গল্প সঙ্গে ছিল বদ্রী অদিতি ভট্টাচার্য্য শরৎ ২০১৯

অদিতি ভট্টাচার্য – র সমস্ত গল্প

সঙ্গে ছিল বদ্রী

অদিতি ভট্টাচার্য্য

এত তাড়াহুড়ো তোমার যে কীসের মিঞা, বুঝি না। কিছুদিন থাকো, সব দেখো শোনো, তা না, আসো আর তড়িঘড়ি করে চলে যাও। আসোও তো সেই কোন মুলুক থেকে! সমুদ্র পেরিয়ে এতখানি পথ যাতায়াতের পরিশ্রম পোষায় ক’দিন না থাকলে? তোমার মুলুকের কতজন তো এখানেই পাকাপাকি ঘরবাড়ি করে রয়ে গেল। মাঝে মাঝে যাতায়াত করে, তুমিও তো তাই করলে পারো। বিবি-বাচ্চাদের নিয়ে এসে এখানেই এবার ঘর বাঁধো দেখি।” কালো, নধর ঘোড়াটার পিঠে একখানা চাপড় মেরে বললেন সুখবিলাস।

যাকে বলা সেই আবদুল্লার অবশ্য হেলদোল নেই। সে তখন এক মনে সুখবিলাসের দেওয়া মুদ্রা গুনছে। তবে যারা আবদুল্লাকে জানে, চেনে, তারা জানে এসব কথার কোনও প্রভাব তার ওপর পড়ে না। সে কম কথার মানুষ। সেই সুদূর আরব দেশ থেকে দু-তিন বছর বাদে বাদে ঘোড়ার পাল নিয়ে আসে সৌরাষ্ট্রের এই সদা ব্যস্ত বন্দর ভেরাবলে। তার মতো আরও অনেক বণিক আসে। ঘোড়া ছাড়াও নানান ধাতব দ্রব্য, মশলা ইত্যাদি নিয়ে বিদেশি বণিকরা আসে। তবে আর্যাবর্তের এই অঞ্চলে ঘোড়ার ব্যাবসা অত্যন্ত লাভজনক। অনেক বিদেশি বণিক এখানে বাড়িঘর তৈরি করে থেকে গেছে, এ দেশের জনগোষ্ঠীতে মিশে গেছে। তারা এখান থেকেই বাণিজ্যে যায়, জিনিসপত্র কিনে নিয়ে এসে আবার এখানেই বিক্রি করে। বন্দরে বড়ো বড়ো জাহাজ ভিড়লেই মানুষের ভিড়ও শুরু হয়ে যায়। বণিকরা তাঁবু তৈরি করে বন্দরের সংলগ্ন অঞ্চলে বাস করে। জিনিসপত্র বিক্রিও সেখানেই নয়। বলতে গেলে বাজার বসে যায়। কতরকমের কতকিছু যে সেখানে পাওয়া যায়! এক ঘোড়ারই কত যে রকমফের! তবে ঘোড়া নিয়ে আসে যারা সেই বণিকদের বড়ো খোলামেলা জায়গার সন্ধান করতে হয়, নাহলে ঘোড়ার আগড় তৈরি হবে কী করে? একটা দুটো তো আর নয়, শয়ে শয়ে ঘোড়া সেখানে থাকে। এই বণিকরা অনেকদিন থাকে, অনেকসময় সব ঘোড়া ভেরাবলে বিক্রি না হলে বাকিগুলোকে নিয়ে দেশের অন্যান্য জায়গাতেও যায়।

তবে আবদুল্লা এরকম নয়। দু-তিন বছর অন্তর সে আসে ভেরাবলে, নিজের ঘোড়ার পাল জাহাজ থেকে নামায়, নিজের যা কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনে, তারপর ফিরে যায় স্বদেশে। তার যেন বড়ো তাড়া। দু’দণ্ড কারুর সঙ্গে বসে দুটো কথা বলারও সময় নেই। সুখবিলাস তা বুঝেছিল বছর কয়েক আগেই। কয়েকজন বণিক ঘোড়া নিয়ে এসে বিক্রি করছিল, সুখবিলাস ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী তিনিও। ব্যাবসা আরও বাড়ানোর কথাই তখন তাঁর মনে ঘুরছিল। ভাবছিলেন, ভালো, তেজী কয়েকটা ঘোড়া কিনে রাখলে মন্দ হয় না। এই বণিকরা তো আর সারাবছর থাকবে না, ঘোড়ার চাহিদা তো সবসময়েই আছে। শুধু রাজা-মহারাজা তো নয়, সম্ভ্রান্ত লোক মাত্রেরই ঘোড়া থাকে। তাঁর আস্তাবলে যদি কিছু ভালো ঘোড়া থাকে ক্ষতি কী? দেখতে দেখতে বিক্রি হয়ে যাবে। এদের ঘোড়ার দাম বড়ো বেশি। সুখবিলাসও দরদস্তুর করছিলেন। এমন সময় আবদুল্লার সঙ্গে দেখা। জানা গেল সেও ঘোড়া নিয়েই এসেছে। সুখবিলাসকে নিয়ে দরজা ঠেলে আগড়ে ঢুকল আবদুল্লা। সুখবিলাসের তো চক্ষুস্থির! এইরকম ঘোড়া! দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে সব ঘোড়াই অতি উৎকৃষ্ট মানের। অত্যন্ত বুদ্ধিমানও, প্রভুর ইশারায় কাজ করে। রঙও যে তাদের কতরকম! কোনওটা ধবধবে সাদা, কোনওটা কুচকুচে কালো, কোনওটা সাদায় কালোয়, কোনওটা পাটকিলে, কোনওটা আবার গাঢ় বাদামি রঙের। আর কোথাও যাননি সুখবিলাস, আর কিছু ভাবেনওনি। বেশ কিছু ঘোড়া আবদুল্লার কাছ থেকেই কিনে ফেলেছিলেন। এ আবার আরও দাম চড়িয়ে রেখেছিল। তবে সুখবিলাসের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী মন বলেছিল যে তিনি লাভ করবেন আরও বেশি। হয়েওছিল তাই। পরে তো সুখবিলাসের আস্তাবলেই লোকের ভিড় বাড়তে লাগল। সেই শুরু। এখন তো আবদুল্লা যত ঘোড়াই নিয়ে আসে সব সুখবিলাসই কিনে নেন। আবদুল্লারও সুবিধে হয়েছে। ঘোড়া নামিয়ে সে সোজা সুখবিলাসের কাছেই পাঠিয়ে দেয়। আলাদা করে আর নিজেকে ঘোড়ার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয় না। তারপর নিজের পাওনাগণ্ডা বুঝে নিয়ে, যা কেনার তা কিনে নিয়ে আবার জাহাজ ছেড়ে দেয়। আর সুখবিলাস? তিনিও আজকাল শুধু সৌরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়ার ভরসায় বসে থাকেন না। পাড়ি দেন দেশের অন্যান্য বড়ো বড়ো নগরে। সেসব জায়গায় এই ঘোড়ার কী কদর তা তিনি একবার গিয়েই বুঝে গেছেন। গোটা আর্যাবর্তের মানুষ তো আর এই ভেরাবলে আসছে না ঘোড়া কিনতে! ভরসা তো এই সুখবিলাসের মতো ব্যবসায়ীরাই। কাজেই তাঁর লক্ষ্মীলাভ ঠেকায় কে!

মুদ্রা গুনে আবদুল্লা মাথা হেলাল, অর্থাৎ সব ঠিক আছে।

“আমার কথাটা তো কানেই তুললে না। ভালো মনে দুটো সুপরামর্শ দিলাম, শুনলে তোমার উপকার বৈ অপকার হত না। তা এখন তোমার মর্জি। আবার তো আসবে বোধহয় সেই তিন বচ্ছর বাদে। বেশ। ওরে, হাঁ করে দাঁড়িয়ে সব কী গিলছিস? নে নে, এগুলোকে নিয়ে চল। সব যেন একেকটা কুঁড়ের বাদশা। দেখছিস আমার এখন দম ফেলার ফুরসত নেই, আর তোদের হাত-পা তো চলছেই না! চল চল।” সুখবিলাস ঘোড়া নিয়ে বকবক করতে করতে চললেন। তার নিজের বাড়িতে এখন বিশাল আস্তাবল। তিন-চারশো ঘোড়া থাকার মতো ব্যবস্থা আছে সেখানে। এই ঘোড়ার দেখাশোনা করার জন্যেই কি কম লোকজন রাখতে হয়!

অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বর্ষা এদিকে খুব বেশি হয়েছে। বন্যা অবধি হয়েছে কোনও কোনও জায়গায়। তবে এখন অবস্থা ভালো, জল নেমে গেছে। সুখবিলাসের তাই আর দেরি করার মোটেও ইচ্ছে নেই। এইবেলা বেরিয়ে পড়তে পারলেই ভালো। গৌড়েও যেতে হবে। সে কি এখানে! ওদিক থেকে কিছু উৎকৃষ্ট মসলিন কিনে আনার ইচ্ছে আছে এবার। যাওয়ার যখন সব স্থির, দিনক্ষণ, বড়ো ছেলে ছাড়া আর কে কে সঙ্গে যাবে—সেসব কিছু, তখন হঠাৎ সুখবিলাসের বুড়ি মা খুনখুনে গলায় বললেন, “যাওয়ার আগে এদিককার একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে যা, বাবা!”

“এদিককার ব্যবস্থা? এদিককার আবার কী ব্যবস্থা?” সুখবিলাস কাজ করছিলেন। মার কথায় মুখ তুলে তাকালেন।

“গাঁ থেকে যে সব তীর্থ করতে আসছে, বাবা। বর্ষার জন্যে এতদিন আসতে পারেনি। এই পূর্ণিমার দিন তো তাদের যাত্রা করার কথা। পথঘাটের অবস্থা তো জানিস, কাউকে না পাঠালে তারা আসবে কেমন করে? বড়োটাকে তো তুই নিয়ে যাচ্ছিস, তাহলে বলতাম তাকেই পাঠা।” মা বললেন।

“না নিয়ে গেলে হবে? এইবেলা সব দেখিয়ে শুনিয়ে দিতে হবে না? ওর মতো বয়সে আমি একা কতদূরে গেছি বাণিজ্য করতে! ভুলে গেলে সেসব কথা?” সুখবিলাস মুখে বললেন বটে তবে চিন্তাতেও পড়লেন। ভুলেই গেছিলেন যে সুদূর গ্রাম থকে বেশ কয়েকজন আসছেন সোমনাথ দর্শনে। আর এই এক ঝামেলা তাঁদের কম পোহাতে হয় না! যবে থেকে প্রভাস তীর্থের লাগোয়া এই বন্দর নগর ভেরাবলে পাকাপোক্তভাবে বসবাস শুরু করেছেন, তবে থেকেই গ্রাম থেকে কেউ সোমনাথ দর্শনে এলে দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হয়। লোক পাঠাতে হয়, এখান থেকে সেই কতটা উজিয়ে গিয়ে তাদের নিয়ে সোমনাথের মন্দিরে পৌঁছে দিতে হয়। পথঘাট ভালো নয়, তীর্থযাত্রীদের ওপর লুটতরাজ চলে হরদম। এদিককার ছোটো ছোটো রাজার সেনারাও কম উৎপাত করে না। সুখবিলাসের গ্রাম থেকে সোমনাথে আসার পথে বেশ কিছুটা অঞ্চল ঘন বন। লুঠপাটটা ওই অঞ্চলেই বেশি হয়। গ্রামের লোকেরা দল বেঁধে আসে, কিন্তু সশস্ত্র লুঠেরাদের আটকানোর ক্ষমতা নেই। যারা পারে তারা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা সঙ্গে করেই আসে। যারা পারে না তাদের মহাদেব ভরসা আর সুখবিলাসের মতো আত্মীয় থাকলে সে লোক পাঠিয়ে দেয়। তবে ইদানীং এসব বন্ধ হয়েছে। চালুক্যরাজ কুমারপালদেব তাঁর সেনাদের আদেশ দিয়েছেন তীর্থযাত্রীদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করতে। তবে তাতেও সুখবিলাসের ঝক্কি কিছু কমে না। লোক তো তাঁকে পাঠাতেই হয়। আবার দেবদর্শন হয়ে গেলে তাদের বাড়িতেও নিয়ে আসতে হয়। তারা এত দূর থেকে এতখানি পথ হেঁটে এল, ক’দিন বিশ্রাম করে যাবে না? বিশ্রাম নেওয়া হলে আবার তাদের ফেরার ব্যবস্থা। তখন আর হেঁটে যাওয়ার ক্ষমতা অনেকেরই থাকে না। তাদের জন্যে গরুর গাড়ির ব্যবস্থা করতে হয়। যথেষ্ট অবস্থাপন্ন সুখবিলাস নিজের আত্মীয়স্বজন, পরিচিতিদের জন্যে এইটুকুও করতে পারবেন না? এতে তো পুণ্য তাঁরই হচ্ছে। মহাদেব প্রসন্ন হবেন, তাঁর কৃপায় সুখবিলাসের ব্যাবসা-বাণিজ্য আরও ফুলে ফেঁপে উঠবে—বিদায় নেওয়ার আগে আত্মীয়রা এরকমই আশীর্বাদ করে যান। সুখবিলাস তাই আর কিছু বলতে পারেন না। কিন্তু এবারে পড়লেন মুশকিলে। তাঁর সঙ্গে তো লোকজন কম যায় না। এখন এদের আনতে কাদের পাঠাবেন?

“বদ্রীকে বলে যাচ্ছি, ও যাবে’খন।” বলে তখনকার মতো রেহাই পেতে চাইলেন।

“এ তুই কী বললি, বাবা? ওই বদ্রী ছোঁড়াটা যাবে? ওই বখাটা? ও গেলে ঝামেলা আরও বাড়বে।” বুড়ি মা একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠলেন। “তাছাড়া ওই ম্লেচ্ছগুলোর সঙ্গে ওর নিত্যি ওঠা বসা। না না, ওকে পাঠালে হবে না। আমি তো ওটাকে বাড়ি থেকেই তাড়াতে বলি, কিন্তু তুই আমার কথাই শুনিস না!”

এবার বিরক্ত হলেন সুখবিলাস। “কী যে বলো না মা, তার ঠিক নেই। নিত্যি ওঠা বসা কিছু নয়। তাছাড়া আমিও তো কম ম্লেচ্ছ-সংসর্গ করি না। এইসব ঘোড়া আসছে কার কাছ থেকে? তা বলে আমিও খারাপ হয়ে যাব? ওসব আজেবাজে কথা মাথা থেকে তাড়াও। ওই বদ্রীই যাবে, সঙ্গে না হয় আরও দুয়েকজনকে নিয়ে যেতে বলব। এ-যাত্রা এর বেশি কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া এখন ওসব উপদ্রব নেই বললেই চলে। রাজার সৈনিক নজর রাখছে। তাই ওই বদ্রী গেলেই হবে। একজনের যাওয়াও হল, পথ চিনিয়ে নিয়েও আসতে পারবে। এই এক আমিই গাঁয়ের লোকজন আনতে লোক পাঠাই, অন্য কেউ করবে না।”

“আজেবাজে কথা আমি বলছি না বাছা, তুমিই বলছ! কার সঙ্গে কার তুলনা! মনিবের সঙ্গে চাকরের!” বুড়িমার মুখ ব্যাজার হল। “যা স্থির করেছ তার যে নড়চড় হবে না, এ আমি বেশ বুঝেছি। যাওয়ার আগে বদ্রীকে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে যেও।”

সংক্ষেপে একটা ‘হুঁ’ বলা ছাড়া আর সুখবিলাস কিছু বললেন না। এখন কাজ অনেক, বাজে কথায় সময় নষ্ট করলে চলবে না।

বদ্রীও সুখবিলাসের গ্রামেরই ছেলে। শহরে থাকবে, কাজকর্ম শিখবে, আস্তে আস্তে ভালো রোজগারপাতি করবে – এই আশায় তার বাবা সুখবিলাসের হাতে তাকে দিয়েছিল। প্রথম প্রথম এত বড়ো শহর দেখে সে খানিক থতমত খেয়েছিল। কিন্তু তারপরেই বোঝা গেল যে অতি চোখকান খোলা ছেলে সে, যা শেখানো হয় চটপট শিখেও ফেলে। দেখতে দেখতে বদ্রী ছাড়া আর কারুর চলত না। এখন তো প্রায় ষোলো বছরের হল। চেহারা দেখে মনে হয় আঠারো-কুড়ি বছরের জোয়ান। তবে এর মধ্যে একদিন আরও অনেক কিছু জানা গেল। দেখা গেল যে শুধু সুখবিলাসের কাছেই কাজকর্ম শিখেছে তা নয়। আরও অনেক কিছু শিখেছে। ঘোড়ায় চড়া শিখেছে, অস্ত্রশস্ত্রও যে চালাতে জানে না তা নয়।

