টাইম মেশিন–ভারতভ্রমণ- দীন মহম্মদ -অনুঃ শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়

পত্র ১৯

কয়েকদিন বেনারসে কাটিয়ে সেনাবাহিনীকে বেশ চাঙ্গা করে বিলগ্রামের দিকে রওনা হলাম। যাত্রাপথ সত্যিই চমৎকার, যেন পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর জায়গা। সবুজ ধানক্ষেত, আখের চাষ করা জমি, কত ফল ও ফুলের বাগান দেখলাম যেতে যেতে যে বলার অপেক্ষা রাখে না।

ঝুসিতে এসে শিবির পাতা হল। এখানেও এক মস্তো দুর্গ। উল্টোদিকেই এলাহাবাদ; স্থানাঙ্ক অনুযায়ী দিল্লির ৪১২ মাইল দক্ষিণে, কলকাতা থেকে ৫৪০ মাইল দূরে আর গঙ্গার মোহনা থেকে পাক্কা ৮৫০ মাইল। গঙ্গা যমুনার মাঝামাঝি এ জায়গাটা ভারি মনোরম। দুর্গের ভেতর রাজপ্রাসাদ। মোগলদের থাকার ব্যবস্থা, দরবার আর জেনানা মহল। সভাসদ আর তাদের পরিবারেরা এখানকার বাড়িগুলিতে আছেন। প্রতিটি বাড়ির দুটি মহল একত্রে জোড়া আর গোল পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। উদ্দেশ্য বাড়ির মেয়েদের শুধু প্রতিবেশীদের থেকেই পর্দানশীন করে রাখা, তাইই নয়, বাড়ির চাকরদের থেকেও আড়াল বজায় রাখা। মহলের ভেতর ঘরগুলি যথেষ্ট বড়ো ও বিলাসবহুল এবং নদীর দিকে মুখ করা। এর সঙ্গেই লাগোয়া ছোটো ঘরগুলি ঘুপচি ও অন্ধকার; আলো হাওয়া প্রবেশের জায়গা প্রায় নেই বললেই চলে। দিনের বেলা গরমে এই ঘরে বিশ্রাম নেয়া চলে, দিবানিদ্রারও ব্যাঘাত ঘটে না। অভিজ্ঞতা থেকে দেশীয় মানুষেরা জেনেছে গরমের হাত থেকে নিস্তার পেতে হলে আলো হাওয়া বর্জিত কোনো জায়গা বানাতে হবে।, অন্তত গনগনে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। ছাতে ওঠার জন্য রয়েছে সরু খাড়াই সিঁড়ি। ভালয় ভালয় দিন কাটলে সেখানেই সন্ধায় হাওয়া খাওয়ার আদর্শ জায়গা।

timemachinedin01 (Medium)এলাহাবাদের দুর্গ পুরোটাই পাথরের তৈরি। গঙ্গা-তীর থেকে খানিক দূরের পাহাড় কেটে সেসব পাথর  বেশ খরচ করেই নিয়ে আসা। এগুলো পোর্টল্যান্ডের পাথরের মতোই তবে একটু মোটা দানার আর বেশি ফাঁপা শুধু দেয়াল নয়, দুর্গের মেঝে, ছাদ আর থামগুলোও ওই পাথরের তৈরি। চওড়া উঠোন, যাতায়াতের রাস্তাতেও এই পাথর বসানো। কাচ, লোহা বা ইঁট বা বাড়ি তৈরির অন্যান্য কোনোকিছুরই ব্যবহার হয়নি এখানে। সেটা অবশ্য দুর্গের অধিকার ইংরেজদের দখলে আসা পর্যন্ত। একটা সামান্য দেয়ালও, এখানে, অন্তত পাঁচ ফুট পুরু। ভারতীয় কায়দায় বানানো বেশকিছু দেখার মতো ছিমছাম বাড়িও রয়েছে এর ভেতর। তবে সবচেয়ে উল্লেখ্য দুর্গের বিশাল তোরণগুলি। এদের চেয়ে আকর্ষক, সুন্দর ও দর্শনীয় আর কিছুই নেই। একমাত্র তুলনীয় কিছু থাকলে তা প্রাচীন রোমের বিজয়তোরণ। 

