গল্প

দেশের বাড়ির সাপের গল্প- অলকানন্দা রায়

SAMSUNG

ভাদ্র মাসের গুমোট গরম। মাঝেমধ্যে জোর বৃষ্টিও হচ্ছে। মাঠগুলোতে ধানগাছগুলো  লকলকিয়ে উঠেছে। ধানের ক্ষেতেও তখন জল। আমাদের জোয়ার-ভাঁটার দেশ বলে জল খুব একটা জমে থাকে না। কিন্তু বাগানে বা নীচু জায়গায় জোয়ারের সময় জল এসে গর্তগুলো বুজিয়ে দেয়। আর এই গর্তেই সাপেদের আস্তানা। মানুষ যে পরিবেশে থাকে, তার জন্য সেই পরিবেশই উপযুক্ত হয়ে ওঠে। বরিশাল জেলা নদীর দেশ আর এই নদীর ধার ঘেঁষেই বসতি এবং খালগুলো শিরা উপশিরার মত গ্রামের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে। প্রতি বাড়িতে দুটো-তিনটে করে পুকুর। জোয়ার-ভাঁটার দেশ বলে মাটি খুব উর্বর। বাগানে সাপ, বেজি, গোসাপ সব ঘুরে বেড়ায়। মাঝে-মধ্যে গৃহস্থ বাড়িতে এদের আগমন হয়। সব থেকে বেশি আসে সাপ। বর্ষাকালে সাপের খুব উপদ্রব হয়।

আমাদের বাড়িতে হাঁস পোষা হত। কার্বলিক অ্যাসিড ছড়িয়ে দেয়া হত ওদের ঘরে, তবু কী করে যে সাপ ঢুকত কে জানে। ফলে প্রায়ই হাঁস মরে যেত। সন্ধ্যের পরে বেরোলে টর্চ নিয়ে, না হয় হ্যারিকেন নিয়ে বেরোতে হত। গ্রামের সব বাড়ি প্রায় কাঁচা। খড়ের বা শনের চাল। সাপেরা সেই চালেও থাকত। কারুর চোখে পড়লে চিৎকার চেঁচামেচি, তারপর লাঠি দিয়ে মেরে ফেলা ছাড়া উপায় থাকত না। আমাদের বাড়ির উঠান বড়ো, বর্ষার সময়ে ইঁট পেতে দেওয়া হত এঘর থেকে ওঘরে যাবার জন্য। অনেক সময়ই কেউ যাচ্ছে, তা দেখে সাপ। সঙ্গে সঙ্গে হাঁকডাক, “ওরে! সাপ এখানে! লাঠি আন!” কত সাপ যে এভাবে মরেছে!

একবার আমার ছোড়দা একটা সাপকে লাঠি দিয়ে এমন জোর মেরেছিল যে মাথাটা ছিঁড়ে গিয়ে কোথায় যে পড়ল, কেউ আর খুঁজে পায়নি। গ্রামের বাড়িতে প্রচলিত বিশ্বাস আছে, সাপ আহত হলে ফিরে এসে কামড়ায়। ছোড়দার কান্ড দেখে রাঙাদাদা বললেন, “ভাইডি, কামডা ত ভাল কর নাই! যাই হোক, এবার আমরা মা মনসার নামে চাঁদ সওদাগর থিয়েটার করমু।”বেশ কিছুদিন পরে সাপের মাথাটা পাওয়া গেছিল রেনুদের চালের উপরে।

যা বলছিলাম; ভাদ্রমাসের ঘটনা। আমার দিদির তখন বিয়ে হয়ে গেছে। ভাদ্রমাসের প্রথম দিকে সে আমাদের বাড়ি এসেছিল।  শেষদিকে তাওইমশাই তাকে নিতে এসেছেন। দিদি তখন সন্তানসম্ভবা। গরমের জন্য মেঝেতে বিছানা করা হয়েছে পাটি পেতে। দু’পাশে মা ও দিদি, মাঝখানে আমি শুয়েছি। দিদি চলে যাবে, তার উপরে তাওইমশাই এসেছেন। পিঠেপায়েস হয়েছে সেদিন। মা, জেঠিমা মিলে আবার সেগুলো রান্নাঘরে গুছিয়ে রেখেছেন।