এই তো খুব বেশি হলে পাঁচ-ছ’মাস আগে। বাড়ির এক চাকর দুপুরবেলা দৌড়তে দৌড়তে এসে খবর দিল, বাড়ি থেকে একটু দূরে ফাঁকা গায়গায় বদ্রী নাকি তির-ধনুক ছোড়া অভ্যেস করছে। সুখবিলাসের বিশ্বাস হয়নি। “দিনদুপুরে নেশা করেছিস?” বলে তেড়ে গেছিলেন তার দিকে। কিন্তু সেও কাঁদো কাঁদো মুখ করে যত ঠাকুরদেবতার নাম জানে সবার নামে প্রতিজ্ঞা করে বলল যা বলছে সব এক্কেবারে নির্জলা সত্যি কথা, একটু মিথ্যে নেই তাতে। বাধ্য হয়েই দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রাম ছেড়ে সুখবিলাসকে তার সঙ্গে যেতে হয়েছিল। দেখে সুখবিলাস নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেলেন। একমনে বদ্রী তির ছোড়া অভ্যেস করে যাচ্ছে। জানা গেল, ঘোড়াতেও নাকি চড়তে পারে। শিখল কখন এসব? কোথায়ই বা? বাড়িতে ঘোড়া অনেক আছে, কিন্তু সেসব ঘোড়ায় বাড়ির চাকর চড়ে ঘুরে বেড়াবে তা তো নয়। সুখবিলাস নিজের প্রয়োজনেই বদ্রীকে এদিক ওদিক নানা জায়গায় পাঠাতেন। নিজের গরজেও সে অনেক লোকের সঙ্গে আলাপ করেছিল। এমনকি আরবদেশের কয়েকজন বণিক যারা ভেরাবলেই স্থায়ীভাবে রয়ে গেছে তাদের সঙ্গেও বদ্রী পরিচিত।

সুখবিলাস তক্ষুনি তাকে ডেকে আনলেন। সংবাদদাতা চাকরটিও মহা উৎসাহে সঙ্গে সঙ্গে আসছিল। “এবার বুঝবে মজা, চাকর হয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে এত কিছু!” বদ্রীকে বলেছিল সে। বদ্রী অবহেলা ভরে তার দিকে একবার তাকিয়েছিল, উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।

জানা গেল এক সৈনিকের কাছে শিখেছে, নাম দ্বিজদাস, সে আগে চালুক্যরাজাদের সেনাবাহিনীতে ছিল। এই ভেরাবল-সোমনাথ অঞ্চলেই তার বাস। কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে তার কাছে গিয়ে শিখেছে, সুখবিলাসের জেরায় বলেছিল বদ্রী। এত লোক থাকতে সে বদ্রীকে এসব শেখাল কেন, এ প্রশ্নও সুখবিলাস করেছিলেন তবে জবাব পাননি। মুখ গোঁজ করে দাঁড়িয়ে ছিল বদ্রী। তবে বদ্রীর এই ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়াও ভালো লাগেনি ওঁর। ধমক-ধামক দিয়েছিলেন, বদ্রী চুপ করে শুনেছিল। আরও আশ্চর্য হয়েছিলেন জেনে যে আবদুল্লা, যে নাকি একটার বেশি দুটো কথা বলে না, সেও তাকে কী একখানা লাঠি এনে দিয়েছে! আবুদুল্লাকে সেকথা জিজ্ঞেস করবেন ভেবেও করেননি। কী দরকার, ওঁর সঙ্গে ব্যাবসার সম্পর্ক, সেটুকুই থাক। তবে দ্বিজদাসের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। একদিন বাজারে বদ্রীর সঙ্গে নাকি ওঁর দেখা হয়েছিল। বাজারে সেদিন তলোয়ার খেলা হচ্ছিল। বদ্রী খুব উৎসাহের সঙ্গে দেখছিল। একটা তলোয়ার নিয়ে নাকি নেড়েচেড়েও দেখেছিল। ওর এদিকে ঝোঁক আছে বুঝে দ্বিজদাস ওকে অস্ত্রচালনা শেখাতে চেয়েছিলেন। বদ্রী রাজি হয়নি। “পরের বাড়িতে কাজ করি আমি, কী করে শিখব? আর মালিককে বললে তো রাজিই হবে না।” কাঁচুমাচু মুখে বলেছিল সে।

অবশেষে ঠিক হয়েছিল, কাজের ফাঁকে ফাঁকে সময় সুযোগ করে শিখবে বদ্রী। যেদিন যতটুকু পারে ততটুকুই।

“এ আপনি উচিত কাজ করেননি। আমি ওর অন্নদাতা। আমাকে লুকিয়ে ওকে শেখানো আপনার কখনওই ঠিক হয়নি।” ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলেছিলেন সুখবিলাস।

“খুব অন্যায় কিছুও হয়নি।” সুখবিলাসের মুখের ওপরেই বলেছিলেন দ্বিজদাস, “বদ্রী কেমন ছেলে তা আমার থেকে ভালো আপনি জানেন। আপনার কোনও ক্ষতি ও কখনও করবে না। বাড়ির একটা চাকর যদি অস্ত্রশস্ত্র চালাতে জানে তো ক্ষতি কী? আপনি ব্যবসায়ী মানুষ, আপনারই বরং উপকারে লাগবে।”

এরপর থেকে বাড়ির অন্য চাকররাও সুযোগ পেলেই বদ্রীর নামে লাগাত, বিশেষ করে সুখবিলাসের মার কাছে। কিন্তু তেমন সুবিধে করে উঠতে পারেনি। সুখবিলাসের বুড়ি-মা অবশ্য সব শুনেই ওকে বিদেয় করতে বলেছিলেন। কিন্তু আগুপিছু না ভেবে দুম করে কোনও কাজ করার মানুষ সুখবিলাস নন, তাছাড়া দ্বিজদাসের কথাটাও ভাবার মতো। বদ্রী তাই রয়েই গেছে। ছেলেটা সত্যিই খুব বিশ্বাসী, পরিশ্রমী। তাছাড়া একটু আধটু অস্ত্রশস্ত্র চালানো বা ঘোড়ায় চড়া জানাটা কিছু গর্হিত অপরাধ নয়। দিনকাল মোটে ভালো নয়। কখন কোনটা কোন কাজে লাগে তা বলা যায়?

বদ্রী বলতে যে অজ্ঞান সে হল সুখবিলাসের মেজো ছেলে প্রভাস। বদ্রীদাদা ছাড়া তার চলে না। তাই যখন সে শুনল বদ্রী যাবে আত্মীয়স্বজনদের আনতে, সেও জেদ ধরে বসল যাবে বলে।

“এই জন্যেই বলি ছোঁড়াটাকে বাড়ি থেকে তাড়াতে। কী গুণতুক করেছে আমার প্রভাসকে কে জানে! কিন্তু বুড়ির কথা কে শোনে!” প্রভাসের ঠাকুমা তো প্রভাসের কথা শুনেই আঁতকে উঠল, “কী যে বলিস বাবা তুই, তার ঠিক নেই! তুই দুধের শিশু, তুই কিনা যাবি ওই ছোঁড়ার সঙ্গে! পথঘাট ভালো নয়, কখন কী বিপদ হয় তার ঠিক নেই। তাছাড়া তোর সঙ্গে ও থাকলেও আমার ভয় করে। কী একখানা চেহারা! মালিকের খেয়ে খেয়ে দিন কে দিন যেন একটা দৈত্য হচ্ছে!” বুড়ি ঠাকুমা শিউরে উঠলেন।

কিন্তু প্রভাস শুনলে তো! দুধের শিশু সে মোটেই নয়। বারো বছর হয়ে গেছে তার। ঠাকুমা যা খুশি বললেই হল নাকি! সে জেদ ধরে বসে রইল। অগত্যা তার মা-ঠাকুমাকে মত দিতেই হল। ঠাকুমা অবশ্য মানত করে বসলেন, নাতি ভালোয় ভালোয় ফিরে এলে সোমনাথকে সোনার বেলপাতা দেবেন।

সুখবিলাস বড়ো ছেলেকে নিয়ে, লোকলশকর নিয়ে, ঘোড়ার পাল নিয়ে বাণিজ্য করতে যাত্রা করলেন। তার পরের দিন বদ্রীও প্রভাসকে নিয়ে রওনা দিল। ওই বনের পথটাই যা ভয়ের। ওইখানে এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে। গ্রাম থেকে তাদেরও এসে পড়ার কথা। এসে গেলে ভালোই, বদ্রী তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসবে। তারা না পৌঁছলে অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। সকাল সকাল বেরিয়েছে। পথে এক জায়গায় রাতটুকু কাটাবে, তারপর আবার সূর্য উঠলেই হাঁটা লাগাবে। লোকজনকে নিয়ে দিনে দিনে ওই পথটুকু পার করে ফেলতে পারলেই মঙ্গল।

প্রভাস খুব খুশি। তার এই বারো বছরের জীবনে এরকম এতখানি পথ হেঁটে হেঁটে সে কখনও কোথাও যায়নি। তাও আবার শুধু সে আর বদ্রী। এ যাওয়ার আনন্দই আলাদা! যাওয়ার মধ্যে তো গেছে প্রভাস তীর্থে মহাদেবের মন্দিরে। তার ঠাকুমা সেখানে মাঝেমাঝেই যান। একবার তীর্থ করে এসে বাড়ি ফিরে দেখলেন নাতি হয়েছে, উনি তার নাম দিলেন প্রভাস। একথা যে কতবার ঠাকুমার মুখে, মার মুখে শুনেছে প্রভাস তার ঠিক নেই।

