জাতক কথা গাব গাছ ও বানরদল নন্দিনী শীত ২০১৬

jataka59বহুদিন আগের কথা। হিমালয়ের এক জঙ্গলে একদল বানর থাকত। দলটা নেহাত ছোটোখাটো নয়,বরং বিরাট এক দঙ্গল ছিল তাদের। আর ঐ জঙ্গলের কাছেই ছিল কয়েকটামাত্র ঘর নিয়ে একটা ছোটো গ্রাম।

ঐ গ্রামে ছিল মস্তবড়ো একটা গাব গাছ। সে গাছে যখন ফল ধরত তখন ফলের ভারে ডালগুলো যেন নুয়ে পড়ত। আর তেমনি মিষ্টি তার ফল। বানরেরা ফল খেতে ভারী ভালোবাসে সে কথা সবাই জানে। আর সে ফল যদি হয় এই গাছের তবে তাদের আর পায় কে? কিন্তু সবসময় তাদের কপাল এত ভালো হত না। এই যেমনটি হল এবার।

বানর দলের একজন একদিন লাফাতে লাফাতে এসে খবর দিল, “ওরে ঐ গাব গাছটায় ফল ধরেছে রে। কিন্তু…..”

“কিন্তু কী?” সমবেত বানরকুল কিচকিচ করে জিজ্ঞেস করলো।

“গ্রামে এবার প্রচুর লোক রয়েছে” সংবাদদাতা বানর কাঁচুমাচু মুখে জানাল।

“তবে উপায়?” বানরেরা তো মহা চিন্তায় পড়ে গেল।

আসলে হয়েছে কী,  ঐ গ্রামের লোকেরা সারাবছর গ্রামে থাকে না। কখনোকখনো বাড়িঘর ছেড়ে গ্রাম খালি করে অন্য কোথাও চলে যায়। গ্রামে লোকজন না থাকলে তখন ওদের ভারী মজা। গাছে ফল ধরলে তখন সবাই মিলে সেগুলো সাবাড় করে।

কিন্তু এবার?

দল বেঁধে সবাই চলল দলপতির কাছে। বানরদের দলপতি অত্যন্ত বিচক্ষণ লোক। হুজুগে মাতলে তাঁর চলে না। এতগুলো বানরের ভালোমন্দের দাযিত্ব তো তাঁরই উপর।

সব শুনে তিনি বললেন, “না না বাছারা ,এবার আমাদের ওখানে যাওয়াটা ঠিক হবে না। ওরা তো গাছের চারধারে পাহারাও বসিয়েছে শুনলাম। তাদের হাতে নাকি আবার তীর ধনুক আছে।”

কিন্তু সবাই কি সে কথা মানে? হাতের কাছে এমন জিভে জল আনা টুসটুসে ফল!

দলের অনেকে ,বিশেষ করে ছোটোরা দলপতির কাছে বারবার অবদার করতে লাগল, “মহারাজ ,আমরা চুপি চুপি রাত্তিরবেলা যাব। তখন তো মানুষগুলো ঘুমোবে। ওরা কেউ টেরটি পাবে না।”

বারবার এভাবে আবদার করায় দলপতি শেষপর্যন্ত খানিকটা নিমরাজি হয়ে মত দিলেন। বললেন, “ঠিক আছে, যারা যেতে চাও যাও, কিন্তু খুব সাবধান।”

যেমনই অনুমতি পাওয়া সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা তৈরি হয়ে গেল। ঠিক হল, গ্রামের ঠিক বাইরে পাথরের আনাচেকানাচে ওরা লুকিয়ে থাকবে দিনের বেলা। নিশুত রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝলে তবেই নি‌:‍‌শব্দে গাছের কাছে  যাওয়া হবে ।

সবার মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা। প্রাজ্ঞরা শুয়ে গড়িয়ে সময়টা কাটিয়ে দিতে লাগল। আর ছোটোগুলো লাফালাফি ,খুনসুটি করে গাছের দিকে নজর রাখার দায়িত্বটা নিল। গাছের চারধারে দু-চারজন মানুষ সবসময়েই তীর-ধনুক নিয়ে ঘুরছে। বানরেরা গাছের কাছে যায় আর তাড়া খেয়ে লুকিয়ে পড়ে পাথরের আড়ালে। ভারী মজা,মানুষদের সাথে এই লুকোচুরি খেলায়! বড়ো বানরেরা একটু আধটু হাল্কা ধমক দিলেও ওরাও এই লুকোচুরি খেলার মজাটা নিচ্ছিল!

