গল্প প্রশ্নোত্তর সিনথীয়া নাজনীন বর্ষা ২০১৯

সিন্থিয়া নাজনিন-এর আগের গল্পঃ  জাদু মামা ও ম্যাজিক পেন,  সুরভী বাইরেন

সিনথীয়া নাজনীন


পটাইয়ের বাবা ছিলেন কাঠের কারবারি। অকাল পিতৃবিয়োগের পর সব দায়িত্ব এসে পড়লো ছেলেমানুষ পটাইয়ের ঘাড়ে। ফলে বয়স মোটে একুশ হলেও ব্যাবসা সে আজ ভালোই বোঝে।
কয়েক দফা আলোচনার শেষে আনন্দপুর স্কুলের কাজের বরাতটা পেয়ে সে দারুণ খুশি! তাই রোজকার মতন সোজাসুজি গ্রামের পথ না ধরে, গোপালের মিষ্টির দোকান হয়ে তবে সে বাড়িমুখো হল। ঘরে ফিরে নিজের হাতে মিষ্টি খাইয়ে খবরটা যখন সে মাকে জানাবে, মা কী খুশিই না হবে! বন্ধু-বান্ধবদেরও ডেকে শিঙাড়া, মিষ্টি আর লাল দই খাওয়াবে সে। বন্ধু বলতে বলাই, ভোলা আর কাদের আলি। তারা আসবে শুনলে মাও তাদের রাতের খাবার না খাইয়ে ছাড়বে না। এসব ভেবে গুনগুনিয়ে সাইকেল চালিয়ে ফিরছে সে। দখিনা হাওয়ায় পরিবেশ বড় মনোরম। হাল্কা বাতাসে তার কাঁচা-পাকা চুল উড়ছে। মাঠের পাশে বটের ঝুরি ধরে ঝুলছে একদল ছেলে। পটাই পাশ দিয়ে যেতেই শুরু হলো তাদের আসল হল্লা, ‘পট পট পটাই বুড়ো, পট পট পটাশ!’ অন্যদিন হলে তেড়ে গিয়ে দিত নাহয় সে দুখান! কিন্তু, আজকের দিনটা যেন অন্যরকম! আজ মন বড়ই ফুরফুরে। তাই সে আর কিছুই বলল না।
আর ঠিক এখানেই পাংচার! কিন্তু, বাড়ি তো অনেকটা দূর। কাছাকাছি সারাইয়েরও দোকান নেই। সন্ধ্যে হয়ে এলো। হনহনিয়ে কুমোর পাড়ার দিকে পা বাড়ালো সে।
পাড়ার মুখে চৌধুরীদের মস্ত বাগান। সেই বাগান শেষে জোড়া তালগাছ। তারপর একটু এগিয়েই তার বাড়ি। কিন্তু পথ যত কমছে, কেমন যেন একটা থমথমে ভাব। হঠাৎ খেয়াল হলো, গাছের একটাও পাতা নড়ছে না! অথচ হাওয়ার বেগ ক্রমশ বাড়ছে। এ আবার কেমন! ব্যাপার তো ঠিক সুবিধের নয়!
পেছন থেকে একটা অদ্ভুত হাওয়া শোঁ শোঁ শব্দে এগিয়ে আসছে। অন্ধকার বেশ ঘন। তাল গাছগুলোর কাছে আসতে না আসতেই খটাং করে একটা ডাল খসে পড়লো! খানিকটা পিছিয়ে এলো পটাই। ঠিক তখনই পাশ থেকে একটা দমকা হাওয়া এসে দিল দারুন ধাক্কা! টাল সামলাতে না পেরে সাইকেল নিয়ে উল্টে গেল বেচারা!

