গল্প সার্কাস রতনতনু ঘাটী শরৎ ২০১৯

রতনতনু ঘাটী  র সব লেখা একত্রে

সার্কাস

রতনতনু ঘাটী

‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস’-এর ই-মেলে একটা সরকারি মেল এসেছে। সে নিয়ে সকাল থেকে গোটা সার্কাস দলে তোলপাড় চলছে। সার্কাস দলের মালিক জগজিৎ সাহনি তাঁর আজ্ঞাবহ কর্মীদের নিয়ে একটু আগে জরুরি মিটিং সেরেছেন।

সার্কাসে হাতির খেলা দেখায় ভাগীরথী মাহাত। এবার হাটপুকুর জেলা শহরে সার্কাসের তাঁবু খাটানোর পর থেকে ভাগীরথীর মনে আনন্দ একটু বেশি। ভাগীরথীর চেয়েও বেশি খুশি তার হাতি আরতি।

হাটপুকুর জেলা কম বড় নয়। বলা যেতে পারে, এ রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা। অনেক দর্শক হচ্ছে প্রতিদিন। তবে সেটাই আরতির খুশির একমাত্র কারণ নয়। মাহুত ভাগীরথীর সঙ্গে সার্কাসের তাঁবুতে আসার পথে সে একটা ঘন জঙ্গল দেখে এসেছে। তার পর থেকে সে খুশিতে আছে। একদিন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার বায়না করেছিল। ভাগীরথী ছাড়া অবস্থায় আরতিকে ঘুরিয়ে এনেছে জঙ্গলে।

ছাড়া অবস্থায় আরতিকে সার্কাসের তাঁবুর বাইরে নিয়ে গেলে, জগজিৎ সাহনির যদি চোখে পড়ে যায়, তা হলে আর রক্ষে নেই, ‘তুমি ওর উপর এতটা আস্থা রেখো না ভাগীরথী! যতই হোক বনের পশু তো। একদিন এর জন্যে তোমাকে খেসারত দিতে হতে পারে। আর তখন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে, মিলিয়ে নিও।’

মাহুত ভাগীরথী যদি আর একদিন জঙ্গলে নিয়ে যায়, সে নিয়ে কম কসরত করছে না আরতি। যদি সার্কাসের খেলার ফাঁকে দুপুরের দিকে আর এক-আধদিন জঙ্গলে নিয়ে যায়। কতদিন ভাগীরথীর সঙ্গে সে ভালোভাবে  জঙ্গল দ্যাখেনি। ভাগীরথী সময় করে উঠতে পারেনি। জগজিৎ সাহনির কড়া নির্দেশ, ‘খেলা দেখানোর আগে কী মানুষ, কী পশুর, সকলের পূর্ণ বিশ্রাম দরকার। না হলে সে বেস্ট খেলাটা দেখাবে কেমন করে?’

তবু, কতদিন জঙ্গলে খুশিমনে যায়নি আরতি, সে কথা এখন মনেও পড়ে না। যাবে কী করে? যখন সে এইটুকুনি পুঁচকে একটা হাতির বাচ্চা, তখন মায়ের সঙ্গে দলমা পাহাড় থেকে নেমে এসেছিল খাবারের খোঁজে অযোধ্যা পাহাড়ে। পাহাড়ের ঢালে ধানে পাক ধরেছে। প্রতি বছর এ সময় হাতিরা দল বেঁধে নেমে আসে পাহাড় থেকে। সেবার নেমে আসার পথে একটা পাহাড়ি ঝরনা পড়েছিল।

পাহাড়ি ঝরনায় জলের তোড় বেশি হয়। ওর মা দাঁড়িয়ে ভাবছিল, বাচ্চাটা পেরোবে কেমন করে? যদি পা পিছলে জলের স্রোতে উলটে যায়? ও তো তখন একটুখানি, ওর তখন অত বিপদ বোঝার বয়স হয়নি। ওর মা শুঁড় নেড়ে নিষেধ করছিল বারবার। সেদিকে খেয়াল ছিল না ওর। পড়বি পড়, একটা নড়বড়ে পাথরের উপর পা রাখতেই ঝপাং করে গড়িয়ে পড়ল স্রোতের পাকে।

