টাইম মেশিন ঠগির আত্মকথা অলবিরুণী শরৎ ২০১৭

আগের পর্বগুলো

 

।৩৩।

ভীর লুটপাট করা হল দুদিন ধরে।যখন শহর ছেড়ে চলে আসছি সেখানে একটা বাড়িও আর আস্ত দাঁড়িয়ে নেই। লোকজন পোড়া কাঠের টুকরো দাঁড় করিয়ে তার ওপরে গাছের পাতা চাপিয়ে কোনমতে সেই ঠান্ডার দিনগুলো কাটাবার বন্দোবস্ত করবার চেষ্টা করছিল। দেখে একটু কষ্টই লাগছিল আমার। শহরে তাদের রক্ষা করবার জন্য কোন সৈন্যই না থাকায় বেচারারা নীরবে দাঁড়িয়ে তাদের শহরের ধ্বংসলীলা দেখেছিল শুধু।

গোদাবরীর তীরে পৈথান শহরেরও একই হাল হল। সেখানকার বেশ কিছু রইস ঔরঙ্গাবাদে পালিয়ে চলে গিয়েছিল, কিন্তু যা বাকি ছিল তাদের দিয়েই আমাদের কাজ হয়ে গেল। এ অঞ্চলের জরির কাজ করা মসলিনের বাজারদর ভাল। বেনারসের মত অত দামি না হলেও পুণা আর হায়দরাবাদের বাজারে তার প্রচুর চাহিদা।আমাদের লুটপাটের প্রধান লক্ষই ছিল এই কাপড়। চিতুর উট আর হাতি সেই মসলিনে বোঝাই হয়ে গেল এইখান থেকে। আমাদের বাকিদেরও লাভ কম হল না। আমাদের সবার সঙ্গেই তখন এত লুটের মাল জমেছে যে সঙ্গে করে বয়ে নিয়ে যাওয়াও কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। ততদিনে আবার ফিরিঙ্গীদের একটা সৈন্যদলও আমাদের পেছনে লেগেছে। তাদের খপ্পর এড়িয়ে অজন্তাঘাট পেরিয়ে বুরহানপুর হয়ে আমরা তাপির উপত্যকা ধরে নেমাওয়ারের ঘাঁটিতে ফিরে এলাম।

আমাদের মালপত্রের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে নেমাওয়ারের সাহুকারদের পুঁজি ফুরিয়ে গেল সেসব কিনতে কিনতে। শেষে অবস্থা সামাল দিতে ইন্দোর, উজ্জ্বয়িনী আর আশেপাশের সব বড় শহর থেকে সাহুকারদের ডেকে পাঠাতে হল নেমাওয়ারের বাজারে।

এইবার বাড়ি ফেরার পালা। আমার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে আমি গেলাম চিতুর দরবারে বিদায় নিতে। সেখানে গিয়ে এক নতুন বিপত্তি। চিতু দেখি আমার বিদায়ী নজরানা ছুঁয়ে দেখছে না, আমাকেও বিদায়ী পান-আতর দিচ্ছে না। মনে মনে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল, আমার সঙ্গে কোন ছলচাতুরীর খেলা খেলছে কিনা লোকটা, এমন সময়

সে আমায় ডেকে বলে, “রাতে আমার সঙ্গে দেখা কোরো, কথা আছে।”

ঘাঁটিতে ফিরতে পীর খান সব শুনে বলে, “জানমাল বাঁচাতে হলে এক্ষুনি পালিয়ে চলুন মীরসাহেব। ব্যাপার আমার সুবিধের ঠেকছে না।” সন্দেহ আমারও একটু ছিল, কিন্তু আমি ঠিক করলাম আর একটু দেখে নেব প্রথমে। তারপর দরকার হলে পালাব।

 মাঝরাতের একটু বাদে চিতুর কথামতো আমি তার তাঁবুতে গিয়ে দেখি চিতু একা বসে আছে। তার দরবারে এসে কখনো সখনো বসলেও এভাবে চিতুর সঙ্গে একা কথা বলবার মতো সম্মান এর আগে আমার কপালে কখনো জোটেনি। আমি সামনে গিয়ে কুর্নিশ করে বললাম, “বান্দা হাজির নবাব। এখন হুকুম কুরুন।”

চিতু চুপচাপ একটুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “আচ্ছা মীরসাহেব, তুমি তো বুদ্ধিমান মানুষ। বলো তো, এই যে আমরা অভিযানটা সেরে এলাম এটার আসল উদ্দেশ্য কী ছিল?”