বাড়ি ফিরে কোনদিকে তাকাল না সে। এক গাল হেসে হেঁসেলের দরজা ঠেলে সোজা ঢুকে পড়ল ভেতরে। ব্যাগ থেকে মিষ্টির প্যাকেট বার করে টপাটপ গিলতে লাগল। প্যাকেট প্রায় শেষ। পেছন থেকে মা বললো, ‘ও পটাই, কখন এলি?’ চোখ গোল্লা করে তাকালো সে। গালভরা হাসি হেসে বাঁজখাই গলায় বললো, ‘বঁলি ওঁ কুঁমুদ সঁরকারের বেঁটি, এঁক গ্লাঁস জঁল দাঁও দিঁকি।’ মা ছিটকে দু’ পা সরে এলো! এ কে গো? এ তো তার পটাই নয়! ঘাবড়ে ঢোঁক গিলে তিনি বললেন, ‘তো তো… তোকে ওরম দেখাচ্ছে যে! গলা অমন শো-না-আ-চ্ছে, গপাগপ গিলছিস কী করে!’ কোনও উত্তর দিল না পটাই। ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে হাসতে দই, শিঙাড়ায় মন দিলো সে।
পটাইয়ের মা পড়লেন মহা সংকটে। ছেলের এ কী হল?
পরদিন পটাই কাজে গেল না। বরং বাড়ির পোষা গাইয়ের দুধ দিয়ে ছানা তৈরি করে নানান মিষ্টি বানাল। সব বাসন মিষ্টিতে ভরে উঠল। কাউকে না দিয়ে একলাই খেয়ে নিল। তারপর দাওয়ায় শুয়ে জোরে জোরে নাক ডেকে ঘুম। ছেলের এমন অদ্ভুত রকম সকম দেখে আর থাকতে পারলেন না মা। জোর গলায় কাঁদতে শুরু করলেন। ‘ওরে, কে কোথায় আছিস? ছেলেটার কী হল রে!’
আশেপাশের দু চারজন এসে বলল, ‘পটাইকে মনে হয় ভুতে ধরেছে গো খুড়ি! ওকে মহিম ওঝার কাছে নিয়ে যাও।’ করিম চাচা বললেন, ‘শোনো পটাইয়ের মা, এসবে কান দিও না। একবার হাকেমবাবার কাছে দেখিয়ে আনো। তিনি যা বলেন শুনো।’

হাকেমবাবার বয়স প্রায় বাষট্টি। পরণে সাদা পোশাক। লম্বা দাড়ি। প্রসন্ন হাসি মুখ। ছাত্রজীবনে ইউনানি পাশ করে গ্রামের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা করে আসছেন বহুকাল। শুধু রোগে ধরলেই নয়, অন্যান্য সমস্যা নিয়েও অবুঝ মানুষজন ভরসা করে তার কাছেই ছুটে আসে। তিনিও যথাসাধ্য চেষ্টা করেন সমাধানের।
তার দাওয়াখানায় এসে দেখা গেলো, তিনি রুগি দেখার ঘরে শিকড় বেঁটে ওষুধ বানাচ্ছেন। দু একজন রুগিও বাইরে বসে।
পটাইয়ের মাকে তিনি বললেন, ‘ছেলেটাকে আগে পরীক্ষা করে দেখি। ও এ ঘরেই থাক। তোমরা যে কয়জন এসেছো, দাওয়ায় গিয়ে বোসো।’
পটাইয়ের কপালে হাত দিয়ে দেখলেন, তাপ মারাত্মক। চোখটাও ঘোলাটে। কিন্তু নাড়ির গতি কম। বুঝলেন, ভূতেই ধরেছে বটে!
একজনকে বলে পাশের ঘর থেকে ছড়িটা আনিয়ে নিলেন।
তারপর পটাইয়ের বাঁ কানটা মুলে ডান গালে ঠাস করে এক চড় দিলেন। সেইসঙ্গে দুই হাতের তালুতে পটাপট ছড়ির বাড়ি। তারপর বললেন, ‘মোবাইলে ভিডিও করে মহিম ওঝাকে পাঠিয়ে দেব। সে কিন্তু ভূত সমাজে জানিয়ে দেবে এই বোকা ভূতটা কীভাবে কানমলা খায়!’
কানমলা ও ছড়ির বাড়ি খেয়ে বয়স্ক ভূতের তো অত্যন্ত আত্মসম্মানে লাগল।
সে বললো, ‘এঁ কেঁমন ব্যঁবহার হঁলো হাঁকেম? ভূঁত বঁলে অঁপমান কঁচ্চ। নঁব্বই বঁচ্চর বেঁচেচিলুম, বঁয়সকালে কেঁউ কোঁনদিন আঁমার সাঁথে তো এঁমন ব্যঁবহার কঁরেনি। কঁত্তজনের কঁত্ত কাঁজে এঁসেচি! আঁর, তোঁমার বাঁপ দাঁদার সাঁথেও কঁম জাঁনাশুনো ছিঁল না! তাঁছাড়া এঁসব কঁথা ছঁড়িয়ে গেঁলে, আঁমার সঁমাজে মুঁখ দেঁখানোর উঁপায় হঁবে না! বঁড়ই ভূঁত হাঁসানো হয়ে যাঁবে! এঁ তোঁমার কেঁমন বিঁচার হাঁকেম?’
হাকেমবাবা ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘তা তুমিও কেমন পরোপকারী ভূত তার তো একটা পরীক্ষা নিতে হয়। তোমায় তিনটে সমস্যা দেব। যদি সমাধান দিতে পার, ভালো কথা। আর না পারলে, ভরতপুরের বাস স্ট্যান্ডের পাশের বটগাছটায় বোতলে করে ঝুলিয়ে রাখবো। সকাল থেকে ঘন ঘন গাড়ির হর্নের আওয়াজে কয়েকদিনেই তুমি ভূত সমাজ থেকে অক্কা পেয়ে কিম্ভূতে পরিণত হবে।’

