জয়ঢাকি খবরকাগজ পাথর ঘর গ্রেট জিম্বাবুয়ে অরিন্দম দেবনাথ

জয়ঢাকের খবরকাগজ–২০১৩ থেকে মনমতানো সমস্ত খবরের অর্কাইভ এইখানে

জিম্বাবুয়ে নামের আফ্রিকান দেশটির দক্ষিণ-পূর্ব অংশের পার্বত্য অঞ্চলে  প্রায় ৯০০ বছরের পুরনো ১৮০০ একর জুড়ে গ্রানাইট পাথরে তৈরি এক বিশাল স্থাপত্য আছে। কোন রকম চুণের গাঁথুনি ছাড়া ড্রাই স্টোনওয়ালিং পদ্ধতিতে গড়ে তোলা, বর্তমানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত এই পাথুরে উপনিবেশে একসময় প্রায় ১৮০০০ লোক বসবাস করত। ইউনিস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ  সাইটের তকমা পাওয়া এই স্বল্প পরিচিত ধ্বংসস্তূপ এক বিস্ময়।

জিম্বাবুয়ে কথার অর্থ স্টোন হাউস বা পাথুরে বাড়ি। পাথরে তৈরি এই সাম্রাজ্য থেকে দেশটির বর্তমান নাম জিম্বাবুয়ে।

ড্রাই স্টোনওয়ালিং পদ্ধতিতে বাড়ি ঘর বানাতে প্রয়োজন স্থাপত্য কলায় অসাধারণ দক্ষতা। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকাংশ ঘরবাড়ি এখনও অটুট। মিশরের পিরামিডের পরেই আফ্রিকা মহাদেশের আর এক বিস্ময় এই পাথর ঘরের সাম্রাজ্য। স্থানীয় পার্বত্য এলাকা থেকে শক্ত গ্রানাইট পাথর কেটে ইঁট বানিয়ে সেগুলো পরপর সাজিয়ে তৈরি হয়েছিল এই পাথরের ঘরবাড়ি, সৌধ,  প্রাচীর। অনুমান প্রায় ৩০০ বছর ধরে গড়ে উঠেছিল এই পাথুরে শহর।

কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে জানা গেছে জিম্বাবুয়ের দক্ষিণ পূর্বে মাসিভিনগো শহর থেক ৫৬ কিলোমিটার দূরে মুতিরিকিউ লেকের কাছে এই পাথুরে ঘরের সাম্রাজ্য  তৈরি হয়েছিল ১১০০ খ্রিস্টাব্দে। কারা তৈরি করেছিল এই নগর  এই নিয়ে মতানৈক্য থাকলেও অধিকাংশ  পুরাতত্ত্ববিদের মতে  ‘সোনা’ (Shona) বংশীয়  গোকোমেরে (Gokomere) সভ্যতার সোনা উত্তোলনে বিশেষজ্ঞ কোন পুরুষ এই সাম্রাজ্যের পত্তন করেছিলেন। আর এই পাথুরে শহর ছিল তাঁর রাজপ্রাসাদ। বান্টু, লেম্বা ও কারাঙ্গা উপজাতীয়রা মিলে গড়ে তুলেছিলেন এই বিশাল স্থাপত্য।  

কিছু পুরাতত্ত্ববিদের মতে  সমতলের জিম্বাজি ও লিমপোপো নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে স্বর্ণখনি থেকে উত্তোলিত সোনা জমিয়ে রাখা হত এই পাথুরে শহরের রাজপ্রাসাদে। প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু চওড়া পাথরের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এই শহর ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে পরিত্যক্ত হয়েছিল। অনুমান ব্যাপক আবহাওয়ার পরিবর্তনে জলের অভাব , প্রাকৃতিক  বিপর্যয়, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জিম্বাজি নদীর অববাহিকায় সোনার অপ্রতুলতা এবং এই শহর থেকে বহু দূরে নতুন সোনার খনি খুঁজে পাওয়ায় ব্যবসা কমে যাওয়ার কারণে এই পাথুরে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন এখানকার বাসিন্দারা।

