টাইম মেশিন ভারতভ্রমণ দীন মহম্মদ অনুঃ শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষা ২০১৬

ভারত ভ্রমণ আগের পর্বগুলো একত্রে

পত্র ২৩

জানেন তো, হিন্দুস্থানে মূল গ্রামীণ ক্রীড়া হল শিকারখেলা আর বাজ ওড়ানো। এরা পারস্যদেশ থেকে বাজ ও অন্যান্য শিকারী পাখি কেনে আর তাদের তালিম দিয়ে খেলার জন্য তৈরি করে তোলে। সুবাদার এবং দেশের গণ্যমান্যরা বন্য জন্তু-জানোয়ারের লড়াই বেশ পছন্দ করেন। যেমন, কখনো হাতির লড়াই, পিঠে মাহুত সওয়ার। বাঁশের বেড়া দেওয়া বেশ বড়সড়ো একটা ঘেরা জায়গা, তার চারপাশ ঘিরে দর্শক। আর প্রাণীদুটি ভীষণ মূর্তিতে একে অন্যেকে আক্রমণ করছে; কখনো কখনো লড়াই জারি থাকে টানা কয়েক ঘন্টা। যতক্ষণ না মাহুতসহ কোন না কোন হাতি মারা পড়ে অথবা পঙ্গু হয়ে পড়ে। আবার মোষের সাথে সাধারণত বাঘকে লড়িয়ে দেওয়া হয়, এবং যদিও দ্বিতীয়টিই বেশি হিংস্র, তবু প্রায়শই এই চারপেয়ে প্রতিপক্ষের কাছে তাকে হারতেও হয়। এরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে, জানোয়ারের সাথে জানোয়ার, জানোয়ারের সাথে মানুষের লড়াই। প্রাণ হাতে করে তারা এই বিপজ্জনক খেলায় অংশ নেয়।

এখানকার সাধারণ মানুষদের অবশ্য সামান্য আয়োজনেই তুষ্টি, যেরকম বিখ্যাত এক কবি, গোল্ডস্মিথ (অলিভার গোল্ডস্মিথ – আইরিশ কবিঃ- অনুবাদক), বলেছেন না, তাঁর এডউইন আর অ্যাঞ্জেলিনা বইতে, “মানুষ চায় কিন্তু আছে তো সামান্য, আবার চাহিদাও তত নেই।”

পথিক ভ্রমণকারীদের সাহায্য খিদমত করে, খানিক তামাক সেজে, লোকজন যৎসামান্য হলেও সেভাবেও কিছু আয় করে। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে খোলাখুলি মেলামেশা খাওয়াদাওয়া সবই চলে।

বিলগ্রাম থেকে ষাট কিলোমিটার দূরে মানিকপুর। সেখানে দিল্লি, আওধ (অযোধ্যা) থেকে শুরু করে আশপাশের বহু রাজ্য থেকে আসা ফকিরদের আখড়া। ভক্ত লোকেরা এখানে এসে এদের দানধ্যান করেন। এটা একটা ধর্মীয় মানবিক প্রথা। বিশ্বাস করা হয় এই ফকিরদের মাধ্যমেই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছনো গেল। মনে করা হয় এই সন্ত ফকিরেরাই ঈশ্বরের একান্ত সেবক।

