গল্প নব মন্ডলের গল্প সাগরিকা রায় শরৎ ২০১৯

সাগরিকা রায়ের আগের গল্পগুলোঃ যে কোনও দিন, ওরা ভূতপুরোহিতমশাই, ছবি তুলতে গিয়ে

সাগরিকা রায়

সে অনেকদিন আগের নয়, মাত্র কয়েকদিন আগের কথা। নব মণ্ডলের তুতো ভাই বলু মণ্ডলের একটি চাঁদপানা খোকা হয়েছে। সেই খবর নব পেল একটি মাস পরে কলাইকাটির হাটে গিয়ে। সেখানে বটেশ্বর সর্দারের মেয়ে শোভারানি এসেছিল কাঁচা হলুদ কিনতে। শীত আসতেছে। এখন কাঁচা হলুদে ভারি রস। যেন কাঁচা সোনা। শোভারানি প্রত্যেক শীতে কাঁচা হলুদ মেখে চান করে বলে কালো রঙে কেমন হলুদ হলুদ আভা দেয় ওর মুখে। তো হলুদ কিনে ফিরে তাকাতেই নবকে দেখতে পেয়েছে। পেয়ে তো মুখে হাসি ধরে না। হাতের রুপোর বালা নেড়ে সে চোখ পাকাল, “কই গো কাকা? মিষ্টি কোথায়? বেলাগোবার চমচম চাই, নইলে দেখো বাজারে গুঁড়মণি সন্দেশ এসচে কি না।”

তো তখন শোভারানি বলুর খোকার কথা বলেছে। আর বলতেই নবর ভারি মনখারাপ হল। কী? বলু আমারে এমন একটা খপর দিলে না? খোকার মুখ দেখতে ডাকলে না? আচ্ছা, বেশ। আমি আজই গিয়ে কলাবতীকে বলব। কাল রওনা দিলে বলুর বাড়ি পৌঁছতে দিন দুই লাগপে। গিয়ে আচ্ছা কইরে কতা শুনিয়ে দেব।

এই ভেবে নব বাড়িতে গেল। নবর বৌ কলাবতী তখনই গরম গরম পায়েস ঠাণ্ডা করতে দিয়েছে ফ্যান খুলে। ফ্যানের হাওয়ায় কলাবতীর চুল ফরফর। ঘুমে চোখ ঢুল ঢুল। নব রেগে রেগে এসেছে বলে তাড়াতাড়ি হেঁটেছে। তাড়াতাড়ি হেঁটেছে বলে বাড়িতে তাড়াতাড়ি এসেছে। এসেই, “খলাবথী-ই-ই!” বলে এমন হাঁক পেড়েছে, ফ্যানটা ভয়ে কাঁপতে লেগেছে। সে ভেবেছে বুমিখম্প হচ্ছে নাকি? বুমিখম্পকে ফ্যানের বড্ড  ভয়। বুমিখম্প হলে পরে ফ্যানকে খুলে মাটিতে গ্যামাছ করে পত্তে হয়! বড্ড ব্যথা নাগে তার! তারপরে কলাবতী লাফিয়ে উঠে যখন দাঁড়িয়ে পড়েছে, তখন ফ্যান তাকিয়ে দেখে নব মণ্ডল বারান্দায় জুতো ছেড়ে ঘরে ঢুকছে। মুখ গরগর। কান লাল। দেখে ফ্যান জোরে জোরে ঘুত্তে নেগেছে। ভাবল, আহা! নোকটার গরম হতিছে। এট্টু ঠাণ্ডা বাতাস দিই। মাতা ঠাণ্ডা হবে।

