টাইম মেশিন সীমান্তের অন্তরালে সমরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী শীত ২০১৭

আগের পর্বগুলো

 শেষ পর্ব

এখন এই সম্পূর্ণ লেখাটি জয়ঢাক প্রকাশন থেকে পুস্তকাকারে পাবেন। ঘরে বসে কপির জন্য মেইল করুন joydhakbooks@gmail.com অথবা পাশের ছবিতে ক্লিক করুন

 

“১৮৩৮-৪০ সালের যুদ্ধে জেনারেল এলফিনিস্টন যে ভুল করেছিলেন কাবুল শহরে সৈন্যাবাস করে, রবার্টস সেরকম ভুল করলেন না। তিনি বালাহিসার প্রাসাদের উত্তরে বিমারু পাহাড়ের গায়ে শের আলির অসমাপ্ত দুর্গ শেরপুরে ক্যান্টনমেন্টে স্থাপিত করলেন।

“কাবুলের আশেপাশে রবার্টসকে উপজাতীয় সৈন্যদের সঙ্গে কয়েকটি বড়ো লড়াই লড়তে হয়েছিল, নিজের সৈন্যদলের তুলনায় অনেক বড়ো বড়ো দলের সঙ্গে। কয়েকটি যুদ্ধে পরাজয়ের আঙিনায় পৌঁছেও তিনি জয়ের নিশান ওড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু শেষরক্ষা করা তাঁরও আর হয়নি। মহম্মদ জান নামক এক আফগান সর্দার এক লক্ষ যোদ্ধার বাহিনী নিয়ে হামলা করলেন এবং হিসার প্রাসাদ ও কাবুল শহর অধিকার করলেন। রবার্টস তাঁর সৈন্যদল নিয়ে শেরপুর দুর্গে অবরুদ্ধ হলেন। তাঁর বাহিনীতে মাত্র সাত হাজারের কাছাকাছি সৈন্য ছিল। মহম্মদ জান তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে শেরপুর দুর্গে ঝাঁপিয়ে পড়েন কোন দিন, কোন সময় তাই নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলতে লাগল দুর্গের ভিতর।

“ইতিমধ্যে রবার্টস গুপ্তচর মারফত জানতে পারলেন মহম্মদ জানের দুর্গ আক্রমণের সবিস্তার পরিকল্পনা। মহম্মদ জান ঠিক করেছিলেন যে দুর্গের দক্ষিণ এবং পশ্চিমদিকের প্রাচীর টপকে ভিতরে প্রবেশ করে হামলা করবে একটি ছোটো সৈন্যদল। ব্রিটিশ সৈন্যদল নিজের সমগ্র শক্তি দিয়ে স্বাভাবিকই সেই দুইদিকে নিয়োজিত করবে। সেই সময় তাঁর মূল বাহিনী দুর্গের পূর্বদিকের প্রাচীরের ফাটল দিয়ে ব্রিটিশ সৈন্যদলকে পিছন থেকে আক্রমণ করবে। মহম্মদ জানের পরিকল্পনা জানতে পেরে রবার্টস উপযুক্ত প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করলেন। রবার্টস গান্ডামাতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চার্লস গাফকে হেলিওগ্রাফে আদেশ দিলেন তাঁর সৈন্যদল সমেত সত্বর কাবুলে চলে আসতে। গাফের সৈন্যদলে মাত্র তেরশো যোদ্ধা ছিল। কিন্তু সেই দল সময়মতো এসে পড়লে অন্তত কিছুটা সাহায্য পাওয়া যাবে। দুর্গের ভিতর রবার্টস দক্ষিণ ও পশ্চিমদিকে কিছু সৈন্য মোতায়েন করে বাদ বাকি সৈন্য পূর্বদিকে জড়ো করলেন, আর তাঁর কামানের সমস্ত মুখ পূর্বদিকে ঘুরিয়ে সাজালেন।

“প্রতীক্ষিত আক্রমণ আরম্ভ হল। দুর্গের দক্ষিণ ও পশ্চিমদিকে রাইফেল ফায়ার শোনা গেল। সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীরের ওপর হামলা। দুর্গের ভিতর থেকেও ফায়ার আরম্ভ হল উত্তরে। সেই সময় কাতারে কাতারে হাজার হাজার আফগান আক্রমণ করল দুর্গের পূর্বদিকে। আফগানরা রাইফেল ফায়ার করতে করতে ঝড়ের মতো ছুটে চলল। যখন আফগান সৈন্যের তরঙ্গ আর্টিলারি কামানের স্টার শেলের পাল্লার মধ্যে পৌঁছেছে তৎক্ষণাৎ ঘন ঘন কামান গর্জন আরম্ভ হল দুর্গের ভিতর থেকে। একেকটি স্টার শেল ফাটে আর শত শত আফগান ধরাশায়ী হয়। মহম্মদ জানের আফগান সৈন্য, তরঙ্গের পর তরঙ্গ ঝাঁপিয়ে পড়ে দুর্গের পূর্বদিকের ফাটলের ভিতর প্রবেশ করার প্রয়াসে, আর রবার্টসের নিখুঁতভাবে সাজানো কামানের সারি ঘন ঘন স্টার শেল উদ্গিরণ করে তাদের শেষ করে দেয়।

“এমনি করে যুদ্ধ চলল সমস্ত রাত আর পরদিন দুপুর পর্যন্ত। মহম্মদ জানের সেই বিশাল সৈন্যদল ক্ষতবিক্ষত হয়ে রণে ভঙ্গ দিল। কাবুল শহর ও বালাহিসার প্রাসাদ আবার ব্রিটিশের অধিকারে এল। তারপর কাবুলে জেনারেল রবার্টসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস আর কারোর হয়নি।

“আফগানিস্তানকে দুর্বল করে রাখার উদ্দেশ্যে রবার্টস এক পরিকল্পনা পেশ করে গভর্মেন্টের কাছে সুপারিশ করলেন দেশটাকে তিন ভাগে ভাগ করে খণ্ডিত করতে। তাঁর পরিকল্পনা, হিরাট অঞ্চল অর্পণ করা পারস্যের হাতে, কান্দাহারে ব্রিটিশের প্রত্যক্ষ শাসন প্রবর্তন, আর বাদ বাকি দেশটায় একজন ব্রিটিশের অনুগত আমিরের শাসনাধীনে রাখা। লর্ড লিটনও সে প্রস্তাবে সায় দিলেন।

“কিন্তু গোল বাধল রাজার অভাবে। হিরাট ও কান্দাহার বাদ দিয়ে যা থাকবে তার জন্য একটা রাজা দরকার। ইয়াকুব খাঁ আর রাজা হয়ে থাকতে চাইলেন না। কণ্টকময় রাজসিংহাসন অপেক্ষা একজন সাধারণ ব্রিটিশ প্রজা হয়ে হিন্দুস্থানে থাকা বাঞ্ছনীয় বলে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন জেনারেল রবার্টসের কাছে। কাজেই ইয়াকুব খাঁকে হিন্দুস্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হল। ইংরেজ কর্তৃপক্ষ মুশকিলে পড়লেন, একজন রাজা কোথায় পাওয়া যায়। আজকালকার দিন হলে দেশবিদেশের সংবাদপত্রে একটা বিজ্ঞাপন দিলেই কাজ হাসিল হয়ে যেত। ঝুড়ি ঝুড়ি দরখাস্ত এসে পড়ত সেই পোস্টের জন্য। এ যুগের অনেক দেশের রাজা এবং রয়াল ফ্যামিলি মেম্বাররা রাজ্য হারিয়ে বসে বেকার জীবন যাপন করছেন। তাঁরা এগিয়ে আসতেন ইন্টারভিউ দিতে।

“কিন্তু সে যুগে আফগানিস্তানের জন্য ব্রিটিশের মাপকাঠি অনুযায়ী রাজা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াল। আফগানিস্তান রাজবংশের কোনও সুশীল ও সুবোধ রাজপুত্র মাথায় তাজ পরতে চাইল না। কারণ, ব্রিটিশ কর্তৃক স্থাপিত রাজার গর্দান যেতে দেরি লাগবে না ব্রিটিশ সৈন্য কাবুল থেকে চলে যাবার পর।

“জেনারেল রবার্টস তাঁর অনুসন্ধানের ফলে জানতে পারলেন যে ভূতপূর্ব আমির শের আলির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আফজল খাঁর পুত্র আবদুর রহমান খাঁ কাবুল সিংহাসনে বসার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন। তিনি ইতিপূর্বে একবার শের আলিকে যুদ্ধে পরাজিত করে নিজের পিতাকে সিংহাসনে বসিয়েছিলেন। কিন্তু আফজাল খাঁ নিজের অলস প্রকৃতির ও মদিরায় আসক্তির জন্য সিংহাসন হারিয়েছিলেন শের আলির হাতেই।

“আবদুর রহমান সে সময়ে রাশিয়ায় বাস করছিলেন এবং একটি সৈন্যবাহিনী গঠন করে রুশ-আফগান সীমান্তে এসে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন সিংহাসন দখলের। জেনারেল রবার্টস আবদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে কাবুলের সিংহাসন তাঁকে দেবার প্রস্তাব করলেন। আবদুর খাঁ ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি ত্রিখন্ডিত আফগানিস্তানের মাত্র এক খণ্ডের ছোটো গণ্ডির মধ্যে রাজত্ব করতে অস্বীকার করলেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করলেন সমগ্র আফগানিস্তান। অন্যনোপায় হয়ে ইংরেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে আশ্বাস দিলেন যে গোটা আফগানিস্তানই তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে। তবে এই শর্তে যে তিনি ব্রিটিশের অনুগত হয়ে থাকবেন এবং তাঁর কোনও কার্যকলাপ ব্রিটিশ স্বার্থবিরোধী হবে না। সেইরূপ চুক্তি সম্পাদিত হল এবং আবদুর রহমান খাঁ আফগানিস্তানে প্রবেশ করার প্রস্তুতি আরম্ভ করলেন।

“আবদুর রহমান খাঁর সঙ্গে বোঝাপড়া হওয়ার পরেই জেনারেল রবার্টসের কাছে দুঃসংবাদ এল, কান্দাহারে ব্রিটিশ ফৌজকে পরাস্ত করেছেন শের আলির আরেক পুত্র আয়ুব খাঁ। আয়ুব খাঁর সৈন্যবাহিনী কান্দাহারে মোতায়েন ব্রিটিশ ফৌজ অপেক্ষা অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল এবং সেখানে ব্রিটিশ সেনাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারোজ আয়ুবের সৈন্যবাহিনীর আক্রমণের মুখে দাঁড়াতে না পেরে কান্দাহার দুর্গে আশ্রয় নিয়েছেন ও সেখানে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন। কাবুল থেকে রবার্টস আবার ছুটলেন নিজের ফৌজ নিয়ে কান্দাহারে। যদিও তাঁর বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা আয়ুবের সৈন্যের তুলনায় অনেক কম ছিল, কিন্তু তিনি তাঁর রণকৌশলে শেষপর্যন্ত আয়ুব খাঁকে পরাজিত করলেন।

