টাইম মেশিন নিউগেট ক্যালেন্ডার- অনুঃ ইন্দ্রশেখর শীত ২০১৯

নিউগেট ক্যালেন্ডার আগের পর্বগুলো

ক্যাপ্টেন জ্যাকারি হাওয়ার্ড (মৃত্যুদণ্ড ১৬৫২ সন)

গ্লসেস্টারশায়ারের এক জমিদারের ছেলে ছিলেন জ্যাকারি হাওয়ার্ড। সম্পত্তির বিরাট আয়। বছরে সে বাজারে চোদ্দোশো পাউন্ড। তবে বাবার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি যখন তিনি হাতে পেলেন ঠিক তখনই সে-দেশে বাধল ১৬৪১ সনের গৃহযুদ্ধ।তার একদিকে রাজা প্রথম চার্লস, আর অন্যদিকে বিদ্রোহী নেতা অলিভার ক্রমওয়েল। 

হাওয়ার্ড প্রবল রাজভক্ত মানুষ ছিলেন। যুদ্ধ বাধতে তিনি তাঁর গোটা সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে প্রায় কুড়ি হাজার পাউন্ড ধার করলেন বাজার থেকে। তারপর সেই বিপুল অর্থে দিয়ে একটা ঘোড়সওয়ার সেনাবাহিনী গড়লেন। উদ্দেশ্য গৃহযুদ্ধে রাজার পক্ষ নিয়ে লড়াই করা।

তবে হাওয়ার্ডের কপাল মন্দ। সে যুদ্ধে বিদ্রোহী প্রজাতন্ত্রীরাই জিতে গেল শেষমেষ। হেরে যাওয়া ইংল্যাণ্ডের রাজার মুণ্ডু কেটে নেয়া হল।হাওয়ার্ড আর তাঁর মতন যে মানুষরা রাজার পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন তাঁরা শাস্তির ভয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নিলেন।

ওদিকে প্রথম চার্লসের ছেলে দ্বিতীয় চার্লস তখন কোমর বেঁধেছেন রাজ্য ফের উদ্ধার করবার আশায়।হাওয়ার্ড তাঁর সঙ্গে ফিরে এসে, প্রজাতন্ত্রীদের সৈন্যদলের বিরুদ্ধে ওরসেস্টারের যুদ্ধে বেজায় বীরত্ব দেখিয়ে দ্বিতীয় চার্লসের সুনজরে তুলে আনলেন নিজেকে।

তবে সে যুদ্ধে শেষরক্ষা হয়নি।শেষপর্যন্ত দ্বিতীয় চার্লসকে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে হয়। এরপর দ্বিতীয় চার্লস কীভাবে ফ্রান্সে পালিয়ে গিয়ে বারো বছর নির্বাসনে কাটিয়েছিলেন এ গল্পে সে কথা আর বলা হবে না। আমরা  বরং দেখি হাওয়ার্ডের কী হল।

বেচারা হাওয়ার্ড ইংল্যান্ডেই রয়ে গিয়েছিল এর পর। জমিদার তার দেনার দায়ে উধাও হয়েছে অনেকদিন। তার ওপর তার মত রাজভক্তকে ক্রময়েলের শাসনে কেউ যে কোনো কাজ দেবে না সে তো বলাই বাহুল্য। অতএব কিছুদিন ভালোভাবেকাজকর্ম করে থাকবার চেষ্টাচরিত্র করবার পর, হাল ছেড়ে দিয়ে হাওয়ার্ড সে-সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় কাজটায় যোগ দিল। সে ছিল রাস্তায় ডাকাতি করবার পেশা।তব সেই প্সহায়কাজ করতে করতেই একটা প্রতিহিংসার আগুন ক্রমাগত জ্বলে চলত তার মনে। যার জন্য তার সব হারাল সেই ক্রমওয়েল আর তার প্রজাতন্ত্রী সাঙ্গোপাঙ্গোদের সে দেখে নেবে। 