আঁ-আঁ শব্দ করতে করতে ও গড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল অনেকটা নীচে। পাহাড়টা ওখানে এতটাই ঢালু যে, ওর মার পক্ষে অতটা নীচে নেমে ওর কাছে পৌঁছনো সম্ভব ছিল না।

হাতির গোটা দলটা থম মেরে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় সারা বেলাটা তারা দাঁড়িয়ে ছিল ওখানে। কিন্তু কিছুই করার মতো উপায় ছিল না। শেষে গোটা দলটা ফিরে গিয়েছিল পাকা ধানের খোঁজে।

ভাগীরথীর বাবা দেবকী মাহাত তখন মস্ত জোয়ান লোক। জঙ্গলে ঢুকেছিল মধুর খোঁজে। পাহাড়ের ঢালের বড় বড় গাছগুলোর মউমাছি চাক বানায় বেশি। মধুও বেশি পাওয়া যায়। মানুষের নাগাল ওসব জায়গায় পৌঁছয় না বলেই হয়তো।

হঠাৎ দেবকী দেখল, একটা বাচ্চা হাতি পাথরের খাঁজে আটকে গিয়ে হুশমুশ করছে। অমনি তক্ষুনি গ্রামে ছুটে এসে দশ-বিশজন লোক জুটিয়ে নিয়ে হাজির হয়েছিল সেখানে। তখনও বাচ্চা হাতিটা উঠে দাঁড়াতে পারেনি। নেতিয়ে পড়ে আছে জলের মধ্যে।

সকলে চারদিকে যতদূর চোখ যায়, দেখে নিল মা-হাতির দল জঙ্গলে লুকিয়ে আছে কিনা। দেবকীর দলের নেতা হরিতোষ মুর্মু বলল, ‘দ্যাখ, কোথাও লুকিয়ে অপেক্ষা করছে কিনা? দাঁতালটা একে ছেড়ে চট করে তো পালাবে না?’

দেবকী বলল, ‘শোনো, ঘটনাটা ঘটেছে মনে হয় সকালবেলা। আর এখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। এখনই যদি বাচ্চাটাকে না তোলা যায়, তা হলে ওকে বাঁচানো যাবে না।’

সঙ্গের সকলে একমত হওয়ার পর শুরু হল উদ্ধারকাজ। সে দলে ভাগীরথীও ছিল। ওর তখন কত আর বয়স? মেরেকেটে উনিশ বছরের বেশি হবে না। নিজের চোখে হাতির বাচ্চাটাকে অমন করে ঝোরায় পড়ে থাকতে দেখে ভাগীরথীর বড় মায়া হচ্ছিল।

সকলে মিলে টেনেহিঁচড়ে হাতির বাচ্চাটাকে গ্রামে নিয়ে আসতে গোটা দলটা হিমশিম খেয়ে গেল। মানিক টুডু দেবকীর বাড়ির সামনে মাটিতে ধপাস করে বসে পড়ে বলল, ‘তবে দেবকী, বাচ্চাটার মা খোঁজ করে তোর এখানে এলেও, ওকে সঙ্গে করে নিয়ে ফিরে যাবে না?’

ভাগীরথী জিজ্ঞেস করল, ‘কেন কাকা?’

কমল যাদব বলল, ‘ঠিক বলেছিস মানিক।’ তারপর ভাগীরথীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যে হাতিকে মানুষ ছুঁয়ে দেয়, তাকে অন্য হাতিরা আর দলে নেয় না। বাচ্চাটা এবার থেকে দলছুটই হয়ে গেল। ওকে এবার বাঁচাবে কী করে, ওহে দেবকী?’

ভাগীরথীর মা কামিনী ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ‘কট্টুকু দুধের বাচ্চা হাতিটা! এ বাঁচবে কী করে?’