ফকিরদের প্রার্থনাতেই ভগবানের আশীর্বাদ, দোয়া মেলে, বিপদ আপদ কেটে যায়। এমনই সব বিশ্বাস চলে আসছে। সাধনার কঠিন পথে এঁদের গমনাগমন আর তা থেকেই সন্ত ফকিরের মর্যাদা লাভ। সে পথ মূলত কৃচ্ছসাধনের পথ, নিজের ওপর শারীরিক নিগ্রহের এক চরম অভ্যাসের পথ। কেউ বঁড়শি বিঁধিয়ে রাখেন চামড়ায়, কেউ ছুরি বিঁধিয়ে রাখেন হাতে, কেউ হয়ত হাতে গনগনে আগুন নিয়ে চললেন, অথবা কাঁটাওয়ালা চটি পড়ে রইলেন। অনেকেই আছেন মুন্ডুটাই ঘুরিয়ে থাকলেন দিনের পর দিন, তারপর মাথাটা ঘাড়ের ওপর অমন ঘুরেই রইল, পেছন দিকে চেয়ে। একদল আবার এমন অভ্যাস করেন যে হাতের মুঠি শক্ত করে রইলেন দিনের পর দিন মাসের পর মাস যাতে করে নখ বেড়ে হাত ফুঁড়ে অন্যপাশ দিয়ে উঠল। কেউ কেউ মৌন থাকেন, কথা না বলে থাকা দিনের পর দিন, অথবা দৃষ্টি নিজের নাকের দিকে লক্ষে স্থির, চোখের দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরানোর ক্ষমতাটাই হয়ত চলে গেল এই করে। এই শেষ দলভুক্ত যারা, তাঁরা মনে করেন যে তাঁরা পবিত্র অগ্নিকে প্রত্যক্ষ করেছেন। এ সমস্ত অস্বস্তিজনক ঘটনা ভাল লাগবে না, অদ্ভুত মনে হবে হয়ত, কিন্তু পবিত্র মন ও একাগ্র লক্ষ নিয়ে এই ঘটনাগুলিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে দেবতার কাছে প্রতিস্পর্ধা মনে হবে না। বরং লোভ-লালসার চেয়ে সেটাই শ্রেয়। জীবনের নানান রং রূপ রস উপভোগ থেকে মানুষ বঞ্চিত থাকবে সাধারণ লোকে তেমন ভাবে না ঠিকই, এমনটা উদ্দেশ্যও নয় তবে কেবলমাত্র এই আরাম বিলাস আনন্দেই মজে থাকলে পরলোকের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা করা হয় বলেই ভাবা হয়। আর তার ফলও পাওয়া যায় হাতেনাতে। লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। পাপী মানুষের অকালমৃত্যু। কিন্তু যারা এই সাময়িক সুখ ত্যাগ করে চিরসুখের আকাঙ্ক্ষা করেন, ঈশ্বরের অসীম করুণা পাবেন বলে সাময়িক পীড়ণ সহ্য করেন। সকলজীবের স্রষ্টা সর্বশক্তিমানের প্রতি যিনি তার মনপ্রাণ সঁপে রাখেন, ইহকালের মায়া ত্যাগ করে শেষ বিচারের দিনে তিনি পুরস্কৃতই হন।

বিলগ্রাম থেকে বেরিয়ে পড়ার আগেই নবাব আসফ-উদ-দৌলার পায়ের ধুলো পড়ল। সঙ্গে এলেন তাঁর ব্যক্তিগত সহায়ক জেনারেল স্টিবার্ট, আর উচ্চপদস্থ অন্য অফিসারেরা। নবাব তার নিজস্ব চালে সভাসদদের সাথে হাওদা-ওয়ালা, সুসজ্জিত হাতির পিঠে চেপে, অগণিত পাইক বরকন্দাজ চোপদার আর বাজনদারের দলের শোভাযাত্রা করে এসে উপস্থিত হলেন। এ সত্যিই বর্ণনা করা কঠিন, বরং সঙ্গের ছবিটাতে আরো ভালো বুঝতে পারবেন।

নাকাড়া বাজিয়ে বিলগ্রামে নবাবের আগমন ঘোষিত হল। তোপধ্বনি করা হল, সামরিক সম্মাননা যেভাবে দেয় আর কী। সেনাধ্যক্ষদের সাথে খাওয়াদাওয়া সেরে নবাব তাঁর জন্য নির্দিষ্ট তাঁবুতে বিশ্রাম নিতে গেলেন। বাহারি সাজানো সেই তাঁবু প্রায় এক একর জায়গা জুড়ে খাটানো। তার চারপাশে খাতির খিদমতের জন্য কাজের লোকেদের জন্য আরও নানান তাঁবু ফেলা হয়েছিল।

timemachinedinmohammed (Medium)

নবাব যেদিন এলেন তার পরদিন আমাদের সর্বাধিনায়ক তাঁর অধস্তনদের আদেশ দিলেন সেনা পরিদর্শনের  জন্য তৈরি থাকতে। সেইমতো এক রেজিমেন্ট ইউরোপিয়ান সৈন্য, ছয় কোম্পানি দেশীয় সিপাহি, দু কম্পানি গোলন্দাজবাহিনী, আর একদল পদাতিক বাহিনী, সব মিলিয়ে সাতশ সেনা বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সাতসকালেই টানটান প্রস্তুত হয়ে রইল। সর্বাধিনায়কের সাথে নবাব হাতির পিঠে পরিদর্শনে এলেন। খানিক বাদে ওই বিশাল হাতিটার পিঠ থেকে নেমে নবাব একটা সুন্দর আরবি ঘোড়ায় চেপে বসলেন। এবং ওতে চেপেই সেনা অফিসারদের অভিবাদন গ্রহণ করলেন।

