গল্প ফ্ল্যাট নম্বর ২০১ সত্যজিৎ দাশগুপ্ত বর্ষা ২০১৭

সত্যজিত দাশগুপ্তর আগের গল্প মোতিবিবি

সন্ধে থেকে অনিদা এখনও পর্যন্ত চা খেয়েছে দু’কাপ। আর আমাকে দাবায় হারিয়েছে চারবার। পঞ্চম বোর্ড শুরু করেছি মিনিট তিনেক হয়েছে। এইমাত্র বিজুদা তিন নম্বর কাপটা দিয়ে গেল। আমি অবশ্য দু’কাপেই থেমে রইলাম। কারণ, একটু পরেই ইলিশমাছ আর খিচুড়ি খাব। বিজুদা চায়ের সাথে ‘টা’ হিসেবে মুগডাল ভাজা দিয়ে গেছিল। কালই অনিদার বাবা কিনে এনেছে। আমি তাতে ভাগ বসাতে এতটুকু লজ্জা করলাম না।

“এত খাস না। না হলে ইলিশমাছের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়েই থাকতে হবে। মুখে আর দিতে…”

অনিদার কথাটা হল না। কারণ, তার আগেই কলিংবেলটা বেজে উঠেছে। সাথে সাথে মুগডাল চিবোনো বন্ধ করে অনিদা হাতঘড়ির দিকে তাকাল। যার মানে হল, এই অসময়ে আবার কে?

প্রশ্নটা যদিও অবান্তর নয়। রাত এখন মাত্র ন’টা। বৃষ্টি যেন কলকাতাকে ভাসিয়ে দিতে নেমেছে! যারা বৃষ্টি নেই, বৃষ্টি নেই বলে হা পিত্যেশ করে বেড়াচ্ছিল তারাই বৃষ্টি থামছে না বলে ছটপট করছে। যেমন বিজুদা। সেই থেকে খালি জানালার পর্দা সরিয়ে সরিয়ে দেখছে আর বলছে, “কইলকাতায় এইবার নিশ্চিত বন্যা!”

সন্ধে থেকে আমি অনিদার ফ্ল্যাটে। তাই মায়ের কোনও চিন্তা নেই। অনিদাদের পাশের ফ্ল্যাটটা আমাদের। জানি দরকার হলেই মা আমাকে টুক করে ডেকে নেবে। অবশ্য মায়ের এই কুছ পরোয়া নেহি গোছের আচরণের কারণ আমি জানি। সেই কখন থেকেই অনিদার মা আড্ডা জুড়েছে আমার মায়ের সাথে। ওদের আড্ডাটা যদিও বসেছে আমাদের ফ্ল্যাটে। আসলে ছেলেবেলার বান্ধবী বলে কথা। অনেকে তো ভাবে আমি আর অনিদা মাসতুতো ভাই। কেউ কেউ আবার আমাকে অনিদার নিজের ভাই বলেও জানে। একবার তো একজন আমার নাম রণজয় বোস শুনে বলেছিলেন, “অনিরুদ্ধ সেন আপনার দাদা? কিন্তু সেন আর বোস, আলাদা টাইটেল কেন?”

অসময়ে দরজার বেলটা আমাদের খেলায় ব্যাঘাত ঘটালেও বিজুদা আমাদের উঠে গিয়ে দরজা খুলে কষ্ট করার হাত থেকে রেহাই দিল। আর সাথে সাথে হুড়মুড়িয়ে ফ্ল্যাটে এসে ঢুকল পার্থদা। ওর অবস্থা দেখে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল অনিদা। সাথে আমিও।

“কী হল রে? এনি প্রবলেম?”

পার্থদা তখন বেদম হাঁপাচ্ছে। চোখদুটো কোনও কারণে যেন কোটর ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। একে তো হাড় গিলগিলে চেহারা, তার ওপর একেবারে ভিজে চুপসে গেছে। ঠক ঠক করে কাঁপছিল বেচারা। ঘরে ঢোকার সময় দেখেছি ছাতাটা বাইরের দরজার গোড়ায় রেখে ঢুকতে। তবে এই বৃষ্টি কি ছাতায় মানে? রাস্তায় বেরোতে গেলে ভিজতেই হবে। গাব্বার পিচে বল বাউন্স করবেই। সেখানে টিকতে গেলে গায়ে বল খেতে হবে বইকি।

“আয়, ভেতরে আয়।” অনিদা পার্থদাকে ভেতরে নিয়ে এসে বিজুদাকে জল আনতে বলে দিল। নিজেকে সামলাতে প্রায় দশ মিনিট নিল পার্থদা। ও যখন জলের গ্লাসে শেষ চুমুক মারছে, তখন অনিদা ওর দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ে খুব মোলায়েম গলায় জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে রে?”

কোনওরকমে দুটো ঢোঁক গিলে পার্থদা বলল, “খুন, অনিদা খুন!”

খুন! কথাটা শুনেই সোজা হয়ে দাঁড়াল অনিদা। কে খুন হল? কে করল? হঠাৎ করে খুনের কথা শুনে আমারও বুক ঢিপ ঢিপ শুরু করল।

পার্থদা তখন জানাল, যমুনা অ্যাপার্টমেন্টের ২০১ নম্বর ফ্ল্যাটে খুন হয়েছেন অজয় বর্মণ। কে খুন করেছে ও সেটা জানে না।

“অজয় বর্মণ? সেই ডাক্তার ভদ্রলোক?” জিজ্ঞাসা করল অনিদা।

“হ্যাঁ।” মাথা নাড়ল পার্থদা।

এই ডাক্তার ভদ্রলোককে আমি চিনি। একবার জ্বর হওয়াতে ওঁর কাছে গেছিলাম। বয়স পঞ্চান্ন থেকে ষাট। মাঝারি উচ্চতায় রোগা ছিপছিপে গড়ন, লম্বাটে মুখে সরু সুতোর মতো গোঁফ। আর গায়ের রং শ্যামলা। এর বেশি আর ওঁর বর্ণনা দেবার মতো কিছু নেই। উনি যে ফ্ল্যাটে থাকেন, পার্থদা সেই বিল্ডিংয়েরই টপ ফ্লোরে থাকে। ও অনিদাকে কিন্তু ফোন করেই ডাকতে পারত। কেন নিজে এল, সেকথা অনিদা ওকে জিজ্ঞাসা করাতে ও জানাল, কোনও কারণে ফোনে পাচ্ছিল না। হতে পারে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে কানেকশান প্রবলেম হচ্ছিল।

অনিদার জিজ্ঞাসা, “কখন খুন হলেন ভদ্রলোক?”

তাতে মাথা নেড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে পার্থদা বলল, “এই তো কিছুক্ষণ আগে। সন্ধে থেকেই আমার মাথাটা ব্যাথা করছিল। খুব গা গোলাচ্ছিল। জ্বর জ্বর লাগছিল। তাই ভাবলাম, ডাক্তারকাকুর থেকে একটা ওষুধ নিয়ে আসি। কিন্তু ওঁর ফ্ল্যাটে ঢুকতেই দেখি…”

“কী দেখলি ঢুকে?”

