গল্প ময়ূর পাহাড়ের রহস্য তরুণকুমার সরখেল শরৎ ২০২০

তরুণকুমার সরখেলের সমস্ত লেখা

‘হোটেল হিলভিউ’ থেকে জাইলো গাড়িতে চেপে প্রচেত দেবনাথ তাঁর দুই সঙ্গী হিমাদ্রিকিশোর রায় ও অনীশ গুপ্তকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। হোটেলের বাঁদিকে বিশাল ওয়াচ টাওয়ার। ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে ওয়াচ টাওয়ারে উঠলে পাহাড়ের রেখা ও শৃঙ্গগুলি চোখে পড়ে। সেখান থেকে প্রচেতবাবুরা বেশ কিছুক্ষণ পাহাড় পর্যবেক্ষণ করেছেন।

হিমাদ্রিবাবু সদ্য সরকারি অফিস থেকে অবসরপ্রাপ্ত হয়েছেন। চাকুরি থাকাকালীনই তাঁর ঘোরাফেরা করার স্বভাবটা ছিল। বর্তমানে প্রচেতবাবুর পাল্লায় পড়ে তাঁর বেশ ভালোই ঘোরাফেরা হচ্ছে। হিমাদ্রিবাবুর লৌকিক দেবদেবী নিয়ে ভীষণ আগ্রহ। যেখানেই লৌকিক দেবদেবীর সন্ধান পান সেখানেই তিনি ছোটেন। তবে এটা তাঁর নিছক নেশা ছাড়া আর কিছু নয়। লৌকিক দেবদেবীর যাবতীয় তথ্য তিনি পত্রিকায় নিয়মিতভাবে প্রকাশ করেন।

অনীশ আর প্রচেত দুই বন্ধু। তবে প্রচেতবাবুর বয়স অনীশের চেয়ে বেশ বেশি। তাই অনীশ প্রচেতদা বলেই ডাকে। আর এই দুই বন্ধুর সঙ্গে হিমাদ্রিবাবুর বয়সের পার্থক্যটা কোনও বাধাই নয় কেননা, সখ্যতার দিক থেকে সেখানে কোনও খামতি নেই।

এন এইট থার্টি টু ধরে গাড়ি বেশ জোরেই ছুটছিল। কিন্তু ড্রাইভার একটা ঝাঁকড়া তেঁতুলগাছের কাছে এসে হঠাৎ ব্রেক কষল। তারপর সামনের সিটে বসে থাকা হিমাদ্রিবাবুকে বলল, “খুচরো পয়সা পকেটে থাকলে শান বাঁধানো স্থানে ফেলে দিন।” এই বলে সে নিজে স্টিয়ারিং থেকে হাত উঠিয়ে জোড়হাত করে মাথায় ঠেকাল।

হিমাদ্রিবাবু খুচরো পয়সা ছুড়ে দিলেন শান বাঁধানো জায়গায় মাটির হাতি-ঘোড়া রাখা হয়েছে এরকম একটি স্থানে। তারপর হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন, “এটা কোন দেবতা?”

“রঙ্কিণী ঠাকুর।” ড্রাইভার বলল।

হিমাদ্রিবাবু বেশ সুর করে বললেন, “রাজার সনে হৈল রণ রক্ষা নাহি আর, রঙ্কিণী করহ রক্ষা তবে সে উদ্ধার।

“মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলে কালকেতুর গল্পে এই রঙ্কিণী দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। দেবী রক্তমুখী, রক্তবর্ণা। দেবীর কাছে নরবলি দেওয়ার প্রথা ছিল একসময় বলে শুনেছি। তাই রঙ্কিণী দেবীকে সকলেই ভয় পায়। অবশ্য ভয় পাওয়ার একটা কারণও আছে। রঙ্কিণী নামের একটা রাক্ষসী ধলভূম জুড়ে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে ঘুরে বেড়াত। জঙ্গলের পথে যাকেই পেত তাকেই খেয়ে ফেলত। সেই রঙ্কিণী রাক্ষসীর ভয়ে গ্রামবাসীরা ঠিক করেছিল প্রতিদিন তারা একেকজনকে রাক্ষসীর কাছে পাঠাবে। রঙ্কিণী ভেবে দেখেছিল, তারও বয়স হচ্ছে, গ্রামবাসীদের এই প্রস্তাবটি মন্দ নয়। তাই সে প্রস্তাবে রাজি হয়ে প্রতিদিন একেকজন গ্রামবাসীকে খেয়ে আসছিল।

