টাইম মেশিন ঠগির আত্মকথা অলবিরুণী শরৎ ২০১৬

আগের পর্বগুলো এইখানে

।২৮।

            জব্বলপুর পৌঁছোন অবধি আর নতুন কোন ঘটনা ঘটল না।  সেখানে পৌঁছে আমি, পীর খান আর মোতিরাম দিনদুয়েক ধরে জব্বলপুরের দোকানবাজারে ঘোরাফেরা করেও কোন শাঁসালো শিকারের খোঁজ না পেয়ে শেষে সময় নষ্ট না করে তিন দিনের দিন আমরা ফের জব্বলপুর ছেড়ে রওনা হলাম। জব্বলপুর থেকে নাগপুর অবধি রাস্তাটা একেবারে বনজঙ্গলে ঢাকা। মাইলের পর মাইল রাস্তা একটা মানুষের মুখ দেখা যায় না। রাস্তাটা ঠগিদের কাজকর্মের পক্ষে একেবারে আদর্শ। এমন একটা রাস্তায় কোন কাজকর্ম ছাড়া দিনের পর দিন চলতে চলতে শেষমেষ যখন একেবারে তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছি এমন সময় একদিন যাত্রার শেষে একটা গ্রামে পৌঁছে মোতি্রাম খবর আনল, সেখানে সে এক ব্যবসায়ীর বাড়ির দরজায় একটা পালকি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। তাকে ঘিরে বেশ ক’জন চাকরবাকর আর সেপাই দাঁড়িয়েছিল।

“মনে হচ্ছে লোকটা বেশ ভালো দরেরই হবে, বুঝলেন মীরসাহেব,” মোতি বলছিল, “আমি বলি কি, আপনি একবার গিয়ে খবরটবর নিয়ে দেখুন না, ব্যাটাকে যদি পাকড়ানো যায়!”

অতএব খানিক বাদে আমি পথের পোশাক খুলে ভালো জামাকাপড় গায়ে চাপিয়ে দলের আর এক ঠগিকে  হুঁকোবরদার সাজিয়ে নিয়ে গ্রামে গিয়ে ঢুকলাম। পালকিটা যেখানে ছিল তার কাছেই একটা পানের দোকানে গিয়ে বসে কথায় কথায় দোকানদারকে বললাম, “আপনাদের দেশটা কিন্তু বেশ বুনো।”

সে বলল, “ তা যা বলেছেন। আপনাদের মতন পথিকরা এ পথে যাতায়াত করেন বলে পানতামাক বেচে খেয়েপরে আছি।”

“কিন্তু সেরকম খদ্দেরও তো বেশি পাও বলে মনে হয় না। রাস্তায় আসতে আসতে কই লোকজন তো বিশেষ চোখে পড়ল না! ”

“হ্যাঁ। এখনো সময় হয় নি। তবে আর ক’টা দিন যেতে দিন, দেখবেন শয়ে শয়ে লোক চলছে। এখন তো সবে লোক আসতে শুরু করেছে। ঐ যে ওইখানে দেখুন না একটা দল এসেছে–” এই বলে সে খানিক দূরে দাঁড়ানো পালকিটার দিকে দেখাল।

“লোকটা কে বলুন তো? পথে আসতে চোখে পড়েনি!”

“সে সব অতশত কিছু আমি জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি লোকটার কাছ থেকে বেশ খানিক তামাক জোগাড় হয়েছে। আর বেশ কিছুদিন পর একটা রুপোর টাকা হাতে পেয়েছি ওর কল্যানে।”

পানওয়ালাকে ছেড়ে খানিক দূরে আর এক দোকানদারের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করেও লাভ হল না কিছু। সে বলল, সম্ভবত কোন রইস মানুষ কোন হইচই না বাধিয়ে ব্যক্তিগত কোন কাজে চলেছেন, তবে তার বেশি সে আর কিছু জানে না। ব্যাপারটা একটু আশ্চর্য লাগছিলো আমার। একটা রঙচঙে আট বেহারার পালকি, সঙ্গে সেপাই সান্ত্রী নিয়ে চলেছে অথচ কাকপক্ষিতেও টের পাচ্ছে না কে যায়! ঠিক করলাম, এর ব্যাপারে কিছু খবর না জেনে এখান থেকে নড়ছি না। ফের সেই পানওয়ালার কাছে ফিরে গিয়ে আমি আমার হুঁকোবরদারকে ডেকে হুঁকোটুকো সাজিয়ে নিয়ে বসে বসে গেলাম। খানিক দূরেই সেই ব্যবসায়ীর বাড়ির সামনে পালকি দাঁড়িয়ে আছে।

timemachonethogi01 (Medium)বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না অবশ্য।পালকির পর্দার আড়াল থেকে মনে হল দুটো ঝকমকে চোখ আমায় দেখছে। খানিক বাদে পর্দাটা একটু ফাঁক হয়ে একটা ভারি সুন্দর মুখ আমার দিকে উঁকি মেরে দেখে সঙ্গে সঙ্গে ফের পর্দা বন্ধ করে দিল।  আমার সব আগ্রহ উবে গেল। আমি তো ঠিকই করে নিয়েছি মেয়ে বুনিজের শিকার আমি আর করবই না কখনো। তাহলে এর ব্যাপারে আর খোঁজখবর নিয়ে কী লাভ! তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে আমি আমার ঘাঁটির দিকে রওনা দিলাম। ঠিক করে নিলাম পরদিন সকাল সকাল সে গ্রাম ছেড়ে চলে যাব। মেয়েটা হয়ত কোন ভালো ঘরের বউ। শ্বশুরবাড়িতে চলেছে একা একা। আহা এমন অসহায় মানুষের ওপর হাত তোলবার কথা ভাবাও অন্যায়। তার মুখটা মনে পড়লেই আমার আজিমার কথা মনে পড়ে গিয়ে বুকটা কেঁপে উঠছিল একেকবার। আমার আজিমাকে যদি পথের মধ্যে এমনিভাবে কোন ঠগির দল ধরে, তাহলে? আমার মত মেয়েদের গায়ে হাত না দেবার প্রতিজ্ঞা তো তারা আর করে বসবে না!