“দেখি যে ডাক্তারকাকু ওঁর ঘরের মেঝেতে চিত হয়ে পড়ে আছেন! দেখেই মনে হল দেহে প্রাণ নেই।”

কথাটা শুনেই কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ল অনিদার। তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে এবার বলল, “ঘরে তখন আর কেউ ছিল না?”

“হ্যাঁ, ছিল।” একবার নাক টেনে নিয়ে পার্থদা বলল, “চারজন ওঁর লাশটাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল।”

“চারজন?” শুনে মাথাটাকে পার্থদার দিকে সামান্য এগিয়ে দিয়ে প্রশ্নটাকে আরেকটু জোরালো করতে বলল, “কে কে?”

“ওঁর বাড়ির কাজের লোক অভয়দা, ওঁর কম্পাউন্ডার সুখেনদা, ওঁর এক ছাত্র আর ওঁর পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোক।”

“হুম।” কয়েক মুহূর্ত কী যেন চিন্তা করল অনিদা। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে আলতো করে চোখ জোড়া বুজে ঝট করে মাথাটা ডানদিকে হেলিয়ে বুঝিয়ে দিল আমাকে কী করতে হবে। সাথে সাথে আমি সবকিছু গুছিয়ে নিলাম। অনিদা এর মধ্যে রেনকোটটা গায়ে চাপিয়ে নিয়েছে। জানি এখন আমাদের গন্তব্যস্থল যমুনা অ্যাপার্টমেন্ট। তাই একমুহূর্ত অপেক্ষা না করে আমিও রেনকোটটা গায়ে গলিয়ে নিলাম।

বৃষ্টির জোর এতটুকু কমেনি। আকাশ একেবারে ভেঙে পড়তে চাইছে। বাইরে একটাও লোক নেই। রাস্তার লাইটগুলো জ্বললেও বৃষ্টির দাপটে দশ হাত দূরের জিনিসও আবছা দেখাচ্ছে। কানে শুধু ঝম ঝম শব্দ আসছে। মাঝে মাঝে গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ। রাস্তায় বেরিয়ে চারপাশটা দেখে ভয় করতে শুরু করল। কল কল, ছপ ছপ করে আরেকটা যে শব্দ কানে আসছিল ওটা পাশের আদি গঙ্গাটার। ভয় হল সেটা না এবার রাস্তায় উঠে আসে!

আমরা আমাদের হরিশ চ্যাটার্জী স্ট্রীটের মেঘমালা অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে সামনের গলিটা ধরলাম। গলিটার শেষেই হরিশ মুখার্জী রোড। সেখানেই যমুনা অ্যাপার্টমেন্ট।

রাস্তার ধারেই একটা বস্তির পাশে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যমুনা অ্যাপার্টমেন্ট। এই বৃষ্টির মধ্যেও বাইরে লোকজন জমে গেছে। একটা পুলিশের ভ্যানও চোখে পড়ল। আমরা বিল্ডিংয়ের মেন গেট পেরিয়ে দু’পা এগিয়েছি, এমন সময় আমাদের পথ আটকে দাঁড়ালেন একজন হাবিলদার। অনিদা তখন ওঁকে বলল, “দেবাশিষ হালদার এসেছেন তো?”

অনিদার মুখে নিজের ওপরওয়ালার নাম শুনে মনে হয় একটু হড়কালেন হাবিলদার ভদ্রলোক। তবুও ওঁর কপালে প্রশ্নের চিহ্ন দেখে অনিদা নীচ থেকেই ফোন করলেন দেবাশিষ হালদারকে। আসলে দেবাশিষ হালদার হলেন লোকাল থানার ওসি। অনিদার খুবই পরিচিত।

অনিদার ফোন আমাদের রাস্তা সাফ করে দিল। সোজা উঠে গেলাম দোতলায়। ডঃ বর্মণের দরজার সামনেও তখন লোকজনের ভিড়। বেশিরভাগ এই বিল্ডিংয়েরই। ভয়, কৌতূহল, উৎসাহ – একেকজনের মুখের ভাব একেকরকম। সবাই নিজেদের মধ্যে গুজগুজ ফিসফাস করে চলেছে।

অনিদার পরিচয় সবার জানা। তাই ওকে দেখেই সবাই রাস্তা ছেড়ে দিল। ফ্ল্যাটের বাইরের লম্বা ঘরটা ডঃ বর্মণ চেম্বার হিসেবে ব্যবহার করতেন। টেবিল, চেয়ার, ট্রলি সবই সাজানো রয়েছে ঘরটাতে। সামনে একটা কার্ডবোর্ড ফ্ল্যাটের অন্দরমহলকে বারমহলের থেকে আলাদা করেছে। টেবিলের ঠিক সামনেটাতে চিত হয়ে পরে আছেন ডঃ বর্মণ। মাথার নীচে চাপ চাপ রক্ত। চোখদুটো খোলা কিন্তু একেবারে স্বাভাবিক। ঘরে ঢুকে অনিদা প্রথমেই মৃতদেহটা পরীক্ষা করতে শুরু করল। মাথার পেছনদিকটা বেশ খুঁটিয়ে দেখে বলল, “কোন ভারী জিনিস দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।”

পুলিশ অফিসার হলেও মিঃ হালদার একেবারে গোবেচারা মানুষ। অনিদা এই তদন্তে জড়িয়ে পড়াতে উনি যেন বেশ খুশিই হয়েছেন। অনিদা ঘরে ঢুকতে মনে হয়েছিল, ওর হেল্পটা যেন ভদ্রলোকের ভীষণ দরকার। এবার অনিদার কথা শুনে প্রায় নেচে উঠে বললেন, “যাক, খুনটা কী করে হয়েছে সেটা তো জানা গেল। কিন্তু অস্ত্রটা কোথায় সেটা এবার জানতে হবে।”

অনিদা তখনও মৃতদেহ পরীক্ষা করে চলেছে। মিঃ হালদারের কথা শুনে বলল, “সে তো হবেই।” তারপর ডঃ বর্মণের কপালের ডানদিকটা দেখিয়ে বলল, “কিন্তু তার আগে এটা দেখুন।”

অনিদার কথা শুনে মিঃ হালদারের মতো আমিও সাথে সাথে মৃতদেহের ওপর ঝুঁকে পড়লাম।

“আঘাতের চিহ্ন মনে হচ্ছে?” বললেন মিঃ হালদার।

“কোথাও গুঁতো খেয়েছেন ভদ্রলোক।” বলল অনিদা।

আবিষ্কার করলাম, কপালের একটা ছোট্ট অংশ থেঁতলে ভেতর ঢুকে গেছে। জায়গাটা থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ে শুকিয়ে গেছে। অনিদা ততক্ষণে চেম্বারের প্রত্যেকটা অংশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করেছে। হাতে ওর আতস কাচ। আসলে ম্যাগনিফাইং গ্লাস থেকে শুরু করে পেন ক্যামেরা, ডিজিটাল ক্যামেরা, পেন ড্রাইভ সবই নিয়ে এসেছিলাম আমরা। অবশ্য সব কেসেই নিয়ে যাই। পরীক্ষা করতে করতে অনিদা এবার টেবিলের সামনের একটা কোণে এসে থেমে গেল। আতস কাচটা সেটার একেবারে সামনে নিয়ে গিয়ে বলল, “এটা কী?”

