জয়ঢাকি খবরকাগজ অরিন্দম দেবনাথ যমজের গ্রাম কোধিনি ৫ এপ্রিল ২০১৮

জয়ঢাকের খবরকাগজ–২০১৩ থেকে মনমতানো সমস্ত খবরের অর্কাইভ এইখানে

যমজের গ্রাম কোধিনি

কেরালার একটি ছোট্ট গ্রাম কোধিনি।জানা গেছে, বছর সত্তর আগে এই গ্রামে প্রথম জন্ম হয়েছিল যমজ শিশুর। বর্তমানে দু’হাজার জনবসতির গ্রামে সাতশোর বেশি যমজ মানুষের বাস। এখন পর্যন্ত কিনারা হয়নি যমজ রহস্যের। অরিন্দম দেবনাথের প্রতিবেদন।

মাথা খারাপ হবার উপক্রম। একটু আগে যেই কিশোরীটি রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই কিনা স্কুলে বসে? আর ওই ছেলেটা প্রায় এক কিলোমিটার দূরে লাল জামা পরে সাইকেল চালাচ্ছিল সে কিনা গাড়ির উল্টো দিক থেকে আসছে। সর্বনাশ, ওই দুই বৃদ্ধা হাত ধরাধরি করে হাঁটছে হুবহু একই রকম দেখতে। এ কি ভূতুরে কাণ্ড।

আমরা যমজ মানবসন্তান প্রায় সবাই কমবেশি দেখেছি। কিন্তু তাই বলে যেদিকে ঘাড় ঘোরানো যায় সেদিকেই একই মূর্তি জোড়ায় জোড়ায় হেঁটে শুয়ে বসে দাঁড়িয়ে? রীতিমত শরীরে শিরশির অনুভূতি এসে যেতে বাধ্য। এ-কেমন গা ছমছমে পরিবেশ? মাথা ঠিক রাখা দায়।

কেরালার মালাপুরম জেলার পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা গ্রীষ্মপ্রধান কোধিনি গ্রাম বিশ্বের নজর কেড়েছে এই গা ছমছমে ঘটনার জন্য। গ্রামের দু-হাজার বাসিন্দার মধ্যে দুশো কুড়ি জোড়া বাসিন্দাই যমজ। এটা হল ২০১৫ সালের নথিভুক্ত সংখ্যা। স্থানীয় চিকিৎসক ডক্টর কৃষ্ণা শ্রীবিজুর  মতে এই সংখ্যাটা আরও বেশি। তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো জোড়া। অনেক পরিবারই সন্তানদের যে কোন কারণেই হোক যমজ বলে নথিভুক্ত করাননি।

যমজ সন্তান কোন জন্মগত ত্রুটি নয়। তারা আর সকলের মতই সুস্থ ও স্বাভাবিক। প্রায় একইসাথে জন্মানো শিশুদুটি দেখতে ও আচারে ব্যাবহারে অধিকাংশ সময়েই অনুরূপ হয়। কখনও কখনও যমজ দুজনের এমন মিল থাকে যে একই পোশাক পরা থাকলে মনে হবে আয়নার প্রতিচ্ছবি।

এমনিতে ভারতে যমজের মানুষের সংখ্যা বিশ্বের গড়ের থেকে কম। গোটা বিশ্বে এই হার প্রতি ১০০০ জন্মে তেরোটা। ভারতবর্ষের জাতীয় হার হাজারে নটি। আর কোধিনিতে? গত সত্তর বছর ধরে সেখানে এই হার প্রতি হাজারে ৪৫ টি যমজ।  এই যমজদের কল্যাণেই গ্রামের নাম হয়ে গেছে ‘টুইন ভিলেজ’। এই যমজদের সৌজন্যে  রীতিমত পর্যটকদের আনাগোনা লেগে থাকে এই গ্রামে।

কোধিনি গ্রামের এই আশ্চর্য বৈশিষ্ট্যটা প্রথম নজরে আনে গ্রামেরই দুই যমজ মেয়ে সামিরা আর ফেমিনা। সেটা ২০০৬ সাল। গ্রামের স্কুলের ক্লাশ এইটের এই দুই ছাত্রী হঠাৎ খেয়াল করে, শুধু তাদের ক্লাশেই আট জোড়া বন্ধু যমজ। ব্যাপারখানা কী তা খুঁজে দেখবার জন্য অন্য ক্লাশগুলোতেও হানা দিল দুই বোন। তাদের দিদিমণিও কৌতুহলী হয়ে তাদের ক্লাস-প্রোজেক্ট আনিয়ে দিলেন সমীক্ষাটাকে।  সব ক্লাশ খুঁজে দুই বোন রিপোর্ট দিল মোট চব্বিশ জোড়া যমজ ছাত্রছাত্রী রয়েছে ইশকুলে।