আমি বললাম, “কী আর হবে? যত পারা টাকাপয়সা রোজগার করে আনা যাতে ফিরিঙ্গির সঙ্গে মারাঠিদের যুদ্ধ বাধবে যখন সে সময় তৈরি থাকা যায়।”

“ব্যাপারটা তুমি খানিকটা ধরতে পেরেছ, কিন্তু সবটা নয়। আমার আরো কিছু উদ্দেশ্য ছিল এই অভিযানের পেছনে। শোনো, টিপু সুলতান যদ্দিন বেঁচে ছিলেন, তদ্দিন অন্তত একজন মুসলমান রাজা ছিল যে বেইমান ফিরিঙ্গিদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে লড়তে জানত। তিনি মারা যাবার পর এখন হায়দরাবাদে সিকন্দর জা ফিরিঙ্গিদের পা চাটছে। মারাঠারা এখন আমাদের একমাত্র আশা। তলায় তলায় তারা দল বাঁধছে ফিরিঙ্গিদের ওপরে ঝাঁপাবে বলে। সে যুদ্ধ যখন বাঁধবে সিকন্দর জা তখন ফিরিঙ্গীদের পাশেই দাঁড়াবে গিয়ে। হতে পারে তার ক্ষমতা বেশি নয়, কিন্তু তবু তাকে অবহেলা করা যায় না। ভিনদেশি ফিরিঙ্গীদের হারাতে হলে সিকন্দর জাকে দুর্বল করে রাখতে হবে আমাদের। আমি তাই ঝড়ের মত আক্রমণ করে তার রাজত্বের অর্ধেকটাকে ফতুর করে দিয়েছি। ইনশাল্লা তার রাজত্বের বাকিটারও একই হাল করব আমি। আবার আমি ঝড়ের মত আক্রমণ করব সিকন্দর জার রাজত্বে। ফিরিঙ্গীদের দখলের এলাকাগুলোও নিস্তার পাবে না।”

“বুদ্ধিটা ভালো নবাব। কিন্তু ফিরিঙ্গীরা কি আমাদের ছেড়ে কথা কইবে? তারাও তো এবারে তৈরি থাকবে একেবারে। যেখানেই গিয়ে হাজির হই না কেন–”

“না,” চিৎকার করে উঠল চিতু, “পারবে না। যতই চালাক হোক না কেন এই ইউরোপের লোকগুলো, আমায় চালাকিতে হারাতে পারবে না ওরা। আমার পেছন পেছন দৌড়ে নাজেহাল হয়ে যাবে, কিন্তু চিতুর একগাছি চুলও তারা ছুঁতে পারবে না। কেন জানো? বোকা ফিরিঙ্গিগুলো ভেবেছে অনেক টাকাপয়সা লুট করে এসে আমি এখানে ফের আগামি দশেরা অবধি চুপচাপ বসে থেকে লুটের টাকা ধ্বংস করব। কিন্তু না। আমি তাদের তৈরি হবার সময় দেব না।”

“কবে বের হতে চান?”

“ঠিক দুমাসের মধ্যে। আর একটা কথা। এ খবর তুমি আর আমার কয়েকজন হাতেগোণা সর্দার ছাড়া আর কেউ জানে না। আমি চাইও না বেশি লোক এ কথা এখন জানতে পারুক। নইলে পরে মুখ ফশকে কে কোথায় গিয়ে বলে বসবে, আর সারা দেশে খবর ছড়িয়ে যাবে। এ আমি একেবারে চাই না। এবারে বলো, দু মাসের মধ্যে বাড়ি থেকে ফিরে এসে তুমি আমার সঙ্গে নুতুন অভিযানে বের হবে কি? যদি বের হও তাহলে এইবার আমি তোমার হাজার ঘোড়সওয়ারের সর্দার বানিয়ে দেবো। কী? রাজি?”

আমি মাথা নিচু করে বললাম, “কথা দিচ্ছি। ঠিক দুমাসের মাথায় ঝালোন থেকে ফিরে আসব আমি।সঙ্গে করে আরো বেশ কিছু বাছাই লোক নিয়ে আসব এবারে।”

“সে খুব ভালো কথা। যত লোক আনবে তত আমার সুবিধে। তবে তুমি এখন রওনা দাও। আমার আস্তাবল থেকে সবার সেরা ঘোড়াটা বেছে নিয়ে যাও।আমি জানি তোমার হাতে তার কোন অযত্ন হবে না।”