প্রতিজ্ঞা করে এইবার পথে নামল হাওয়ার্ড। প্রথমেই তার শিকার হল এসেক্সের আর্ল। প্রজাতন্ত্রীদের প্রধান সেনাপতি ছিল সে। একদিন জেনারেল ব্যাগশট শহরের এর রাস্তা দিয়ে জনা পাঁচ ছয় দেহরক্ষি নিয়ে গাড়ি করে চলেছেন, তখন হাওয়ার্ড জ্যাকারি সেখানে এসে উদয় হল। গাড়ির দরজা ধরে দাঁড়িয়ে সে বলে, “যা আছে দিয়ে যাও হে আর্ল। নইলে কেউ আর তোমাদের বাঁচাতে পারবে না। বেচারা আর্ল তখন ক্রমওয়েলের শাসনে নানা রাজতন্ত্রী জমিদারের সম্পত্তি লুটে দেদারটাকা কামাচ্ছে। সামান্য কারণে প্রাণ দেবার কোনো ইচ্ছে তার ছিল না। অতএব অভিযান থেকে হাওয়ার্ডের প্রাপ্তি হল প্রায় বারোশো পাউন্ড। যাবার আগে সে টিটকিরি দিয়ে বলে গেল, “ফের দেখা হবে আর্লসাহেব। জমিচষা সম্পত্তি থেকে সেবারেও এই বারোশো মত পাউন্ড সঙ্গে রাখবেন কিন্তু।”

এরপর আর এক আর্লের পালা। ইনি আবার সুরসিক বলে খ্যাত ছিলেন। পার্লামেন্টে বক্তৃতার সময় নানা রসিকতায় মাতিয়ে রাখতে পারতেন সকলকে। একদিন তিনি এক চাকরকে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ায় চেপে চলেছেন তখন হাওয়ার্ড সেখানে এসে উপস্থিত। তার হাতের পিস্তল দেখে আর্লসাহেব অবশ্য ভয়টয় পেলেন না। বলেন, “সাহস তো তোমার কম নয় হে। একলা মানুষ হয়ে আমাদের দুজনের মহড়া নিতে চলে এসেছ!”

জবাবে হাওয়ার্ড বলে, “আরে মশাই, তুমি তো কোন ছাড়, তোমাদের ওই বাক্যবাগীশ ক্রমওয়েল ব্যাটাও যদি তোমার সঙ্গে থাকত তাও আমি একহাত লড়ে যেতাম ঠিক। জিতেও যেতাম।”

শুনে আর্ল বলেন, “আরে রাখো। ক্রমওয়েল কতবড়ো যুদ্ধ জিতে এল ভাবো দেখি! স্বয়ং দেশের রাজাও তাকে এঁটে উঠতে পারেনি, আর তুমি তো কোন ছাড়।”

শুনে হাওয়ার্ড বলে, “আরে ছাড়ো দেখি তোমাদের কাপুরুষদের ক্তহা। এসব বলে বলে দেরি করাবার মতলব করেছ, তাই না! ভালো কথায় তাড়াতাড়ি যা আছে সব দাও। নইলে…”

আর্ল তবুও কথা ঘোরাবার চেষ্টায় ছিলেন। কিন্তু এইবার হাওয়ার্ড আর কথা বলে সময় নষ্ট করতে রাজি নয়। সে আর্লকে ঘোড়া থেকে জোর করে নামিয়ে, ঘোড়াটাকে গুলি করে মারল প্রথমে। তারপর তাঁড় সোনাদানা, হিরের আংটি সব কেড়েকুড়ে নিয়ে চাকরের ঘোড়ার পিঠে মালিক আর চাকর দুজনকে পিঠোপিঠি বসিয়ে বেঁধেছেঁদে রাস্তায় ছেড়ে রেখে পালিয়ে গেল।