বাইরে অপেক্ষমান রুগিদের মধ্যে রয়েছে কানু মাঝি ও তার ছেলে। ভূতের পরীক্ষা নিতে হাকেমবাবা বললেন, ‘বল তো দেখি, কানু আজ এখানে এসেছে কেন?’
খানিকক্ষণ চুপ রইলো ভূত। একটু পর বললো, ‘ওঁর ছেঁলেটা অঁসুস্থ। কিঁন্তু এঁ সাঁরানো তো কোঁনো ওঁষুধের কঁম্ম নঁয়। এঁর উঁপায় অঁন্য।’
হাকেম হেসে বললেন, ‘এ কেমন কথা! তাহলে, উপায়টা বল শুনি।’
‘দঁস্যি ছেঁলে। এঁকটি ব্যাঁঙকে বঁন্দী রেঁকেচে। তাঁকে বঁড়ই অঁত্যাচার কঁরে। রোঁজই তাঁর পাঁগুলো ধঁরে টাঁনে। সেঁও দিঁয়েছে অঁভিশাপ হেঁনে। ফঁলে ওঁই ছেঁলের হাঁত পাঁও থেঁকে থেঁকে লাঁল হঁয়ে যাঁচ্চে। সাঁথে জ্বঁর। ব্যাঁঙটাকে পুঁকুরে ছেঁড়ে দিঁলেই সঁমস্যা কেঁটে যাঁবে।’
রোগের এমন ব্যাখ্যা শুনে হাকেমবাবাও থ’ হয়ে গেলেন। কিন্তু, ভূতের কথা তিনি অমান্য করলেন না। বাইরে দাওয়ায় কানুর ছেলের কাছে গিয়ে গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই কি কোনো ব্যাঙ ধরেছিস খোকা?’
ছেলেটিও ক্ষীণ কণ্ঠে সব স্বীকার করে নিলো।
কানুকে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে, পাশের ঘরে দুপুরের নামাজে গেলেন বাবা।
ফিরে এসে কানু জানালো, ‘ব্যাঙটাকে পেয়েছি। পাশের পাঁতিপুকুরে ছেড়ে দিয়েছি।’
ছেলেটিকে পরীক্ষা করে হাকেমবাবাও দেখলেন, জ্বর আর নেই! হাত পায়ের লাল ভাবও সেরে গেছে।
ভূতকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানালেন তিনি।


রোগীর ঘরে পরেরজন এল, যদু গোয়ালা। সে একটু ইতস্তত করে বললো, ‘আজ্ঞে রোগটা ঠিক আমার নয়। আমাদের পুরোনো গাই খুশির। দুদিন হলো সে আর দুধ দেয় না। হাম্বাও ডাকে না। খাওয়া দাওয়াও ছেড়ে দিয়েছে। তা খুশিকে কি সারিয়ে তোলা যায় না বাবা?’
হাকেমবাবা বললেন, ‘একটু ভেবে নিই। তুই ততক্ষণ দাওয়ায় গিয়ে বোস।’
পটাইয়ের দিকে ফিরে ভূতকে বললেন, ‘কী বুঝলে হে?’
ভূত চুপ করে থাকায় হাকেম হেসে বললেন, ‘প্রশ্নটা কঠিন নাকি?’
ভূত বললো, ‘মঁন দিঁয়ে বিঁষয় বুঁঝে নিঁতে কিঁছুটা সঁময় লাঁগে হাঁকেম! তাঁ খুঁশির চোঁখের সাঁমনেই যেঁ নঁতুন গাঁইয়ের খুঁব সেঁবাযত্ন হঁচ্চে। দুঃখেই খুঁশি খাঁওয়া ছেঁড়ে দিয়েছে।’
হাকেমবাবা বললেন, ‘তাহলে উপায়?’
ভূত বললো, ‘খুঁশির কাঁছে ক্ষঁমা চাঁইতে হঁবে। তাঁকে আঁলাদা রেঁখে যঁত্ন কঁরতে হঁবে। তাঁহলেই সঁব ঠিঁক হঁয়ে যাঁবে!’
হাকেমবাবা বললেন, ‘বেশ!’
হাকেমবাবার কথা মতন বাড়ির পথে দৌড় দিলো যদু গোয়ালা। বাবাও কিছুক্ষণের জন্য মধ্যাহ্ন বিরতিতে গেলেন।
ফিরে এসে যদু জানালো, ‘খুশিকে আলাদা গোয়ালে রেখেছি। তার মাথায় হাত বুলিয়ে ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছি। সেও খুশি হয়ে হাম্বা ডাকছে! গিন্নি এখন বালতি হাতে দুধ দুইছেন!’
খুব খুশি হয়ে, হাকেমবাবাকে মন ভরে প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিলো যদু।