তখন কত রাত হবে কে জানে, মা’র ঘুম ভেঙে গেল রান্নাঘরের দিক থেকে একটা শব্দ শুনে। মা মশারি খুলে বেরিয়ে আস্তে করে জ্বালানো হ্যারিকেনটা বাড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে গেছেন। ভাবছেন বিড়াল, না কি বনবিড়াল আবার ঢুকল?

বড়োঘরের পর একটা শোবার ঘর, তারপর রান্নাঘর। মা গিয়ে দেখেন, সবই তো ঠিক আছে! আবার ঘরে ঢুকে মুখ ধুয়ে হ্যারিকেনটা রেখে পান খেতে বসেছেন। পানের নেশা ছিল মা’র। পানটা সবে গালে দিয়েছেন, দেখেন পায়ের দিকের মশারিটা খুব নড়াচড়া করছে। মা নিজের মনেই বলছেন,  “ছোডোমাইয়াটার শোয়া বড় খারাপ, কোথায় শুয়েছে আর কোথায় গেছে…মশারিটারে এবার ছেড়বে-”

কথাগুলো বলে আমাকে ঠিক করে শোয়াবেন বলে মশারিটা তুলেছেন যেই, অমনি “ওরে বাবা রে, মস্ত বড়ো সাপ যে মশারির মধ্যে!!” বলে চেঁচিয়ে উঠেছেন। দিদি তখন আধাঘুমে। মা’র চিৎকার শুনে সে-ও উঠে পড়েছে। মা বললেন, “ওরে টাইনগা বাইর কর।”

দিদি আমার হাত ধরে টেনে বের করছে আর আমি ঘুমের ঘোরে ভাবছি বুঝি ডাকাত এসে দিদিকে নিয়ে যাচ্ছে। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠেছি, “বাঁচাও বাঁচাও” বলে। সঙ্গেসঙ্গে বাড়ির এঘরের সব লোক উঠে পড়েছে। কেউ হাতে টর্চ,কেউ লাঠি নিয়ে হাজির।

তারপর তো মশারি পুরো খুলে দেওয়া হল। আলো জ্বালানো হল। “খোঁজ,খোঁজ-কোথায় গেল ?”

বড়দাও তখন বাড়িতে। বড়দা, বউদি, কবিরাজদাদারা উত্তরের ভিটের ঘরে শুতো। সব ঘর তন্ন তন্ন করে খোঁজা হল। নাঃ, কোথাও নেই।

“পলাইয়া গেছে!”

 মা বললেন যে যখন মশারি খুলছিলেন, তখন তাকে দেখেছেন উত্তর দিকের ঘরে তড়িৎগতিতে ছুটছে। ঘন্টা দুই খোঁজাখুঁজি হল। সবাই বলল, “তোমরা এবার ঘুমোও। ও নাই ঘরে।”

আমরা তো ভয়ে কাঁটা হয়ে আছি। শ্রীকান্তমামু, আমাদের জ্ঞাতিসম্পর্কের বোনপো, বড়দার চেয়েও বয়সে বড়-আমাদের জমির কাজ করতেন। খুব বুদ্ধিমান, বিশ্বাসী ও সাহসী ছিলেন। লোকজন চলে যাবার পর শ্রীকান্তমামু তামাক সেজে খাচ্ছেন, বড়দাও একটা জলচৌকিতে বসে আছেন। দুজনেই আলোচনা করছেন সাপটা গেল কোথায়? বেশ বড়ো সাপ। দুজনেই খুব সন্দিহান। বড়দা বললেন, “চল ছিরু,তুই আর আমি আর একবার দেখি।”