“আবদুর রহমান খাঁ আমিরের তাজ পরে আফগানিস্তানের সিংহাসনে বসলেন এবং দোস্ত মোহম্মদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সুচারুরূপে রাজ্যশাসনে মনোনিবেশ করলেন।”

১৬

“আবদুর খাঁর দেশ শাসনপর্ব এখন মুলতুবি রেখে আমরা ফিরে যাই অতীতের সেই জোয়াকি যুদ্ধের আরেকটি অধ্যায়ে। সেই অধ্যায়ে আফ্রিদি খণ্ড জাতি জাকাখেলের সঙ্গে ইংরাজের যুদ্ধটাই মুখ্য, জোয়াকিদের কাহিনীটি যদিও গৌণ, কিন্তু এর মধ্যে পাখতুনদের আরেকটি দিক দেখতে পাওয়া যায়।

“জাকাখেল খণ্ড জাতি থাকে খাইবার পাসের বারা এবং বাজার উপত্যকায়। সেখানে কদম গ্রামের অখতার খাঁর বিবাহ হয়েছিল জোয়াকিদের পায়া গ্রামের দিলদার খাঁর ছোটো বোন নসিবের সঙ্গে। দুই পরিবারের মধ্যে জানাশোনা ছিল অনেকদিনের, আর তাদের মধ্যে সদ্ভাবও ছিল। একদিন কী একটা ছোটো ব্যাপার নিয়ে দিলদার আর অখতারের মধ্যে তর্ক আরম্ভ হল। কী বিষয় নিয়ে তর্ক হচ্ছিল তা জানা নেই, কিন্তু শুনেছি বিষয়টি অকিঞ্চিৎকর। ক্রমে তর্ক থেকে কলহে গিয়ে দাঁড়াল এবং রাগের মাথায় দিলদার অখতারকে বেহায়া ও বেইমান বলে বসল। অখতার কোমরবন্ধ থেকে ছোরা বের করে দিলদারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দিলদারের ছোটোভাই ছুটে গেল দিলদারকে সাহায্য করতে আর অখতারের ছুরি আমূল বিঁধে গেল তার বুকে। দিলদার তার ভাইয়ের হত্যাকারীকে প্রতি আক্রমণ করার আগেই অখতার নিজের ঘোড়াটির পিঠে লাফ দিয়ে উঠে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল নিজের গ্রামে।

“কয়েকবছর পরে একদিন অখতারের ছোটোভাই যাচ্ছিল জাকাখেল এলাকার বাইরে একটি সরু পথ ধরে পায়া গ্রামের পাশ দিয়ে। পথের ধারের একটি ঝোপ থেকে হঠাৎ বেরিয়ে দিলদার ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর এবং তরোয়াল দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করল। তখন থেকে চলে আসছে দুই পরিবারের মধ্যে শোধবোধের পালা। তিন পুরুষ ধরে ঘাত-প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে চলে আসছে শত্রুতা।

“বংশানুক্রমিক সেই শত্রুতার ফলে জোয়াকি-যোদ্ধা চমন গুলের হাতে একসময় মৃত্যু হল সাদিকের ছোটোভাই কাসিমের। এখন সাদিকের পালা চমন গুল পরিবারের যেকোনও একটি পুরুষের প্রাণ নেওয়া।

“এমন অবস্থায় জোয়াকিদের এলাকা ইংরেজ সৈন্যের অধিকারে চলে যাওয়ায় একটি জোয়াকি লশকরের যোদ্ধারা আশ্রয় নিল জাকাখেলদের গ্রামগুলিতে। জাকাখেলদের কদম গ্রামে মহম্মদ সাদিক খাঁর বাড়িতে আশ্রয়প্রার্থী হয়ে এক আঁধার রাতে পৌঁছল জোয়াকি লশকরের চমন গুল ও আরও কয়েকজন লোক। সাদিক খাঁর বৃদ্ধা মা একটি প্রদীপ হাতে নিয়ে এলেন বাড়ির প্রাঙ্গণে অতিথিদের অভ্যর্থনা করতে। বৃদ্ধা চোখে ভালো দেখতে পান না, তাই প্রত্যেক আগন্তুকের মুখের সামনে চেরাগটি তুলে ধরেন মুখ চিনবার জন্য। চমন গুলের মুখের ওপর প্রদীপটি তুলে ধরতেই চমন বৃদ্ধার মুখ দেখতে পেয়ে চমকে উঠল। দু’পা পিছিয়ে গিয়ে ঘুরে পা বাড়াল বাইরে যাবার জন্য। বৃদ্ধা গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘চমন, চলে যেও না। আমরা পাখতুনদের আইনের অনুশাসন অক্ষরে অক্ষরে পালন করে থাকি। সেই আইনের নির্দেশ অনুসারে যেমন প্রতিশোধ নেওয়া অবশ্য কর্তব্য, আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয়দানও তেমনি অপরিহার্য। রক্তের দেনাপাওনা এখন মুলতুবি থাকল। আমার ছেলে সাদিক আইন লঙ্ঘন করে প্রতিশোধ নিতে পারে না এমন সময়। তবে আতিথ্য যখন শেষ হবে, তখন আমাদের বংশের রক্তের বদলে রক্ত নিশ্চয় আদায় করব।’

“চমন গুল উত্তর দিল, ‘ধন্যবাদ। আমি ভুল করে এ বাড়িতে প্রবেশ করেছি। তবে আমি আজ আপনার আতিথ্য গ্রহণ করলাম। ভবিষ্যতে উপযুক্ত সময়ে আমি হিসাবনিকাশের জন্য প্রস্তুত থাকব।’

“জাকাখেলদের মধ্যেও ইংরেজ বিদ্বেষ ঘনিয়ে উঠেছিল। তারা ইংরেজ দ্বারা আফগানিস্তান আক্রমণে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হয়েছিল। আফগানিস্তান তাদের পিতৃভূমি। তারা খাইবারের পথে ইংরেজ সৈন্যের আফগানিস্তান অভিযান নির্লিপ্তভাবে দেখতে পারে না। তাদের শক্তি ইংরাজের তুলনায় তুচ্ছ। তাদের যোদ্ধা সংখ্যা মাত্র চার-পাঁচ হাজার এবং নিকৃষ্ট অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। কিন্তু তাদের পিতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার কর্তব্য তাদের কাছে অকিঞ্চিৎকর নয়।

“একটি সামরিক সিগনালার্স দল মেজর পিয়রসনের অধীনে আফগানিস্তান অভিযানকারী ইংরেজ সৈন্য ও পেশাওয়ারে সামরিক হেডকোয়ার্টারসের মধ্যে খবরাখবর আদানপ্রদানে রত ছিল। জাকাখেলদের একটি ছোটো লশকর ইংরেজ সিগনালার্স দলের ওপর হামলা চালিয়ে দলটিকে ছত্রভঙ্গ করে দিল। ঘটনাটি ছোটো এবং আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ হলেও এটি ছিল বড়োরকমের গোলযোগ সৃষ্টির ইঙ্গিত। আফগানিস্তান আক্রমণকারী ব্রিটিশ সৈন্যের জীবনসূত্র বাঁধা ছিল খাইবার ও কুরম গিরিবর্ত্মের যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে। যেকোনও একটি গিরিবর্ত্মের, বিশেষ করে খাইবারের পথ ছিন্ন হলে আফগানিস্তানে ইংরেজ সৈন্যের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে উঠতে পারে। ব্রিটিশের পক্ষে যেকোনও মূল্যে গিরিবর্ত্মগুলি দিয়ে তাদের সৈন্য চলাচল অব্যাহত রাখা একান্তই প্রয়োজন। অতএব ইংরেজ কর্তৃপক্ষ জাকাখেলদের শায়েস্তা করার ব্যবস্থা দ্রুত হাতে নিলেন।

“সাম্রাজ্য বিস্তার করার জন্য ইংরেজ ব্যবহার করতেন তিনটি অস্ত্র – কূটনীতি, ছলচাতুরি ও আধুনিক মারণাস্ত্র। ইংরাজের ইন্টেলিজেন্স বিভাগ জানতে পারল যে কদম গ্রামের জাকাখেল সম্প্রদায়ের সঙ্গে কুকিখেল সম্প্রদায়ের সে সময় প্রচণ্ড মনোমালিন্য চলছে। ইংরাজের কাছে সেটা খুব সুখবর ও মস্ত সুযোগ। ইংরাজের কূটনীতির চালে কুকিখেলরা ব্রিটিশ সৈন্যের সাহায্যে কদম গ্রাম আক্রমণ করতে রাজি হয়ে গেল।

“কুকিখেলদের একটি বড়ো লশকর এসে কদম গ্রামের ওপর চড়াও হল। তাদের পিছনে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কিছু ইংরেজ পদাতিক সৈন্য। প্রত্যেক গ্রামেই আছে সুউচ্চ মিনার এবং গ্রামের চারদিকে প্রশস্ত দেয়াল। আক্রান্ত হলে মিনার থেকে সুরক্ষিত অবস্থায় গ্রামবাসীরা ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি চালায় আক্রমণকারীদের ওপর। সেই গুলিবৃষ্টির মুখে আক্রমণকারীদের গ্রামে প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ।

“কুকিখেল দ্বারা গ্রাম আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাসীরা নিজেদের জাজয়েল নিয়ে পৌঁছে গেল মিনারের ভিতর। কিছু লোক ছড়িয়ে পড়ল দেয়ালের পিছনে। মিনারের ভিতর থেকে ও দেয়ালের পিছন থেকে গ্রামবাসীদের গুলিবর্ষণের সামনে দাঁড়াতে না পেরে কুকিখেলরা পিছিয়ে গেল। বার বার চেষ্টা করেও গ্রামের দেয়াল অতিক্রম করতে পারল না। তখন ইংরেজ গোলন্দাজরা কামানের গোলাবর্ষণ আরম্ভ করল। গোলার আঘাতে মিনার ভেঙে পড়ল, দেয়ালের বেড়া চুরমার হয়ে গেল। তখন আর কুকিখেল লশকর ও ব্রিটিশ পদাতিক সৈন্যকে ঠেকানো গেল না। গ্রামবাসীরা ছুটল পাহাড়ের দিকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে।

