গল্প- নূর ঋজু গাঙ্গুলী শীত ২০১৬

golporiju01

বিরক্ত মুখে স্ক্রিনের থেকে চোখ তুলে সামনের প্লেক্সিগ্লাসের দেয়ালের দিকে তাকালেন সের্গেই। স্বচ্ছ দেওয়াল দিয়ে তখন দেখা যাচ্ছে সেই দৃশ্য, যা অগুন্তি মহাকাশচারীর দেওয়া বর্ণনা পড়ে, আর ফটোর মাধ্যমে ভূগোল বইয়ে হাজারবার দেখেও পুরনো হয় না। কালো আকাশের বুকে উজ্জ্বল একটা নীল গোলকের মতো ঝুলে থাকা পৃথিবীর যে দিকটায় রাত নেমেছে, সেদিকের শহরের পর শহরে জ্বলে উঠছে আলোর মালা। কিন্তু সের্গেই-এর মাথার ভেতরে তখন যদি একটা দাঁড়িপাল্লা ফিট করা যেত, তাহলে অন্যসব আবেগ আর অনুভূতি একদিকে চাপিয়ে অন্যদিকে শুধু বিরক্তি চাপালেও বিরক্তির দিকেই কাঁটাটা ঝুঁকে পড়ত। আর তাঁর বিরক্তির কারণটাও একটা কথাতেই গুছিয়ে বলা যেত।

ওই অবাধ্য মেয়েটার জন্যই আজ ডায়নামো কিয়েভের সঙ্গে বার্সেলোনার খেলা দেখার সুযোগটা ফসকে গেল!

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে কাছে এসে গিয়েও পৃথিবী যে এখনও রেডিও অ্যাকটিভ একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়নি, সেটা স্রেফ কয়েকজন ঠাণ্ডা মাথার মানুষের চেষ্টায়। তাঁরা এটা খুব ভালো করে বুঝেছিলেন যে লড়াইয়ের জন্য আস্তিন গুটিয়ে বসে থাকা কয়েকজন নেতাকে, আর তাঁরা যাদের খেপিয়ে তুলছেন সেইসব মানুষকে, যদি তাঁদের যাবতীয় বোঝাপড়া খেলার মাঠে করে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে যুদ্ধের দরকারই হবে না।

তাঁদেরই চেষ্টায় পৃথিবীতে আয়োজিত হচ্ছে এক অলিম্পিক, যা আক্ষরিক অর্থেই অভূতপূর্ব। যুদ্ধের জন্য কোমর বেঁধে তৈরি হওয়া দুই শিবিরের দেশগুলোর সেরা সব টিম ভাগ নিচ্ছে সেই অলিম্পিকে, যাতে কবাডি থেকে ক্রিকেট, বেসবল থেকে বোওলিং, সুইমিং থেকে সেপাক টাকরো – এইসব খেলাই থাকছে। সেই অলিম্পিকের অঙ্গ হিসেবে ফুটবলম্যাচগুলো একেবারে জমে গেছে। গ্রুপের মরণ-বাঁচন এক ম্যাচে আজ রাতে মুখোমুখি রাশিয়ার চ্যাম্পিয়ন টিম ডায়নামো কিয়েভ আর স্পেনের সেরা দল বার্সেলোনা। কিন্তু…

পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকা অগুন্তি উপগ্রহের মাধ্যমে অলিম্পিকের বিভিন্ন খেলা, ধারাবিবরণী, বিশ্লেষণ, বিজ্ঞাপন, গানবাজনা, মায় এই এলাহি ব্যাপার নিয়ে কমেডিয়ানদের নানা হাসিঠাট্টা, এসবই পৌঁছে যাচ্ছে টেলিভিশন, রেডিও আর ইন্টারনেট মারফৎ প্রায় প্রতিটি মানুষের কাছে। কিন্তু চাঁদের বুকে গড়ে ওঠা মাইনিং কলোনি, গবেষণাগার, আর ক্যাম্পেও তো থাকেন প্রচুর মানুষ। তাঁরা এসব শুনতে দেখতে পাবেন কী করে?

