গল্প

golpobotolerbhutuya01 (Medium)

অপর্ণা গাঙ্গুলী

ঘুরঘুট্টি আঁধার রাত। এমন রাতে ভূতের মায়ের ভিরকুট্টি পর্য্যন্ত দেখা যায় না আর এই রাতে কিনা আমার একটা বদখেয়াল চাপল! সত্যি বলছি,এইসব বদখেয়াল-টেয়াল চাপলে আমি বড্ডো কেমন ইয়ে হয়ে যাই। সেই সময়টা আমি আর নিজেকে রুখতে পারি না বাপু। ঘড়িতে দেখলুম রাত দুটো আর বাড়ির পাশের ঝোপেঝাড়ে অনেক জোনাকি ঝিকমিক করছে। ইচ্ছে হল,জোনাকি ধরব।

যেই না ভাবা,একটা বোতল নিয়ে বের হয়ে গেলুম বাইরে। জোনাকপোকা ধরে বোতলে রেখে আবার কিছুক্ষণ বাদে ওদের ছেড়ে দিলেই হল। বেশ লাগে দেখতে ওদের ঝিকমিক চিকমিক।

golpobotolerbhutuya02 (Medium)ঝিঁঝির ডাক,জোনাকির ঝিকমিক,আর আকাশে একটা ঘুম ঘুম ভূতুড়ে চাঁদ আর মিটমিটে তারা। মনটা বেশ খুশি খুশি হয়ে উঠল। একটা গান গেয়ে উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় দেখি,ও বাবা,জোনাকির বদলে এটা কী ধরলুম!একখানা মিচকে মতন জিনিস বোতলের মধ্যে হাত পা ছুঁড়ছে।

প্রথমে ভাবলাম ব্যাঙাচি,বলে যেই ছেড়ে দিতে যাচ্ছি,দেখলুম ভেতরের ব্যাপারটা চিৎকার-মিৎকার করে একশা করছে। আমাকে গালও দিচ্ছে বলে মনে হল। আগেই বলেছি আমার বদখেয়ালের কথা। ব্যাস, খেয়াল চাপল একে ছাড়ব না। যেই না ভাবা, বোতলের মুখ বন্ধ করে তাকে তো নিয়ে এলুম ঘরে। ইলেকট্রিকের আলোয় দেখি এইটুকুনি বাচ্চা মত একটা ভূত ধরেছি শেষে। আর সেও বেজায় হাত পা ছুঁড়ে আমাকে গালাগালি লাগিয়েছে দেশোয়ালি ভাষায়। বলছে “এ কঁহা সে আয়া রে, হামকো ভূত বোলকে চিল্লাতা হ্যায়, ম্যায় ভূত থোড়ি না হুঁ,ভূতুয়া বোলো ইয়া পিরেত,মগর ভূত কভ্‌ভি নহিঁ।”

“ইঃ! ভূতুয়া বলতে হবে ওনাকে! ওরে আমার ভূতুয়া রে,দাঁড়াও,হচ্ছে তোমার। কাল যদি না ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গিয়ে তোমার বারোটা বাজাই আমি!”

ভূতুয়াটা কী বুঝলো জানি না, সারারাত ওইভাবে চেঁচিয়ে-মেচিয়ে golpobotolerbhutuya03 (Medium)একশা করল আর আমার ঘুম উঠল শিকেয়। ভোর রাতে দেখলুম, সে ক্লান্ত হয়ে একটুকু ঘুমিয়েছে। দেখে ভারী মায়া হল। খুলে দিলুম বোতলের ছিপি আর অমনি তড়াক করে বেরিয়ে আমার কাঁধে চেপে বসল সেই বোতলের ভূতুয়াখানা। আমি তার সাহস দেখে ভারী আশ্চর্য হয়ে গেলুম। আমি হলুম গে প্রফেসর খিটকেল চট্ট। আমার কাঁধে ভূত? লোকে শুনলে ছ্যাছ্যাকার করবে যে! এত সাহস বঙ্কু বিল্লিরও তো কখনো হয়নি। আমি বললাম, “ও ভাই ভূতুয়া,নামো দিকিন ঘাড় থেকে।”