“তো একদিন সেই গ্রামের এক ব্রাহ্মণ বাড়ির পালা এল। ব্রাহ্মণ ভাবল ব্রাহ্মণী আর তাদের একমাত্র ছেলেকে রেখে সেই যাবে রাক্ষসীর খাবার হতে। আবার ব্রাহ্মণী তাতে রাজি নয়। সে থাকতে ব্রাহ্মণকে রঙ্কিণীর কাছে পাঠাবে কেন? এদিকে তাদের ছেলে মা-বাবাকে কিছুতেই বনে যেতে দিতে চায় না। সে-ই যাবে।

“এসব দেখে ঘরের রাখাল ছেলেটি বলল, ‘বনে আমি যাব। আমাকে একমুঠো ছোলাভাজা সঙ্গে দাও। আজ তারই একদিন কি আমারই একদিন।’

“কিন্তু ব্রাহ্মণ রাখালকেই বা কী করে রাক্ষসীর কাছে যেতে দেন? রাখালের জেদাজেদিতে ব্রাহ্মণ তাকে একমুঠো ছোলাভাজা গামছাতে বেঁধে দিলেন।

“রাখাল রাস্তার পাশে এক কামারশালায় গিয়ে কয়েকটি লোহার ছোটো ছোটো টুকরো সংগ্রহ করে নিল। তারপর অনেক দেরি করে রাক্ষসীর কাছে গিয়ে পৌঁছল। রাক্ষসী খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে ছিল। রাখাল তাকে লোহার টুকরোগুলো দিয়ে বলল, ‘এগুলো হল ছোলা। আগে এটা খাও। তারপর আমাকে খাবে।’ এই বলে সে গামছায় বাঁধা ছোলাগুলো কুড়মুড় করে চিবোতে লাগল। রাক্ষুসী ততক্ষণে একটা ছোলাও চিবোতে পারেনি। তার দাঁতও নড়বড় করতে লাগল। ছেলেটি নিশ্চয়ই তার চেয়ে বলশালী ভেবে রাক্ষসী এবার ভয় পেয়ে ছুটতে শুরু করল। তারপর ছুটতে ছুটতে এসে সুবর্ণরেখা নদীর কাছে এসে থামল। সেখানে তখন এক দরিদ্র ধোপা রমণী বালি ছেঁকে ছেঁকে সোনার কণা পাওয়া যায় কি না তারই চেষ্টা করছিল। রঙ্কিণী তাকে গিয়ে বলল, ‘পিছনে এক ভয়ানক শক্তিশালী লোক আমায় তাড়া করেছে। আমাকে তার হাত থেকে বাঁচালে আমি তোমায় রানি করে দেব।’

“গল্প এখানেই শেষ।” বলে হিমাদ্রিবাবু থামলেন।

“আপনার গল্পের সুবর্ণরেখার কাছেই এসে পড়েছি সেটা দেখেছেন?” বললেন প্রচেতবাবু।

হিমাদ্রিবাবু লক্ষ করলেন সামনে একটি সিমেন্টের বোর্ড রয়েছে। তাতে বড়ো বড়ো করে লেখা ‘টটকো নদী’।

প্রচেতবাবু বললেন, “যে নদীতে সোনা পাওয়া যায় সে নদীর জলের রংও সোনার মতো। সূর্যের আলো নদীতে পড়লে সোনালি আভা চোখে পড়ে। তাই নদীর নাম সুবর্ণরেখা। আর সুবর্ণরেখাই হল এখানের টটকো নদী।”

হিমাদ্রিবাবু বললেন, “তাই বলুন। আমি ভাবলাম এটা আবার কোন নদী। নামই শুনিনি আগে।”

“এখনও কিন্তু মেয়েরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সোনার খোঁজে বালি ছেঁকে যায়। সোনার কণা পেয়েও যায় কেউ কেউ।” প্রচেতবাবু বললেন।