কয়েক পাতা লেখা ভূতকে দেখিয়ে হাকেমবাবা বললেন, ‘বল তো, এগুলো আমার কাছে কী করে এল?’
‘কাঁলকেইতো অঁসুস্থ সঁত্যানন্দকে দেঁখে এঁলে। ওঁষুধও দিঁয়ে এঁলে। লেঁখা নষ্ট হঁওয়ায় মঁন খাঁরাপ। তাঁই সেঁইতো তোঁমাকে এঁগুলো দিঁল যঁদি কোঁনও উঁপায় হঁয়। কিঁ, ঠিঁক বঁললাম তো হাঁকেম?’
হাকেমবাবা হেসে বললেন, ‘তা ঠিক। কিন্তু, লেখাগুলো তো কিছুই পড়া যায় না। এমন অবস্থা কী করে হলো বল তো?‘
‘সেঁ তো জ্যোঁতিষ নিঁয়ে লেঁখালেখি কঁরে। কিঁন্তু, বঁয়স্ক মাঁনুষ আঁজও কাঁলির কঁলমেই লেঁখে। এঁর ফঁল সেঁ হাঁড়ে হাঁড়ে টেঁর পেঁয়েচে। লিঁখতে লিঁখতে যেঁই না সেঁ পাঁশের ঘঁরে গেঁলো, জাঁনলা দিঁয়ে ক্রিঁকেটের বঁল উঁড়ে এঁলো, উঁল্টে গেঁলো খোঁলা কাঁলির দোঁয়াত। কাঁলি পঁড়ে নঁষ্ট হঁলো লেঁখা।’
হাকেমবাবা বললেন, ‘সবই তো জানো দেখছি। কিন্তু, এই সমস্যার কী সুরাহা হয়?’
‘কাঁলিতে নঁষ্ট লেঁখা তো, এঁ আঁমি নঁতুন কঁরে লিঁখে দিঁতে পাঁরি হাঁকেম! এঁকটু লেঁখাপড়া জাঁনি বটে!’
আশাবাদী হয়ে হাকেম একটি কলম ও কিছু কাগজ এগিয়ে দিল।
কালিতে নষ্ট পাতা ক’খানায় ভালো করে চোখ বোলাল ভূত। তারপর নষ্ট হওয়া সব লেখা পড়ে, নতুন কাগজে সরসর করে লিখে দিলো।
কাছেই সত্যানন্দের বাড়ি। বিশ্বস্ত একজনের হাত দিয়ে ভূতের লেখা কাগজগুলো সত্যানন্দের কাছে পাঠিয়ে দিলেন বাবা। সেই লেখা হাতে পেয়ে সত্যানন্দ তো দারুণ উৎফুল্ল।
সামনেই বসে ছিলেন তার বন্ধু, থানার দারোগা কার্ত্তিক সামন্ত। তিনিও বললেন, ‘এ তো ভারি আশ্চর্যের ব্যাপার।
সত্যানন্দ বললেন, ‘কীভাবে সম্ভব হল, চলো গিয়ে জেনে আসি।’


