জয়ঢাকি খবরকাগজ অরিন্দম দেবনাথ প্রাণঘাতী স্কুলপথ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

জয়ঢাকের খবরকাগজ–২০১৩ থেকে মনমতানো সমস্ত খবরের অর্কাইভ এইখানে

প্রাণঘাতী স্কুলপথ

পৃথিবীর বহু দেশের শিশুদের অনেক কষ্ট করে স্কুল যেতে হয়। এমনকি অনেক সময় প্রাণ বিপন্ন করে। চিনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি গ্রামে শিশুদের প্রতিদিন পাহাড়ের গায়ে শতাব্দী প্রাচীন ঝুলন্ত মই বেয়ে আটশো মিটার পথ ওঠানামা করে স্কুলে যাওয়া ছাড়িয়ে গেছে সব দুর্গমতাকে। অরিন্দম দেবনাথের প্রতিবেদন  

মাত্র! মাত্র ৮০০ মিটার পাঁচিলের মত খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে হয় খুদেগুলোকে। বয়স! এই ছয় থেকে পনেরো! না, কোন পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে নয়। তার থেকেও বিপজ্জনক! পাহাড়ের গায়ে শতাব্দী প্রাচীন লতা আর বাঁশে  ঝোলানো দুর্বল মই বেয়ে পিঠে স্কুলের বইয়ের ভারি বোঝা কাঁধে চিনের সাইচুন (Sichun) প্রদেশের প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রাম আতুলের-এর (Atuler)  জনা পনেরো পড়ুয়াকে এ ভাবেই যাতায়াত করতে হয়। এটাই সম্ভবত এখনও পর্যন্ত খবর মেলা সবচেয়ে প্রাণঘাতী স্কুলের যাত্রাপথ।

দুর্গম পাহাড়ের মাথায় আলু, গোলমরিচ আর আখরোট চাষ করে দিন গুরজান করা, বাইরের দুনিয়া সাথে সড়ক যোগাযোগহীন ৭২টি  পরিবারের গ্রাম ‘আতুলের’। সে গ্রামের স্কুল একটা পাহাড়ের মাথায়। গ্রাম থেকে পাহাড়ের ৮০০ মিটার খাড়াই ঢালে ঝুলিয়ে রাখা ১৭টা মইপথ বেয়ে স্কুলে আসতে  হয় গ্রামের ছেলেমেয়েদের। তার থেকেও মারাত্মক অনেক জায়গায় কোন মইও নেই। পাশে নেই ধরার কিছু। একরকম হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করতে হয় পথের সে-জায়গাগুলোতে।

গ্রামের বাসিন্দারা এভাবেই বছরের পর বছর যাতায়াতে অভ্যস্ত। এই পথ বেয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে হাত-পা ফস্কে পাহাড়ের ঢালু গা বেয়ে কয়েকশো মিটার নীচে আছড়ে পরে মৃত্যুও হয়েছে অনেক গ্রামবাসীর। 

‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো অ্যাওয়ার্ড’ বিজয়ী চাইনিজ ফটোগ্রাফার চেন ঝি (Chen Jie) ২০১৬ সালে সোশ্যাল মিডিয়া উই-চ্যাটে, পিঠে স্কুলের ব্যাগ কাঁধে পাহাড়ের খাড়া গায়ে ঝুলতে থাকা এই গ্রামের শিশুদের ছবি সহ একটি পোস্ট দিয়েছিলেন এই ভেবে যে, তার তোলা ছবিগুলো হয়ত এই শিশুদের জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তন আনতে পারবে। তার পোস্টে তিনি লিখেছিলেন “আমি চোখের সামনে খুদেদের ওইভাবে ঝুলন্ত মই বেয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে দেখে আঁতকে উঠেছিলাম।”

চেন তিনদিন ধরে  ওই মই বেয়ে আতুল গ্রামে বেশ কয়েকবার যাতায়াত করেছিলেন। ছবি তোলা ছাড়াও,  ওই বিপদজনক যাত্রার ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে। ‘গার্ডিয়ান’ সংবাদপত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন “ওই যাত্রা শুধুমাত্র বিষম ভীতিকরই নয়। চলতে হবে একশো শতাংশ সতর্কতার সাথে। এ পথে একবার পদস্খলন মানে সটান পাতালে আছড়ে পড়ে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু।”  