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কীসের কথা বলছ?”

তাতে ও বলল, “রক্তের দাগ বলে মনে হচ্ছে। একেবারে তাজা।”  

আতস কাচের মধ্য দিয়ে দেখে বুঝলাম, অনিদার সন্দেহ ঠিক। মাথাটা দু’বার সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে বুঝিয়ে দিলেন মিঃ হালদারও অনিদার সাথে একমত।

এখানে রক্ত এল কী করে? প্রশ্নটা করতে গিয়ে দেখি অনিদার ডান গাল বেয়ে একটা হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। আমি এবার জিজ্ঞাসুর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাতে ও হাসিটা দু’গালে আরেকটু ছড়িয়ে দিয়ে বলল, “মনে হচ্ছে ব্যাপারটা একটু আধটু ধরতে পারছি। লক্ষ করলাম, অনিদার কথাটা শুনে সুখেনদার গলার কাছটা কোনও একটা কারণে একবার ওঠানামা করল।

তাতে মিঃ হালদার জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ধরতে পারলে?”

অনিদা তখন কোনও একটা জিনিস দিয়ে আঘাত করার ভঙ্গী করে বলল, “মনে হয় ওঁকে কেউ একটা ভারী জিনিস দিয়ে মাথার পেছনদিকে আঘাত করে। সাথে সাথে উনি হুমড়ি খেয়ে পড়েন টেবিলের ওপর। মাথায় আঘাত লাগে ওঁর। তখুনি উনি লুটিয়ে পড়েন মাটিতে।” এবার চোখজোড়া সরু করে বলল, “হয়তো সাথে সাথে প্রাণ হারান ডাক্তারবাবু।”

এর মধ্যে অনিদার কথার মাঝে ডঃ বর্মণের ছাত্র আর কাজের লোক অভয়দা যে একবার করে চোখাচোখি করে নিল সেটা আমার নজর এড়াল না। জিনিসটা যে অনিদাও নজর করেছিল তা ও আমাকে পরে বলেছিল। ব্যাপারটা কিন্তু আমাকে যথেষ্ট ভাবালো বটে। অনিদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আর কিছু বুঝতে পারলে?”

ভদ্রলোকের চোখ দেখে তো মনে হয় না উনি মারা যাবার আগে এতটুকু ভয় পেয়েছিলেন বা চমকেছিলেন।

অনিদার কথার মানে আমি জানি। তাই বললাম, “চেনাশোনা লোকই কি তাহলে এই কাজটা করেছে?”

“অন্তত নব্বই ভাগ নিশ্চিত।”

অনিদার কথাটা যেন আবার ধাক্কা মারল সুখেনদা, অভয়দা আর সেই ছাত্রকে। পাংশু মুখগুলো ফ্যাকাশে হয়ে গেল ওদের। ভাবলাম, ব্যাপারটা কী? এরা তিনজন মিলেই কি কান্ডটা করেছে? অনিদা এর মধ্যে ফ্ল্যাটের প্রতিটা ঘর ঘুরে দেখতে শুরু করেছে। আগেই বলেছি, ঢুকেই লম্বা ঘরটা ছিল ডঃ বর্মণের প্র্যাকটিসের ঘর। সেটা পেরোলে দুটো শোবার ঘর। সদর দরজায় তখনও বেশ ভিড়। এদের মধ্যে মাঝারি উচ্চতার পেটমোটা টাকমাথাওয়ালা একটা লোকের উৎসাহ যেন ছিল সবথেকে বেশি। একগুচ্ছ টেনশন নিয়ে ভদ্রলোক আমাদের পেছন পেছন ঘুরছিলেন। জিনিসটা বোধহয় বিরক্ত করছিল মিঃ হালদারকে। বেশ বিরক্তি নিয়ে উনি ভদ্রলোককে প্রশ্ন করলেন, “আপনি?”

সেই ভদ্রলোক তখন জোর করে মুখে একটা হাসি আনার চেষ্টা করে বললেন, “আমার নাম বিনয় লাহিড়ী।” তারপর আবার গম্ভীর হয়ে বললেন, “পাশের ফ্ল্যাটেই থাকি।”

বিনয় লাহিড়ীর বিনয় মনে হয় না খুব একটা খুশি করল মিঃ হালদারকে। কারণ, উনি একই ভঙ্গিতে ওঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “পুলিশকে আপনিই খবর করেন?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।”

উত্তরটা শুনে অনিদা একবার ভদ্রলকের দিকে তাকাল। তারপর হঠাৎ কী যেন দেখতে পেয়ে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। জানালার সামনেই খাট। তার পাশে একটা ছোটো টুল আর তার ওপর একটা টেবিল-ল্যাম্প রয়েছে। টেবিলের ওপর রাখা বেশ কয়েকটা ডাক্তারি বই দেখে অনুমান করা যায় ডঃ বর্মণ বেশ রাত পর্যন্ত পড়াশুনা করতেন। অনিদা তখন খাটের ওপর ঝুঁকে পড়ে তার ওপর পাতা গদিটাতে হাত বোলাতে বোলাতে কী যেন দেখছে। এবার ওই অবস্থাতেই আমাকে ডাকল, “জয়, একবার এদিকে আয়।”

“কী অনিদা?” আমি এগিয়ে গেলাম।

“দেখ, গদির কোনাটা কেমন ভিজে ভিজে। ও তখনও খাটের ওপর একইভাবে ঝুঁকে রয়েছে।”

সাথে সাথে আমিও ঝুঁকে পড়ে গদিটার ভেজা জায়গায় হাত বোলাতে বোলাতে বললাম, “ভিজল কী করে? জল পড়েছিল নাকি?”

“মেঝেতেও তো জলের ঝাপটা। মনে তো হচ্ছে বৃষ্টির জল। হয়তো এই জানালা দিয়েই…” অনিদার কথায় আমি এবার মেঝের দিকে তাকালাম। মিঃ হালদারও তখন আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। মেঝেটা দেখে মাথাটা বার দুয়েক সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে “হুম” বলে মুখ দিয়ে আওয়াজ করলেন।

অনিদা একবার সামনের জানালাটা খুলেই সাথে সাথে বন্ধ করে দিল। বাইরে তখনও মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। ছাঁটটা জানালার দিকেই।

“জানালা দিয়েই মনে হয় জল ঢুকেছে।”

আমার কথা শুনে মাথা নেড়ে অনিদা বলল, “হুম, হতে পারে।”

মিঃ হালদার তখন বিনয় লাহিড়ীকে জেরা শুরু করেছেন। অনিদা এবার ওঁদের দিকে এগিয়ে গেল।

“ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, মিঃ লাহিড়ীকে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি?” অনিদার প্রশ্নটা মিঃ হালদারের উদ্দেশ্যে ছিল।

সাথে সাথে উনি অনিদাকে রাস্তা ছেড়ে দিলেন, “ওহ সিওর! ক্যারি অন!”