নব হেব্বি খেপে গিয়েছে। “কী কাণ্ড বল দিনি, খলাবথী! আমার ভাইয়ের খোকার জন্মের খপর কিনা অন্যের মুখ থেকে শুনতি হল? বটেশ্বরের মেয়ে গিয়ে গাঁয়ের লোকদিগেরে বলে দিইছে এতক্ষণে, ‘শুনিছ, নবর সঙ্গে ভাইয়ের ভাব নেইকো! কতাবাত্তা নেইকো! খোকার খপর নব জানে নাকো!’ অহন আমি বলুর বাড়ি সরুচাকলিতে যাব। গিয়ে আচ্ছা করি কতা শুনোয় আসপ। তুমিও যাবে খলাবথী। আমি যখন বলুরে বকতি থাকপ, তুমি খোকারে দুইখান সোনার বালা পরায় দিও। পারবা না? ও, পায়েস করিছ? কৌটো করি নে’ চলো দিনি। বলুরে অনেকদিন পায়েস খাওয়াইনি। বলু পায়েস খাতি খুব ভালোবাসে।”

কলাবতী হেসে হেসে দুলে দুলে পদ্ম রঙের শাড়ি পরেছে। খোঁপায় সোনার চিরুনি গুঁজেছে। হাতের বটুয়ায় লাল ভেলভেটের বাক্সে একজোড়া সোনার বালা নিয়েছে। আর কৌটো করে পায়েস নিয়েছে। এদিকে যাওয়ার সময় ভুল করে ফ্যান অফ করে যায়নি! ফ্যান অনেকবার বলতে চেয়েছে, ‘ওগো, আমারে অফ করি যাও। কবে ফিরবা তোমরা কে কতি পারে! আমি কতদিন ধইরে ঘুত্তি থাকপ? মাথা ঘুইরে মরব নাকি?’ তা তারা খুব ব্যস্ত কিনা! শুনতেই পেল না ফ্যানের কথা। ফ্যান ক্যাচ ক্যাচ করে ঘুরছে। শরীর ব্যথা। মাথাও ঘুরছে। কী কর্বে? ওরে থামাবে কে? নবর ঘরে আছে মনখুশি। তাকে না বললে সে আজকাল কাজই কত্তে চায় না। নবর আজব ফলের গাছে রোজ দুটো দানা ইউরিয়া ফেলার কথা তার মনেই থাকে না। কলাবতী বলে, “মনখুশির বয়স হইছে গো।” আর নব বলে, “মনখুশির বড়ো ফুটানি হইছে মনে হতিছে।”

এদিকে তারপরে তো তারা দু’জনে রওনা দিয়েছে। অনেকদূর হেঁটে নব আর কলাবতী একটা অটো-রিকশা ধরে কু-ঝিক-ঝিক ইস্টিশানে পৌঁছেছে। কামরায় উঠে আরাম করে বসেছে। জানালার বাইরে কত কত গেরাম সুড়ুৎ সুড়ুৎ সরে যাচ্ছে। কলাবতীর দেখে দেখে আশ মেটে না। কাদের পুকুরঘাটে দুটো বউ চান করতে লেবেছে। তাদের গোছাভরা চুল খুলে জলে ডুবে আছে। দেখে কলাবতীর ইচ্ছে জেগেছে ওইর’ম করে চান করে। নব জেনে ব্যাজার হল। অহন টেরেন গাড়িরে থামতে বললে সে থামবে না। মাঝে থেকে কিনা দেরি হয়ে যাবে বলুর বাড়ি যেতে। ওদিকে দেরি হতি থাকলি খোকাডা বড়ো না হইয়ে যায়! তখন হাতের বালা আর হাতে ঢুকপে? কলাবতীর বুদ্ধিতে জল দিতে হবে। বুদ্ধি মোটে বাড়ছে না! এট্টু জল দিলি গাছের মতো বুদ্ধিও ফরফর করে বাড়বে। কিন্তু ট্রেনে জল কোথায়? পাশের শুঁটকোমুখো লোকটি একটা মোবাইল ফোন নিয়ে ভারি মজার খেলা খেলছে। গোল গোল রঙবেরঙি বেলুনরে ঠুস ঠুস ফাটিয়ে দিচ্ছে। নব উঁকি দিয়ে খেলাটা দেখছে, সেটা লোকটির মোটেও পছন্দ হলনি। সে খেঁকিয়ে উঠল, “অভব্যতা। সভ্যতা জানে না। লোকের ঘাড়ের ওপরে উঠতি হয় না, সেটা জানে না।”