কিন্তু মুখটা কিন্তু আমি ভুলতে পারছিলাম না কিছুতেই। বারবার সেই পর্দার ফাঁক দিয়ে একঝলকের জন্য উঁকি দেয়া ধারালো মুখ আর ঝকমকে চোখদুটো ফিরে আসছিল চোখের সামনে। একবার মনে হয় ফিরে গিয়ে আর একবার দেখে আসি মেয়েটাকে, আবার নিজেই নিজেকে শান্ত করি।

এমনি করে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এল যখন তখন হঠাৎ দেখি একটা মেয়ে আমাদের ঘাঁটির দিকেই আসছে। এই অবেলায় একটা মেয়ে একলা একলা এদিকে কেন আসছে ভাবতে ভাবতে আমি তার কাছাকাছি এগিয়ে যেতে খেয়াল করলাম সে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজছে। আমার কাছে এসে একটু ইতস্তত করে সে বলল, “গোস্তাকি মাফ করবেন সাহেব, আমি একজনকে খুঁজতে এসেছি এখানে। যাঁকে খুঁজছি তাঁর যা চেহারার কথা শুনেছি সেটা আপনার সঙ্গে মেলে।”

“বলো , কী বলতে চাইছো?”

“আপনিই সে কি না আমি আমি জানিনা। আচ্ছা বলুন তো আপনি কি আজ সকালে পানওয়ালার দোকানের সামনে বসে হুঁকো খাচ্ছিলেন?”

“খাচ্ছিলাম তো। কিন্তু তাতে কী হল? তার জন্য আমায় খুঁজে বেড়াচ্ছো নাকি?”

“না না, আমি নই, অন্য একজন আপনাকে তখন দেখেছেন। তিনি আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চান। আপনি কি একবার আমার সঙ্গে আসবেন?”

 “হুঁ। তা এই একজনটি কে? আমার সঙ্গে তাঁর কাজটাই বা কী?”

“প্রথম প্রশ্নটার জবাব দেবার অনুমতি আমার নেই সাহেব। আর দ্বিতীয়টার উত্তর আমি সত্যিই জানি না। চলুন, গিয়ে নিজেই জানতে পারবেন সব। ”

বললাম, “চলো।”

“তাহলে খানিক দূর থেকে আমার পেছন পেছন আসুন, আর বাড়ির কাছে এসে এমন দাপটের সঙ্গে ভেতর ঢুকে আসবেন, যেন আপনিই মালিক।”

সেদিন মেয়েটার কথা শুনে আমি তার সঙ্গে আসতে না-ই পারতাম। কিন্তু নিয়তিকে কে ঠেকাবে। কপালে যা লেখা আছে তার অন্যথা করবার ক্ষমতা তো আমাদের নেই! আমি মন্ত্রমুগদ্ধের মতো মেয়েটার সঙ্গ নিলাম।

সকালবেলার সেই বাড়িটার সামনে গিয়ে আমি চটিদুটো বাইরে খুলে রেখে সটান ভেতরে ঢুকে গেলাম। ঘররের পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে যাবো তখন সেই মেয়েটা বলে, “একটু দাঁড়ান আমি ভেতরে গিয়ে একবার বলে নিই।” এই বলে সে পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। খানিক বাদেই ফের বের হয়ে এসে বলল, “আসুন।”

পর্দা ঠেলে ঘরে ঢুকে দেখি সেখানে আপাদমস্তক ঢাকা একটি মেয়ে বসে আছে। তার মুখ দেয়ালের দিকে ফেরানো। বললাম, “বান্দা হাজির। এখন হুকুম করুন সাহেবা।”

মৃদু আওয়াজে উত্তর ভেসে এল, “বসুন, আপনাকে আমার কিছু জিজ্ঞাসা করবার আছে।”

আমি খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে মেঝের কার্পেটের ওপরে গিয়ে বসলাম।

“এভাবে আপনাকে আমার ঘরের ভেতর ডেকে আনায় আপনি হয়তো আমাকে নির্লজ্জ ভাবছেন, কিন্তু আর কোন উপায় নেই। আমি একা বিধবা পথে চলেছি। সঙ্গে বিপদে আপদে বাঁচাবার কেউ নেই। আপনারা কোনদিকে চলেছেন জানতে পারি কি?”

বললাম, “আমরা জব্বলপুর থেকে আসছি। যাব নাগপুরে। কাল সকালে রওনা দেবার কথা।”

“আমিও সেখান থেকেই আসছি,” সে বলল, “যাবোও নাগপুরেই। মনে হচ্ছে স্বয়ং ভগবানই আপনাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন আমার সহায় হবার জন্য।”

“আচ্ছা, পথে আপনাদের সঙ্গে দেখা হয়নি কেন বলুন তো?” আমি একটু অবাক গলায় জিজ্ঞাসা করলাম।

“দেখা হয়নি কারণ আমি আপনাদের থেকে খানিক পিছিয়ে ছিলাম। সামনে আপনার দলটা চলেছে সে খবর পাবার পর খুব তাড়াতাড়ি এসে এইখানে আপনাদের নাগাল পেয়েছি। আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে এখন থেকে আপনার দলটার সঙ্গে সঙ্গে চলতে চাই। তাহলে বিপদ-আপদের ভয় থাকবে না।”

“আমি রাজি সাহেবা। কথা দিচ্ছি পথে আপনার কোন বিপদ হতে দেব না। কাল ভোরবেলা আমি আপনাকে ডাকবার জন্য লোক পাঠিয়ে দেব।”

মেয়েটা আমায় সালাম দিল, আর সেই করতে গিয়ে হঠাৎ করে তার মুখের সামনে থেকে কাপড়টা একমুহূর্তের জন্য সরে যেতে ফের আমার সারা শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। এমন আগুনের মত রূপ আমি বেশি দেখিনি। এক মুহূর্তের জন্য আমার দিকে চোখ তুলে ধরেই সে ফের মুখের ওপর কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়ে দেয়ালের দিকে ঘুরে বসল।

আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, “এবারে তবে আমি চলি।”

“আপনার নামটা জানা হল না যে!”