ভদ্রলোকের ভাবটা এমন যে ‘আপনি করলে তো রক্ষা পাই মশাই’।

“আপনি কতদিন ধরে ডাক্তারবাবুকে চেনেন?” মিঃ লাহিড়ীকে প্রশ্ন করল অনিদা।

“প্রথম থেকেই। আমি আর ডাক্তারবাবু তো প্রায় একই সময়ে এখানে উঠি।” বললেন মিঃ লাহিড়ী। তারপর একটু চিন্তা করে একটা লম্বা ‘হ্যাঁ’ বলে বললেন, “তা আজ তিনবছর হয়ে গেল।”

“আপনি কখন ঘটনাটা জানতে পারেন?”

“কয়েকদিন আগে আমি একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। ডাক্তারবাবু ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন। আজ পাঁচদিনের কোর্স শেষ হতে রিপোর্ট দেব বলে এসেছিলাম। আর এসে দেখি এই ঘটনা! কী মর্মান্তিক!” বলতে বলতে চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল মিঃ লাহিড়ীর।

“ঘরে তখন কে কে ছিল?”

“ওই তো, ওরা তিনজন।” বলে মিঃ লাহিড়ী কম্পাউন্ডার সুখেনদা, কাজের লোক অভয়দা আর ডাক্তারবাবুর ছাত্রর দিকে ইশারা করল। তারপর বলল, “এর পরই তো পার্থ আসে।”

“আর বিশেষ কিছু দেখেছিলেন?”

“ওই দৃশ্য দেখে আর কিছু দেখার মতো অবস্থায় ছিলাম না ভাই।”

“হুম। তা আপনি হঠাৎ এই সময় এখানে এলেন কেন?” এই প্রশ্নটা কেন জানি না অনিদা বেশ খেলিয়ে বলল।

ওর কথায় থতমত খেয়ে মিঃ লাহিড়ী বললেন, “মানে?”

অনিদা একই মেজাজে বলল, “আপনার কি এই ফ্ল্যাটে প্রায়ই যাতায়াত আছে?”

উত্তর দেবার সময় লক্ষ করলাম লাহিড়ী ভদ্রলোক জেরার চোটে বেশ দিশেহারা। বললেন, “না, আসলে ডাক্তারবাবু ছিলেন অকৃতদার। পরিবার বলতে কিছু নেই। মিশতেনও না তেমন কারও সাথে। তাই আমরাও শুধু দরকার পড়লেই…”

“দরকার পড়লে মানে কি অসুস্থ হলে?” মিঃ লাহিড়ীর কথার ওপর কথা চাপাল অনিদা।

তাতে ইতস্তত করে মিঃ লাহিড়ী বললেন, “ওই আর কী।” উত্তরটা দিতে গিয়ে ভদ্রলোক লজ্জা পেলেন নাকি ঢাকলেন বুঝলাম না।

অনিদা ওঁকে আবার জিজ্ঞাসা করল, “কাউকে সন্দেহ হয় আপনার?”

তখন ঘরে উপস্থিত সবার দিকে একবার নজর বুলিয়ে মিঃ লাহিড়ী বললেন, “কাকে সন্দেহ করব বলুন? ওঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তো কোনও আইডিয়াই নেই আমাদের। তবে…”

বুঝতে পারলাম, ভদ্রলোক কোনও একটা কথা বলতে গিয়েও বললেন না। সেটা গোপন করার জন্য কি না জানি না। অনিদা তখন ওঁর শেষ কথাটাকেই প্রশ্ন করে বলল, “তবে?”

দু’বার আমতা আমতা করে মিঃ লাহিড়ী বললেন, “ডাক্তারবাবু এমনিতে কিন্তু ছিলেন বেশ হাসিখুশি মানুষ। কিন্তু কয়েকদিন আগে মর্নিং-ওয়াকে গিয়ে দেখি ওঁর মুখ কালো। কারণ জিজ্ঞাসা করতে প্রথমটায় উনি কিছু বলতে চাইছিলেন না। শেষে জোরাজুরি করায় বললেন ওঁকে নাকি কেউ গত ছ’মাস ধরে ব্ল্যাকমেল করছিল।”

“ব্ল্যাকমেল!” কথাটা শুনেই কপালে গোটা কয়েক ভাঁজ পড়ে গেল অনিদার। মিঃ হালদারও ততক্ষণে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছেন। অস্বীকার করব না, তথ্যটা আমাকেও একটা ধাক্কা মারল। কানে এল ঘরে একটা হালকা গুঞ্জন উঠল, তারপর অনিদা সেদিকে তাকাতে সেটা মিলিয়ে গেল। অনিদা এবার মিঃ লাহিড়ীকে জিজ্ঞাসা করল, “কে ওঁকে ব্ল্যাকমেল করছিল? কেন করছিল?”

উনি ব্ল্যাকমেলারের পরিচয় দিতে পারলেন না। কারণ, ডঃ বর্মণ সেকথা ওঁকে বলেননি। জিজ্ঞাসা করতে উনি নাকি শুধু বলেছিলেন, “আমার অন্ন ধ্বংস করে আমাকেই ব্ল্যাকমেল!’’ এর বেশি আর কিছু না।

“হুম।” উত্তরটা শুনে কোনও একটা চিন্তায় ডুবে গেল অনিদা। বুঝতে পারছিলাম, সূত্র হাতে আসতে শুরু করেছে। অপরাধে কার হাত থাকতে পারে বোঝার চেষ্টা করছিলাম। একটু আড়াল পেয়ে অনিদাকে জিজ্ঞাসা করতে ও বলল, “চারজনের যে কেউ হতে পারে।”

বুঝলাম, ডঃ বর্মণের কাজের লোক অভয়দা, কম্পাউন্ডার সুখেনদা, ওঁর ছাত্র আর এই মিঃ লাহিড়ী, কাউকেই সন্দেহের তালিকার বাইরে রাখছে না ও। তবে মিঃ লাহিড়ীকে ডঃ বর্মণ যে কথাটা বলেছিলেন সেটাই ওকে বেশি ভাবাচ্ছে। অবশ্য যদি না লোকটা গল্প বানায়।

“ব্ল্যাকমেল করার কথা বলছ?” জিজ্ঞাসা করলাম ওকে।

“তার চেয়েও আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আছে। অন্ন ধ্বংস করা। কে ওঁর অন্ন ধ্বংস করছে আবার ক্ষতিও করার চেষ্টা করছে? কিন্তু সেই লোক ওঁকে ব্ল্যাকমেল করছে কেন?” গলার টোনই বলে দিল শেষ প্রশ্নটা অনিদা নিজেই নিজেকে করল।