বড় মিষ্টির প্যাকেট হাতে, দারোগাকে সাথে নিয়ে হাজির হলেন সত্যানন্দ।
সত্যানন্দ বললেন, ‘আপনি তো দারুন ম্যাজিক করেছেন মশাই! এ কী করে সম্ভব হল?’
দুজনকে বসিয়ে বিশদে সবটাই বোঝালেন হাকেম।
দারোগা বললেন, ‘ভূত যে মানুষের এত উপকার করে, কখনও শুনিনি!’
সত্যানন্দ মিষ্টির বাক্সটা এগিয়ে ভূতকে বললেন, ‘তোমাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব! নাও, মিষ্টিমুখ কর।’
ভূত বললো, ‘তাঁ দেঁন। কিঁন্তু এঁ মিঁষ্টি তেঁমন রোঁচে না! খেঁতেন যঁদি আঁমার হাঁতের মিঁষ্টি, বুঁঝতেন! আঁমার নাঁম গোঁলু মঁয়রা। এঁ তল্লাটের সেঁরা মিঁষ্টি এঁকদিন আঁমিই বেঁচতুম। এঁখনকার ছেঁলে ছোঁকরা দোঁকানদাররা আঁর তেঁমন মিঁষ্টি বাঁনায় কঁই!’
এই শুনে হাকেম হেসে বললেন, ‘এই জন্য তুমি পটাইয়ের বাড়ি গিয়ে অত মিষ্টি বানাচ্ছিলে। আর একলাই সব খেয়েছ!’
তাহলেও পরোপকারী ভূত বলে কথা! দারোগাও জানালেন, ‘আমার একটি নিয়ম আছে। এই গ্রামের কেউ যখন খুব ভালো কোনও কাজ করে, তখন আমি তাকে বিশেষ পুরস্কারে পুরস্কৃত করি। ভূত হলেও এ পুরস্কার তোমারই প্রাপ্য।’
খুশি হয়ে পকেট থেকে দু হাজার টাকা বের করে ভূতকে এগিয়ে দিলেন দারোগা।
লজ্জায় জিভ কেটে ভূত বললো, ‘ভূঁত হঁয়ে কিঁ আঁর পুঁরস্কার নিঁতে পাঁরি? পুঁরস্কার বঁরং পঁটাই নিঁক। শুধু কাঁনমলার কঁথাটা তোঁমরা দঁয়া করে ভূঁতেদের জাঁনিও না।’
হাকেম বললেন, ‘ কিন্তু, তুমি এতো ভালো হয়েও শুধু শুধু পটাইকে ধরে কষ্ট দিলে কেন?’
‘ছিঁলাম মোঁড়ের মাঁথার নিঁম গাঁছটায়। পঁটাইয়ের দঁলবল নিঁম গাঁছটা কেঁটে চাঁলান কঁরে দিঁলো ভঁরতপুরের কাঁঠগোলায়।’
হাকেমবাবা বললেন, ‘তারপর?’
‘গাঁছহারা আঁমি কীঁ আঁর করি! মঁনের দুঁক্কে তাঁল গাঁছে প্রঁতিবেশী ভূঁতভাঁইয়ের কাঁছে ঠাঁই নিঁলাম। শুঁনলাম পঁটাই এঁ রকম অঁনেক গাঁছ কেঁটেচে। ভূঁতেরা তঁবে যাঁবে কোঁথায়? তাঁই ভাঁবলাম ওঁকে এঁকটু শিঁক্ষে দিঁই। তাঁ তোঁমরা কঁথা দাঁও ওঁ আঁর এঁমন কঁরবে না। আঁমিও ওঁকে ছেঁড়ে চঁলে যাঁবো।’
ভূত পটাইকে ছেড়ে তার পাশে এসে বসল। তবে লম্বা হাত দিয়ে পটাইয়ের ঘাড়খানা শক্ত করে ধরে রাখল, যেন সে পালাতে না পারে।
হাকেমবাবা বললেন, ‘বাবা পটাই, নিমগাছটা কেটে ভারি অন্যায় করেছিস। ভূতের কাছে ক্ষমা চেয়েনে। আর ওখানে একটা নিমের চারা পুঁতে দিয়ে আসবি।
ভূতের হাতে তখনো বাঁধা থাকায় ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বহু কষ্টে পটাই বললো, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি কাঠের ব্যবসায় আর না! বরং, স্টিলের আসবাব বেচব। গাছ আমাদের সকলেরই কত্ত কাজে লাগে।’
‘তোঁকে আঁমি আঁশীর্বাদ দিঁলুম পঁটাই। তুঁই এঁকটা মিষ্টির দোঁকান দেঁ! দেঁখেও আঁমার আঁত্মাটা শাঁন্তি পাঁবে। ভাঁলো থাঁকিস!’ এই বলে পটাইকে সম্পূর্ণ ছেড়ে, হুঁশ করে উড়ে গিয়ে ভূঁত কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। ধুপ করে মাথা ঘুরে পড়ে গেল পটাই। চোখে মুখে জলের ছিটে দিতেই সে স্বাভাবিক হয়ে বসল।
কিন্তু দারোগাবাবু সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘গাছগুলো কেটে পটাই খুবই অন্যায় করেছে। তাই পুরস্কার তার নয়।’ এই বলে পুরস্কারের টাকা তিনি হাকেমবাবাকেই এগিয়ে দিলেন।
হাকেমবাবা বললেন, ‘পটাই, এই টাকায় আমি তোকে কিছু চারা কিনে দেব। তুই সেই চারাগুলো লাগিয়ে দিবি।’
দারোগা, সত্যানন্দ ও হাকেমবাবা, তিনজনেই পটাইকে ভালো করে বোঝালেন ও রকমভাবে গাছপালা সে যেন আর না কাটে।‘
পটাইও কাঁচু মাচু হয়ে বললো, ‘আজ্ঞে, এমন কাজ আর করব না। এসব কথা কাউকে জানাবেন না। আমাকে ভূতে ধরেছিলো জানলে ছেলেরা বড়ই তামাশা করবে!’
তিনজনেই কথা দিলেন, ভূতে ধরার কথা ঘুণাক্ষরেও কেউ জানবে না।
হাকেমবাবা পটাইকে সাথে করে বাইরে নিয়ে এলেন। পটাইয়ের মাকে বললেন, ‘ছেলে সুস্থ হয়ে গেছে। ওকে বাড়ি নিয়ে যাও।’
পটাই ভালো হয়ে গেছে দেখে আনন্দে কেঁদেই ফেললেন পটাইয়ের মা। বারবার ছেলের মাথায় হাত বুলোতে থাকলেন তিনি। এদিকে পটাই কেমন আছে জানতে, তার তিনজন বন্ধুও এসে জুটেছে। তাদের দেখে একটু হেসে পটাই বললো, ‘কাল আমার বাড়ি আয়। তোদের নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াব।’
তারপর বন্ধুদের কাঁধে হাত রেখে, মাকে সাথে নিয়ে ধীরেসুস্থে সে তার বাড়ির পথে পা বাড়াল।