হিমাদ্রিবাবু তাঁর বাষট্টি বছরের জীবনে ঘুরেছেন অনেক। জলে-জঙ্গলে-পাহাড়ে সর্বত্রই। তবে বাংলার বাইরে তিনি খুব একটা যাননি। যেতেও চান না। বলেন, ‘আমি যে ঘরকুনো।’

একসময় তিনি ভৈরববাঁকি আর কংসাবতীর বাঁকে বাঁকে যে বিস্তীর্ণ জনপদ আছে সেইসব অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ইতিহাসের বহু স্মৃতি নিয়ে সেইসব স্থানে অনেক দেব-দেউল, জমিদারের ভেঙে পড়া ইমারত ও রাজরাজড়াদের গড় এখনও ছড়িয়ে আছে। হিমাদ্রিবাবু সেখান থেকে নানা উপাদান সংগ্রহ করেছেন। আলম সায়রের পাড়ে চাঁদু ডাঙায় বসে তিনি পুরনো রাজরাজড়াদের বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া কাহিনি উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন।

প্রচেতবাবুর বেশ চা-তেষ্টা পেয়েছিল। রাস্তার বাঁদিকে একটা চায়ের দোকান দেখে তাড়াতাড়ি গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়লেন। দোকানে পাঁচ-ছ’জন বসে হাতি নিয়ে আলোচনা করছে। এখান থেকে দলমা খুব বেশি দূরে নয় বলে বনপাথারির জঙ্গল থেকে হাতির দল বেরিয়ে এসে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। চাষিদের খামার বাড়ি থেকে ধান খেয়ে হাতির দল অন্ধকার থাকতেই আবার ফিরে চলে যায়। চাষিরা তাই মশাল হাতে রাত-পাহারার ব্যবস্থা করে রাখে। গতকাল রাতে রাত-পাহারা থাকা সত্বেও একপাল হাতি এসে চাষিদের ধান পালুই লণ্ডভণ্ড করে চলে গেছে। সে বিষয়েই কথাবার্তা হচ্ছে। গাড়ি থেকে হিমাদ্রিবাবু ও অনীশ চা খেতে নেমে এলেন।

চা খেয়ে আবার যখন গাড়ি ছাড়ল তখন প্রায় এগারোটা বাজে। প্রচেতবাবু বললেন, “গঙ্গানারায়ণের নাম শুনেছেন ?”

প্রশ্নটা শুনে হিমাদ্রিবাবু বললেন, “কোন গঙ্গানারায়ণ? যিনি দোর্দণ্ডপ্রতাপ ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন, তিনি তো ?”

প্রচেতবাবু উত্তর দিলেন, “ঠিক। শোনা যায় বরাভূম রাজ্যের এই গঙ্গানারায়ণ সমস্ত জমিদারদের এককাট্টা করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। আমরা যে রাজবাড়িতে যাচ্ছি সেই বাড়িটাও এই গঙ্গানারায়ণ হাঙ্গামার সঙ্গে যুক্ত।”

অনীশ চা খাবার পর থেকে কানের হেড ফোন সরিয়ে হিমাদ্রিবাবুদের গল্প শুনে যাচ্ছে আর ভাবছে, প্রচেতদা কী বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে রাজবাড়িতে যাচ্ছে? এখনও পর্যন্ত কিছু তো বলেনি।

সত্যনারায়ণ বর্তমান ভাঙাচোরা রাজপ্রাসাদের বাসিন্দা। বৈভব বলতে আর কিছুই নেই। তবে প্রাসাদের দরজা, জানালা ও বেশি কিছু মেহগনি কঠের আসবাবপত্র রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলের সম্মান রক্ষা করে চলেছে।

উপরের একটি বেশ সাজানো গোছানো ঘরে নিয়ে গিয়ে সত্যনারায়ণবাবু প্রচেতদাকে একটা বড়ো সিন্দুক দেখিয়ে বললেন, “এতে পুরনো অনেক অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে। কিন্তু আপনাকে যে ছোরাটার কথা বলেছিলাম সেটা এই সিন্দুক থেকে বহুদিন আগে থেকেই নিখোঁজ হয়েছে।”

প্রচেতদা বললেন, “ছোরাটার হাতল কী কোনও মূল্যবান ধাতু দিয়ে বাঁধানো ছিল?”