অনিদা এবার বাকি তিনজনকে জেরা শুরু করল। জানতে পারলাম, খুনটা প্রথমে দেখেছিলেন কম্পাউন্ডার সুখেনদা। চল্লিশ ছুঁই ছুঁই এই ভদ্রলোক কেমন যেন কথা হারিয়ে ফেলেছিলেন। এনাকে আমি সেবার দেখেছিলাম। মানে যেবার আমার জ্বর হতে আমি ডঃ বর্মণের কাছে এসেছিলাম। চেহারাটা আহামরি কিছু না। কী করে মনে রাখব জিজ্ঞাসা করলে বলতে হয়, মোটা একটা গোঁফ আছে আর শরীরটা বেশ শক্তপোক্ত। মাজা গায়ের রং। উচ্চতা একটু বেঁটের দিকে। উনি বললেন, উনি বাড়ি যাবার জন্য রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু বৃষ্টির দাপটের জন্য মাঝপথ থেকেই ফিরে আসেন।

“আপনি যখন বাড়ি যাবার জন্য রওনা দেন তখন ফ্ল্যাটে কে কে ছিল?” ওঁকে জিজ্ঞাসা করল অনিদা।

“অভয়দা আর স্যারের ছাত্র সমরজিৎ।” বললেন সুখেনদা।

অভয়দাকেও আমি আগেই দেখেছি। খুবই বেঁটে। পরনে পায়জামা আর ফতুয়া। মাথা ভর্তি কাঁচা পাকা চুল। তবে আমি সেদিন যখন দেখেছিলাম, তখন ওঁর মাথার চুলগুলো অনেকটা ঝাঁকড়া ছিল। হতে পারে এর মধ্যে কেটে ফেলেছেন। সামনে থেকে পেছনে একেবারে সমান মাপের। মানে আমরা যেটাকে বাটি ছাঁট বলি। কিন্তু ডঃ বর্মণের ছাত্রকে আমি এই প্রথমবার দেখলাম আর জানতে পারলাম ওর নাম সমরজিৎ।

অনিদা সুখেনদাকে আবার জিজ্ঞাসা করল, “কতদূর গেছিলেন?”

“ওই বড়ো রাস্তার মোড় পর্যন্ত। খুব কষ্ট করে গেছিলাম। কিন্তু গাড়িঘোড়া না থাকায় ফিরে আসি।” বললেন সুখেনদা।

“এসে কী দেখলেন?”

“দরজা খোলা। স্যার ওইখানে, ওই মেঝেতে পড়ে আছেন।”

“হুম।” কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে অনিদা বলল, “কাউকে সন্দেহ হয় আপনার?”

“না স্যার। কাকে সন্দেহ করব?”

“উনি কেমন লোক ছিলেন?”

“খুব শান্ত। হাসিখুশি আর সাধাসিধে। ভীষণ পরোপকারী ছিলেন। এই তো গত মাসেই আমাকে দু’হাজার টাকা দিয়ে বললেন, ছেলের পড়ার খরচ দিলাম। ফেরত দেবার নামও কোরো না।”

“কতদিন ওঁর আন্ডারে কাজ করছেন?”

একটু ভেবে সুখেনদা বলল, “তা প্রায় আড়াই বছর হবে।”

“শুনলাম, ওঁকে কেউ নাকি ব্ল্যাকমেল করছে? আপনি জানেন, কে?”

“না স্যার। এই ব্যাপারে কিছু জানি না।”

“আচ্ছা, আপনি তো বৃষ্টি কমার জন্য বাস-স্ট্যান্ডেই অপেক্ষা করতে পারতেন। হঠাৎ ফিরে এলেন যে?”

অনিদার তেরছা প্রশ্নে একটু ঘাবড়ালেন সুখেনদা। আমতা আমতা করে বললেন, “বৃষ্টি কখন থামবে বুঝতে পারছিলাম না। তাই ভাবলাম রাতটা এখানেই কাটিয়ে যাই।”

“বাড়ি কোথায় আপনার?”

“অনেকদূর। ডানলপ।”

সুখেনদাকে ছুটি দেবার পর অনিদা এবার ডাকল ডঃ বর্মণের কাজের লোক অভয়দাকে। উনি সেই সময় পাড়ার কোনও একটা দোকানে খাবার কিনতে গেছিলেন। অভয়দা প্রায় পনেরবছর এ বাড়িতে কাজ করছেন। ওঁর কথা অনুযায়ী মালিক খুব ভালো লোক ছিলেন।

“তিনজনের মধ্যে আপনিই সবার শেষে ঘর ছেড়ে বেরোন?” অভয়দাকে জিজ্ঞাসা করল অনিদা।

“হ্যাঁ,” বলে একটা ঢোঁক গিলল অভয়দা।

“তখন ডঃ বর্মণ কী করছিলেন?”

“নিজের চেয়ারে বসে কাজ করছিলেন।”

“রুগি দেখছিলেন?”

“না। আজ সাতটার পর আর রুগি আসেনি।”

“আপনি ফিরে এসে কী দেখলেন?”

“বাবু ওইখানটাতে মরে পড়ে আছেন। সামনে বেবাক দাঁড়িয়ে সুখেন।”

“সুখেনদা তো বাড়ি যেতে গিয়েও ফিরে এসেছিলেন। তা হঠাৎ ফিরে এলেন কেন? কী মনে হয় আপনার?”

“বাইরে খুব বৃষ্টি ছিল তো, তাই।”

“উনি কি এর আগেও এই ফ্ল্যাটে রাতে থেকেছেন?”

“হ্যাঁ, বার দুয়েক।”

“পাড়ার খাবার দোকান তো বাস-স্ট্যান্ড থেকে অনেক কাছে। তবুও আপনি সুখেনদার পরে ঘরে ফিরলেন কেন?”

“খাবার তৈরি হতে একটু সময় লেগেছিল বাবু।”

“আচ্ছা অভয়দা, আপনার বাবুর শোবার ঘরের জানালাটা কি বৃষ্টির সময় বন্ধ ছিল?”

অনিদার প্রশ্নে অভয়দা জোরে মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ বাবু। বন্ধ ছিল।”

“ঠিক করে মনে করে বলুন।”

“আমার মনে আছে বাবু। বৃষ্টি নামতে আমিই জানালাটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম।”

অভয়দা ব্ল্যাকমেলের ব্যাপারে কোনও আলো দেখাতে পারলেন না। মালিক হিসেবে ডঃ বর্মণকে দশে এগারো দিলেন। ওঁদের পেছনে নাকি দেদার টাকা খরচ করতেন। এই গত মাসেই নাকি ওঁকে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছিলেন। কথাটা শুনে অনিদার কপালটা কোনও এক অজ্ঞাত কারণে কুঁচকে গেল।

চক্কর মারতে মারতে আমরা আবার ডঃ বর্মণের চেম্বারের টেবিলটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। দরজার সামনে তখনও লোকজনের ভিড়। মিঃ লাহিড়ীর উৎসাহ এতটুকু কমেনি। অবশ্য পার্থদা এখনও আগের মতোই বিধ্বস্ত। বাইরে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। কিন্তু আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে দাপটটা একটু হলেও কমেছে। পুলিশ অফিসার মিঃ হালদারের মুখ থেকেও বেশি কিছু শোনা যায়নি। উনি শুধু অনিদার জেরা শুনছেন আর থেকে থেকে ঘাড় নাড়ছেন। আর মাঝে মাঝে মাথার টুপিটা সেট করে নিচ্ছেন।