বদ্রী প্রভাসের হাতে একখানা লাঠি ধরিয়ে দিয়েছে, লাঠিটার মাথা আবার লোহা দিয়ে বাঁধানো। “পারবে তো এটা নিয়ে হাঁটতে?” বদ্রী জিজ্ঞেস করেছে।

প্রভাস তো ঘাড় কাত করেছে। এরকম একখানা লাঠি হাতে পেয়েই নিজেকে কীরকম বড়ো বড়ো মনে হচ্ছে, আর হাঁটতে পারবে না! বদ্রীর নিজের কাঁধে একখানা পুঁটলি আর হাতে তির-ধনুক।

“বাবা যে বললেন এখন আর চোর-ডাকাতের উপদ্রব নেই, তীর্থযাত্রীদের ওপর আর কেউ হামলা করে না, তাহলে এসব নিয়ে যাচ্ছে কেন বদ্রীদাদা?” প্রভাস জিজ্ঞেস না করে পারেনি।

“মহারাজ কুমারপালদেব একজন সেনাপতি আর কিছু সেনাকে পাঠিয়েছেন ডাকাতদের দমন করতে, তবে একেবারেই কি আর সব বন্ধ হয়েছে? যারা লুঠতরাজ করে তারাও কি আর এত সহজে থামবে? তীর্থযাত্রীদের কাছে কত সোনাদানা, মুদ্রা থাকে জানো? সেইসবের লোভেই করে। তাছাড়া রাজায় রাজায় বিরোধও তো কম নয়। তবে মহারাজের সঙ্গে পারবে না।” বলল বদ্রী।

প্রভাসের মনে হল, বদ্রী অনেক কিছু জানে। চাকরবাকর বলে ঠাকুমা ওকে যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করুন না কেন, ও বাড়ির অন্য কাজের লোকদের মতো নয়।

ভেরাবলের সীমা ছাড়িয়ে একটু এগিয়েছে ওরা তখন। দেখল, পথের ধারে একটা বড়ো গাছের নিচে একজন দাঁড়িয়ে। বদ্রী প্রভাসকে, “তুমি এখানে দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি আসছি” বলে এক দৌড়ে লোকটার কাছে চলে গেল।

প্রভাস অবাক হয়ে দেখল, বদ্রী লোকটার কাছে গিয়ে তাকে প্রণাম করল, কথা বলল। তারপর লোকটাও চলে গেল, বদ্রীও প্রভাসের কাছে ফিরে এল।

“ও কে?” প্রভাস জিজ্ঞেস করল।

“উনিই আমাকে ঘোড়ায় চড়া, অস্ত্রচালনা এসব শিখিয়েছেন। এই যে এখন আমি তির ছুড়তে পারি, তলোয়ারও মোটামুটি চালাতে পারি তা সবই ওঁর জন্যে। উনি না থাকলে এসব কিছুই হত না।” বদ্রী বলল।

“ও, উনি তার মানে সেই রাজার সৈনিক?” বলল প্রভাস। ওও তো শুনেছিল তখন সব।

“হ্যাঁ। তবে উনি কী বললেন জানো?” বদ্রী বেশ চিন্তিত।

“কী?”

“বললেন, আবার লুঠতরাজ শুরু হয়েছে। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আসাটা বোধহয় উচিত হয়নি। তোমাকে আমি বরং বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি…”

বদ্রীর কথা শেষ হল না। প্রভাস প্রবল আপত্তি জানিয়ে উঠল। “না না, কক্ষনও নয়। আমি ফিরে যাব না, যাব না, যাব না। ফিরলে একসঙ্গে দু’জনেই ফিরব।”

“কিন্তু…”

“কিচ্ছু হবে না। আমি জানি তুমি থাকতে আমার কোনও ক্ষতি কেউ করতে পারবে না।” দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে বলল প্রভাস।

বদ্রী তাকাল ওর দিকে। বাড়ির এতগুলো লোকের মধ্যে এই একটা ছেলে যে ওকে কী চোখে দেখেছে! না, সুখবিলাস যে ওকে সবসময় বকছেন বা কিছু করছেন তা নয়, ওকে বিশ্বাসও করেন, কিন্তু সে একজন চাকরকে যতটুকু করা যায় ততটুকুই, তার বেশি কিচ্ছু নয়। ওঁর স্ত্রীও গ্রামের ছেলে বলে মাঝেমধ্যে যে দুটো ভালো কথা বলেন না তা নয়, তবে প্রভাসের ঠাকুমা আর প্রভাসের বড়ো দাদা ওকে দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। ওদের ভয়, বদ্রী সুযোগ পেলেই নাকি একদিন ওদের মেরেধরে সব কেড়েকুড়ে নিয়ে চলে যাবে! শুনে বদ্রী হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায় না। একেক সময় বদ্রী ভেবেছে চলে যাবে এখান থেকে, কিন্তু শেষ অবধি আর যেতে পারেনি। তারা গরিব মানুষ, দরকারের সময় সুখবিলাস তাদের সাহায্য করেছেন। নিজের গাঁয়ের গরিব মানুষদের তিনি সাহায্য করেন, এ সহৃদয়তাটুকু তাঁর আছে। বদ্রীকে কাজ দিয়েছেন। এসব কিছু ভুলে বদ্রী চলে যেতে পারে না। ভাবে আর কিছুদিন যাক, তারপর দেখা যাবে। তবে প্রভাসের ওপর ওরও যে মায়া পড়ে গেছে সেকথাও অস্বীকার করতে পারে না। বাপ, মা, ভাই, বোনকে ছেড়ে এতদূরে এসে থাকে, প্রভাসকে দেখলে নিজের ভাইদুটোর কথা মনে পড়ে। তারাও এরকম ওর সঙ্গে সঙ্গে ঘুরত। যেবার সুখবিলাসের সঙ্গে ভেরাবলে চলে এল, সে কী কান্না ওদের!

“তবে সাবধানে পথ চলো, চোখকান খোলা রেখ, বুঝলে? আর মনে রেখ, বিপদে বুদ্ধি আর সাহসই ভরসা।” বদ্রী বলল প্রভাসকে।

প্রভাসও লক্ষ্মীছেলের মতো ঘাড় হেলাল।

দেখতে দেখতে অনেকটা পথ ওরা হেঁটে পার করে ফেলল। সূর্যও ডুবব ডুবব করছে। প্রভাস ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এই প্রথম এতটা পথ একনাগাড়ে হাঁটল। আর হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে বকবকও কি কিছু কম করেছে নাকি? কত যে প্রশ্ন তার! উত্তর দিতে দিতে একেক সময় বদ্রীই কাহিল হয়ে পড়ছিল। এবার রাতের আশ্রয় খোঁজা দরকার। এদিকে দু-চারটে সরাইখানা আছে, পথচলতি লোক রাতে সেখানেই আশ্রয় নেয়। কিন্তু সঙ্গে প্রভাস আছে, তাই বদ্রী সরাইখানার দিকে গেল না। এ-পথ দিয়ে সেও গ্রামে তার বাড়িতে যায়, তাই অনেক কিছুই চেনা। তাছাড়া সুখবিলাসের পরিচিত কিছু কম নয়। বদ্রী প্রভাসকে নিয়ে এক গৃহস্থের বাড়িতে উঠল।

“বলি শ্রেষ্ঠীর আক্কেলখানা কী? তোমাকে পাঠিয়েছে? সঙ্গে আবার এইটুকু একটা ছেলে? দু-চারটে পাইক হলেও না হয় হত। আবার যে লুঠতরাজ শুরু হয়েছে! এই তো কিছুক্ষণ আগে একদল তীর্থযাত্রী এল, তাদের সর্বস্ব লুঠ করেছে। বাধা দিতে গেছিল বলে দু’জনকে যা জখম করেছে, এখন বাঁচে কি না দেখো! তার মধ্যে তুমি এই পুঁচকে ছেলেটাকে নিয়ে যাচ্ছ! শুনলাম নাকি পথ ভুলিয়ে নিয়ে গিয়ে লুঠ করেছে। রাজার সেনার ভয়ে পথের ওপরে আর লুঠ করতে পারছে না, তারা টহল দিচ্ছে কিনা।” সব শুনে বয়স্ক গৃহস্বামী বললেন। তিনি বদ্রীকে চেনেন। গেল বর্ষায় যখন বাড়ি থেকে ফিরছিল বদ্রী, তখন এঁর বাড়িতেই রাতটুকু কাটিয়েছিল।

“বেরিয়ে যখন পড়েছি তখন তো আর না গিয়ে উপায় নেই।” গম্ভীর মুখে বদ্রী বলল।

“তুমি যাও না হয়, ছেলেটাকে আমার কাছে রেখে যাও। ওকে নিয়ে গিয়ে বিপদে পড়বে নাকি?”

