টাইম মেশিন সীমান্তের অন্তরালে সমরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী শরৎ ২০১৬

সীমান্তের অন্তরালে-আগের পর্বগুলো

time07পূর্বপ্রকাশিতের পর

কাবুলে দোস্ত মোহম্মদ বৃটিশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হলেন ও আত্মসমর্পণ করলেন। তাঁকে এক বৃটিশ রক্ষিদলের তত্ত্বাবধানে হিন্দুস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হল। মনে হয় তিনি ব্রিটিশের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না । তিনি ব্রিটিশের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন কিন্তু সাহায্য দিতে অসম্মত হলেও তারা যে তাঁকে হঠাৎ আক্রমণ করবে সে কথা সম্ভবত তিনি ভাবতে পারেননি ।

কাবুলে খুব ঘটা করে, রাজপোশাক পরে সুন্দর আরবি ঘোড়ায় চড়ে শাহ সুজা প্রবেশ করলেন বালা হিসার রাজ প্রাসাদে এবং সেই সিংহাসনে বসলেন, যে সিংহাসন দোস্ত মোহম্মদ প্রায় উনত্রিশ বছর পূর্বে কেড়ে নিয়েছিলেন। শাহ সুজার এক পাশে স্যর বার্নস ও আর এক পাশে স্যর ম্যাকনাটন ছিলেন ঘোড়ায় চড়ে এবং বৃটিশ মিলটারি ব্যান্ড বাজাচ্ছিল হর্ষোল্লাসভরা সুরে। জেনারেল সেল এক সৈন্যদল নিয়ে চলে গেলেন জালালাবাদ জয় করতে। বৃটিশ বাহিনীর একটা বড় অংশ কাবুলে ক্যানটুনমেন্ট নির্মাণ করে জমে বসল। বিবাহিত অফিসাররা তাঁদের স্ত্রী পরিবার হিন্দুস্তান থেকে কাবুলে আনালেন। পোলো, ঘোড়দৌড়, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলার ব্যবস্থা হল ইংরাজদের মনোরঞ্জনের জন্য। তাঁদের জীবন বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠলো কাবুলে।

তবে কথায় বলে মানুষের সর্বনাশ ডেকে আনে” জ়ন, জ়র ও জ়মিন’ অর্থাৎ নারী,জহরত ও জমি । কাবুলে বৃটিশ বাহিনীর তাই হল। দোস্ত মোহম্মদের পুত্র আকবর খাঁ তাঁর পিতার সঙ্গে শঠতার জন্য ইংরাজের ওপর প্রতিশোধ নেবার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। আফগান মেয়েদের সঙ্গে বৃটিশ অফিসারদের খারাপ ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে তিনি গোটা আফগানিস্তানের সর্দারদের খেপিয়ে তুললেন, বললেন যে আফগানদের মান ইজ্জত ডুবিয়ে দিচ্ছে ইংরাজরা। গোটা আফগানিস্তানে ইংরাজবিরোধী আগুন জ্বলে উঠল। আফগান সর্দাররা নিজের নিজের লশকর(ফৌজ) নিয়ে আকবর খাঁর ঝাণ্ডার তলে দাঁড়ালেন ও ইংরাজের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করলেন।

ইতিমধ্যে জেনারেল জন কিন হিন্দুস্তানে ফিরে গিয়েছিলেন ও কাবুলে স্থলাভিষিক্ত হয়ে ছিলেন জেনারেল এলফিনস্টন। তিনি একে বৃদ্ধ, তাঁর বয়স তখন ষাট তার ওপর তাঁর শরীরও সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল না, কাজেই তাঁর পক্ষে সুস্থভাবে সৈন্যপরিচালনা করা সম্ভব ছিল না । আফগানদের প্রবল আক্রমণ ইংরাজবাহিনী ঠেকাতে পারল না। প্রতিটি যুদ্ধে ইংরাজ বাহিনী প্রচণ্ড মার খেতে লাগল। বাহিনীর রসদাগার বেহাত হয়ে গেল, স্যর বার্নস খুন হয়ে গেলেন, বালা হিসার প্রাসাদের মধ্যেই শাহ সুজা সেই হত্যা কাণ্ড নিবারণ করতে পারলেন না। স্যর ম্যাকনাটন আকবর খাঁর পিস্তলের গুলিতে নিহত হলেন ক্যানটুনমেন্টের বাইরে। তখন বৃটিশবাহিনীর পক্ষে আর কাবুলে টিকে থাকা সম্ভব হল না, জেনারেল এলফিনস্টন নিজের ফৌজ নিয়ে পশ্চাদপসরণ করে ভারতের দিকে রওনা হলেন । 