ভূত বলতেই ইচ্ছে করেছিল কিন্তু বেকার ঝামেলিতে গেলুম না আর কি! ভূতুয়া নামবে কী,সে তখন আমার কাঁধ বেয়ে তড়বড় করে চকচকে টাকের উপর উঠে বসেছে। উঠতে গিয়ে দু’বার সিলিপ খাওয়া সত্ত্বেও উঠে বসে দু’পা ঝুলিয়ে দিয়েছে আমার মাথার উপর।

এসব আমার বরাবর সয় না। ভারী বিশ্রী লাগে এসব আহ্লাদ। তাছাড়া আজ অবধি কেউ আমাকে এইভাবে রাগায়নি। ভূতুয়া বললে,“অব ক্যায়সে মজাক বাবুয়া, অর জাওগে ভূতুয়া পাকড়নে? একে কী বলে জানো? বলে ভূতে ধরা। এখন তুমি কী করবে?” সব কথা অবশ্য তার দেশোয়ালি হিন্দিতেই সে চালিয়েছিল।

“তবে রে,আমি কিনা বৈজ্ঞানিক! ইয়া ইয়া বই পড়ি আর এটা ওটা আবিষ্কার করে ফেলি ফস করে,আমার ঘাড়ে কিনা ভূত? মামদোবাজি নাকি?”

ভূত বোধহয় শেষের কথাগুলি শুনে ফেলেছিল। বললে, “মামদো নই আমি, আমি হলেম গিয়ে কেশো ভূতুয়া।” বলে খুক খুক করে একটু কাশি দিল।

আমার টাক সুড়সুড় করছে। ভয়ে বেশি কিছু বলতেও পারছি না, যদি ঘাড়ের কাছে নেমে এসে মটকে দেয়?

বললুম, “ভাই ভূতুয়া,তুমি নেমে যাও বাবা,আমি তোমাকে ছেড়ে দিয়ে আসছি।” সে ব্যাটা বললে, ও করলে তার নাকি ভারী নিন্দে হবে,একবার মানুষের ঘাড়ে উঠলে তেনারা নাকি এক ঘটি জল মুখে করে নিয়ে না গিয়ে নামেন না।

golpobotolerbhutuya04 (Medium)সর্বনাশ,তবে কি ওঝা,ঝাড়ফুঁক এইসবের কথা বলছে? সেরেছে,এ তো ভূতে ধরার আষাঢ়ে গপ্প ফেঁদেছে দেখছি! যত্তোসব কুসংস্কার। ভূত বড়জোর মানুষের সাথে থাকতে পারে, তাকে কিছু সাহায্য করতে পারে কাজেকর্মে, কিন্তু ঘাড়ে চাপা? কক্ষনো না। মনে মনে সাহস আনলুম বেশ করে। কিন্তু কা কস্য … কিছুতেই সে নামে না। আমার যে কী নিন্দে হতে পারে এসবে এই ভেবে আমি কেঁদে উঠলুম
ডুকরে, আর না পেরে। আর দেখলুম ভূতটা শুট করে নেমে এসে আমার নাকে ঠান্ডা হাত বুলুচ্ছে। ওফ কী সাহস! চোখ খুললুম ধীরে ধীরে। কিন্তু না,এ যে বঙ্কু বেড়াল! কোথায় ভূত? ওই তো সকাল হয়েছে। বঙ্কু আমাকে ডাকতে এসেছে রোজের মত। সারা ঘরে

ভূতুয়ার টিকিটি নেই,শুধু বোতলের মধ্যে ওটা কী? একটুখানি?golpobotolerbhutuya05 (Medium) এট্টুখানি চিরকুটে লেখা, “বুদ্ধু কাহিঁকা!” ক্যালেন্ডার এ চোখ পড়তেই দেখি, সর্বনাশ, আজ পয়লা এপ্রিল!

তবুও জানো,আজও তারা উঠলে,জোনাকি আলো জ্বাললে,বোতলের ভূতুয়ার কথা মনে পড়ে যায় আর প্রাণটা কেমন এলোঝেলো হয়ে যায় যেন।

ছবি মৌসুমী