সন্ধে নামল। আকাশে তারার মেলা। গ্রাম আস্তে আস্তে নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। মাঝে মাঝে শেয়ালের দলের “হুক্কা হুয়া”। বানরদের চোখে কিন্তু ঘুম নেই। দলের এক একজন করে মাঝে মাঝে গাছে গাছে টহল দিয়ে  গ্রামের অবস্থা জানিয়ে যাচ্ছে দলের বাকিদের। ক্রমে সবাই যখন নিশ্চিন্ত হল যে গ্রামের সবাই ঘুমে অচেতন, তখন এক এক করে প্রায় সবাই উঠলো গাছের ওপর। শুধু দু-চারজন পাথরের আড়ালে পাহারায় রইল।

মনের সুখে সবাই পাকা গাব খাচ্ছে। এতদিন একঘেয়ে ফল খেয়ে খেয়ে সবারই মুখ যেন মেদা মেরে গিয়েছিল। আজ মুখের স্বাদ বদলে সবাই খুশ। একদলের খাওয়া শেষ হলে আরেকদল ,যারা পাহারায় রয়েছে তাদের সুযোগ দিতে হবে। দলপতির এমনই নির্দেশ।

সব ঠিকঠাকই চলছিল, এমনসময় একটা ঘরের আগল খুলে গেল। মশাল হাতে একজন বেরোল ঘরের মধ্যে থেকে। বেচারা বানরেরা! পাকা গাব খেতে এতটাই মশগুল যে তারা এসব কিছু টেরই পেল না।

আসলে হয়েছে কী, তখন তো গ্রামের ঘরে ঘরে প্রাকৃতিক কাজকর্ম করার জায়গা থাকত না, লোকে মাঠে ঘাটেই কাজ সারত। আর এ তো একেবারে হিমালয়ের কোল ঘেঁষা পাহাড়ি গ্রাম। এই লোকটি রাতদুপুরে প্রকৃতির ডাকে মশাল হাতে ঘরের বাইরে বেরিয়েছিল। অভ্যাসমতো গাছের দিকে মশালটা ধরতেই তো চক্ষু চড়কগাছ! গাছভর্তি বানর মহানন্দে টুসটুসে গাবগুলো খাচ্ছে।

আর যায় কোথা? লোকটা তো পরিত্রাহি চেঁচামেচি জুড়ল। ফলে মুহূর্তের মধ্যে গ্রামের মোটামুটি সবাই জেগে উঠল। হাতের সামনে যে যা পেয়েছে নিয়ে বেরিয়ে এল।

এই গাব গাছটা গ্রামের লোকেদের ভারী প্রিয়। গরিব মানুষ সব,ভালোমন্দ খাবার তো রোজ জোটে না, তাই গাব গাছে ফল ধরলে ওরা পালা করে গাছটা পাহারা দেয়। এখন রাত দুপুরে বানরেরা যে গাছে হানা দেবে এটা গ্রামের লোকেরা স্বপ্নেও ভাবেনি। সবাই রে রে করে তেড়ে এল। কারো হাতে সড়কি, কারো তিরধনুক, বল্লম, এমনকি যারা হাতের কাছে কিছুই পায়নি তারাও পাথর কুড়োতে শুরু করল। আজ এই বদমাশগুলোকে একেবারে শেষ করে ছাড়বে তারা।

বানরেরা ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করল। এখন পালাবে কোন পথ দিয়ে? গাছটা একটু ফাঁকা জায়গায়। আশেপাশে কোনো বড়ো গাছ নেই যেখানে লাফিয়ে পালাবে। আর নীচে নামার তো প্রশ্নই ওঠে না। তীর,সড়কির আঘাতে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যাবে।