বললাম, “বান্দার নাম আমীর আলি। আমি হিন্দুস্তানের একজন নগণ্য সৈয়দ।”

“সে আমি আপনার মুখের মার্জিত ভাষা শুনেই অনুমান করেছিলাম যে আপনি বড়োঘরের মানুষ। ফজিল, পান আর আতর নিয়ে এস।”

আমায় সঙ্গে করে নিয়ে আসা দাসীটি তাড়াতাড়ি সেইমত সবকিছু সাজিয়ে নিয়ে এল। তার থালা থেকে একখিলি পান তুলে নিয়ে, বুকে আর দাড়িতে আতর বুলিয়ে নিয়ে আমি বিদায় নিলাম।

ব্যাপারটা আমি সে রাতে কারো কাছে ভাঙিনি। পরদিন সকালে একটু দেরি করে রওনা হয়ে যখন মেয়েটার পালকি আর লোকজকে আমার দলে ডেকে নিলাম তখন একজন সুন্দরী মহিলা আমাদের সঙ্গে নাগপুর অবধি যাবে শুনে দলের সবাই উত্তেজিত। পীর খান আর মোতিরাম আমায় নিয়ে নানান রঙ্গরসিকতা জুড়ল। আমি যত প্রতিবাদ করি, বলি ওসব কিছু নয়, ততই তারা আরো বেশি করে ঠিসিঠাট্টা করে আমায় নিয়ে। খানিক পরে একটু রেগে গিয়ে আমি বললাম, “দেখো হে, এসব কথার কোন মানে নেই। আমি সেধে গিয়ে কাউকে ডেকে আনিনি। এ মেয়েটাকে আমি চিনিও না। আমাদের এ ভেবেছে সাধারণ পথচলা লোকজন। তাই একসাথে যেতে চেয়েছে। আমিও রাজি হয়ে গেছি। তাতে মেয়েটা সুন্দর না কুচ্ছিত, বুড়ি না ছুঁড়ি সেসব আমি কিছু বিচার করে দেখিনি। চলতে চলতে হয়ত এর সব কথাই জানতে পারব। কিন্তু সে পরিচয় যা-ই হোক না কেন, আমি একে আশ্রয় দিয়েছি। অতএব এর কোন ক্ষতি আমি হতে দেব না।”

“আরে বন্ধু রাগ করেন কেন? বন্ধুদের মধ্যে এমন একটু আধটু ঠাট্টা তামাশা তো চলেই থাকে।” হাসতে হাসতে মোতিরাম বলল, “আপনি হলেন গিয়ে দলের মালিক। আপনার দয়া হলে দলে যত খুশি মেয়ে এসে ঢুকুক না কেন, একজকেও আমরা বুনিজ বানাব না।”

অতএব আমাদের পথ চলা শুরু হল। মাঝে মাঝে আমি পালকির কাছটায় গিয়ে ঘোরাঘুরি করতাম। শুরুতে তাতে সাড়া না মিললেও আস্তে আস্তে  পালকির দরজা খুলে একটা দুটো কটাক্ষ হানাও শুরু হয়ে গেল ওপক্ষের দিক থেকে।

কদিন বাদে একদিন দুপুরে খাবার জন্য থামা হয়েছে এমন সময় ফজিল নামে সেই দাসী মেয়েটা ফের এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল। তার কাছে যেতেই দেখি আমি আমার বাড়ির কথা, আজিমার কথা সব ভুলে যেতে বসেছি। অনেকক্ষণ আমার সামনে চুপচাপ বসে থেকে হঠাৎ কাপড়ের আড়াল থেকে চোখদুটো বের করে সে তার দাসীকে বলল, “বাইরে গিয়ে বোস। সাহেবের সঙ্গে আমার গোপন কথা আছে।”

  ফজিল চলে গেলে আবার খানিকক্ষণ সব চুপচাপ। খানিক বাদে সে আস্তে আস্তে বলল, “এইভাবে নিজের মুখ আপনাকে দেখিয়েছি, নির্লজ্জের মত ডেকে এনে কথা বলছি সেটা অশোভন, তা আমি জানি মীর সাহেব। কিন্তু যা ঘটে গেছে তা তো আর ফেরানো যাবে না! আমার কথা বলি। আমি আগ্রার কাছের এক নবাবের বেগম। আমার স্বামী হায়দরাবাদ থেকে ফেরবার পথে নাগপুরে মারা গিয়েছেন। আগ্রার ওদিকে তাঁর অঢেল সম্পত্তি। আমার কাছে খবর এসেছিল, আমার বাপের বাড়ি লোকজনও আমার স্বামীর পরিবারের মতই নামজাদা। তাঁরা সেইসব সম্পত্তির দখল নিয়ে আমার জন্য রেখে দিয়েছেন। এখন আমার ফিরে গিয়ে সম্পত্তির দখল নিতে বাধা নেই। ফিরে গিয়ে উপযুক্ত কোন মানুষের সঙ্গে নিকাহ করে সম্পত্তির উত্তরাধিকারীর জন্ম দেয়াই এখন আমার কাজ। তাই আমি তাড়াতাড়ি ফিরে যাচ্ছিলাম নাগপুর থেকে আগ্রার দিকে। কিন্তু তারপর—আমীর আলি—কী লজ্জা—কেমন করে আমি আমার বাকি কথাটা বলব আপনাকে? লজ্জায় আমার জিভ চলছে না।”