শুনেই প্রভাস বদ্রীর কাছে ঘেঁষটে ওর হাতটা আঁকড়ে ধরল। গৃহস্বামী আর কিছু বললেন না। যা বোঝার বুঝে গেলেন।

“রাতটুকু কাটিয়ে সূর্য উঠতে না উঠতেই আবার বেরিয়ে পড়তে হবে কিন্তু। যা বুঝছি অবস্থা ভালো নয়। আমি তোমাকে বাড়িতে রেখে আসতে চেয়েছিলাম, তুমি কথা শুনলে না। শুনলেই ভালো করতে।” বদ্রী বলল প্রভাসকে।

প্রভাস ক্লান্ত ছিল। খেয়েদেয়ে সে শোয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু বদ্রীর আর ঘুম এল না। কীভাবে তীর্থযাত্রীদের নিয়ে, প্রভাসকে নিয়ে সে নিরাপদে আবার ভেরাবলে ফিরে আসবে সেই চিন্তাই তার মাথায় ঘুরতে লাগল। প্রভাসের এত ভরসা, বিশ্বাস তার ওপর, সেই ভরসা, বিশ্বাস যেন এতটুকু নষ্ট না নয়। না, হবে না। বদ্রী তা হতে দেবে না। কোনও মূল্যেই নয়। নিজের প্রাণের বিনিময়েও সে সবাইকে রক্ষা করবে।

এবার পথ বনের ধারে ধারে। কোথাও দু-চার ঘর লোকবসতি আছে, কোথাও তাও নেই, পথের দু’পাশে ঘন বন। শাল, সেগুন, আম, মেহগনিগাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে।

“এই বনে সিংহ আছে, তাই না?” প্রভাস খুব উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“আছে তো।” বদ্রীর উত্তর, “এবার বর্ষায় যখন বাড়ি যাচ্ছিলাম তখন কী হয়েছিল জানো?”

বদ্রী সে গল্প বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বলল না। সামনে দু’জন গরু-মোষের পাল নিয়ে আসছে। তার মধ্যে একজন বেশ বুড়ো, কুঁজো হয়ে চলছে। আর কিছুটা এগোলেই সেই জায়গায় পৌঁছে যাবে বদ্রীরা যেখানে গ্রাম থেকে আসা তীর্থযাত্রীদের অপেক্ষা করার কথা। বহুকালের পুরনো একখানা ভাঙা হাভেলি আছে এ-পথের ওপরেই। তীর্থযাত্রীরা সেখানেই অপেক্ষা করে। এদের জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবে কাউকে ওখানে অপেক্ষা করতে দেখেছে কি না। এরাও তো ওইদিক থেকেই আসছে।

লোকদুটো কাছে আসতে বদ্রী জিজ্ঞেস করল সেকথাই।

“ভাঙা হাভেলির সামনে বসেছিল তো। একটা লোক এল, বলল, সোজা এই পথ ধরে গেলে অনেকখানি হাঁটতে হবে। মাথার ওপর রোদও চড়া, কষ্ট হবে। বনের ভেতর দিয়ে ছায়ায় ছায়ায় গেলে তাড়াতড়িও হবে, কষ্টও কম। সে নাকি পথ চেনে। শুনে তারা তার সঙ্গে চলে গেল।” বুড়ো লোকটা বলল।

“চলে গেল! কোথায় চলে গেল?” বদ্রী আবার জিজ্ঞেস করল।

“কোথায় আবার যাবে? বনের ভেতরে চলে গেল। তোমার কি বুদ্ধিশুদ্ধি নেই নাকি?” লোকটা খুব বিরক্ত।

বদ্রী বুঝল, যা ভয় পাচ্ছিল তাই ঘটেছে। বনের ভেতর দিয়ে সোমনাথে পৌঁছনো কোনও সংক্ষিপ্ত পথ নেই বদ্রী ভালো করেই জানে। এদিককার পথঘাট তার ভালো চেনা। এ নিশ্চয়ই লুঠেরাদের কাজ। বদ্রী বুঝল, ওকে এখনই বনের মধ্যে ঢুকতে হবে। নিজের জন্যে ওর ভয় নেই, ভয় প্রভাসকে নিয়ে।

“ভাঙা হাভেলির ওদিক দিয়ে বনে ঢুকল?”

“এককথা কতবার বলব, বলো তো? ওইখানেই তো সবাই বসেছিল। ভাঙা হাভেলির পাশ দিয়েই ঢুকে গেল। ওদিকে যা ঘন বন, অতগুলো লোকজন যেন বনের ভেতরেই হারিয়ে গেল। তবে তোমার এত চিন্তা করার কিছু নেই। যে নিয়ে গেছে সে বেশ হাট্টাকাট্টা জোয়ান, বিপদ এলে রুখতে পারবে।” বুড়ো বলল।

“এ-পথ দিয়ে যদি রাজার সেনা যেতে দেখো, তাদের ওইদিকে পাঠিয়ে দিও, ভাঙা হাভেলির ওদিকে।” বদ্রী বলল। বলে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না, ছুটতে শুরু করল। পেছন পেছন প্রভাস।

“নিজে যেন একেবারে মহারাজা এলেন! হুকুম দিয়ে চলে গেলেন!” মুখটাকে প্যাঁচার মতো করে বলল বুড়ো। তারপর আবার ‘হেঁই হেঁই, হ্যাট, হ্যাট, চল, চল’ করতে করতে গরু-মোষের পাল নিয়ে চলল।

“ওই লোকটা কে? ডাকাত?” ছুটতে ছুটতে প্রভাস জিজ্ঞেস করল।

“জানি না, হতেও পারে। তুমি ভয় পেয়ো না যেন।” বদ্রীও ছুটতে ছুটতেই উত্তর দিল।

পনেরো জনের এই তীর্থযাত্রীদের দলটায় বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যাই বেশি। অল্পবয়সী পুরুষ মানুষ নাকি মাত্র দু’জন, বদ্রী শুনেছে। সে মনে মনে ভেবেও নিয়েছে কী করবে। বনের ভেতর প্রভাসকে ঢুকতে তো হবে, তবে গাছের আড়াল আবডাল দিয়ে। বনের মধ্যে লুঠেরার দলে ক’জন আছে তা তো আর ও জানে না। এখন প্রভাস ভয় না পেলেই হল।

“না না, আমি একদম ভয় পাইনি, তুমি কিচ্ছু ভেবো না।” প্রভাস বলল। যদিও ভয়ে ওর বুক ধুকপুক করছে। কিন্তু সেকথা তো আর মুখে প্রকাশ করা যায় না।

ভাঙা হাভেলির সামনে এসে কাউকে দেখতে পেল না বদ্রী। দিনের বেলা হলেও জায়গাটা যেন বড়ো বেশি নিঝুম। অন্যদিন দুয়েকজন স্থানীয় লোকজনও ভাঙা হাভেলির সিঁড়িতে বসে থাকে, বা গরুবাছুর চরতে দিয়ে গাছের তলায় ছায়ায় শুয়ে থাকে। আজ কেউ নেই।

“এবার আমরা বনে ঢুকব। কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে যাতে আমাদের কেউ না দেখতে পায়। কোনও আওয়াজ কোরো না, বুঝলে?” বদ্রী প্রভাসকে বলল।

প্রভাসের গলা শুকিয়ে কাঠ। কোনঅরকম ঢোঁক গিলে বলল, “পা টিপে টিপে খুব সাবধানে যাব, তাই তো? বুঝেছি। তুমি বনের ভেতরে পথ চেনো?”

“চিনি। আমি ঢুকেছি বনের ভেতর, বাড়িতে যাওয়া আসার পথে। এই সামনে দিয়ে কিছুদূর গেলে একটা পোড়ো মন্দির আছে। আগে নাকি ওখানে শিবলিঙ্গ ছিল, পুজো হত রোজ। এখন আর কিচ্ছু নেই। একটা বিড়োগাছ মন্দিরের দেওয়াল ফাটিয়ে, চুড়ো ফাটিয়ে উঠে গেছে। এবার আমার পেছন পেছন এসো, সাবধানে।”

কাঁধের ছোটো পুঁটলিটায় খাবার ছিল, সেটাকে একটা গাছের ডালে পাতার আড়ালে বেঁধে রাখল বদ্রী। তারপর ঢুকে পড়ল বনের গভীরে। তির-ধনুক হাতেই রইল।

