টাইম মেশিন ইতিহাসের খন্ডচিত্র-হরিনাথ দে বাসুদেব দাস শরৎ ২০১৬

timemachinekhondochitro (Medium)

হরিনাথ

বাসুদেব দাস

এ এক অদ্ভুত ছেলে। চার বছর বয়সও তখন তার হয় নি। বাবা প্রথম ভাগের বই এনে দিয়েছেন। ছেলের কিন্তু সবুর সয় না। সে বইটা পড়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। রান্না ঘরে কাজে ব্যস্ত এলোকেশী ছেলের পীড়াপীড়িতে গোটা বইটা একবার ছেলেকে পড়িয়ে দিলেন। সন্ধেবেলা পিতা ভূতনাথ দে বাড়ি ফিরে এলে ছেলেটি বইটি বিস্মিত পিতার হাতে তুলে দিয়ে গড়গড় করে আগাগোড়া মুখস্থ বলে গেল। শুধু তা-ই নয়, স্লেটের উপর অ,আ,ক,খ, সবগুলি অক্ষর অনায়াসে লিখে ফেলল। সবাইকে চমকে দেওয়া এই অসাধারণ মেধাবী ছেলেটিই হলেন পরবর্তীকালের পৃথিবী বিখ্যাত ভাষাবিদ হরিনাথ দে।

বিখ্যাত রাশিয়ান প্রাচ্যতত্ত্ববিদ কোরবাভস্কি কলকাতায় এসে হরিনাথের সঙ্গে আলোচনায় মুগ্ধ হয়ে হরিনাথকে সেন্ট পিটাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পদ গ্রহন করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন। রাশিয়ান এবং সংস্কৃত ভাষায় গভীর জ্ঞান এবং বৌদ্ধ দর্শনে হরিনাথের অসাধারণ পাণ্ডিত্য কোরবাভস্কিকে বিস্মিত করেছিল। সুপরিচিত জাপানি পণ্ডিত ওটানি কোজুই হরিনাথের পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে অনেকগুলি প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য পুঁথি উপহার দেন। প্রখ্যাত জার্মান প্রাচ্যতত্ত্ববিদ রিচার্ড ফন পিশেল হরিনাথের পাণ্ডিত্যের কথা শুনে তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেদ ও সংস্কৃতের ওপর তিনি বক্তৃতা দেন।

হরিনাথ দে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের অদূরে আড়িয়াদহে ১৮৭৭ সালের ১২ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রায়বাহাদুর ভূতনাথ দে মধ্যপ্রদেশের বিখ্যাত আইনজীবি ছিলেন। রায়পুরের সরকারি মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে হরিনাথের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ১৮৯৬ সনে লাতিন ও ইংরেজিতে ডাবল অনার্স সহ কৃতিত্বের সঙ্গে বি-এ পাশ করে স্কলারশিপ পান। একই বছরে লাতিন ভাষা ও সাহিত্যে শতকরা ৭৭ ভাগ নম্বর পেয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এম-এ পাশ করেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রাইপোস-এর দুর্লভ সম্মান অর্জন হরিনাথের শিক্ষা জীবনের স্মরণীয় ঘটনা। ইউরোপের বিশ্ববিখ্যাত অধ্যাপকদের কাছে হরিনাথ পাঠগ্রহন করেন। বিভিন্ন ভাষায় হরিনাথের অসাধারণ কৃতিত্ব ও বিস্ময়কর প্রতিভা বিদেশী অধ্যাপকদের চমৎকৃত করে। গ্রিক, লাতিন, মধ্যযুগীয় জার্মান ভাষা, মধ্যযুগীয় ফরাসি ভাষা, আধুনিক জার্মান ও ফরাসি, ইতালিয়ান স্পেনিস ও পর্তুগিজ প্রভৃতি প্রাচীন ও ইউরোপীয় ভাষায় হরিনাথের বিশেষ দখল ছিল। তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রাপ্ত স্বর্ণপদক, পুরস্কার ও স্কলারশিপের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ইউরোপে শিক্ষামূলক ভ্রমণের সময় ভারতত্ত্ব বিষয়ক গবেষণায় সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করেন।১৯০৫ সালে হরিনাথ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সবগুলি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র রচয়িতা ও পরীক্ষক ছিলেন। বৌদ্ধধর্ম ও দর্শন সম্পর্কে হরিনাথ অনেক গ্রন্থাদি রচনা করেন। এই অনন্য সাধারণ প্রতিভা মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে অকালে ঝরে যাওয়ায় ভারতের অপূরণীয় ক্ষতি হয়।\

জয়ঢাকের টাইম মেশিন লাইব্রেরি