তাই শুধু তাঁদের জন্যে, মাত্র কয়েকমাস আগে, দুই শিবিরের মিলিত উদ্যোগে মহাকাশে ঠাঁই পায় একটি আনকোরা নতুন স্পেস স্টেশন, লাইকা। তারই ডালপালা মেলার ফলে, মানে চাঁদ আর পৃথিবীর টানাটানির ফলে তার সম্প্রচার ব্যবস্থা যাতে চোট না খায় সেটা নিশ্চিত করার জন্যে যে ক’টা ছোট্ট উপগ্রহ চাঁদের চারপাশে ঘুরছে তাদেরই একটি হল লাইকা-৫।

লাইকা-৫-এ কর্মীর সংখ্যা মাত্র দুই – ক্যাপ্টেন সের্গেই আর অপারেটর নূর। অলিম্পিক শুরু হওয়ার পর থেকেই কর্তৃপক্ষ নূরকে নিয়ে বিব্রত হচ্ছেন, আর তারও মাত্র একটাই কারণ, মেয়েটা অবাধ্য। নূরকে যদি বলা হয়, আজকের খেলা শুরুর আগে আতসবাজির জমকালো বর্ণনা সবার কাছে পৌঁছে যাওয়ার সময় জগঝম্প বাজিয়ে খুশির আবহ তৈরি করা হোক, ও সে কথা শুনবেই না। বরং, সেদিন আফ্রিকার কোন এক নাম না জানা গ্রামে দাঙ্গাবাজদের আক্রমণে মৃত শিশুদের জন্যে ও উৎসর্গ করবে একটা করুণ সুর। আবার তাকেই বলুন না খেলার মাঠের পাশে রাশভারি বৈঠকে মোলাকাত করতে বসা দুই তাবড় নেতার প্রতি সম্মান জানাতে গম্ভীর একটা সুর বাজাতে। সে মেয়ে মোক্ষম সময়ে বাজাবে এমন এক চটুল সুর, যা শুনে খেলোয়াড় থেকে যুদ্ধবাজ নেতা সবারই পা আপনা থেকেই ঠুকতে থাকবে, শরীরে আসবে দুলুনি। অথচ প্রায় সব পরিস্থিতিতে হাতে যা থাকবে তাই দিয়ে লাগসই সুর ফুটিয়ে তোলায় জুড়ি নেই নূরের! সঙ্গে যোগ করতে হয় তার অসামান্য স্মৃতিশক্তি, যা দিয়ে সে নিমেষে মনের কোণ থেকে খুঁজে বের করতে পারে হারিয়ে যাওয়া সুর, পদ, ছন্দ। তাই লাইকার কর্তারা রেগে অগ্নিশর্মা হন। টেনশনে ডাক্তারের কাছে তাঁদের হাজিরা বাড়ে। কিন্তু নূর থেকে যায় তার জায়গায়, কিবোর্ড আর মাইকের সামনে।

সেনাবাহিনীর ইম্পিরিয়াল ব্যান্ড থেকে অবসর নিয়ে সের্গেই যখন প্রথমে লাইকায় যোগ দেন এবং তারপর লাইকা-৫-এর দায়িত্ব নেন তখন নূরের কাজকর্ম দেখে তিনি রাগে আর বিস্ময়ে প্রায় হতবাক হয়ে গেছিলেন। তবে শুরুতে একজন প্রাক্তন সৈন্য হিসেবে ভীষণ রেগে গেলেও একটু একটু করে সের্গেই অবাধ্য আর দুষ্টু মেয়েটাকে মেনে নেন, এমনকি একটু স্নেহও করতে শুরু করেন।

মহাকাশের বিশালতায় অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর থেকে মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবেই দেখে মেয়েটা। আর তাই ছোট্ট একটা ঘরে ফুলেফেঁপে বসে থাকা লোকেদের কথাকে সে পাত্তা দেয় না। ওর সেই বেপরোয়া মনোভাবই যে এই অবাধ্যতার মাধ্যমে প্রকাশ পায়, এটুকু বোঝার ক্ষমতা ছিল সের্গেই-এর। কিন্তু আজকের পর থেকে আর স্নেহ নয়, ক্ষমাও নয়, মেয়েটার কথা ভাবলেই দাঁত কড়মড় করে উঠছে সের্গেই-এর!