শুনেই লোকটির থোম্বাপানা মুখ বউটি ফিচিক করে পানের পিক ফেলেছে জানালা দিয়ে। “গেরামের লোক মনে হতিছে, বুঝলে? এতই যখন ইচ্ছে, কিনে নেগে যা।”

“কী কিনে নেব?” নব ভারি অবাক প্রায়, “এই খেলনা কোথায় পাব? কোন হাটে?”

“অ মা! এটা আসতিছে কোথা থেকে গ? কিছুই জানে না নাকি? বাজারে যাও। পাবে। বলবে মুবাইল ফুন কিনব। হাটে এসব বিক্রি হয় না গো! হি হি, ভূত একটা। কিছুই জানে না। হ্যাঁ গো, কিছু না জানলি পরে খুব কষ্ট, তাই না?”

নব হাঁ করে বসে থাকে। মুবাইল ফুন? বাপ রে! ইডা পাবে কনে? কোন হাটে? হাটে নাকি পাওয়া যায় না। তাহলে নব বাজারে যাবে কোন পথ দিয়ে?

“হাটে পাওয়া যায় না। বাজারে যাও। এইটে হল গে হ্যান্ড সেট। পরথমে এইটে কিনতে হবে। তারপরে দোকানি সব বুঝোয় দেবে। আর সিম নিতে হবে।”

নবর মন আর চলে না। এইর’ম একখান ফুন হলি পরে কতই না মজা। হাটে গেল নব। কলাবতীর জন্যি একখান রোদ্দুরের চশমা কিনতি ইচ্ছে হল। তো কলাবতী কেমন নিতে চায়? জানতে হলে নবকে বাড়িতে আসতে হবে না। পকেটে মুবাইল ফুন আছে। কলাবতীরে ফুন করপে নব, “ও খলা, কেমন চশমা নিবা কও দিনি। লাল ডান্টি? নাকি লীল?”

কিন্তু সিম কেন যে নিতি হবে! বাড়িতে ইবারে সিম হয়নি। গাছের গোড়ায় পিঁপড়ে বাসা বেঁধেছে। গোড়া কেটে দিয়েছে। সিম কিনতে হবে কতটা? কেজি পাঁচেক হলি? হপে?

শুঁটকো আর ওর থোম্বাপানা বউ জবাব দেওয়ার আগেই ওদের ইস্টিশান এসে গেল। ওরা হুড়পাড় করে নেমে গেল। নামার আগে শুঁটকো দাঁত কেলিয়ে মুখের ভেতরে তাস খেলা দেখাল। “কেজি দশেক সিম কিনে নিও। চাইলে আরও কিনে নিও। চচ্চড়ি খেও সর্ষেবাটা দিয়ে। মুগ ডালে গোটা সিম দিতি পার। তাইলে এট্টু ঘি দিও। বলে, মুগের ডালে ঘি দিলে ক্ষীরের স্বাদ হয়। ঘি না থাকলে কিনে নিও।” বলেই লোকটি ঝুপ করে হাওয়া।

নব মাথা নাড়ল। বেশ। কেজি দশেক সিম দিয়ে তাহলে কাজ চালাতে হবে? কী দরকার? নব এট্টু বেশিই কিনে রাখপে। সামান্য সিম। নবর জমিতে না হয় সিম লাগিয়ে দেওয়া যাবে। হু, কলাবতী সিম-চচ্চড়ি বড্ড ভালোবাসে।