ততক্ষণে বাড়ির উঠোন লোকে লোকারণ্য। গ্রাম ঝেঁটিয়ে কত মানুষ ছুটে এসেছে বাচ্চা হাতিটাকে দেখবে বলে।

দেবকী বলল, ‘দ্যাখো দাদা, ও তো ঝোরায় পড়ে থেকে এমনিতেই মারা পড়ত। বরং দেখি না চেষ্টা করে, বাঁচাতে পারি কিনা!’

বাচ্চাটার এতটাই কষ্ট হয়েছে ঝোরা থেকে উঠে আসার চেষ্টা করতে গিয়ে, সে এখন আর ভালোভাবে মাটিতে পা ফেলতেই পারছে না। 

কমল যাদব বলল, ‘হাতি পোষার ঝক্কি কম নয় হে দেবকী! খাওয়ার জোগাতে ভিখিরি হয়ে যাবে তো!’

কিছু না বুঝেই উত্তর দিয়েছিল ভাগীরথী, ‘পারব জেঠা!’

‘দ্যাখ, পারিস তো ভাল!’ বলে হাতি উদ্ধারের দলবল যে-যার বাড়ি ফিরে গেল। সেই থেকে হাতিটা রয়ে গেল দেবকীদের বাড়িতে। ভাগীরথী বাবাকে বলল, ‘বাবা, ওর একটা নাম রাখতে হবে তো?’

দেবকী বলল, ‘এটা তো মাদি হাতি রে! এর নাম থাক ‘আরতি’। তোর ঠাকুমার নাম। আমার খুব ছেলেবেলায় তোর ঠাকুমা মারা গেয়েছে কিনা।’

তার পর দিনই দেবকী দূরের হাট থেকে একটা শক্ত কাঁছি কিনে আনল। উঠোনে একটা মোটা খিরিশ গাছের সঙ্গে বেড় দিয়ে বাঁধা হল কাঁছিটার একটা প্রান্ত। আর একটা প্রান্ত দিয়ে আরতির বাঁ পায়ে বাঁধা হল শক্ত করে। তবে আশ্চর্যের কথা কী, তাকে বেঁধে ফেলা হচ্ছে দেখেও আরতি এতটুকুও গাঁইগুঁই করল না। শুধু বার তিনেক দেবকীর দিকে শুঁড় তুলে নাড়াল। দেখে ভাগীরথীর ছোট ভাই ভাগ্যধর বলল, ‘দাদা, দ্যাখ, আরতিটা এখনও প্রতিবাদ করতে শেখেনি মনে হয়!’

গ্রামের সকলে নানারকম আশঙ্কা করেছিল। হাতির গোটা দলটা ফিরে এসে হয়তো তাণ্ডব চালাবে গ্রামে। ভাঙচুর করবে বাড়িঘর। মানুষকে তাড়া করবে। পাকা ধান নষ্ট করবে। শেষমেশ সেসব কিছুই করল না মা-হাতিটা। তিনবার আরতির মা খুঁজে খুঁজে ঠিক এসে হাজির হয়েছিল ভাগীরথীদের বাড়ির সামনে। দূরে দাঁড়িয়ে অনেকটা সময় ধরে দেখছিল আরতিকে। একবারের জন্যেও আরতির কাছে ঘেঁষেনি। সেই দেখে ভাগীরথী ভাইকে বলেছিল, ‘দ্যাখ ভাগ্যধর, ওকে মানুষ ছুঁয়েছে তো! ওকে আর অন্য হাতিরা তাদের দলে নেবে না। মানিককাকা ঠিকই বলেছিল রে।’

সত্যিই তাই। এখন আরতি ছাড়া থাকলেও আর জঙ্গলে যায় না। দু’বছর হতে চলল, আরতির মা এখন আর ওর খোঁজে আসে না। খিদে পেলে বাড়ির আশপাশের গাছপালা ভেঙে খায়। তারপর একবেলার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসে। অবশ্য ভাগীরথী এবং ভাগ্যধর, দু’ ভাই মিলে কখনও কখনও কলাগাছ, এটাওটা এনে খেতে দেয় আরতিকে। এখন তাকে ‘আরতি’ বলে ডাকলে সে সাড়াও দেয়। তার মানে সে তার নামটা এখন জেনে গেছে।