তা, সে অবস্থায় আর্লকে নিয়ে যখন কাছাকাছি একটা শহরে গিয়ে পৌঁছোল তাঁদের ঘোড়া, তখন তাঁদের দশা দেখে শহরের লোক হেসেই অস্থির। শেষে নিজের পরিচয় দিতে, আর রাস্তায় কী ঘটেছে সেসব বলতে লোকজন তাঁদের বাঁধন খুলে দেয়।

এরপর আবার সরকারি সৈন্যদলের আর এক সেনাপতি ফেয়ারফ্যাক্স এসে বাসা নিলেন নিউক্যাসল এলাকায়। হবি তো হ, হাওয়ার্ডও তখন সে শহরে অধিষ্ঠান করছে।তা একদিন হাওয়ার্ডের কাছে খবর এল শহরের মেয়র সেনাপতি সাহেবকে বেশ ক’খানা দামি দামি প্লেট উপহার দিয়েছেন আর মেয়র সাহেব সেসব প্লেট, ফ্যারিংডন শহরে তাঁর স্ত্রীর কাছে পাঠাবার বন্দোবস্ত করছেন।

খবরটা পেয়েই দুষ্টুবুদ্ধি সওয়ার হল হাওয়ার্ডের মাথায়। সেনাপতির লোক যেই না প্রায় আড়াইশো পাউন্ড দামের সেই উপহারের বাক্স নিয়ে শহর ছেড়ে বড়ো রাস্তায় এসে ওঠা অমনি হাওয়ার্ড এসে তার নাগাল ধরেছে।তখন সে দিব্যি এক ভদ্রলোক সেজেছিল। পাশাপাশি চলতে চলতে সেনাপতির সেই লোকের সঙ্গে ভাব জমিয়ে নিতে দেরি হল না তার। সে লোকও ভাবল ভালই হল। একলা একলা ফাঁকা রাস্তা দিয়ে যাবার বদলে সঙ্গে আরেকটা ভদ্রলোক থাকলে মন্দ কী?

তা এইভাবে চলতে চলতে যখন ফ্যারিংডন পৌঁছুতে আর একদিনের রাস্তা বাকি আছে তখন হাওয়ার্ড অবশেষে স্বমূর্তি ধরল। বলে, “বাঁচতে চাইলে বাক্সটা আমায় দিয়ে দাও।”

কিন্তু সেনাপতির লোক তো নিজেও সেপাই। অত সহজে সে-ও ছাড়বে কেন? সে জবাবে পিস্তল বের করে সটান হাওয়ার্ডের ঘোড়াটাকে গুলি করে দিল। মাটিতে পড়ে গিয়েও ফের লাফ দিয়ে উঠল হাওয়ার্ড। তারপর ঘোড়সওয়ার আর মাটিতে দাঁড়ানো দুই পক্ষে গুলির লড়াই শুরু হল।

তবে হাওয়ার্ডের সেদিন কপাল ভালো ছিল। খানিক বাদে তার পিস্তলের একটা গুলি এসে লাগল ঘোড়সওয়ারের মাথায়। অতএব সেখানেই যুদ্ধ শেষ। হাওয়ার্ড এইবার লোকটার পকেট হাতড়ে সেখান থেকে সেনাপতির সেয়া চিঠিটা খুলে পড়ে দেখল। তারপর মহানন্দে উপহারের বাক্স নিয়ে খানিক দূর এগিয়ে একটা গাছের কোটরে সেটা লুকিয়ে রেখে শিস দিতে দিতে ফ্যারিংডন শহরে পৌঁছে একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে পেট পুরে খেল। বলা বাহুল্য সে খাবারের টাকা সে পেয়েছিল খানিক আগে যুদ্ধে মারা যাওয়া সেপাইয়ের পকেটে। সেখানে রাতটা কাটিয়ে পরদিন বিশ্রাম নিয়ে বিকেলবেলা চিঠি পকেটে করে সে হাঁটতে হাঁটতে জেনারেলের বাড়িতে গিয়ে হাজির।

