টাইম মেশিন সীমান্তের অন্তরালে সমরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী বর্ষা ২০১৭

আগের পর্বগুলো

মনে মনে এই রকম আকাশ পাতাল চিন্তা করছি, এমন সময় হঠাৎ কড়াক শব্দে একটা রাইফেলের ফায়ার হল কুরাম নদীর ওপারে থাল গ্রামের বিপরীত দিকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আর একটি ফায়ার। আরাম করে গা এলিয়ে দিয়ে চেয়ারে আর বসে থাকা চলল না। উঠে দাঁড়ালাম নদীর ওপারে কী হচ্ছে দেখবার জন্যে। অত দূর থেকে কী হচ্ছে কিছুই দেখা গেল না, কারণ আকাশ সেদিন ধূলায় ভরা, ওপারের পাহাড়গুলো পর্যন্ত ঝাপসা আর অস্পষ্ট। সেই মুহূর্তেই কড়কড় শব্দে অজস্র ফায়ার শুনতে পেলাম আর সেই সঙ্গে দ্রিম দ্রিম শব্দে দামামা বেজে উঠল থাল গ্রামের মালেকের (উপজাতীয় প্রধান ) বাড়ির ছাদে। হতভম্ব হয়ে গেলাম রাইফেল আর দামামার শব্দ শুনে। ব্যাপারখানা কী হচ্ছে তা বুঝতে পারলাম না। খাসাদার ( ইংরাজ সরকারের মাইনে করা উপজাতীয় রক্ষি ) ইব্রাহিম খাঁ কাছেই দাঁড়িয়েছিল, সে এই ধাঁধার সমাধান করে দিল যে, “কাবুলখেল ওয়াজিরি উপজাতির লস্কর থাল গ্রামের কুরম উপজাতীয়দের আক্রমণ করেছে। মালেকের দামামা বাজিয়ে গ্রামবাসিদের সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে আর তাদের আহ্বান করা হচ্ছে হাতিয়ার নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার জন্যে। আমাকেও যেতে হবে।” প্রশ্ন করার আগেই ইব্রাহিম খাঁ ক্ষিপ্রগতিতে চলে গেল। সে কুরম উপজাতীয় ও থাল গ্রামের বাসিন্দা।

অনুসন্ধানকারী সশস্ত্র কন্সটাবিউলারি ও মিলিশিয়া বাহিনির চোখে ধূলা দিয়ে  কাবুলখেল ওয়াজিরি দল যে কোথাও লুকিয়ে ছিল সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ ছিল না। কাবুলখেল উপজাতীয় লস্কর ইংরাজ সরকারের মিলিশিয়া ও কন্সটিবিউলারির সঙ্গে মহড়া নিয়ে সে সময় নিজেদের শক্তি অপচয় করতে চায়নি কারণ তাদের লক্ষ ছিল থাল গ্রামের কুরম উপজাতি। 

দ্রিম দ্রিম দ্রিম – মালেকের বাড়ির মিনার থেকে দামামা বেজে চলেছে। গ্রামের পুরুষ বাসিন্দারা, যুবক এবং বৃদ্ধ সকলেই ছুটে চলেছে কুরাম নদীর তীরে। সহস্র রাইফেল গর্জে উঠল কুরাম নদীর এপার থেকে কাবুলখেল উপজাতীর ক্ষণপূর্বের গুলিবর্ষণের উত্তরে। কাবুলখেল ও কুরাম উভয় উপজাতিই আজ রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে এক ঘাসে ভরা জমিটার অধিকার কায়েম করতে বদ্ধপরিকর।

দামামার দ্রিম দ্রিম শব্দ থেমে গেছে কিন্তু রাইফেলের গর্জন অব্যাহত। রাতের অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে রাইফেলের নির্ঘোষ কিছুটা শ্লথ হয়ে এলো। তারপর সব চুপচাপ। অন্ধকারের জন্য নদীর এপার থেকে অন্য পারে তখন আর কিছুই দেখা যায় না। মনে হল যেন সে রাতটার জন্য যুদ্ধ স্থগিত রাখল দু’পক্ষই।

কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। সেই মুহূর্তেই অজস্র হাউই বাজি দু’দিক থেকে উঠে স্বল্প পরিসর নদীর তীর আলোয় ঝলমল করে তুলল, আর সেই ক্ষণিক আলোর সুবিধা নিয়ে আবার দু’দিকের রাইফেল কড় কড় শব্দে ডেকে উঠল। পরদিন ভোরবেলা পর্যন্ত এই ভাবেই অবিরাম যুদ্ধ চলতে থাকল।

থাল দুর্গ

পরদিন একটা সরকারি কাজে আমাকে থাল গ্রামে যেতে হয়েছিল। গত রাতের যুদ্ধের কোনোরকম উত্তেজনা বা আতঙ্ক গ্রামে দেখা গেল না। গ্রামবাসীদের সাধারণ জীবনযাত্রার কোনোরকম ফের বদল দেখতে পেলাম না। গ্রামের ব্যবসায়ীরা, যারা বেশির ভাগই হিন্দু, প্রতিদিনের মতোই আফগান ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কেনাবেচা করছে আফগানী পণ্য, যেমন পার্সিয়ান ও বোখারা কার্পেট, ভেড়ার ছালের কোট বা পোস্তিন এবং হিং প্রভৃতি। মুদ্রা বিনিময়ের প্রভূত লাভজনক ব্যবসায়ও প্রতি দিনের মতোই থালের হিন্দুরা চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের মেয়েরা কুরাম নদী থেকে জল আনছে কলসি ভর্তি করে। গ্রামের রেস্তোরাঁগুলিতে তীব্র স্বরে গ্রামাফোন বেজে চলেছে আর আফগান খদ্দেররা মাথা নেড়ে নেড়ে সেই গান উপভোগ করছে, সবুজ চা আর মাংসের রোস্ট খেয়ে রেস্তোরাঁর পৃষ্ঠপোষকতা করছে। রাখাল বালকেরা কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে অথবা কোমরে রিভলবার বেঁধে ভেড়ার পাল নিয়ে যাচ্ছে গ্রামের বাইরে মাঠের দিকে। দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এমন স্বাভাবিকভাবে চলছে, যেন যুদ্ধটা একটা অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। একটি ছোট্ট কাপড়ের দোকানের সামনে জনাপাঁচেক লোক ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তাদের দেখে থাল গ্রামের লোক বলে মনে হল না । তাদের পায়ে ঘাসের তৈরি চপ্পল। থাল গ্রামের বাসিন্দাদের গায়ে খানিকটা আধুনিক সভ্যতার হাওয়া কিছুটা লেগেছে বলে তারা চামড়ার চপ্পল পরে। এই নবাগতদের দিকে একটু অবাক হয়ে আমাকে তাকাতে দেখে আমার পাখতুন দেহরক্ষী নজীব গুল বলল, “আপনি ঠিকই ধরেছেন, এই লোকগুলি থাল গ্রামের বাসিন্দা নয় , এরা কাবুলখেল উপজাতি। গত রাতের যুদ্ধে এদের দলের যারা মারা গেছে, তাদের জন্য কফিনের কাপড় কিনতে এখানে এসেছে। কাবুলখেলদের গ্রামে কোনও কাপড়ের দোকান নেই। সেই সঙ্গে নজীব গুলও এ কথাও  বুঝিয়ে দিল যে , যদিও ওরা শত্রুপক্ষের লোক কিন্তু ওরা এ’সময় নিরস্ত্র, ওদের মাথার চুলটিও কেঊ স্পর্শ করবে না থাল গ্রামে। নিরস্ত্র পাখতুন শত্রুকে পাখতুনরা আঘাত করে না, এটা হল পাখতুনদের অলিখিত আইন।

দিনটা কেটে গেলো শান্তিতে। ভাবলাম ঝড়ের অবসান ঘটেছে, রাতে নির্বিঘ্নে ঘুমোতে পারব। কিন্তু অদৃষ্টে তা আর হল না, সূর্য অস্ত যাবার সঙ্গে সঙ্গেই কুরাম নদীর দু’পার থেকেই রাইফেল গর্জে উঠল। গোটা রাত রাইফেলের গর্জন চলল অবিরাম এবং পর পর তিন রাত ধরে অবস্থার কোনও পরিবর্তন ঘটল না। ইতিমধ্যে থালের কুরাম উপজাতীয় পাখতুনরা বোধহয় বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। চতুর্থ দিন সকালবেলা তারা রীতি অনুযায়ী যুদ্ধ বন্ধ করল না। মরিয়া হয়ে দিনের আলোতেই কুরাম নদী পার করে ছোট পাহাড়টির চূড়া দখল করে নিল আর পিছন থেকে নিজেদের দলের কভারিং ফায়ারের আওতায় চূড়ার ওপর একটি সাঙ্গড় (পাথরের দেয়াল )গড়ে তুলল ঘণ্টাদুয়েক এর মধ্যে। তারপর সাঙ্গড় থেকে গুলিবর্ষণ করে সেই জমিটির দখল নেওয়া থাল গ্রামবাসীদের পক্ষে মোটেই কঠিন হল না।