“সাদিক খাঁ দেয়ালের আড়াল থেকে শত্রুর ওপর জাজয়েল ফায়ার করছিল। হঠাৎ কামানের গোলার একটা টুকরো তার বাঁ কাঁধের ওপর দিকটা ছিঁড়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল। সাদিক মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ হওয়ার দরুন সে ক্রমে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ল। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। প্রতিক্ষণে তার অবস্থা সংকটজনক হতে লাগল। যদি তার কাঁধের রক্তক্ষরণ অচিরে বন্ধ না করা যায় তাহলে তার মৃত্যু সুনিশ্চিত। কিন্তু সেই ডামাডোল ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে কে তাঁকে মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করবে? তার ক্ষতস্থান থেকে ক্রমাগত রক্ত গড়িয়ে চলেছে আর সঙ্গে সঙ্গে চেতনা হ্রাস হয়ে চলেছে। মৃত্যুর কালো হাত তার দিকে এগিয়ে আসছে। এমন সময় একটি লোক নিঃশব্দে তার কাছে এসে নিজের পাগড়ি থেকে খানিকটা কাপড় ছিঁড়ে নিয়ে সাদিকের ক্ষতস্থান বেঁধে দিল, তারপর তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে গ্রামের এক অন্ধকার কোণ দিয়ে বেরিয়ে গেল গ্রামের বাইরে পাহাড়শ্রেণীর দিকে। চেতনা সম্পূর্ণ রূপে হারাবার পূর্বে সাদিক চিনতে পারল তার প্রাণরক্ষাকারীকে,  সে বংশপরম্পরায় তার শত্রু চমন গুল।

“কুকিখেল দ্বারা কদম গ্রাম আক্রমণ ও ধ্বংসের খবর তড়িৎবেগে ছড়িয়ে পড়ল বাজার এবং বার উপত্যকার সমস্ত জাকাখেলদের মধ্যে। তাদের বুঝতে বাকি রইল না যে ইংরাজের কামানের সাহায্য ছাড়া কুকিখেলদের সামর্থে কুলোত না কদম গ্রাম ধ্বংস করা। আসল শত্রু  ইংরেজ। গোটা বাজার ও বারা উপত্যকার জাকাখেলরা চঞ্চল হয়ে উঠল।

“খাইবার পাসের যত্রতত্র ব্রিটিশ সৈন্যের ওপর হামলা আরম্ভ করল জাকাখেল খণ্ড জাতি। খাইবার পাস দিয়ে সৈন্য চলাচল ভয়াবহভাবে বিঘ্নিত হয়ে উঠল। আফগানিস্তানে যুদ্ধরত ব্রিটিশ বাহিনীর জন্য রসদ প্রভৃতি পাঠাবার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হল। বোঝা যাচ্ছিল, খাইবার পাস জাকাখেলদের হাত থেকে মুক্ত না করতে পারলে আফগানিস্তানে অভিযানকারী ইংরেজ ফৌজের দুর্বিপাক অবশ্যম্ভাবী।

“খাইবার পাসের নিরাপত্তার ভার ছিল লেফটেন্যান্ট জেনারেল মডের ওপর। জাকাখেলদের দমন করার উদ্দেশ্যে মড স্বয়ং একটি সুসজ্জিত ফৌজ নিয়ে চড়াও হলেন বাজার ও বারা উপত্যকার ওপর। সহকারী সেনাপতিরূপে সঙ্গে নিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল টাইটলারকে।

“জাকাখেল অপারেশন ফোর্সে ছিল পাঁচটি দূরপাল্লার কামান, দুটি অশ্বারোহী সৈন্যদল, এক কোম্পানি সামরিক এঞ্জিনিয়ার ও দু’হাজারেরও বেশি পদাতিক সৈন্য। ফৌজের সঙ্গে ছিল প্রচুর সামরিক উপকরণ, অতি আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এবং অঢেল রসদ। জেনারেল মড ফৌজটিকে দু’ভাগে ভাগ করে, একটি সৈন্যদল দিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল টাইটলারের অধিনায়কত্বে ও আর অন্য দলটির সেনাপতিত্ব নিলেন নিজে।

“জেনারেল মড আলি মসজিদ শিবির থেকে সোজা জাকাখেলদের এলাকায় প্রবেশ করা স্থির করলেন এবং টাইটলারকে হুকুম দিলেন ডাক্কা ফোর্ট থেকে যাত্রা করে সফেদ কোহ পর্বতমালার মধ্যে সিসোবি গিরিবর্ত্ম দিয়ে এগিয়ে বাজার উপত্যকায় মডের মূল বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হতে। সফেদ কোহ পর্বতমালার সিসোবি গিরিবর্ত্ম দিয়ে টাইটলারকে পাঠাবার উদ্দেশ্য ছিল যাতে আক্রান্ত হয়ে জাকাখেলরা সফেদ কোহ পাহাড়ের মধ্যে পশ্চাদপসরণ করে আত্মগোপন করতে না পারে।

“রাতের অন্ধকারে মড ও টাইটলার নিজের নিজের সৈন্যদল নিয়ে নির্দিষ্ট স্থান থেকে আগুয়ান হলেন। জেনারেল মডের পরিকল্পনা ছিল ভোরবেলায় অকুস্থলে পৌঁছে অতর্কিতে জাকাখেলদের আক্রমণ করবেন। কিন্তু সেটা সঠিকভাবে কার্যে পরিণত করতে পারা গেল না। মানচিত্র দেখে শুধুমাত্র আনুমানিক দূরত্বই জানা ছিল জেনারেল মডের। পথের মধ্যে প্রাকৃতিক বাধার এবং পথের দুর্গমতার হদিশ মানচিত্রে ছিল না। কাজেই জেনারেল মডের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোরবেলায় গন্তব্য স্থানে পৌঁছতে পারলেন না, পৌঁছলেন বিকালবেলায়। টাইটলারের সৈন্যদল তখনও সেখানে উপস্থিত হতে পারেনি। তাঁর জন্য নির্দিষ্ট পথ ছিল আরও দুর্গম। সেইজন্য জেনারেল মডের সঙ্গে মিলিত হতে তাঁর আরও একদিন সময় লাগল।

“জাকাখেলদের কয়েকটি গ্রামের আশেপাশে মড এবং টাইটলার সৈন্য সাজালেন। ভারী কামানগুলিকে উপযুক্ত স্থানে বসানো হল। তারপর আরম্ভ হল সংহারের পালা। জেনারেল টাইটলারের কামানের গোলার আঘাতে জাকাখেলদের নিকাই নামক গ্রামের মিনারগুলি সব একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। হালওয়াই নামক আর একটি গ্রাম ঘিরে ফেললেন জেনারেল মড। তারপর মেগাফোনের মারফত খাঁটি পশ্তো ভাষায় গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্যে হাঁক দিয়ে বললেন, ‘গ্রামের সমস্ত পুরুষ মানুষ নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গ্রামের বাইরে এসে আত্মসমর্পণ কর। আমার সৈন্য তোমাদের গ্রামটিকে ঘিরে রেখেছে, আমার ভারী কামানগুলিও প্রস্তুত আছে তোমাদের গ্রাম ভূমিসাৎ করার জন্য।’

“কদম গ্রাম ধ্বংস হওয়ার পর সেই গ্রামের বাসিন্দারা আশ্রয় নিয়েছিল হালওয়াই গ্রামে। তাদের সঙ্গে ছিল কিছু সংখ্যক জোয়াকি যারা পায়া গ্রাম ধ্বংস হওয়ায় আশ্রয় নিয়েছিল কদম গ্রামে। কদম গ্রামের সাদিক খাঁ তখন আর চমন গুলের আশ্রয়দাতা নন। তিনি নিজেই আশ্রয়প্রার্থী। ইতিমধ্যে তাঁর কাঁধের ক্ষত প্রায় সেরে উঠেছে। কাঁধটায় আড়ষ্টতা আছে, সেই কারণে তিনি স্বাভাবিক ক্ষিপ্রতার জাজয়েল ফায়ার করতে পারেন না। তাঁর মনের মধ্যেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। তিনি ভুলে যেতে চান চমন গুল পরিবারের সঙ্গে শত্রুতার কথা। তিনি চেষ্টা করেও ভুলতে পারেন না যে তাঁর আহত অবস্থায় চমন গুল তাকে বিধ্বস্ত কদম গ্রাম থেকে কাঁধে তুলে নিরাপদ আশ্রয়ে না নিয়ে গেলে তাঁর মৃত্যু অবধারিত ছিল।

“সাদিক খাঁ তার মানসিক দ্বন্দ্বের কথা তাঁর মাকে জানালেন। কিন্তু বৃদ্ধা তাঁর যুক্তি মেনে নিলেন না। বৃদ্ধার মতে চমন গুল সাদিকের জন্য যেটুকু পরিশ্রম স্বীকার করেছে সেটুকু যেকোনও পাখতুন তাঁর কর্তব্য মনে করে অবশ্য করত। তিনি সাদিকের এ যুক্তি মানতে নারাজ যে কোনও সাধারণ পাখতুনের পক্ষে যে কাজটা কর্তব্য বিশেষ, বংশপরম্পরায় শত্রু চমন গুলের পক্ষে সাদিকের জন্যে সে কাজটা অবশ্য কর্তব্য হতে পারে না। বৃদ্ধা বললেন যে দুই পরিবারের মধ্যে শত্রুতা শেষ হওয়ার সময় তখনও আসেনি। তিনি দৃঢ় ভাষায় সাদিককে আদেশ দিলেন কাসিমের হত্যার প্রতিশোধ নিতে। পাখতুনদের বদলা নেবার নিয়মকানুন অত্যন্ত কঠোর এবং ইচ্ছা না থাকলেও সে নিয়ম মেনে চলতেই হবে।