কোন লিখিত ইতিহাস নেই এই সাম্রাজ্যের।১৫৩১ সালে  মোজাম্বিক দেশের সোফালা প্রদেশের পর্তুগিজ সামরিক বাহিনীতে সৈন্য সরাবরাহকারি  এক ক্যাপ্টেন, ভিসিনেট পিগাডো, এই পরিত্যক্ত শহরের কথা লিপিবদ্ধ করেছিলেন তাঁর নথিতে। পেগাডো লিখেছিলেন যে স্থানীয়রা এই প্রাসাদকে বলেন ‘সিমাবাও’ যার অর্থ ‘রাজদরবার’।

উনবিংশ  শতাব্দীর মাঝামাঝি   ইউরোপিয়ানদের পা পরে এই পাথর নগরীতে। ১৮৬৭ সালে অ্যাডাম রেন্ডার নামে আফ্রিকার দক্ষিণের এক জার্মান-আমেরিকান শিকারি তথা স্বর্ণসন্ধানী ও ব্যবসায়ী এক শিকার অভিযানে গিয়ে এই পরিত্যক্ত পাথুরে সাম্রাজ্য পুনরাবিষ্কার করেন।১৮৭১ সালে তিনি কার্ল মুখ নামের এক জার্মান অভিযাত্রী তথা আফ্রিকান ভূগোল বিশেষজ্ঞকে এই স্থাপত্য দেখাতে নিয়ে যান।কার্ল এই স্থাপত্য দেখে প্রথমেই ধরে নিয়েছিলেন যে এই পরিত্যক্ত শহরের সাথে সেই সময় মুখে মুখে চর্চিত বাইবেলে বর্ণিত রাজা সলোমনের ধনসম্পদের যোগ আছে। যোগ আছে দক্ষিণ আরবের শেবার(বর্তমান ইয়েমেন) রানির রাজপ্রাসাদের। একটি কাঠের দরজার চৌকাঠ দেখে তাঁর মনে হয়েছিল শেবার রানির রাজপ্রাসাদের আদলে তৈরি এই পাথুরে শহর।যদিও এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘদিন ধরে এই নগরীর কথা সেভাবে প্রকাশ করতে দেননি তৎকালীন রোডেশিয়ান সরকার। পুরাতত্ববিদের রীতিমত চাপ দেওয়া হয়েছিল এই স্থাপত্য কীর্তি  যে কালো চামড়ার আফ্রিকানদের তা যেন প্রকাশ না পায়। রোডেশিয়া স্বাধীন দেশে পরিণত হলে নব্য দেশের পরিচালকবর্গ প্রাচীন পূর্বপুরুষদের এই মহান কীর্তিকে জাতীয় সৌধের স্বীকৃতি দেয় ও এই পাথুরে নগরীর নামে দেশের নামকরণ করেন জিম্বাবুয়ে। আর এই সৌধের নাম দেন ‘গ্রেট জিম্বাবুয়ে’। ‘গ্রেট জিম্বাবুয়ে’ নামকরণ এই কারনেই যে কাছাকাছি আরও প্রায় ২০০ টি ছোট  ছোট পাথর ঘরের সাম্রাজ্য খুঁজে পাওয়া গেছে জিম্বাবুয়ে ও পাশের দেশ মোজাম্বিকে। 

পুরাতাত্ত্বিক খনন থেকে জানা গেছে চতুর্থ শতক থেকে এই অঞ্চলে মানুষ বসবাস করতে শুরু করেছিল। সে সময় এই  উপত্যকায় খুব ভাল ফসল হত। লৌহআকরিক খুঁজে পাওয়া গেছিল এই অঞ্চলে আর তাই দিয়ে লোহার সরঞ্জাম বানাতে শিখেছিলেন  এখানকার মানুষজন। কিন্তু সে সময়কালে কোন পাথুরে ঘর বানাননি এখনাকার বাসিন্দারা।এই শহর তৈরি হয়েছিল অনেক পরে।