অনিদা জেরা করতে করতে ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ভ্রূকুটি আর গম্ভীর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ও এখন কতটা চিন্তিত। এবার টেবিলের ওপর পড়ে থাকা একটা সিগারেটের প্যাকেট আবিষ্কার করল।

“সিগারেট কে খায় এ বাড়িতে?” জিজ্ঞাসা করল অনিদা।

“স্যার খেতেন।” এই প্রথম কথা বলল ডঃ বর্মণের ছাত্র সমরজিৎ। অনিদা ওকে তুমি বলেই সম্বোধন করল। দেখে মনে হচ্ছিল ছেলেটার বয়স খুব বেশি হলে পঁচিশ হবে। অনিদার থেকে কমপক্ষে পাঁচবছরের ছোটো। গায়ের রং বেশ ফর্সা। রোগা শরীরের গড়ন। উচ্চতা পাঁচ দশ মতো হবে। মানে অনিদার সমান। ভারতীয় হিসেবে যেটা একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না। লম্বাটে মুখে মোটা ফ্রেমের চশমা। কালো ট্রাউজারের ওপর হলুদ ফুলহাতা জামাটা না গোঁজা অবস্থায় প্রায় প্যান্টের পকেট অবধি এসে ঝুলছে। ছেলেটার জামার হাতার বোতামগুলো আটকানো। কিন্তু যেটা চোখে লাগল সেটা হল, কেন জানি না গলার বোতামটাও লাগিয়ে রেখেছে ছেলেটা।

“তুমিও বাইরে গেছিলে?”

উত্তরে মাথাটা দু’বার সামনের দিকে ঝোঁকাল সমরজিৎ।

“কেন?”

“স্যার আমাকে সিগারেট আনতে পাঠিয়েছিলেন। ওই যে টেবিলের ওপর যে প্যাকেটটা দেখছেন, ওটা আমিই নিয়ে আসি।”

“তোমার এখানে যাতায়াতের কারণ?”

“আমি ওঁর ছাত্র। আমার ডাক্তারির ফাইনাল ইয়ার তো, তাই মাঝে মাঝেই কিছু কিছু জানতে আসতাম।”

“উনি পড়াতেন? মানে ওঁর ছাত্রছাত্রী ছিল?”

“না না। উনি আমার জেঠুর বন্ধু। সেই সূত্রেই আসতাম। এমনিতে ওঁর কোনও ছাত্রছাত্রী ছিল না।”

“স্যার হিসেবে উনি কেমন ছিলেন জিজ্ঞাসা করে লাভ নেই। কিন্তু মানুষ হিসেবে উনি কেমন ছিলেন বলে তোমার মনে হয়? কোনও শত্রু-টত্রু ছিল?”

“একেবারে মাই ডিয়ার টাইপের। এমন লোকের শত্রু থাকতেই পারে না। বয়সের এতটা ফারাক বুঝতেই দিতেন না। না হলে আমাকে সিগারেট আনতে পাঠান?”

“তা ঠিক।” মাথা নেড়ে অনিদা বলল, “এখানে কতদিন হল তোমার যাতায়াত?”

“নয় নয় করেও একবছর তো হবেই স্যার।“

“রোজ আস?”

“না। দরকার পড়লে তবেই। অবশ্য সপ্তাহে একবার আসতামই। তিনমাস পরেই পরীক্ষা।”

“তুমি যখন ঘর থেকে বেরিয়েছিলে তখন কি ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ ছিল?”

“না। হালকা ভেজানো ছিল।”

“দরজা খুলে চলে গেছিলে? যদি কিছু চুরি হয়ে যেত?”

“ঘরে অভয়দা ছিল। তাছাড়া ও যাবার সময় দরজা বন্ধ করে গেছিল।”

“বন্ধ মানে তালা দিয়ে?”

“না না। এমনিই লক করে। এই দরজাটা বাইরে থেকেও খোলা যায়। তাছাড়া চুরি হবে কী করে? স্যার তো তখন এ ঘরের চেয়ারে বসেই কাজ করছিলেন।”

“হুম।” কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে অনিদা বলল, “শুনেছি আজকাল ওঁকে কেউ ব্ল্যাকমেল করছিল। এ ব্যাপারে তোমার কোনও আইডিয়া আছে?”

“না স্যার।”

সমরজিৎকে অনিদা আর বেশি কিছু জিজ্ঞাসা করল না। গম্ভীর মুখে ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে পায়চারি করতে লাগল। মাঝে একবার দাঁড়াল। কী যেন ভাবল। দু’বার মাথা নাড়ল। তারপর আবার পায়চারি করতে লাগল। ঘরের মধ্যে একটা থমথমে আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল। সমরজিৎ থেকে শুরু করে অভয়দা, সুখেনদা বা মিঃ লাহিড়ী, কারও মুখে কোনও রা নেই। মিঃ হালদারের চোখের মণিগুলো এতক্ষণ অনিদার চলার সাথে সাথে ডাইনে বাঁয়ে নড়াচড়া করছিল। মাঝে অনিদা থামতে সেগুলোও একবার থামল। তারপর আবার নড়াচড়া শুরু করল। আসলে অনিদা কী করে সেটার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করছিলেন না ভদ্রলোক।

অনিদা এবার ডঃ বর্মণের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর টেবিলের ড্রয়ারগুলো খুলে দেখতে শুরু করল। শেষে একদম নীচের ড্রয়ার থেকে কিছু একটা পেয়ে সেটা যখন বের করে আনল তখন আবিষ্কার করলাম, ওর হাতে ধরা রয়েছে একটা ব্যাঙ্কের চেক-বই। ধীরে ধীরে এবার এবার চেক-বইয়ের প্রথম পাতাটা খুলল অনিদা। ওর চোখদুটো স্থির হয়ে ছিল চেক-বইটার ওপর। এবার একটা হালকা হাসি ফুটে উঠল ওর চোখেমুখে। চোখজোড়া চিক চিক করে উঠল। কিন্তু কেন জানি মুহূর্তের মধ্যে মুখের ভাব বদলেও গেল আবার। কপালটা কুঁচকে গেল। মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। তারপর মাথাটা দু’বার সামনের দিকে নেড়ে বলল, “ছি ছি, এমন কেউ করে? যে থালায় খেলি, সেই থালাতেই ফুটো করলি?”

কথাটা শুনে আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। আর বুঝতে বাকি রইল না যে অনিদা খুনির সন্ধান পেয়ে গেছে। তাই প্রচন্ড উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কে করেছে খুনটা?”

মিঃ হালদার অবশ্য প্রথমে অনিদার কথার মানে ধরতে পারেননি। শেষে আমার কথা শুনে চেঁচিয়ে উঠলেন, “সে কি! তুমি কি খুনিকে ধরে ফেললে নাকি, অনিরুদ্ধ?”