থালবাসিরা যুদ্ধে জয়ী হল কিছুকালের জন্য মাত্র, কারণ পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া পাখতুনদের স্বভাববিরুদ্ধ। এই অপঘাতী অন্তর্দ্বন্দ্ব কতদিন ধরে চলবে কে জানে, সেই সবুজ ঘাসে ভরা জমিটার রক্ত তৃষ্ণা কখনো মিটবে কি না তাও কে জানে।

পাখতুনরা ইংরাজের সঙ্গে দীর্ঘকালিন যুদ্ধে যদিও কখনও জয়লাভ করতে পারেনি, কিন্তু পরাজয়ও স্বীকার করেনি। ইংরাজদের পাখতুনিস্থান থেকে বিতাড়িত করতে না পারলেও তাদের নিরুদ্বেগে রাজত্বও করতে দেয়নি তারা। প্রথম অ্যাংলো আফগান যুদ্ধের সময় থেকে আরম্ভ করে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রায় শেষদিন পর্যন্ত ইংরাজকে তারা ঘাত প্রতিঘাতে সর্বক্ষণ অস্থির ও সংকটময় অবস্থার মধ্যে রেখেছিল।

১০

১৮৫১ সালের থাল অঞ্চলে যুদ্ধ শেষ হবার কিছু পরেই উত্তর সোয়াট উপত্যকার রানিজাই উপজাতির একটি দল লস্কর একদিন মালকান্দের কাছে একটি ব্রিটিশ রক্ষিদলকে আক্রমণ করে পরাস্ত করল। তাদের এলাকায় ব্রিটিশদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করাতে এই উপজাতির আক্রোশ দিন দিন পুঞ্জীভূত হয়ে ফেটে পড়েছিল সেদিন। দুর্ঘটনার খবর পেশাওয়ারে পৌঁছন মাত্রই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্যার ক্যাম্বেলের অধীনে দু’হাজার সোলজার ও অফিসারের এক বাহিনী গঠন করে পাঠানো হল সোয়াট উপত্যকায়। ব্রিটিশ বাহিনী যে অত তাড়াতাড়ি গিয়ে হাজির হবে, রানিজাই উপজাতীয় পাখতূনরা সেটা ধারণা করতে পারেনি। কাজেই তারা তখনই স্যার ক্যম্বেলের গোলন্দাজ, অশ্বারোহী এবং পদাতিক বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। রানিজাই উপজাতির নায়করা দেখলেন যে সে অবস্থায় স্যার ক্যাম্বেলের ফৌজের মোকাবেলা করার চেষ্টা করলে তাঁরা ইংরাজ সৈন্যবাহিনীর কোনও রকম ক্ষতিসাধন তো করতে পারবেনই না , উপরন্তু ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর হাতে তাঁরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন। নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে তাঁরা স্যার ক্যাম্বেলের কাছে দূত পাঠালেন। প্রস্তাব করলেন যে স্যার ক্যাম্বেল যদি সোয়াট উপত্যকা থেকে নিজের সৈন্যসামন্ত অপসারণ করেন , তাহলে তাঁরা ইংরাজ সরকারের বশ্যতা স্বীকৃতির নিদর্শন স্বরূপ অর্থদণ্ড দেবেন। এতে, বিনাযুদ্ধে রানিজাই উপত্যকাকে পদানত করতে পারলেন মনে করে স্যার ক্যাম্বেল খুশি হলেন। তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনীকে ফেরত নিয়ে গেলেন পেশাওয়ারে।

এই ঘটনার মাস দুই পরেই পেশাওয়ারে সংবাদ এল যে চারসাদ্দার উপকণ্ঠে কয়েকটি ব্রিটিশ ঘাঁটি আক্রমণ করে দখল করেছে উৎমনখেল উপজাতি। স্যার ক্যম্বেলের সৈন্যবাহিনী সোয়াট উপত্যকা থেকে ফেরার পর তখনও অটুট অবস্থাতেই ছিল। তিনি সেই বাহিনী নিয়ে আবার পাড়ি দিলেন চারসাদ্দার দিকে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত ব্রিটিশ বাহিনী প্রচণ্ড প্রতি-আক্রমণ করে ঘাটিগুলি পুণরুদ্ধার করল আর ব্রিটিশ শক্তিকে উপেক্ষা করার ধৃষ্টতার জন্য উৎমন খেল উপজাতি পাখতুনদের গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করে দিলেন স্যার ক্যাম্বেল, তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেবার উদ্দেশে।

উৎমনখেলদের সাময়িক ভাবে দমন করে স্যার ক্যাম্বেল তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে ফিরে গেলেন পেশাওয়ারে। সেখানে পৌঁছেই তিনি খবর পেলেন যে সোয়াটের রানিজাই উপজাতীয় নেতারা তাঁদের প্রতিশ্রুত অর্থদণ্ড দিতে অস্বীকার করেছেন। তাঁরা ইতিমধ্যে সাড়ে চার হাজার লোক নিয়ে একটি লস্করও গঠন করেছেন, যদিও সেই লস্করের কাছে কোনও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। শুধুমাত্র তরওয়াল আর কিছু গাদা বন্দুক নিয়েই রানিজাই পাখতুনরা দেশের ওপর নিজেদের অধিকার সাব্যস্ত করার জন্য রুখে দাঁড়িয়েছে।

রানিজাইদের দুটি মজবুত ঘাঁটি সাখাকোট ও দরগাই গ্রাম অবরোধ করলেন স্যার ক্যাম্বেল। রানিজাইরা এ দুটি গ্রামের দক্ষিণে পাথর দিয়ে সাঙ্গড়ের সারি গড়ে তুলেছিল ইংরাজি ফৌজের আক্রমণ রোধ করার জন্য। উপজাতীয় যোদ্ধারা এই সব সাঙ্গড়ের আড়ালে আক্রমণকারী ব্রিটিশ সৈন্যের মোকাবেলা করার জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু ব্রিটিশ গোলন্দাজ সৈন্যের কামানের গোলায় সাঙ্গড়গুলি তাসের ঘরের মতই লুটিয়ে পড়ল। একের পর এক পাখতুন যোদ্ধাদের মধ্যে অনেকে পিষে গেল কামানের গোলায়। তারপর আরম্ভ হল সাখাকোট ও দরগাই গ্রামের ওপর ব্রিটিশ পদাতিক সৈন্যের আক্রমণ। গ্রামদুটি রক্ষার জন্য রানিজাইরা প্রভূত সাহস আর বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করল। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি আর অলিগলিতে তারা ব্রিটিশ সৈন্যকে বাধা দান করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করল , কিন্তু শেষ পর্য্যন্ত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ইংরাজ বাহিনীরই জয় হল। এই যুদ্ধের প্রামাণিক বিবরণ থেকে জানতে পারা যায় যে ব্রিটিশ সৈন্যের হতাহতর সংখ্যাও প্রচুর ছিল এই যুদ্ধে।

এরপর আরও কয়েকটি পাখতুন উপজাতির সঙ্গে ইংরাজের যুদ্ধ হয়ে গেল ১৮৫২ সালে। উত্তরে ইউসুফজাই এবং সোমান্দ, মধ্য পাখতুনিস্থানে আদমখেল এবং দক্ষিনে শিরানি উপজাতি প্রায় একই সময় তাদের এলাকার মধ্যে ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলি আক্রমণ করে ঘাঁটির রক্ষিদলসমূহকে পর্যুদস্ত করল। ফলে অতিরিক্ত কয়েকটি বিশেষ বাহিনী গঠন করে পাঠালেন ইংরাজ সরকার আক্রমণকারী  উপজাতিগুলিকে দমন করার জন্য। এগুলির মধ্যে ইউসুফজাইদের উত্থানটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। কর্নেল ম্যাকসন পাঁচ হাজার সৈন্যের এক ব্রিটিশ ফৌজ কয়েকমাস ধরে যুদ্ধ করে ইউসুফজাইদের পরাস্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে কর্নেল ম্যাকসন  ইউসুফজাইদের গ্রামগুলি ধূলিসাৎ করে দিয়েছিলেন।

১৮৫১ সালে থাল এর দক্ষিণে যে’সব ওয়াজিরি উপজাতি ব্রিটিশের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল তারা ১৮৫৪ সালে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। মাঝে দীর্ঘ চার বছর সময় তাদের কতকটা চুপচাপ থাকতে হয়েছিল কারণ ইংরাজ ফৌজ তাদের গ্রামগুলি সমস্ত  ধ্বংস করে দেওয়ায় তারা স্ত্রীলোক শিশুদের নিয়ে বনে, জঙ্গলে , গুহায় বাস করতে বাধ্য হয়েছিল। অনাহারে, অর্ধাহারে, নিষ্ঠুর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে তাদের দিন কাটাতে হয়েছিল। এই অসহনীয় অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি তারা সহজেই পেতে পারত বহিরাগত দখলকারি ইংরাজের কাছে নতি স্বীকার করে, কিন্তু তা তারা করেনি।