“আমার বড্ড চান চান মন কত্তিছে। এট্টু চান করিগে? এখন টেরেন থামিছে। নেমে পড়ি।” বলেই কলাবতী নেমেছে। কী আর করা যাবে? নবও নেমে পড়েছে। ওরা নামতেই ট্রেন হুস-হাস-ভাগ-ভাগ বলতে বলতে গা নাড়াতে নাড়াতে কোথায় চলে গেল। নব দেখে দেখে শ্বাস ফেলল। দেখ দিনি কাণ্ড! কত না দেরি হয়ে যায়! ওদিকে বলুর ছেলে বুঝি বড়ো হইয়ে গেল। না জানি কত লম্ফা হয়েছে সে! চোখে চশমা না উঠে যায়! চিনতে পারবে না নব বলুর ছেলেকে। আহা, সোনার বালাদুটো তার হাতে আর ঢুকপে না।

বলুর খোকার সোনার বালায়
ছোট্ট ছোট্ট ফুল,
দেরি হলি বড়ো হবে
বড্ড হবে ভুল।
বলুর খোকা চশমা চোখে
আটুল বাটুল চায়,
নব নামে জ্যাঠার কথা
বলতে নাহি পায়।
অচেনা এক কলাবতী
নামের জেঠিমণি,
বলুর খোকা তাকে তো আর
দেখবে না কখনই।
চোখে জল আসে নবর।

ওদিকে ট্রেন লাইনের পাশের পুকুরঘাটে গিয়ে জলে নেমে পড়েছে কলাবতী। চুল খুলে জলে ডুবিয়ে ছলাত ছলাত চান করতে লেগেছে। নব বলল, “তুমি তাহলে চান করো। আমি দেখি, এদিকের বাজার কোথায়। ফুনটা কিনে আনি গে।”

বলেই নব দুলে দুলে হেঁটে যাচ্ছে। অনেকটা রাস্তা গিয়ে একটা চার মাথার মোড় পড়েছে। নব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। মনে হচ্ছে এদিকেই কোথাও বাজার আছে। চারটি বড়ো বড়ো ছেলে একজায়গায় বসে মনখারাপ করে কীসব আলোচনা করছে। নব ভাবল, যাই, ওদের জিজ্ঞাসা করে দেখি। এখনকার ছেলে, এরা সব জানে। ফুনের কথা বলতে পারবে ঠিক।

নব কাছে গিয়ে দাঁড়াতে ছেলেরা মুখ তুলে তাকিয়েছে। আর নব দেখল, আহা, ছেলেদের চোখে কত দুঃখ টলমল কত্তিছে। এদের কী হয়েছে কে বলবে! বড্ড দুঃখ পেইছে মনে হতিছে। নব জিজ্ঞাসা করেই ফেলে, “হ্যাঁ গো, তোমরা কারা? এহানে মনখারাপ কইরে আছ কেন? দেশে কি রাক্ষস আছে নাকি?”

ছেলেরা আকাশের দিকে তাকাল। “রাক্ষস কি আর নেই? আছে। আমাদের পেছনে আছে। ঠেলে ফেলে দেয় কেবল। সে বড়ো ভয়ংকর!”

“সেডা কেমন?”

“আমাদের ভারি কষ্ট। টাকা নেই। ঘরে বাবা, মা, ভাই, বোন… কাজ করতুম অনেক দূরে। আজ চাকরি থেকে ছাঁটাই করেছে। হঠাৎ করে বলে দিল, বাড়ি যাও। আর আসতি হবে নে। অনেক টাকা পেয়ে গেছ। অহন বাড়ি গিয়ে সুখ করো। যারা বলিছে, তারা রাক্ষস। সে কী ভয়ানক চেহারা! আমাদের খাতি দেবে না। অথচ তাদের কত সুখ। সুখের পাহাড়ে বসে তারা চমচম খাচ্ছে। কত কী খায়। দুধের সরে মধু ঢেলে খায়। আর আমাদের পান্তায় জল নেই! বলো দেখি, জল ছাড়া বাঁচি কী করে? তো বলে, জল খাও, ভাতের দরকার নেই। টাকা নেই। কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছে গো। খারাপ লোক কিনা।

“এখন চাল কিনব কী করে? খাওয়াব কী? খাব কী? রাক্ষসেরা মধু খায় মাখন মেখে, আর আমাদের ভাত নেই!”

