টাইম মেশিন ইতিহাসের খন্ডচিত্র- মালেরকোটলা ও গুরুর আশীর্বাদ দীপঙ্কর চৌধুরী বসন্ত ২০১৯

মালেরকোটলা গুরুর আশীর্বাদ

দীপঙ্কর চৌধুরী

দৌড় দৌড় দৌড়!

দুরন্ত গতিতে ঘোড়সওয়ারদলটি ছুটে চলেছে আনন্দপুর থেকে দূরে ঐ শিবালিক পর্বতমালার দিকে। এই দলে রয়েছেন গুরুজির মাতা ষাটোর্ধবর্ষীয়া গুজরী দেবী, আর দুই নাবালক পুত্র জারোয়ার সিং আর ফতেহ্‌ সিং, যথাক্রমে ৯ আর ৬ বছর বয়স তখন তাদের। প্রায় ত্রিশজন বিশ্বস্ত সহচর তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে এঁদের পাহারা দিয়ে দিয়ে  নিয়ে চলেছে শিবালিক পাহাড়ের কোলে বিলাসপুর রাজ্যের দিকে। এই ঘটনা শিখ-সম্বৎ ২৩৭-এর, অর্থাৎ খৃষ্টাব্দের হিসেবে ১৭০৫। মুঘল মসনদে তখনও আসীন আওরঙ্গজেব আলমগীর, যদিও মারাঠাদের নিয়ে ব্যতিব্যস্ত বাদশাহ্‌ এ-ঘটনার তেইশ-চব্বিশ বছর আগে থেকেই দক্ষিণে খুঁটি গেড়ে বসে আছেন; জিবনের শেষ সাতাশ বছর তাঁর দক্ষিণেই কাটে, ও ১৭০৭-এ এন্তেকাল হয় আহম্মদনগর দুর্গে।

তা, এঁরা সেই পৌষ মাসের প্রবল পাঞ্জাবী শৈত্যে শিবালিক পর্বতের পথে কোথায় চলেছেন? বৈকালও হয়ে এসেছে, দিগন্তে অকালের মেঘ ঘনীভূত।

এর কারণ জানতে যে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে।

***

দশম শিখগুরু গোবিন্দ সিং (১৬৬৬-১৭০৮ খৃ.)!   ভারতবর্ষের ইতিহাসের একজন শ্রেষ্ঠ যুগপুরুষ। মহান যোদ্ধা, ধর্মগুরু, দার্শনিক, আবার এক কবি ও নাট্যকার। হিমালয়ের হেমকুণ্ডে তপস্যা করে তিনি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন বলে কথিত আছে। অসম্ভব সুপুরুষ মানুষ। তাঁর মাত্র চুয়াল্লিশ বৎসরের জীবনে যা যা হাসিল করে গেছেন গুরু গোবিন্দ্‌ , ইতিহাসে তার জুড়ি মেলা ভার।

এক প্রতিবাদী ধর্মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন তিনি, যার নিরিখে তাঁর স্থান মহাবীর ও বুদ্ধদেবের পরেই। শিখপন্থের জন্ম তাঁরই হাতে। আর এটা করতে দিল্লির সঙ্গে অবিরাম লড়াই করে যেতে হয়েছে গুরুজিকে।সারাজীবনে মোট তেরোটি ছোটবড় সম্মুখসমরে জড়িয়ে পড়েন তিনি মুঘলশক্তির সঙ্গে।তার মধ্যে আনন্দপুর সাহিবে হয় একটি প্রধান যুদ্ধ (১৭০৪ খৃ.), যেখানে সৈয়দ খান আর রমজান খানের মতো দুই মোগল সেনাপতি শিখদের সঙ্গে সম্মুখসমরে নিহত হন। দিল্লি থেকে তখন সিরহন্দের সুবেদার ওয়াজির খানের নেতৃত্বে পাঠানো হলো আরো বিশাল এক বাহিনী, যারা সম্মুখসমরে শিখদের হারানো অসম্ভব বুঝে আনন্দপুর ঘিরে থানা গেড়ে পড়ে রইলো বৈশাখ থেকে পৌষ—এই নয় মাস। রসদ-পানি সব বন্ধ। শেষে মোগলবাহিনী একটা রফায় এলো যে  নারী ও শিশুদের অন্ততঃ সেখান থেকে চলে যেতে দেওয়া হবে, অতঃপর চলবে বাতচিৎ। হ্যাঁ, সেই মোতাবেকই ১৭০৪-এর ডিসেম্বরের সেই অপরাহ্নে  দুই নাবালক পৌত্রকে নিয়ে পিতামহী অশ্বপৃষ্ঠে চলেছিলেন সেই পার্বত্যরাজ্যের উদ্দেশ্যে।