দেখতে দেখতে তিন বছর পেরিয়ে গেল, আরতি ভাগীরথীদের বাড়িতে আছে। এখন সে মস্ত বড়টি হয়ে উঠেছে। খোরাকিও বেড়েছে ওর। খাবার জোগান দেওয়া চাট্টি কথা নয়। সে নিয়ে চিন্তাও কম নয় দেবকীর।

এতদিনে আরতি বেশি বন্ধু হয়ে উঠেছে ভাগীরথীর। ভাগীরথী ক্লাস নাইন অবধি উঠেছিল নবীন কিসকু হাই স্কুলে। তারপর তার আর পড়ায় মন নেই। ক্লাসে দু’বার ফেল করল। তখনই দেবকী মনস্থ করে ফেলল, ভাগীরথীকে আর স্কুলে পাঠাবে না। বরং তার সঙ্গে মধু ভাঙতে যাক জঙ্গলে। দু’ পয়সা রোজগার হবে তা হলে।

ভাগীরথী না করেনি। বাবার সঙ্গে জঙ্গলে যেতে শুরুও করেছিল। কিন্তু একদিন হল কী, সকাল সকাল পান্তাভাত খেয়ে বাপ-ছেলে জঙ্গলে ঢুকেছিল মধু ভাঙতে। একটা খুব সরু ঝোরা থেকে ঝিরঝির করে জল বেরোচ্ছিল। তার উপরে যে একটা খুব সরু মতন গর্তে লুকিয়ে ছিল বিষাক্ত সাপটা, দেবকী বুঝতে পারেনি। যেই গর্তটার মুখের কাছে পা দিল, অমনি সাঁ করে ছোবল মারল সাপটা। তারপর বাবাকে কাঁধে করে বয়ে এনে বাড়ির উঠোনে শুইয়ে দিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল ভাগীরথী। ঘরের ভিতর থেকে ছুটে এল মা, ভাই। ছুটে এল গ্রামবাসী। না, বাঁচানো গেল না দেবকীকে। হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ারও সময় দিল না।

দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল আরতি। কিছু একটা বিপদ ঘটেছে আঁচ করে স্থির হয়ে গিয়েছিল সে। তারপর গটমট করে এগিয়ে এসে দেবকীর মাথার কাছটায় দাঁড়িয়ে শুঁড় তুলে ধরল উঁচুতে। তারপর এক পা দু’ পা করে পিছিয়ে গিয়ে ফের দাঁড়িয়ে পড়ল খিরিশ গাছের তলায়। তার চোখের কোলে জলের রেখা।

তারপর দেবকীকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হল। আরতিও বলা নেই কওয়া নেই, সঙ্গে সঙ্গে চলল। সন্ধে পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়েছিল দেবকীর চিতার সামনে। সৎকার শেষ হওয়ার পর তখনও চুপ করে দাঁড়িয়েছিল সেখানে আরতি। গ্রামটা ঘুমিয়ে পড়ার পর কখন ফিরে এসেছিল আরতি, সে কেউ জানে না।

।। ২।।

তারপর থেকে আরতির খাওয়া কমে আদ্ধেক হয়ে গেল। সব সময় মনমরা হয়ে শুয়ে থাকে। কারও দিকে বিশেষ ফিরেও তাকায় না। কেউ কেউ বলল, ‘ডাক্তার ডাকো ভাগীরথী। মনে হয় অসুখ হয়েছে।’

পাহাড়-জঙ্গলে কোথায় পাবে হাতির ডাক্তার? হাতির ওই আদ্ধেক খাবার জোগাতেই তখন দুই ভাই নাস্তানাবুদ।

হঠাৎ একদিন অযোধ্যা পাহাড়ের নীচ থেকে খবর উড়ে এল, ‘একদল লোক নাকি সার্কাসের দলের জন্যে হাতির খোঁজ করছে।’

খবরটা মানিক টুডুই কোথা থেকে জুটিয়ে এনেছিল। ভাগীরথীর বাড়ি বয়ে এসে বলল, ‘ভাগীরথী, বাড়ি আছিস নাকি?’