ছেলেরা কেঁদে উঠেছে। আর নবর ভারি বিরক্তি ধরেছে। ছি ছি ছি! বুড়ো দামড়া ছেলেরা কানতি লজ্জা হয় নাকো? রাক্ষস এর’ম করে? ছি ছি। নবর রাগ হয়। রাগ হলি নবর বিনিপিসির কথা মনে হয়। সেই পিসি, যে কিনা খুন্তি গরম করে রাক্ষস মেরেছিল। নব খবর পেয়ে গিয়ে দেখেছে, পিসির উঠোনের ওপরে গরম ছ্যাঁকা খাওয়া রাক্ষস শুয়ে কাঁদতে লেগেছে। একখান ছেঁড়া হাফ প্যান্ট পরে আছে। গায়ে সিল্কের জামা। গলায় সোনার হার। সে নাকি পিসির গলার থে হার টেনে নিয়ে পালাচ্ছিল। পিসি তাড়া করতেই জামগাছের ওপরে উঠে সে পালাচ্ছিল। পিসি সন্দেহ করেছিল জামগাছের ওপরে ওর কোয়ার্টার। পিসি জগদীশকে ডেকে গাছে তুলে দিল। জগদীশ গাছে উঠে রাক্ষসের কোয়ার্টারটা হাতে নিয়ে নেমেছে। আর রাক্ষস গরম ছ্যাঁকা খেয়ে সেই থেকে কাঁদছে। তো এই ছেলেরা কাঁদছে, লজ্জা নেই! এরা মানুষ। মানুষ কেন রাক্ষসের মতন কইরে কাঁদপে?

“লজ্জা? না খেয়ে থাকতি পার? তাহলে বুঝতে।”

“দাঁড়াও, আমারে ভাবতি দাও। পরথমে কও দিনি, বাজার কোনদিকে। আমি একডা ফুন কিনব।”

“মোবাইল ফোন? ওই দিকে বাজার। যাও। ফোন কেন গে।”

“অ মা, আমি ফুন কিনব কি একা একা? চলো, আমারে দোকান দেখিয়ে দেবে।”

ছেলেগুলো ব্যাজার মুখে চলল নবর সঙ্গে।

বাজারে পরপর কত দোকান। সকলের হাতে হাতে মুবাইল ফুন। দেখে নব ভারি খুশি। একটা দোকানে ঢুকে ফোন কিনেছে নব। সিম কার্ড দেখে হেসে বাঁচে না। অ মা, এর নাম নাকি সিম? হায় হায়! কী বোকা আমি। বলে, আর হাসে নব। এদিকে ছেলেরা বলল, “অহনে আমরা যাই।”

“যাবা কেন? চলো, কিছু খাতি হবে। খিদে পেইছে, চলো।”

ছেলেগুলোকে নিয়ে পেটভরে মিষ্টি খেল নব। ছেলেরা মিষ্টি খেয়ে খুশি। পেট ভরেছে মনে হচ্ছে ওদের। এখন নব কাজের কথা বলতে চায়।

কী কাজের কথা?

“বলতেছি, তোমরা ফুনের দোকান দাও। আমি টাকা দেব। চারজন মিলেমিশে ব্যাবসা করবা। বুঝতেছ? আমারে পরে টাকা শোধ কইরে দিতি হবে কিন্তু। টাকা জমবে। জমি কিনে চাষ করো। ফসল হবে। সেই ফসল কলকেতার বাজারে যাবে। তার জন্যি খুব খাটতি হবে। নইলে টাকা কি এমনি আসে? বলো, ঠিক কি না?”

