জাতক কথা লক্ষণ জাতক নন্দিনী চট্টোপাধ্যায় শরৎ ২০১৭

সমস্ত জাতক কথা একত্রে

“লক্ষণ,কালু” —

বাবার ডাকে দুই ভাই দৌড়ে এল।  অঘ্রাণের সকাল। সুন্দর ঝিকিমিকি রোদ উঠেছে। জঙ্গলের লাগোয়া গ্রামের ধানক্ষেতে যেন কেউ গলানো সোনা ঢেলে দিয়েছে। লক্ষণ আর কালু — রাজামশাই এর দুই ছেলে তাদের হাজার খানেক সঙ্গীসাথিদের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এদিক সেদিক। ওরা জানে আর কদিন বাদেই পালাতে হবে এখান থেকে। নইলে প্রাণে বাঁচা মুশকিল। দুজনে তাড়াতাড়ি দৌড়ে এসে বাবার সামনে দাঁড়াল। চোখে উত্কণ্ঠা।
“বাকি সবাইকে খবর দাও যে আমি ডেকেছি।”

সঙ্গে সঙ্গে দূতেরা ছুটল এ ক্ষেত, ও ক্ষেত। কিছুক্ষণের মধ্যেই জঙ্গলের মধ্যে ফাঁকা জায়গাটায় এসে সবাই জড় হল। রাজামশাই হঠাৎ এই অসময়ে ডেকে পাঠালেন কেন? জঙ্গলে কী কোন বাঘের দেখা পাওয়া গেছে? এ  ওকে  জিগ্গেস করে। কিন্তু উত্তরটা যে কারুরই জানা নেই।

রাজামশাই ধীরে সুস্থে লক্ষ্মণ আর কালুকে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন একটা পাথরের উপরে। গলাটাকে যথাসম্ভব গম্ভীর করে বলতে শুরু করলেন, “বাছারা,আমি বুড়ো হয়েছি। আর লক্ষ্মণ -কালু –আমার দুই ছেলেও বেশ উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। আজ থেকে তোমাদের সব দায়িত্ব এদের হাতে দিলাম। আমি যেভাবে এতদিন তোমাদের দেখাশোনা করেছি, বিপদে রক্ষা করেছি, এখন থেকে সে কাজ ওরাই করবে।”

লক্ষ্মণ,কালু একমুহূর্ত আগেও ভাবতে পারেনি যে  বাবা এরকম একটা কথা বলবেন।

কালু আমতা আমতা করে, “কিন্ত বাবা, আমরা কি আপনার মতো করে এতবড় দায়িত্ব সামলাতে পারব?”

“শোন বাছারা, তোমাদের মতো বয়সে একদিন আমার বাবাও এ দায়িত্ব আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আমি যথাসাধ্য তা পালন করার চেষ্টা করেছি। এবার তোমাদের সময় এসেছে।”

লক্ষ্মণ এতক্ষণ মন দিয়ে সব শুনছিল,একটাও কথা বলেনি। এবার সে মুখ খোলে, “বাবা, গ্রামের মাঠে ধান পাকা শুরু হয়েছে। আজকেই আমি লক্ষ করেছি মাঠে দু-এক জায়গায় ফাঁদ পেতে রেখেছে মানুষেরা। একজায়গায় তো আরেকটু হলেই কালু ফাঁদে পড়ত। গর্ত করে তার উপরে গাছপালা দিয়ে এমন ঢেকে রেখেছে যে খুব খেয়াল না করলে বোঝাই যাচ্ছেনা!”

সবাই মাথা নাড়িয়ে সায় দিল।

“তাহলে আর দেরি না করে কালকেই তোমরা প্রজাদের নিয়ে উঠে যাও  পাহাড়ের উপরে। অন্যবার একাজটা আমি করি, তোমরা সাহায্য কর। এবার তোমাদের দায়িত্ব। পুরো দলকে আধাআধি ভাগ করে নাও। একদলকে নিয়ে যাবে লক্ষ্মণ, একদলকে কালু। খুব সাবধানে যাবে। গ্রামের পাশ দিয়ে যাবার সময় খুব সাবধান। মানুষেরা কিন্তু টের পেলেই তির-ধনুক নিয়ে হামলা করবে। যাও, যে যার দল বুঝে নাও।”

সেদিন সারাটা দিন গেলো দল ভাগাভাগিতে। লক্ষ্মণ -কালুর বাবা বলে দিয়েছিলেন,”রাত থাকাতেই বেরিয়ে যাবে। দিনের আলোয় পথ চললে বিপদ বাড়বে। “

রাত গভীর। পূর্ণিমার চাঁদ একেবারে মধ্যগগনে। লক্ষ্মণ তার দলবলকে ডেকে তুললো। ঘুম ভেঙে সবাই হকচকিয়ে গেল। বুঝি সকাল হয়ে গেছে। চোখ সয়ে যেতে তবে ভুল ভাঙল। লক্ষ্মণ সবাইকে জড়ো করে রওনা হল। রাতের মধ্যে গ্রামের পথটুকু পেরিয়ে যেতে হবে। কালুকেও ডেকেছিল লক্ষ্মণ। কিন্তু তার ঘুম ভাঙাতে পারেনি। খুব সাবধানে সবদিক দেখে পথ চলে লক্ষ্মণ। কে জানে কোথায় কী ফাঁদ পাতা আছে? দলের সবাইকে বলা আছে একদম  তার পিছু পিছু আসতে। 

নিঝুম রাতে দু -একটা রাতচরা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। পূবের আকাশটায় যখন লাল রং ধরব ধরব করছে তখন ওরা গ্রাম ছাড়িয়ে পাহাড়ের পথে ওঠা শুরু করেছে। আর একটু এগিয়ে বিশ্রাম।