“না না সাহেবা, আপনি বলুন। কথাটা শেষ করুন,” আমি তাড়াতাড়ি বললাম।

“হ্যাঁ। বলতে তো আমাকে হবেই। যতই লজ্জা হোক, কথাটা না বলে আমি পারব না। আপনার কথা আমি প্রথম শুনি ফজিলের কাছে। বাইরে থেকে আপনাকে দেখে এসে সে-ই আমার কাছে আপনার বর্ণনা দিয়েছিল প্রথমে। কেমন সুন্দর আপনার চেহারা, ঘোড়ায় চড়ে কেমন বীরের মতন ছুটে যান সেইসব কথা। তার কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। আমার স্বামী ছিলেন বুড়োমানুষ। আমাকে সন্দেহ করতেন। ওই এক দাসী ফজিল ছাড়া আর কোন মানুষের সঙ্গে কথা বলাও মানা ছিল আমার। কিন্তু মনের ভেতর বড় ইচ্ছা হত জানেন, কোন সুপুরুষ জওয়ানের সঙ্গে কথা বলি, তাকে দেখি। সাহস হত না। ভদ্রতায় বাধত। কিন্তু তারপর সেদিন যখন আমি আপনাকে পানওয়ালার দোকানে বসে থাকতে দেখলাম, আর চোখ সরাতে পারি না। আপনি চলে যাবার পর কার্পেটে লুটিয়ে পড়ে অনেক কেঁদেছিলাম সেদিন। ওই ফজিল আমায় তখন বুঝিয়ে সুজিয়ে শান্ত করে। তারপর আমার অবস্থা দেখে ও-ই গিয়ে আপনাকে খুঁজেপেতে নিয়ে এসেছিল সেদিন বিকেলে।

প্রথম যখন এসে ঢুকলেন, তখন আমার ইচ্ছে হয়েছিল আপনার পায়ে গিয়ে লুটিয়ে পড়ি। তারপর আপনার সঙ্গে যখন কথা বললাম, বুকের ভেতর আগুন জ্বলে গেল আমার। সঙ্গের লোকজনকে ডেকে বললাম, নাগপুরে কিছু দামি রত্ন বন্ধক রাখা রয়ে গেছে, সেগুলো ছাড়িয়ে আনবার জন্য আমায় নাগপুরেই ফিরে যেতে হবে আবার। আগ্রায় এখন আমার ফেরা হবে না। তারা আমায় বিশ্বাস করল, আমীর আলি– ”

বলতে বলতে একটানে মুখের ওপর থেকে ওড়নাটা পুরোপুরি সরিয়ে দিয়ে আমার কোলে এসে মুখ গুঁজল সে—“আমীর আলি। এই আমার লজ্জার কথা, আমি তোমায় ভালোবাসি। আমায় তুমি তোমার দাসী করে রাখো। যেখানে তুমি যাবে আমি সঙ্গে যাবো। তুমি যে-ই হও, যা-ই হও, আমি তোমার হয়ে থাকব চিরকাল! তোমায় ছাড়া আমি বাঁচব না। আমি তোমার—আমি তোমার—ওঃ আমীর আলি, কেন তুমি এলে আমার জীবনে?”

।২৯।

ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে গেল ওভাবে। বাড়ির কথা , আমার আজিমার কথা, বাচ্চাদের কথা, সব আমি ভুলে গেছিলাম তখন। মেয়েটার নাম শুরফুন। জোরা সুন্দরী ছিল আজিমা তার চেয়েও সুন্দরী। কিন্তু শুরফুনের তুলনা শুধু সে নিজে। আমি কখনো স্বপ্নেও এমন রূপের কথা ভাবিনি। আমার সঙ্গে অনেক কথা সে বলল। আমি শুধু মন্ত্রমুগদ্ধের মত সব ভুলে তার কথা শুনে চলেছি তখন।

সে বলছিল, “আমীর আলি, কেন শুধু শুধু সৈনিকের জীবন নিয়ে এত লড়াই করে জীবন কাটাতে চাও? আমি থাকতে তোমার জীবন বিপন্ন করবার কোন দরকার হবে না। টাকার আমার অভাব নেই। যখন চাইব, যত চাইব পেয়ে যাব। আর সব ভুলে তুমি শুধু আমার কাছে থাকো। আমায় ছেড়ে যেও না কখনো।”

সে মুহূর্তে কী যে হয়ে গিয়েছিল আমার, আমি প্রতিজ্ঞাও করে ফেললাম সব ছেড়েছুড়ে তার সঙ্গেই চলে যাবো। তারপর, পরদিন ফের ফিরে এসে কীভাবে কী করা হবে সেসব ঠিকঠাক করব সেই প্রতিজ্ঞা করবার পর সেদিনের মত ছাড়া পেলাম আমি।

তাঁবুতে ফিরে সেদিন আমি খাওয়াদাওয়া কিছু করতে পারলাম না। একদিকে আমার আজিমা, আমার ঘরবাড়ি, পরিবার, আমার দলবল, কাজকর্ম, আর অন্যদিকে এই হঠাৎ এসে জুড়ে বসা মেয়েটা। কোনটা যে ঠিক আর কোনটা নয় সেই দ্বন্দ্বে পড়ে মাটিতে শুয়ে ছটফট করছিলাম আমি। অবস্থা দেখে জংলি গিয়ে পীর খানকে ডেকে আনল। তাকে গালাগাল দিয়ে বিদেয় করলাম। তারপর একবার ভাবলাম দিই নিজের বুকে ছুরি গেঁথে সব কষ্টের অবসান করে। কিন্তু করতে পারলাম না। বহুক্ষণ এইভাবে কষ্ট পাবার পর একসময় অনেকক্ষণ ধরে কেঁদে মাথাটা একটু ঠান্ডা হলে পরে পীর খানকে ফের ডাকিয়ে এনে সব কথা তাকে খুলে বললাম।

সব শুনে পীর খান বলল, “এ বড় সমস্যার ব্যাপার আমীর খান। কাল মেয়েটার কাছে গিয়ে বাচ্চাছেলের মত আচরণ না করে একটু পুরুষমানুষের মত ব্যবহার কর। ঠান্ডা মাথায় বোঝাও যে তোমার ঘরে বিবি আর দুটো বাচ্চা আছে, জীবনে অন্য কাজকর্ম আছে। এইভাবে তুমি সব ছেড়ে তার সঙ্গে যেতে পারবে না। দেখবে শুনেই সে তোমার সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে বসবে। তখন তুমিও তার সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করে সব চুকিয়েচুকিয়ে দিয়ে চলে এসো। আর এতে যদি কাজ না হয় তাহলে একে রাস্তার মধ্যে রেখে আমাদের দলটা রাতের অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পালিয়ে গিয়ে একেবারে বেরারে গিয়ে উঠতে পারি। কোনদিন আর ও মেয়ে আমাদের খুঁজে পাবে না তাহলে।”