রশীদ খান তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু কুদরৎ খানের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন একদিন। কুদরৎ খান রশীদের মতই লম্বা চওড়া জোয়ান মানুষ, পেশীবহুল শরীর, মাথায় বাবরি কাটা চুল, গায়ের রং ফিকে গোলাপি, সুন্দর চেহারা। রশীদের এর সঙ্গে কুদরৎ খানের কয়েকটা বিষয়ে খুবই অমিল। রশীদ খানের চোখের দৃষ্টি স্থির, কুদরৎ খানের চঞ্চল। রশীদ অত্যন্ত ধীর ও স্থীর প্রকৃতির লোক, কুদরৎএর প্রকৃতি অস্থির। রশীদ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, কুদরৎ এর দৌড় মোল্লাদের মাদ্রাসা পর্‍্যন্ত। রশীদ হুইস্কির বোতল সঙ্গে না নিয়ে কোথাও রাত কাটান না, কুদরৎ মাদক দ্রব্য স্পর্শ পর্য্যন্ত করেন না। রাইফেল, রিভলবার তৈরি করতে ঐ অঞ্চলে তাঁর জুড়ি ছিল না। কুদরৎ খানের হাতের তৈরি লি এনফিল্ড ও বি,এস,এ রাইফেলের এবং ওয়েব্লি স্কট রিভলবারের হুবহু কপি দেখে আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি যে সেগুলি বিলাতের আধুনিক কারখানায় তৈরি নয়। আগেই বলেছি কুদরৎ খান ও তাঁর স্ত্রী সলমা থাকেন মান্দুরির কাছে আমাদিশামা গ্রামে। তিনি পেওয়াড় গিরিসঙ্কটের মুখে শালোজান গ্রামের মেয়ে।

পারাচিনার থেকে একটা কাঁচা রাস্তা চলে গেছে শালোজান গ্রামের মাঝখান দিয়ে পেওয়াড় গিরিসংকট পর্যন্ত।তারপর সেটা পশ্চিম দিকে মোড় ঘুরে কাছেই ডুরান্ড লাইনের ওপর ইংরাজ সরকারের সামরিক পোস্ট খারলাচিতে শেষ হয়েছে। পেওয়াড় দিয়ে আফগানিস্তানে যাতায়াত করতে গেলে শালোজান গ্রামের সঙ্গে পরিচয় না হয়ে উপায় নেই। শালোজানের আখরোট ,আপেল, আঙ্গুর যেমন প্রসিদ্ধ , তেমনই ঐ গ্রামের রমণীদের সৌন্দর্যও গোটা পাখতুনিস্থানে বিখ্যাত। তবে কবির নারী সৌন্দর্যের উপমা ‘ দ্বিজরাজ মুখি, মৃগরাজ কটি, গজরাজ বিনিন্দিত মন্দ গতি’র সঙ্গে ঠিক মেলে না। এদের গতিটা গজরাজের মন্দগতির মত মোটেই না ,বরং হরিণের সঙ্গে মিল আছে। শোনা যায় যে আফগান নৃপতি ও সভাসদদের পক্ষে অন্তত একটি করে শালোজান  কন্যা বিবাহ করা অনিবার্য প্রথা। তবে এ গ্রামের মেয়ে বিয়ে করা অত্যন্ত ব্যায়সাপেক্ষ। মেয়ের সমান ওজন খাঁটি রুপোর আফগানি টাকা কন্যাপণ হিসেবে দিতে হয়, কাজেই আমির ওমরাহ ধরনের লোক ছাড়া সাধারনের নাগালের বাইরে। এহেন গ্রামের মেয়েকে অতি সাধারণ আর্থিক অবস্থার লোক কুদরৎ খান কী করে বিয়ে করে আনল তার ইতিহাস আছে আমি আগেই বলেছি।

থাল এর উত্তর পশ্চিমে প্রায় ষাঠ মাইল রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছতে হয় পারাচিনারের(আদি নাম তূতকাই) মালভূমিতে। ছয় হাজার ফুট পাহাড়ের মাথায় ষোল মাইল লম্বা ও বারো মাইল চওড়া সমতলভূমির মাঝখানে ছোট্ট উপজাতীয় গ্রাম। গ্রামটির পশ্চিমে প্রায় আধ মাইল দূরে পারাচিনারের ব্রিটিশ দুর্গ। দুর্গরক্ষি সৈন্য এক ব্যাটলিয়ান কুরাম মিলিশিয়ার সিপাই। দুর্গের পূর্ব দিকে কিছু দূরে বড় বড় বাংলোয় থাকেন কুরামের পলিটিকাল এজেন্ট, কুরাম মিলিশিয়ার ব্রিটিশ অফিসাররা ও অ্যাসিস্ট্যান্ট পলিটিকাল অফিসার। পারাচিনারকে ঘিরে রেখেছে উত্তর আর উত্তর পশ্চিম দিকে সুউচ্চ পর্বত শ্রেণি। পারাচিনার মালভূমিতে প্রচুর সবুজ গাছপালা, কিন্তু উত্তর ও উত্তর পশ্চিমের পাহাড়গুলি রুক্ষ ও কর্কশ।

থাল পারাচিনার সড়কটি সাধারণত দিনের বেলায় যাতায়াতের পক্ষে নিরাপদ বলেই জানা ছিল, অবশ্য মাঝে মাঝে উপজাতীয় স্নাইপিং বা ছোটখাটো হামলা যে না হত তা নয়, তবে তেমন ঘটনাকে সে দেশে স্বাভাবিক বলেই সকলে মনে করে। কিন্তু দুদিন পূর্বে মান্দুরি থেকে থালে ফেরার পথে যে ঘটনাটি হয়েছিল তার জন্য আমি একটু সন্ত্রস্ত বোধ করছিলাম। বন্ধু রশীদ খান তখনও পেশাওয়ার থেকে ফিরে আসেননি যে তাঁকে অনুরোধ  করব আমার সঙ্গে যেতে, অথচ পারাচিনার যাওয়া আমার একান্তই প্রয়োজন চাকরির খাতিরে। ভেবেচিন্তে কুদরৎ খাঁ এর কাছে বার্তা পাঠালাম আমার সঙ্গে পারাচিনার যাবার অনুরোধ জানিয়ে।

কুদরৎ খাঁ ও আমার দেহরক্ষী নাজিব গুলকে সঙ্গে নিয়ে পারাচিনার যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি, এমন সময় কুরামের পলিটিকাল এজেন্টের কাছে থাল ব্রিগেড হেডকোয়াটর্সে খবর এল যে বহু সংখ্যক সশস্ত্র ওয়াজিরি উপজাতিদের কুরাম উপত্যকার মধ্যে চলাচল করতে দেখা গিয়েছে। সেই জন্য থাল পারাচিনার সড়ক ছাপরিতে বন্ধ করে দেওয়া হবে বেলা একটার সময়। ওই সময়ের পর সেদিন কোনও যানবাহন কে ছাপরি গেট অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না, কারণ তাতে বিপদের সম্ভাবনা প্রচুর।

কুদরৎ খাঁ ও নাজিব গুলকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম বেলা বারটা নাগাদ। ছাপরি থাল থেকে মাত্র ছয় সাত মাইল দূর, পাহাড়ি রাস্তা হলেও মিনিট পনেরো কুড়ির মধ্যে ছাপরি পৌঁছে যাবার কথা। কাজেই নিশ্চিন্ত ছিলাম যে রাস্তা বন্ধ হবার আগেই আমরা ছাপরি পেরিয়ে যাব।  ছাপরি গেটে পৌঁছতে আর মাইল দেড় রাস্তা বাকি, পাহাড়ের গায়ে ছাপরির মিলিশিয়া পোষ্ট স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, এমন সময় কড়াং শব্দ করে আমার গাড়ির টাইরডটা খুলে গেল। গাড়ি থামিয়ে গাড়ির তলায় ঢুকলাম মেরামত করার প্রয়াশে। কুদরৎ খাঁ ও নাজিব গুল নিজেদের রাইফেল নিয়ে গাড়ির দু’পাশে দাঁড়িয়ে পাহারায় রত হল। কয়েকবার টানাটানি করে টাই রডটাকে তার সকেটের ভিতর ফিট করলাম কিন্তু প্রত্যেকবারই গাড়ি চালাবার সঙ্গে সঙ্গেই খুলে বেরিয়ে যায়! এমনি করে প্রায় দু’ঘণ্টা সময়  নষ্ট করলাম ,শেষে কুদরৎ খাঁ নিজের রাইফেলটি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এবার আপনি পাহারাদারের ভূমিকা নিন,আমি একবার দেখি গাড়িটাকে চালু করতে পারি কি না। এসব কাজ এঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা হয় না। মিস্ত্রিরাই পারে।”

কুদরৎ খাঁ সুদক্ষ কারিগর , আধঘণ্টার মধ্যেই ঠুকে পিটে টাই রডটা লাগিয়ে গাড়িটা চালু করে দিল। ছাপরিতে গিয়ে পৌঁছলাম বেলা চারটের পর। রাস্তা তখন বন্ধ, আর গেটের ওপর কড়া পাহারা। মিলিশিয়ার সিপাইরা কিছুতেই গেট খুলতে রাজি হল না। মিলিশিয়া পোস্ট থেকে পারাচিনারে অ্যাসিস্ট্যান্ট পলিটিকাল অফিসার খাঁ বাহাদুর নক্সবন্দ খাঁকে টেলিফোনে অনুরোধ করলাম আমাকে ছাপরি পার হবার অনুমতি দিতে। খাঁ বাহাদুর  সাহেব রাজি হলেন না। জানালেন, যেহেতু সে দিনকার পরিস্থিতিতে তিনি আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে পারবেন না, কাজেই ছাপরি গেট পার হবার অনুমতি দিতে তিনি অক্ষম।