“চলেন মামা,” বলে দুজনে আবার ঘরে এসে খুঁজতে শুরু করলেন। বড়দার হাতে চার ব্যাটারির টর্চ, মামুর হাতে লাঠি। বড়োঘর শেষ করে পাশের শোবার ঘরে গেলেন। ঘরটা বেশ লম্বা ধরণের। একদিকে খাট পাতা। আলনা রয়েছে। বড়োঘর থেকে খাবার ঘরে যাবার দরজার ডানদিকে একটা বিরাট সাইজের মাটির জালা, দেশে বলে মটকি, বসানো ছিল মেঝেতে। সেটায় চাল রাখা হত। তখন সেটা খালি। বড়দা আস্তে আস্তে টর্চের আলো ফেলছেন। হঠাৎ করে মটকির মধ্যে আলো ফেলতেই দেখেন যে সমস্ত শরীর গুটিয়ে মাথাটা উঁচু করে বসে আছে সাপবাবাজি। একে তো এখন মারা যাবে না। তাহলে কী করা যায়? মটকির গা বেয়ে উঠতে পারা সম্ভব নয়। পালাবার সময় তাড়াহুড়ায় ভেতরে পড়ে গেছে নিশ্চয়।

পরামর্শ হচ্ছে, জেগে বসে থাকবে নাকি? বড়দা তখন মামুকে বললেন “যা রান্নাঘরে, রাত্তিরের খাওয়া সব কাঁসার থালা আছে। পাঁচ ছ’খানা নিয়ে আয়। ইঁট আন দুটো, পোলো আন  আর ঝাঁকি জাল।” পোলো হল বাঁশের তৈরি মাছ ধরার সরঞ্জাম। আমরা যে নেটের জাল দিয়ে খাবার ঢাকি, ঐরকম দেখতে অনেকটা, তবে ফাঁকগুলো একটু বড়ো বড়ো। উপরের জায়গাটা ফাঁকা। ওখান থেকে হাত ঢুকিয়ে মাছ ধরা হয়।

এরপর সেই মটকির উপর থালা চাপানো হল, তার উপরে দুটো ইট। তারপর পোলো চাপা, এর উপর জাল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হল।

“ব্যস,এবার নিশ্চিন্তে ঘুমোও। সকাল হোক,তারপর ব্যবস্থা,” বলে বড়দারা ঘুমোতে গেল। আমিওঘুমিয়ে পড়লাম। দিদি আর মা নতুন বিছানা পেতে শুলো, ঘুমোতে পেরেছে কি না জানি না।

সকালবেলা হইহট্টগোলে ঘুম ভেঙে গেল। ওরে বাবা, বাড়িতে যেন বাজার বসে গেছে। বাড়ির লোক ছাড়াও এবাড়ি ও বাড়ি থেকে লোক এসে গেছে। সবার কী কৌতুহল! গ্রামের বাড়িতে এই একটা ব্যাপার, কোথাও কিছু হলে মুহূর্তের মধ্যে সে খবর ছড়িয়ে পরে, “শোনছ নি,ওই বাড়ি একটা সাপ ঢুইক্যা গ্যাছে।”

আর সব থেকে মজার কথা ,সবাই পরামর্শ দেয়। গ্রামের সাপের উপদ্রব যেমন, লোকে তাদের মারেও তেমন। অত ভয় পায় না। আমাদের বাড়িতে আমার ছোড়দা ও রাঙাদাদা সাপ মারায় ওস্তাদ। তাদের সামনে সাপ পড়লে আর নিস্তার নেই।

