জাতক কথা মূষিক জাতক নন্দিনী চট্টোপাধ্যায় বসন্ত ২০১৭

আগের  সংখ্যায়–গাব গাছ ও বানরদল

 

jatok01-medium

জঙ্গলের ধারে সে এক বিশাল মাঠ। ধূ ধূ করা তেপান্তরের মাঠ যেন। তার এক ধারে ইঁদুরদের বাসা।মাঠটা যেমন বিশাল ,ইঁদুরদের দলটাও তেমনি।কাজেই দলের রাজাকে সবসময়ি চিন্তায় থাকতে হয়।কারণ ইঁদুর বেচারাদের কি শত্রুর শেষ আছে? গাছের উপরে কাক-চিল তো মাটিতে বিড়াল-সাপ-শেয়াল,আরো কতো কী। ইঁদুরের মাংস পেলে এদের যেন আর কিছুই চাইনা। তাই ইঁদুর-রাজকে অনেক বুদ্ধি খাটিয়ে চারদিকে চোখ-কান খোলা রেখে চলতে হয়।তবে হ্যাঁ,রাজার যেমন বুদ্ধি,চেহারাখানাও তেমনই। একেবারে রাজার মতই।

মাঠের ঐ প্রান্তে ,ঠিক জঙ্গলের কিনারায় আছে এক শেয়ালের বাসা।অনেকদিন ধরেই তার নজর পড়েছে ইঁদুরদের উপর।কিন্তু বেচারা একটা ইঁদুরকেও বাগে পায়না!তবে অনেক ভাবনা চিন্তা করে এবার সে এমন একটা ফন্দি এঁটেছে,যাকে বলে একেবারে ওস্তাদের মার!দেখা যাক এবার কী করে বাছাধনেরা রক্ষে পায়?

*****

সে দিন সকালে ইঁদুরেরা গর্ত থেকে বেরিয়েছে খাবারের খোঁজে। কিছুদূর গিয়েই তো সবার চোখ গোল গোল। ওটা কী? একটা শেয়াল না? কিন্তু অমনভাবে একপায়ে সূর্যের দিকে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে  দাঁড়িয়ে আছে কেন?

ইঁদুর-রাজ শেয়ালের কাছে গিয়ে নমস্কার করে জানতে চাইলেন, “আপনি কে?”

শেয়াল গম্ভীর ভাবে জবাব দিল, “আমার নাম ধার্মিক।”

“কিন্তু আপনি এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কষ্ট হচ্ছে না?”

শেয়াল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কী করবো বলুন? কপাল! চারটে পা মাটিতে ফেললে আর দেখতে হবেনা।আমার ভারে পৃথিবীটাই উল্টে যাবে।”

“ও বুঝলাম।কিন্তু ওরকম হাঁ করে সূর্যের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন যে?”

“বুঝতে পারলেন না? সূর্যকে প্রণাম করছি তো।আর হাঁ না করে কী উপায় বলুন? আমি তো হাওয়া ছাড়া আর কিছুই খাইনা!” শেয়ালের চোখে-মুখে যেন এক অপার্থিব দীপ্তি।

শেয়ালের এই কঠোর তপস্যা দেখে ইঁদুর-রাজ মুগ্ধ। সেই থেকে সকাল-সন্ধে দুবেলা তিনি তাঁর দলবল নিয়ে শেয়ালকে প্রণাম করে যেতেন।এমন একজন তপস্বীকে হাতের নাগালে পাওয়া কি কম ভাগ্যের?

******

ইঁদুরদের দলটা এত বড়ো যে কদিন আগেও বাসায় একেবারে ঠাসাঠাসি করে থাকতে হত। কিন্তু এখন হঠাৎ বাসাটা যেন বড়ো হয়ে গেছে। সবাই বেশ হাত-পা খেলিয়ে থাকতে পারছে। ব্যাপারটা কী হল? ইঁদুরদের দলে একটা সাড়া পড়ে গেল। হিসেব নিয়ে দেখা গেল কদিন ধরেই মিন্তিপিসির ছোটোমেয়ে, খেন্তিমাসির ভাসুরপো,প টলদাদুর বড়ো নাতি–এরকম অনেকেই বেপাত্তা। না বলেকয়ে এতজন তো একসঙ্গে উধাও হতে পারে না! ব্যাপারটা সবার কাছেই গোলমেলে ঠেকতে লাগল।

ইঁদুর-রাজের কিন্তু সন্দেহটা পড়ল শেয়ালের ওপর। ও আসার পর থেকেই গন্ডগোলটা শুরু হয়েছে।  অন্যান্যদিন ইঁদুর-রাজ যখন বেরোয় তখন সে থাকে সবার সামনে। সেভাবেই শেয়াল-তপস্বীকে প্রণাম করতে যায়। আজ কিন্তু প্রণাম সেরে রাজা সবাইকে এগিয়ে দিয়ে নিজে রইলেন সবার শেষে। ইচ্ছে করেই যেন ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে লাগলেন রাজা।

শেয়ালও আছে তক্কে তক্কে। তার মনটা আজ একটু বেশি খুশি। অন্যদিনের থেকে আজকের ইঁদুরটার চেহারাখানা বেশ ভালো! যেমন নাদুস-নুদুস,তেমনই বড়োসড়ো। আহা! দেখে যেন মনে হয় ছোটোখাটো শুয়োরছানা একটা! শেয়ালের জিভ দিয়ে টসটস করে জল গড়ায়। উঃ! আর অপেক্ষা করা যায় না! সুড়ুৎ করে জিভের জলটাকে ভিতরে টেনে নেয় শেয়াল। আর তারপরেই এক থাবা।