পরদিন  শুরফুনের তলব আসতে পীর খানের কথায় বুক বেঁধে গিয়ে হাজির হলাম তার তাঁবুতে। তখন বিকেলবেলা। তার তাঁবুতে গিয়ে ঢুকতেই সব লজ্জার মাথাটাথা খেয়ে সে এসে আমায় একেবারে জড়িয়ে ধরে বসল। ঠেলেঠুলেও তাকে সরাতে না পেরে মরীয়া হয়েই আমি তাকে এবার আমার বউবাচ্চার কথা খুলে বললাম। দেখা গেল পীর খান একেবারে সঠিক কথা বলেছিল। একেবারে হাতেনাতে ফল হল। রেগে আগুন হয়ে উঠে দাঁড়াল শুরফুন। তার চোখ যেন জ্বলছে। খোলা চুল উড়ছে মুখের চারপাশে। গলার শিরাগুলো ফুলে ফুলে উঠছে রাগের চোটে। বলে, “শয়তান, দুশ্চরিত্র কোথাকার—আর একবার নিজের মুখে বল, তোর বউবাচ্চা আছে–”

এইবার আমিও উঠে দাঁড়িয়ে তার মুখোমুখি হলাম। বেশ কড়া গলায় বললাম, “হ্যাঁ শুরফুন। আমি সত্যিকথাই বলছি। সে-ও তোমার মতই সুন্দরী। সে আমাকে বিশ্বাস করে। আমিও তার বিশ্বাসের অমর্যাদা করতে পারব না। আমায় তুমি তাদের কথা বলবার সুযোগটাই তো দাওনি কখনো। তোমার রূপ দেখে আমার চোখও ধাঁধিয়ে গিয়েছিলো সেটা ঠিক, কিন্তু আল্লাহ এখন আমায় নতুন শক্তি দিয়েছেন। তোমায় আমি আবার বলছি, শান্ত হয়ে আমার কথাটা শোনো– ”

কিন্তু কে শোনে কার কথা। শুরফুন তখন মাটিতে বসে গলা ছেড়ে কাঁদছে, নিজের চুল ছিঁড়ছে, বুক চাপড়াচ্ছে আর মাঝে মাঝে কান্না থামিয়ে আমায় ঠগ, জোচ্চোর বলে যা মুখে আসে তাই গালাগালি দিচ্ছে। আমি একটা কথা বলছিলাম না। ভয় হচ্ছিল একটাও নরম কথা বললে সে আবার সব ভুলে এসে আমায় জড়িয়ে ধরবে।

বেশ কিছুক্ষণ এইভাবে কেঁদেকেটে গাল দিয়ে শেষে একটু ঠান্ডা হল শুরফুন। আমার দিকে ফিরে বলল, “দূর হও তুমি আমীর আলি। সারাজীবন আমি তোমায় ভালোবাসা দিতে পারতাম কিন্তু সে সবের যোগ্য তুমি নও। সবই আল্লার ইচ্ছা। নইলে যাকে আমি ভালোবেসে সবকিছু দিতে তৈরি ছিলাম সে একটা মিথ্যেবাদি জোচ্চোর হবে কেন? শুরফুন এখনো এতটা নিচে নেমে যায়নি যে একজন মানুষের হৃদয়কে অন্য একজনের সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে বাঁচবে। সে যদি স্বয়ং দিল্লির বাদশা হয় তা হলেও নয়। যাও তুমি আমার চোখের সামনে থেকে। তোমায় আমি সহ্য করতে পারছি না। যাও। আল্লাহ আমাদের দুজনকেই ক্ষমা করুন।”

তার তাঁবু থেকে বের হয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি আমি পীর খানকে সব খুলে বলতে সে তো বেজায় খুশি। বলে, “এইবার আর দেরি নয়। চলো ফির যাই। নাগপুরে গিয়ে আয়-রোজগার বিশেষ কিছুই হবে না। তার চেয়ে তুমি চাইলে চলো বেরারের দিকটা ঘুরে খান্দেশ হয়ে ফিরে যাই।”

সেইমত পরদিন সকালে আমরা শুরফুনকে ছেড়ে ফিরতি পথ ধরলাম। বেশ কিছুদূর এসে  যে গ্রামে তার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল তার চেয়ে কয়েক ক্রোশ দূরে অন্য একটা গ্রামে ঘাঁটি গাড়লাম সেদিন আমরা। কিন্তু শুরফুনের অত সহজে আমায় ছাড়বার মতলব ছিল না। বিকেল হবার আগেই দেখি তার পালকি সেখানেও এসে হাজির। এখন কী করি? আমার ইচ্ছে ছিল তখনই তল্পিতল্পা গুটিয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যে দিকে দু’চোখ যায় পালিয়ে যাই। কিন্তু মোতি্রাম আর পীর খান সে কথা মানতে রাজি নয়। বলে একটা মেয়েমানুষের ভয়ে জঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে বুনো জন্তুর খপ্পরে পড়ব,এমন কাপুরুষ আমরা নই। মোতি্রাম আবার আর এক কাঠি এগিয়ে বলে, “ভয় পাচ্ছ কেন? এমনও তো হতে পারে যে তোমার ব্যাপারটা চুকেবুকে যেতে মেয়েটা হয়তো আবার আগ্রায় ফেরবার পথ ধরেছে? ”

বললাম, “হতে পারে,” কিন্তু মনে মনে ভয় হচ্ছিল এ আবার আমাকে ধাওয়া করছে। খানিকক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল আমার সন্দেহটা ঠিক। দেখি ফজিল দুধওয়ালির ছদ্মবেশ ধরে আমার তাঁবুতে এসে হাজির। বলে তার মালকিন আমায় ডেকেছে। আমি কাউকে কিছু না বলে ফের তার পিছুপিছু শুরফুনের কাছে গিয়ে উঠলাম। তারপর যা শুরু হল সে বলার কথা নয়। একবার সে কেঁদেকেটে আমার কোলে এসে পড়ে আবার পরের মুহূর্তেই রেগে উঠে যা নয় তাই বলে গাল দিয়ে আমায় তাড়িয়ে দেয়, কিন্তু আমি ঘুরে দাঁড়াতেই ফের এসে পায়ের ওপর লুটিয়ে কান্না জোরে। বলে, “অভাগিনীকে দয়া করো সাহেব। আমার কথা শোন। চলো আমার সঙ্গে সব ছেড়ে।”