আমার নিজের দলের কাছে আমার কোন কথাই গোপন থাকে না। ফিরে এসে তাদের আমি চিতুর পরিকল্পনার কথা বলতে তারা তারাও দেখি চিতুর বুদ্ধি আর দূরদর্শীতায় মুগ্ধ। প্রত্যেকেই কসম খেয়ে বলল তারাও পরের অভিযানে চিতুর সঙ্গে যোগ দেবে।

 পরদিন সকালে আমরা রওনা হয়ে গেলাম ঝালোনের পথে। আমায় এত তাড়াতাড়ি ফিরতে দেখে আজিমারা তো আনন্দে আটখানা।কিন্তুসেই সব আনন্দের আড়ালে দুর্ভাগ্যের মেঘ ঘনিয়ে আসছিল আমাদের ওপরে। তখন আমি তা বুঝতে পারিনি। পরদিন ঝালোনেররাজার দরবারে গিয়ে তাঁকে তাঁর ঘোড়াগুলোর দাম চুকিয়ে দিলাম। সেইসঙ্গে পৈথান থেকে লুট করা কিছু মসলিন, একটা মুক্তোর মালা আর একান্নটা মোহরের নজরানাও সাজিয়ে দিলাম তাঁর সামনে। রাজা ভারি খুশি খুশি ভাবরে আমায় অভ্যর্থনা জানালেন, আড়ালে ডেকে গোপনে আমার লুটপাটের কাজ আরো বেশি করে করতে উৎসাহ দিলেন, প্রকাশ্য রাজসভায় একটা দামি পোশাক দিয়ে সম্বর্ধনাও জানালেন, কিন্তু সেইসবের আড়ালে তিনি যে কী চাতুরির খেলা খেলছেন আমার সঙ্গে তার বিন্দুমাত্র আভাসও আমায় টের পেতে দেননি রাজা।

খুশিমনে ফিরে এসে আমি পীর খান আর মোতিরামকে পাঠিয়ে দিলাম পরের অভিযানের জন্য বাছাই করে লোক জোগাড় করতে। দিনদশেকের মধ্যেই তারা বারোজন নতুন লোক জোগার করে নিয়ে এল। এরা প্রত্যেকেই ওস্তাদ ঘোড়সওয়ার।সেইসঙ্গে সবরকম অস্ত্রশস্ত্রও চালাতে পটু। আগেরবার আমাদের ঘোড়া দিয়ে রাজার অনেক টাকা লাভ হয়েছিল। কাজেই এবারেও রাজা খুশি হয়েই আর একবার আমার দলটাকে ঘোড়া ভাড়া দিয়ে দিলেন। লোকগুলোর অস্ত্রশস্ত্র ঠিকঠাক করে নেয়া, লম্বা সফরের রসদ জোগাড় করা, এইসব করতে করতে দেখি আর বেশি সময় নেই হাতে। টাকাপয়সা তখন হাতে এত জমেছে যে বেশ কয়েক বছর আর আমায়কোন কাজ না করলেও চলে যেতো দিব্যি। ইচ্ছে করলেই, নিজের ঘরে আরামে থেকে রাজদরবারে একটা ভালো কাজ জুটিয়ে নিতে পারতাম আমি। কিন্তু বুকের ভেতর যে  দুঃসাহসিক অভিযানে বের হয়ে পড়বার একটা লোভ সবসময় কাজ করে চলে আমার, তাকে আটকাবে কে? তার ওপর চিতুকে আমি কথা দিয়ে এসেছিলাম তার কাছে ফিরে যাব। সে কথারও খেলাপ করবার ইচ্ছে আমার ছিল না। রাজারও তাতে খুব উৎসাহ।আমায় তিনি একখানা সুন্দর তলোয়ারও উপহার দিয়ে ফেললেন সে জন্য। কাজেই আমি আজিমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, বাবার আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে ফের পথে বের হয়ে পড়লাম।

আমি ফিরে যেতে চিতু খুব খুশি। সে তখন তার নতুন অভিযানের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আমাদের আগের অভিযানে  সাফল্যের খবর চারপাশে ছড়িয়ে যেতে তখন হাজারে হাজারে লোক এসে জুটছে তার নতুন অভিযানে যোগ দিতে। সেইসব নানান জাতের লোকজনকে সাজিয়ে গুছিয়ে বিভিন্ন দলে ভাগ করে একটা সুশৃংখল সেনাবাহিনীতে সাজানো এক দুরূহ কাজ। চিতু আমায় সেই কাজে লাগিয়ে দিল প্রথমে। কাজটা কঠিন আর সময়সাপেক্ষ। এ লোকগুলো স্বভাবত উচ্ছৃংখল আর নিষ্ঠুর। তাদের নিয়মে বাঁধা সহজ কাজ নয়। সে কাজটা করতে করতেও আমার মন থেকে কিন্তু করিঞ্জা শহরে গফুর খানের সেই মেয়েটাকে নিষ্ঠুরভাবে খুন করার ছবিটা মুছে যায় নি। গফুর খান এ অভিযানের আগেও ফের উত্তেজিত হয়ে রয়েছে ফের নতুন নতুন হিংস্র কাজ করবার জন্য। আমি মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম, এইবার উপযুক্ত সুযোগ বুঝে গফুর খানের অপরাধের শাস্তি আমি তাকে দেবই। আর সেইজন্যই আমি আরো বেশি বেশি করে তার সঙ্গে মিশছিলাম, যাতে উপযুক্ত সময়ে তাকে হাতে পেতে আমার কোন অসুবিধে না হয়।