“কেন? খুনিকে কি এত তাড়াতাড়ি ধরে ফেলা উচিত ছিল না, নাকি?” হেসে বলল অনিদা।

“না মানে, তা না, আসলে এত তাড়াতাড়ি খুনির সন্ধান পেয়ে যাব, ভাবতেই পারিনি!”

আমরা খুনির পরিচয় জেনে গেছি জানতে পেরে ঘরে উপস্থিত সবার গুনগুনটা প্রায় চেঁচামেচিতে পরিণত হল। শেষে মিঃ হালদারের ধমকে সবাই থামল। আসলে সবার একটাই দাবি, যত তাড়াতাড়ি হয় খুনিকে ধরে দিতে হবে।

আমি তখন অপলকে মুখ হাঁ করে অনিদার দিকে তাকিয়ে আছি। অনিদা এবার আমার দিকে এগিয়ে এসে তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের চাপে আমার মুখটা বন্ধ করে দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল, “খুনটা করেছে এমন একজন যার কিনা এই ফ্ল্যাটে অবাধ যাতায়াত ছিল। প্রথম দিকে ডঃ বর্মণ তাকে পছন্দ করতেন। বিনা পয়সায় চিকিৎসা থেকে শুরু করে আরও অনেকরকম সুবিধাই সে নিত ডঃ বর্মণের কাছ থেকে। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তার সাথে শত্রুতা হতে শুরু করে ডঃ বর্মণের।”

“অজ্ঞাত কারণে?” জিজ্ঞাসা করলেন মিঃ হালদার।

“হ্যাঁ,” মাথাটা একবার সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে অনিদা বলল, “সবকিছু ধরতে পারলেও খুনের কারণটা এখনও ধরতে পারিনি মিঃ হালদার। তবে সেই কারণেই ডঃ বর্মণকে…”

“ব্ল্যাকমেল হতে হচ্ছিল।” অনিদার কথাটা শেষ করলাম আমি। ও প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে।

“তার মানে ব্ল্যাকমেলারই ডাক্তারবাবুর খুনি?”

মাথা নেড়ে মিঃ হালদারের কথায় সম্মতি জানাল অনিদা। তারপর বলল, “আন্দাজ করা যায়, খুনির সাথে সম্পর্কের তিক্ততা একেবারে চরমসীমায় পৌঁছে গেছিল ডাক্তারবাবুর। একটা সুযোগ খুঁজছিল খুনি। আচমকা সেই সুযোগ আসে আজকে। শেষ রুগি চলে যাবার পর থেকে একেকজন একেক সময় ফ্ল্যাটে আসা যাওয়া করতে থাকে। এরই মধ্যে সবার চলে যাওয়া থেকে শুরু করে প্রথম লোকের ফিরে আসা পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই কাজ সারে সে। দরজায় যে হালকা লক ছিল সে তা জানত। তাই সটান ঘরে ঢুকে পড়ে সে। ডঃ বর্মণ অবশ্য কোনওভাবেই সেই মুহূর্তে এই বিপদের আশঙ্কা করতে পারেননি। কিন্তু খুনি শেষপর্যন্ত সেই সুযোগটা নেয়। কোনও একটা ভারী জিনিস দিয়ে আচমকা আঘাত করে ডঃ বর্মণের মাথার পেছনদিকে। শেষে শোবার ঘরের জানালা খুলে অস্ত্রটা ফেলে দেয় বিল্ডিংয়ের পেছনদিকের জলা জমিতে। সেই সময় বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। মনে হয়, জানালা খুলতে বৃষ্টির ছাঁট এসেই বিছানা ভিজিয়ে দিয়েছিল।”

বুঝলাম, ওর শেষের কথাগুলো আমার উদ্দেশ্যেই বলা। এবার থামতে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “তাহলে খুনি কি সবার অবর্তমানে বাইরে থেকে এসেছিল?”

“না, খুনি এই বিল্ডিংয়েই ছিল। নিজেকে সবার আড়ালে লুকিয়ে রেখে সুযোগের অপেক্ষা করছিল।”

“এতটা সিওর হচ্ছ কী করে?”

“খুনির জামাকাপড় শুকনো ছিল। এই বৃষ্টির মধ্যে বাইরে বেরোলে জামা একটু হলেও তো ভিজবে।”

শুকনো জামাকাপড়ের কথা শুনে প্রথমেই আমার নজর গেল বিনয় লাহিড়ীর দিকে। তারপর জিজ্ঞাসা করলাম, “খুনি কোথায় লুকিয়ে ছিল?”

“এমন একটা জায়গা সে বেছে নিয়েছিল যেখান থেকে ফ্ল্যাটের দরজাটা পরিষ্কার দেখা যায়।” কথাটা বলে কয়েকমুহূর্ত চুপ করে থেকে অনিদা বলল, “হতে পারে সিঁড়িতে। দোতলা থেকে তিনতলায় ওঠার চাতালে।”

“কিন্তু খুনটা করল কে?”

“যে ব্ল্যাকমেল করছিল।”

“কে ব্ল্যাকমেল করছিল?”

“যাকে ডাক্তারবাবু টাকা দিচ্ছিলেন।”

আমার প্রতিটা প্রশ্ন গোল গোল করে ঘোরাচ্ছিল অনিদা। ওর হেঁয়ালির জ্বালায় অতিষ্ট হয়ে আমি বললাম, “ওহ্‌, কাকে আবার ডাক্তারবাবু টাকা দিচ্ছিলেন?”

ও অবশ্য হেঁয়ালি থামাল না। বলল, “যার নাম চেক-বইয়ের ডিটেল পেজে লেখা আছে। যাকে ডঃ বর্মণ প্রতিমাসেই কুড়ি হাজার টাকার চেক কেটে দিতেন। জিনিসটা চলছিল গত ছ’মাস ধরে। কিন্তু কেন?” প্রশ্নটা অনিদা নিজেই নিজেকে করল।

আমি তখন ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, “এই লোকটাই যে খুনি সে ব্যাপারে এতটা সিওর হচ্ছ কী করে? চেক-বইতে তার নাম লেখা আছে, তাই?”

“না, শুধুমাত্র সেই জন্য নয়। চেক-বইয়ে নাম দেখে আমি কেবল নিশ্চিত হলাম যে এই লোকটাই খুনি। আসল সন্দেহটা তৈরি হয়েছিল অন্য একটা তথ্য থেকে।”

“কোন তথ্য?” আমি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

“সে জানল কী করে যে অভয়দা ফ্ল্যাট থেকে বেরনোর সময় গেটটা শুধুমাত্র টেনে লক করে গেছিল আর সেই সময় ডাক্তারবাবু নিজের চেয়ারে বসে কাজ করছিলেন?”

“মানে?” অনিদা কী বলতে চাইল বুঝতে পারলাম না।

ও তখন বলল, “আমার প্রশ্নটা কিন্তু সমরজিতের উদ্দেশ্যে করা।”

“তার মানে সমরজিতই…” মিঃ হালদার প্রশ্নটা শেষ করার আগেই সমরজিৎ জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কী বলতে চাইছেন?”