“চমন গুল নিজের জ়াজয়েল কাঁধে ঝুলিয়ে চলেছে হাওলয়াই গ্রাম থেকে মাইল দুই দূরে পাহাড়ের মধ্যে একটি সংকীর্ণ গিরিপথ দিয়ে। হঠাৎ কড়াক শব্দে জ়জয়েলের একটি ফায়ার হল আর তাঁর মাথার হাতখানেক ওপর দিয়ে সাঁৎ করে একটি গুলি গিয়ে অদূরে একটি পাথরে ঠিকরে পড়ল। প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে পাহাড়ের মাথার দিক থেকে সাদিক খাঁ চিৎকার করে বলল, ‘চমন, আমি দ্বিতীয়বার গুলি চালাবার আগে নিজের জাজয়েল তুলে ধর। নিজের আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত হও। আমার দ্বিতীয় গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না।’ চমন গুল ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু প্রত্যুত্তরে নিজের জাজয়েল ব্যবহার করার কোনও লক্ষণ দেখাল না। কোমরে দুই হাত রেখে উত্তর দিল, ‘সাদিক, তুমি কি মনে কর আমি এতই নির্বোধ যে বিশ্বাস করব তুমি মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে একজন ছ’ফুট লম্বা মানুষকে গুলি করতে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছ? আমাকে হত্যা করার ইচ্ছা থাকলে তোমার দ্বিতীয় ফায়ার করার প্রয়োজন হত না। তুমি বোধহয় চাও যে আত্মরক্ষার তাগিদে তোমার গুলির উত্তরে আমি তোমাকে গুলি করে হত্যা করি। তুমি চাও যে এইভাবেই আমাদের শত্রুতার অবসান হোক। কারণ, তোমার পর তোমাদের পরিবারে আপাতত কোনও পুরুষমানুষ থাকবে না বদলা নেবার জন্য। কিন্তু তা হবে না, সাদিক। আমার যে হাতদুটি একদিন তোমার প্রাণরক্ষা করেছিল সে হাত আর কখনও তোমার প্রাণ সংহারের নিমিত্ত হবে না। আমাদের শত্রুতার অবসান একদিন হয়তো হবে, কিন্তু কবে, কীভাবে তা অজানা ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত আছে। তবে তুমি আমার ওপর এখনই বদলা নিয়ে শত্রুতার শেষ করতে পার। আমি তোমার বিরুদ্ধে হাত তুলব না।’

“ঠিক তখন হালওয়াই গ্রামে কামানের গুড়ুম-গুম শব্দে দু’মাইল দূরের পাহাড় কেঁপে উঠল। শব্দের প্রতিধ্বনি পাহাড়ের গায়ে গায়ে ঠিকরে দূরে চলে গেল। সাদিক আর চমন অবাক হয়ে সেদিক ঘুরে তাকাল। তারপর চমন গুল বলল, ‘সাদিক, আমাদের শত্রুতার নিষ্পত্তি এখন স্থগিত থাক। মনে হয় ইংরাজের সৈন্য হালওয়াই গ্রাম আক্রমণ করেছে। হালওয়াই এখন আমাদের দু’জনেরই আশ্রয়স্থল। আমাদের উচিত এখন আমাদের দুই পরিবারের রক্তের দেনাপাওনার হিসাব ভবিষ্যতের জন্য তুলে রেখে হালওয়াই গ্রামবাসীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইংরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা।’

“সাদিক আর চমন ছুটে চলল পাহাড়ের গা বেয়ে হালওয়াই গ্রামের দিকে। গ্রামে তখন ধ্বংসলীলা আরম্ভ হয়ে গেছে। গ্রামবাসীরা আত্মসমর্পণে রাজি না হওয়ায় জেনারেল মড মৃত্যুর বন্যায় গ্রাম ভাসিয়ে চলেছেন। মুহুর্মুহু কামানের গোলার আঘাতে গ্রামের মিনার, ঘরবাড়ি সব ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। জাকাখেল গ্রামবাসীদের জ়জয়েল প্রায় নিস্তব্ধ। তাদের গুলি-বারুদ ফুরিয়ে এসেছে। মডের পদাতিক সৈন্য পশ্চাদপসরণকারী জাকাখেলদের ওপর গুলিবর্ষণ করে তাদের ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। আর অশ্বারোহী সৈন্য তাদের ঘোড়া ছুটিয়ে জাকাখেলদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কাউকে মাস্কেটের গুলিতে, কাউকে বল্লম দিয়ে আর কাউকে তলোয়ারের আঘাতে মরণের কোলে তুলে দিচ্ছে। কোনঅ কোনও পাখতুন ভিড়ের মধ্যে ধাবমান ঘোড়ার ধাক্কায় মাটিতে পড়ে তার পায়ের তলায় থেঁতলে যাচ্ছে। স্ত্রীলোক ও ছোটো ছেলেমেয়েদের গ্রামের বাইরে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাবার সুবিধা দেবার জন্য কিছু গ্রামবাসী প্রাণপণ করে ব্রিটিশ সৈন্যদলকে আটকে রাখার প্রয়াস করে চলেছে।

“গ্রামের একটি গলিপথে গ্রামপ্রধান আর তাঁর কয়েকজন সহচরকে সেই সময় ঘিরে ফেলল ব্রিটিশ সোলজারের একটি দল। গ্রামপ্রধান ও তাঁর সহচরদের কাছে গুলি-বারুদ আর ছিল না। তারা জাজয়েল ঘুরিয়ে নিয়ে তাই দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিল। জাজয়েলের কুঁদোর আঘাতে কয়েকজন সোলজার ধরাশায়ী হল। কিন্তু সেই অসমান যুদ্ধের পরিণতি যে কী তা সকলেই জানত।

“হাতাহাতি লড়াইয়ের সময় একটি পাথরে পা হড়কে গ্রামপ্রধান মাটিতে পড়ে গেলেন। দু’জন সোলজার তৎক্ষণাৎ তাঁকে লক্ষ করে বেয়নেট উদ্যত করল। ঠিক সেই সময় দুটি জাজয়েল গর্জে উঠল আর সোলজার দু’জন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

“সাদিক ও চমন সোলজার দু’জনকে ধরাশায়ী করে এগিয়ে চলল ব্রিটিশদলের অন্যান্য সোলজারদের হাত থেকে গ্রামপ্রধানকে রক্ষা করতে। কিন্তু লক্ষ্যস্থলে পৌঁছোবার আগেই একদল অশ্বারোহী সৈন্য তাদের আক্রমণ করল। দুটি বল্লম এসে বিঁধল তাদের শরীরে, আর ঘোড়ার পায়ের তলায় পড়ে তারা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল।

“হালওয়াই গ্রামে জেনারেল মড তাণ্ডবলীলার মধ্যে নিজের কাজ শেষ করে সৈন্যদল নিয়ে চলে গেলেন আর একটি জাকাখেল গ্রাম ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। হালওয়াই গ্রামে ফিরে এলেন গ্রামের স্ত্রীলোক এবং অন্যান্যরা যাঁরা মৃত্যুর কবল থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। গ্রামে আহত-নিহতদের তল্লাশ আরম্ভ হল। সাদিক খাঁর মা ও চমন গুলের স্ত্রীও তল্লাশকারীদের মধ্যে ছিলেন। তাঁরা যুগপৎ দেখতে পেলেন একই জায়গায় সাদিক ও চমন পাশাপাশি পড়ে আছে। তাদের একজনের হাতের মধ্যে আর একজনের হাত রয়েছে করমর্দনের ভঙ্গিতে। দু’জনের রক্ত গড়িয়ে এক হয়ে মিশে গেছে মাটিতে। দু’জনই চেতনাহীন। তখনও তাদের ক্ষীণ নিঃশ্বাস বইছে। মৃত্যু তাদের আপাতত রেহাই দিয়েছে বলে মনে হল। সাদিকের মা দু’জনকেই নিয়ে গেলেন শুশ্রূষার জন্য গ্রামের ভিতরে। চমন গুলের স্ত্রীকেও নিয়ে গেলেন সঙ্গে।

“গ্রামের একটি ভাঙা ঘরে দু’দিন পরে সাদিকের চেতনা ফিরে এল। তখনও দূরে ব্রিটিশ সৈন্যের কামান ও মাস্কেটের  গোলাগুলি বর্ষণ চলেছে গুড়ুম গুড়ুম ও কড়কড় শব্দে। হালওয়াই গ্রামের ঘরবাড়ির ভাঙা দেয়ালগুলি কেঁপে কেঁপে উঠছে। ইংরাজের সৈন্য তখন জাকাখেলদের অন্যান্য গ্রাম ধ্বংস করায় ব্যস্ত। চোখ খুলতে প্রথমটা সাদিকের সব ঝাপসা মনে হল, তারপর ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি পরিষ্কার হয়ে এল। তিনি দেখতে পেলেন বৃদ্ধা মাকে। মার মুখটি চিন্তাক্লিষ্ট, কিন্তু তাঁর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির আভাস রয়েছে বলে মনে হল। সাদিক ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘মা, আমি চমন গুলের ওপর গুলি চালিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমার ফায়ার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গেল। আমি আবার সুযোগের সন্ধানে থাকব। আশা করি, এবার আমার নিশানা ফসকাবে না।’

“তার মা একটু মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, ‘সাদিক, তোমার নিজের বিবেকের সঙ্গে লড়াই আর আত্মপ্রতারণা করার প্রয়োজন শেষ হয়েছে বোধহয়। হালওয়াই গ্রামে ইংরাজের সঙ্গে লড়াইয়ে তোমার আর চমনের রক্ত একই সঙ্গে গড়িয়েছে। দুই রক্তের ধারা মিশে এক হয়ে তোমাদের রক্তে দেনাপাওনা সব শোধবোধ হয়ে গেছে। চমন যদি রাজি থাকে তাহলে আমাদের দুই পরিবারের শত্রুতা আমি এখানেই শেষ করে দিতে চাই।’

“কাছেই চমন গুল শুয়েছিল। তার চেতনা ফিরেছে আগের দিন, কিন্তু তখনও সে বেশ দুর্বল। বৃদ্ধার কথা শুনে চমন উত্তর দিল, ‘আপনার সিদ্ধান্ত আমি খুশি মনেই মেনে নিলাম। আমি আগেই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম নিজের কাছে যে সাদিকের জীবননাশের জন্য কখনও হাত তুলব না। আমার তরফ থেকে শত্রুতার ভাব সেই মুহূর্তেই শিথিল হয়ে গেছে যখন আমি আপনাদের আতিথ্য স্বীকার করলাম। তারপর যখন দেখলাম ইংরাজের অস্ত্রের আঘাতে কদম গ্রামে রক্তাক্ত দেহে সাদিক মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে, সেই সময়েই আমি স্থির করেছিলাম যে নিজেদের মধ্যে কলহে রক্তক্ষয় না করে পাখতুন জাতির স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়াসে নিজের রক্ত দেব।’ এই বলে চমন গুল গড়িয়ে গড়িয়ে সাদিকের দিকে এগিয়ে গিয়ে ডানহাতটা বাড়িয়ে দিল। সাদিক আনন্দোজ্জ্বল মুখে চমনের হাত ধরল।

“জেনারেল মড এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল টাইটলার হালওয়াই গ্রামের পর পথে ছোটো ছোটো কয়েকটি জাকাখেল গ্রাম ধ্বংস করে এগিয়ে চললেন উপজাতির আর একটি বড়ো গ্রাম ‘চীনা’ অভিমুখে। উদ্দেশ্য ছিল গ্রামখানি ঘিরে ধরে গ্রামবাসীদের নির্মূল করা। চীনা গ্রামে পৌঁছে তাঁরা দেখলেন যে গ্রামটি জনমানবশূন্য। গ্রামবাসীরা গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে দুর্গম পাহাড়ের জঙ্গলে এবং তাদের গবাদি পশুও নিয়ে গেছে সঙ্গে। কিন্তু গ্রামে পাওয়া গেল প্রচুর খাদ্যশস্য। তাড়াতাড়িতে গ্রামবাসীরা সেগুলি সরাবার সময় পায়নি। জেনারেল মড সমস্ত খাদ্যশস্য আত্মসাৎ করলেন।