সেটা ১৮৪২ সালের জানুয়ারি মাস এবং আফগানিস্তানে তুষারপাত আরম্ভ হয়ে গেছে, কাবুল ও আশেপাশের ক্ষেত্র বরফে ঢেকে গেছে । জালালাবাদ যাবার রাস্তায় এক ফুট মতন বরফ জমে গেছে । ইতিমধ্যে আফগান উপজাতীয় লশকর চলমান ফৌজের ওপর হানা দিয়ে অনেক টেন্ট লুট করে নিয়ে গেল। রাতের বেলা টেন্টের অভাবে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হল অনেকে। রাতে শীতের প্রকোপে অনেক হিন্দুস্তানি সিপাই, গোরা ( ইংরাজ) সোলজার ও ফলোয়ার এবং কিছু স্ত্রীলোক মারা পড়ল। অনেকে কম্বল জড়িয়ে বরফের শয্যাতেই শুয়েছিল, সকাল বেলায় দেখা গেল যে তারা ঠাণ্ডায় জমে কাঠের মত শক্ত হয়ে গেছে । মৃত লোকেদের সেইখানেই ফেলে রেখে বাদবাকি ফৌজ আবার চলল জালালাবাদের দিকে, আশা যে জালালাবাদে পৌঁছতে পারলে সেখানে জেনারেল সেল এর সৈন্যর কাছে সাহায্য পাওয়া যাবে ও সেখান থেকে খাইবার পাস দিয়ে হিন্দুস্তান পৌঁছতে সময় অনেকটা কম লাগবে।

বন্ধুর ও সংকীর্ণ পথ দিয়ে অগ্রসর হতে গিয়ে যে পথের দু ধারে পাহাড়ের মাথায় আফগান উপজাতীয় লোক তাদের জাজ়য়েল (দূর পাল্লার গাদা রাইফেল)নিয়ে বসে আছে। রাস্তায় অনেক অফিসার ,সোলজার ও সিপাই জাজ়য়েলের গুলিতে লুটিয়ে পড়ল।

timemachoneseemanterontorale (Medium)এমনি করে দিনের পর দিন অনাহারে,শীতে ও আক্রমণকারীদের গুলিতে বা তলোয়ারের আঘাতে মরতে লাগল বৃটিশ বাহিনীর লোক । যারা একদিন বাঁচল তারা আবার হাঁটতে আরম্ভ করল ক্ষীণ আশা নিয়ে যে জালালাবাদে পৌঁছতে পারলে প্রাণে বাঁচা হয়তো সম্ভব হবে । পরের দিন সেই একই অবস্থা ,তবুও জীবিত লোকেরা অর্ধমৃত অবস্থায় কঠিন গিরিপথ হয়ে মৃতদেহের ওপর হোঁচট খেতে খেতে, অনাহারে দুর্বল দেহ নিয়ে এগিয়ে চলল জালালাবাদের দিকে ।

যখন জালালাবাদে পৌঁছল তখন ফৌজের মাত্র জনাকয়েক জীবিত। যে বাহিনী তিন বছর পূর্বে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছিল আক্রমনকারী রূপে, মেদিনী কাঁপিয়ে, রণহুঙ্কার দিয়ে, যে বাহিনী গর্বভরে গোটা  আফগানিস্তানকে পদানত করেছিল তার কী বিপর্যয়, কী করুণ আর নিষ্ঠুর পরিণতি!