আমি তো বিছানা ছেড়ে উঠেই ঘাটে গিয়ে চোখমুখ ধুয়ে একছুটে চলে এসেছি। যে ঘরে সাপ তার সামনের বেড়া বা পার্টিশন খোলা হচ্ছে। সামনেই খোলা লম্বা বারান্দা। খোলার পরে ঘরে বেশ আলো এসে গেছে। অনেকের হাতে লাঠি। রাঙাদাদার হাতে তার তৈরি সাপ ধরার ফাঁদ। শক্ত বাঁশের লাঠিতে বেড় দিয়ে ফাঁস বানানো হয়। মাছ ধরার ছিপে যেমন সুতো বেঁধে বড়শি বাঁধা হয়, তেমন করে পাতলা বেতের ফিতের মতন বাঁধা হয়। লাঠিটার মাথায় থাকে ফাঁস। সেই ফাঁসের বেতের প্রান্তটি থাকে ঝুলে, লম্বা মতন; যাতে সাপের মাথাটা ওই ফাঁসের মধ্যে ঢুকিয়ে বেতের প্রান্ত ধরে টান দেবে আর সাপের গলায় ফাঁস বসে যাবে। সাপকে তখন টেনে বের করে নিয়ে আসবে। তারপর বাঁশের লাঠির পিটুনি।

এ সাপটিরও  শেষ অবধি সেই ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

**********

আর একবার একটা বিরাট সাপ ধরা পড়েছিল আমাদের মন্দিরের পাশে। ছোটবেলা বাড়িতে সন্ধে দেখানোর কাজটা ছিল আমার। ঘরে লক্ষ্মীঠাকুর, মন্দিরে রাধাকৃষ্ণ, শিব, বিষ্ণু আর একপাশে ছিলেন কালাচাঁদ। বেশ বড়োসড়ো একটা মূর্তি। শুনেছি আমাদের দাদুর বাবা কবে অসুস্থ হয়ে স্বপ্নে কালাচাঁদকে পেয়েছিলেন। সেই থেকে তিনি বাড়িতে অধিষ্ঠিত। তাঁর পুজোর খুব একটা উপাচার নেই। বাতাসা বা সন্দেশ, তবে সঙ্গে থাকে একটি গাঁজার প্যাকেট। একদিন সকালে আমার সামনে একজন লোক এসে জেঠিমাকে বলল, “জেঠিমা, কাঁলাচাদের মানত করছিলাম পোলার অসুখের জন্য। পোলা ভালো হইছে, হেই জন্য পূজা লইয়া আইছি।”

তখন সাড়ে এগারোটা বাজে। জেঠিমা পুজো করছিল। আমি সেখানে ছিলাম, দেখলাম, জেঠিমা একটা থালায় বাতাসা সাজিয়ে দিলেন। কালাচাঁদের ঘটটা একটা হাঁড়ি দিয়ে ঢাকা থাকত। জেঠিমা হাঁড়িটা একপাশ থেকে একটু ফাঁকা করে গাঁজার পুঁটুলি ঢুকিয়ে আবার ঢাকা দিয়ে দিলেন।

সন্ধেবেলা যথারীতি আমি সন্ধ্যা দিতে গেছি। সন্ধ্যা দেখিয়ে কাঁসর, ঘন্টা বাজিয়ে ধূপ, প্রদীপ দেখিয়ে বেরোবো, হঠাৎ মনে হল দেখি তো কালাচাঁদকে যে গাঁজা দিয়েছে, তা কি সে  খেয়ে ফেলেছে? কৌতুহল যে কী মারাত্মক হতে পারে তার নমুনা পেলাম মুহূর্তের মধ্যে। আস্তে করে হাঁড়িটা যেই তুলেছি, বাবা গো বাবা গো বলে চিৎকার করে লাফিয়ে মন্ডপের বারান্দায় এলাম।

কিলবিল করে একগাদা সাপ বেরিয়ে এসেছে। সন্ধ্যেবেলা উঠানভর্তি লোকজন, ছেলেপিলে। বাবা তো সকাল সন্ধে নারায়ণের মন্দিরে এসে প্রণাম করবেন। অন্যরাও করে। অতএব সবাই এসে আমাকে ঘিরে ধরেছে, “কী হোইছে, কী দ্যাখছো মনু?”

কী বলব,ভয়ে কাঁটা হয়ে গেছি। বাবা বললেন, “ও মাগো, কী হইছে,ক দেহি !”