জেনারেলের বউ বের হয়ে আসতে তাঁর হাতে সেই চিঠিটা তুলে দিয়ে ভালোমানুষের মত উখ করে দাঁড়িয়ে রইল হাওয়ার্ড। চিঠিটা ছিল এইরকম,

নিউক্যাসল, ১২ আগস্ট, ১৬৫০

প্রিয়তমাসু,

তুমি আর আমাদের মেয়ে এলিজাবেথ ভালো আছ নিশ্চয়। নিউক্যাসলের লোকজন আমাকে বেশ পছন্দ করে ফেলেছে। এখানকার মেয়র তাই আমায় কয়েকটা দামি প্লেট উপহার দিলেন সেদিন। সেগুলো আমি টমাস নামে এই মানুষটার হাতে তোমার কাছে পাঠাচ্ছি। টমাস ভারী ভালো ছেলে। খুব বিশ্বস্ত। ওকে যত্ন আত্তি কোরো। ছেলেটা আমার কাছে সবে কাজে জুটেছে,বুঝলে! আগে ও যাঁর কাছে কাজ করত তিনিও দরাজ সার্টিফিকেট দিয়ে ওকে পাঠিয়েছেন আমার কাছে। আমি ভালো আছি। এ-মাসের শেষের দিকেই বাড়ি আসব।

ইতি,
তোমার একান্ত
ফেয়ারফ্যাক্স।

ভদ্রমহিলা চিঠি পড়ে হাওয়ার্ডের দিকে ঘুরে মিষ্টি হেসে বললেন, “তা উপহারের বাক্সটা কোথায় গো?”

জবাবে হাওয়ার্ড বলে, “আর বলবেন না। বাক্স নিয়ে আসছি, রাস্তাটা খুব নির্জন ছিল, তখন কয়েকট সন্দেহজনক লোক আমার পিছু নিল। পাছে কেড়ে নেয় সেই ভয়ে আমি পথে একটা সরাইখানা পেয়ে তার মালিকের জিম্মায় বাক্স রেখে দিয়ে আপনার কাছে চিঠিটা আগে পৌঁছে দিতে এলাম। দিন দুয়েক বাদে আমি নিজে গিয়ে সেটা নিয়ে আসব আবার।”

শুনে ভদ্রমহিলা খুব খুশি হয়ে বললেন, “বাঃ। তোমার বুদ্ধি আছে। আচ্ছা বেশ। এখন ক্লান্ত হয়ে এলে, দুটি খাবার মুখে দিয়ে একটু বিশ্রাম নাও।”

এই বলে তাকে ভালো করে খাইয়ে দাইয়ে তিনি বাড়ির একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলেন।

হাওয়ার্ড সেখানে শোয়ামাত্র নাক ডেকে ঘুম দিল একটা। তারপর মাঝরাত্রে যখন বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছে তখন পিস্তলটা হাতে নিয়ে সে চাকরবাকরদের ঘরে গিয়ে প্রথমে তাদের বেঁধে ফেলল। তারপর ভদ্রমহিলার ঘরে গিয়ে তাঁকে আর তাঁর মেয়েকে বেঁধেছেঁদে রেখে তাঁর সর্বস্ব লুটপাট করে নিয়ে মনের আনন্দে শিস দিতে দিতে বেরিয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে। বেরিয়ে এসে গুনেগেঁথে সে দেখে প্রায় দু’হাজার মোহর আর কিছু রুপোর বাসনপত্র লাভ হয়েছে তার।  আর ওদিকে গাছের কোটরে লুকোনো সেই উপহারের বাক্সটা তো আছেই।

ঘটনাটা এরপর ফেয়ারফ্যাক্সের কানে যেতে তো তোলপাড় বেধে গেল চারদিকে। হাওয়ার্ডের মাথার ওপর পাঁচশো পাউণ্ড পুরস্কার ঘোষণা করে হুলিয়া বের হয়ে গেল। হাওয়ার্ডও বিপদ বুঝে সটান পালিয়ে গেল আয়ার্ল্যাণ্ডে।