বিপর্যয়ের খবর পৌঁছল বড়লাটের কাছে। ইংরাজমহলে কালিমা ছেয়ে গেল। সেই দুঃসংবাদের ওপর আরও একটা দুঃসংবাদ এল, বৃটিশ প্রতিনিধি আমির শাহ সুজাও ইতিমধ্যে ইংরাজ বিদ্বেষী আফগানদের হাতে নিহত হয়েছেন।

কিন্তু ইংরাজের অবর্ণনীয় ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও ইংরাজ আফগানিস্তানকে রাশিয়ার হাতে তুলে দিতে পারে না। বৃটিশ স্বার্থরক্ষার জন্য আফগানিস্তানে ব্রিটিশের একছত্র প্রভাব যে কোনও মুল্য দিয়েও চালাতে হবে। ইংরাজ গভর্নর জেনারেল লর্ড এলেনবরা ( লর্ড অকল্যান্ড অবসর গ্রহন করে বিলেতে ফিরে গিয়েছিলেন সেই সময় ) হুকুম দিলেন আর একটি শক্তিশালী বাহিনী এক জন বিচক্ষণ জেনারেলের অধীনে আফগানিস্তান পাঠাতে। সে জেনারেলের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হবে আফগানিস্তান চূড়ান্ভাবে জয় করা ও সেখানে এক জন বৃটিশ অনুগত সুশাসক রাজা জোগাড় করে তাকে গদিতে বসিয়ে সত্বর ভারতে ফিরে আসা।    

রণপারদর্শী ও বিচক্ষণ জেনারেল পোলাক এক সুশিক্ষিত ও সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনী নিয়ে রওনা হলেন আফগানিস্তানের দিকে ১৮৪২ সালের এপ্রিল মাসে। তিনি সহজ ও সুদীর্ঘ পথে কালক্ষেপ না করে সরাসরি খাইবার পাস দিয়ে এগোলেন এবং সমস্ত বাধাবিঘ্নের সঙ্গে লড়াই করে আফগানিস্তানে প্রবেশ করলেন। বিরাট সুশিক্ষিত ও আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত ফৌজ ও তাঁর রণকৌশলে আফগানিস্তান পরাজিত হল চূড়ান্তভাবে। কাবুলে যে বাজারের ভিতর দিয়ে স্যর ম্যাকনাটন এর মৃতদেহ ঘৃণিতভাবে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল আফগানরা সে বাজারকে ভেঙে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হল। জেনারেল এলফিনস্টনের শোচনীয় পরাজয়ের ও তাঁর বাহিনীর চরম দুর্দশার গ্লানি ও কলঙ্ক মুছে গেল।

কিন্তু গোল বাধল ব্রিটিশের মাপকাঠি অনুযায়ী আফগান রাজা পেতে। ফাহৎ জঙ্গ নামে রাজবংশের এক জনকে জেনারেল পোলাক সিংহাসনে বসালেন, কিন্তু  বৃটিশ বাহিনী ফিরে যাচ্ছে শুনে তিনিও বাহিনীর সঙ্গে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন কারণ বৃটিশ ফৌজের অনুপস্থিতে তাঁর পক্ষে রাজ্য শাসন করা অসম্ভব। অতএব অনন্যোপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত বন্দী দোস্ত মোহম্মদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে ১৮৪৪ সালের এপ্রিল মাসে তাঁকেই বসান হল আফগানিস্তানের সিংহাসনে ।