“এইভাবে জাকাখেলদের ছোটোবড়ো অনেক গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেল, তাদের খাদ্যশস্য লুঠ হয়ে গেল, অগণিত লোক ইংরাজের সঙ্গে যুদ্ধে হতাহত হল। জেনারেল মড সন্তুষ্ট মনে নিজের ফৌজ আর লুণ্ঠিত খাদ্যশস্য নিয়ে পা বাড়ালেন ফেরার পথে।

“নিশ্চিন্ত মনে চলছেন জেনারেল মড, সামনে বা আশেপাশে কোনও বাধা নেই। এমনি নিষ্কন্টক যাত্রাপথে এক ছোটো গিরিবর্ত্মের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল তাঁর বাহিনী। হঠাৎ ফৌজের পৃষ্ঠরক্ষী (রিয়ার গার্ড) দলের ওপর একঝাঁক গুলি এসে পড়ল। পিছন দিক থেকে অকস্মাৎ জাকাখেলদের আক্রমণে ফৌজের মধ্যে কিছুটা বিশৃঙ্খলা ও বিহ্বলতার সৃষ্টি হল আর সেই সুযোগে হামলাকারী জাকাখেল লশকর তাদের লুঠ হয়ে যাওয়া খাদ্যশস্য ফৌজের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল। উপরন্তু ইংরেজ ফৌজের রসদ আর মালবাহী খচ্চর ও উটও নিয়ে গেল। এরপর গোটা পাহাড়ি অঞ্চলের পথে পর পর ছোটো ছোটো জাকাখেল দল ইংরেজ ফৌজকে হায়রান করে চলল। ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে জেনারেল মড পাহাড়ি অঞ্চল পার করে সমতল ভূমিতে পৌঁছবার পর জাকাখেলদের হাত থেকে রেহাই পেলেন।

“ওদিকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল টাইটলার তাঁর সৈন্যদল নিয়ে ফিরছিলেন সিসেবি গিরিবর্ত্ম হয়ে। এক সন্ধ্যাবেলায় তাঁরা পৌঁছলেন একটি ছোটো উপত্যকায়। সেখানে সবুজ ঘাসে ভরা এক বিস্তীর্ণ জায়গায় রাতে বিশ্রামের উদ্দেশ্যে ডেরা স্থাপন করলেন। সেখানে পাশ দিয়ে একটি পাহড়ি নদী পড়ন্ত সূর্যের আলোর গোলাপি রঙ গায়ে মেখে চলেছে কুলু কুলু রবে। চারদিকের পাহাড়গুলিতে নানা রকমের সুন্দর গাছপালা ছেয়ে আছে। নদীর জলের কুলু কুলু আর বনের মধ্যে বাতাসের শ্রুতিমধুর ঝির ঝির শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। জায়গাটিতে এক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। যুদ্ধে জাকাখেলদের গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে টাইটলারের সৈন্যদল শ্রান্ত। এখানে তাদের আশা যে এই শান্তিময় পরিবেশে রাতটা সুখনিদ্রায় কাটাতে পারবে। সৈন্যদল সেখানে নিজেদের তাঁবু খাটাল। রান্নাবান্না করে খাওয়াদাওয়ার পর কিছু সোলজারকে চারদিকের পাহাড়ে পাহারার জন্যে মোতায়েন করে বাদ বাকি সব নিদ্রাদেবীর কোলে এলিয়ে পড়ল রাতের আঁধার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে।

“জাকাখেলদের চোখে কিন্তু ঘুম নেই। তাদের ঘরবাড়ি সব ধ্বংস হয়ে গেছে, খাদ্যশস্য নষ্ট করে দিয়েছে ইংরেজ সৈন্য। তাদের না আছে আশ্রয়, না আছে খাদ্য, আছে শুধু বুকের ভিতর প্রতিহিংসার আগুন আর নিজেদের দেশকে ইংরাজের কবল থেকে মুক্ত করার অদম্য স্পৃহা। মাঝরাতের গাঢ় অন্ধকারে টাইটলারের সৈন্যদল যখন ঘুমোচ্ছে, অফিসাররা হয়তো সুখস্বপ্ন দেখছেন যে জাকাখেলদের সাফল্যের সঙ্গে দমন করার জন্য কারুর হবে প্রোমোশন আর কেউ বা পাবেন বীরত্বের জন্য পদক।

“ঠিক সেইসময় জাকাখেলদের জাজয়েল কড়কড় শব্দে গর্জে উঠল চারদিকের পাহাড়ের শিখরগুলি থেকে। ব্রিটিশ সৈন্যদলের কোয়ার্টার গার্ড থেকে তীব্র সুরে বেজে উঠল বিউগল, সৈনিকদের হাতিয়ারবন্দ হয়ে নির্দিষ্ট স্থানে হাজির হওয়ার নির্দেশ। ঘুমের ঘোর কাটিয়ে উঠে যতক্ষণে সৈন্যদল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হল ততক্ষণে জাকাখেলরা বেশ কিছু ক্ষতিসাধন করে অন্ধকারের আড়ালে চলে গেছে বহুদূর।

“সে রাতটা আর ব্রিটিশ ফৌজ ঘুমোতে পেল না। সজাগ এবং প্রস্তুত হয়ে থাকতে হল জাকাখেলদের সম্ভাব্য পুনরাক্রমণের মোকাবেলা করার জন্য।

“এমন সব বাধাবিঘ্ন জয় করে টাইটলার অবশেষে ফিরে গেলেন তাঁর ফৌজ নিয়ে ডাক্কা দুর্গে। খাইবার গিরিবর্ত্ম আপাতত শত্রুমুক্ত হল এবং আফগানিস্তানে অভিযানকারী ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হল।”

১৭

কিছুকাল বাদে একদিন মধ্যাহ্নভোজনের সময় রশিদ খাঁকে হাজির দেখে একটু অবাক হলাম। কারণ, তাঁর সঙ্গে সাধারণত দেখা হত রাতে খাবার সময়। তাও রোজ নয়। কী ব্যাপার জিজ্ঞাসা করতে রশিদ বললেন, “শোন দোস্ত। আজ সন্ধেবেলা আমি একটি ছোটো চা পানের পার্টির ব্যবস্থা করেছি। সন্ধ্যা ছ’টার সময় থাল গ্রামের মালেক সাহেবের ফলের বাগানে নিমন্ত্রিত সকলে জমায়েত হবে। সরকারি চাকুরেরা বেশি নেই নিমন্ত্রিতদের মধ্যে। শুধু তুমি আর মেকানিক মহম্মদ জান, আর আসবে কুদরত খাঁ এবং মালেক সাহেব ও কয়েকজন পাখতুন বন্ধু।”

বললাম, “ব্যাপার কী, রশিদ? তুমি হঠাৎ পার্টি দিচ্ছ কী কারণে?”

“কারণ দুটো আছে। প্রথম হল যে আমি ওয়াজির ফোর্সের সঙ্গে ছিলাম, ওয়াজিরিস্তান অপারেশন মেডেল পেয়েছি আজকে। আর দ্বিতীয় কারণটি পরে বলব।”

আমি বললাম, “রশিদ, আমি এতদিনে তোমাকে যতটুকু জেনেছি তাতে তো মনে হয় যে ইংরেজ ওয়াজিরিস্তান অপারেশনে অকৃতকার্য হলেই তুমি খুশি হতে। কিন্তু দেখছি যে অপারেশন সাফল্যমণ্ডিত হওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার অপারেশনে অংশ গ্রহণকারীদের মধ্যে তোমাকেও তমগা দিয়েছে বলে তুমি খুশি হয়েছ। তোমার মনোভাব আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না।”

সেদিন ছিল শনিবার। কাজেই লাঞ্চের পর আর অফিস যাবার তাড়া ছিল না। রশিদও বসে গেল আমার সঙ্গে খাবার জন্য। আধখানা মুরগি-রোস্ট আর খানকয়েক নান আরও আনিয়ে নিলাম।

রশিদ খেতে খেতে বলল, “ডিয়ার ব্রাদার, তুমি ঝট করে না বুঝেসুঝে একটা মতামত প্রকাশ করে বস। এটা তোমার একটা মস্ত দোষ। এই যে তমগা বা মেডেল, এটা নিকেল আর সিলভার দিয়ে তৈরি। এটা বিক্রি করলে রাইফেলের দু’রাউন্ড গুলি কিনতে পারা যায়। তাছাড়া পাখতুনদের মেডেল সম্বন্ধে একটু দুর্বলতা আছে। মেডেল সম্বন্ধে একটা ঘটনা ঘটেছিল এ দেশে অনেকদিন আগে। দ্বিতীয় আফগান ওয়ারের সময় মোহমান্দ অপারেশনের কথা তোমাকে বলেছি, তোমার মনে আছে হয়ত। সেই অপারেশনে এক পরিত্যক্ত মোহমান্দ গ্রাম থেকে এক রুগ্ন বৃদ্ধাকে এক ব্রিটিশ জেনারেল উদ্ধার করেন এবং তাঁর চিকিৎসা করিয়ে বৃদ্ধাকে তাঁর আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়ে দেন। বৃদ্ধা জেনারেল সাহেবের ওপর খুবই খুশি হলেন এবং কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ তাঁর যুবক পুত্রকে ব্রিটিশের সেবায় অর্পণ করলেন। জেনারেল সাহেব সেই যুবককে ফৌজে ভর্তি করে নিলেন। কিছুকাল পরে মোহমান্দ অপারেশনে সাফল্য অর্জন করার জন্য অপারেশনে অংশগ্রহণকারী রেজিমেন্টগুলির জন্য বিলাতে মন্ত্রীমণ্ডল অপারেশন মেডেল মঞ্জুর করলেন। রেজিমেন্টের সবাইকেই মেডেল দেওয়া হল। সেই মোহমান্দ যুবকটি তার ব্যাটেলিয়ান কমান্ডারের কাছে নালিশ জানাল যে তাকে মেডেল দেওয়া হয়নি যদিও সে মোহমান্দ অপারেশনে যুদ্ধ করেছিল। কমান্ডার সাহেব উত্তরে বললেন যে সে মোহমান্দ যুদ্ধে অবশ্যই অংশগ্রহণ করেছিল, কিন্তু লড়াই করেছিল ইংরাজের বিরুদ্ধে। কাজেই মোহমান্দ অপারেশনে সে মেডেল পেতে পারে না। মোহমান্দ যুবকটি কমান্ডার সাহেবের উত্তরে সন্তুষ্ট হল না। তার দৃঢ় ধারণা যে মেডেলটি যখন মোহমান্দ যুদ্ধের জন্য দেওয়া হয়েছে তখন সে মেডেল তারও প্রাপ্য। কারণ, সেও যুদ্ধ করেছিল বীরত্বের সঙ্গে। কোন পক্ষে করেছিল, সেটা বড়ো কথা নয়। তোমাকে যেসব গ্রন্থের তালিকা দিয়েছি সেই গ্রন্থগুলির মধ্যে ঘটনাটির উল্লেখ পাবে। কাজেই মেডেল জিনিসটার প্রতি আমাদের একটু মোহ আছে সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ এতক্ষণে।