“সাপ সাপ,অনেক সাপ !”

“কোথায় দেখলি ?”

তখন একটু ধাতস্থ হয়ে বললাম সব। ছোড়দা তো শুনেই ঠাস করে এক চড়,  “অ্যাঁ,গাঁজা খাইছে নাকি দেখতে গেছ? বেশ হইছে, তোরে জড়াইয়া ধরল না ক্যান?”

জেঠিমা এসে ছোড়দাকে থামালেন, “ওরে এবার ছাড়ান দে, মাইয়াডা ভয় পাইছে,তার উপর তুই আবার ওকে মারলি ক্যান? যা, ঠাকুরঘরে ঢুইক্যা এবার দ্যাখ সাপগুলান আছে না গ্যাছে। কাল তো মুই ই আবার পূজা করতে ঢুকমু।”

“হয় হয়,এবার সব পোলাপান লইয়া সরো দেহি।মোরা এবার কাজে লাগি।”

সর্পবিশেষজ্ঞ রাঙাদাদার মন্তব্য, “ও দেবা, হ্যাজাকটা ধরা। হীরালাল লাডি লইয়া আয় দেহি।”

হ্যাজাক জ্বেলে দাদারা সব ঢুকে পড়ল মন্দিরে। সব জায়গা খোঁজা হল, কোথায় কী? পেছনের দিকে একটা নালি আছে, যেখান থেকে ঠাকুরঘরের জল বেরোয়। নালির পাশটা ভাল করে দেখা হল। কোনো চিহ্নই নেই সাপের। মন্ডপটা পশ্চিমমুখী। পেছনে পূব দিক। সেদিকটা ঘুরে চলে এলো দক্ষিণদিকে।

খুঁজতে খুঁজতে দেখে দেয়ালের গা ঘেঁষে নীচে একটা গর্ত। তখন সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল যে সাপ এখানেই। মাইজগাদাদা ছোড়দাকে বললেন, “ভাইডি, টর্চটা ভাল কইরগা ধর দেহি, এট্টু দেহি, ব্যাডারা যাবে কোনহানে?”

ছোড়দা টর্চটা গর্তের মুখে স্থির করে ধরে রইল। আর মাইজগাদাদা গর্তের একদম কাছে গিয়ে উবু হয়ে দেখতে লাগলেন। তারপরই তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন, “ওইতো দেহা যায় !! চক্ষুদুইডা চকচক করত্যাছে !”

ব্যস, রাঙাদাদা হুকুম দিলেন, “যা, বেতের আক্রা লইয়া আয় দেহি।”

বেতের আক্রা হল লম্বা সরু নাইলনের দড়ির মতন বেতের টেন্টাকল অংশ, সারা গা ভর্তি কাঁটা। ভীষণ শক্ত। এই কাঁটার মাথায় একটা ব্যাং লাগিয়ে সাপের গর্তে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ব্যাং হল সাপের প্রিয় খাদ্য। ব্যাংবাবাজি ভয়ে ছটফট করতে থাকে আর সাপবাবাজি এসে টপাস করে তাকে গিলে ফেলে। যতই গিলে নেয়, ততই কাঁটাগুলো গেঁথে যায়। কতক্ষণ আর এভাবে থাকতে পারে? কাবু হয়ে যায়; তখন আক্রার গোড়াটা ধরে সাপকে টেনে বের করে আনে।

এই সাপটি ছিল সাঙ্ঘাতিক শক্তিধর। সন্ধে থেকে সে দুটো ব্যাঙসহ আক্রা গিলে ফেলেছিল। আবার ব্যাঙের টোপ দেওয়া হল। রাত প্রায় বারোটা পর্যন্ত চলল এই কাজ। তারপর সবাই রণে ভঙ্গ দিয়ে শুয়ে পড়ল। বলে “বেয়ানে উইঠগ্যা আবার দেহা যাবে!”