এতক্ষণ চুপ করে ছিল সমরজিৎ। এবার ফোঁস করে উঠল। ব্যপারটা বুঝতে পেরে আমিও এবার চমকে উঠলাম। অনিদা এবার সমরজিতকে বলল, “আমি কী বলতে চাইছি, তা তুমি ভালো করেই বুঝতে পারছ।”

সমরজিৎ এবার চেঁচিয়ে উঠে বলল, “আপনি কেন আমাকে খুনি বলে সাজাতে চাইছেন?”

তাতে অনিদা হেসে বলল, “সাজাতে চাইছি না তো, প্রমাণ করতে চাইছি।”

“ওহ অফিসার,” সমরজিৎ এবার মিঃ হালদারের দিকে ফিরে বলল, “হি ইজ লাইং! হি ইজ আ বিগ লায়ার! আসল খুনিকে না ধরে…”

“শাট আপ!” সমরজিতকে এবার এক ধমকে থামিয়ে দিল অনিদা। এমন ধমক শুনে যে কোনও পালোয়ানেরও বুক শুকিয়ে যেতে বাধ্য। অনিদা বলতে থাকল, “চেক-বইতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ডঃ বর্মণ তোমাকে গত ছ’মাস ধরে কুড়ি হাজার টাকা করে দিয়ে আসছিলেন। বলতে পার, কী উপলক্ষ্যে? বুঝতে পারছি, এই মাস থেকে উনি টাকা দেওয়া বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। তাই বেচারাকে তোমার রোষের সামনে পড়তে হয়েছিল। আর তাই শেষ পর্যন্ত ওঁকে খুন হতে হল।”

কয়েক মুহূর্ত থেমে দম নিল অনিদা। তারপর আবার বলতে শুরু করল, “আজ তোমার কাছে সেই সুযোগ এসেছিল। সিগারেট আনতে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির চাতালে লুকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলে। জানতে, সবাই বেরিয়ে গেলে বেশ কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। শেষে অভয়দা বেরোতে তুমি সোজা ঢুকে এলে স্যারের ফ্ল্যাটে। তোমাকে দেখে কোনও সন্দেহ হয়নি ওঁর। কিন্তু সেই বিশ্বাস ভেঙে ওঁকে তুমি খুন করলে। তারপর অস্ত্রটা ফেলে দিলে বিল্ডিংয়ের পেছনদিকে। হয়তো খুন করে তুমি চলে যেতে। ফিরে আসতে সবাই ফিরে আসার পর। কিন্তু কোনও কারণে সে সুযোগ না পাওয়াতে আবার সিঁড়ির চাতালে গিয়ে লুকিয়ে পড়লে। এর মধ্যে অভয়দা ফিরে এলেন। আশ্চর্যজনকভাবে ফিরে এলেন সুখেনদাও। তাতে অবশ্য সুবিধেই হল তোমার। সবার শেষে ঘরে ঢোকার জন্য কেউ তোমাকে সন্দেহও করল না। কিন্তু দরজা লক করার কথা বলে আর ডঃ বর্মণের চেয়ারে বসে কাজ করার কথাটা বলেই সন্দেহটা নিজের দিকে টেনে আনলে।”

চাপের মুখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না সমরজিৎ। সামনের চেয়ারটাতে ধপ করে বসে পড়ে দু’হাতে মুখ ঢাকল ও। কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে ধীরে মুখ তুলে বলল, “হি ওয়াজ আ মার্ডারার, মিঃ সেন।”

“হোয়াট!” এবার চমকাবার পালা অনিদার।

তাতে সমরজিৎ বলল, “ইয়েস, মিঃ সেন। মাস দশেক আগে উনি এক কোটিপতি ব্যবসায়ীর কথামতো তার বাবাকে খুন করেছিলেন।”

“কেন?” সমরজিতের কথা শুনে অবাক হয়ে গেল অনিদা। সাথে আমরাও।

“বাবা মারা গেলে তাঁর একশো কোটি টাকার সম্পত্তি পেতেন ওই ব্যবসায়ী। তাই উনি ডঃ বর্মণকে এই কাজটা অফার করেন। বদলে উনি ডঃ বর্মণকে পুরো সম্পত্তির এক পার্সেন্ট দেবার প্রতিশ্রুতিও দেন। তাই চিকিৎসার নাম করে ডঃ বর্মণ ওই ব্যবসায়ীর বাবাকে বিষাক্ত ইনজেকশন দেন। শেষে ডেথ সার্টিফিকেটও লিখে দেন এই বলে যে, ইট ওয়াজ আ কেস অফ সিম্পল হার্ট অ্যাটাক! ব্যস, কেস সোজা জলের মতো পাস করে যায়। কিন্তু আমি এই ব্যাপারটা জানতে পেরে গিয়েছিলাম। আমাদের ফ্যামিলির অবস্থা ভালো না। ভাবলাম, এই সুযোগ। এই ফাঁকে কিছু কামিয়ে নিতে পারলে ক্ষতি কী? তাই ব্ল্যাকমেল করা শুরু করলাম খুনিটাকে। কিন্তু এই মাসে বেঁকে বসল শয়তানটা। বলতে শুরু করল, বেশি বাড়াবাড়ি করলে ওই ব্যবসায়ীকে সব বলে দেবে। লোকটা খুব পাওয়ারফুল। আমার লাইফ রিস্ক হতে পারত। ভাবলাম, কোনওরকম ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। বিপদ আমার ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছিল।”

“তাই শেষপর্যন্ত স্যারকে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিলে।” কথাটা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল অনিদা।

পুরো ফ্ল্যাটে তখন অস্বাভাবিকরকমের নীরবতা। মিঃ লাহিড়ী একাবারে থ বনে গেছেন। সুখেনদার মুখটাও একেবারে ফ্যাকাসে। এতক্ষণ এক মনে সমরজিতের কথাগুলো শুনছিলেন অভয়দা। এবার মধ্যমা আর বুড়ো আঙুলে চোখ মুছলেন।

বাইরে এর মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেছে। অনিদারও কাজ শেষ। তাই আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করলাম না। এবার আমাদের ফেরার পালা। বেরোনোর সময় মিঃ হালদার অনিদাকে ধন্যবাদ দিলেন। অনিদা তখন ওঁকে বলল, “আমাকে যে কাজের জন্য ডাকা হয়েছিল, তা আমি করেছি মিঃ হালদার। খুনিকে আপনি অ্যারেস্ট করুন। কিন্তু এই ঘটনার সাথে আরও একজন অপরাধী জড়িয়ে আছে। তাকে আপনি অ্যারেস্ট করবেন কি না সেটা আপনিই জানেন।”

“সে কে?” অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন মিঃ হালদার।

“সেই ব্যবসায়ী যে ডঃ বর্মণকে কাজে লাগিয়ে তাঁর বাবাকে হত্যা করিয়েছিলেন। সেদিনের সেই ঘটনাটা না ঘটলে আজকের এই ঘটনাটাও হত না মিঃ হালদার।”

ডঃ বর্মণের ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা।

ছবিঃ শিমুল

জয়ঢাকের গল্পঘর

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s