গ্রামের সীমানায় যে সব বানরেরা পাহারা দিচ্ছিল তারাও বুঝতে পেরেছে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। দলপতি কিন্তু নির্বিকার। মিটিমিটি হাসতে হাসতে বললেন, “ঘাবড়িও না, সেনক ঠিক একটা ব্যবস্থা করবে।”

সেনক দলপতির ভাগ্নে। অত্যন্ত চৌকশ ছেলে। এই বয়সেই কী বুদ্ধিতে, কী সাহসে সে তার মামার যোগ্য উত্তরসুরী হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেনক গেল কোথায়? ভরসা রাখলেও বানরেরা মনে মনে একটু সংশয়ী হয়ে উঠল।ও কি তাহলে গ্রামের দিকে গেল? না:,ওদিকে যেতেও তো ওকে কেউ দেখেনি। তবে?                 

মোদ্দা কথা যেটা জানা গেল, দুপুরের পর থেকেই, মানে জঙ্গল থেকে বেরোনোর পর থেকেই তাকে কেউ দেখেনি। বানরদলের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। কয়েকজন জঙ্গলের দিকে এগোল সেনকের খোঁজে।

মাঝপথেই অবশ্য তার দেখা মিলল। ডালে ডালে লাফিয়ে সে এদিকেই আসছিল। আসলে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম যখন ভাঙল তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। আশেপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারল তাদের মহল্লা ফাঁকা । বানরেরা সব গ্রামে এসেছে মনে করে সে এদিকেই আসছিল।

খবর শুনে সেনক নিজের মনেই খানিক চিন্তা করল। তারপর লম্বা লাফ দিল গ্রামের দিকে। অন্য বানরেরা সব মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।

খানিক বাদেই গ্রামের ঐ প্রান্তে জ্বলে উঠলো আগুন। আবার নতুন করে আরেকটা হৈ-চৈ উঠল। তবে এবার চেঁচামেচিটা গাছের নীচ ছেড়ে যেন দূরের দিকে ধাওয়া করেছে। বানরদল হতবাক। কী যে হল ব্যাপারটা কারই বোধগম্য হচ্ছে না। তবে যাই হোক ,গাছের বানরেরা এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে দেরি করল না।

ততক্ষণে সেনকও ফিরে এসেছে। বেশ গ্রামভারী চালে সকলকে একনজর দেখে নিল সে। ভাবখানা— “কেমন দিলাম?”

বানরদের বিস্ময়ের ঘোর কাটছিল না। সেনকই শেষে ব্যাপারটা ভাঙল।  গ্রামের মধ্যে ঢুকে এদিকওদিক ঘুরে দেখতে গিয়ে ও একটা ঘরে আগুন জ্বলতে দেখে। কাছে গিয়ে দেখা গেল ঘরের মধ্যে এক বুড়ি ঘর গরম করার জন্য আগুন জ্বেলে রেখেছে। ও চুপি চুপি জানালা দিয়ে হাত গলিয়ে একটা জ্বলন্ত কাঠ বের করে নেয়। বুড়ি টেরও পায়নি। তারপরের কাজটা তো সহজ। এক বাড়ির চালে ঐ জ্বলন্ত কাঠটাকে টুপ করে ফেলে দেওয়া। ব্যস,তাতেই কেল্লা ফতে!  নিশ্চিন্তে সবাই এবার ফেরার পথ ধরল।

          *              *               *             *             *                *                *               *                 

এই গল্প বলে বুদ্ধেব শিষ্যদের বললেন, “সেদিন দলপতি হিসাবে আমার সিদ্ধান্ত ছিল, যে সবচেয়ে ভরসাযোগ্য তার উপর ভরসা রাখ। আর আমার এই প্রাজ্ঞতাই সেদিন দলকে বাঁচিয়েছিল। কাজেই হঠকারিতা নয়, চিন্তা ভাবনা করে যে কোনো পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।”

(তিন্দুক জাতক অবলম্বনে)

আগের জাতক কথা মরুভূমির পথে      ছোট্টো চড়াই ও বাজপাখি  

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s