কিছুদূর এগোতেই লোকজনের কথাবার্তার আওয়াজ কানে এল ওদের, চাপা কান্নারও। বদ্রীর সমস্ত স্নায়ু টানটান হল। দ্বিজদাস ওকে অস্ত্রশিক্ষা দিতে দিতে এরকম পরিস্থিতির কথা বলেছেন। এই সময় কী করণীয় সেও বলেছেন। কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতে ওর পড়া এই প্রথম। তবে বিপদও কি আর বলে কয়ে আসে? হঠাৎ এলেও সর্বশক্তি দিয়ে তার মোকাবিলা করতেই হয়। তাছাড়া এরকম কিছু যে হতে পারে তার ইঙ্গিত তো ও গতকালই পেয়েছিল। প্রভাসের দিকে দেখল ও। বেচারার মুখ শুকিয়ে এই এতটুকু। বদ্রী চোখের ইশারায় ওকে ভয় পেতে বারণ করল। তারপর আবার এগোতে লাগল। এদিকটায় বেশ বড়ো বড়ো ঝোপ, তার আড়াল দিয়ে দিয়েই চলা। ওই তো পোড়ো মন্দির দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার সামনে? যা দেখল তাতে প্রভাসের রক্ত হিম হয়ে গেল। বেশ কয়েকজন লোক একজায়গায় গুটিসুটি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, ভয়ে কাঁপছে। দু’জন মহিলা মাটিতে বসে পড়ে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছে। বোঝাই যাচ্ছে, এরাই তীর্থ করতে গ্রাম থেকে এসেছে। এদের সামনে চারজন সশস্ত্র লোক। তার মধ্যে একজন তীর্থযাত্রীদের দলের এক পুরুষের গায়ে তলোয়ার ঠেকিয়ে রেখেছে; দ্বিতীয়জন খোলা তলোয়ার নিয়ে পাহারা দিচ্ছে। তৃতীয় এবং চতুর্থজন অসহায় মানুষগুলোর কাছ থেকে সব কেড়েকুড়ে নিয়ে একজায়গায় জড়ো করে পুঁটলি বাঁধছে। চারটে ঘোড়া কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।

কী করতে হবে ভেবে নিয়েছিল বদ্রী। আর দেরি না করে ছুড়ল তির। প্রথম তির গিয়ে লাগল প্রথম লোকটার গলার পাশে। বিকট আর্তনাদ করে সে বসে পড়ল। হাত থেকে তলোয়ার গেল পড়ে। বদ্রী আশা করেছিল এই সুযোগে তীর্থযাত্রীর দলের লোকটা তলোয়ারটা তুলে নেবে। কিন্তু সে এসব কিছুই না করে পড়ি কি মরি করে দৌড় লাগাল নিজের সহযাত্রীদের কথা না ভেবেই। ততক্ষণে বদ্রীর তির আরও একজনকে জখম করেছে। তীর্থযাত্রীরা এই সুযোগে ঠেলাঠেলি করে যে যেদিকে পারল দৌড়ল। কেউই নিজের ছাড়া অন্যদের কথা ভাবছে না। বদ্রীর দেখে খুব আশ্চর্য লাগল। মানুষ এরকম করে কেন? বিপদের মুখে অন্যদের রেখে পালায় কেন? এ তো কাপুরষতা! লুঠেরারাও নিজেদের কাজ গুছিয়ে নিয়েছে ততক্ষণে। লুঠের সম্পত্তি পুঁটলি বেঁধে একজন দাঁড়িয়ে, অন্য হাতে তার খোলা তলোয়ার। এক চিৎকারে তীর্থযাত্রীদের বাকি লোকেদের একজায়গায় দাঁড় করাল। তার ওই চেঁচানি শুনেই গ্রামের লোকেদের হাঁটু আবার ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। অন্য দু’জন বদ্রীদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তাদের আক্রমণ করার সাহস কে করল বোধহয় সেই দেখতেই। এই দু’জনের মধ্যে একজন ভালোই জখম। বদ্রীর মনে হল, এই দু’জন ওর পক্ষে তেমন বিপজ্জনক কিছু হবে না।

“তুমি এখানেই লুকিয়ে থাকো, বেরিও না। আমি যাচ্ছি।” ফিসফিস করে প্রভাসকে বলে বদ্রী এক লাফে বাইরে বেরিয়ে একজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। টাল সামলাতে না পেরে সে পড়ল মাটিতে। বদ্রী তার তলোয়ার কেড়ে নিয়ে সব উঠে দাঁড়িয়েছে, এমন সময় পেছন থেকে একটা আকুল কন্ঠের আওয়াজ ভেসে এল, “ও বদ্রীদাদা!”

বদ্রী চমকে পেছন ফিরল। প্রভাস! ওই জখম লোকটা প্রভাসকে কবজা করে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে। তার হাতের তলোয়ার প্রভাসের গলা ছুঁয়ে, মুখে নিষ্ঠুর হাসি, যে হাসির ভাষা বোধগম্য হতে বদ্রীর একটুও বিলম্ব হল না। ও কিছু করার চেষ্টা করলেই লোকটার তলোয়ার প্রভাসের কন্ঠনালি ছিন্নভিন্ন করবে। হে ভগবান, এ কী হল! এখন তো অস্ত্র ত্যাগ করা ছাড়া কোনও উপায় নেই। তাতেও কি ওরা বদ্রী আর প্রভাসকে রেহাই দেবে? ওদের ওপর আক্রমণ করার স্পর্ধা দেখিয়েছে যে বদ্রী! বদ্রীর হাত থেকে তির-ধনুক পড়ে গেল। ওদের অবস্থা দেখে লোক তিনটে অট্টহাসি হেসে উঠল।

প্রভাস আর বদ্রীকে নিয়ে ওরা ঘোড়াগুলোর কাছে গেল। যেতে যেতে এক ঝলক দেখে বদ্রী বুঝল, ওর তিরের আঘাতে একজন মরেছে। বদ্রীদের প্রাণে বাঁচার আর বোধহয় আশা নেই। লোকগুলোর ভাবভঙ্গীও বলছে, এবার তলোয়ারের একেক কোপে বদ্রী আর প্রভাসকে মেরে ঘোড়া ছুটিয়ে ওরা চলে যাবে।

ওদিকের পোড়ো মন্দিরের আড়াল থেকে একটা রক্ত জল করা হুঙ্কার ভেসে এল। শুধু হুঙ্কার নয়, সে নিজেও এক লাফে সামনে এল। ঘোড়াগুলো চঞ্চল হয়ে উঠল। লোকগুলোও আর দেরি করল না। বদ্রী আর প্রভাসকে ছেড়ে ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়ল, আর ঘোড়াও ছুটল তিরবেগে। যে এসেছিল সে এদিক ওদিক একবার মাথা ঘোরাল। যেন অবস্থাটা ভালো করে বুঝল, তারপর ধীর পায়ে চলে গেল। যেমন আচমকা বনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল, তেমন আবার বনের গভীরে মিলিয়েও গেল। বিশালাকায় এক সিংহী। বদ্রী ছাড়া বাকি সকলের তখন অবর্ণনীয় অবস্থা। একে সশস্ত্র লুঠেরা, তার ওপর আবার বনের হিংস্র সিংহী! তিনটে লোক তিনটে ঘোড়া নিয়ে চলে গেছে। যে লোকটা মরেছে তার ঘোড়াটা এখনও রয়েছে। বদ্রীর এক লাফে সেটার পিঠে চড়ে বসল। ডাকাতগুলো সবকিছু লুট করে নিয়ে পালিয়েছে। এখনও গেলে ওদের ধরা যেতে পারে। বদ্রীর রক্তে তখন পিছু ধাওয়ার নেশা, লুঠের সম্পত্তি উদ্ধারের নেশা। আর কিছু না ভেবে সেও ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। অবশ্য যাওয়ার আগে প্রভাসকে বলল, “বন থেকে এদের নিয়ে বেরিয়ে যাও। যে পথ দিয়ে এসেছি সেই পথ দিয়েই ফিরে যাও। এখন ও-পথে কিছু হবে না, কারুর কথা শুনো না, যাও।”

প্রভাস এতক্ষণ ভয়ে এতটুকু হয়ে ছিল। কিন্তু এখন ওর সাহস ফিরে এল। বদ্রী এত বড়ো দায়িত্ব দিয়ে গেছে ওকে, ভয় পেলে চলে কখনও? যারা পালিয়েছিল তারা এবার গুটিগুটি ফিরে এসেছে।

“ওই ছেলেটা আমাদের ফেলে চলে গেল কেন? ওও কি ডাকাত নাকি? যেরকম করে ঘোড়া ছুটিয়ে গেল, দেখে তো তাই মনে হল। এবার ও ওদের কাছ থেকে আমাদের সর্বস্ব নিয়ে পালাবে। আমাদের যা গেল তা গেলই!” একজন বলল।

শুনে প্রভাসের যা রাগ হল! “বদ্রীদাদা কক্ষনও এরকম নয়। কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না, বন থেকে বেরোতে হবে। আমার সঙ্গে এসো।” বলল ও।