ঘুম থেকে ওঠার পর মাথার ভেতরে জমা মাকড়শার জালগুলো কাটানোর জন্যে সের্গেই-এর সবচেয়ে পছন্দের পদ্ধতি হল দিনের বাকিটা নিয়ে প্ল্যান করা। আজ যখন তিনি কষ্টার্জিত ছুটিটা ভিডিও স্ক্রিনের সামনে বসে প্রিয় দুই দলের খেলা দেখে কাটানোর জমাট পরিকল্পনা করছেন, আর সেই ভাবনার ঠেলায় বিনা কফিতেই তাঁর মাথাটা একদম সাফসুতরো হয়ে যাচ্ছে তখনই সদর দপ্তর থেকে ডাক এল। সদর দপ্তরে রিপোর্ট করেই সের্গেই ছুটলেন কনফারেন্স রুমে, যেখানে ততক্ষণে জমা হয়েছেন লাইকা আর তার সম্পূরক স্টেশনগুলোর প্রায় সব ক’জন অধিকারী।

কোনওরকম ভূমিকা না করেই কথা শুরু করলেন লাইকার প্রধান অফিসার, ব্রিগেডিয়ার উ থান্ট।

“আজ সকালে আমরা রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছ থেকে একটা মেসেজ পেয়েছি। শেষ পর্যায়ের কথাবার্তার জন্য, লাইকায় আজ এসে পৌঁছচ্ছেন দুই বিবাদমান শিবিরের দুই রাষ্ট্রনেতা। তাঁদের সঙ্গেই থাকছেন রাষ্ট্রপুঞ্জের একেবারে উঁচুস্তরের কয়েকজন পদাধিকারী। যেহেতু চাঁদে দুই শিবিরেরই বহু মানুষ জাতির সেবায় এবং কর্তব্যের খাতিরে নির্বাসিত জীবনযাপন করেন, তাই রাষ্ট্রপুঞ্জের তরফে একটা বৈপ্লবিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেই পরিকল্পনা মাফিক কথাবার্তা হয়ে যাওয়ার পরেই চাঁদের বাসিন্দা যেকোনও মানুষ তাঁর ক্যাম্পের ভিসিফোন ব্যবহার করে দুই শিবিরের দুই নেতাকে যেকোনও প্রশ্ন করতে পারবেন।”

এই অবধি শুনেই গোটা কনফারেন্স রুমে এত জোরালোভাবে গুঞ্জন উঠল যে কথা থামিয়ে একটু অপেক্ষা করলেন উ থান্ট। তাতেও কোনও ফল না হওয়ায় ওনাকে জোর গলায় বলতে হল, “নিজেদের মধ্যে কথা না বলে সেগুলো একে একে বললে এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে আমাদের সবারই সুবিধে হবে।”

কথাটায় প্রত্যাশিত ফল হল, মানে সবাই চুপ করে গেল। আবার কথা শুরু করলেন ব্রিগেডিয়ার।

“রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং দুই শিবিরের অধিকাংশ নেতাদের মতে এতে দুই শিবিরে বিশেষত চাঁদের কলোনিগুলোয় পরিবেশ অনেক চাপমুক্ত হবে। তাছাড়া চাঁদে যেসব বিজ্ঞানী আছেন তাঁরা বেশিরভাগই দুই শিবিরের থিঙ্ক ট্যাঙ্কের সদস্য। ফলে এই কথাবার্তা থেকে যদি তাঁরাও নিশ্চিন্ত হন, তাহলে দুই শিবিরের মধ্যে শান্তির ব্যাপারটা পাকাপোক্ত হয়।”

এই অবধি আলোচনা শুনে সের্গেই-এর কোনও ভাবান্তর হয়নি। কারণ, এমন একটা মারমার কাটকাট ব্যাপারে লাইকার জীবনে ঢেউ উঠলেও এবং সেখানের সব কর্তাব্যক্তির ছুটি বাতিল হলেও গান বাজানোর দায়িত্বে থাকা স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত অফিসার অর্থাৎ, তাঁকে জ্বালানোর কোনও দরকারই নেই।

কিন্তু যেখানে নূর আছে, সেখানে কিছু না কিছু তো হবেই!