শেষমেষ দেখা গেল প্রায় দশ হাজার ঘোড়সওয়ারের একটা দল একত্র হয়েছে।তাদের সঙ্গে চ্যালাচামুন্ডা আরও যত জুটেছে তার তো গুণে হিসেব করা যায় না। সব মিলিয়ে যেন এক বিরাট মেলা বসে গেছে নেমাওয়ারে তখন। এইবারে একদিন চিতু একটা দরবার ডেকে সবাইকে তার পরিকল্পনাটার কথা জানালো। এবারে আমরা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে নাগপুরের রাজার এলাকার মধ্যে দিয়ে বের হয়ে, গন্ডোয়ানার জঙ্গল পেরিয়ে গিয়ে হানা দেব মসলিপটনমের উত্তরের অরক্ষিত শহরগুলোতে। তারপর সেখান থেকে কৃষ্ণা পেরিয়ে একেবারে কুরনুল অবধি এগিয়ে গিয়ে তারপর ফিরতি পথ ধরবো আবার।

চিতুর কথা শেষ হতেই ঘন ঘঞ্জয়ধ্বনিতে আকাশবাতাস কেঁপে উঠল একেবারে। ঠিক হল পরের দিনই আমরা নর্মদা পার হয়ে রওনা দেব। 

।৩৪।

আমার সঙ্গের এক হাজার সৈন্য নিয়ে প্রথমে আমি নদী পাড় হলাম। পাঁচ মাস আগে যেখানে শিবির বসানো হয়েছিল এইবারেও সেই একই জায়গায় শিবির বসানো হল আমাদের। সেখান থেকে রওনা দিয়ে নাগপুরের রাজত্ব পেরিয়ে, গন্ডয়ানার জঙ্গুলে এলাকাগুলো পাড় হতে গিয়ে মাঝেমাঝেই জলেরভাবে খুব ভুগতে হলেও আমরা কেউ তাতে কিছু মনে করিনি। তারপর যখন মসলিপটনমের উত্তরের উর্বর, সমৃদ্ধ জনবসতিগুলোর নাগাল পেলাম আমরা তখন গোটা দলটা কয়েক মাইল চওড়া একটা মালার মত হয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম  তাদের ওপরে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিয়ে চিতুর সেনাবাহিনী এগিয়ে চলল অপ্রতিহত গতিতে। তবে একটা ব্যাপারে আওরা খুব সাবধান থাকতাম। কোথাও যদি খবর পেতাম কোন প্রতিরোধের ব্যবস্থা রয়েছে, তাহলে সেসব জায়গা আমরা সযত্নে এড়িয়ে যেতাম। যদিও জানতামযুদ্ধ হলে আমরা জিতবোই, তবু, লুট করবার জায়গার যখন অভাব নেই তখন দু একটা জায়গায় শুধু শুধু লড়াই করে কিছু লোক খুইয়ে কী লাভ?

কয়েকদিন এইভাবে চলবার পর অবশেষে আমরা এসে পৌঁছোলাম গুন্টুরে। খবর ছিল এইখানে ভালো টাকাপয়সা পাবার সম্ভাবনা আছে। যে এলাকাগুলো দিয়ে আমরা লুটতরাজ চালাতে চালাতে এসেছি সেসব এলাকার থেকে বদমাশ ইউরোপিয়ানগুলোর জড়ো করা লক্ষ লক্ষ টাকার খাজনা এইখানে জমানো রয়েছে। আমাদের লোকজন একদল দৈত্যের মতন গিয়ে শহরটার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাদের  বশে রাখা আমার সাধ্য ছিল না। সে চেষ্টাও আমি করলাম না। গোটা শহরটাকে একেবারে লুটেপুটে নেয়া হল সবাই মিলে। শহরে ইংরেজ যে কটা ছিল সেগুলোও গিয়ে তাদের খাজনার টাকা জমা করবার তোষাখানাটাকে আগলে বসে রইল। তার কাছাকাছি কোন পিন্ডারিকে দেখা গেলেই ঝাঁক ঝাঁক গুলি ছুটে আসছিল তার দিকে। চিতুকে গিয়ে আমি বারবার বললাম, একবার আমায় আমার দল নিয়ে বাড়িটাকে আক্রমণ করবার সুযোগ দিতে। কিন্তু সে কথা শুনতে সে মোটেই রাজি নয়। শুধু বলে “আমি ঠকেছি। কে জানত এখানে এত ইংরেজ পাহারাদার রয়েছে?” যত বলি ওরা সংখ্যায় মাত্রই গুটিকয়, কন্তু ততই সে ইংরেজের সংখ্যা বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলে আর আমায় আটকায়।