কর্নেল আয়রনসাইড গোটা সৈন্যদলকে এভাবে সাজিয়েছিলেনঃ ডান দিকে এবং বাঁদিকে একেবারে ধারে ঘোড়সওয়ার দল। তিন রেজিমেন্ট করে দেশীয় সেপাইরা ঠিক তাদের গায়ে গায়েই, ভেতরের দিকে। ইউরোপিয় বাহিনী একদম মধ্যবর্তী স্থানে। প্রথমে গোটা বাহিনীরই একসাথে পরিদর্শন হল। তারপর যে যার নিজস্ব দলে ভাগ ভাগ হয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ ভাবে ও নানান কুশলতায়  কসরৎ কুচকাওয়াজ করলে। পরিচালক, সর্বাধিনায়ক, অফিসারেরা, দর্শক এমনকী বিশেষত নবাব আসফ-উদ-দৌলাও যারপরনাই খুশি হলেন। এই সম্মান প্রদর্শনে নবাব তাঁর ভেতরের আনন্দ বেশ খোলাখুলিই জানালেন।

পরিদর্শনের শেষে নবাবের সম্মানে প্রাতরাশের আয়োজন করা হয়েছিল।  আর এসময় গোলন্দাজেরা ক্রমাগত তোপধ্বনির মাধ্যমে তাঁকে সম্মান জানাচ্ছিলেন। সাধারণত নবাবের খাবার তার নিজস্ব ভৃত্যেরাই পরিবেশন করত, কেননা বিধর্মীদের হাত থেকে তিনি কিছুই খেতেন না। ধর্মীয় রীতি মেনেই এটা করতে হত। যদিও এক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট সৌজন্য দেখিয়ে আমাদের অফিসারদের সঙ্গে অন্তত এক টেবিলে খেতে বসতেন। কিছুদিন ক্যাম্পে কাটিয়ে নবাব তাঁর রাজ্যে ফিরে গেলেন।

পত্র ২৪

কলকাতা যাবার আদেশ এসে যেতেই আমরা বিলগ্রাম ছাড়লাম। ওখানে সৈন্যবাহিনী রাখার আর দরকারও ছিল না। এদিকে সে সময়ে দিল্লির সাথে কম্পানির সুসম্পর্ক চলার দরুণ, সেনাছাউনিগুলিকেও ধুলিসাৎ করে দেওয়া গেল। একেবারে যাকে বলে শেষ নিশানটুকুও মুছে ফেলা হল।

ফিরতি পথে ওলন্দাজ, ড্যানিশ ফরাসি ইত্যাদিদের কারখানাসমূহ পেরিয়ে এলাম, আর যেগুলি এককালে পর্তুগিজদের অধীনে ছিল, সেগুলিরও কলেবর কমেছে আর ক্রমে এখন বেশিরভাগই ইংরেজদের দখলে এসেছে। ধীরে ধীরে আমাদের গোটা পল্টন এসে ফোর্ট উইলিয়াম পৌঁছলো, সেটা ১৭৭৮ সাল। আর এখানকার বাহিনী রওনা হয়ে গেল দেনাপুরের দিকে।

ফোর্ট উইলিয়ামের পনেরো মাইল দূরে ড্যানিশদের একটা উপনিবেশ আছে, নাম শ্রীরামপুর। সুতির জিনিস তৈরি হয় এখানে, বিশেষ করে বাফেতি, মোটা সুতিকাপড় (ক্যালিকো), রঙীন-ছাপা সুতিকাপড়, টেবিলঢাকা, ন্যাপকিন প্রভৃতি।

লোকেদের বাসস্থানগুলি খুব পরিচ্ছন্ন। নদীর পাড়ে গোলন্দাজ বাহিনীর ছোটো ছাউনি, মাঝে লাটসাহেবের প্রাসাদ, তার মাথায় ড্যানিশ পতাকা উড়ছে। কিছুদূরেই চুঁচুড়া, ওলন্দাজদের উপনিবেশ, একইরকম ব্যবসাবাণিজ্য চলে এখানেও। আরো খানিকদূরে ইংরেজ ও ফরাসিদের বহু বাদানুবাদের সাক্ষী, ফরাসডাঙা, চন্দননগর -এখন ইংরেজদেরই মালিকানাধীন। পশ্চিমে শত্রুপক্ষের দিক, যদিও সেদিকে দেওয়ালঘেরা, এবং ক্ষেত্রবিশেষে তা বেশ সুরক্ষিত।  এখানে রুমাল এবং মসলিন তৈরি হয় এবং এলাকাটা ব্যবসা বাণিজ্যের বেশ ব্যস্ত অঞ্চল। ফরাসডাঙার কাছেই শ্রীরামপুরের দিকে গৌরহাটি। মঁসিয়ে শেভালিয়েঁর হুকুমদারীতেই ছিল জায়গাটা, এখন ইংরেজদের দখলে। লাটের বাসস্থান, গৌরহাটি প্যালেস, সে এক মনোহর অট্টালিকা। গঙ্গার পাড়ে এমন স্থাপত্যকলা চেয়ে দেখবার মতো; ভেতর দিকটাও অননুকরণীয় সৌন্দর্যে সাজানো। কারুকাজকরা সাটিনের পাড়ে মোড়া আসবাবপত্র,, লাল টকটকে সাটিনের পর্দায় ঢাকা জানালা। এমন অসামান্য প্রাসাদে ঢোকার রাস্তাটির দুপাশে গাছের সারি, ছায়ায় ঢাকা। ফুলবাগানের খুশবু, সে তো বলাই বাহুল্য, বাতাসে তার সৌরভ আবিষ্ট করে রাখে। পুকুর ভরা মাছ, ঝরনা, গাছ-গাছালি চারপাশের মনোহারি  দৃশ্য। বাগিচার এখানে ওখানে দুধ-সাদা মার্বেল-পাথরের মূর্তি। শিল্পিদের হাতের ছোঁয়ায় পাথরের টুকরো যেন প্রাণ পেয়েছে। এর মধ্যেই একটা অপেরা হাউসও আছে, আমোদ-প্রমোদের জন্য। লাটপ্রাসাদের দরজায় রক্ষী মোতায়েন।