আয়ার্ল্যাণ্ডে এসেও হাওয়ার্ড ফের ইংল্যাণ্ডের মতই তোলপাড় বাঁধিয়ে বসল কিছুদিনের মধ্যে। বেশ কিছুদিন সেখানে সন্ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে এইবার ফের সে ফিরে এল ইংল্যাণ্ডে। মাথায় তার অন্য এক মতলব এসেছে তখন তার। ইংল্যাণ্ডে এসে সে সটান হাজির হল চেস্টার শহরে। অলিভার ক্রমওয়েল তখন সেখানেই রয়েছেন।

হাওয়ার্ডের কাছে তখন অনেক টাকাপয়সা। অতএব ক্রময়েল যে দামি সরাইখানায় ঘাঁটি গেড়েছেন সেইখানেই ভদ্রলোক সেজে এসে ঘর ভাড়া নিল সে। তারপর মিষ্টি কথায় ক্রমওয়েলকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তাঁর বন্ধু হয়ে পড়তে তার মত ধড়িবাজের আর কত সময় লাগে! কথায় কথায় প্রথম চার্লসের কথা উঠতে সে দেখা গেল প্রবল উৎসাহে ক্রমওয়েলকে প্রশংসা করে চলেছে। বলে, সাক্ষাৎ শয়তানটাকে মেরে কী যে উপকার হয়েছে দেশের!

ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা গেল ক্রমওয়েলের ঘনিষ্ট বন্ধু হয়ে উঠেছে হাওয়ার্ড। গলায় গলায় ভাব দুজনে। সর্বক্ষণ তাদের একসঙ্গে দেখা যায় সব জায়গায়।

এরপর একদিন খুব ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে হাওয়ার্ড সটান ক্রমওয়েলের শোবার ঘরে গিয়ে হাজির। ঘনিষ্ট বন্ধু হিসেবে ঘরে ঢুকে পড়তে তাকে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি তা বলাইবাহুল্য।

ক্রমওয়েল তখন সবে ঘুম থেকে উঠেছেন। হাওয়ার্ডকে দেখে বলেন, “এস হে বন্ধু, একসঙ্গে সকালের প্রার্থনাটা সেরে নেয়া যাক।

এই বলে যেই না ক্রমওয়েল হাঁটু গেড়ে বসেছেন, হাওয়ার্ডও ঝাঁপ দিয়ে পড়ে তাঁর মাথায় পিস্তলের বাঁট দিয়ে সপাটে একটা ঘা মেরে তাঁকে কাত করে দিয়েছে। তারপর বন্দুকের নলটা ক্রমওয়েলের বুকে গুঁজে দিয়ে সে বলে, “এতটুকু আওয়াজ করলে গুলি চালিয়ে বুকটা ফুঁড়ে দেব তোর শয়তান রাজদ্রোহী।তাতে আমায় যদি এক্ষুণি ফাঁসি যেতে হয় সেও ভি আচ্ছা।”

ক্রমওয়েল দেখলেন লোকটা একেবারে বেপরোয়া। এর কাছে কোনো যুক্তিতর্ক চলবে না। কাজেই নিরুপায় হয়ে তিনি প্রাণটা বাঁচাবার জন্য একেবারে চুপচাপই রইলেন। হাওয়ার্ড এইবার তাঁর হাত-পা-মুখ বেঁধেছেদে বসিয়ে রেখে ঘরের জিনিসপত্র উলটে-পালটে দেখে এগারোশো মোহর পকেটস্থ করল।তারপর, ঘরের এক কোণে দাঁড় করানো প্রাতঃকৃত্যের ভর্তি গামলাটা বয়ে নিয়ে এসে (পুরোনো ইউরোপে এ-কাজের জন্যে আলাদা টয়লেট থাকত না। ঘরের এক কোণে একটা ঢাকা টুল থাকত। তার তলায় একটা গামলা বসানো থাকত। তাইতে মানুষ টয়লেটের কাজ সারত।) ক্রমওয়েলের মাথায় সেটা উলটে টুপির মত বসিয়ে দিল।