সত্যনারায়ণ বললেন, “না, তেমন কিছু মূল্যবান ধাতু ছিল না। এরকমই একটি সাদামাটা ছোরা। কিন্তু ছোরাটা গঙ্গানারায়ণ নিজে সবসময় কাছে রাখতেন বলে ওটার একটা আলাদা মূল্য আছে। তাছাড়া ওই ছোরাটা বেশ কয়েকবার ব্যবহৃত হয়েছিল। প্রতিবারই ওই ছোরার কল্যাণে গঙ্গানারায়ণ প্রাণে বেঁচে ফিরে আসেন। এমনকি একবার একটা আস্ত ভালুকও ওই ছোরাটার আঘাতে কাবু হয়ে গিয়েছিল। এসব কারণেই ছোরাটা আমাদের পরিবারের কাছে সৌভাগ্য বহনকারী বস্তু হিসাবে গচ্ছিত ছিল।”

হিমাদ্রিবাবু ও অনীশ হাঁ করে সত্যনারায়ণবাবুর কথা শুনে যাচ্ছিলেন। প্রচেতবাবু তাহলে ওই ছোরা রহস্যের কিনারা করবেন বলেই এখানে এসেছেন!

লহরিয়া ঝরনা ধারা দেখতে গেলে মনে হয় এখানের চারপাশটায় এখনও আদিমতার ছোঁয়া লেগে আছে। ঝরনার কাছে যাওয়াটা কম বিপজ্জনক নয়। উপর থেকে কোন আদিমকাল থেকে জলরাশি নিচে শক্ত গ্রানাইটের উপর পড়ে পড়ে সেগুলো অতি মসৃণ হয়ে গেছে। স্বচ্ছ ঝরনার জলে পা ভিজিয়ে ওই গ্রানাইট পার হওয়া খুবই মুশকিল, যেকোনও সময় পা পিছলে পড়ে মাথা ফেটে যেতে পারে।

হিমাদ্রিবাবু কাঁধের ঝোলা একপাশে রেখে মোবাইল ক্যামেরায় ঝরনার ছবি তুলছেন। অনীশ উপরে যেখান থেকে জল হঠাৎ বাঁক নিয়ে সোজা নিচে এসে পাথরে ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। আর প্রচেতদার মাথায় ঘুরছে কেবল রাজবাড়ির ছোরার কথা।

লম্বা লম্বা শালগাছ ছড়িয়ে রয়েছে যতদূর চোখ যায়। অনেক দূরে মাথা উঁচু করে আছে গোর্গাবুরু, মাঠাবুরু পর্বতশৃঙ্গ। অনীশ ইতস্তত ঘুরতে ঘুরতে মস্ত বড়ো একটা গ্রানাইট চাঙড়ের উপর দেখতে পেল একটি রং চটে যাওয়া ধূসর রং-এর ছাতা। এধরনের ছাতা এখন খুব একটা দেখতে পাওয়া যায় না। গ্রামের রাখাল বালকরা এধরনের ছাতা মাথায় দিয়ে মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। তাদেরই কেউ ছাতাটা এখানে রেখে গেছে মনে হয়।

অনীশ দূর থেকে হিমাদ্রিবাবুকে বলল, “আমার একটা ফটো তুলে ফেলুন দেখি।” এই বলে সে কুড়িয়ে পাওয়া ছাতাটা মাথায় দিয়ে রাখল সেজে দাঁড়াল।

হিমাদ্রিবাবু অনেক দূর থেকে জুম করে অনীশের দু-তিনটে ছবি তুলে নিলেন পটাপট। আর ওদিকে অনীশ হঠাৎ দেখতে পেল হিমাদ্রিবাবু পাথরে পা পিছলে সোজা পড়ে গেলেন ঝরনার শীতল জলে। তাঁর ডান কনুইটা ব্যথায় টনটন করে উঠল। তাছাড়া তিনি চলে ভিজে একেবারে চুপসে গেছেন। হিমাদ্রিবাবু হাঁক পাড়লেন, “প্রচেতবাবুকে দেখছি না তো! তিনি কোথায়?”