এই পাথুরে নগরীটি ছিল তিন  ভাগে বিভক্ত। ‘হিল কমপ্লেক্স’ , ‘ভ্যালি কমপ্লেক্স’ও ‘গ্রেট এনক্লোজার’ । পুরাতাত্ত্বিক যে সব নিদর্শন এই পাথুরে শহরের ‘হিল কমপ্লেক্সে’ পাওয়া গেছে তাঁর মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হল ‘জিম্বাবুয়ে বার্ড’। তিন ফুট উঁচু নকশা করা পাথরের বেদীর ওপর আঠারো ইঞ্চি লম্বা  পাখির মূর্তি। যার পা দুটো মানুষের হাতের মত আঙুলবিশিষ্ট। মোট  আটটি পাখি মূর্তির সংখ্যা লিপিবদ্ধ আছে। তবে এর বেশি পাখির মূর্তি ছিল এই শহরে। পাখির মূর্তি সহ অধিকাংশ পুরাকীর্তিই প্রত্নতত্ত্ব লুঠতরাজদের কল্যানে লোপাট হয়ে গেছিল লোকচক্ষুর অন্তরালের  পরিত্যক্ত আদিম এই শহর থেকে। ১৮৮৯ সালে প্রথম চুরির ঘটনা জানতে পেরে রোডেশিয়ার শাসকরা পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছিল পরিত্যক্ত এই শহরে।  তারা এসে জানিয়েছিলেন যে অনেকগুলো একইরকম দেখতে পাখির বেদি তাঁরা দেখেছেন কিন্তু সেগুলোর ওপরের অংশটা সম্পূর্ণ ভাঙা। দুর্ভাগ্যবশত এর পরেও বেশ বেশ কয়েকটি পাখির মূর্তি চুরি গেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জিম্বাবুয়ে সরকার এর অধিকাংশই উদ্ধার করতে পেরেছিল। মূর্তিগুলো ছিল হিল কমপ্লেক্সের ভেতরে।হিল কমপ্লেক্স ছিল উপাসনার জায়গা।

জানা চুরির প্রথম ঘটনাটা  ঘটিয়েছিলেন ১৮৮৯ সালে এক  ইউরোপিয়ান শিকারি  উইলি পোসেল্ট। তাঁর ডায়েরি থেকেই জানা গেছে, জার্মান অভিযাত্রী কার্ল মুখের কাছ থেকে  এই পাথুরে শহরের কথা জেনে তিনি এক সঙ্গীকে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন পরিত্যক্ত এই নগরীতে। স্থানীয় অধিবাসীরা ওঁকে বারণ করেছিলেন ঝোপ জঙ্গলে ঢাকা পবিত্র ওই নিষিদ্ধ শহরে ঢুকতে। কারো কথা না শুনে তিনি ওই পাথুরে সাম্রাজের মধ্যে প্রবেশ করে বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখতে পান। তার মধ্যে পাখির মূর্তিগুলো ছিল সবচাইতে আকর্ষণীয়। তিনি সবচাইতে ভাল পাখির মূর্তিটিকে বেছে নিয়ে সেটিকে মাটি থেকে খুঁড়ে বের করতে উদ্যত হলে দূরে দাঁড়িয়ে তাঁর কার্যকলাপ লক্ষ করতে থাকা এক উপজাতীয় নেতা আণ্ডিবিজি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে  অস্ত্রশস্ত্র সহ উইলিকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়।  উইলি অনুমান করেছিলেন যে এরকম ঘটনা ঘটতে পারে। তাই আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন। সঙ্গী ক্লাসকে বলে রেখেছিলেন সঙ্গে আনা দুই  বন্দুকে গুলি ভরে রাখতে। উইলি ক্লাসকে বললেন বন্দুক তাক করতে এবং স্থানীয় উপজাতির লোকেদের বললেন কেউ আক্রমণ করার চেষ্টা করলেই তারা সরাসরি গুলি চালাবেন।স্থানীয় উপজাতির লোকেরা বন্দুকের শক্তি ভালই জানতেন।তাই উদ্যত দুই বন্দুকের সামনে থেকে তারা পিছিয়ে গেলেন।

উইলি বুঝতে পারছিলেন এত ভারী মূর্তি তাঁদের দুজনের পক্ষে  উঠিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই মাটি খুঁড়ে মূর্তিটি ঢুকিয়ে ঘাস লতাপাতা দিয়ে চাপা দিয়ে তখনকার মত খালি হাতে চলে এলেন।

তারপর আবার কিছুদিন পরে ফিরে গিয়ে উপজাতীয় নেতা আণ্ডিবিজি ও তাঁর লোকজনকে কম্বল ও অনান্য জিনিসপত্র উপহার দিয়ে মূর্তিটিকে নিয়ে ফিরে এসে কেপটাউনের সিসিল রোডেস নামে এক ধনকুবেরকে বিক্রি করে দিলেন। রোডেস মূর্তিটিকে যত্ন সহকারে বসালেন তার লাইব্রেরিতে। তিনি ধরে নিলেন এই পাখি ঈশ্বর তাকে আরও সৌভাগ্য  এনে দেবে। তিনি এইরকম অসংখ্য পাখির মূর্তি কাঠে খোদাই করিয়ে তার বাড়ির সিঁড়িগুলোর ধার মুড়ে  দিলেন। শুধু তাই নয় আসল মূর্তির তিনগুণ বড় একই পাখির মূর্তি পাথরে খোদাই করিয়ে তার ইংল্যান্ডের বাড়িতে বসালেন।