ভাগীরথী বাড়ির ভিতরেই শুয়েছিল এক বুক হতাশা নিয়ে। মানিক কাকার গলা পেয়ে বাইরে বেরিয়ে এল, ‘কী গো কাকা? খোঁজ করছ?’

মানিক টুডু বলল, ‘আরে শুনছি, সমতলে নাকি সার্কাস দলের লোক এসেছে। তারা হাতির খোঁজ করছে। যা না, গিয়ে খবর নে।’

ভাগীরথী জিজ্ঞেস করল, ‘তারা কি হাতি কিনতে চায়?’

মানিক ঘাড় নেড়ে বলল, ‘তার আমি কী জানি বাপু! আমি কি আর খোঁজ-তল্লা করেছি? উড়ো খবরটা কানে এল, তাই শুধোতে এলাম!’

ভাগীরথী জেদের গলায় বলল, ‘আমি আরতিকে বেচব না কাকা। ও তুমি যা-ই বলো আর তা-ই বলো!’

হতাশ হয়ে মানিক টুডু চলে গেল। দুপুর গড়ানের মাথায় তিনটে লোক ভাগীরথীর উঠোনে এসে ডাক দিল, ‘বাড়িতে কেউ আছেন কি? একবার বাইরে আসবেন?’

ভাগ্যধরও এখন আর স্কুলে যায় না। বাবা চলে যাওয়ার পর তার পড়া বন্ধ হয়েছে। সে ঘরের বাইরে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কোত্থেকে এসেছেন? কাকে চাই?’

লম্বা, ফরসা, একমুখ দাড়ি, কালো হাফ প্যান্ট, লাল টি-শার্ট, মাথায় কালো কাউবয় টুপি পরা একটা লোক এগিয়ে এসে বলল, ‘আমরা দি গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস থেকে এসেছি। তোমাদের বাড়ির সামনে হাতিটা শুয়ে আছে দেখে মনে হল, হাতিটা তোমাদের পোষা। আমাদের সার্কাসে একটা হাতির দরকার। এখন হিংস্র জীবজন্তুদের নিয়ে তো সার্কাসে খেলা দেখানো বেআইনি। তাই আমরা সার্কাসে হাতির খেলা চালু করব। পোষা হাতিকে খেলা শেখাতে বেশি বেগ পেতে হবে না। তোমরা কি হাতিটা বিক্রি করবে?’

ভাগ্যধর ঘরের ভিতর থেকে ভাগীরথীকে ডেকে আনল। বেরিয়ে এসে ভাগীরথী বলল, ‘না না। আপনারা ভুল শুনেছেন। আমরা হাতি বিক্রি করব না। অন্য কোথায় হাতি পাওয়া যায় কিনা খোঁজ করে দেখুন। এ আমাদের পোষা হাতি! ছোটবেলা থেকে আমাদের বাড়িতে আছে।’

সার্কাস দলের আর একটা লোক নীল প্যান্টের উপর হলদে পাঞ্জাবি পরা। এগিয়ে ভাগীরথীর সামনে এসে চোখের দিকে চোখ রেখে বলল, ‘না ভাই, শুনুন, শুনুন! বলছিলাম কী, হাতি পোষারও তো খরচখরচা কম নয় ভাই। তাই আমরা নিয়ে গেলে… তোমাদের কী দিতে হবে বলো!’

কামিনী বাড়ির ভিতর থেকে লোকগুলোর কথা শুনছিল। এবার বেরিয়ে এসে বলল, ‘না বাবু! এ আমাদের বাড়িরই একজন। একে আমরা বিক্রি করব না।’

প্রথম লোকটি বলল, ‘হাতিটা বড্ড রোগা হয়ে গেছে দেখছি! কত আর বয়স? দশও হয়নি?’