ছেলেরা খুশিতে মাথা নাড়ে। ঠিক ঠিক ঠিক! হাসি ফিক ফিক ফিক! অজানা সে বিজনেস/ ফ্যান্টাসটিক!

ছেলেরা প্রাণপণ খাটছে। নবর ফুনের দোকানে ভিড় উপচে পড়ছে। বাজারে নতুন দোকান নবর। ছেলেরা যখন বেশ ভালোরকম ব্যাবসা করতে শিখে গেল, কিছু জমি কিনিয়ে দিল নব। সেই জমিতে কত কত ফসল হল, সে আর বলার না। তারপরে একদিন নব বলল, “এইবারে আমি যাই, আবার আসপ। ওদিকে আমার বউ  কলাবতীর পুকুরে চান বুঝি হয়ে গেল।”

বলে তাড়াতাড়ি করে ছেলেদের নতুন কেনা বাইকে চেপে ইস্টিশনে পৌঁছেছে নব। কলাবতী চান সেরে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল। নব গিয়ে মোবাইল ফোন দেখাতে কলাবতী কী খুশি, কী খুশি! বলে, “বলুরে একটা ফোন করো দিনি। বলো, আমরা ঝগড়া করতি আসতেছি। কথা শোনাব বইলে আসতেছি। খোকা হয়েছে, বলু কিনা তোমারে একটা খপর দেয় নাই?”

নব বলুকে ফোন করেছে। বলু আনন্দে হেসে অস্থির। “আস দাদা। আজ খোকার হাতেখড়ি। নেকাপড়া শিখপে কিনা। তুমি এলে দেখপে খোকা কেমন সুন্দর হইছে। কত কথা কয়। খোকার কথা শুনলি তুমি অবাক হইয়ে যাবে। বিশ্বাস করতি পারবে না দাদা। খোকার দুটো হাত, দুটো পা, দুটো চোখ, দুটো কান আছে গো! এক্কেরে আমার মতোই! তোমার মতোই! সে কথা কয় মুখ দিয়ে!”

নব তাড়াহুড়ো করে ট্রেনে উঠে বসেছে। মন খুশি, আবার খারাপও। খোকা কিনা বড়ো হইয়ে গেল? বালাদুটো পত্তে পেলে না?

কলাবতী সাহস দেয়, “তাতে কী? এই যে পায়েস নিয়ে যাচ্ছি, খোকারে খাইয়ে দিতি হবে। খোকা তাতেই খুশি হবে দেখো। আর সোনার বালা হাতে না ঢোকে তো আঙুলে ঠিক ঢুইকে যাবে।”

এই সময় নবর একটা কথা মনে পড়ে গেল। “ইস! কলাবতী, বিরাট ভুল করি ফেলাইছি। ফ্যানটা বুঝি অফ করি নাই! বেচারা ঘুত্তেছে আর ঘুত্তেছে!”

“মনখুশি আছে তো! ফ্যানটারে ও ভালোবাসে। দেখেশুনে রাখপে। তাছাড়া ফ্যানডার বুদ্ধি আছে। নিজেই থেমে যাবে। না থামলি ওর মাথা ঘুরবে না? চলো, অহন এট্টু আরাম করি। বলুর বাড়ি এল বলে।”

কলাবতী আরামে চোখ বুজে ফেলে। চান করে আরাম হয়েছে আর কী! “এট্টু ঘুমিয়ে নিই।”

নব আর কী করে? বসে বসে ইটুবে ছিনেমা দেখতে বসে গেল। ছিনেমার নাম লালু ভুলু। নবর মনে হল, এরা ভুল লিখেছে। আসলে হবে, নব আর বলু। সবাই কি আর সবকিছু বোঝে?

অলঙ্করণঃ শিমুল

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s