শেষে তোষাখানা লুটতে না পেরে আমাদের আক্রোশ গিয়ে পড়ল ইংরেজদের বসতবাড়িগুলোর ওপরে। তার সবকিছু ভেঙে লন্ডভন্ড করে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বদমাশগুলোকে তাদের তোষাখানার নিরাপত্তা থেকে আমাদের ঘোড়ার সামনে টেনে আনবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ইংরেজগুলো দেখা গেল বেজায় চালাক। তারা কিছুতেই তোষাখানা ছেড়ে নড়ল না। শেষে নিরুপায় হয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তোষাখানা না লুটেই আমাদের ফেরার পথ দেখতে হল। অবশ্য যা টাকাপয়সা পেয়েছিলাম তার পরিমাণটাও নিতান্ত কম নয়। কিন্তু তাতে আমাদের দলবলের মন ভরল না।

আমার অবশ্য আক্ষেপ ছিল না কোন। আমি আমার ঠগির দলটা নিয়ে এক হিন্দু রইসের বাড়িকে কব্জা করেছিলাম গিয়ে। আর কোন পিন্ডারিকে সেখানে ঢুকতে না দিয়ে আমরাই সে বাড়ির লুটতরাজ যা করবার করেছিলাম।  মারধোর বিশেষ করতে হয় নি অবশ্য। তারা এমনিতেই ভয় পেয়ে সবকিছু আমাদের দিয়ে দিয়েছিল। তার পরিমাণ কম করেও ত্রিশ হাজার টাকামত হবে।

লুটতরাজ শেষ করে দিন দুই পর একদিন বিকেলবেলা শহর ছেড়ে বেরিয়ে প্রায় দশ ক্রোশ দূরে গিয়ে আমরা ঘাঁটি গড়লাম।

কৃষ্ণা পার হয়ে এরপর আমরা কুরপা অবধি এগিয়ে গেলাম। শুনেছিলাম এই কুরপাতেও ইংরেজদের তোষাখানা আছে একটা। কিন্তু এখানেও বিশেষ সুবিধে করা গেল না। শহরের কাছাকাছি পৌঁছে জানা গেল, আগে থাকতে খবর পেয়ে সেখানে ইংরেজদের একটা পুরোদস্তুর সেনাবাহিনী আমাদের অভ্যর্থনা করবার জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের সঙ্গে কোন ঝগড়ায় না গিয়ে আমরা কুরনুলের দিকে এগোলাম, কিন্তু এখানেও ইংরেজদের হাতে মার খেয়ে পিছিয়ে এসে শেষমেষ আবার ইংরেজের এলাকা ছেড়ে এসে ঢুকে পড়লাম নিজামের রাজত্বে। ইংরেজদের একটা ঘোড়সওয়ার বাহিনী আমাদের তাড়া করে এসেছিল বটে কিন্তু তারা আর আমাদের পিছু পিছু নদী পেরোবার ঝুঁকি নিল না।