কামিনী বলল, ‘এ কীরকম কথা তোমাদের? বাপ-মা রোগা হলে ছেলেরা কি তাদের ফেলে দেয় নাকি? না না। আরতিকে আমরা বেচব না।’

তিন নম্বর লোকটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আরতিকে দেখছিল। মুখ ঘুরিয়ে কামিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, হাতিটাকে না-ই বিক্রি করো। হাতিকে এবং হাতির সঙ্গে তোমাদের একজনকে আমরা সার্কাসের দলে চাকরি দেব। ভালো মাইনে পাবে। বলতে পারো, একসঙ্গে তোমাদের বাড়ির দু’জনের চাকরি হয়ে যাবে। ব্যাপারটা মন্দ কী? একবার বিবেচনা করে দ্যাখো!’

এ কথায় খানিকটা কাজ হল যেন। ভাগীরথী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে। কাল আপনারা একবার আসুন। ভেবে দেখছি।’

লোকগুলো চলে গেল। দুই ছেলে এবং মা মিলে কমলজেঠুকে ডেকে এনে আলোচনায় বসল। কমলজেঠু বলল, ‘তোরা এক কাজ কর। রাজি হয়ে যা। হাতিটার খাবার জোগাতে আর চিন্তা করতে হবে না। তার উপর একটা মাইনে তো ঘরে আসবে।’ একটু থেমে কমলজেঠু বলল, ‘না না, ভুল হল ভাগীরথী। দু’জনের মাইনে ঘরে আসবে। মন্দ হবে না! কাল লোকগুলো এলে রাজি হয়ে যাস! তবে সার্কাস দলের সঙ্গে সঙ্গে তোর হাতি এবং তোকে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হবে। তাতে কী? দেশে যেখানে কাজের এত মাঙ্গা!’ তারপর কী ভেবে বলল, ‘তবে সার্কাসে মাঝে মাঝে বসেও থাকতে হয়, যখন সার্কাস বন্ধ থাকে। তখন ওরা কী করবে ভালোভাবে খোলসা করে নিস।’

।। ৩।।

পরদিন কথা ফাইনাল হয়ে গেল। ভাগীরথী আর তার হাতি আরতি দি গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসে ঢুকে পড়ল। ওদের নিয়ে যাওয়া হল মুম্বইতে। সেখানে একটা জায়গায় ট্রেনিং চলল ভাগীরথীর। কেমন করে হাতিকে দিয়ে খেলা শেখাতে হয়, তার শিক্ষা। তারপর আরতিরও ট্রেনিং শুরু হল। আরতি চটপট করে শিখে নিল টেবিলে উঠে দু’পা তুলে খেলা দেখানো। সামনের দু’পায়ে নাচের তালে তালে পা মেলাতে শিখল। আর খুব তাড়াতাড়ি যেটা শিখে ফেলল আরতি, তা হল ফুটবলে শট মারা। দর্শকদের মাতিয়ে দিতে লাগল আরতি। ছোটরা হাতির ফুটবল খেলা দেখে মুগ্ধ। ভিড় বাড়তে লাগল সার্কাসে। যখন ভারতের যে প্রান্তেই সার্কাস চলুক না কেন, ভিড় উপচে পড়ে।

দেখতে দেখতে সে আজ কত বছর হয়ে গেল। কামিনী হঠাৎ একদিন মারা গেল, তখন ভাগীরথী কলকাতার পাটুলির কাছে সার্কাস ক্যাম্পে আরতিকে নিয়ে। খেলা চলছিল বলে একদিনের জন্যে মাত্র বাড়ি এসেছিল। তারপর ভাগীরথী মাহাতর সংসারে অনটনের দিন শেষ হল। নিজে বিয়ে করল ভাগীরথী। ভাইয়েরও বিয়ে দিল। বাড়ি তৈরি করল অযোধ্যা পাহাড় থেকে বাঘমুন্ডি যাওয়ার পথে বাঘমুন্ডির অনেকটা আগে বাস রাস্তার পাশে।

গোটা সার্কাসের সিজনটা আরতিকে নিয়ে ভারতের নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় ভাগীরথী। মাইনেও বেড়েছে তাদের। পেটপুরে না হলেও, আরতিকে আধপেট করে খেতেও দেয় সার্কাস দলের লোক। আরতির পায়ে শেকল বাঁধা থাকে। খেলার সময় সে শেকলের বাঁধন খুলে দেয় ভাগীরথী। তারপর আরতি যখন সার্কাসের মঞ্চে ঢোকে, তখন হইহই, চিৎকার আর হাততালিতে গমগম করে ওঠে সার্কাসের তাঁবু!