অনীশ সম্বিৎ ফিরে পেল। হঠাৎ যেন তার ঘুমটা ভেঙে স্বপ্নটা খান খান হয়ে গেল। কিন্তু সে তো এখন জেগে আছে। তাহলে স্বপ্ন দেখল কী করে? সে তবুও একবার দূর থেকেই চেঁচিয়ে হিমাদ্রিবাবুকে সাবধান করল, “দেখবেন পা পিছলে পড়ে-টড়ে যাবেন না যেন। চারদিকে শুধু শক্ত গ্রানাইটের চাঙড়।”

অনীশের কথাটা তখনও শেষ হয়নি। বলতে-বলতেই হিমাদ্রিবাবু পা হড়কে সোজা ঝরনার জলে।

অনীশ ছাতাটা ফেলে দ্রুত নিচে নামতে লাগল। প্রচেতদাকেও এই সময় শাল জঙ্গল ভেদ করে আসতে দেখা গেল। দু’জনে একসঙ্গে হিমাদ্রিবাবুকে জল থেকে উপরে তুললেন। জল খুব একটা গভীর নয়। কিন্তু তিনি পুরোপুরি ভিজে গেছেন এবং ডান কনুইয়ে চোটও পেয়েছেন।

অনীশ তো ব্যাপারটা বুঝতেই পারল না এটা কেন এবং কীভাবে হল। এইমাত্র তো সে এই ঘটনাটাই হুবহু স্বপ্নের মতো চোখের সামনে দেখতে পেল। পৃথিবীতে কত যে অলৌকিক কাণ্ড ঘটে যার কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

অনীশ তবুও দৌড়ে একবার উপর থেকে পুরনো ছাতাটা হাতে নিয়ে প্রচেতদার কাছে এল। তারপর সেটা প্রচেতদাকে দেখিয়ে বলল, “এটা মাথায় দিয়ে দেখো দেখি নতুন কিছু দেখতে পাও কি না !” এই বলে সে হিমাদ্রিবাবুর জলে পড়ে যাওয়ার ঘটনাটা বলল।

প্রচেতবাবু ছাতাটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। পুরনো ছাতাটার দু-তিন জায়গায় তাপ্পি মারা। উপরের দিকে রাংতার মতো কিছু দিয়ে ফুটো আটকানো হয়েছে। তিনি অনীশকে বললেন, “কোথায় কুড়িয়ে পেলি ছাতাটা?”

অনীশ বলল, “ওই তো ওই বড়ো পাথরটার উপর পড়ে ছিল।”

হিমাদ্রিবাবু কাপড়ের ঝোলা থেকে গামছা বের করে গা-মাথা মুছতে শুরু করলেন। প্রচেতবাবু ছাতাটা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যই দেখতে লাগলেন। অনীশ অনেক আশা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এক মিনিট পর পরই সে প্রশ্ন করছে প্রচেতদাকে, “কিছু দেখতে পেলেন? এই যেমন কেউ পড়ে যাচ্ছে বা এরকম কিছু।”

প্রচেতবাবু বললেন, “তোর ওটা মনের ভুল। ওরকম আবার হয় নাকি ? আসলে দীর্ঘদিন ধরে জলের স্রোত এই পাথরের উপর বয়ে গেছে বলে এগুলো পিচ্ছিল হয়ে আছে। আমাদের মধ্যে যে কেউ যখন তখন পা পিছলে জলে পড়ে যেতে পারি। আর সেই ভয় থেকেই তুই ওরকম একটা কিছু কল্পনা করে ফেলেছিস।”

অনীশ বলল, “কিন্তু হিমাদ্রিবাবুর ক্ষেত্রে ডান কনুইয়ে চোট, এটা মিলে গেল কী করে?”

এ প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে প্রচেতদা দূরে একবার তাকিয়ে বললেন, “অনীশ, দ্যাখ ওপাশে দুটো ময়ূর উড়ে দূরের ওই ছোট্ট পাহাড়টার উপর এসে নামল।”

হিমাদ্রিবাবু ও অনীশ দু’জনেই সেদিকে তাকাল। “ময়ূর? হলেও হতে পারে।”

এখন সাড়ে চারটে বাজে। হাতে আরও এক-দেড় ঘণ্টা বেড়ানোর সময় রয়েছে। তারপরে রাজবাড়িতে ফিরতে হবে।

প্রচেতবাবু সঙ্গীদের নিয়ে ওই ছোট্ট পাহাড়টাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে চললেন। অনীশ চেয়েছিল পুরনো ছাতাটা সঙ্গে নিয়ে আসতে। কিন্তু প্রচেতদা সেটা সঙ্গে আনতে দেননি। যার ছাতা সে তো ওটা রেখে অন্য কোথাও গেছে। সেটা নিয়ে পালানো কি শোভা পায়?