“দ্বিতীয় খবরটি হল যে তোমার ট্রান্সফারের হুকুম আসছে। তোমার ফ্রন্টিয়ার ট্রেনিংও শেষ হয়েছে এবং তুমি হিন্দুস্থানে ফিরে যাচ্ছ এক সপ্তাহের মধ্যেই। তোমার পোস্টিং হচ্ছে রাওলপিণ্ডিতে। কাজেই তোমাকে একটা ফেয়ারওয়েল দিতে হবে তো, তাই একটা পার্টি দিয়েই দুটো উদ্দেশ্য সিদ্ধ করছি।”

খবরটা শুনে আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। বললাম, “আমার ট্রান্সফার আর পোস্টিং হচ্ছে সেকথা আমি এখনও জানতে পারিনি অথচ তুমি জানলে, সেটা কী করে সম্ভব?”

রশিদ বলল, “তুমি মনে করছ রশিদ গাঁজাখুরি হুইস্কি টেনে আবোলতাবোল বকছে। কিন্তু সরকারি খবরাখবর জানবার ব্যবস্থা আমার আছে এবং আমার সে ব্যবস্থা ত্রুটিহীন। আগামীকাল তোমার ও আমার নিমন্ত্রণ কুদরত খাঁর বাড়িতে। সকালবেলা নাস্তা থেকে আরম্ভ করে রাতের খাবার পর্যন্ত। আগামীকাল তো রবিবার। তোমার অফিস বন্ধ। তবে থালের বাইরে যাবার জন্য কর্তাদের অনুমতি প্রয়োজন হবে। সেটা নিয়ে রেখো। আমরা সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ে বেলা ন’টার মধ্যেই আমাদিশ্যমা পৌঁছে যাব।”

পাখতুনদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ মানেই সব জায়গায় একইরকম খাবারের ব্যবস্থা। অর্থাৎ তন্দুরি নান, বিরিয়ানি ও মুরগি কিম্বা দুম্বা রোস্ট। কিন্তু কুদরতের বাড়িতে কিছু রকমফের ছিল। সকালবেলা আমাদিশ্যমায় পৌঁছলাম ব্রেকফাস্টের সময়। কুদরতের স্ত্রী সলমা নাস্তা তৈরি করেই রেখেছিল। পেস্তা, বাদাম ও কিসমিসের হালুয়া এবং সবুজ চা। শুধুমাত্র মেওয়া বাটা ও খাঁটি ঘিয়ে ভাজা হালুয়া। খেতে খুবই উপাদেয় হলেও পরিমাণে বেশি খেতে পারলাম না। কিন্তু রশিদ ও কুদরত আমার ত্রুটিটা পূর্ণ করে দিল। হাজার হলেও ওরা পাখতুন, পাথর খেয়ে তাও হজম করতে পারে।

অনেক গালগল্পের মধ্যে ব্রেকফাস্ট সারা হল। তারপর কুদরত একটা সুন্দর উইঞ্চেস্টার রাইফেল দিয়ে বলল, “আমি সম্প্রতি এটা তৈরি করেছি।”

আমার মনের সন্দেহ কুদরতকে জানাতে চাইনি। তাই রশিদকে ইংরাজিতে বললাম, “এটা নিশ্চয়ই অ্যামেরিকান রাইফেল। কুদরতের এর হাতে এরকম রাইফেল তৈরি হতে পারে না।”

রশিদ আমার হাত থেকে রাইফেলটি নিয়ে নিচের লিভার টানল। এক রাউন্ড গুলি রাইফেলের ব্রিচ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল। গুলির কার্টিজটি আমার হাতে দিয়ে রশিদ জিজ্ঞাসা করল, “গুলিটা কী ক্যালিবারের বলতে পার?”

আমি কার্টিজটি দেখে বললাম, “এটা তো থ্রি-নট-থ্রি এনফিল্ডের গুলি।”

রশিদ বলল, “তুমি নিশ্চয় জানো, থ্রি-নট-থ্রি বোর অ্যামেরিকায় তৈরি হয় না। এই রাইফেলটি উইঞ্চেস্টারের হুবহু নকল। কিন্তু রাইফেলের বোর রাখা হয়েছে থ্রি-নট-থ্রি। কারণ, এই ক্যালিবারের রাইফেল ও গুলি ব্যবহার করে ব্রিটিশ ফৌজ। তাই এই ক্যালিবারের অ্যাম্যুনিশান জোগাড় করা কিছুটা কষ্টসাধ্য হলেও পাখতুনদের পক্ষে অসম্ভব নয়। একটা আর্মি কনভয় লুঠ করতে পারলেই অনেক অ্যাম্যুনিশন হাতে এসে যায়। সেই কারণে পাখতুনরা যত রাইফেল তৈরি করে সবই এই বোরের।”

কুদরত বলল যে সে রাইফেলটি ফায়ার করে দেখেছে, খুব পাক্কা নিশানা। আমাদের অনুরোধ করল রাইফেলটি ফায়ার করে দেখতে। গ্রাম থেকে বেরিয়ে প্রায় আধমাইল দূরে একটি পাহাড়ের নিচে পৌঁছে সকলে দাঁড়ালাম। সঙ্গে সলমাও গিয়েছিল এক থলেভর্তি আপেল নিয়ে। প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে পাহাড়ের গায়ে একটি লাল টুকটুকে আপেল রাখা হল। কুদরত রাইফেল লোড করে বাঁটটি কাঁধে লাগিয়েই সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার করল, আর আপেলটি টুকরো টুকরো হয়ে গেল। এইভাবে তিনটি আপেল নষ্ট করল কুদরত। তার ফায়ার করা দেখে মনেই হল না যে সে নিশানা স্থির-টির করে ফায়ার করছে।

তারপর সলমাও একইভাবে একটি আপেল নষ্ট করল। এরপর আমার পালা। এক চোখ বন্ধ করে রাইফেলের ব্যাক সাইট ও ফোর সাইটের মধ্যে দিয়ে পঞ্চাশ গজ দূরে লাল রঙের আপেলটি একটি ছোট্ট বিন্দুর মতো দেখাচ্ছিল। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে ভালো করে এইম করে ট্রিগারে চাপ দিলাম। কিন্তু গুলিটি আপেলের প্রায় ছয় ইঞ্চি দূরে গিয়ে লাগল। পর পর তিনবার চেষ্টা করার পর আমার গুলিটি আপেলের এক পাশের একটু ছাল তুলে দিল মাত্র।

আমি রশিদের হাতে রাইফেলটি ধরিয়ে দিয়ে বললাম, “তুমি তো আমারই মতো কলম থেকে শুধু কালি ফায়ার করতে অভ্যস্ত। একবার চেষ্টা করে দেখ একটা আপেল ভেদ করতে পার কি না!”

রশিদ মুচকি হেসে রাইফেল আমার হাত থেকে নিল কিন্তু ব্রীচ লোড করল না। কুদরতকে একটা কী ইশারা করল, কুদরত একটি আপেল নিয়ে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে গিয়ে সেটিকে আকাশের দিকে জোরে ছুড়ে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে রশিদ পলকের মধ্যে লিভার টেনে ব্রীচ লোড করে আপেলটি মাটিতে পড়ার অনেক আগেই ফায়ার করল। আপেলটি ছোটো ছোটো টুকরো হয়ে চারদিকে ছিটিয়ে পড়ল। আমি রশিদের বিস্ময়কর নিপুণতা দেখে অবাক হয়ে গেলাম।

রাতের বেলায় রশিদ আর আমি কার্পেটের শয্যায় শুয়ে গল্প করতে করতে বললাম, “রশিদ, তুমি আমার কাছে একেবারে অজানাই থেকে গেলে। নিজের সম্বন্ধে কিছুই বললে না কোনওদিন।”

রশিদ উত্তর দিল, “আমার জীবনীর সঙ্গে লিখিত ইতিহাসের বিশেষ সম্বন্ধ নেই। তবে তোমাকে আমার ব্যক্তিগত জীবনের কিছুটা আভাস দেব তুমি জানতে চাইছ বলে এবং তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না বলে।

“তোমাকে কোহাট পাসের আদমখেল গ্রামবাসীদের সঙ্গে ইংরেজ স্যাপারদের প্রথম যুদ্ধের বৃত্তান্ত বলেছি। ইংরাজের স্যাপারদের তাড়াতে গিয়ে শমীর খাঁ মারা গিয়েছিলেন। তারপর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ক্যাম্বেলেরর ফৌজের আক্রমণের সময় সিকন্দর খাঁও মারা যান। সিকন্দরের স্ত্রী ও শিশুপুত্র এবং শমীর খাঁর পৌত্র ও পুত্রবধূ বেঁচে ছিলেন। সিকন্দর খাঁর একমাত্র বংশধর এখনও আছে। সে হল কুদরত খাঁ আর শমীর খাঁর শেষ বংশধর আমি।