কাজ  সেরেসুরে নীচে নেমে এসে ভালোমানুষের মত নিজের ঘোড়াটায় চেপে হাওয়ার্ড এলাকা ছেড়ে চম্পট।

ওদিকে বেচারা ক্রমওয়েল বাঁধা অবস্থায় মাথায় হেলমেটের মত আটকানো ময়লার গামলা মেঝেতে ঠুকে ঠুকে অনেকক্ষণ শব্দ করবার পর কেউ সেটা শুনতে পেয়ে ঘরে ঢুলে এসে তাঁকে উদ্ধার করে।

হাওয়ার্ডকে অবশ্য এরপর খুঁজে পাওয়া গেল না। উলটে, সপ্তাহখানেক বাদে তার লেখা একখানা চিঠি এসে হাজির ক্রমওয়েলের কাছে। তাতে লেখা,

“বেজায় ভালো আছি হে বন্ধু। তোমার সঙ্গে যেটা করেছি সেটা তোমায় একটা কথা বুঝিয়ে দেবার জন্যে করা। যতই বড়ো যোদ্ধা হও না কেন তুমি, রাজাকে হত্যা করে যে পাপ তুমি করেছে সে পাপের সাজা তোমায় দেবার জন্য মাত্র একজন সাহসী আর বুদ্ধিমান মানুষই যথেষ্ট সেইটা শুধু প্রমাণ করে দিয়ে গেলাম। মাথায় নিজের প্রাতঃকৃত্যের গামলা চাপিয়ে তোমার মুখখানা ঠিক কেমন হয়েছিল, তাড়াহুড়োয় সেইটে ভালো করে দেখতে পেলাম না এই একটাই আফশোস রয়ে গেল। আর একটা কথা বলে রাখি, আমাকে বিশ্বাস করে তার ফল তো হাতেনাতেই পেলে। এখন থেকে এদেশের একজন মানুষকেও আর বিশ্বাস করবে না। সবসময় ভয়ে ভয়ে থেকো। সবাইকে সন্দেহ করবে দিনরাত। কারণ, তোমার দলবল যে নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে, তাদের অপকর্মের দরুণ আমার মত এত বেশি লোক সব খুইয়ে পথে বসেছে যে, আমরাও তোমারই মত ঠগ আর চতুর হয়ে উঠেছি। আমার মত আরো অনেক ঠকে যাওয় আমানুষ কিন্তু তোমার চারপাশে ছড়িয়ে আছে। সুযোগ পেলে তাদের যে কেউ যে কোনোদিন ফের আঘাত হানবে তোমার ওপর।”

তবে এর পর আর বেশিদিন স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেনি হাওয়ার্ড। ক্রমওয়েলের সেপাইরা নিজে থেকে তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি বলাই বাহুল্য। সে নিজেই একদিন ব্ল্যাকহিথ এলাকায় ক্রমওয়েলের দলের ছজন সৈন্যের একলা মহড়া নিতে এগিয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধে একজন সেপাই মারা যায়। দুজন গুরুতর আহত হয়। কিন্তু বাকি তিনজন তাকে ধরে ফেলেছিল।

এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মেইডস্টোন জেলখানায়। সেখানে ক্রমওয়েল এসেছিলেন তাকে দেখতে। দেখা হতে ক্রমওয়েল যত্তাকে গালাগাল দেন, ততই সে জবাবে তাঁকে টিটকিরি দেয় আর হা হা করে হাসে।