চেনের এই পোস্ট সামান্য সময়ের মধ্যে আলোড়ন তুলল। বেজিংএর এক সংবাদপত্রে শিশু পড়ুয়াদের দুর্দশার খবর প্রকাশিত হতেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই খবর ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবী জুড়ে। সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যম ঝাঁপিয়ে পড়ল আতুল গ্রামের খোঁজ নিতে। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে পৌঁছতেই পারলেন না অনেকে! ঝুলন্ত মই বেয়ে পাহাড়ের মাথায় ওঠা ছাড়া বিকল্প কোন পথ না দেখে খবর সংগ্রহে পাঠান চায়ানার সরকারি দূরদর্শনের সাংবাদিক মিস যাহাং লি ভয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে গ্রামে যেতে অস্বীকার করলেন।

চিনের অনেক অঞ্চলেই বিছিন্ন ভাবে গড়ে ওঠা এই ধরনের সামান্য কিছু পরিবারের লোকবসতি আছে। মূলত শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতেই প্রাচীন কালে আদিবাসীরা এই ধরনের দুর্গম অঞ্চলে বসতি গড়েছিলেন। তারপর বংশপরম্পরায় ওই বসতিগুলো রয়ে গেছে। চিনের সামগ্রিক আর্থিক উন্নতির কোন প্রভাব পড়েনি মূল লোকবসতি থেকে অনেক দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই গ্রামগুলোয়। হতদরিদ্র এই সব গ্রামগুলো এখনও পরে আছে সেই আদিম যুগে। দীর্ঘ হাঁটাপথ, দড়ির মই, ঝুলন্ত সেতু, ডিঙিনৌকোই এই সব গ্রামে পৌঁছাবার মাধ্যম। আতুলের গ্রামও তার একটি। এই গ্রামের বাসিন্দারা তাদের জমিতে উৎপাদিত আলু, গোলমরিচ ও আখরোট পিঠে বেঁধে দেড় ঘণ্টা ধরে দড়িপথ বেয়ে নেমে কাছের বাজারে নিয়ে যায় বিক্রি করতে। আবার প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে আড়াই ঘণ্টা ধরে মই বেয়ে উঠে তবে পৌঁছয় গ্রামে।

এহেন নিস্তরঙ্গ জীবনযাত্রায় আলোড়ন তুলে দিল চিত্রসাংবাদিক চেন। চেনের দৌলতেই সরকারি কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসল। স্কুলের বাচ্চাদের এখন প্রতিদিন দেড়ঘণ্টা মইপথ বেয়ে নেমে আর আড়াই ঘণ্টা মই বেয়ে গ্রামে ফেরত যেতে হয় না। তারা এখন তাদের পাহাড়ি গ্রামের পাদদেশে অবস্থিত স্কুলের আবাসিক। মাসে মাত্র দুবার মইপথ বেয়ে গ্রামে যাতায়াত করে স্কুল থেকে। কিছুদিন হল, সরকারি তরফে বাঁশ-কাঠ-লতায় তৈরি মই বদলে সেখানে বসেছে লোহার মই।

একটি কেবল-কার সার্ভিস তৈরি হয়েছিল, কিন্তু গ্রামের বাসিন্দারা সেটি চালানোর বিদ্যুতের খরচ দিতে না পারায় এই পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায় অচিরেই।

পরিবহণ, শিক্ষা ও প্রকৃতি রক্ষা দফতরের পঞ্চাশ জন সদস্যকে নিয়ে গঠিত একটি সরকারি দল এই গ্রামকে উন্নত করার পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির খরচ এত বেশি যে সরকার ভাবছেন এই গ্রামকে একটু অন্য ধরনের পর্যটন কেন্দ্রে পরিবর্তিত করবেন। যেখানে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা খাড়া পাহাড়ের গায়ে দোল খেতে থাকা দড়ির মই বেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৌছবেন গ্রামে। কারণ গ্রামের লোকেরা তাদের পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে অন্য কোথায় বসতি গড়তে নারাজ।  

 

চিত্র সৌজন্যঃ ফিচার চায়না / বারক্রফট ইমেজেস।

     

Advertisements