জয়ঢাকি খবরকাগজ বন্ধু শ্রীজ্ঞান ১৮ জানুয়ারি ২০১৮

জয়ঢাকের খবরকাগজ–২০১৩ থেকে মনমতানো সমস্ত খবরের অর্কাইভ এইখানে

বন্ধু

শ্রীজ্ঞান

দেখলে ভিডিওটা? এইবার তার আশ্চর্য গল্প শোনোঃ

মানবিকতা শব্দের সংজ্ঞা কী? মানবিক মুল্যবোধ। অর্থাৎ যে মুল্যবোধ মানুষের। মানবজাতির।
কিন্তু এই যে মুল্যবোধ, এ কি কেবল মানুষের সম্পত্তি?
কী বলছ, তাই?
তাহলে শোনবলি। তার আগে বল, জলের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড ওজনের এক বিশালাকৃতি তিমি যদি ক্রমশ তার শরীর দিয়ে তোমাকে ঠেলতে থাকে, তাহলে তুমি ভয় পাবে কিনা?
অবশ্য ন্যানও পেয়েছিলেন। আঠাশ বছর ধরে তিমিদের নিয়ে কাজ করার পরেও।
ন্যান হুশার সামুদ্রিক প্রাণীদের উপর গবেষণায় এক পরিচিত নাম। কুক আইল্যান্ড নিবাসী ন্যান, তেষট্টি বছর বয়সেও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন কুক আইল্যান্ড ও বাহামার তিমি, ডলফিন ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীদের নিয়ে।
সেদিন ন্যান এবং তার টিম কুক আইল্যান্ড থেকে একটু দূরে একটি তিমিকে নিয়ে কাজ করছিলেন। জলে নেমে হ্যাম্পব্যাক (কুঁজো পিঠ) তিমিটিকে পরখ করছিলেন ন্যান। এমন সময় জলের মধ্যে তিমিটি তাঁকে হঠাৎ ঠেলতে শুরু করে।
প্রথমে ন্যান ভয় পেয়ে যান। তাঁর জবানিতে, “আমি বুঝতে পারিনি তিমিটি আসলে কী করতে চায়। আঠাশ বছর কাজ করেও এরকম ঘটনার সম্মুখীন আমি কোনদিন হইনি।”
“শুরুতে আমি ভয় পেয়েছিলাম। কারণ ও যদি জোরে ধাক্কা মারে বা ওর ডানার ঝাপটা যদি জোরে লাগে, তাহলে আমার হাড়ভাঙা বা শারীরিক ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল। এমনকি ও আমাকে ওর ডানা দিয়ে বেশি জড়িয়ে ধরলেও আমি ডুবে যেতে পারতাম। তাও আমি কোনরকম প্যানিক করিনি। কারণ জানতাম সেটা ওকে আরও সন্ত্রস্ত করে তুলতে পারে।”

‘প্রায় দশমিনিট ধরে আমাকে ঠেলে নিয়ে এসেছিল ও। দীর্ঘদিন ধরে আমি প্রাণীদের সাথে সময় কাটিয়েছি। তাই আশঙ্কিত হয়েও আমি মাথা ঠান্ডা রেখে ভাবার চেষ্টা করছিলাম কী করে এই অবস্থা থেকে বেরোন যায়।”

কিছুক্ষণ বাদে জলের উপরে উঠে ন্যান বুঝতে পারেন যেখানে তিনি ছিলেন সেখানে আসলে একটি টাইগার শার্ক ছিল যার থেকে তাকে আসলে বাঁচাচ্ছিল তিমিটি। জলে শুধুমাত্র তিমিটিকে খেয়াল করার জন্য যাকে দেখতে পাননি ন্যান। পরে, বেশ খানিক দূরে ভাসমান প্রাণীটার লেজের নড়াচড়ার পার্থক্য দেখে বুঝতে পারেন(তিমির লেজ ওঠানামা করে, হাঙরের লেজ সোজা জল কেটে বেরোয়)। যখন তিমিটি তাকে দূরে সরাচ্ছিল আরেকটি তিমি ক্রমাগত পাখার ঝাপটায় হাঙরটিকে দূরে সরিয়ে রাখছিল।

ন্যানের সঙ্গী ফোটোগ্রাফার প্রথমবার কোন তিমির ছবি তুলছিলেন বলে তিনি বুঝতেও পারেননি কতটা অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী তিনি হয়ে রইলেন। যদিও ন্যানের টিম পুরো ঘটনাটির ভিডিও করেন। জলার তলার ভিডিওতে যদিও দেখে মনে হয় যে ন্যান তিমিটিকে ছুঁচ্ছেন, কিন্তু ন্যানের মতে, তিমিটিই বারবার জোর করে তার শরীর স্পর্শ করছিল।
“একমাত্র অসুস্থ বা সমুদ্রতটে আটকে পড়া বাদ দিলে আমি কোনদিন কোন তিমিকে স্পর্শ করিনি,” ন্যান হাসছিলেন, “একসময় আমিই তিমিদের হ্যারাস করার বিষয়ে আইনকানুন বানিয়েছিলাম। আর সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল এখন তিমিরাই আমাকে হ্যারাস করছে।”
হ্যাম্পব্যাক তিমিদের এই আচরণ নতুন নয়। এর আগেও তাদের নিজের প্রজাতির ছোটদের, অন্য প্রজাতির তিমি, সীল, ডলফিন প্রভৃতি প্রাণীকে বাঁচাতে দেখা গেছে।
ডলফিনদেরও এইরকম সাহায্যের বহু ঘটনা রয়েছে। কিন্তু কোন তিমি কোন মানুষকে বাঁচাচ্ছে, এই ঘটনা এই প্রথম দেখা গেল।
“জীববিজ্ঞানে ‘অল্ট্রুইজম’ বলে একটি কথা আছে। এর মানে হল, কোন প্রাণীর নিজের কোন লাভ ছাড়া, এমনকি নিজের ক্ষতি করেও অন্য প্রাণীর ভালো করা। হ্যাম্পব্যাক তিমিদের ক্ষেত্রেও এটি দেখা যায়। তারা অনেকসময় তাদের বিশালাকৃতি ডানার নীচে সীলেদের লুকিয়ে রেখে তাদের কিলার হোয়েলদের থেকে বাঁচায়। এ বিষয়ে রবার্ট পিটম্যান বলে একজন বিজ্ঞানী একটি গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেছেন।”
বোটে ওঠার পরও, ন্যান কুক আইল্যান্ডে নিরাপদে না পৌঁছনো পর্যন্ত তিমিটি তাঁকে অনুসরণ করে।  
 “আঠাশ বছর ধরে আমি ওদের রক্ষা করতে চেয়েছি, অথচ সেই মুহূর্তে আমি বুঝতেও পারিনি, ওরাও একইভাবে আমাকে রক্ষা করে এসেছে।”

তথ্যসূত্রঃ ডেইলি মিরর

 

Advertisements