নিজের কথা শেষ করে উ থান্ট এবার একে একে সবাইকে শুধোতে থাকেন, অনুষ্ঠানটিকে সর্বাঙ্গসুন্দর করার জন্যে কী কী করা যায়। অনেকের অনেক কথার মধ্যে লাইকা-৫ নিয়ে কোনো উল্লেখ না থাকায় সের্গেই যখন ‘নীরবতা হিরণ্ময়’ কথাটা মেনে আলোচনা শেষ হওয়ার আশায় কনফারেন্স রুমের প্রকাণ্ড ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছেন, ঠিক তখনই নূরের গলা তাঁর কানে এল।

নূর বলছিল, “আচ্ছা, ফোন-ইন-এর সঙ্গে অনুরোধমাফিক গান বাজানোর ব্যাপারটা থাকলে অংশগ্রহণকারী বৈজ্ঞানিক, সৈন্য, হাইড্রোপনিক প্ল্যান্টের ইনচার্জ, এমনকি, উত্তরদাতা রাষ্ট্রনেতা, সব্বাই অনেক বেশি উৎসাহী হবেন। তাই না?”

একমুহূর্তের জন্যে আলোচনা থেমে গেলেও এর পরেই সবাই প্রস্তাবটা সবাই লুফে নেয়। বলাই বাহুল্য, যে কিছুক্ষণ আলোচনার পরেই দেশ বিদেশের গানের সম্বন্ধে অঢেল জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে নূরই অনুষ্ঠানের গান বাজানোর অংশটা সঞ্চালনের দায়িত্ব পায়। এটা বলাও বাহুল্য, যে এমন হেভিওয়েট অনুষ্ঠানের সময় একা নূরকে লাইকা-৫-এর দায়িত্বে রাখার কথা ভাবাও অন্যায় বলে গণ্য হয়।

ফলে আপনমনে একটা ভোমরার মতো করেই প্রিয় সুরটা গুনগুনিয়ে নূর যখন তার নিজের হাতে পাকানো জট সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে লাইকা-৫-এর সব সিস্টেম পরীক্ষা করে দেখছে তখন খেলা না দেখে সের্গেই বসে আছেন কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে।

সচরাচর সের্গেই নূরকে বকেন না। কিন্তু আজ নিজের খিঁচিয়ে থাকা মেজাজ আর কানের কাছে হওয়া গুনগুন, এই দুইয়ের প্রভাবে উনি যখন একটা বিশাল ধমক নিজের মধ্যে জমিয়ে তুলে সেটা বাইরে আনার সুযোগ খুঁজছেন তখনই নূর অবাক বিস্ময়ে প্লেক্সিগ্লাস দিয়ে বাইরে একটা কিছু দেখিয়ে প্রশ্ন তুলল, “ওটা কী, ক্যাপ্টেন?”

আকাশের যে কোণটা নূর দেখিয়েছিল, সেদিকে তাকিয়ে সের্গেইও খুব অবাক হলেন। চাঁদের বুকে হতে থাকা উল্কাপাতের হাত থেকে কলোনিগুলোকে বাঁচানোর জন্যে যে ভাসমান আর প্রকাণ্ড আকারের ম্যাগনেটিক ফিল্ড জেনারেটরগুলো একসময় ব্যবহৃত হত, তেমনই একটা পরিত্যক্ত জেনারেটরের মধ্য থেকে তখন বেরিয়ে আসছিল একটা নাম, চিহ্ন, এমনকি সিরিয়াল নম্বরবিহীন স্পেসশিপ। এমন একটা মহাকাশযান হঠাৎ চাঁদের ওপরে কী করছে সেটা নিয়ে মনের মধ্যে জেগে ওঠা প্রশ্নগুলো মুখ ফুটে বলার আগেই সের্গেই আর নূরকে ভীষণ চমকে দিয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল লাইকা-৫। হরেক রঙের আলোয় ঝলমলে কন্ট্রোল প্যানেল আর স্ক্রিনগুলোও একই সঙ্গে অন্ধকার হয়ে গেল।

লাইকা-৫-এর এমার্জেন্সিসূচক লাল আলোটা জ্বলে উঠল অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই। কিন্তু হেডফোন আর মাউথপিস দিয়ে স্টেশনের প্রায় প্রতিটি যন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা নূরের দিশেহারা চোখ দেখে যে আশঙ্কাটা সের্গেই-এর মনে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল, সেটাই যে সত্যি তার প্রমাণ একটু পরেই পাওয়া গেল যখন উনি বুঝলেন যে যান্ত্রিক শব্দগুলো এমনকি আধা পরিত্যক্ত স্টেশনেও শোনা যায়, সেগুলোও আর শোনা যাচ্ছে না। ইলেক্ট্রনিক্সের দিক থেকে লাইকা-৫ এখন অচল হয়ে গেছে!