এইবার বিষয়টা বড়দের নজরে আনতে বেশ একটা নাড়াচাড়া পড়ে গেল চারদিকে। ২০০৮ সালে গোটা গ্রামে এই নিয়ে একটা সমীক্ষায় ২৮০ জোড়া যমজের সন্ধান পাওয়া গেল। এইবার আর কারো সন্দেহ রইল না যা এখানে বিশেষ কিছু একটা ব্যাপার আছে।

আরও একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার লক্ষ করা যায় সে-সমীক্ষায়। গ্রামের পুরুষানুক্রমিক বাসিন্দারা তো বটেই, অন্য জায়গা থেকে সে-গ্রামে যারা অসয়াস করতে আসেন তাঁদেরও যমজ ছেলেপিলে হতে শুরু করে কিছুদিনের মধ্যেই।

 অনেকের কাছে এই গ্রাম এক অলৌকিক বসতি। কারণ, এই গ্রামের অসংখ্য জোড়ায় জোড়ায় মানুষ। সত্যিই তো ভুতুড়ে বা দৈব ব্যাপার না হলে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে এরকম হবে কেন?

এই গ্রামে যমজ শিশুর জন্মের ঘটনা কিন্তু খুব বেশি পুরনো নয়। জানা গেছে বছর সত্তর আগে এই গ্রামে প্রথম যমজ শিশুর জন্ম হয়। তার পর থেকেই উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে যমজ শিশুর সংখ্যা। শুধু ২০০৮ সালেই এই গ্রামে পনেরো জোড়া যমজ শিশুর জন্ম হয়। ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী এই গ্রামের জীবিত দুই যমজ বর্ষীয়ানের জন্ম ১৯৪৯ সাল। এই গ্রামের যমজদের নিয়ে বিশ্বের প্রথম “দি টুইন্স এন্ড কিন্স অ্যাসোসিয়েশান” গড়ে ওঠে।

ডক্টর শ্রীবুজির মতে সাধারণত একটু বেশি বয়সী মহিলাদের যমজ সন্তান হয়। দেখা যায় অধিকাংশ যমজ সন্তানের মায়ের উচ্চতা পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির উপর। কিন্তু কোধিনি গ্রামে ঠিক উল্টোটা ঘটছে। দেখা গেছে  কমবয়সী মহিলাদের যমজ সন্তান হচ্ছে। এই গ্রামের মেয়েদের সাধারণত আঠারো থেকে কুড়ি বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। আর এই গ্রামের মহিলাদের গড় উচ্চতা মাত্র পাঁচ ফুট।

পরিবেশ, বংশগতি, জৈবিক বিশ্লেষণ, এমনকি জিন পরীক্ষা করেও বিজ্ঞানীরা এখনও পর্যন্ত এই যমজ রহস্যের কোন কারণ খুঁজে বের করতে পারেননি। ডক্টর শ্রীবুজির মতে এই গ্রামের পুরুষ ও মহিলারা এমন কিছু খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করেন যার ফলশ্রুতি এই যমজ সন্তান। কিন্তু যেহেতু কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায় নি, তাই হতবুদ্ধি কোধিনি গ্রামবাসীদের কাছে এটা ভগবানের করুণা ছাড়া আর কিছু নয়।

 তবে বিজ্ঞানীরা কিন্তু বসে নেই। কোধিনি, ভিয়েতনামের হুং হিয়েপ, নাইজেরিয়ার ইগবো ওরা, ব্রাজিলের ক্যানডিডো গোদই—বিশ্বের এই জায়গাগুলোতে একইসঙ্গে এই যমজের প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা গিয়েছে। এই সবগুলো জায়গা থেকেই  যমজদের ডি এন এ, অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান এই সমস্তকিছুর নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গবেষণা চলছে প্রকৃতির সেই জাদুকাঠির যার ছোঁয়ায় এমন ম্যাজিক ঘটে চলেছে তিনটে মহাদেশের বিভিন্ন কোণায়।

তবে উত্তর এখনো মেলেনি। না মিলুক। পৃথিবীতে একটা দুটো রহস্য নাহয় থেকেই যাক না! সবকিছুর উত্তর পেতেই হবে এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে মানুষকে?

 

 

 

চিত্র – ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s