আদালতের কাঠগড়ায় যখন তাকে দাঁড় করানো হল তখন দেখা গেল তার অপরাধের সাক্ষি যত এসে জুটেছে তাতে সব মিলিয়ে কুড়িবার প্রাণদণ্ড দেয়া যায়।সব সাক্ষ্যপ্রমাণ দেখেশুনে বিচারক তার ফাঁসির হুকুম দিলেন।

ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাওয়ার্ড মুক্তকন্ঠে নিজের সব কৃতকর্মকে স্বীকার করে নিয়েছিল। আর তারপর বলেছিল, তার আক্রমণ সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নয়। রাজহন্তা ক্রমওয়েল, তার সৈন্যদলের অফিসার ফেয়ারফ্যাক্স এঁদের মত লোকজন আর তাঁদের পরিবারের বিরুদ্ধেই কেবল সে এই আক্রমণগুলো করেছে। কারণ তাঁদের অপরাধ তার চাইতে শতগুণ বেশি। এই ফাঁসির মঞ্চ থেকে যদি তাকে মুক্তিও দেয়া হয় তা হলেও সে ফের সেই একই কাজ করবে। যতদিন একজনও রাজদ্রোহী বেঁচে থাকবে ইংল্যাণ্ডের বুকে ততদিন সে তাদের আক্রমণ করে চলবে এইভাবে।

আর তারপর, তার ফাঁসির মঞ্চের সামনে এসে দাঁড়ানো ক্রমওয়েলের দিকে মুখ ফিরিয়ে বিদ্রূপের একটা হাসি হেসে বলেছিল, যদি আমি কোনো অন্যায় না করে থাকি, তাহলে বলে যাচ্ছি একদিন তোমাকেও এই মঞ্চে এসে দাঁড়াতে হবে। সেই হবে আমার একমাত্র পুরস্কার।

 ১৬৫২ সালে, বত্রিশ বছর বয়সে জ্যাকারি হাওয়ার্ড-এর ফাঁসি হয়ে যায়।

এর ঠিক দশ বছরের মাথায় তার ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়েছিল, তবে একটু অন্যভাবে। ১৬৫৮ সালে ক্রমওয়েলের মারা যাবার পরেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত বৃটিশ কমনওয়েলথ ভেঙে পড়ে। ১৬৬১ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লস তাঁর ফরাসি দেশের স্বেচ্ছা-নির্বাসন থেকে ফিরে এসে ইংল্যাণ্ডের সিংহাসনে বসেন ও সেখানে রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়। সিংহাসনে বসে তিনি রাজদ্রোহী ও রাজহন্তা ক্রমওয়েলকে মরণোত্তর মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবি থেকে কবর খুঁড়ে ক্রমওয়েলের দেহাবশেষ তুলে এনে লণ্ডনের টাইবার্নে তাকে শেকলে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়া হয়। তাঁর মুণ্ডুটা কেটে নিয়ে গিয়ে ওয়েস্টমিনস্টার হল-এ একটা লাঠির মাথায় গেঁথে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। ১৬৮৫ অবধি খুলিটা এইভাবেই ঝোলানো ছিল। এরপর কিউরিও সংগ্রাহকরা খুলিটা নিয়ে বেচাকেনা করে বেশ কয়েকবার সেটা হাতবদল করেন ও সেটাকে নিয়ে প্রদর্শনী করেন। অবশেষে ১৯৬০ সালে এসে বেচারা ক্রমওয়েলের খুলিকে কেমব্রিজের একটা চ্যাপেলে গোর দেয়া হয়। গোর দেবার সঠিক জায়গাটা অবশ্য কাউকে জানানো হয়নি। কিন্তু কেমব্রিজের সিডনি সাসেক্স কলেজের অ্যান্টিচ্যাপেলে গেলে সেখানে সেটার একটা আনুমানিক অবস্থান দেখিয়ে একটা বোর্ড দেয়া আছে দেখবে।

জয়ঢাকের টাইম মেশিন সব লেখা একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s