সেনাবাহিনির একটা মস্ত বড়ো গুণ এটাই যে সেই জীবন একজন সৈন্যকে প্রায় যেকোনও অবস্থায় কার্যকারণ সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে শেখায়। তাই অন্য কেউ যে অবস্থায় নার্ভাস হয়ে পড়ত সেখানে সের্গেই তৎপর হলেন এটা জানতে যে ঠিক কী হয়েছে লাইকা-৫-এ। স্টেশনের ইলেক্ট্রনিক চোখগুলো অচল হয়ে গেলেও তিনি আর নূর নিজেদের মধ্যে চট করে কাজ ভাগ করে নিলেন। আর তারপর একে একে স্টেশনের প্রতিটি পোর্ট হোল দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলেন।

একটু পরেই দেখা গেল স্টেশনের বাইরের দেওয়ালে মহাকাশের বিভিন্ন ঘটনা ও দৃশ্য বিষয়ে লাইভ ফিড সম্প্রচার করার জন্যে যে পোর্টটা কাজে লাগানো হয় সেটাতেই এসে লেগেছে একটা জিনিস। জিনিসটা পাশ থেকে দেখতে মিসাইলের মতো হলেও পে-লোড হিসেবে বিস্ফোরকের বদলে তার মাথায় রয়েছে একটা রিং আকৃতির বস্তু, যেটা পোর্টের লাগোয়া প্রতিটি পয়েন্ট দিয়ে লাইকা-৫-এ ঢুকিয়ে দিয়েছে নিজের বিভিন্ন সূক্ষ্ম কেবল।

সের্গেই একবার দেখেই বুঝতে পারলেন ওই রিংটির মধ্যে প্রচুর যন্ত্রপাতি গিজগিজ করছে, যেমনটা থাকে সামরিক ক্ষেত্রে কাজে লাগানো জ্যামারে। অর্থাৎ, ওই যন্ত্র তথা অস্ত্র দিয়ে লাইকা-৫-কে অচল করে দেওয়া হয়েছে। জ্যামারটি এসে লাগার ঠিক আগেই যেহেতু ওই নামগোত্রহীন স্পেসশিপটি দেখা গেছিল, তাই এটা মনে করাই যুক্তিযুক্ত যে ওটিই যত নষ্টের গোড়া।

কিন্তু কেন? কী করতে চাইছে ওই স্পেসশিপ?

উত্তরটা একটু পরে দু’জনের কাছেই স্পষ্ট হল। বিশেষত স্পেসশিপটি যখন চাঁদের বুকে ছুটে চলা পৃথিবীর ছায়ার সঙ্গে গা মিশিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে মারে আমব্রিয়াম-এর কাছে পৌঁছে গেল, যার পরেই চাঁদের দিগন্তরেখা, আর তার ঠিক ওপাশেই… ।

নূরই কথাটা আগে বলে উঠল। “ওরা লাইকাকে আক্রমণ করতে চলেছে!”

হয় এই বৈঠকের কথাটা আগেভাগেই জানাজানি হয়ে গেছিল নয়তো দুই শিবিরের মধ্যে যুদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সময় থেকেই কোনও না কোনও এক দেশ এই ভয়ংকর পরিকল্পনাটা ছকে নিয়ে তাদের একটা স্পেসশিপ, স্রেফ এইরকম কোনও অন্তর্ঘাত ঘটানোর জন্যেই লুকিয়ে রেখেছিল ওই পরিত্যক্ত জেনারেটরের মধ্যে। এইমুহূর্তে চাঁদের দিক থেকে লাইকায় হামলা হওয়ার কোনও আশঙ্কা নেই বলে লাইকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে নিযুক্ত ফ্লিট পৃথিবীর দিকে তাক করে রয়েছে তাদের যাবতীয় পর্যবেক্ষণ আর প্রতিরক্ষার যন্ত্র।

“কিন্তু ক্যাপ্টেন,” সের্গেই-এর মাথার মধ্যে প্রায় ইকুয়েশনের মতো করে চলতে থাকা ভাবনাগুলোকে আবার নাড়িয়ে দিল নূর, “ওরা আমাদের অ্যাটাক করল কেন?”