কী করা যায় ভেবে কোনও কুলকিনারা পাচ্ছিলাম না। তখন থালে ফিরবার পথও কম বিপদজনক নয়। সন্ধ্যার পর থেকে স্বাভাবিক অবস্থাতেও ব্রিটিশ কেল্লার দেয়ালের বাইরে উপজাতীয়দের রাজত্ব চলে। কুদরৎ খাঁর পরামর্শ চাইলাম। কুদরৎ খাঁ বলল, “শোন সাহেব, ছাপরির বন্ধ গেটকে ফাঁকি দিয়ে পারাচিনার যাওয়া খুবই সহজ। গাড়িটাকে মাইল আড়াই পিছিয়ে নিয়ে গেলে একটা অস্থায়ী সেতুর কাছাকাছি পৌঁছোন যাবে। সেই সেতু দিয়ে কুরাম নদী পার হয়ে ‘নো ম্যানস ল্যান্ডের’ ভিতর দিয়ে একটি কাঁচা রাস্তা চলে গেছে মান্দুরির ওপারে। মান্দুরিতে আর একটি অস্থায়ী সেতু আছে, সেই সেতু পেরিয়ে এপারে এসে এই রাস্তায় উঠতে পারা যাবে। তারপর ছাপরির বন্ধ গেটের তোয়াক্কা রাখতে হবে না।”

‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ এর ভিতর দিয়ে চোদ্দ মাইল কাঁচা রাস্তা পার করার প্রস্তাবে মনটা ভীষণ দমে গেল। জিজ্ঞাসা করলাম ওই রাস্তায় কোনও বিপদ আছে কি না। আমার প্রশ্ন শুনে কুদরৎ খাঁ ও নাজিব গুল দু’জনেই হেসে উঠল। কুদরৎ খাঁ বলল, “বিপদ কোথায় নেই? মানুষের ছায়ার মতই বিপদ তার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় সর্বদা, বিপদের মুখোমুখি হয়ে তার সঙ্গে পাঞ্জা লড়েই তাকে পরাস্ত  করা যায়।”

উপায়ান্তর না দেখে কুদরৎ খাঁর পরামর্শ অনুযায়ী গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে গিয়ে অস্থায়ী সেতুটি পার করে নো ম্যানস ল্যান্ডের ভিতর দিয়ে ছোট ছোট পাহাড়ের মাঝে কাঁচা সড়কটি দিয়ে এগোতে লাগলাম। রাস্তাটি খুবই খারাপ ও মোটরকার চলার পক্ষে অনুপযোগী। গাড়িটা হোঁচট খেতে খেতে ঘণ্টায় মাত্র দশ মাইল গতিতে চলছিল। সূর্য তখন ডুবু ডুবু করছে, সেই সময় একটা মোড় ঘুরতেই দেখি সামনে প্রায় একশ গজ দূরে একটি টিলার ওপর জনা ত্রিশ উপজাতীয় লোক তাদের রাইফেল বাগিয়ে বসে আছে, লক্ষ আমাদের গাড়ি। সেই দলের দলপতি তাঁর টাট্টু ঘোড়াটি ছুটিয়ে রাস্তার ওপর গাড়ির সামনে থামলেন, আর রিভলভার তাগ করে হুঙ্কার ছাড়লেন ‘ওয়াদারেগা’ অর্থাৎ থামো।

আমার তো হার্ট ফেল হবার যোগাড়। মনে হল সাক্ষাৎ যমরাজের অনুচর আমার সামনে দাঁড়িয়ে। আমার জীবনের শেষ মুহূর্ত এসে গেছে। আমি গাড়ি থামিয়ে দিলাম। দলপতি প্রশ্ন করলেন “তা চোকে”(তুমি ক)? উত্তর দেবার চেষ্টা করলাম,কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। সেই সময় কুদরৎ খাঁ গাড়ির ভিতর থেকে চিৎকার  করে দলপতিকে লক্ষ করে বলল “তা মালিক সাব দে” (তুমি কী মালিক সাহেব)?

কুদরৎ খাঁর গলার স্বর চিনতে পেরে মালিক সাহেব রিভলবার খাপে পুরে টাট্টু ঘোড়া থেকে নামলেন। ইতিমধ্যে কুদরৎ খাঁ গাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে এল ও দলপতির করমর্দন করে তাঁর সঙ্গে বাক্যালাপ আরম্ভ করে দিল। কয়েক মিনিট পরে দলপতি আমার দিকে এগিয়ে এসে ‘স্তু্ড়িমাসে’ বলে সাদর সম্ভাষণ করে হাত বাড়িয়ে দিলেন, আমিও তাঁর করমর্দন করে প্রত্যাভিবাদন করলাম ‘খোয়ারমাসে’ বলে। দলপতি বললেন যে, কুদরৎ খাঁ সঙ্গে থাকার জন্য আমার প্রাণটা সে যাত্রা বেঁচে গেল। সাবধান করে দিলেন সাদ্দা ফোর্টের পাশ দিয়ে যাবার সময় যেন খুব সতর্ক থাকি, কেননা ফোর্টের কাছে বঙ্গশ, বিলন্দখেল ও পাড়া উপজাতীয়দের খুব বড় একটা দল জমায়েত হয়ে আছে। দলপতির সঙ্গে আমরা সকলে করমর্দন করে পুণরায় যাত্রা আরম্ভ করলাম।

সাদ্দা ফোর্টে পৌঁছবার আগেই হাল্কা হাল্কা তুষারপাত আরম্ভ হয়েছিল এবং সম্ভবত সেই জন্যই সাদ্দায় জমায়েত উপজাতীয় দল সড়কের ওপর বিশেষ নজর রাখেনি। কাজেই আমরা নির্বিঘ্নে ওই বিপদজনক স্থান পার হয়ে গেলাম। কিন্তু আরও একটা ক্ষুদ্রতর বিপদ অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য পথে। পারাচিনার পৌঁছতে তখনও মাইল তিনেক রাস্তা বাকি, তুষারপাত প্রচণ্ড হয়ে উঠেছে আর রাস্তার ওপর এত বরফ জমে গেছে যে গাড়ি আর স্টিয়ারিং এর বশে চলতে চাইছে না, বরফের ওপর স্কিড করে যত্র তত্র চলে বেড়াচ্ছে। কয়েকশ গজ পথ এমনিভাবে রাস্তার এপাশে ওপাশে চলে গাড়ির চাকা বরফের ভিতর একেবারে বসে গেল। আ্যক্সিলারেটারে চাপ দিয়ে যতই গাড়িটাকে আগে বাড়াবার চেষ্টা করি ততই গাড়ি বরফের মধ্যে ডুবে যায়। শেষ পর্যন্ত গাড়িটাকে সেইখানেই ফেলে রেখে আমরা হাঁটতে আরম্ভ করলাম। ঝরতে থাকা বরফের ওপর দিয়ে হাঁটাও এক দুরূহ কাজ। একে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় তখন হাত পা প্রায় অসাড়, তার ওপর বরফের ভিতর পা ডুবে যাচ্ছে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত। কোনও রকমে যখন পারাচিনার পৌঁছলাম তখন রাত একটা একটা বেজে গেছে। সে সময়ে আমার স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের নিয়ে থাকতেন পারাচিনারে। তিনি খবর পেয়েছিলেন যে আমি সন্ধ্যা নাগাত সেখানে পৌঁছব। কিন্তু রাত দশটা পর্যন্ত আমি না পৌঁছনোয় তিনি খাঁ বাহাদুর নক্সবন্দ খাঁ সাহেবের কাছে লোক পাঠালেন, তিনি কোনও খবর দিতে পারেন কিনা জানবার জন্য। খাঁ বাহাদুর সাহেব বলে পাঠালেন যে যেহেতু তিনি আমাকে ছাপরি গেট অতিক্রম করার অনুমতি দেননি, আর তিনি খবর নিয়ে জেনেছেন যে আমি থালেও ফেরত যাইনি , তখন ধরে নিতে হবে যে আমি উপজাতীয় লস্করের হাতে নিহত হয়েছি। তিনি আশ্বাস দিলেন যে পরের দিন তিনি সার্চ পার্টি পাঠাবেন আমার মৃতদেহ তল্লাশের চেষ্টায়। খাঁ বাহাদুর সাহেব আমাকে তাঁর খাতা থেকে একেবারে ছেঁটে বাদ দিয়েছিলেন। তা, আমি সশরীরে উপস্থিত হওয়ায় আমার ক্রন্দনরতা স্ত্রীর মুখে হাসি ফুটে উঠল।