কিন্তু, না। তাঁদের সেদিনের যাত্রা মোটেই সুখকর হয়নি। আনন্দপুর ছাড়বার কিছুক্ষণ পরেই পূর্বপরিকল্পনা মতো গোধূলির আঁধারে মস্ত একদল অশ্বারোহী সৈন্যদল এসে ঘিরে ফেলল তাদের। মাতাজির দলের সাত-আটজন তখন কিছুটা এগিয়ে গেছে। দুই শাহজাদাকে নিয়ে একটু পিছিয়ে পড়া দল দুইটিই ধরা পড়ে গেল মুঘলবাহিনীর হাতে। টেনে নিয়ে গেল তাদের সিরহিন্দের দরবারে, মনসবদার ওয়াজির খাঁ-র সমীপে।

***

এর পরের গল্পটুকু বলবার আগে , সময়ের নিরিখে, এস, আমরা এগিয়ে আসি  প্রায় তিন শতাব্দী।

১৯৮০র দশকে তখন পাঞ্জাবে ভয়ংকর উগ্রপন্থী হানা চলছে। দিল্লির এক নামী সংবাদ-সাময়িকীর সাংবাদিকদল সমগ্র পঞ্জাব চষে ফেলছেন খবরের সন্ধানে। সঙ্গরুর জেলার মালেরকোটলা নামক তালুকে এসে এঁদের একটি অদ্ভুত  অভিজ্ঞতা হলো। এই যে সারা পাঞ্জাব জুড়ে হানাহানি কাটাকাটি চলছে, কিন্তু কৈ মালেরকোটলাতে তো একটিও খুনখারাপির খবর নেই?! আশ্চর্য!এবং মালেরকোটলা হলো আজকের পাঞ্জাবের একমাত্র মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ মহকুমা। এখানকার জনসংখ্যার ৬৮% মুসলমান, ২১% হিন্দু ও ১০% শিখ।

এই সংক্রান্ত খোঁজখবর নিতে নিতেই উঠে এল আরও অসাধারণ কিছু তথ্য, যার সূত্রেই আমাদের আজকের এই কাহিনীর অবতারণা । জানা গেল, ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময়েও সমগ্র পাঞ্জাব যখন জ্বলেছে, অনন্য মরুদ্যান হয়ে বিরাজ করেছে এই মালেরকোটলা মহকুমা, দিল্লি থেকে লুধিয়ানা যেতে পাটিয়ালা পেরিয়ে বাম দিকে পড়ে যে জনপদটি। কী সেই জাদুকাঠি যার স্পর্শে মানিক হয়ে জ্বলজ্বল করছে ছোট্ট এই কসবা?

***

চলো, আবার ফিরে যাই সেই তিনশতাব্দী পূর্বে, দুই শিশুকে বন্দী করে মোগল বাহিনী যখন পেশ করেছে ওয়াজির খানের দরবারে। দুর্মদ শিখদের দমন করতে না পেরে ক্রুদ্ধ মনসবদার দিলেন নিষ্ঠুর আদেশঃ গুরুর এই দুই ব্যাটাকে জ্যান্ত গেঁথে ফ্যাল্‌ দেওয়ালের মধ্যে (এ-পদ্ধতি বোধহয় মুঘলামলে বড্ড চলত, আনারকলির ভাগ্যেও এমন কোতল জুটেছিল বলে কথিত আছে, না?)।

যেমন হুকুম তেমনি কাজ! সেই দুই শিশুকে জ্যান্ত গেঁথে ফেলা হল প্রস্তরনির্মিত দীবারের মধ্যে, যে খবর দাদীমায়ের কাছে পৌঁছলে শোকে প্রাণত্যাগ করেন গুরুমাতা গুজরী দেবী।

***

মা ও দুই শিশুপুত্রকে ‘নিরাপদ’ স্থানে পাঠিয়ে দিয়ে বড় দুই ছেলে অজিত ও জুঝরকে নিয়ে আনন্দগড় রক্ষা করছিলেন গুরু গোবিন্দ (সেবছরই শেষের দিকে চামকৌড়ির যুদ্ধে গুরুর এই জ্যেষ্ঠ দুই পুত্রেরও শাহ্‌দাত লাভ হয়)। কনিষ্ঠ দুই পুত্রের নিহত হবার এই দুঃসংবাদ গুরু গোবিন্দজির বুকে শেল হয়ে বিঁধল। তিনি শোকে-ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন, বিশেষ করে ওয়াজির খানের বেইমানী তাঁর অসহ্য লেগেছিল (পরে এই ওয়াজির খানের শিরচ্ছেদ করেন ‘বন্দীবীর’ কবিতাখ্যাত শিখবীর বান্দা)। শোকান্ধ গুরু প্রশ্ন  তুললেন, দুই শিশুকে যে এতো নৃশংসভাবে হত্যা করলো সেই শয়তান, তাও আবার তার দরবারে ফরমান করে নিয়ে? সেখানে উপস্থিত সকল আমীর-ওমরাহ্‌ই কি এই অন্যায় কাজ সমর্থন করেছিল?