স্টেশন অচল হয়েছে, এটা বোঝার পর থেকেই এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজছিলেন সের্গেই। তার উত্তরটাও ততক্ষণে পেয়ে গেছিলেন তিনি। তাই জবাবটা তিনি ঝটপট দিতে পারলেন, “এটাই হল সেই একচিলতে সময়, যখন পৃথিবীর ছায়া এসে পড়ে চাঁদের বুকে। এই সময়টায় যাতে সম্প্রচারের ব্যাপারটা মসৃণ হয় তা নিশ্চিত করার জন্য বাকি সবক’টা স্টেশন থাকে পৃথিবীর দিকে। শুধু লাইকা-৫ থাকে দিগন্তরেখার এপারে। তাই লাইকা-৫-এর যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দিলে নিঃশব্দ আততায়ীর এগিয়ে আসার খবরটাও লাইকা বা নিরাপত্তাবাহিনির কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে না। আর ঠিক সেই কাজটাই করা হয়েছে। একবার লাইকায় হামলা হলে শান্তি প্রক্রিয়া এমনভাবে চোট খাবে যে দুই শিবিরকে আর খেলা বা আলোচনা দিয়ে সন্তুষ্ট রাখা যাবে না। যুদ্ধ বাঁধবেই।”

কিন্তু এই ভীষণ বিপদের হাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে কী করতে পারে লাইকা-৫, বা আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে তার দু’জন সদস্য? নূরের মুখে এই প্রশ্নটা উচ্চারিত হওয়ার আগেই সের্গেই মনে মনে নিজের হাতে থাকা বিকল্পগুলো আউড়ে নিচ্ছিলেন।

ইলেক্ট্রনিক্সের ওপরে নির্ভরশীল সব সিস্টেম অকেজো।

মহাকাশের নিঃসীম শূন্যতার মধ্য দিয়ে কোনও শব্দ পাঠানো যাবে না।

আলোর সংকেত পাঠানো যেতে পারত, কিন্তু এই মুহূর্তে লাইকা-৫ অন্য সবক’টা স্টেশনের নজরের বাইরে। তাছাড়া এমার্জেন্সির এই ভূতুড়ে লাল আলোর ওপরে তাঁদের কোনও নিয়ন্ত্রণও নেই।

একমাত্র উপায় হল কোনওভাবে একটা ঘটনা ঘটিয়ে লাইকা এবং পৃথিবীর দিক দিয়ে তার চারপাশে বলয় করে থাকা নিরাপত্তাবাহিনির স্পেসশিপগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

কী করা যায়?

একটা উত্তর সের্গেই-এর মাথায় এল। কিন্তু সেটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অবশ্যম্ভাবী পরিণামটাও একই সঙ্গে মাথায় আসায় উনি সেটাকে এড়িয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু উনি তো আর স্টেশনে একা ছিলেন না। বরং লাইকা-৫-এর অন্য মানুষটি তীক্ষ্ণ চোখে তাঁর দিকে নজর রাখায় মুহূর্তের জন্যে সের্গেই-এর মাথায় ঝিকিয়ে ওঠা সম্ভাবনাটা নূরের কাছ থেকে গোপন রাখা গেল না।

“ক্যাপ্টেন, আপনার মাথায় কিছু একটা এসেছে। শিগগিরি বলুন। শুধু লাইকা নয়, গোটা পৃথিবীর বিরাট বিপদ এখন!”

অতঃপর সের্গেইকে বুঝিয়েই বলতে হল মাথায় আসা পরিকল্পনাটা।

“লাইকা-৫-এ কোনও অস্ত্র নেই। কিন্তু যেকোনও স্পেস স্টেশনের মতো এতেও আছে দু’টি এসকেপ পড। স্পেস স্টেশনের ওপর সেটিকে নির্ভরশীল রাখলে পাছে বিপন্ন মহাকাশযাত্রী সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন সেই আশঙ্কায় এমন ব্যবস্থা করা আছে যাতে সেটির গতিবিধির সঙ্গে লাইকা-৫-এর কোনও সম্পর্ক নেই। সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে শুধু তার ভেতরে বসা মহাকাশযাত্রী। খুব বেশি দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলেও একেবারে সেকেলে সলিড-স্টেট ফুয়েলচালিত পডটা অল্প দূরত্বের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে যেতে পারে। তার গতিপথে অল্পস্বল্প হেরফের করাও যায়। তবে সেসবই করতে হয় পডে বসে।