এইখানে এসে আমাদের দলটা তিন ভাগে ভাগ হয়ে গেল। এতে একদিকে যেমন অনেক বেশি জায়গায় একসঙ্গে লুটতরাজ চালানো যাবে, তেমনি আমাদের তাড়া করতেও ইংরেজদের সমস্যা বাড়বে। সেইমতো চিতুর নেতৃত্বে একটা বাহিনী চলে গেল পুবদিকে, একটা পশ্চিমের পথ ধরল আর তৃতীয় বাহিনীটা চলল তাদের মাঝবরাবর। চিতুর সলে ছিলাম আমি আর গফুর খান। হায়দরাবাদের পুবপাশ দিয়ে নিজামের রাজত্ব পেরিয়ে নিরমুল দিয়ে আমরা আবার নাগপুরের রাজার এলাকায় এসে ঢুকবো, এই আমাদের পরিকল্পনা ছিল। এই সময়টা আমি আর গফুর খান এক তাঁবুতে থাকতাম, আর প্রতিদিন তার নিষ্ঠুর কাজকর্মের সাক্ষি থাকতে হত আমাকে। একদিনের কথা বলি। সেদিন একটা ছোট শহরে লুটতরাজ করে আমি আমার ঠগিদের দলটাকে নিয়ে শহর থেকে বের হয়ে যাচ্ছি এমন সময় একটা সাজানো গোছানো বাড়ির ভেতর থেকে কয়েকটা তীক্ষ্ণ গলার আর্তনাদ ভেসে এল। তাড়াতাড়ি ঘোড়া থেকে নেমে আমি আমার দলবল নিয়ে বাড়িটার মধ্যে ঢুকে দেখি সেখানে গফুর খান আর তার দলবল নিজেদের কাজে ব্যস্ত। দুটো কমবয়েসি ছেলে আর একজন বয়স্ক মহিলার ভয়ানকভাবে ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ পড়ে আছে মাটিতে। একজন বয়স্ক মানুষের মাথায় গরম ছাই ভরা ঘোড়ার চানা খাবার থলি বেঁধে দিয়ে গফুর খানের দুই চ্যালা তাকে বেধড়ক মারছে আর গফুর খান তার কানের কাছে বাজপড়ার মত গলায় চিৎকার করে প্রশ্ন করে যাচ্ছে তার লুকোন টাকাপয়সার খোঁজে। অন্যপাশে তিনটে সুন্দর কমবয়েসি মেয়ে প্রাণপণে  গফুর খানের চারপাঁচজন সৈন্যের হাত ছাড়াবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাদের চেহারা থেকে বোঝা যায় এতক্ষণ কী ভয়ংকর অত্যাচার হয়েছে তাদের ওপর। এদের চিৎকারই আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম বাইরে থেকে।

গফুর খানকে সরাসরি আক্রমণ করবার উপায় ছিল না। সেটা করলে চিতুর কানে খবরটা চলে যাবে। আমি তাই তার কাছে গিয়ে বললাম, “তাড়াতাড়ি একবার বাইরে আসুন তো খানসাহহেব। একটা বাড়ির দরজা কিছুতেই খোলা যাচ্ছে না। বাড়িটার ভেতরে প্রচুর টাকাপয়সা আছে শুনেছি।  আপনি একবার এলে যদি কিছু সুরাহা হয়!”

কথাটা পুরো মিথ্যে নয়।সত্যিই একটা প্রাসাদের মত বাড়ির দরজা ভাঙতে গিয়েছিলাম আমি খানিকক্ষণ আগে। তারপর শোনা গেল ওতে কেউ থাকে না। তখন আর সেখানে ঢোকবার চেষ্টা করিনি।

“একটু দাঁড়ান মীরসাহেব। এখানে খেলা এখন বেজায় জমে গেছে। ভাবুন একবার, ব্যাটা কাফিরের দল তলোয়ার হাতে আমাদের আটকাতে চেয়েছিল। স্বয়ং আমার একটা হাতে একখানা কোপ বসিয়েছে ব্যাটারা। শেষপর্যন্ত ঢুকে দেখি এই ঘরে সবকটা মিলে আশ্রয় নিয়েছে। কাফিরটার ছেলেগুলোকে আর বুড়ি বউটাকে আমি নিজে হাতে কেটেছি। আর এখন তো দেখছেনই, লেগে আছি বুড়ো শয়তানটার কাছ থেকে লুকনো টাকাপয়সার খোঁজে।”

“আহা লোকটা আপনাকে সে কথা জানাবে কী করে খান সাহেব? মুখে তো ছাইয়ের থলে বাঁধা। কথা বেরোবে কোথা দিয়ে? ওটা খুলে দিয়ে না হয়–”

“দেখ চেষ্টা করে। কিন্তু ফল কিছুই হবে না এই বলে দিলাম।”

লোকটার পেছনে দাঁড়ানো পিন্ডারিটাকে আমি বললাম, “এর মুখের থলেটা সরাও হে। আর দেখো যদি একটু জল পাও কোথাও তো নিয়ে এস। গলাভর্তি তো ছাই। কথা বলবে কেমন করে?”