উপসংহারঃ

পটাই এখন ভালো হয়ে গেছে। সে আর দলবল নিয়ে অন্যায়ভাবে গাছ কেটে বেড়ায় না। ভরতপুরের বাজারে তার এখন দু-দুটো দোকান। একটা স্টিলের ব্যবসার। অন্যটি গোলুর মিষ্টির দোকান। দুই ব্যবসাই চলছে রমরমিয়ে। সোম থেকে শনি সে ব্যবসা সামলায়। আর রবিবার ছোটো ছেলেমেয়েদের সাথে নিয়ে গাছের চারা পোঁতে নানান জায়গায়। সেগুলোর খেয়াল রাখে ও যত্নও করে। মন ভরে সে ভালোবাসে গাছগুলোকে। স্বপ্ন তার একটাই, যেন সবুজে ভরে ওঠে দেশ।
পটাইয়ের কাজ দেখে হাকেমবাবা দারুণ গর্বিত। গর্বিত সত্যানন্দ ও দারোগাও। দারোগা বলেছেন, গ্রামের পরিবেশ রক্ষার জন্য এত ভালো কাজ করায় পটাইয়ের জন্য বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছেন।
….আর পটাইয়ের পোঁতা চারাগুলো? সেগুলোও দেখতে দেখতে একদিন বড় গাছে পরিণত হয়। সেই নিমের চারাও এখন এক মস্ত গাছ। মাঝে মাঝেই পটাই যখন সেই নিম গাছটার কাছে যায়, কেন জানিনা মনে হয় সবকিছুই খুব শান্ত। কেমন যেন শুনশান।… কে জানে? ভূতদাদু কি ফিরে এসেছে?

ছবিঃ স্বীকৃতি 

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে

2 Responses to গল্প প্রশ্নোত্তর সিনথীয়া নাজনীন বর্ষা ২০১৯

  1. কিশোর ঘোষাল says:

    এমন উপকারী ভূত সব্বার মাথায় চাপুক। খুব সুন্দর লেখা সিন্থিয়া। দারুণ মজা পেলাম।

    Like

  2. সৈয়দ সঞ্জনা ফারহীন says:

    Khub sundor lekha….asadharon……

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s