শেষমেষ তিতিবিরক্ত হয়ে আমি তার আস্তানা ছেড়ে বের হয়ে যেতে সে আর্তনাদ করে বলে “একটিবার ফিরে এসো।” আমি তখন ফের ভেতরে ঢুকে এসে বললাম, “শুরফুন, এমন ছেলেমানুষী কোরো না। আমি তো তোমায় বুঝিয়ে বলেছি বারবার যে দিল্লির মসনদটাও আমি তোমার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি, কিন্তু আমার হৃদয়ের ভাগ তুমি কোনদিন পাবে না। ওখানে যার অধিকার তারই থাকবে। তাহলে কেন জোর করছ শুধু শুধু? ”

শুনে সে কাঁদতে কাঁদতে বলে,  “আমি তোমার কোন কথা শুনতে চাইনা। আমায় স্বীকার না করলে তোমার ভালো হবে না আমীর খান। আমাদের ধর্মে তোমার চারজন বিবি থাকতে পারে। তাহলে আমায় বিয়ে করতে তোমার বাধা কোথায়? কথা দিচ্ছি আজিমাকে আমি নিজের বোনের মত দেখব। তার সন্তানদের নিজের সন্তানের মত ভালোবাসব। আমার ধনদৌলত তাদেরও হবে। সব মেনে নিচ্ছি আমি। তাহলে আর তোমার আপত্তি কীসের? এই দেখ, আমি আর পাগলামো করছি না। যা বলছি ঠান্ডা মাথায় বলছি। তোমার যদি একটা সহোদর বোন থাকত তাহলে সে তোমায় যেভাবে বোঝাত সেইভাবে তোমায় বোঝাচ্ছি। কথা শোন আমীর খান।”

আমি মাথা নেড়ে বললাম, “যদি আল্লা তোমায় আমার বোন করতেন শুরফুন, তাহলে আমার মত সুখী আর কেউ হত না। কিন্তু যা তুমি চাইছো সেটা বড় লজ্জার। আচ্ছা ভেবে দেখ, কত বড় পরিবারের মেয়ে তুমি। আর আমার না আছে বংশমর্যাদা, না আছে ধনদৌলত। তাঁরা কি আমার মত একটা নামধামহীন রাস্তা থেকে তুলে আনা লোককে তোমার স্বামী হিসেবে মেনে নেবেন? কক্ষনো না। তার চেয়ে বরং নিজের বাড়িতে ফিরে যাও। পরে একসময় আমি আজিমাকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব, সে গিয়ে তোমায়, তার স্বামীকে তার কাছে ফিরিয়ে দেবার জন্য ধন্যবাদ দিয়ে আসবে।”

timemachonethogi02 (Medium)এইবারে সে দেখি একটু চুপ করেছে। কিন্তু একটু পরেই আবার সে রাগে একেবারে ফেটে পড়ে আমায় দুরদূর করে তাড়িয়ে দিল। কিন্তু ঘন্টাখানেক যেতে না যেতে আমার তাঁবুতে ফের ফজিল এসে হাজির। বলে, “আল্লাহর কিরে মীর সাহেব, মালকিনের জন্য কিছু একটা করুন। খানিক আগে আমায় ডেকে বলল, খানিকটা আফিং জোগাড় করে আনতে। আমি মানা করতে রেগেমেগে আমায় যা নয় তাই গালি দিয়ে বলে তুই না পারিস তো আমি নিজেই গিয়ে আফিং জোগাড় করে আনব। কী আর করি, এই যে আফিং জোগাড় করে নিয়ে যাচ্ছি। জানি এ দিয়ে মালকিন কী করবেন। আপনাদের সব কথাবার্তা আমি নিজে কানে শুনেছি। আপনি ভালো মানুষ। সৎ মানুষ। কিন্তু মালকিনের প্রাণটা বাঁচাবার জন্য অন্তত মিথ্যে করে হলেও তাঁকে একটু আশা দিন। বলে দিন যে তাঁর জায়গিরে পৌঁছে আপনি তাঁকে বিয়ে করবেন। আপনাদের সঙ্গেসঙ্গেই নিয়ে চলুন তাঁকে। কথা দিচ্ছি পথে তিনি আর কখনো আপনার সঙ্গে দেখা করবার চেষ্টা করবেন না। শুনেছি আপনি বলছিলেন মালকিনকে আল্লাহ আপনার বোন বানালে আপনি ধন্য হয়ে যেতেন। তাঁর প্রাণটা বাঁচাবার জন্য ভাইয়ের এই কর্তব্যটুকু আপনি করবেন না?”

আমি নিমরাজি হয়ে বললাম, “ঠিক আছে। বাঁচামরার প্রশ্ন উঠে গেছে যখন, তখন এইটুকু করতে আমি রাজি।” এই বলে আমি ফজিলের সঙ্গে গিয়ে শুরফুনকে সেইমতো সান্ত্বনাটুকু দিতে সে যে কী উল্লাস তার! আমার গলা জড়িয়ে ধরে বসে রইলো অনেকক্ষণ। তারপর ফজিল যখন তাকে খুলে বলল সে কেমন করে আমায় রাজি করয়েছে তখন আনন্দে ফজিলকে জড়িয়ে ধরে তার দ’গালে চুমুর বন্যা বইয়ে দিলো। দেখে আমি রেগে উঠে বললাম, “আমি যা বলেছি, যা করেছি সব তোমার প্রাণটা বাঁচাবার জন্য শুধু। তবে হ্যাঁ। কথা যখন দিয়েছি তখন আমার সঙ্গেসঙ্গেই তুমি পথ চলবে। কিন্তু সাবধান। আমার সঙ্গে খুব দরকার না হলে দেখা করবার চেষ্টা কোরো না।”

শুরফুন ফজিলকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে আমার কাছ ঘেঁষে এসে গলা নামিয়ে বলল, “আমায় মিছে কথা বলে ফাঁকি দিতে চাইছ বুঝি? সাবধান। তুমি যদি কথা না রাখো তাহলে তোমার সব গোপন কথা কিন্তু আমি ফাঁস করে দেব। আমি কিন্তু জানি তুমি আসলে কী।”

“কী জানো তুমি?”