সরকারি কাজ সারা করে পরদিন বিকেল বেলায় আমার থালে ফিরে যাবার কথা , কিন্তু আমি আটক হয়ে পড়লাম। সেই রাতে আমরা সাদ্দা ফোর্ট অতিক্রম করার পর উপজাতীয় লস্কর ফোর্ট আক্রমণ ও দুর্গরক্ষিদের পরাস্ত করে ফোর্টে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। কোহাট থেকে ব্রিটিশ আর্মর্ড কলম এসে রাস্তা বিপদমুক্ত না করা পর্যন্ত থাল-পারাচিনার রাস্তা সরকারি হুকুমে সর্বসাধারণের ও বিশেষ করে সরকারি চাকুরেদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

১১

বন্ধু রশীদ খানকে বললাম, আচ্ছা রশীদ বল তো তুমি নিজেকে পাখতূন আর এই দেশটাকে পাখতূনিস্তান বলে আখ্যাত কর কেন? ইতিহাসে পাখতূন বলে কোনও জাতির বা ভূগোলে পাখতূনিস্তান বলে কোনও দেশের উল্লেখ আছে বলে তো মনে পড়ে না। এ অঞ্চলটা তো ইন্ডিয়ার নর্থ- ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স। রশীদ খান মুর্গির ঠ্যাং চর্বণ করছিলেন একমনে। কয়েক মিনিট কোনও উত্তর দিলেন না। মুর্গির ঠ্যাং চিবানো শেষ করে আমার দিকে মুর্গি কারির বোল এগিয়ে দিয়ে বললেন, “মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড ,আমাদের দেশ ও দেশবাসিদের সম্বন্ধে তোমার জ্ঞানের বহর নিতান্তই অল্প দেখছি। এখনই তো ইতিহাস ও ভূগোল এর নজির দেখাচ্ছিলে ,অথচ আমাদের দেশের অর্থাৎ আফগানিস্তানের ইতিহাস তুমি কতটুকুই বা জানো। এ দেশটা ইন্ডিয়ার অংশ নয় আর আমরাও ইন্ডিয়ান নই। আমরা আফগান কিন্তু নিজেদের আফগান বলে পরিচয় দেবার অধিকার থেকে ইংরাজ আমাদের বঞ্চিত করে রেখেছে। তাই বলে আমরা নিজেদের ইন্ডিয়ান বলে মেনে নিতে পারি না। আফগানিস্তানের জনসাধারণের ভাষা ‘পস্তো’ বা ‘পাখতো’। তাই আমরা নিজেদের দেশটাকে অর্থাৎ আফগানিস্তানের দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলকে বলি ‘পাখতূনিস্তান’, ও নিজেদের বলি পাখতূন। আমাদের দেশ ও দেশবাসী সম্বন্ধে  জানতে হলে আফগানিস্তানের ইতিহাস কিছুটা ওয়াকিফহাল হওয়া দরকার তোমার।”

আমাদের মধ্যে আপ সম্বোধন থেকে তুম এ কখন এসে গেছি জানতেই পারি নি।মনে পড়ে গেল Sir. William Barton তাঁর “India’s North West Frontier” বইটিতে লিখেছেন “The Afgan border land is central Asian in characteristic. No apology is needed for again stressing an outstanding fact too easily forgotten “.

আফগানিস্তান একটি রহস্যময় কিন্তু মনোমুগ্ধকর দেশ এবং এ দেশের বাসিন্দারা অত্যন্ত যুদ্ধ প্রিয় ও প্রভূত গুণসম্পন্ন। যদিও আপাতদৃষ্টিতে অনেকগুলি গুণ পরস্পরবিরোধী বলে মনে হয় বিদেশিদের কাছে। আফগানিস্তানের সহজাত সীমানা উত্তরে অক্ষ নদী (অক্সাস)থেকে আরম্ভ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্বে সিন্ধু নদ পর্যন্ত প্রসারিত। এই বিস্তারিত ভূমি সবটাই প্রকৃত পক্ষে আফগানিস্তান। কিন্তু ইংরাজ দেশের অর্ধেকটা অপহরণ করে ইন্ডিয়ার সঙ্গে জোড়াতালি দিয়ে নাম দিয়েছে ইন্ডিয়ার ‘নর্থ ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স।’

আফগানিস্তানের উল্লেখযোগ্য ইতিহাস আরম্ভ হল আহমদ শাহ আবদালির সময় থেকে। তিনিই প্রথম দুরানি রাজ বংশ প্রতিষ্ঠা করেন ১৭৪৭ সালে। এর আগে পশ্চিম আফগানিস্তান ছিল পারস্যের (অধুনা ইরান) অধিকারে, এবং বাদবাকি দেশটা বিভিন্ন উপজাতীয় সরদাররা নিজ নিজ এলাকার মধ্যে শাসন করতেন। আহমদ শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র তিমুর শাহ সিংহাসনে বসেন ও দক্ষতার সঙ্গে শাসনকার্য চালান। গোল বাধল ১৭৯৩ সালে তিমুর শাহের মৃত্যুর পর। তাঁর পুত্র সংখ্যা ছিল গোটা কুড়ির ওপর। সিংহাসন দখল করার জন্য তাদের মধ্যে রক্তাক্ত যুদ্ধ বেধে গেল। এক রাজপুত্র সিংহাসন দখল করে বসতে না বসতে আর একজন তাকে তাড়িয়ে নিজে রাজা হয়ে বসে। এমনি চলল কিছুদিন। শেষে শাহ শুজা নামে এক রাজপুত্রকে হারিয়ে মোহমুদজাই উপজাতীয় সর্দার দোস্ত মোহম্মদ ১৮১০ সালে সিংহাসনারূঢ় হলেন।

শাহ শুজা হিন্দুস্থানে পালিয়ে গিয়ে ইংরাজের আশ্রয় নিলেন। দোস্ত মোহম্মদ বিচক্ষণ শাসক ছিলেন ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন অল্প সময়ের মধ্যে। তিনি ব্রিটিশের অর্থ সাহায্যে শাহ শুজার সিংহাসন পুণরুদ্ধারের চেষ্টায় দু’দুটি অভিযান নিষ্ফল করে দেন।   

সে সময় ইংরাজের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রসার করে চলেছে। কথিত আছে ওদিকে রুশ সম্রাট জারও নাকি নিজের দক্ষিণ সীমান্তের বাইরে পা বাড়াবার মতলব আঁটছিলেন। একই সময়ে পারস্যের (অধুনা ইরান ) শাহ এর দরবারে রুশ সম্রাটের প্রভাব ছিল প্রচুর। সেই প্রভাবের সুযোগ নিয়ে রুশ এর রাজদূত শাহকে প্ররোচিত করলেন আফগানিস্তানের হিরাট অঞ্চল আক্রমণ করার জন্য। পারস্যে ব্রিটিশ রাজদূত স্যর হেনরি এলিস শাহকে এ বিষয়ে নিরস্ত করতে না পেরে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভাইকাউন্ট পামরস্টোনকে ব্যপারটা জানালেন এক বার্তা পাঠিয়ে, মন্তব্য করলেন যে পারস্যের হিরাট দখল প্রকৃত পক্ষে হিরাটের ওপর রাশিয়ার অধিকারই কায়েম হবে ও সেক্ষেত্রে ক্রমে গোটা আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তার করা রুশ সম্রাটের পক্ষে অসম্ভব হবে না।

সেরূপ অবস্থা ব্রিটিশ স্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর হবে ও ব্রিটিশের ভারত সাম্রাজ্য বিপদগ্রস্ত হতে পারে। ভারতের ইংরাজ গভর্নর জেনারেল পারস্যের শাহকে প্রতিবাদ জানিয়ে লিখলেন যে, পারস্যের হিরাট অভিযান ইংরাজ সমর্থন করে না এবং ঘোর অসন্তুষ্টির চোখে দেখে। সে প্রতিবাদে কোনও কাজ হল না। হিরাট আক্রমণের  জন্য তোড়জোড় আরম্ভ হয়ে গেল।

দোস্ত মোহম্মদ খবরটা পেয়ে বিচলিত হলেন কারণ তিনি জনপ্রিয় শাসক হলেও দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁর শত্রুর অভাব ছিল না। শক্তিশালী বহির্শত্রুর হিরাট অভিযানের ফলে দেশের ভিতরের শত্রুরাও মাথা চাড়া দিয়ে উঠে দোস্ত মোহম্মদকে বিপদে ফেলতে পারে সে আশঙ্কা ছিল। তিনি ভারতের ইংরাজ গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ডের কাছে দূত পাঠিয়ে আসন্ন হিরাট আক্রমণ প্রতিহত করতে ও শিখ রাজা রণজিৎ সিং এর কবল থেকে পেশাওয়ার পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য প্রার্থনা করলেন ( আগে পেশাওয়ার ছিল আফগান নৃপতির শীতকালীন রাজধানী)। লর্ড অকল্যান্ড স্যর অ্যালেকজান্ডার বার্নসকে নিজের প্রতিনিধি হিসাবে পাঠালেন আফগানিস্তানে দোস্ত মোহম্মদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতে, কিন্তু তাঁর আসল উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অর্থাৎ দোস্ত মহম্মদকে সামরিক ও আর্থিক সাহায্য দানের প্রস্তাবটা একেবারে এড়িয়ে গেলেন। অকল্যান্ডের নির্দেশমত স্যর বার্নস কতকগুলি নিছক বাণিজ্যিক ও সিন্ধুনদের অববাহিকার উৎকর্ষ সাধনের বিষয়ে প্রস্তাব দিলেন। দোস্ত মোহম্মদ এসব অবান্তর আলোচনায় মোটেই আগ্রহী ছিলেন না। তিনি স্পষ্ট জানতে চাইলেন যে ইংরাজ তাঁকে ইপ্সিত সাহায্য দেবেন কি না এবং জানিয়ে দিলেন যে ইংরাজের কাছে সাহায্য না পেলে তিনি রাশিয়ার দ্বারস্থ হবেন। স্যর বার্নস অতঃপর চাটিবাটি গুটিয়ে ফিরে গেলেন হিন্দুস্থানে, কারণ দোস্ত মোহম্মদকে সেরূপ কোনও প্রতিশ্রুতি দেবার অধিকার তাঁর ছিল না।

