সিনেমা হল ছোট্ট রাজপুত্র মহাশ্বেতা বর্ষা ২০১৬

আগের সংখ্যায়- কর্প্‌স্‌ ব্রাইড-মহাশ্বেতা

আন্তোয়াঁ দ্য স্যাঁত এক্সুপেরির যুগান্তকারী বই ‘ল্য পেতি প্র্যাঁস’[Le Petit Prince, trans. : The little Prince] এর চিরকালই বিশাল ভক্ত আমি। ছোটবেলা পড়ে সেটার একরকম মানে বুঝেছিলাম, তা ধোঁয়া ধোঁয়া হলেও মনের অতি গোপনে কোথাও যেন একটা স্পর্শ করেছিল। বড় হয়ে আবার একবার পড়ে অন্যভাবে গল্পটাকে বুঝেছিলাম, রাজপুত্র, বা গোলাপবফুলের চরিত্রগুলো অন্যরকম অর্থ নিয়ে চোখের সামনে দাঁড়িয়েছিল এসে তখন। আবার হয়তো ভবিষ্যতে কখনও পড়ব। তখন কী বুঝব কে জানে!

cinema57 (1) (Medium) কিন্তু সে যাহোক। এহেন একটা সরল অথচ কঠিন গল্পকে সিনেমায় রূপান্তরিত করা যে আদৌ সম্ভব তা কখনও ভাবিনি আমি। তাই গত বছর যখন শুনতে পেলাম এরকমই কিছু একটা হতে চলেছে, তখন মনে বড়োই আশঙ্কা জেগেছিল। কেমন হবে, কীভাবে গল্পটার বিভিন্ন সাঙ্কেতিক দিকগুলোকে ব্যক্ত করবেন পরিচালক, দেখতে কেমন হবে ছবিটা, এইসব নিয়েও চিন্তা ছিল।

cinema57 (2) (Medium)ইউটিউবে ট্রেইলারটা দেখে বিশেষ ভরসা হয়নি। পুরোন গল্পের নামমাত্র নেই তাতে, নতুন চরিত্র, নতুন গল্পের মধ্যে এক্সুপেরির গল্পের কিছু কুঁচি ঢুকিয়ে দিয়ে তার নামকরণ করেছেন পরিচালক ‘দা লিটল প্রিন্স।’ সত্যি বলতে কি রাগ হয়েছিল বেশ। ওরকম একখানা বইকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলবার অধিকার কে কাকে দেয়?

সে যাই হোক। বেশ কয়েক মাস পরে এক বন্ধু বলল ব্যাপারটা আদৌ সেরকম খারাপ কিছু নয়। বিশেষ কিছু না বলে সে আমায় ছবিটাকে দেখতে বলল একবার। সে ঠিকই বলেছিল, কারণ অনেকদিন পরে একটা সিনেমা দেখে মন ভরে গেল। পরিচালক গল্পটাকে আমূল পরিবর্তন করেছেন বটে কিন্তু তাছাড়া বোধহয় আর উপায় ছিল না। প্রতিবারের মত এবারও ছবির প্লটের একটু আভাস দিয়ে দিলাম।

একটা ছোট্ট মেয়ে। তার মা চায় সে সব বিষয়ে ফার্স্ট হোক। বিশাল খটোমটো একটা স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরীক্ষায় পাশ না করতে পেরে, বাড়ি বদল করে স্কুলের পাড়াতে চলে আসে তারা, যাতে আরও ভালো করে পড়াশুনা করে মেয়ে আবার সেই স্কুলে ভর্তি হতে পারে। মা এবার তার সাথে এনেছে একটা বিশাল বড়ো বোর্ড, তাতে মেয়ের গোটা জীবনের একটা সাংঘাতিক ছক বানানো রয়েছে। তাতে প্রতি বছরে, প্রতি মাসে, প্রতি সপ্তাহে, প্রতি দিনে, প্রতি ঘন্টায়, প্রতি মুহুর্তে সে কী করবে তার একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে। শুধু তাই নয় সে কোন জন্মদিনে কী উপহার পাবে তারও একটা ফর্দ রয়েছে সেখানে। কিন্তু তাই সই, মা মেয়ের হাতে তা ধরিয়ে দিয়ে অফিসে চলে যায় সক্কালবেলা, মেয়েও শান্তিমতে পড়তে বসতে যাবে এমন সময় তার নাকে একটা গন্ধ এসে লাগে।

cinema57 (3) (Medium)গন্ধটা আসছিল তাদের বিদ্ঘুটে পাশের বাড়ির থেকে। গোটা পাড়ায় এরকম দুটো বাড়ি নেই। সুন্দর ছিমছাম, মাপা মাপা সাদা বাড়ির ভিরে উঁচু, নড়বড়ে, বেখাপ্পা, গাছ-পালায় ঢাকা একটা বাড়ি, সারা গায়ে পায়রা বাসা বেঁধেছে, আর ছাদের ওপরে উড়ে চলেছে একটা ছেঁড়া ঘুড়ি। তাদের ছকে বাধা জীবনদর্শনের কাছে এইরকম বাড়ি তো একেবারে কদাকার লাগার কথা, আর লাগলও তাই। কিন্তু বাড়ির চেয়েও বেখাপ্পা হচ্ছে বাড়ির বাসিন্দা, একটা দাড়ি-ওয়ালা পাগলাটে বুড়ো। বাড়ির পেছনে নাকি একটা প্লেন বানাচ্ছে সে, মেয়েটি গ্যাসের গন্ধ পেয়ে যেই দেখতে গেল, ওমনি দেওয়াল ফুটো করে একটা বিশাল প্রপেলার ঘুরতে ঘুরতে বাড়ির দেওয়াল ভেঙে ঢুকে সব কিছু তছনছ করে দিতে লাগল।

cinema57 (4) (Medium)