********

প্রথম এ্যাংলো আফগান যুদ্ধের (১৮৩৮-১৮৪২) অভিজ্ঞতা খতিয়ে ইংরাজ দেখল যে আফগানিস্তানের ওপর একছত্র প্রভাব বজায় রাখতে হলে দক্ষিণ পূর্ব আফগান উপজাতি – আফ্রিদি, ওয়াজিরি, মোমান্দ ইত্যাদি ও তাদের গোষ্ঠীগুলিকে আফগানিস্তানের আওতা থেকে সরিয়ে নিজের আয়ত্তে আনা অনিবার্য এবং খাইবার ও কুরাম অঞ্চল তথা গিরিবর্ত্মের ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার কায়েম করা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। তাই আরম্ভ হল পররাজ্য অপহরণের কাজ।  আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও আফগানিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করা হল। বৃটিশ কর্তারা দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানে যে সব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে চলেছিলেন, সে সব এলাকাগুলিতে যে কার শাসন চলছে তা স্থানীয় লোকের কাছে অস্পষ্ট, এমন কি কাবুলের আমিরের কাছেও ছিল অস্পষ্ট। আমীর মনে করলেন যে কতকগুলি ঘাঁটি যদিও বৃটিশ এখানে সেখানে তৈরি করছে কিন্তু তথাপি সে এলাকাগুলি কাবুলের শাসনাধীন। বৃটিশ কর্তারা জানতেন যে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানে তাঁরা কাবুল শাসনতন্ত্রের ছায়াও পড়তে দেবেন না । তবে ইংরাজরা একটা কথা তখনও জানত না যে এই অঞ্চলের অধিবাসীরা চিরকালই স্বায়ত্তশাসনে বিশ্বাসী। কাবুলের আমীরের বশ্যতা স্বীকার করত এরা নামে মাত্র, কাজের বেলায় প্রত্যেক উপজাতি বা খণ্ড জাতিগুলির শাসনকার্য চালাত এদের জির্গা (নির্বাচিত সদস্যদের সভা)। প্রত্যেক খণ্ডজাতি ও উপজাতির একজন করে মালেক আছে কিন্তু তারা জির্গার মীমাংসা অমান্য করতে পারে না। ইংরাজের আবির্ভাবে কাবুলের যেটুকু আধিপত্য এদের ওপর ছিল সেটুকুও লোপ পেয়ে গেল। অবশ্য মূল দেশের সঙ্গে এদের নাড়ির টান ও রক্তের সম্বন্ধ যেতে পারে না । 

উপরোক্ত সময় থেকে খণ্ডিত দক্ষিণ-পশ্চিম আফগানিস্তানকে পাখতূনিস্তান ও অধিবাসিদের পাখতূন বলে আখ্যাত করা যেতে পারে। পাখতূনরা কাবুলের শাসন যদিবা কিছুটা মেনে চলত, ইংরাজের শাসন মোটেই মেনে নিল না। প্রথম অ্যাংলো ইন্ডিয়ান যুদ্ধের সময় থেকে বৃটিশ সাম্রাজ্যের শেষ দিন পর্যন্ত পাখতূনরা ইংরাজের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। গোটা পাখতূনিস্তান কার্যত নো-ম্যানস ল্যান্ড হয়ে থেকে গেল ব্রিটিশের কাছে । কিন্তু এই নো ম্যানস ল্যান্ডের গুরুত্ব ছিল অনেক । পাখতূনিস্তান সম্বন্ধে স্যর উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন “As long as the border could remain a no-mans’land ,all was well but if any power to be supreme, that power must neither be Russia nor Afganistan.” ( The story of the Malakhnd field force by WinstonChurchill).

**********

মাঝে দু’দিনের জন্য আমি কোহাট ক্যান্টুনমেন্টে গিয়েছিলাম, ফিরে সেই রাতেই খাবার টেবিলে বসে বন্ধু রশীদ খাঁ কে বললাম  ‘রশীদ তোমার ইতিহাসের ঝুলিটা একটু ঝাড়ো , পাখতূনিস্থানের গল্প শুনতে আমার বেশ ভাল লাগে।’

খাঁ সাহেব স্কচের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আমাদের দেশের গল্প তো শুধু যুদ্ধ আর যুদ্ধ , বলে শেষ করা যায় না তবে যদি তোমার শুনতে ভাল লাগে তাহলে সংক্ষেপে বলে যাব যখনই সময় ও সুবিধা পাব।  ১৮৪৯ সাল থেকে ১৮৫২ সাল পর্যন্ত অনেক জায়গাতেই পাখতূনরা রুখে দাঁড়িয়েছিল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে । এই থাল অঞ্চলেই ১৮৫১ সালে যুদ্ধ হয়েছিল পাখতূন ও ইংরাজের মধ্যে যার উল্লেখ একদিন করেছি, সে যুদ্ধে ইংরাজ উপজাতীয় লশকরকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিল যদিও, তবু যাকে বলে ডিসাইসিভ ব্যাটল তা হয়নি।