মনে হয় স্যর বার্নসকে আফগানিস্তানে পাঠাবার আগেই লর্ড অকল্যান্ড নিজের লক্ষ স্থির করে ফেলেছিলেন। অকল্যান্ডের উদ্দেশ্য ছিল  দোস্ত মহম্মদকে সিংহাসনচ্যূত করে ইংরাজের আশ্রিত ও তল্পিদার  শাহ সুজাকে গদিতে বসিয়ে পরোক্ষে আফগানিস্তানের ওপর নিরঙ্কুশ প্রভুত্ব করা। ইতিমধ্যে শাহসুজা ব্রিটিশের অর্থসাহায্যে নিজের সৈন্যদল গঠন করে দুবার দোস্ত মোহাম্মদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়েছিলেন ও মার খেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এবার ওকল্যান্ড স্থির করলেন যে সরাসরি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈন্যবাহিনী দিয়ে আফগানিস্তান আক্রমণ করে নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করবেন। প্রথম অ্যাংলো আফগান যুদ্ধ এর সুত্রপাত হল।

১৮৩৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিশাল ফৌজ এসে জড়ো হল ফিরোজপুরে। ফৌজে ছিল ব্রিটিশ ও ইন্ডিয়ান সৈন্য ষোল হাজারের ওপর। ফৌজের মালপত্র বহনের জন্য সঙ্গে ছিল আটত্রিশ হাজার উট ও ফৌজ এর রসদাদি সরবরাহের ও অন্যান্য কাজের জন্য সাধারণ লোক ছিল ত্রিশ হাজার। এ ছাড়া শাহ সুজার তথাকথিত নিজস্ব ফৌজ ছিল প্রায় সাত হাজার।

হিন্দুস্থান থেকে আফগানিস্তানে প্রবেশ করার পথ আছে মাত্র তিনটি। একটি খাইবার পাস হয়ে জালালাবাদ ও কাবুল , দ্বিতীয়টি কুরাম পাস হয়ে গজনি ও তৃতীয়টি বালুচিস্তান হয়ে কান্দাহার। খাইবার পাস অত্যন্ত কঠিন পথ, পেশাওয়ারের পশ্চিমে জামরূদ দুর্গ ও সেখান থেকে তোরখাম পর্যন্ত ৮৫ কিলোমিটারের মত অপ্রশস্ত ও দুর্গম দু’সারি পাহাড়ের মাঝ দিয়ে চলে গেছে। পাহাড়ের গায়ে ও পাদদেশে দুর্ধর্ষ আফরিদিদের বাস। মোটের মাথায় ওই পথ দিয়ে যেতে হলে হয় আফরিদি উপজাতির বিভিন্ন গোষ্ঠীর সদিচ্ছা লাভ করতে হয় কিম্বা প্রতিপদে তাদের সঙ্গে লড়াই করে এগোতে হয়।

কুরাম পাস কোহাট থেকে প্রায় একশ কিলোমিটার পশ্চিমে থাল থেকে আরম্ভ হয়েছে এবং পেওয়াড়ে শেষ হয়েছে ও তারপর সুতর গর্দন পাস অতিক্রম করে গজনি শহর ও দুর্গ, থাল থেকে কমবেশি দুশ কিলমিটার। বেশির ভাগ পথ কুরাম উপত্যকার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে ও থাল থেকে চব্বিশ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মান্দুরিতে পথ কিছুটা সংকীর্ণ অন্যথা পেওয়াড় পর্যন্ত পথটি বেশ প্রশস্ত।

অবশ্য এ পথেও দু’পাশের পাহাড়ে ও উপত্যকায় দুর্দম ওয়াজিরি উপজাতির বিভিন্ন গোষ্ঠীর বাস।এ পথটি খাইবারের তুলনায় সহজ কিন্তু কুরাম পাস সম্বন্ধে বিশদ জ্ঞান সে সময়ে ইংরাজের ছিল না। ব্রিটিশ সামরিক মহলে স্থির করা হল যে পথ অত্যন্ত দীর্ঘ হলেও সিন্ধুনদ পার করে বালুচিস্তান হয়ে কান্দাহার, ও সেখান থেকে গজনি ও কাবুল এর ওপর চড়াও করা হবে।

পাঞ্জাবের ফিরোজপুর  থেকে রওনা হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফৌজ ও শাহ সুজার তথাকথিত নিজস্ব ফৌজ। সে কী তার জাঁকজমক! সোলজারদের ও অফিসারদের পরনে লাল রঙের টিউনিক, অফিসারদের (বলাবাহুল্য যে অফিসারমাত্রই ছিলেন ইংরাজ ) ও গোলন্দাজ সৈনিকদের মাথায় পালিশ করা ঝকমকে শিরস্ত্রাণ, ঘোড়সওয়ার পল্টনের শান দেওয়া বল্লমের ফলক সূর্যের আলোয় এক অপূর্ব শোভা দিচ্ছিল। বাহিনীর অধিনায়কগন ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জন কিন, মেজর জেনারেল কটন, সেল ও উইলশায়ার। শাহ সুজার ‘নিজস্ব বাহিনীর’ অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সিম্পসন। এছাড়া বাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হিসাবে ছিলেন স্যর এ্যালেকজ়ান্ডার বার্নস, স্যর উইলিয়াম ম্যাকনাটন্।

বিজয়লক্ষ্মী তখন ইংরাজ বাহিনীর প্রতি সদয়। কয়েকটি ছোটখাট লড়াই করে বালুচিস্তান পার হয়ে ব্রিটিশ বাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করল। ব্রিটিশ বেয়নেটের প্রতাপে গ্রামের পর গ্রাম লুটিয়ে পড়ল, ব্রিটিশ বাহিনী সদর্পে এগিয়ে চলল কান্দাহারের দিকে।

কান্দাহারে আফগান সৈন্যদল পরাজিত হল এবং সেখানেই শাহ সুজার রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন ব্রিটিশ সমরনায়করা। সে অনুষ্ঠানে আফগান সর্দাররা কোনও উৎসাহ দেখাল না। ইংরাজ কর্ত্তাদের ধারণা ছিল যে শাহ সুজা আফগানিস্তানে জনপ্রিয় ছিলেন এবং তিনি দেশে প্রবেশ করা মাত্রই সর্দাররা ও জনতা তাঁকে নতজানু হয়ে অভিনন্দন করবে কিন্তু তার কোনও  লক্ষণ দেখা গেল না। তারপর আমীর ( সুলতান) শাহ সুজাকে সঙ্গে নিয়ে ব্রিটিশ বাহিনী রাজধানী কাবুলের দিকে রওনা হল।

কাবুলে দোস্ত মোহম্মদ ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হলেন ও আত্মসমর্পণ করলেন। তাঁকে এক ব্রিটিশ রক্ষিদলের তত্ত্বাবধানে হিন্দুস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হল। মনে হয় তিনি ব্রিটিশের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি ব্রিটিশের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন কিন্তু সাহায্য দিতে অসম্মত হলেও তারা যে তাঁকে হঠাৎ আক্রমণ করবে সে কথা সম্ভবত তিনি ভাবতে পারেননি।

কাবুলে খুব ঘটা করে রাজপোশাক পরে সুন্দর আরবি ঘোড়ায় চড়ে শাহ সুজা প্রবেশ করলেন বালাহিসার রাজপ্রাসাদে এবং সেই সিংহাসনে বসলেন, যে সিংহাসন দোস্ত মোহম্মদ প্রায় উনত্রিশ বছর পূর্বে কেড়ে নিয়েছিলেন। শাহ সুজার এক পাশে স্যর বার্নস ও আর এক পাশে স্যর ম্যাকনাটন ছিলেন ঘোড়ায় চড়ে এবং ব্রিটিশ মিলটারি ব্যান্ড বাজাচ্ছিল হর্ষোল্লাসের সুরে। জেনারেল সেল এক সৈন্যদল নিয়ে চলে গেলেন জালালাবাদ জয় করতে। ব্রিটিশ বাহিনীর একটা বড় অংশ কাবুলে ক্যানটুনমেন্ট নির্মাণ করে জমিয়ে বসল। বিবাহিত অফিসাররা তাঁদের স্ত্রী পরিবার হিন্দুস্থান থেকে কাবুলে আনালেন। পোলো, ঘোড়দৌড়, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলার ব্যবস্থা হল ইংরাজদের মনোরঞ্জনের জন্য। তাঁদের জীবন বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠল কাবুলে।