“বাবা ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী পাখতুন। থাকতেন আফ্রিদি তিরাহ অঞ্চলে। মায়ের ইচ্ছা ছিল আমি কিছু লেখাপড়া শিখে কাবুল দরবারে গিয়ে কাজকর্ম করি। আমার শিক্ষা সম্বন্ধে বাবার কী ইচ্ছা ছিল জানতাম না। কিন্তু মা, বাবা মারা যাবার পর তাঁর কোনও বন্ধু মারফত আমাকে কোহাটে এক ইংরাজি স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। বাবা যুদ্ধে মারা যাবার আগে ঐ তিরাহ অঞ্চলের অন্য একটি গ্রামের গুলজমানের ওপর আমার তত্ত্বাবধানের ভার দিয়েছিলেন। স্কুলের পড়া শেষ করে পেশাওয়ারে কলেজে পড়তে গেলাম। আমার লেখাপড়া ও আনুষঙ্গিক খরচপত্রের জন্য টাকাপয়সা সময়মতো আমার কাছে এসে পৌঁছত অজ্ঞাত লোক দ্বারা। গুলজমান খাঁকে দেখেছিলাম মাত্র একবার, স্কুলে পড়া শেষ করার পর কোহাটে। কিন্তু তাঁর গ্রাম বা বাড়ি দেখিনি। কলেজে প্রথম গ্রীষ্মের ছুটি পড়বার পর একজন লোক পেশাওয়ারে গিয়ে আমাকে তিরাহ অঞ্চলে গুলজমানের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। গুলজমানের সংসারে শুধু তিনি আর তাঁর মেয়ে জায়েব। স্ত্রীর মৃত্যুর পর গুলজমান নিজেই মেয়েকে লালন পালন করছেন তার তিন বছর বয়স থেকে, কাজেই সে বাপের ভীষণ আদুরে। কুড়ি বছর বয়সে সে বলতে গেলে তার বাপের ডানহাত ও তাঁর সব কাজের সাথী। গুলজমান মেয়েকে সংসারের কাজ, ক্ষেতখামারের কাজ এবং যুদ্ধবিদ্যাও ভালোভাবেই শিখিয়েছিলেন। রাইফেলের নিশানা অব্যর্থ। জায়েবের সৌন্দর্যের বর্ণনা করার মতো ভাষা আমি খুঁজে পাই না। আধফোটা গোলাপ দেখেছ, কত সুন্দর? জায়েব ছিল সেই আধফোটা গোলাপ।

“আমাদের দেশে ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রেম নিষিদ্ধ। আমি কিন্তু জায়েবকে দেখেই তার প্রেমে পড়ে গেলাম। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। আমাদের দেশে খুব নিকট আত্মীয় না হলে যুবকযুবতীদের মেলামেশা করতে দেওয়া হয় না। কিন্তু গুলজমান খাঁ জায়েবের সঙ্গে আমার মেলামেশায় কোনও বাধা দিলেন না। কয়েকদিনের মধ্যে বুঝতে পারলাম জায়েবও আমার প্রতি অনুরক্ত।

“পাখতুনদের দেশের অলিখিত আইনের চোখে আমাদের দু’জনেরই মনোভাব অত্যন্ত গর্হিত। কিন্তু মানুষের নিয়ম যাই হোক না কেন, প্রকৃতির নিয়মের শক্তির কাছে তাকে পরাজয় স্বীকার করতেই হবে। শায়ের জিগর মুরাদাবাদী তো বলেইছেন, ‘পাসে অদব সে ছুপ না সকা রাজ়-এ-ইশক কা, জিস জা তুমহারা নাম সুনা সর ঝুকা দিয়া’।

“গুলজমানের বাড়িতে রঙিন স্বপ্নের মতোই আমার ছুটির সময়টা কেটে গেল। গুলজমান অবশ্য অলসভাবে আমাকে পড়ে থাকতে দেননি। ক্ষেতখামারের কাজ তিনি নিজে আমাকে শেখাচ্ছিলেন আর আমার অস্ত্রশিক্ষার ভার দিয়েছিলেন জায়েবের ওপর।

“শিক্ষয়িত্রী হিসাবে জায়েব ছিল খুব কড়া। শিক্ষার সময় আমার কোনও গাফিলতি সহ্য করত না। কিন্তু আমি তার শাসন খুবই উপভোগ করতাম। কলেজের ছুটির দিন ফুরিয়ে গেল। গুলজমান ও জায়েবের কাছে বিদায় নিলাম। গুলজমান বললেন যে কলেজের ছুটি হলেই যেন আমি বাড়িতে চলে আসি। কারণ, ইংরাজি লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জাতীয় শিক্ষাও আমাকে গ্রহণ করতে হবে। তাঁর কথাবার্তায় আর একটা জিনিসের ইঙ্গিত পেলাম। কলেজের পড়া শেষ হলেই জায়েবের সঙ্গে আমার শাদি হবে। পুলকিত মনে পেশাওয়ার ফিরে গেলাম।

“কলেজে গিয়ে লেখাপড়ায় আর তেমন মন বসাতে পারলাম না। সবসময়েই অন্যমনস্ক হয়ে শুধু জায়েবের কথাই ভাবতাম। পড়ার কেতাবে শুধু জায়েবের মুখই দেখছি বলে মনে হত। কয়েকদিন পরেই কলেজ কামাই করে আবার চলে গেলাম গুলজমানের বাড়িতে। বললাম, কলেজে কয়েকদিনের ছুটি হয়েছে, তাই চলে এলাম। জায়েব আমাকে দেখে খুশি হল, কিন্তু আমার কলেজের ছুটির কথা বিশ্বাস করল না। আমাকে বলল, ‘সত্যি বল তো, তোমার কলেজের ছুটি হয়েছে না লেখাপড়ার ক্ষতি করে কলেজ থেকে পালিয়ে এসেছ?’ আমি তাকে মিথ্যা কথা বলতে পারলাম না। চুপ করে থাকলাম।

“এরপর ফের একটা লম্বা ছুটিতে গুলজমানের বাড়িতে গেলাম। বাড়িতে জায়েব আর আমি খড় জড়ো করার কাজ করছিলাম সেবার। অবশ্য খড়ের গাদার মধ্যে আমাদের লুকোচুরির খেলাও চলছে। আমি কাজের চাইতে অকাজই বেশি করছিলাম, এমন সময় গুলজমান ও তাঁর সঙ্গে জনাকুড়ি লোক ছুটতে ছুটতে বাড়িতে এসে পৌঁছলেন। গুলজমান বললেন, ‘তোমরা রাইফেল নিয়ে তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হও। আমার সঙ্গের লোকগুলি আমার আশ্রয়প্রার্থী। একটি ছোটো যুদ্ধের পর এদের গ্রাম ইংরাজের সৈন্য নষ্ট করে দিয়েছে ও এদের পিছু নিয়েছে।’

“সকলে রাইফেল নিয়ে ছড়িয়ে পড়লাম বাড়ির চারদিকে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ইংরাজের সৈন্যদল এসে আক্রমণ করল। তখন চলল রাইফেলের কড় কড় ধ্বনি দুই দলের মধ্যে। আমরা যখন সম্মুখ আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়ছি, সেই সময় কিছু সৈন্য পিছনদিক থেকে আমাদের ওপর একঝাঁক ফায়ার করল। তারপর সব নিস্তব্ধ। বেশ কিছুক্ষণ সময় পেরিয়ে গেল, কিন্তু রাইফেলের ফায়ার আর শুনতে পাওয়া গেল না। আমি আমার রাইফেলের ম্যাগাজিনে আর একটা চার্জ গুলি লোড করে বেরিয়ে পড়লাম সেই অকারণ যুদ্ধের খতিয়ান করার জন্য। প্রথমেই দেখলাম, গুলজমানের এবং আশ্রয়প্রার্থী কয়েকজনের মৃতদেহ। বাদ বাকিরা সম্ভবত পিছু হটে পাহাড়ের মধ্যে চলে গেছে। তারপর সেই খড়ের গাদার কাছে গিয়ে দেখলাম জায়েব রাইফেল হাতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। তার বুক আর মুখ থেকে রক্ত গড়িয়ে জায়গাটা লাল হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে তাকে চিৎ করে শোয়ালাম। তখনও তার চেতনা রয়েছে, কিন্তু বাঁচার কোনও আশা নেই। গুলি লেগেছিল তার পিঠে আর গলায়। তার দৃষ্টি নিষ্প্রভ, শ্বাসকষ্টও হচ্ছিল খুবই। সে তার দুর্বল তর্জনী দিয়ে ইশারায় আমার রাইফেল ও নিজের মাথা দেখাল। সে কী বলতে চাইছে বুঝতে পেরে আমি তার মাথায় রাইফেলের নল রেখে পর পর দুটি ফায়ার করে তার অসহ্য কষ্টের অবসান করে দিলাম। আধফোটা গোলাপ এক অযথা ঘূর্ণিবাত্যায় ঝরে পড়ল। রাইফেল ঘুরিয়ে নিয়ে নলটা নিজের মুখে দিয়ে ট্রিগারে চাপ দিতে গিয়ে থেমে গেলাম। পাখতুন আত্মহত্যা করে না। তার ধর্ম ‘প্রতিশোধ’, রক্তের বদলে রক্ত। আমার জীবনে আনন্দের আলো ফুটে ওঠার আগেই নিভে গেল আর জ্বলে উঠল প্রতিহিংসার আগুন। যারা আমার জীবন মরুভূমিতে পরিণত করল, তাদের রক্তপাত আর আমাদের দেশ থেকে তাদের উৎখাত করাই আমার ব্রত হল সেই ক্ষণ থেকে।

“পেশাওয়ারে ফিরে গেলাম এবং অত্যন্ত পরিশ্রম করে শেষ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করলাম। তারপর নিলাম ইংরেজ সরকারের চাকুরি এবং পরিশ্রম ও ইংরেজ কর্তাদের তোষামোদি করে তাদের বিশ্বাসভাজনদের মধ্যে স্থান করে নিলাম। ঈপির ফকিরের লশকরের বিরুদ্ধে ইংরাজের ওয়াজিরিস্তান অপারেশনের কথা তো তুমি সব শুনেছ। কিন্তু তুমি জান না যে ঈপির ফকির সাহেব ছিলেন শুধুমাত্র ফকির। ধর্মগুরু হিসাবে ওয়াজিরিস্তানে তাঁর প্রভাব ছিল প্রচুর। কিন্তু যুদ্ধ চালাবার জন্য সাংগঠনিক দক্ষতা তাঁর ছিল না। যুদ্ধবিদ্যাতে তাঁর ব্যুৎপত্তিও বিশেষ ছিল না। সে বিষয়ে তাঁর উপদেষ্টা ছিলেন গুল শমীর নামে একটি লোক।