“আমি জানি যে তুমি পেশায় একজন ঠগি। ফজিল তোমার লোকেদের ঠগিদের পুজোআর্চা করতে দেখে আমায় এসে বলেছে। সেইসঙ্গে, তোমরা যেভাবে ঘাঁটি গাড়ো, যেভাবে চলাফেরা কর, কথাবার্তা বল সেইসব মিলিয়ে দেখে আমার আর কোন সন্দেহই নেই এ নিয়ে। কাজেই, সাবধান আমীর আলি। যাদের তুমি খুন করেছ তাদের সব লুঠ করা জিনিসপত্র এখনো তোমাদের সঙ্গেই রয়েছে। আর, এই কথা শুনে তোমার মুখের ভাব বলে দিচ্ছি এ কথাগুলোর একবর্ণও মিথ্যে নয়, তাই না?”

দাসীটার ওপরে আমার ভীষণ রাগ হচ্ছিল। আমাদের দলের একটা লোকের সঙ্গে ওর কদ্দিন ধরেই মাখামাখি চলছিল সেটা আমি খেয়াল করলেও গুরুত্ব দিইনি বিশেষ এতদিন। লোকটাকে মরতে হবে এইজন্য। কিন্তু তখন সেইসব কথা ভাববার সময় নেই আমার। যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হয়েছি আমি তখন। বললাম, “শুরফুন, জেনেই যখন গিয়েছ, তখন আর তোমার আলাদা থাকা চলবে না। আমার দলের লোকেদের বাঁচাবার জন্য বিয়ে আমাদের করতেই হবে। কিন্তু এ বাঁধন বড় ভয়ংকর। তুমি জীবন্ত থাকতে কখনো তা ঘুচবে না এ কথা জেনে রেখো।”

সে বিচিত্র একটা হাসি হেসে বলল, “যাক। রাজি হলে শেষপর্যন্ত। কথাগুলো আমার আরো আগেই বলে দেয়া উচিত ছিল তোমায়। তাহলে এত দুঃখ পেতে হত না। এইবার আমি তোমার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত। তুমি এখন যাও। রোজ একবার অরে আমার খবর নিয়ে যেও।”  

ফিরে যেতে যেতে আমার মনের ভেতর ঝড় উঠেছিল একটা। শুরফুন যে আমাদের আসল পরিচয় জেনে গেছে সে কথা আমাকে আমার দলের কাছে খুলে বলতে হবে। সেটাই নিয়ম। কিন্তু তার ফল কী হবে কে জানে! তাঁবুতে ফিরে এই নিয়ে বহুক্ষণ চিন্তা করলাম আমি। দলের পঞ্চাশটা তাজা জওয়ানের জীবন ওই একটা মেয়ের খেয়ালখুশির সুতোয় ঝুলে রয়েছে। এটা হতে দেয়া যায় না। আমাদের পেশার নিয়ম বড় কড়া। সবাইকে জানাতেই হবে ব্যাপারটা। তার একটাই ফল হতে পারে। কিন্তু আমার তাতে কিছু করবার নেই। শুরফুন নিজেই নিজের দুর্ভাগ্যকে ডেকে এনেছে। এখন আর তাকে এড়াবার কোন পথ নেই আমাদের।

**********

দেখা গেল যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই ঘটেছে। আমার দলের লোকজন খবরটা শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। শুরফুনকে যদি কোনখানে ফেলে রেখে পালাই তাহলে সে আর কিছু না পারুক কাছাকাছি গ্রামগুলোতে খবরটা দিয়ে দিলেই যথেষ্ট। শিকারী কুকুরের মত তারা ঠিক গন্ধ ধুঁকে শুঁকে আমাদের খুঁজে বের করে ফেলবে।

সে যাই হোক, আমাদের হাতে উপস্থিত একটা কাজ ছিল; যে লোকটা ফজিলকে খবরটবর দিয়েছে তাকে উপযুক্ত একটা শাস্তি দেয়া। ছেলেটার বয়স বেশি নয়।  পীর খানের দলে ছিল আগের যাত্রায়। পেশায় লুগাই। হাতের কাজ ভালো। তাকে এর আগে বেশ কদিন ফজিলের সঙ্গে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে সকলেই। ছেলেটাকে ডেকে সটান জিজ্ঞাসা করলাম, “ফজিলকে তুই আমাদের কথা বলে দিয়েছিস?” তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যেতে আমার আর কোন সন্দেহই রইল না। বললাম “দুর্ভাগা কুকুর, এমন কাজ তুই কেন করলি? এর শাস্তি কী তা তুই জানিস না?”

সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “জেমাদার, আমি অপরাধ করেছি। শাস্তিও পাবো। আমাদের আইন কত কড়া সে আমি জানি , তাই শুধু শুধু মার্জনা ভিক্ষা আমি করব না। দাসীটাকে আমি সব কথা বলেছিলাম একটাই কারণে। সে আমাকে বলেছিল আপনি তার মালকিনকে বিয়ে করতে চলেছেন, আমরা আসলে কী কাজ করি সে ব্যাপারে আপনার কাছ থেকে আগেই জেনে গেছে সে। এখন আমাদের বীরত্বের কিছু গল্প বললে সে চিরতরে আমার হয়ে যাবে। আমি বোকার মত তার কথায় বিশ্বাস করে আমাদের নানা অভিযানের গল্প করেছি তার কাছে কয়েকদিন আগেই। ক্ষমা আমি চাই না, শুধু একটাই অনুরোধ করব, আমার বন্ধু গুরু দত্তের হাতে যেন আমি মরি। ওর হাতটা খুব ভালো। বেশি কষ্ট দেয় না।”