হিলটপের ওদিকটায় দু-তিনটে খাবার হোটেল আছে। সেখান থেকে কয়েকজন টুরিস্ট এদিকেই বেড়াতে এসেছে। সঙ্গে স্থানীয় একজন ড্রাইভার টুরিস্ট পার্টির লোকজনদের বলছিল, “এটা হল ময়ূর পাহাড়। অনেক আগে এখানে রাজাদের ছোট্ট একটা মন্দির ছিল। মন্দিরের পাশে ছিল ময়ূরদের থাকবার জায়গা। অনেকগুলি ময়ূর এই পাহাড়ে ঘুরে বেড়াত। সেই থেকেই পাহাড়ের নাম ময়ূর পাহাড়।”

প্রচেতবাবু একটু দূরে মন দিয়ে ড্রাইভারের কথা শুনলেন। হঠাৎ প্রচেতবাবু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “এখন কি এই পাহাড়ে ময়ূর দেখা যায়?”

ড্রাইভার মুচকি হেসে বলল, “কী যে বলেন। সেসব কোন রাজরাজড়ার যুগের কথা। তবে ময়ূর দেখা না গেলেও এই পাহাড়ের নামটা কিন্তু ময়ূর পাহাড় হয়েই টিকে রয়েছে এখনও। তাছাড়া ওই যে দেখছেন, ভাঙা মন্দিরটা উপরে দেখা যাচ্ছে।”

কথা বলতে বলতে সবাই একসঙ্গে ময়ূর পাহাড়ের উপরে উঠে এলেন। কিছুক্ষণ পরেই টুরিস্ট পার্টির লোকজন নিচে নেমে অন্য কোথাও চলে গেল।

অনীশ বলল, “প্রচেতদা, তোমার ময়ূর কিন্তু দেখতে পেলাম না এখনও। সেটাও কিন্তু আমার মতো দিবাস্বপ্নই ছিল।”

হিমাদ্রিবাবু বললেন, “এই মন্দিরের পাথর খিলানের সঙ্গে জৈনদের মন্দিরের অনেক মিল দেখতে পাচ্ছি। একবারটি ভেতরে ঢুকে দেখতে হবে। এদিকে আবার কনুইয়ে যা ব্যথা!”

প্রচেতবাবু বললেন, “আপনি তো মশাই আপনার সাবজেক্ট পেয়ে গেলেন। এবার এই মন্দির সম্পর্কেও একটা বড়ো প্রবন্ধ লিখে ফেলুন।”

মন্দিরের ভেতরে ঢোকা খুবই শক্ত। কারণ, দরজার কাছে বড়ো বড়ো খিলানগুলো পড়ে গিয়ে মন্দিরের প্রবেশপথটি অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে গেছে। তাছাড়া ভেতরে সাপ-টাপও থাকতে পারে। তবুও তিনজনের মিলিত চেষ্টায় মন্দিরে ঢোকার ছোট্ট একটা রাস্তা তৈরি করা হল এবং সাহস নিয়ে ঢুকেও পড়লেন তিনজনে। ভেতরটা বেশ ঠাণ্ডা এবং দু-তিনটে ফুটো দিয়ে বাইরে থেকে আলো-বাতাসও ঢুকছে। আলো ততটা জোরালো নয়। সেই দু-তিনটে ফুটো দিয়ে চামচিকেদেরও আনাগোনা আছে বেশ বোঝা যাচ্ছে। গুমোট একটা গন্ধ নাকে আসছে।

পাথরের একটি মূর্তি মন্দিরের গায়ে হেলে পড়ে আছে। মূর্তিটার গায়ে তেল-সিঁদুর মাখানো। তবে সেটা অনেকদিনের পুরনো। বর্তমানে এটি অবহেলার সঙ্গে পড়ে রয়েছে।