দোস্ত মোহম্মদের পুত্র আকবর খাঁ তাঁর পিতার সঙ্গে শঠতার জন্য ইংরাজের ওপর প্রতিশোধ নেবার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। আফগান রমণীদের সঙ্গে ব্রিটিশ অফিসারদের লাম্পট্যপূর্ণ ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে তিনি গোটা আফগানিস্তানের সর্দারদের খেপিয়ে তুললেন, বললেন যে আফগান রমণীদের ধর্ম নষ্ট করে সমগ্র আফগান জাতির মান ইজ্জত ডুবিয়ে দিয়েছে ইংরাজ। গোটা আফগানিস্তানে ইংরাজবিরোধী আগুন জ্বলে উঠল। আফগান সর্দাররা নিজের নিজের লস্কর ( ফৌজ) নিয়ে আকবর খাঁর ঝাণ্ডার তলে দাঁড়ালেন ও ইংরাজের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করলেন। ইতিমধ্যে জেনারেল জন কিন হিন্দুস্থানে ফিরে গিয়েছিলেন ও কাবুলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে ছিলেন জেনারেল এলফিনস্টন। তিনি একে বৃদ্ধ, তাঁর বয়স তখন ষাট তার ওপর তাঁর শরীরও সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল না, কাজেই তাঁর পক্ষে সুস্থভাবে সৈন্য পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। আফগান্দের প্রবল আক্রমণ ইংরাজ বাহিনী ঠেকাতে পারল না। প্রতিটি যুদ্ধে ইংরাজ বাহিনী প্রচণ্ড মার খেতে লাগল। বাহিনীর রসদাগার বেহাত হয়ে গেল, স্যর বার্নস খুন হয়ে গেলেন ,বালাহিসার প্রাসাদের মধ্যেই শাহ সুজা সেই হত্যাকাণ্ড নিবারণ করতে পারলেন না।স্যর ম্যাকনাটন আকবর খাঁর পিস্তলের গুলিতে নিহত হলেন ক্যানটনমেন্টের বাইরে। তখন ব্রিটিশ বাহিনীর পক্ষে আর কাবুলে টিকে থাকা সম্ভব হল না ,জেনারেল এলফিনস্টন নিজের ফৌজ নিয়ে পশ্চাদপসরণ করে ইন্ডিয়ার দিকে রওনা হলেন।

সেটা ১৮৪২ সালের জানুয়ারি মাস এবং আফগানিস্তানে তুষারপাত আরম্ভ হয়ে গেছে, কাবুল ও আশেপাশের ক্ষেত্র বরফে ঢেকে গেছে। জালালাবাদ যাবার রাস্তায় এক ফুট মতন বরফ জমে গেছে। ইতিমধ্যে আফগান উপজাতীয় লস্কর চলমান ফৌজের ওপর হানা দিয়ে অনেক টেন্ট লুট করে নিয়ে গেল। রাতের বেলা টেন্টের অভাবে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হল অনেকে। রাতে শীতের প্রকোপে অনেক হিন্দুস্থানি সিপাই, গোরা ( ইংরাজ)সোলজার ও ফলোয়ার এবং কিছু স্ত্রীলোক মারা পড়ল। অনেকে কম্বল জড়িয়ে বরফের শয্যাতেই শুয়েছিল, সকাল বেলায় দেখা গেল যে তারা ঠাণ্ডায় জমে কাঠের মত শক্ত হয়ে গেছে। মৃত লোকেদের সেইখানেই ফেলে রেখে বাদবাকি ফৌজ আবার চলল জালালাবাদের দিকে, আশা যে জালালাবাদে পৌঁছতে পারলে সেখানে জেনারেল সেল এর সৈন্যর কাছে সাহায্য পাওয়া যাবে ও সেখান থেকে খাইবার পাস দিয়ে হিন্দুস্তান পৌঁছতে সময় অনেকটা কম লাগবে। ওদিকে সেই বন্ধুর ও সংকীর্ণ পথের দু’ধারে পাহাড়ের মাথায় আফগান উপজাতীয় লোক তাদের জাজ়য়েল ( দূর পাল্লার গাদা রাইফেল)নিয়ে বসে আছে। রাস্তায় অনেক অফিসার ,সোলজার ও সিপাই জাজ়য়েলের গুলিতে লুটিয়ে পড়ল। এমনি করে দিনের পর দিন অনাহারে,শীতে ও আক্রমণকারীদের গুলিতে বা তলওয়ারের আঘাতে মরতে লাগল ব্রিটিশ বাহিনীর লোক।

যারা একদিন বাঁচল তারা আবার হাঁটতে আরম্ভ করল ক্ষীণ আশা নিয়ে যে জালালাবাদে পৌঁছতে পারলে প্রাণে বাঁচা হয়ত সম্ভব হবে। পরের দিন সেই একই অবস্থা ,তবুও জীবিত লোকেরা অর্ধমৃত অবস্থায় কঠিন গিরিপথ বেয়ে মৃতদেহের ওপর হোঁচট খেতে খেতে, অনাহারে দুর্বল দেহ নিয়ে এগিয়ে চলল জালালাবাদের দিকে। যখন জালালাবাদে পৌঁছল তখন ফৌজের মাত্র জনাকয়েক জীবিত। যে বাহিনী তিন বছর পূর্বে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছিল আক্রমণকারী রূপে, মেদিনী কাঁপিয়ে, রণহুঙ্কার দিয়ে, যে বাহিনী গর্বভরে গোটা আফগানিস্তানকে পদানত করেছিল, তার কী বিপর্যয়, কী করুণ আর নিষ্ঠুর পরিণতি!

বিপর্যয়ের খবর পৌঁছল বড় লাটের কাছে। ইংরাজ মহলে কালিমা ছেয়ে গেল। সেই দুঃসংবাদের ওপর আরও একটা দুঃসংবাদ এল, ব্রিটিশ প্রতিনিধি আমির শাহ সুজাও ইতিমধ্যে ইংরাজ বিদ্বেষী আফগানদের হাতে নিহত হয়েছেন।

কিন্তু ইংরাজের অবর্ণনীয় ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও ইংরাজ আফগানিস্তানকে রাশিয়ার হাতে তুলে দিতে পারে না। ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষার জন্য আফগানিস্তানে ব্রিটিশের একচ্ছত্র প্রভাব যে কোনও মুল্য দিয়েও কায়েম করতে হবে। ইংরাজ গভর্নর জেনারেল লর্ড এলেনবরা ( লর্ড অকল্যান্ড অবসর গ্রহণ করে বিলেতে ফিরে গিয়েছিলেন সেই সময়) হুকুম দিলেন আর একটি শক্তিশালী বাহিনী এক জন বিচক্ষণ জেনারেলের অধীনে আফগানিস্তান পাঠাতে। সে জেনারালের উদ্দেশ্য ও লক্ষ হবে আফগানিস্তান চূড়ান্ত ভাবে জয় করা ও সেখানে একজন ব্রিটিশ অনুগত সুশাসক রাজা জোগাড় করে তাকে গদিতে বসিয়ে সত্বর ইন্ডিয়াতে ফিরে আসা।

১২

রণ পারদর্শী ও বিচক্ষণ জেনারেল পোলাক এক সুশিক্ষিত ও সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনী নিয়ে রওনা হলেন আফগানিস্তানের দিকে। ১৮৪২ সালের এপ্রিল মাসে তিনি সহজ ও সুদীর্ঘ পথে কালক্ষেপ না করে সরাসরি খাইবার পাস দিয়ে এগোলেন এবং সমস্ত বাধা বিঘ্নের সঙ্গে লড়াই করে আফগানিস্তানে প্রবেশ করলেন।তাঁর বিরাট সুশিক্ষিত ও আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত ফৌজ ও তাঁর রণকৌশলে আফগানিস্তান পরাজিত হল চূড়ান্তভাবে। কাবুলে যে বাজারের ভিতর দিয়ে স্যর ম্যাকনাটন এর মৃতদেহ ঘৃণিতভাবে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল আফগানরা সে বাজার কে ভেঙে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হল। জেনারেল এলফিনস্টনের শোচনীয় পরাজয়ের ও তাঁর বাহিনীর চরম দুর্দশার গ্লানি ও কলঙ্ক মুছে গেল।

কিন্তু গোল বাধল ব্রিটিশের মাপকাঠি অনুযায়ী আফগান রাজা পেতে। ফাহৎ জঙ্গ নামে রাজবংশের একজনকে জেনারেল পোলাক সিংহাসনে বসালেন,কিন্তু  ব্রিটিশ বাহিনী ফিরে যাচ্ছে শুনে তিনিও বাহিনীর সঙ্গে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন কারণ ব্রিটিশ ফৌজের অনুপস্থিতে তাঁর পক্ষে রাজ্য শাসন করা অসম্ভব। অতএব অনন্যোপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত বন্দি দোস্ত মোহম্মদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে ১৮৪৪ সালের এপ্রিল মাসে তাঁকেই বসান হল আফগানিস্তানের সিংহাসনে।