“প্রকৃতপক্ষে ১৯৩৪-৩৫ সালের যুদ্ধটা বাধাবার মূলে ছিল গুল শমীর। বান্নুতে খাস ব্রিটিশ সংরক্ষিত এলাকা থেকে একজন হিন্দু স্ত্রীলোককে অপহরণ করিয়ে একজন পাখতুন মালেকের সঙ্গে তার বিয়ে দিল গুল শমীর। ব্রিটিশ কর্তারা খুবই অপমানিত বোধ করলেন। কারণ, স্ত্রীলোকটি অপহৃত হয়েছিল ব্রিটিশ রক্ষী সৈন্যদলের বৃত্তের ভিতর থেকে। ওয়াজিরি মালেকের কাছে ইংরাজের তরফ থেকে আল্টিমেটাম দেওয়া হল স্ত্রীলোকটিকে সত্বর ফেরত দেওয়ার জন্য। তখন ঈপির ফকির সাহেবের প্রভাবের সাহায্য নিয়ে গোটা ওয়াজিরিস্তানে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিল গুল শমীর। সমগ্র ওয়াজিরিস্তান রুখে দাঁড়াল ইংরাজের বিরুদ্ধে। ওয়াজিরি লশকরের পর লশকর আক্রমণ করল সমস্ত ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি। যুদ্ধ পরিচালনার ও পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিলেন গুল শমীর এবং সমস্ত ওয়াজিরি উপজাতির মধ্যে সমন্বয়সাধনও করেছিলেন তিনি। যে ওয়াজিরিস্তানে মাসুদ, বাটানি, বঙ্গশ ইত্যাদি উপজাতিদের নিজেদের মধ্যেই লড়াই লেগে থাকত, তারা সব এক হয়ে নামল ইংরাজের বিরুদ্ধে। ঘোরতর যুদ্ধ চলল তিন বছর ধরে। স্পিনওয়ামে পাহাড়ের গুহায় ঈপির ফকিরকে ইংরেজ ধরতে যাবার ঠিক আগেই ফকির সাহেবকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়েছিল গুল শমীর। সে ইংরাজের প্রতিটি চালের খবর রাখত।

“বলা বাহুল্য যে গুল শমীর চলাফেরা করত ছদ্মবেশে। তুমি মনে করছ যে গুল শমীর একজন হিন্দু স্ত্রীলোককে অপহরণ করে তার বিয়ে একজন পাখতুন মালেকের সঙ্গে দিয়ে ভীষণ অন্যায় কাজ করেছিল। আমিও স্বীকার করি, কিছুটা অন্যায় হয়েছিল। কিন্তু ‘অল আর ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার’। তাছাড়া আমি জানি যে সেই স্ত্রীলোককে তার পূর্বের অবস্থার অপেক্ষা অনেক ভালো দৈহিক অবস্থায় এবং আরামে রাখা হয়েছিল ওয়াজিরি মালেকের বাড়িতে।

“ভাগ্যদোষে ওয়াজিরিদের সেই উত্থান বিফল হল। ইংরেজ তার সাম্রাজ্যের দৌলতে প্রবল শক্তিশালী। তাকে ওয়াজিরিস্তান থেকে তাড়ানো গেল না। তবে শত্রুর রক্তপাত হল প্রচুর। পাখতুনওয়ালি আইন, রক্তের বদলে রক্ত। তারপর এসে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মান, ইতালি ও জাপানের আঁতাতের বিরুদ্ধে সর্বপ্রধান শক্তি হল ইংরেজ। এখন সমগ্র পাখতুনিস্তানের উপজাতিদের সংগঠিত করে নামাতে হবে পাখতুনিস্তানকে বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত করার জন্য। দেখা যাক, কতদূর কী হয়। একটা ভবিষ্যদ্বাণী বোধহয় নির্ভুলভাবেই করা যেতে পারে যে বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল যে পক্ষের অনুকূলেই যাক না কেন, ব্রিটিশের সাম্রাজ্য লোপ অনিবার্য।

“কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্য লোপ পেলে যে সাম্রাজ্যবাদও লোপ পাবে তা মনে হয় না। কোন পুঁজিবাদি পশ্চিম শক্তি ব্রিটিশের স্থান দখল করবে কিংবা করবে না, তা এখনই বলা কঠিন। যদি অন্য কোনও পুঁজিবাদি তথা সাম্রাজ্যবাদি পশ্চিমি শক্তির অভ্যুদয় হয়, তাহলে সেই শক্তি আর সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে সংঘর্ষ নতুন করে আরম্ভ হবে আফগানিস্তানে এবং আমাদের রক্তের ফোয়ারা ছুটবে আবার। সুদূর ভবিষ্যতে পাখতুনিস্তান আবার আফগানিস্তানের সঙ্গে জোড়া লাগবে, না স্বাধীন সত্ত্বা ধারণ করবে কিংবা অন্য কোনও বৃহৎ শক্তির খপ্পরে গিয়ে রক্তাক্ত জোয়াল টেনে চলবে, তাও বলা যায় না এখনই। তবে আমার জীবদ্দশায় আমি চেষ্টা করে যাব বিদেশির কবল থেকে পাখতুনিস্তানকে মুক্ত করাতে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আমরা একদিন সফল হবই। তবে সময় লাগবে এবং ধৈর্য ধরে সেদিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আমি শায়েরের ভাষায় বলি,

অওর কুছ দের ভটক লে মেরে দরমাদা নদীম

অওর কুছ দিন অভি, জহরাব কা সাগর পী লে।

নূর অফশাঁ চলি আতি হ্যয় উরুসে ফর্দা,

হাল তারিকো সম

আফশাঁ সহি লেকিন জী লে।

(আর কিছুদিন বুকের বেদনা বয়ে

পান করে চলো গরলসাগরখানি

বেঁচে থাকো শত জীবনযাতনা সয়ে

আলোর সকাল দূর বেশি নয় জানি)

“সেই উদ্দেশ্য নিয়ে আমি কাজ করে যাচ্ছি। কোথাও রশিদ খাঁ, কোথাও গুল শমীর আর কোথাও আলেফসাহেব রূপে। এবার নতুন কী ভূমিকা তা এখনও স্থির করিনি। তোমাকে আমার অনেক ব্যক্তিগত কথা সংক্ষেপে বললাম। কারণ, তোমার সঙ্গে আর আমার দেখা হবে না। সরকারি চাকুরিতে আমি ইস্তফা দিয়ে এসেছি। কারণ, তার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে। আর তুমিও দু-তিনদিনের মধ্যে আমাদের দেশ ছেড়ে চলে যাবে। রাত প্রায় শেষ হতে চলেছে। এখন একটু ঘুমিয়ে নাও। সকালবেলায় আমি চলে যাব। কোথায় যাব তা জিজ্ঞাসা কোরো না, করলে উত্তর পাবে না। যাবার সময় তোমাকে গুড বাই করে যাব। তুমি আমার দেশের লোক নও এবং তোমাকে আমি নিজেদের একজন বলে কখনই মেনে নিতে পারি না। তবুও তোমাকে আমার দোস্ত বলে স্বীকার করেছি এবং চিরকাল দোস্ত বলে তোমাকে মনে রাখব।”

ভোরের আবছা আলো তখন উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়েছে। রশিদের ডাক শুনে আমি কার্পেট-শয্যা ত্যাগ করে ঘরের বাইরে গেলাম। রশিদের দেখি নতুন মূর্তি। গায়ে শার্ট, নেকটাই, কোট নেই। বদলে সে পরে আছে হাঁটুর নিচে পর্যন্ত ঝুলের কুর্তা তার ওপর পোস্তিন, ঢোল্লা সলওয়ার ও মাথার কুল্লার ওপর দড়ির মতো পাক দেওয়া পাগড়ি। বাঁ কাঁধে ঝুলছে কুদরতের তৈরি উইঞ্চেস্টার প্যাটার্নের থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল। কোমরে এক কার্তুজের ব্যান্ডোলিয়ার বেল্ট। তার একদিকে একটি ড্যাগার, অন্যদিকে একটি রিভলভার ও কার্তুজের স্ট্র্যাপ আর ডান কাঁধে কাপড়ের একটি পুঁটলি। রশিদ তার ব্রিফকেসটি খুলে স্কচের বোতল বের করল। তাতে তখনও প্রায় আধবোতল মতো হুইস্কি ছিল। একবার বোতলটির দিকে তাকিয়ে সেটাকে দূরে ছুড়ে দিয়ে বলল, “রিস্তা তোড়া ম্যয়খানে সে।”

তারপর ব্রিফকেসটি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এটা তোমাকে দিলাম। এর ভিতর এক বান্ডিল কাগজ আছে। তাতে পাখতুনিস্তানের যেসব কাহিনি তোমাকে বলা হয়নি, সেগুলো সব লেখা আছে। তুমি পাখতুনদের ইতিবৃত্ত জানতে আগ্রহী, তাই তোমাকে এগুলো দিয়ে গেলাম।”

তারপর আমার সঙ্গে কোলাকুলি ও করমর্দন করে রশিদ বলল, “চললাম, দোস্ত।”

আমি শুভেচ্ছা জানিয়ে বললাম, “খুদা হাফি়জ়়।”

“খুদা হাফি়জ়়,” রশিদ উত্তর দিল।

তারপর সোজা সামনের পাহাড়ের দিকে হাঁটতে আরম্ভ করল সে। আমার মন বিষাদে ভরে গেল। প্রায় তিনশো গজ গিয়ে রশিদ ফিরে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে আবার বিদায় জানাল। তারপর তরতর করে পাহাড়ের মাথার দিকে উঠতে লাগল।

পাহাড়ের মাথায় পৌঁছে রশিদ ক্ষণিক স্থির হয়ে দাঁড়াল। আমি আমার হাতের দুই তালু চোঙের মতো করে মুখের ওপর রেখে চেঁচিয়ে বললাম, “রশিদ, খুদা হাফি়জ়।”

সে আর ফিরে তাকাল না। পাহাড়ের ও-পিঠে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার শুভেচ্ছা পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকল, খুদা হাফি়জ়, খুদা হাফি়জ়, খুদা হাফি়জ়।

শেষ

টাইম মেশিন সব লেখা একত্রে

Advertisements

One Response to টাইম মেশিন সীমান্তের অন্তরালে সমরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী শীত ২০১৭

  1. Hossain Mahmud says:

    সীমান্তের অন্তরালে প্রসঙ্গে
    সমরেন্দ্রনাথ লাহিড়ীর ‘সীমান্তের অন্তরালে’র শেষপর্ব পড়লাম এই শেষরাতে। আমি বাংলাদেশের মানুষ। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া হয়নি। দূর থেকে সে যুদ্ধ বিষয়ে শুনেছি । আধুনিক কিছু অস্ত্রশস্ত্রের সাথে যৎসামান্য পরিচয় আছে। গত শতকের ত্রিশের শেষ ও চল্লিশ দশকের প্রথম দিকে পাখতুনিস্তানে ব্রিটিশ-উপজাতির মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, মৃত্যু,ধ্বংস ও বর্বরতার যে বিশদ ছবি তিনি এঁকেছেন, তাদের যুদ্ধ ও অস্ত্রশস্ত্র বিষয়ে যেভাবে হাত খুলে লিখেছেন, অবশ্যই তার আর নজির নেই। আমি সামান্য ব্যক্তি এই অসাধারণ লেখকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। আমি তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। লেখকের গুণী কন্যা স্বপ্না লাহিড়ীকে ও এ চমৎকার গ্রন্থটিকে যারা আলোতে এনেছেন, সবাইকে সালাম ও অভিনন্দন। ০৪-৫৫ মি.২১.০১.২০১৮,ঢাকা।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s