মোবাইলের টর্চ জ্বেলে মূর্তিটা বেশ ভালো করে নিরীক্ষণ করলেন হিমাদ্রিবাবু। বোঝা যাচ্ছে তিনি এই মূর্তিটা নিয়ে বেশ আগ্রহী। তিনি নিজের মনেই বলে উঠলেন, “মা এখানে অষ্টভুজা। আটটি হাত রয়েছে মায়ের। খুব সম্ভবত এই দেবী ‘কিয়াইসেনী’ নামে পরিচিতা। এই জঙ্গলমহল অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন লোকদেবতা হলেন এই কিয়াইসেনী। আষাঢ় মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে এই দেবীর খুব জাঁকজমক করে পুজো করার রীতি ছিল। ইনি বৃষ্টির দেবী। ঠিক সময়ে অধিক পরিমাণে বৃষ্টির জন্য মূর্তির গায়ে এত অধিক পরিমাণে সিঁদুর-ঘি-দুধ ইত্যাদি ঢালা হয়েছে। আরেকটি ব্যাপার লক্ষ্যণীয়, তা হল এই বৃষ্টির দেবীর কোনও হাতেই কোনও অস্ত্র থাকে না।”

প্রচেতদা খুব ভালো করে লক্ষ করছিলেন দেবী মূর্তিটাকে। তিনি বললেন, “আমি কিন্তু দেবীর একেবারে উপরের বাঁহাতে একটি ছোরা দেখতে পাচ্ছি।”

তিনি মোবাইলের টর্চলাইট জ্বেলে বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন দেবীর হাতের অস্ত্রটি। খুব ভালো করে লক্ষ করার পর বোঝা গেল সেটি মূর্তির সঙ্গে খোদাই করা নয়। আলাদাভাবে রাখা হয়েছে। কিন্তু ছোরার গায়ে এত তেল-সিঁদুর লেপা রয়েছে তাতে সেটিকেও পাথরের বলে মনে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ছোরাটি মূর্তির সঙ্গে এমনভাবে সেঁটে রয়েছে, ফলে কেউ বুঝতেও পারবে না যে ওটি আসল ছোরা, পাথরের নয়।

প্রচেতবাবু বললেন, “কী হিমাদ্রিবাবু, ছোরাটা কি এখনই খুলে নেব, নাকি আগে মূর্তির ছবি তুলবেন কয়েকটা?” হিমাদ্রিবাবু হাত নেড়ে বললেন, “না না, অষ্টভুজা মাকে ছোরা হাতে কি মানায়? এখনই ওই কৃত্রিম ছোরাটা হাত থেকে খুলে নিন।” প্রচেতবাবু তাই করলেন। হিমাদ্রিবাবু মূর্তির গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন, “টারকোজ পাথরের তৈরি বলে মনে হচ্ছে। এসব পুরনো পাথরের মূর্তি এককথায় অমূল্য মশাই।”

প্রচেতবাবু একটা অমূল্য বস্তু হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। গঙ্গানারায়ণের ব্যবহৃত সেই ছোরা। যা তাঁকে বেশ কয়েকবার শত্রুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়।

কিন্তু ময়ূরের ঘটনাটা? তার ব্যাখ্যা তো তিনি পেলেন না। প্রচেতবাবু ঠাণ্ডা মাথায় আবার একবার পুরো ঘটনাটা মেলানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। তিনি ছাতা মাথায় দিতেই দুটো দৃশ্য দেখতে পেলেন। সেই ময়ূরের সন্ধান করতে করতে খুঁজে পেলেন ময়ূর পাহাড়। আর শেষে এই ছোরা। সবকিছুর মধ্যেই তো রয়েছে সুন্দর একটা যোগসূত্র। বলতে গেলে ওই ছাতাটাই এইটা অলৌকিক ছাতা। যার কল্যাণে তিনি উদ্ধার করতে পারলেন রাজবাড়ির সৌভাগ্যবহনকারী ছোরাটা। ঝরনার কাছে গিয়ে আরেকটিবার সেই অলৌকিক ছাতাটার খোঁজ করলে কেমন হয়?

ছবি:সায়ন মজুমদার

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s