“যদি এসকেপ পডটা একটা মিসাইলের মতো করে ব্যবহার করা যায় যাতে লাইকা-৫ থেকে বেরিয়ে এসেই সেটি ছুটে যেতে পারে ওই স্পেসশিপটির দিকে তাহলে সেটা ওই স্পেসশিপে আছড়ে পড়বে। তাতে যদি স্পেসশিপটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পথ পাল্টে পালিয়ে যায়, ভালো কথা। যদি তা নাও হয়, তবুও বিস্ফোরণ নিরাপত্তাবাহিনির স্ক্যানারে ধরা পড়বেই এবং তৎক্ষণাৎ তারা লাইকার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে।”

“দারুণ আইডিয়া ক্যাপ্টেন। কিন্তু আপনি এটা চেপে যাচ্ছিলেন কেন?”

নূরের মুখে উচ্ছসিত প্রশ্নটা শুনে এত টেনশনের মধ্যেও সের্গেই-এর হাসি পেয়ে যায়। ক্লিষ্ট একটা হাসি হেসে কারণটাও ব্যাখ্যা করেন তিনি।

“যেহেতু এসকেপ পডের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা খুবই পুরনো ধাঁচের, তাই সেটিকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে চালিত করার জন্যে সেটিতে ঢুকে বসা মহাকাশযাত্রীকে শেষপর্যন্ত তাতে থাকতেই হবে। আগেভাগে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনও উপায়ই থাকবে না তার কাছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই পডটির আরোহীর কাছে এটি হবে একটি সুইসাইড মিশন।”

সের্গেই ব্যাপারটা নূরকে বুঝিয়ে বলতে বলতেই রওনা দিয়েছিলেন এসকেপ পড যেখানে রাখা থাকে সেই বে-র উদ্দেশ্যে। ক্যাপ্টেন হিসেবে পডটা যে তাঁকেই চালাতে হবে সে নিয়ে তাঁর মনে কোনও সন্দেহই ছিল না। কম মাধ্যাকর্ষণের একটা সুবিধে হল, শরীরের নিচের দিকটা পুরনো চোট আঘাতে জর্জরিত হলেও সেটা ওই পরিবেশে ততটা সমস্যা সৃষ্টি করে না। ইলেক্ট্রনিক ব্যবস্থা থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লাইকা-৫-এর নিজের অক্ষ বরাবর ঘুরপাক খাওয়াও থেমে গেছিল। ফলে স্টেশনে যে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ সাধারণত বজায় থাকে, সেটা লোপ পেয়েছিল। এই হঠাৎ পাওয়া সুবিধেটা কাজে লাগিয়ে প্রাণপণে ছুটছিলেন সের্গেই। কারণ, নিঃশব্দে একটা হাঙরের মতো করে এগিয়ে আসা স্পেসশিপটা যে খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবে দিগন্তরেখার কাছে এটা তিনি মনে মনে হিসেব করে বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু নূরের স্বভাবটা একমুহূর্তের জন্যে তিনি ভুলে গেছিলেন।

অর্ধেকের কম বয়সী একটা মেয়েকে, বিশেষত যে নিজেও ভারহীনতার সুবিধে নিয়ে প্রায় উড়ে চলেছে, তিনি কীভাবে হারাবেন? দৌড়ে সের্গেইকে পাশ কাটিয়ে পডের দরজায় পৌঁছে গেল নূর। আর তারপর কি-প্যাডের কাছে মুখ নিয়ে একটা সুর

গুনগুন করে গেয়ে উঠল। যতক্ষণে পডের কাছে পৌঁছলেন সের্গেই, ততক্ষণে তাতে ঢুকে আবারও ভয়েস-লক দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে নূর।