প্রথম এ্যাংলো আফগান যুদ্ধের (১৮৩৮-১৮৪২) অভিজ্ঞতা খতিয়ে ইংরাজ দেখল যে আফগানিস্তানের ওপর একছত্র প্রভাব বজায় রাখতে হলে দক্ষিণপূর্ব আফগান উপজাতি – আফ্রিদি, ওয়াজিরি, মোমান্দ ইত্যাদি ও তাদের গোষ্ঠীগুলিকে আফগানিস্তানের আওতা থেকে সরিয়ে নিজের আয়ত্তে আনা অনিবার্য এবং খাইবার ও কুরাম অঞ্চল তথা গিরিবর্ত্মের ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার কায়েম করা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। তাই আরম্ভ হল পররাজ্য অপহরণের কাজ।  

আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও আফগানিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করা হল। ব্রিটিশ কর্তারা দক্ষিণপূর্ব আফগানিস্তানে যে সব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে চলেছিলেন , সে সব এলাকাগুলিতে যে কার শাসন চলছে তা স্থানীয় লোকের কাছে অস্পষ্ট, এমন কি কাবুলে আমিররের কাছেও ছিল অস্পষ্ট। আমীর মনে করলেন যে কতকগুলি ঘাঁটি যদিও ব্রিটিশ এখানে সেখানে তৈরি করছে কিন্তু তথাপি সে এলাকাগুলি কাবুলের শাসনাধীন। ব্রিটিশ কর্তারা জানতেন যে সমগ্র দক্ষিণপূর্ব আফগানিস্তানে তাঁরা কাবুল শাসনযন্ত্রের ছায়াও পড়তে দেবেন না। তবে ইংরাজরা একটা কথা তখনও জানত না যে এই অঞ্চলের অধিবাসীরা চিরকালই স্বায়ত্ত শাসনে বিশ্বাসী। কাবুলের আমীরের বশ্যতা স্বীকার করত এরা নামে মাত্র,কাজের বেলায় প্রত্যেক উপজাতি বা খণ্ড জাতিগুলির শাসনকার্য চালাত এদের জির্গা (নির্বাচিত সদস্যদের সভা)। প্রত্যেক খণ্ডজাতি ও উপজাতির একজন করে মালেক আছে কিন্তু তারা জির্গার মীমাংসা অমান্য করতে পারে না। ইংরাজের আবির্ভাবে কাবুলের যেটুকু আধিপত্য এদের ওপর ছিল সেটুকুও লোপ পেয়ে গেল।

অবশ্য মূল দেশের সঙ্গে এদের নাড়ির টান ও রক্তের সম্বন্ধ যেতে পারে না। উপরোক্ত সময় থেকে খণ্ডিত দক্ষিন পশ্চিম আফগানিস্তানকে পাখতূনিস্তান ও অধিবাসিদের পাখতূনবলে আখ্যাত করা যেতে পারে।

পাখতূনরা কাবুলের শাসন যদি বা কিছুটা মেনে চলত, ইংরাজের শাসন মোটেই মেনে নিল না। প্রথম অ্যাংলো ইন্ডিয়ান যুদ্ধের সময় থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শেষ দিন পর্যন্ত পাখতূনরা ইংরাজের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। গোটা পাখতূনিস্তান কার্যত নো-ম্যানস ল্যান্ড হয়ে থেকে গেল ব্রিটিশের কাছে।

কিন্তু এই নো ম্যানস ল্যান্ডের গুরুত্ব ছিল অনেক। পাখতূনিস্তান সম্বন্ধে স্যর উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন “As long as the border could remain a no-mans’land ,all was well but if any power to be supreme, that power must neither be Russia nor Afganistan.” ( The story of the Malakhnd field force by WinstonChurchill).

মাঝে দু’দিনের জন্য আমি কোহাট ক্যান্টুনমেন্টে গিয়েছিলাম। ফিরে সেই রাতেই খাবার টেবিলে বসে বন্ধু রশীদ খাঁ কে বললাম, “রশীদ তোমার ইতিহাসের ঝুলিটা একটু ঝাড়ো। পাখতূনিস্থানের গল্প শুনতে আমার বেশ ভাল লাগে।”

খাঁ সাহেব স্কচের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, “আমাদের দেশের গল্প তো শুধু যুদ্ধ আর যুদ্ধ, বলে শেষ করা যায় না তবে যদি তোমার শুনতে ভাল লাগে তাহলে সংক্ষেপে বলে যাব যখনই সময় ও সুবিধা পাব। ১৮৪৯ সাল থেকে ১৮৫২ সাল পর্যন্ত অনেক জায়গাতেই পাখতূনরা রুখে দাঁড়িয়েছিল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে।এই থাল অঞ্চলেই ১৮৫১ সালে যুদ্ধ হয়েছিল পাখতূন ও ইংরাজের মধ্যে যার উল্লেখ একদিন করেছি , সে যুদ্ধে ইংরাজ উপজাতীয় লস্করকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিল, যদিও যাকে বলে ডিসাইসিভ ব্যাটল যাকে বলে তা হয়নি।

১৮৫৫ সালের প্রথম দিকে থাল এর আশপাশের ওয়াজিরিরা পুনরায় সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি সমূহের ওপর হামলা আরম্ভ করল। এদের সঙ্গে যোগ দিল কোহাট- থাল এর মধ্যবর্তী এলাকার তূরি ও জায়মুখট্ উপজাতি। এদের বারংবার হামলায় ঐ বিস্তৃত অঞ্চলের ব্রিটিশ রক্ষিদল ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল , তোরাওয়াড়ি নামক গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি বেদখল হয়ে গেল আর অন্যান্য ঘাঁটিগুলির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়ে উঠল। ইংরাজের যেটুকু ক্ষমতা, প্রভাব ও সম্মান এসব অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল তাও ভেঙ্গে পড়বার উপক্রম হল। সংকটাপন্ন ব্রিটিশ রক্ষীদলকে সাহায্য এবং ব্রিটিশ প্রভাব ও সম্মান পুনঃ প্রতিষ্ঠার জন্য কোহাটে পাঁচ হাজার সৈন্যের একটি অতিরিক্ত বাহিনী সমবেত করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নেভিল চেম্বারলেন এর অধিনায়কত্বে পাঠানো হল অকুস্থলে।

থালের পূর্বদিকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে পথের পাশেই দর্সমন্দ এর ছোট্ট ঘাঁটি আর তার উত্তরে তোরাওয়াড়ি গ্রাম। তোরাওয়াড়িতে দেড়হাজার পাখতূ্ন উপজাতির লস্কর ঐ অঞ্চলের কাছাকাছি ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি গুলির ওপর চড়াও হবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।  কর্নেল মোকাটা  ও কর্নেল উইলিয়ামস জোয়াকিদের অজান্তে পৌঁছে গেলেন পায়া গ্রামের পাশে দুটি পাহাড়ের চূড়ায়। কিন্তু কর্নেল গার্ডিনারের অভিগমন জোয়াকিরা টের পেয়ে গেল। গার্ডিনার তার নির্দিষ্ট পাহাড়ের চূড়ায় নিজের সৈন্য  নিয়ে পৌঁছে দেখলেন যে একটি জোয়াকি লস্কর তার বিপরীত দিকের উচ্চতর পাহাড়ের মাথাটা অধিকার করে বসে আছে। এরকম অবস্থায়  আগে জোয়াকি লস্করটিকে ঐ পাহাড়ের চূড়া থেকে স্থানচ্যুত না করতে পারলে লস্করদের ওপর হামলা সফল হবে না।

কর্নেল গার্ডিনার কম্পাসের সাহায্যে জোয়াকিদের অবস্থানসূচক ম্যাপ তৈরি করে পাঠালেন গোলন্দাজ বাহিনীর কাছে। দূর পাল্লার কামানগুলি গর্জন করে উঠল। গোলার আঘাতে পাহাড়ের চূড়াটি ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। জোয়াকি লস্কর পশ্চাদপসরণ করল, কিন্তু কর্নেল গার্ডিনার তাঁর পদাতিক সৈন্যসমেত পাহাড়ি চূড়াটি দখল করা মাত্র জোয়াকিরা ফিরে এসে তাঁর সৈন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ও তাদের হটিয়ে দিল। দুই দলের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধে পাহাড়ের চূড়াটি কয়েকবার হাত বদল হবার পর কর্নেল গার্ডিনার দু’দিন পরে চূড়ান্ত ভাবে সেই গুরুত্বপূর্ণ চূড়াটি দখল করে নিলেন। তারপর অপর দুই সৈন্যদলের সঙ্গে মিলিত হয়ে পায়া গ্রাম আক্রমণ করা হল। কর্নেল মোকাটা, গার্ডিনার ও মেজর উইলিয়ামস এর সম্মিলিত শক্তির সামনে দাঁড়াতে না পেরে জোয়াকিরা এক গিরিপথ দিয়ে এলাকার গভীর অন্তর্দেশে গিয়ে নতুন ঘাঁটি স্থাপন করল। জেনারেল কিজ় এর মতলব ছিল জোয়াকিদের তাদের গ্রামে অবরুদ্ধ করা, সেটা সফল হল না।

টাইম মেশিন সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s