এই সব দেখে তদানন্তিন ব্রিটিশ সাউথ আফ্রিকা কোম্পানির শাসকদের টনক নড়ল। জেমস বেন্ট নামক এক ভদ্রলোকের অধীনে একটি দল বানিয়ে শুরু হল পাথুরে শহরে অনুসন্ধান।

‘জিম্বাবুয়ে বার্ড’, জিম্বাবুয়ের জাতীয় প্রতীক। এদের পতাকায়, এদের মুদ্রায় সমস্ত সরকারি সিলমোহরে আছে এই পাথুরে পাখির উপস্থিতি।

‘গ্রেট এনক্লোজার’ ছিল রাজাদের থাকার জায়গা।নানান আকৃতির পাথুরে ঘর বিভিন্ন উচ্চতার অন্তর্বর্তী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। তাঁর মধ্যে সবচাইতে বড় প্রাচীরটি ৩৬ ফুট উঁচু পাঁচ ফুট চওড়া ৮২০ ফুট লম্বা।সাহারা মরুভুমির শেষে এত বড় সুপ্রাচীন দুর্গসদৃশ সৌধের খোঁজ এখনও পর্যন্ত আর পাওয়া যায়নি। ‘গ্রেট এনক্লোজারের’ ঠিক মাঝখানে আছে ৩০ ফুট উঁচু ১৮ ফুট গোল মোচা আকৃতির এক মিনার।      

‘ভ্যালি কমপ্লেক্স’ আবার দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। আপার ও লোয়ার ভ্যালি কমপ্লেক্স।বিভিন্ন বৃত্তির প্রজাদের মর্যাদা অনুযায়ী বাসস্থান ছিল এই দুই অংশে। কিন্তু পুরো শহরটাই ছিল শক্তপোক্ত পাথুরে প্রাচীরের সুরক্ষা বলয়ে।

অনেক পুরাকীর্তি লুঠ হয়ে গেলেও পুরাতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে বিভিন্ন ধরনের বাহারি মাটির পাত্র, পাথরের মূর্তি, লোহার ঘণ্টা, তামার মুদ্রা, কাঁচের পুঁতি, কাজ করা হাতির দাঁত, লোহা ও তামার তার, লোহার নিড়ানি, ব্রোঞ্জ নির্মিত বল্লমের ফলা, তামার পিণ্ড ও ধাতু গলাবার পাত্র, সোনার পুঁতি ও নানান ধরনের সোনার গয়না ও সোনার খাপ পাওয়া গেছে এই পরিত্যক্ত শহর থেকে।

পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী এই পাথুরে শহর একটা সময় ছিল জমজমাট আন্তর্জাতিক ব্যবসাকেন্দ্র। বিভিন্ন আরব দেশ ছাড়াও এই শহর থেকে ভারত মহাসাগরের ধারে বর্তমান তানজানিয়া দেশের সোয়াহিলি উপকুলের কিলওয়া সমুদ্র বন্দর থেকে ব্যাবসা চলত ভারতবর্ষ হয়ে সুদুর চীন দেশ পর্যন্ত।এই শহরে খুঁজে পাওয়া তামার মুদ্রার অনুরূপ মুদ্রা পাওয়া গেছে কিলওয়াতে। চীনদেশে তৈরি কাঁচের সামগ্রী ও নানাবিধ বাহারি মৃৎশিল্পের নিদর্শন মিলেছে এই শহরে। বিদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য সামগ্রী ও নুনও আমদানি করা হত এই শহরে। মূলত সোনা ও হাতির দাঁত চালান যেত এই শহর থেকে। আরব দেশে চালান যেত কৃষি সামগ্রী ও গবাদি পশু।অনুমান প্রায় ৬০ হাজার কেজি সোনা উত্তোলন করা হয়েছিল সেই সময় এই পরিত্যক্ত শহরের কাছের স্বর্ণখনি থেকে।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s