সকাল থেকে সার্কাস দলে কী নিয়ে যে অত ফিসফাস চলছিল, সেদিকে নজর করেনি ভাগীরথী। সকালে আরতিকে ভালো করে স্নান করিয়েছে সে। তারপর খেতেও দিয়েছে নরম কয়েকটা কলা গাছ। শুঁড়ে আর গলায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে টানা আধঘণ্টা!

এখন আরতি ভাগীরথীর আদর না পেলে আঁ-আঁ করে আদুরে গলায় শব্দ করে। ঘনঘন শুঁড় দোলাতে থাকে। ক্রমাগত মাথা নেড়ে চলে। পা ছুড়তে শুরু করে। তখন ভাগীরথীর বুঝতে দেরি হয় না, আরতির এখন ভাগীরথীর আদর চাই। দিনদিন বড্ড আদুরে হয়ে উঠেছে হাতিটা! কিছুক্ষণ চোখের আড়াল হলে আর রক্ষে নেই।

এমন সময় জগজিৎ সাহনির তাঁবুতে ডাক পড়ল ভাগীরথীর। সার্কাসের কর্মীদের দুটো কারণে জগজিৎ সাহনির তাঁবুতে ডাক পড়ে। হয় তার মাইনে বাড়বে, নয় তার খেলায় ভুল হয়েছে বলে চাকরি যাবে। অনেক চিন্তা নিয়ে ভাগীরথী গিয়ে ঢুকল তাঁর তাঁবুতে।

জগজিৎ সাহনির সামনে ল্যাপটপ খোলা। সেদিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে চিন্তামাখা গলায় বললেন, ‘ভাগীরথী, সরকার আবার নতুন আইন জারি করল। এটা তার খসড়া প্রস্তাব।’

জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল ভাগীরথী। জগজিৎ সাহনি বললেন, ‘আজই মেল এসেছে। সার্কাসে এখন থেকে হাতিকে দিয়ে আর খেলা দেখানো যাবে না। এমনকী, সার্কাসে বা মোবাইল এনটারটেনমেন্টেও কোনও প্রাণীকে আর ব্যবহার করা যাবে না। এক পশুপ্রেমী সংস্থা সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই আইন চালু করছে।’

এ কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল ভাগীরথী মাহাত। বলল, ‘মানে…!’

মিঃ সাহনি বললেন, ‘আমাদের ডিরেক্টর বোর্ড এই মাত্র সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমরা আইন লঙ্ঘন করব না। আজ থেকেই আমরা আমাদের সার্কাসে হাতির খেলা দেখানো বন্ধ করে দিচ্ছি। তোমার এবং তোমার হাতি আরতির আজ থেকে ছুটি হয়ে গেল। অবশ্য, তুমি তো অনেক দিন আমাদের সার্কাসে আছ। তোমার প্রতি আমাদের ডিরেক্টর বোর্ডের একটা সফট কর্নার আছে। তুমি তোমার হাতিকে বিক্রি করে দিয়ে চাইলে অন্য কিছু একটা কাজ নিয়ে আমাদের সার্কাসে থাকতে পারো।’

কথাটা বুলেটের মতো ভাগীরথীর হৃদয়ে গিয়ে লাগল। স্তব্ধ হয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকল কয়েক মিনিট। সার্কাসের নুন শো শুরু হতে আর খুব একটা দেরি নেই। ভাগীরথী শুনতে পেল, ‘সার্কাসের মাইক থেকে ঘোষণা ভেসে আসছে: ‘আজ থেকে সরকারের নতুন নির্দেশ মতো আমাদের সার্কাসে হাতির খেলা দেখানো বন্ধ করে দেওয়া হল। দর্শকরা, দয়া করে আমাদের আর হাতির খেলা দেখাতে অনুরোধ করবেন না।’