আমরা ছোটরা খুব উত্তেজিত ছিলাম। পরদিন সকালসকাল উঠে পড়লাম। আর উঠেই মন্ডপের পাশে। সকালে খাওয়ার কথাও ভুলে গেছি। সর্পনিধনের সব সৈন্যসামন্তরাও হাজির।

“ঐ,ঐ দেহা যায়!”

“আরে,এ যে সাঙ্ঘাতিক কান্ড রে !”

কতরকম মন্তব্য। মা,জেঠিমা আমাদের খেতে ডেকে হয়রান। সবার কাজকর্ম শিকেয় উঠেছে।

একটু বাদে ছোড়দা এসে এক দাবড়ানি, “ছোডমনু, কানু, বেলা, যা খাইয়া আয় আগে। তোগো এত দ্যাহনের কী আছে ?”

এক দৌড়ে গিয়ে নাকেমুখে দিয়ে আবার দৌড়ে এসে বসলাম। আমরাও দেখতে পাচ্ছি সাপটার মুখটা একদম গর্তের সামনে, বেতের আক্রাটি প্রায় গিলে ফেলেছে। যেটুকু বেরিয়ে আছে, সেটা হাত দিয়ে ধরবার অবস্থায় নেই। আর সাপটা তো গর্জাচ্ছে। রাঙাদাদা তো গভীর চিন্তিত।

গ্রামের বাড়িতে কে আর ঘড়ি ধরে কাজ করে? তবে তখন মনে হয়, বেলা সাতটা, আটটা হবে। আমাদের মজিদদাদা এসে হাজির। মজিদদাদার বাড়ি হোগলা গ্রামে, ছোড়দার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব পাতানো ছিল, যদিও তিনি বয়সে বড়ো ছিলেন। পরে ছোড়দার চাইতে আমাদের পরিবারের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক হয়ে যায়। মজিদদাদা এসে দেখে গেলেন একবার। তারপর চলে গেলেন বাবার সঙ্গে দেখা করতে। এর মধ্যে বড়োবউ মজিদদাদার জন্য ভাত বেড়ে ডাকছে, ওদিকে রাঙাদাদারা ডাকছে। মজিদদাদা, “রাঙ্গাভাই,দাঁড়াও এট্টু,ভাত দুইডা খাইয়া আয়ি” বলে শেষে ভাত খেয়ে ,তামাক খেয়ে,পান গালে দিয়ে এসে পড়লেন ময়দানে। এপাশ থেকে ওপাশ শুধু পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। তারপর একটু চিন্তাভাবনা করে বললেন, “রাঙ্গাভাই, বড়ো বড়শি লইয়া আহ। দেহি চেষ্টা কইরগা।”

 নদীতে বড়ো মাছ ধরার বড় বঁড়শি নিয়ে আসা হল। লুঙ্গি গুটিয়ে, হাতে বঁড়শি নিয়ে মজিদদাদা এগিয়ে গেলেন গর্তের কাছে। তারপর চোখের পলক ফেলার আগে বঁড়শিটা গেঁথে দিলেন সাপের মুখে। তারপর তার সুতো ধরে আস্তে আস্তে টানতে লাগলেন। আমরা হাঁ হয়ে দেখছি, সাপটা আস্তে আস্তে সুতোর টানে বেরিয়ে আসছে। তিনটে বেতের আক্রা তার গলার মধ্যে, অবস্থা করুণ। ধীরে ধীরে পুরো সাপটা বের করে আনা হল। সে কী বিশাল লম্বা সাপ !! ব্যাং গিলে পেটটা ফোলা। তারপর খোনতা এনে গর্তটা একটু একটু করে খোঁড়া হল। কিলবিল করে বেরিয়ে এল একগাদা সাপের বাচ্চা। আমি তো এদেরই দেখেছিলাম!

“মোরে যে কইলা-ঠিক দেহি নাই? এখন দ্যাহো, দ্যাহো সক্কলে। তোমাগো কালাচাঁদের গাঁজা এরাই খাইছে…”

ছবিঃ মৌসুমী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s