তার পিছুপিছু এল লম্বা হাড়গিলে বুড়োটা। প্রপেলারটা তুলে নিয়ে চুপচাপ ফিরে গেল বাড়িতে, মেয়েটাকে যেন দেখতেই পেল না। এইভাবেই তাদের আলাপ। অনেক রাতে কাগজের প্লেনে ছোট্ট রাজপুত্রের গল্প লিখে সে পাঠিয়ে দেয় মেয়েটির জানালায় আর ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক কৌটো পয়সা ধরিয়ে দেয় তার হাতে। সেইটা গুনতে গুনতে বিভিন্ন অদ্ভুত জিনিস পায় মেয়েটা, একটা ছোট্ট ছেলের পুতুল, একটা ছোট্ট প্লেন, একটা শুকনো গোলাপ আর একটা সবুজ মার্বেল। তারপর সাহস করে মেয়েটা দেওয়ালের গর্ত দিয়ে ঢুকতেই দেখে ওপাশে এক অদ্ভুত দুনিয়া, সবুজ গাছে ভর্তি বাগান, ভাঙা প্লেন, গানবাজনা, হরেক রকমের খেলনা। সেখানে কোঙ্কিছুই দরকারের জিনিস নয়, সবিওই যেন খেলা। বড় হোয়ে যাওইয়া নম্বর ও কংক্রিটের এক বিশাল সমুদ্রের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের যেন একখানা ছোট্ট দ্বীপ বানিয়ে রেখেছে বুড়ো। এবার তাদের বন্ধুত্ব আর আটকায় কে?

cinema57 (5) (Medium)

বড়ো হয়ে ওঠা ও নিয়মের কঠিন বাঁধন যে তার জন্য অপেক্ষা করছে সেটাও সে জানে, কিন্তু বুড়ো বন্ধুর কাছে ছোট্ট রাজপুত্রের গল্প শুনে, ঘুড়ি উড়িয়ে, সুর্য্যাস্ত দেখে, রাত্রে টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে তারা দেখে সে তার গরমের ছুটিটা কাটিয়ে দিতে চায়, এত বছরের উপেক্ষা করা শৈশবকে উপভোগ করে নিতে শেখে সে। আর বুড়োও সাহারা মরুভূমিতে প্লেন ভেঙে পড়ার পর তার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, ছোট্ট রাজপুত্রের সঙ্গে দেখা হওয়ার বিভিন্ন গল্প বলবার একটা লোক পায়।

কিন্তু তাদের আনন্দ বড়োই ক্ষণস্থায়ী। খুব শিগগিরই তাদের এই বন্ধুত্ব ধরা পড়ে যাবে নিয়মের ফাঁদে, আর অসুস্থ বন্ধুকে বাঁচাতে ছোট্ট রাজপুত্রর খোঁজে তখন বেরোতে হবে মেয়েটিকেই। সিনেমায় কোন চরিত্রেরই কোন নাম নেই। মেয়েটি শুধু মেয়েই, বুড়ো লোকটি হল ‘এভিয়েটর,’ মা হল মা, আর গল্পের পটভূমিকা ফ্রান্স হলেও এটা যে কত সহজে ভারতীয় কোন শহরে ফ্ল্যাটবাড়িতে আটক কোন শিশুর গল্প হতে পারে তা হাড়ে হাড়ে বুঝছিলাম সিনেমাটা দেখে। শৈশব যে এখন বিশ্ব জুড়ে সঙ্কটে পড়েছে, পড়ার চাপে, নিয়মের বেড়াজালে নিজস্বতা হারিয়ে ফেলে রবীন্দ্রনাথের ‘তোতাকাহিনী’র সেই তোতা পাখি হয়ে যাচ্ছে শিশুরা, এটা তারই বিরুদ্ধে একটা শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। আর সিনেমাটা ৩-ডি অ্যানিমেশানে তৈরি হলেও, বুড়োর গল্পের জায়গাগুলো চিরপরিচিত স্টপমোশান অ্যানিমেশনের কাজ, কাগজ ও পিজবোর্ড দিয়ে ধোঁয়া, মরুভূমির বালি সমস্ত কিছু অদ্ভুত সুন্দর করে দেখানো হয়েছে।

এটা অতি অবশ্যই দেখে ফেলা দরকার ছোটদের আর তার থেকেও বেশি বড়দের যারা বড় হয়ে গিয়ে ভুলে গিয়েছেন তাদের ভিতরে লুকিয়ে থাকা শিশুটিকে।

কিছু তথ্য

নাম – দ্য লিটল প্রিন্স /বছর – ২০১৫ / ভাষা – ইংরিজি ও ফরাসি

দেশ – ফ্রান্স/কানাডা

পরিচালক – মার্ক ওসবর্ন