—না, হুজুর, সেখানে উপস্থিত ছিলেন মালেরকোটলার নবাব শের মহম্মদ খান সাহে। তিনি প্রচণ্ড আপত্তি করেন এই ইসলামবিরোধী কাজের, দক্কণে স্বয়ং বাদশাহের কাছে নালিশ করে খত্‌ মুসাবিদা করে ফেলেন, এবং শেষাবধি তাঁর কথা মানা না হলে সেই দরবার পরিত্যাগ করে চলে যান  মালেরকোটলা-নরেশ!

‘তাই?’  আনন্দাশ্রুতে ভরে উঠল গুরু গোবিন্দজির আঁখি, ‘তাহলে সকলেই অমানুষ ছিল না সেখানে, একজন প্রকৃত মানুষ, সাচ্চা মুসলমানও ছিলেন! শাবাস!’

গুরু এরপর এক শর দিয়ে ভূমি থেকে মৃত্তিকা ও তৃণগুচ্ছ তুলে নিয়ে নিজ দক্ষিণহস্তে স্থাপন করে মন্ত্রপাঠ করলেন, আশীর্বাদ করলে মালেরকোটলাকেঃ

“জালীম কি জাদায়েঁ উখড় জায়েঙ্গে। লেকিন মালেরকোটলাওয়ালোঁ কি বেলেইন সদা হরী রহেঙ্গী!” [অত্যাচারী আসবে ও যাবে, কিন্তু মালেরকোটলাবাসীদের কেশাগ্র কেউ কখনও স্পর্শ করতে পারবে না। তারা চিরসবুজ থাকবে]—অমোঘ আশীর্বাণী গুরু গোবিন্দসিংজির!

আর তাই, ১৯৪৭-র দাঙ্গার সময়ে দেখা গেছে দলে দলে নিপীড়িত জনতা অন্য অন্য স্থান থেকে তাড়া খেয়ে এসে মালেরকোটলার সবুজ গমক্ষেতে এসে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউ তাদের ক্ষতি করতে পারেনি। ১৯৮০র দশকে অতবড় পাঞ্জাব-উগ্রপন্থার কালে মালেরকোটলায় একটিও খুনখারাবি হয়নি। তাই না ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’-র অভিনেতা ‘ফুলব্রাইট স্কলার’ সঈদ জাফরী লণ্ডনে বসেও গর্ব করে বলতেন যে তিনি আদতে মালেরকোটলার সন্তান! মালেরকোটলা ও তার অধিবাসিগণ হলেন শাশ্বত মিলিজুলি ভারতবর্ষের প্রতীক!

***

আবার গুরুজির কাহানীতে ফিরে এসে শোনাই শেষটুকু। উনি মালেরকোটলার নবাব-বাহাদুরকে যে ‘হুকমনামা’ ও ‘কৃপাণ’ দিয়েছিলেন তা আজও রক্ষিত হয়ে আছে মালেরকোটলা প্রাসাদে। পাশেই আছে সেই খৎ-এর প্রতিলিপি যা শের মহম্মদ খানসাহেব লিখেছিলেন বাদশাহ্‌ আওরঙ্গজেবের উদ্দেশ্যে। ১৯৪৭-এর দেশবিভাগের পরেও তৎকালীন নবাব আহমদ আলি খান সাহেব ভারতে থেকে যান সপরিবার (মৃ. ১৯৮২)। দেশভাগের সময় দৈনিক সহস্রাধিক মানুষের লঙ্গর চালাতেন নবাবসাহেব, যা  তাঁর নিজরাজ্যের জনসংখ্যার চাইতে অধিক। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে গুরুজির আশীর্বাদের ফলেই এ’সব সম্ভব হয়েছে ও হচ্ছে। প্রাসাদে তাঁর নিজস্ব সংগ্রহশালায় শিখপন্থের নিশান-সাহিব ও কৃপাণ-সাহিব আজও বিরাজ করে। রয়েছে গুরু গোবিন্দ সিংজির তৈলচিত্র, অমৃতসর স্বর্ণমন্দিরের তৈলচিত্র। প্রাসাদের সন্নিকটে শহরের আদি প্রতিষ্ঠাতা শেখ সদরুদ্দীন সাহেবের দরগাও রয়েছে, যেখানে দৈনিক শত শিখ-হিন্দুভক্ত ও মাথা টেকাতে যান। আছে বাবা হায়দার শেখজির দরগাও। মালেরকোটলাতে গো এবং শূকরমাংস দুইই নিষিদ্ধ।

***

আমাদের এই ভারতবর্ষ বহুজাতি বহুধর্ম বহুভাষার দেশ। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য রয়েছে এ’দেশের নাড়িতে। যুগে যুগে মহান মানুষ জন্মেছেন এখানে, দিয়ে গেছেন তাঁদের প্রেমের বাণী। তা-ই আমাদের পাথেয়, তা-ই আমাদের আদর্শ।।

জয়ঢাকের টাইম মেশিনের লাইব্রেরি

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s