কিন্তু ‘এসো’ বললেই কি আর আসে সবাই? একজনের কান্না থামে তো আরেকজনের হা-হুতাশ শুরু হয়। একজন হাঁটতে শুরু করে তো আরেকজন ধপ করে বসে পড়ে। এখনও নাকি ভয়ে তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আছে। একজন তাকে টেনে তোলে তো আরেকজনের তেষ্টায় ছাতি ফাটে! দেখে প্রভাসই অবাক হয়ে যায়, বিরক্তও। কোথায় এখন তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বন থেকে বেরোবে, তা নয়, কী কাণ্ডই না করছে সব! শেষে ওই বুঝিয়ে সুঝিয়ে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে চলল। বদ্রীর অনুপস্থিতি ওকে এক ধাক্কায় বড়ো করে দিয়েছে।

যেতে যেতে হাতের লাঠিটার লোহা বাঁধানো মুঠটা খুলে ফেলল প্রভাস। ফেলতেই ঝকঝকে ছোরাটা বেরিয়ে এল। কাল রাতে বদ্রী ওকে একসময় এই গুপ্ত অস্ত্র দেখিয়েছিল। ছোরাটা হাতে নিয়েই প্রভাস হাঁটতে লাগল। একটা অস্ত্র হাতে থাকলে অতটা ভয় করে না। তখন খুব বোকার মতো কাজ করে ফেলেছিল। বদ্রী লুকিয়ে থাকতে বলেছিল ওকে, কিন্তু ও সেকথা না শুনে বেরিয়ে এসেছিল। সতর্কও ছিল না একেবারে। তাই ধরা পড়ে গেছিল। কিন্তু তাই বলে বারবার একই ভুল করবে নাকি?

দলের এক বুড়ি প্রভাসকে জিজ্ঞেস করল, “এ-লাঠি তুই কোথায় পেলি?”

“বদ্রীদাদা দিয়েছে।” প্রভাসের সংক্ষিপ্ত উত্তর।

ব্যস আর যায় কোথায়! বুড়ি আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “ওগো, আমার ছেলে ঠিকই বলেছে গো, কিছু অন্যায্য কথা বলেনি গো। ওই ছেলেও ডাকাত। ডাকাত না হলে কারুর সঙ্গে এরকম লাঠি থাকে? ওগো, তীর্থ করতে এসে এ কী বিপদে পড়লাম গো! এ-ছেলেও তো ডাকাতের সঙ্গে মিশে মিশে উচ্ছন্নে গেছে গো! সুযোগ পেতেই ছোরা বার করল! এবার বুকে বসিয়ে দিতে আর কতক্ষণ গো! বুড়ো বয়েসে তীর্থ করতে এসে শেষে ডাকাতের হাতে কি পরানটা যাবে গো!”

বুড়ির কান্না শুনে আরও দুয়েকজন কান্নার উপক্রম করতেই প্রভাস গলা চড়িয়ে বলল, “বেশ, কাঁদো তোমরা এখানে বসে বসে। আমি চললাম। এই বনে আমি আর থাকব না। যারা আমার সঙ্গে যেতে চাও তারা এসো, যারা চাও না তারা থাকো এখানেই। দেখলে তো বনে কীরকম সিংহ আছে? তোমাদের এই কান্না শুনে তারা রেগে গিয়ে কী করবে তা কিন্তু আমি জানি না।”

আগুনে যেন জল পড়ল। সবাই চুপচাপ প্রভাসের পেছন পেছন হাঁটা লাগাল। বন থেকে পথে পড়তে প্রভাসের বেশিক্ষণ সময় লাগল না। বেরোনোর আগে গাছের ডালে আটকানো পুঁটলিটাও নিয়ে নিয়েছে। দলে তিনটে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে আছে। একটা তো একেবারে ছোটো, কোলে চড়ে যাচ্ছে। খাবারের দরকার হতেই পারে।

কিন্তু অনেকদূর চলে আসার পরও যখন বদ্রীর দেখা পেল না তখন প্রভাসের চিন্তাই হল। যেভাবে একাই তিনজনের পেছনে ধাওয়া করল, কোনও বিপদ হল না তো? ওদিকে গ্রামের লোকেদের মনে এই ধারণাই বদ্ধমূল হচ্ছে যে বদ্রী আর ফিরবে না। বেচারা প্রভাস কী করবে ভেবে ভেবে কূলকিনারা পেল না। এদিকে সূর্য ডুবে গেছে। এখনও অল্প অল্প আলো আছে ঠিকই, কিন্তু এদের হাঁটার যা গতি তাতে সন্ধের আগে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে পারবে না। বদ্রী বলেছিল ফেরার সময় কোনও সরাইখানায় রাত কাটাবে। কিন্তু সেসব তো এখনও অনেকদূর। সকালে ও আর বদ্রী তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে এসেছিল; কিন্তু এরা তো দু’পা হাঁটে আর জিরোয়!

বদ্রীর দেখা পেল না বটে, কিন্তু কয়েকজন সশস্ত্র সৈনিকের দেখা পাওয়া গেল। ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র দেখে আবার সবাই কান্না জুড়বার উপক্রম করল। প্রভাসের এখন ভরডর উবে গেছে। সে এগিয়ে গিয়ে একজন সৈনিকের সঙ্গে কথা বলল। চালুক্যরাজ কুমারপালদেবের লাঞ্ছন সে জানে, বদ্রীই তাকে বলেছে। সেই পতাকা দেখেই প্রভাস এগিয়ে গেছে।

“আজ কি ভাঙা হাভেলির পেছনে তোমাদের ওপরেই হামলা হয়েছিল?”

“হ্যাঁ। আপনারা তো মহারাজ কুমারপালদেবের সৈন্য?” প্রভাস বলল।

“হ্যাঁ। আমাদের সঙ্গে এসো, কোনও ভয় নেই, আমরা তোমারদের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেব।”

সৈনিকদের সঙ্গে বড়ো বড়ো মশাল আছে, অস্ত্রশস্ত্ররও অভাব নেই। এদের সঙ্গে পথ চলতে চিন্তা হয় না। তাছাড়া এদের তো নিয়োগ করাই হয়েছে তীর্থযাত্রীদের রক্ষা করার জন্যে। শুধু এখন বদ্রীর খবর পেলেই হয়। সেও নিরাপদে ফিরে আসুক, তাহলেই প্রভাস খুশি।

সৈনিকদের সঙ্গে সঙ্গে একটা সরাইখানায় পৌঁছল প্রভাসরা। আসার সময় দেখেছে এই সরাইখানাগুলো। তীর্থযাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করা হল। সরাইখানার একজায়গায় কয়েকজনের জটলা। তারা নিজেদের মধ্যে কীসব বলাবলিও করছে। কয়েকটা কথা প্রভাসের কানে গেল। “কে বলবে এ চাকর!” “কী সাহস দেখো তো, এর জন্যেই তো সব ধরা পড়ল!”

প্রভাস ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল। কিন্তু যা দেখল তাতে একেবারে আঁতকে উঠল। মেঝের ওপর বসে বদ্রী; একজন বৈদ্য তার শুশ্রূষা করছে। হাতে পটি বেঁধে দিচ্ছেন, কিন্তু সে পটি রক্তে লাল। এক পায়েও ক্ষত।

“বদ্রীদাদা!” চেঁচিয়ে উঠে প্রভাস বসে পড়ল বদ্রীর পাশে।

“তুমি এসে গেছ? সবাইকে নিয়ে আসতে পেরেছ তো?” এই যন্ত্রণার মধ্যেও বদ্রী প্রভাসকে দেখে হাসল।

“পেরেছি। সবাই এই সরাইখানাতেই বিশ্রাম করছে। কিন্তু তোমার এ কী অবস্থা? খুব কষ্ট হচ্ছে, না?”

“এরকম তো একটু আধটু হবেই। তুমি ভালোয় ভালোয় সকলকে নিয়ে ফিরে এসেছ, এই সবচেয়ে বড়ো কথা। আমি তখন ঝোঁকের মাথায় চলে গেলাম, পরে মনে হচ্ছিল কাজটা ঠিক হয়নি।” বদ্রী বলল।

এত রক্ত পড়ছে আর একে বদ্রী বলছে একটু আধটু! প্রভাসের চোখ ছলছল করে উঠল।

“আমি তখন বোকার মতো ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলাম। তোমার কথা শুনিনি। তোমার কথা শুনলে আর এরকম হত না।” বলল প্রভাস।

“কিচ্ছু হয়নি। খুব সাহসী ছেলে তুমি।” বদ্রী বলল।

“আমি জানি তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু তুমি বলছ না।”

“বাহাদুর ছেলেরা এরকম কষ্টকে গায়েই মাখে না। তুমি তো জানো না কী কাণ্ডই না করেছে এ!” জটলার মধ্যে একজন বলে উঠল।

তখন প্রভাস শুনল সব। বদ্রী একাই ওই তিনজনকে ধাওয়া করে ওদের গোপন ডেরায় গেছিল। সেইখানে লুঠ করা ধনসম্পত্তি রাখা ছিল। বনের ভেতর আর কে আসবে, এই ভেবে ডেরায় আর কেউ ছিল না তখন। বদ্রী একাই তিনজনের সঙ্গে লড়ে তাদের ঘায়েল করে সেসব ধনসম্পত্তি উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে। তারপর তো রাজার সেনারা গিয়ে তাদের ধরে এনেছে। সেও তো বদ্রীর কাছ থেকে খবর পেয়েই।

শুনে প্রভাস আর দাঁড়াল না, উঠে পড়ল। বদ্রীর, “কী হল? কোথায় যাচ্ছ?”-র উত্তরেও আর কিছু বলল না। সোজা এল যেখানে তীর্থযাত্রীরা ছিল, সেইখানে। তাদের সব বলল। বলবে না? তখন থেকে বদ্রীর নামে যা খুশি তাই বলে যাচ্ছে!