কলকাতা থেকে ৫০ মাইল দূরে হুগলি শহর। বেশ শক্তপোক্ত দুর্গ আছে সেখানে, চারপাশে পরিখা কাটা। ব্যস্ত বাণিজ্যপথেই পড়ে জায়গাটা। বিশেষত আফিম আর আফিমজাত দ্রব্য, আসে মূলত পাটনা থেকে। জিনিসটার খারাপ প্রভাবের কথা তো ছেড়েই দিন, ওলন্দাজদের লোভ এত বেশি, যে ভারতের যেখানে একটু জমি পেয়েছে আফিমের চাষ করতে শুরু করেছে। অন্যদিকে চীনে, এই ক্ষতিকারক প্রভাবের জন্য আফিমচাষ করলেই মৃত্যুদন্ড। এমনকী কেউ এর বেচাকেনা করলে সে বাড়িরও ধ্বংস অনিবার্য। এখানে হিন্দু মুসলমান উচু নীচু নির্বিশেষে আফিমসেবন চলে। নীচুতলার লোকেরা কঠিন অবস্থার স্মমুখীন হবার সময় আফিম নেয় যাতে বিপদের কথা, কষ্টের কথা ভুলে থাকতে পারে, আর ধনী উঁচু জাতের লোকেরা সেবন করে স্রেফ মজা করার জন্য, চূড়ান্ত আহ্লাদের জন্য। এর প্রভাব অবশ্য সেবনের রকমভেদে আলাদা আলাদা। কাঁচা আফিম তৈরি হয় পোস্ত থেকে, গাছের মূলগুলো মানুষের হাতের আঙুলের মতো মোটা মোটা হয়। গাছের রস তেতো আর ফুলগুলি গোলাপের মতোই দেখতে। নরম কান্ডের গা, দুহাতের বেশি লম্বা নয়। পাতাগুলো অনেকটা লেটুসপাতার ধরনে। লম্বাটে, সরু, ঢেউখেলানো আর ঘনসবুজ। রসে টসটসে হয়ে এলে, বাইরের দিকে সামান্য চিরে দিলেই, ঘন সাদা দুধের মতো একটা তরল বার হয়ে আসে। ফোঁটা ফোঁটা ক্রমশ জমে ওঠে। এগুলো দুধ মধুতে চুবিয়ে নরম করে নিলে পিচের মতো আঠালো মিশ্রন তৈরি হয়। এই আঠাটাই শুকিয়ে খন্ড খন্ড করে নিলেই আফিম তৈরি।  ভালো জাতের আফিম মানে নরম এবং দামী। পাটনা থেকে সবচেয়ে ভালো জাতেরটাই বাজারে পাঠানো হয়। ভারতের অন্যন্য জায়গায় মহার্ঘ্য হলেও, পাটনাতে বেশ কমদামেই ও জিনিসখানা সারাবছরই পাওয়া যায়। আফিমের মধ্যে এমন বিপরীতধর্মী গুণাগুণ –যে এই মগজ চিন্তাশূন্য করে দিল তো এই আবার মাথায় অদ্ভুত সব ভাবনার উদয়। এই ঝিম ধরল, তো এই চরম সজাগ। তবে হ্যাঁ, বেশি যদি কেউ আফিম নিয়মিত নেয়, পাগল তো সে হবেই এমনকী মৃত্যুও হতে পারে।

ক্রমশ

ছবি মূল পুস্তক