জাতক কথা মরুভূমির পথে নন্দিনী চট্টোপাধ্যায় শরৎ ২০১৬

জাতক কথা

jatok01 (Medium)                                                

মরুভূমির পথে

নন্দিনী চট্টোপাধ্যায়

            উ:! আর একদিনের পথ!  তারপরেই এই ভয়ানক মরুভূমির কবল থেকে বেরোনো যাবে‌। এ পথ তো যে সে নয়! পথে না পাওয়া যায় জল,না খাবার, না জ্বালানী কাঠ। পাঁচশোটা গাড়ি নিয়ে বণিক যখন পথ চলা শুরু করেছিলেন তখন কত না উত্তেজনা সবার মধ্যে। আজ এতদিন ধরে ধূ ধূ বালিরাশির মধ্যে দিয়ে পথ চলে চলে সবাই ক্লান্ত।

            বণিক এর আগে অন্য অন্য দিকে গেছেন বাণিজ্য করতে। কখনো কোনো শহরে ,কখনো বন্দরে। সঙ্গে থাকে পাঁচশো গাড়ি জিনিসপত্র। মরুভূমির দিকে এই প্রথম।

             ঊনষাট দিন ধরে চলছে এই ক্লান্তিকর পথ চলা। দিনে কোনো জায়গায় শিবির করে গাড়ি গুলো একজায়গায় গোল করে দাঁড় করে তার ছায়ায় রান্না-খাওয়া সারতে হয়।তারপর তাঁবুর নীচে সমস্ত দিন বিশ্রাম।আর রাত হলে তারা দেখে দেখে পথ চলা ।আজ সবার মনে ভারী আনন্দ।কাল সকালেই পৌঁছনো যাবে শহরে।

            যখনকার কথা বলছি,তখন যানবাহন বলতে ডাঙায় ছিলো গরুর গাড়ি,আর জলপথে নৌকো।পথ চেনানোর জন্যে সব যাত্রীদলেই একজন করে লোক থাকতেন,যিনি আকাশের তারা দেখে পথ চেনাতেন।

            বণিক তাঁর দলের লোকজনদের বললেন,” বাড়তি জল, জ্বালানী সব ফেলে দাও। আর তো বেশি পথ নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা শহরে পৌঁছে যাব।”

            কারণ এটা তিনি আগেও দেখেছেন গাড়ি যত হাল্কা হবে বলদ ততো জোরে তা টানবে। আর তাহলে সূর্যোদয়ের আগেই দলবল নিয়ে তিনি শহরে ঢুকতে পারবেন।

            নিস্তব্ধ রাত্রি। চাঁদের আলোয় ধূ ধূ বালি চিকচিক করছে। গাড়ি চলছে ঢিমে তালে। গরুর গলার ঘন্টার টুংটাং শব্দ,গাড়ির মিঠে দুলুনি। ছই-এর নীচে সওয়ারিরা সব ঘুমে বিভোর। শুধুমাত্র পাঁচশো গাড়ির গাড়োয়ান একদম সামনের গাড়ির দিকে টানটান দৃষ্টি রেখে চলেছে। ওই গাড়িতেই তো রয়েছে তাদের পথ প্রদর্শক।

            সারারাত পথ চলে চাঁদ যখন প্রায় ডুবুডুবু ,চারদিকটা আলো -আলো হয়ে উঠেছে, তখন  কয়েকজন গাড়োয়ানের একটু সন্দেহ হল। কোথায় কী? কোনোদিকে কোথাও লোকালয়ের চিহ্ন তো দেখা যায় না? এমন সময় সামনের গাড়ি থেকে পথ প্রদর্শকের চিৎকার শোনা গেল–“গাড়ি ফেরাও,গাড়ি ফেরাও…”

            প্রবল শোরগোলে সবার ঘুম ভাঙল। ব্যাপারখানা কী? ব্যাপার শুনে তো সকলের আক্কেল গুড়ুম! সামনের গাড়ির পথপ্রদর্শকের কখন চোখটা একটু লেগে এসেছিলো,আর সেই অবকাশে গাড়িগুলো একদম ভুল পথে চলে এসেছে। মরুভূমিতে এমনি তো কোনো চিহ্ন থাকে না, তবুও ভালো করো আকাশটাকে দেখেশুনে বোঝা গেলো  গাড়িগুলো ঘুরেফিরে আবার গত দিনের জায়গাতেই ফিরে এসেছে।

            হায় হায়! এখন উপায়? বণিকের সঙ্গের লোকজন কপাল চাপড়াতে লাগল। কেউ বা পথপ্রদর্শককে এই মারে তো সেই মারে, “একজনের ভুলে আজ আমরা এতোগুলো লোক বুঝি বেঘোরেই মারা পড়লাম।” আর কেউ ভাগ্যের হাতে সবটুকু সঁপে দিয়ে কাঁদতে লাগল, “হায়রে! আমরা কেন খাওয়ার জল,জ্বালানী কাঠ স–ব রাস্তায় ফেলে এলাম গো? এমন হবে কে জানত? বাঁচার আর কোনো উপায় নেই…..”