কিন্তু আজকের ব্যাপারটা তো অন্যদিনের মতো হল না। এ ইঁদুরটা তো উল্টে ঘাড়ে উঠে পড়ল। ওরে বাবা! দাঁতের কী ধার! প্রথমেই লোভে পড়ে এই গাঁট্টাগোট্টাটাকে ধরাটাই ভুল হয়েছে।অন্যদিন ইঁদুরগুলোকে স্রেফ থাবা দেবার অপেক্ষা। এক থাবাতেই শেষ হয়ে যায়।আর তারপর খেয়েদেয়ে মুখ মুছে আবার ভেক ধরে দাঁড়াতে কতক্ষণ ই বা লাগে!

ইঁদুর-রাজের সঙ্গে শেয়াল যেন আজ এঁটে উঠতে পারছে না। ধারালো দাঁতে শেয়ালের সারা গায়ের মাংসে যেন লাঙল চালাচ্ছে। ফালা ফালা করে দিচ্ছে একেবারে। গলাটাকে কিছুতেই ছাড়ছে না। আঃ,দম শেষ হয়ে যাচ্ছে শেয়ালের। ইঁদুরটাকে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে যে পালাবে,সে জো কি রেখেছে? যে দিকে চোখ যায় সেদিকেই থিক থিক করছে ইঁদুরবাহিনী। শেয়ালের হেনস্থা দেখছে আর ফূর্তির যেন ফোয়ারা উঠছে  সেই দেখে! একে আজ সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি, তারপর এই যুদ্ধ,সারা গা দিয়ে রক্ত ঝরছে। অথচ প্রথম যখন ইঁদুরটা লাফ দিয়ে ঘাড়ে পড়ল শেয়াল তখন মনে মনে হেসে প্রাচীন প্রবাদ আউড়েছিল–‘পিপীলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে’। কিন্তু এই নরুণদাঁতীগুলোর দাঁতে যে এমন জোর কে জানত?

সূর্যের তেজ ক্রমশ বাড়ছে । গায়ের ক্ষতগুলো চিড়বিড় করছে। ইঁদুর-রাজ ও হাঁপিয়ে উঠেছিল। অতবড়ো একটা জন্তুর সাথে সমানতালে টক্কর দেওয়া কি চাট্টিখানি কথা? কিন্তু যতই ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন ওর গলাটা ছাড়া যাবে না। আজ ওকে চরম শিক্ষা দিতেই হবে। এতদিন ধরে এতজন ইঁদুরকে ঠকিয়ে এনে সাবাড় করার ফল একে পেতেই হবে।

শেয়ালটা প্রাণপণে এমন গা ঝাড়া দিচ্ছে যে প্রতি মুহূর্তে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। একবার তো প্রায় পড়েই গিয়েছিল। কোনোমতে শেয়ালটার কান কামড়ে ধরে আবার ঘাড়ে চড়েছে ইঁদুর-রাজ। আজকে বাছাধন একেবারে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে এতদিনের বদমাইশির ফল।আর আজ ইঁদুর-রাজ যদি মরেও যায় তবেও কি এই পাজি শেয়ালটা রক্ষে পাবে? সঙ্গের হাজার হাজার ইঁদুর ওর বারোটা বাজাবে। ইঁদুর-রাজ তো ওদের এখনো ডাকেইনি। একবার ডাকলেই ঝাঁকে ঝাঁকে সব ঝাঁপিয়ে পড়বে হতভাগাটার উপর।

ইঁদুরের পিঠটাও শেয়ালের নখের আঁচড়ে চিড়ে গিয়েছে। তাতে কী? ইঁদুর-রাজের এখন একটাই লক্ষ্য,কোনোমতে ওর গলার নলীটা কুচ্ করে কেটে দেওয়া। আর শেষ পর্যন্ত সুযোগটা এসেও গেল। শেয়ালের পিঠের উপর দিয়ে গিয়ে লেজ ধরে ঝুলে পড়েছিল ইঁদুর। বোকা শেয়ালটা যেই না ঘুরে কামড়াতে গেছে ইঁদুরকে, ইঁদুর সঙ্গে সঙ্গে আর দেরি না করে ওর গলা ধরে ঝুলে পড়েছে। আর তারপরেই সরু সরু ধারালো দাঁতে গলার নলীটা দিল কেটে। ব্যস, শেয়ালের সব জারিজুরি শেষ!  ইঁদুর-রাজ তখন বলল, “ছল করে ধর্মের ভেক ধরে মাংস খাবার সাধ এবার মিটল তো?”

বেচারা শেয়াল! তার আর কিছুই করার ছিল না,করুণ চোখে চেয়ে থাকা ছাড়া।

******

এই ইঁদুর-রাজ কে ছিলেন বুঝতে পারলে তো?।হ্যাঁ ঠিকই ধরেছ। সে জন্মে বোধিসত্ত্বই ছিলেন ইঁদুরদের রাজা।এই ভাবে শক্তি, বুদ্ধি ও সাহসের দ্বারা তিনি তাঁর প্রজাদের রক্ষা করে ছিলেন।

 

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s