মুখের থলেটা সরিয়ে দিয়ে জলের একটা পাত্র এনে তার ঠোঁটের সামনে ধরা হল। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে সরিয়ে নিল। সে জাতে হিন্দু ব্রাহ্মণ।

তাই দেখে রাগে গরগর করতে করতে খান বলে, “জল খা শয়তান। নইলে আমার হাতে আজ আর তোর রক্ষা নেই। ব্যাটা গোমূত্র খাস ঢকঢকিয়ে, আর সাচ্চা মুসলমানের হাতে জল খেতে আপত্তি?”

লোকটা ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলল, “শয়তান নররাক্ষস, আমি আমার মরা ছেলের রক্ত খাবো তবু তোদের হাতে জল খাব না।”

“কী বললি? আচ্ছা তাই হোক তাহলে। সুমুন্দ খান, মাটি থেকে বুড়োর ছেলের রক্ত তুলে একটা পেয়ালায় ভরে নিয়ে এস দেখি। বুড়ো বেহেস্তের শরবতের মত ঢকঢকিয়ে খাক!”

“দাঁড়ান খানসাহেব,” আমি হাঁকার দিয়ে বললাম, “এমন জঘন্য কাজ আপনি করতে পারেন না।”

“কাজের মধ্যে ঝামেলা বাঁধাবেন না মীরসাহেব। আপনি আমার বন্ধু বটে, কিন্তু আমার কাজে হস্তক্ষেপ করলে কিন্তু বিপদে পড়বেন এই বলে দিলাম। বুড়ো যখন নিজেমুখে বলেছে আমার হাতের জলের বদলে নিজের ছেলের রক্ত খাবে তখন তাই ওকে খেয়ে দেখাতে হবে আজ।”

সুমুন্দ খান ততক্ষণে আধপেয়ালা ভর্তি রক্ত বুড়োর মরা ছেলের গা থেকে চেঁছে তুলে এনে তার সামনে ধরেছে। বলে, “এই যে নিন, গঙ্গাজল মনে করে একটু খেয়ে নিন, তারপর আমাদের লুকনো টাকাপয়সার খবরটবর যা দেবেন দিয়ে দিন প্রভু।”

শুনে গফুর খান হেসে গড়িয়ে পড়ল। বলে, “সুমুন্দ খান, তুমি তো ভারী রসিক লোক হে? এ গল্পটা আজ চিতুকে গিয়ে করতে হচ্ছে।”

বুড়োমানুষটার শরীরটা  বমির ধাক্কায় কেঁপে কেঁপে উঠছিল। সেইদিকে একনজর দেখে গফুর খান বলে, “শুধু শুধু সময় নষ্ট করে লাভ নেই। ছুরি দিয়ে এর মুখটা খুলিয়ে মুখে ঢেলে দাও–”

তাই করা হল। আমার চোখের সামনে তার মুখ খুলিয়ে সেখানে তার ছেলের রক্ত ঢেলে দিয়ে তবে থামল দুই শয়তান। সেই করতে গিয়ে ছুরির খোঁচায় মানুষটার ঠোঁটদুটো থেকে শুরু করে গালটা ইস্তক কেটে দুখানা হয়ে গেল।

“এবারে বল সোনা কোথায় লুকিয়েছিস,” বলে গফুর খান চিৎকার করে উঠল ফের, “শিগগির বল। তোর প্রাণ আমার হাতের মুঠোয়। এই তলোয়ারের একটা ঘা–”

“মারো, মেরে ফেলো আমায়—দেরি করছ কেন?” বলতে বলতে কাতরাচ্ছিল বৃদ্ধ মানুষটি।

“ওরে বদমাশ, আগে বল সোনা কোথায়?”

“সোনা আমদের আর নেই সে আমি তোমায় আগেই বলেছি। তাও তুমি আমার বৌ-ছেলেদের খুন করলে, আমার ছেলেবউদের সর্বনাশ করলে। এখন দয়া করে যে কজন বেঁচে আছি তাদেরও মেরে ফেল। ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করবেন।”

গফুর খান মুখচোখ লাল করে বলে, “আমাকে টিটকিরি দিচ্ছিস তুই? বুড়ো শয়তান! তোর এতবড় সাহস! এই কে আছিস, খানিকটা তেল আর আগুণ নিয়ে আয়। এ কায়দাটা আমার আজ পর্যন্ত বিফল হয় নি। দেখি বুড়ো শয়তান কত সহ্য করতে পারে।”

ততক্ষণে সেখানে আরো অনেক পিন্ডারি এসে জমেছে। ফলে ইচ্ছে হলেও আমার গফুর খানকে আটকাবার সাধ্য ছিল না আর। চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি তাকে তার পাপের ঘড়া পূর্ণ করতে দিলাম।মনে মনে ঠিক করে নিচ্ছিলাম, আর দেরি নয় এইবারে এর শাস্তির সময় এসে গেছে।