বদ্রী আর প্রভাস সবাইকে বাড়ি নিয়ে এল। এক্ষুনি আর হেঁটে হেঁটে সোমনাথ মন্দিরে যাওয়ার অবস্থা ওদের কারুরই নেই। দুয়েকদিন অন্তত বিশ্রাম না নিলেই নয়।

প্রভাসের বুড়ি ঠাকুমা কিন্তু সব শুনে আর বদ্রীকে বাড়িতে রাখতে রাজী হলেন না। ওঁর ওই এককথা, “এ-ছেলে সুবিধের নয়, আমি আগেই জানতাম। কী বলে তুই আমার দুধের বাছাকে বনে ফেলে পালিয়ে গেলি? যদি ওকে সিংহে ধরত? তোর মতলবই বা কী ছিল তা কে বলতে পারে? হাত-টাত কেটেকুটে একসা হয়েছে তাই হয়তো ফিরে এসেছিস, নাহলে সবকিছু নিয়ে পালিয়ে যেতিস কি না কে জানে? না না, যেখানে পারিস যা, এ ভিটেয় আর তোর ঠাঁই হবে না।”

বদ্রী আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। হাত-পা কেটেছে, সে জ্বালা আর কতটুকু? দু’দিনেই সেরেও যাবে, কিন্তু এই অপমানের জ্বালা বড়ো ভয়ংকর। ওর কোনও কাজেরই কোনও মূল্য নেই ওদের কাছে। থাকবে কী করে? ও যে গরিব। পেটের দায়ে চাকর হয়ে এসেছিল এই বাড়িতে সেই কোন ছোটোবেলায়। ওর কথা কে বুঝবে? নিজের অল্প ক’টা জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে এল সুখবিলাসের বাড়ি থেকে। অন্য চাকরগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে আর হ্যা হ্যা করে হাসছে।

দু’পা এগিয়েছে কি এগোয়নি, দেখে সামনে দ্বিজদাস। দু’বাহু প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে, মুখে হাসি। বদ্রী আর সামলাতে পারল না নিজেকে। হাতের জিনিসপত্র সব ফেলে ছুটে গিয়ে দ্বিজদাসের বাহুবন্ধনে ধরা দিল।

“এ-বাড়িতে যে আর তোর ঠাঁই হবে না তা আমি বুঝেছিলাম। তাই তো দাঁড়িয়ে আছি। চল, আমার সঙ্গে চল, আমার কাছেই থাকবি তুই এবার থেকে।” দ্বিজদাস বললেন।

বদ্রী কিছু বলতে চাইল, কিন্তু বলতে পারল না। আনন্দে, আবেগে গলা বুঝে এল ওর।

“কতটুকু আর কী শেখাতে পেরেছি আমি তোকে? কিন্তু তা সত্ত্বেও তুই যা করেছিস ভাবলেই আমার বুক গর্বে ভরে উঠছে। এবার থেকে আরও ভালো করে শেখাব তোকে আমি। আমার যা জ্ঞান, বুদ্ধি যত, তোকেই উজাড় করে দেব।”

বদ্রী মহানন্দে আছে। দ্বিজদাসের কাছে অস্ত্রশিক্ষা করছে। এখন আর লুকিয়ে লুকিয়ে ভয়ে ভয়ে কাজের ফাঁকে শেখা নয়। সারাদিনই বলতে গেলে অস্ত্রচালনা অভ্যেস করে। মাঝে মাঝে দ্বিজদাসের সংসারের কাজকর্ম করে দেয়। সেও বলতে গেলে জোর করেই। প্রভাসকে আটকানো যায় না। সে প্রতিদিনই নিয়ম করে বদ্রীর সঙ্গে দেখা করতে আসে।

“ওই সিংহীটা কীরকম অদ্ভুত, তাই না? এল, আবার চলেও গেল। কিচ্ছু করল না।” একদিন প্রভাস বলল।

“বোধহয় অদ্ভুত নয়। আমরা বিপদে পড়েছি বুঝেই ও বোধহয় এসেছিল। আমার মনে হয়, ও আমাকে চেনে।” বদ্রী বলল, “বর্ষার পর বাড়ি যাব বলে ছুটি নিলাম না? বৃষ্টি থেমেছে তখন, কিন্তু জল সবজায়গায় নামেনি। আমি ওই পথ দিয়ে গেলেই বনে ঢুকি। সেবার দেখি বনে জল। পোড়ো মন্দিরের পেছনে তো হাঁটু ডোবা জল! হঠাৎ শুনি পোড়ো মন্দিরের ভেতর থেকে চাপা গরগর আওয়াজ আসছে। রেগে গিয়ে যেরকম গজরায়, ঠিক সেরকম। আস্তে আস্তে বাইরে থেকে উঁকি মেরে দেখি, ও মা, দেখি উঁচু উঁচু পাথরের ওপর একটা সিংহী তার তিনটে ছানাকে নিয়ে বসে। বুঝলাম বনে জল হয়েছে, ছানাদের বাঁচাতে এখানে নিয়ে এসেছে। সিংহীটাকে দেখে মায়া হল। মনে হল যেন খিদে পেয়েছে। তাড়াতাড়ি সরে এলাম ওখান থেকে। পথের ধারে ধারে জল তখন অনেকটাই নেমে এসেছে। দেখি, দুটো বুনো শুয়োর যাচ্ছে। একটা মারলাম, মেরে টেনে এনে পোড়ো মন্দিরের কাছে ফেলে রেখে চলে গেলাম। আমার কী মনে হয় জানো? ও বুঝেছিল যে আমি ওর জন্যে খাবার এনে দিয়েছি। তাই আজ আমাদের বিপদে পড়তে দেখে এসেছিল। তুমি ওদের ক্ষতি না করলে ওরাও তোমার ক্ষতি করবে না। কে জানে ছানাগুলো এখন কত বড়ো হল!”

***

সুখবিলাস ফিরে এসেছেন। সব ঘটনা শুনেছেন। একজন নয়, নানা জনের মুখ থেকে। নিজের মার দুর্ব্যবহারের কথাও।

“তোমার জন্যে লজ্জায় আমার মাথা কেটে যাচ্ছে। ছিছিক্কার করছে সবাই। কেউ করে এরকম কাজ!” মাকে বলেছেন তিনি।

আর কোনও ওজর আপত্তি শোনেননি, নিজে গেছেন দ্বিজদাসের বাড়িতে বদ্রীকে ফিরিয়ে আনতে। নিজের মার ব্যবহারের জন্যে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। দ্বিজদাস বদ্রীকে ছাড়তে চাইছিলেন না। বদ্রীর নিজেরও যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু সুখবিলাসের অনুরোধে না বলতে পারেনি।

“এখন থেকে আমার ছেলের মতো থাকবি তুই। প্রভাস আর তোর মধ্যে কোনও তফাত করব না। অস্ত্রশিক্ষা করতে চাস, কর। রোজ আসিস এঁর কাছে। যা শেখার শেখ। মাঝেমধ্যে নাহয় থাকিস, কিন্তু আমার বাড়ি একেবারে ত্যাগ করিস না। আমার খুব খারাপ লাগবে। বুঝব, মার ব্যবহারে কষ্ট পেয়ে তুই চলে এলি।” বলেছেন সুখবিলাস।

এরপর আর বদ্রী কিছু বলতে পারেনি। ফিরে গেছে ও-বাড়িতে। তবে সুখবিলাস তাঁর কথা রেখেছেন। বদ্রী বাড়ির ছেলের মতোই আছে ওখানে। আর এতে সবচেয়ে খুশি যে প্রভাস সে তো বলাই বাহুল্য।

অলঙ্করণঃ শিমুল

জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস

4 Responses to গল্প সঙ্গে ছিল বদ্রী অদিতি ভট্টাচার্য্য শরৎ ২০১৯

  1. কিশোর ঘোষাল says:

    ভীষণ ভালো লাগল। প্রাচীন ভারতের স্মৃতিমেদুর অনবদ্য কল্পনা।

    Like

  2. রুমেলা says:

    তোমার গল্পের ঐতিহাসিক ফ্লেবার আমার বড় প্রিয়

    Like

Leave a Reply to রুমেলা Cancel reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s