timemachoneseemanterontorale2 (Medium)সেই যুদ্ধের পর ইংরাজ ভেবেছিল যে আপাতত পাখতূনিস্থানে ইংরাজকে কোনও উপজাতি আর ঘাঁটাবে না, কিন্তু পাখতূনরা ইংরাজকে নিশ্চিন্ত হতে দিল না। সোয়াত উপত্যকার রানিজাই উপজাতির একটি লশকর একদিন মালাকান্দের কাছে একটি বৃটিশ রক্ষিদলের ওপর হামলা করে তাদের পরাস্ত করল । রক্ষিদলের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হল। রানিজাই এলাকায় কয়েকটা গুরুত্তপূর্ণ জায়গায় ব্রিটিশের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিণামস্বরূপ সে অঞ্চলের পাখতুনদের আক্রোশ দিনদিন পুঞ্জীভূত হয়ে প্রকাশ পেতে আরম্ভ করল ।

উত্তর পাখতূনিস্থানের শানদূর গিরি সংকটের কাছ থেকে বেরিয়ে দক্ষিণে নেমে গিয়ে পেশাওয়ারের প্রায় সত্তর কিলোমিটার উত্তরে পাঁজ কোড়া নদীর সঙ্গে মিলেছে সোয়াত নদী। এই দুই নদীর সঙ্গমের কাছেই মালাকান্দ পাস। রানিজাই উপজাতির গ্রামগুলি ছড়িয়ে আছে এই মালাকান্দ উপত্যকা অঞ্চলে। সংখ্যায় এরা আশপাশের অন্যান্য উপজাতিদের তুলনায় দুর্বল , কিন্তু মনোবলে দুর্বল নয়।

মালাকান্দে বৃটিশ রক্ষিদলের ওপর হামলার খবর পেশাওয়ারে পৌঁছন মাত্রই সত্বর দু হাজার সৈন্যের একটি বৃটিশ বাহিনী গঠন করে পাঠানো হল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্যর ক্যাম্বেল এর অধিনায়কত্বে রানিজাই উপজাতির ঔদ্ধত্বের জবাবে । স্যর ক্যাম্বেলের গোলন্দাজ, পদাতিক ও অশ্বারোহি সৈন্য রানিজাই এলাকায় পৌঁছেই তাদের দুটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম ঘিরে ফেলল। স্যর ক্যাম্বেল উপজাতীয় নেতাদের কাছে চরমবার্তা পাঠিয়ে দাবি জানালেন যে হয় তারা আত্মসমর্পণ করে ব্রিটিশের বশ্যতা স্বীকার করুক আর বৃটিশ রক্ষি দলের ওপর হামলা করার খেসারতস্বরূপ মোটা জরিমানা দিক নয়ত গোটা রানিজাই উপজাতিকে নির্মূল করে দেওয়া হবে।

রানিজাই পাখতূনরা ধারণা করতে পারেনি যে বৃটিশ বাহিনী এত অল্প সময়ের মধ্যে পেশাওয়ার থেকে মালাকান্দ অঞ্চলে পৌঁছে যাবে, তাই তারা কোন বড় রকম যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না । রানিজাই সর্দাররা দেখলেন যে বৃটিশ বাহিনীর কামান গুলি তাদের গ্রাম ধ্বংস করে দিতে পারে নিমেষে। সে অবস্থায় জেনারেল ক্যাম্বেল এর ফৌজ এর মোকাবেলা করার চেষ্টা করলে ইংরাজ বাহিনীর অতি অল্পই ক্ষতি হবে, কিন্তু রানিজাই উপজাতি তাদের শিশু ও স্ত্রীলোক সমেত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সর্দার স্যর ক্যাম্বেল এর দাবি মেনে নিলেন এই শর্তে যে তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনী রানিজাই অঞ্চল থেকে অচিরে অপসারণ করবেন আর জরিমানা আদায়ের জন্য কিছু সময় দেবেন। স্যর ক্যাম্বেল সে প্রস্তাবে খুশি হলেন কারণ বিনা যুদ্ধেই রানিজাই উপজাতিকে পদানত করতে পারলেন তিনি।