            বণিক মহা বিপদে পড়লেন। কিন্তু হাল ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকার লোক তিনি নন। চিন্তিত মুখে তিনি এদিক ওদিক ঘুরে দেখতে লাগলেন।সূর্য উঠে গেছে।পায়ের নীচের বালি তাততে শুরু করেছে।আর খানিকক্ষণের মধ্যেই তা আগুন হয়ে উঠবে।

            এমন সময়–ওটা কী? বণিক সবিস্ময়ে লক্ষ করলেন এক জায়গায় দু-চার গাছি বড়ো বড়ো ঘাস জন্মেছে। বণিকের মনে একটু আশা দেখা দিল,”এখানে নিশ্চয়ই মাটির নীচে জল আছে, না হলে ঘাস কী করে হলো এই বালির মধ্যে?”

            সঙ্গের লোকজনদের ডেকে বললেন,”শিগগির এখানটা খোঁড়। মনে হচ্ছে জল পাওয়া যাবে।”

            যদিও সূর্যদেব এখন আগুন ছড়ানো শুরু করেছেন,তবুও জলের আশায় সবাই মিলে শাবল, কোদাল, গাঁইতি নিয়ে প্রবল উদ্যমে বালি খুঁড়তে শুরু করল। খুঁড়তে খুঁড়তে বিরাট গর্ত হয়ে গেল। কিন্তু জল কোথায়? এদিকে সুর্যের তাপ চড়চড় করে বাড়ছে। খিদে,তেষ্টায় সবার অবস্থা কাহিল। এইসময় কোদালের ঘা শক্ত কিছুতে পড়ল।বিরাট বড়ো একটা পাথর! আর আশা নেই! সকলেই হাল ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল।

            বণিক তখন গর্তে নেমে পাথরে কান পাতলেন। কী আশ্চর্য! কুলু কুলু জলের শব্দ! তাঁর মন আনন্দে নেচে উঠল। কিন্তু পাথরটা ভাঙবে কে? সঙ্গের লোকজনের যা অবস্থা তাদের দিয়ে কি একাজ হবে? তিনি তখন তাঁর খাস চাকরকে বললেন, “দেখ বাবা,পাথরটা ভাঙতে পারলে এতগুলো প্রাণীর প্রাণ বাঁচে।” 

           

অল্পবয়সি ছেলে, কাজে তার প্রচুর উত্সাহ। সর্বোপরি মালিক তাকে বলেছেন। অতএব চালাও গাঁইতি। ঘায়ের পর ঘা পড়তে লাগল পাথরে। দরদর করে ঘাম গড়াচ্ছে সমস্ত শরীর থেকে কিন্তু থামা চলবে না তার। একসময় পাথরের একটা কোণা ভেঙে গেল। কলকল করে জল বেরিয়ে আসতে লাগল সেখান থেকে। আ—-! কী শান্তি! রান্নার জ্বালানীর প্রয়োজন মেটাল গরুর গাড়ির ছই এর বাড়তি খড়গুলো।

            সেদিন আনন্দে সকলের চান খাওয়া হল। বিশ্রাম নিয়ে আবার রাতের পথ চলা।     

            তবে আজ আর পথপ্রদর্শকের ভুল হয়নি। সকাল হওয়ার আগেই বণিক তাঁর দলবল নিয়ে পৌঁছে গেলেন শহরে।

******

            এই গল্প বলে বুদ্ধদেব তাঁর শিষ্যদের কী শিক্ষা দিলেন?—-তাঁর শিক্ষা হল কখনো কোনো অবস্থাতেই নিরুৎসাহ হয়ে হাল ছেড়ে দিতে নেই। তাহলেই যে কোনো কাজে সফল হওয়া যাবে।

ছবিঃ সঙ্ঘমিত্রা

আরো একটি জাতক কথা -ছোট্টো চড়াই ও বাজপাখি -নন্দিনী চট্টোপাধ্যায়

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s