মাথা নিচু করে জগজিৎ সাহনির ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় ভাগীরথী কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘আরতিকে বিক্রি করে দিতে পারব না স্যার! ওকে ছেড়ে আমি বাঁচতে পারব না।’

মিঃ সাহনি উঠে এসে ভাগীরথীর পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘তুমি ভুল করছ ভাগীরথী! আরতিকে বিক্রি করতে না চাও, পাশেই জঙ্গল আছে। ওকে ছেড়ে দিয়ে এসো। তারপর তুমি কাজে যোগ দাও! তোমার সংসার আছে, স্ত্রী-ছেলেমেয়ে আছে। তাদের ভালোবাসতে হবে। নিজেকে ভালোবাসতে শেখো ভাগীরথী। একটা হাতির জন্যে নিজেকে বিপদের দিকে ঠেলে দিলে ভুল করবে!’

কী ভেবে ভাগীরথী হঠাৎ ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে বলল, ‘আমি আরতিকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে ফিরে আসছি স্যার। আপনি আমার জন্যে কিছু একটা কাজের ব্যবস্থা করো দিন! না হলে ভরা সংসার নিয়ে স্যার মারা পড়ে যাব!’

হাসতে হাসতে মিঃ সাহনি ভাগীরথীর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার শুভবুদ্ধির উদয় হল দেখে আমি খুশি! যাও, চটপট ফিরে এসো!’

।। ৪।।

ভাগীরথী হনহন করে গিয়ে তাঁবুতে নিজের দরকারি জিনিস রাখার বাক্সটা খুলল। চেন্নাইতে দারুণ খেলা দেখানোর জন্যে আরতি কপালে পরার যে বিরাট পিতলের চাঁদমালাটা উপহার পেয়েছিল, সেটা বের করে নিয়ে গিয়ে পরিয়ে দিল আরতির গলায়। তারপর গলায় আর শুঁড়ে মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভাগীরথী বলল, ‘আরতি, তুই যেখানে থাকিস, ভালো থাকিস। আমি পেটের দায়ে তোকে ধরে রাখতে পারলাম না রে! ক্ষমা করে দিস!’

পায়ের শেকল খুলে দিল আরতির। বেড়ানোর আনন্দে খুশি হয়ে শুঁড় দোলাতে লাগল আরতি। ভাগীরথী বলল, ‘চল, তোকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসি। সেটাই তো তোর জায়গা!’

জঙ্গলের অনেকটা গভীরে গিয়ে আরতিকে ফেলে রেখে কাঁদতে কাঁদতে সার্কাসের তাঁবুর দিকে প্রাণপণে দৌড়তে শুরু করল ভাগীরথী। জীবনে কখনও এত জোরে দৌড়য়নি সে। তাঁবুর সার্কাস মঞ্চের পাশে যেখানে মিঃ সাহনি বসে আছেন, তাঁর সামনে গিয়ে বলল, ‘স্যার, আমার কাজটা?’

এমন সময় চারদিকে তুমুল চিৎকার, ‘পাগলা হাতি! পাগলা হাতি!’ যে যেদিকে পারছে দৌড়চ্ছে।

ভাগীরথী দেখল, ওইটুকু সময়ের মধ্যে জঙ্গলের অতটা দূর থেকে কী করে যে ফিরে এসেছে আরতি। ভাগীরথীকে খুঁজতে খুঁজতে শুঁড় দিয়ে তাঁবুর পরদা ছিঁড়ে ঢুকে পড়েছে সার্কাসের মঞ্চে। দু’ চোখ ভরা জল নিয়ে সে এখন ভাগীরথীর সামনে!

অলঙ্করণঃ ইন্দ্রশেখর

জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s