আমি গুরু দত্তকে ডাকতে সে এগিয়ে এসে তাকে বলল, “আমার দোষ নিও না ভাই। আমি আমার কর্তব্য পালন করছি কেবল।”

সে উত্তর দিল, “আমি তোমায় মাপ করে দিলাম। দেখো হাত যেন না কাঁপে। আমি কোন বাধা দেব না। তাড়াতাড়ি কোরো।”

গুরু দত্ত আমার দিকে তাকাতে আমি ঝিরনি দিয়ে দিলাম। পরের মুহূর্তেই তার হাতে পাপের প্রায়শ্চিত্ত পুরো হয়ে গেল বেচারা বিশ্বাসঘাতকের।

এর পর একটাই কাজ বাকি ছিল। পরের দিনের সাংঘাতিক কর্তব্যটার জন্য দলের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া। সে কাজটা ঠিকঠাকভাবে করবার পর বুকের ভেতরটা বেশ হালকা হল আমার। একজন দায়িত্বশীল ঠগির মতই আমি দয়ামায়ার চেয়ে কর্তব্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে পেরেছি। সে কাজটা করতে করতে ভারী আশ্চর্য লাগছিল আমার। শুরফুন আমাদের প্রকৃত পরিচয় জানবার পরেও কেন পালিয়ে না গিয়ে ফের আমাকে খুঁজতে এল? ভাগ্যের লিখন। কপালে ওর যা লেখা ছিল তাকে খন্ডাবে কে? আমি কে তা জেনেও সে পালিয়ে না গিয়ে সেই আমারই কাছে ফিরে এল আবার! পালাবার সুযোগ সে তো কম পায়নি! তবু সব জেনেশুনেও সেধে এসে নিয়তির পাতা ফাঁদে ধরা দিল মেয়েটা!

পরদিন সকালে শুরুফুনদের দলটাকে নিয়ে আমরা রওনা হয়ে গেলাম। ঠিক করেছিলাম, তাকে আমি নিজে হাতে মারব না। যে হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করেছি সে হাতে তার শ্বাস বন্ধ করে দিতে আমার বাধবে। সে দায়িত্বটা দিয়েছিলাম মোতি আর পীর খানকে। আমার ভাগে পড়েছিল তার এক চাকর।

শুরফুনদের দলটা বেশ বড়। আটজন পালকি বেহারা, চারজন সেপাই আর ফজিলের একজন চাকর মিলে কুল্লে পনেরোজনের দল। তাদের নিকেশ করবার জন্য আমাদের দলের পঁয়ত্রিশজন লোককে বাছা হয়েছিল। অপেক্ষা ছিল শুধু এতবড়ো একটা কাজের উপযুক্ত জায়গা বেছে নেয়ার। আসবার পথে এই এলাকায় একটা জঙ্গুলে পথ আমি দেখে গিয়েছিলাম। ওর ভেতরে একটা জায়গায় জঙ্গল খুব ঘন। মানুষের একেবারেই কোন যাতায়াত নেই তার আশেপাশে। যে মোড় থেকে সেই রাস্তাটা শুরু হয়েছে তার মুখে এসে একটা সমস্যা দেখা দিল। নির্জন, জঙ্গলে ভরা রাস্তাটা দেখে শুরফুনের দলবল সেদিক দিয়ে যেতে নারাজ। বুঝিয়ে শুঝিয়ে তাদের সে পথে যেতে রাজি করাতে বেশ বেগই পেতে হল আমাদের।

কয়েক ঘন্টা যাবার পর একটা ছোট নদী দেখে আমরা সেখানে থামলাম। আমার দলটা শুরফুনের দলকে ঘিরে সংকেতের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু আমি চাইছিলাম, দলের ওপর আক্রমণটা হবার আগেই শুরফুন চলে যাক। অতগুলো মৃতদেহ যেন তাকে দেখতে না হয়। তার পালকির কাছে গিয়ে বললাম, “খাবে এসো। খানিকটা দূরে আমি গছের ডাল থেকে পর্দা ঝুলিয়ে রেখেছি। ওখানে বসে একসঙ্গে খাব।”

সে সাবধানে পালকি থেকে নেমে দাঁড়াতেই মোতিরাম তার গলায় রুমালটা জড়িয়ে দিল। সঙ্গেসঙ্গেই মারা গেল শুরফুন, কিন্তু পীর খান তার হাত ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলো যাতে দূর থেকে কিছু বোঝা না যায়। সেই অবস্থাতেই তাকে ফের পালকির মধ্যে ভরে দিয়ে তার দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে পীর খান বলল, “বিসমিল্লা। এইবার ঝিরনিটা দিয়ে দিন মীর সাহেব।”

আক্রমণের সংকেতটা দিতে আমি আর দেরি করলাম না। দু এক মুহূর্তের মধ্যেই সব কাজ শেষ হয়ে গেল। শুধু ফজিল মেয়েটা যার হাতে পড়েছিল সে তত দক্ষ নয়। মরবার আগে বড় চিৎকার করছিল সে। একটু দুঃখই হচ্ছিল আমার। একটা মেয়ের অর্থহীন কৌতুহলের জন্য পনেরোটা জীবন চলে গেল। শুরুফুনের শরীরটা গোর দিতে নিয়ে গেল যখন, আমি তার সঙ্গে যাইনি। তার পালকিটাকেও ভেঙেচুরে তার সঙ্গেই কবরে পাঠিয়ে দেয়া হল। বুকের ভেতর একটা মোচড় লাগছিল আমার। কিন্তু আগের দিনই নিজের দলের একজনকে মৃত্যুদন্ড দেবার স্মৃতি তখনো আমার মনের ভেতর তাজা হয়ে আছে। তাছাড়া, টুপুনির গুড় খেয়েছি আমি, ঠগিধর্মে যা যা কর্তব্য সেসব তো আমায় পালন করতেই হবে!

ক্রমশ

অলঙ্করণঃ মৌসুমী