এদিকে জঙ্গলে যখন দু চারটে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে,আকাশটা ফর্সা হয়ে উঠেছে তখন কালু তার দল নিয়ে হাঁটা লাগাল। ভোরের মিঠে হাওয়ায় পথ চলতে বেশ ভালই লাগছে।

ক্ষেতের পাশ দিয়ে যাবার সময় এই দলটাকে দেখতে পেল গ্রামের দু -একজন। আর কী? কচি হরিণের নরম মাংসের লোভে গ্রামের লোকেরা তির -ধনুক -বর্শা নিয়ে এদের উপর চড়াও হল। বেগতিক দেখে কালু দৌড় শুরু করল। সঙ্গীরাও কালুর সাথে পড়িমরি দৌড় লাগাল।

দৌড় —দৌড় —-দৌড়—–

দিগ্বিদিকজ্ঞানশূণ্য হয়ে দৌড়তে গিয়ে বেশ কজন মাঠের ধারে  পাতা ফাঁদে পড়ে গেল, তির -বর্শার আঘাতেও বেশ ক’জন ঘায়েল হল। সারাদিন বেদম দৌড়ঝাঁপ করে সন্ধেবেলা কালুর দল গিয়ে পৌঁছল লক্ষ্মণের দলের কাছে। 
লক্ষ্মণ তার দলবলের সঙ্গে সারাদিন ভালই কাটিয়েছে। তিরতির করে বয়ে চলেছে ছোট নদী,তার ধারে কচি ঘাস হয়ে রয়েছে। বেশ দূর  থেকে গরুর গলার ঘন্টা শোনা যাচ্ছে। তার মানে ওই দিকে গ্রাম আছে। রাতের বেলা সাবধানে পেরোতে হবে। 

আবার রাতের বেলা পথ চলা।

“কালু,তোরা কালকের দিনটা বিশ্রাম নিয়ে   রাতের দিকে বেরিয়ে যাস। “

ধীরে -সুস্থে পথ চলে লক্ষ্মণের দল। লক্ষ্মণের  মতো নেতা সঙ্গে থাকলে আর ভাবনা কীসের? পথে ছোট ছোট যে দু -একটা গ্রাম পড়ল সে সব জায়গায় ওরা অতি সাবধানী। কাক পক্ষীটিও যেন টের না পায় হরিণের দল চলেছে। শেষ পর্যন্ত ভোরবেলা ওরা পৌঁছে গেল পাহাড়ের মাথায়। এখানে এখন বেশ কিছুদিন থাকতে হবে। যতদিন না গ্রামে ফসল কাটা শেষ হচ্ছে। দলে তো অনেকরকম হরিণ আছে। কেউ কেউ পাকা ধানের লোভ সামলাতে পারে না  আর তার ফল ভুগতে হয় গোটা দলকে। 

এবার কালুর দলের খবরটা একবার নেওয়া যাক। খেয়ে দেয়ে সারারাত বিশ্রাম করে কালু আর তার সঙ্গীসাথীরা পরিকল্পনা করলো,”কী দরকার সেই রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করার? তার চেয়ে ভোর ভোর বেরিয়ে পড়াই ভালো।”

যেই ভাবা সেই কাজ। ভোরবেলা গোটা দল রওনা দিলো হৈ হৈ করে। এদিনও আগের দিনের মতো হাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে সন্ধের মুখে কালুর দল পাহাড়ে উঠল। আজও দলের বেশ ক’জন মানুষদের হাতে ঘায়েল হয়ে ধরা পড়েছে।

যাই হোক, এভাবেই লক্ষ্মণ -কালু দুই ভাই-এর দিন কেটে যায়। এখানে খাবার -জল কিছুরই অভাব নেই। পাহাড়ের এতো উপরে মানুষজনও বিশেষ কেউ আসে না। আর এক আধজন আসছে খবর পেলেই ওরা লুকিয়ে পড়ে জঙ্গলের গভীরে।

শীতটা তখন যাই যাই করছে। তখন সবাই মিলে ঠিক করল এবার নীচে যাওয়া যেতে পারে। এতদিনে নিশ্চয়ই মাঠের ফসল কাটা হয়ে গেছে। কাজেই ফসল খেতে গিয়ে ধরা পড়ার ভয় কম। আর তাছাড়া এতদিন নিজেদের জায়গা ছেড়ে থাকতে কারুরই আর ভালো লাগছে না। 

লক্ষ্মণ আগেরবারের মতো মাঝরাতেই রওনা দিল। আর ঘুমকাতুরে কালুর বেরোতে বেরোতে  আকাশে সূয্যিমামার উঁকি মারার সময় হয়ে গেল। ফলে এবারও সেই আগেরবারের মতোই গোলযোগে পড়তে হল তার দলকে। 
শেষ পর্যন্ত অর্ধেক সঙ্গীকে রাস্তায় খুইয়ে কালু এসে পৌঁছল তাদের আস্তানায়। লক্ষ্মণ অবশ্য তার অনেক্ষণ আগেই পৌঁছে গেছে। রাস্তায় তার দলের ক্ষয় -ক্ষতিও হয়নি। তার সঙ্গী সব কজনই ফিরে এসেছে অক্ষত ভাবে।

******

বুদ্ধদেব গল্পের শেষে শিষ্যদের বললেন,”সে জন্মে আমি ছিলাম লক্ষ্মণ -কালুর বাবা। কথায় বলে না বুদ্ধিই  বল? দেখলে তো  কালুর হঠকারী কাজের ফলে গোটা দলকে কিভাবে ভুগতে হল? কাজেই সবসময় ভেবেচিন্তে কাজ করবে। “

ছবিঃ তিতিল

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s