ক্রুদ্ধ, বিরক্ত এবং জীবনে প্রথমবার নিজের বয়স আর অশক্ত শরীরের জন্য অসহায় বোধ করা সের্গেই গর্জন করে নূরকে দরজা খুলতে বললেন। যতরকমভাবে মেয়েটাকে ভয় দেখানো সম্ভব তার চেষ্টা করলেন তিনি। কিন্তু পডের জানলা দিয়ে উনি দেখলেন, সিটে বসে বেল্ট বেঁধে নিয়েই নূরের দু’টো হাত মসৃণ দক্ষতায় একটার পর একটা লিভার টেনে আর ডায়াল ঘুরিয়ে পডটাকে বের করে নিল এয়ার-লক থেকে, উল্টোদিকের একটা খুলে যাওয়া পোর্ট দিয়ে। শেষবারের মতো নূর একবার তাকাল সের্গেই-এর দিকে।

golporiju03ওর চোখের দিকে তাকিয়ে সের্গেই-এর বুক কেঁপে উঠল। কাজল-কালো সেই চোখজোড়ায় ছিল অল্প একটু ভয়, একটু ভেজা ভাব, একটু দুঃখ, কিছুটা হাসি আর অনেকখানি ইস্পাত। পরমুহূর্তেই এয়ার-লকের দরজায় আছড়ে পড়ল পডের এগঝস্ট থেকে বেরিয়ে আসা আগুনের স্রোত। চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল সের্গেই-এর। তাই মৃত্যুবাহী স্পেসশিপটার বুকে একটা হার্পুনের মতো করে পডটার আছড়ে পড়া আর তার পরেই হওয়া বিস্ফোরণে পড আর স্পেসশিপটার ধ্বংস হওয়া, এগুলো দেখতে পাননি তিনি।

তিন সপ্তাহ পরের কথা।

নূর নিজের জীবন দিয়ে শুধু লাইকা এবং তাতে থাকা প্রতিটি মানুষের জীবনই বাঁচায়নি। সের্গেই-এর জবানবন্দি, লাইকা-৫-এ লেগে থাকা জ্যামার এবং ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে পাওয়া নমুনা, এইসবকিছু খতিয়ে দেখে দুই শিবিরের যৌথ দল এই ভয়ংকর পরিকল্পনার জন্যে যাদের দিকে সুনির্দিষ্টভাবে আঙুল তুলেছে তারা চুপ হয়ে যাওয়ায় দুই শিবিরের মধ্যে শান্তিচুক্তি সই হয়েছে একেবারে পাকাপোক্ত হয়ে। কিন্তু আর এক দফা যুদ্ধ এড়ানোর জন্যে এই ঘটনাটি গোপন রাখতে বাধ্য হয়েছে সবাই। দুই শিবিরের, সঙ্গে আরও কিছু দেশ থেকেও একঝাঁক মরণোত্তর সম্মান পেয়েছে নূর।

নূরের স্মরণসভায় এসে ওর মা আর বাবা চুপ করে বসেছিলেন। অনেক নামজাদা মানুষের ভিড়ে বসেছিলেন সের্গেইও। তাঁদের অবাধ্য মেয়ে যে সুর দিয়ে তার নিজের এবং আরও অজস্র মানুষের জীবনটা ভরে তুলেছিল সেটা নিয়ে অনেককিছু বলার থাকলেও তার অসমসাহসী শেষ কাজটা নিয়ে কিছু বলার এক্তিয়ার নেই বলে সের্গেই এগিয়ে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে পারছিলেন না। তবুও অনেকের অনেক কিছু বলা হয়ে যাওয়ার পর যখন তাঁকেও নূরকে নিয়ে কিছু বলতে বলা হল তখন সের্গেই একটা কাজ করলেন। মাইক নয় বরং নিজেকে একটু একটু করে টেনে মঞ্চের একপ্রান্তে রাখা পিয়ানোটার কাছে নিয়ে গেলেন সের্গেই।

নিস্তব্ধ অডিটোরিয়াম, শূন্যদৃষ্টি নিয়ে বসে থাকা নূরের বাবা-মা, নিজের চোখের সামনে জমে ওঠা অবাধ্য বাষ্প, এসব তুচ্ছ করে সের্গেই আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া আঙুল দিয়ে পিয়ানোর রিডে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলেন সেই সুরটা যেটা অবাধ্য মেয়েটা নিজের মনে গুনগুন করত লাইকা-৫-এর যত্রতত্র।

মি * * | মি * মি | মি ** | রে * *

মি * সল | ফা * * | ফা *  | সল * *

 ডো * * | রে * * | মি * * |

ডো * মি | রে *  | সি ডো | * * *

নিরাপদ পৃথিবীর বুকে যেদিকটায় রাত নেমেছে, তার শহরের পর শহর তখন সেজে উঠছে আলোর মালায়।

ছবিঃ ইন্দ্রশেখর

  জয়ঢাকের গল্প ঘর

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s