বুড়োর মরা ছেলেদের ধুতি ছিঁড়ে সেই কাপড় তার হাতের আঙুলে মোটা করে জড়িয়ে দিয়ে তেলে ভিজিয়ে নেয়া হল প্রথমে। তারপর একটা কাঠির মাথায় আগুন জ্বালিয়ে নিয়ে গফুর খান বলে, “একটা শেষ সুযোগ দিচ্ছি তোকে ব্যাটা কাফির, এখনো বলে দে কোথায় সোনাদানা লুকিয়ে রেখেছিস।”

বুড়োমানুষটি বেপরোয়া গলায় বললেন, “যা পারো করো। আমায় যখন খুন করবেই না, তখন আমায় যন্ত্রণা দিয়ে যদি তুমি সুখি হও তাহলে তাই হোক। নারায়ণ আমায় তোমার হাতে তুলে দিয়েছেন। এ কাজ তুমি করছ না। এ সব তাঁরই ইচ্ছায় হচ্ছে। আমার গোটা হাতটা পুড়ে গেলেও আমি\সহ্য করব। একটা শব্দ করব না মুখে। থুঃ—থুঃ–”

“উঃ এর কথা আর সহ্য করা যাচ্ছে না। এর আঙুলে আগুন লাগা,” বলে চিৎকার করে উঠল গফুর খান। লোকটার আঙুলগুলো একে একে মশালের মত জ্বলে উঠল। তার হাতদুটো জোর করে চেপে ধরে রেখেছিল কয়েকজন মিলে। দাউদাউ করে জ্বলছিল আঙুলগুলো। মাংস পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছিল চারদিকে। মাঝেমাঝে সেখানে নতুন করে তেল ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছিল আগুন জ্বালিয়ে রাখবার জন্য।

বুড়োমানুষটা নিজের প্রতিজ্ঞা ভুলে গেল। তার বুকফাটা আর্তনাদ শুনে পাথরের বুকেও দয়া হবে, কিন্তু গফুর খানের মন তাতেও গলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে হাসি হাসি মুখে সে মানুষটার কষ্ট দেখছিল আর মাঝেমাঝ্যেই তার প্রশ্নটা ফের করে উঠছিল একবার করে, “কোথায় রেখেছিস তোর সোনাদানা?”

খানিক পরে লোকটার চিৎকার একেবারে থেমে গেল।

“লোকটা মরে গেছে খানসাহেব,” আমি চিৎকার করে উঠলাম, “আল্লার কিরে এবারে চলুন এখান থেকে।”

গফুর খান আমার কথায় কান না দিয়ে বলল, “হারামজাদি বউগুলো কোথায়? ধরে আন ওগুলোকে। একবার নিজে জিজ্ঞেস করে দেখি। সোনার খবর আজ আমি বের করে তবে ছাড়ব।”

কিন্তু দেখা গেল তারাও আর নেই। পাশের ঘরে থই থই রক্তের মধ্যে তাদের শরীরদুটো পাওয়া গেল।

খবরটা  শুনে গফুর খান একটা হিংস্র জন্তুর মত দাঁতে দাঁত ঘষতে শুরু করল। তার মুখের দিকে তাকাতে তখন ভয় লাগছিল আমাদের। এইসময় বুড়োমানুষটা হঠাৎ চোখ মেলল। কোনমতে উঠে বসে নিজের পোড়া হাতদুটোর দিকে ভারী করুণ চোখে তাকিয়ে দেখল একবার। তারপর চারপাশে একবার তাকিয়ে যেন বুঝতে চাইল এরা কারা  তাকে ঘিরে রেখেছে? এরা মানুষ, না রাক্ষস!

গফুর খান তার তলোয়ারটা টেনে বের করল এবারে। সেটা মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরে বলল, “জবাব দে। নাহলে-”

আমার মনে হল বুড়োর মুখে মৃদু একটা হাসি খেলে গেল যেন। চোখদুটোকে আকাশের দিকে তুলে ধরল সে। কিন্তু তার মুখ থেকে কোন কথা বের হল না। খানের হাতের তলোয়ারটা এবার সজোরে নেমে এল মানুষটার কপালের ওপর। মাথাটা তার কেটে দুফালা হয়ে গেল এক মুহূর্তে।

মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, গফুর খানের আর বেঁচে থাকবার কোন অধিকার নেই। তারপর অভিশপ্ত বাড়িটা ছেড়ে বের হয়ে গেলাম।

ক্রমশ

টাইম মেশিন সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s