এলাহাবাদ জায়গাটি বাসস্থান ও আবহাওয়ার নিরিখে দিব্যি। বর্ষা কেটে গেলে আকাশে আর ছিটেফোঁটাও মেঘ নেই। মেঘমুক্ত নীল আকাশ। দমকা বাতাস সূর্যের প্রখর তাপ থেকে মাঝে মাঝে স্বস্তি এনে দেয়। গরমের দাবদাহের মধ্যে স্বস্তির শ্বাস। গাছপালা এত দ্রুত বাড়ে যে খালি চোখেই আন্দাজ পাওয়া যায়। এই ধরা যাক একসপ্তাহ আগে ফাঁকা জমি দেখলেন, ধূ ধূ, একটুকরো বালির চরা মতো, ভগবানের অশেষ করুণায় খুব দ্রুতই ভরে উঠল সবুজে। পুরো এলাকাটার ভোলবদল ঘটে গেছে যেন। এমনকি জলা জংলি জায়গাগুলোও সোনালি ফসলে ভরে উঠেছে; জলবায়ুর আনুকূল্যে প্রকৃতিও অকৃপণ হাতে ভরিয়ে দিয়েছে মাঠঘাট সহ গোটা জায়গাটাই। ধান গম সরষে বিন শুঁটি প্রভূত পরিমাণে হয় এখানে। এছাড়া হয় জোয়ার, অনেকটা ইউরোপের ওটের মতো। এ মাটিতে নীলচাষও হয়। গাছগুলো গোলাপের মতো উচ্চতার। এর চেয়ে বেশি নয়। আর এর পাতাগুলো ছিঁড়ে নিয়ে জলে চুবিয়ে তা থেকে নীল বের করা হয়। পাতা ভালোমতো ভিজিয়ে জল ফেলে দিয়ে বাকি অধঃক্ষেপ রোদে শুকিয়ে নিলেই গুঁড়ো নীল প্রস্তুত। বাগানগুলোতে নানান ফুলের চাষ। গন্ধ না থাক দর্শনসুখের তো বটেই। গন্ধের জন্য গোলাপ কিম্বা জুঁইয়ের মতো সাদা সাদা ফুল ছেড়ে কোনো কথা চলে না।  ফলের মধ্যে আম পেয়ারা ডালিম আনারস তরমুজ পাতিলেবু কমলালেবু পাওয়া যায়;আপনা হতেই জন্মায় এসব ফলের গাছ আর তাদের ফলনও বেশ ভালো। হলুদ আর আদাও জন্মায়, যার মধ্যে এখানকার আদা হল সর্বোৎকৃষ্ট। এর জুড়ি মেলা ভার।

পত্র ২০

এলাহাবাদ ছেড়ে এগোনো গেল। সে যাত্রাও গঙ্গার পাড়ে মেহেন্দিঘাট অবধি বেশ ভালোই ছিল; সেখানে এসেই এক প্রচন্ড ঝড়ের সম্মুখীন হলাম। বজ্রপাত শিলাবৃষ্টি কিছুই বাদ গেল না। তিনদিন চলল সেই দুর্যোগ। মানুষ আর গবাদিপশুগুলি একেবারে নাকাল হয়ে পড়ল। ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি সামলে, সব সারিয়ে তুলতে এক সপ্তাহ এখানে রয়ে গেলাম। তারপর নদী পেরিয়ে অপরদিকে বিলগ্রাম পৌঁছলাম। ১৭৭৬ সাল। বিলগ্রামে শিবির তৈরি হল। কাছেই গ্রাম, দুই মাইলটাক হবে, যার নামে গোটা এলাকার নাম। আমাদের আসার মাসদুয়েক পর ফৌজদার মাহবুব আলি খান এবং খাজা বসন্ত আলি খান, দুজনের সাথেই মতদ্বৈততার ফলে, তাদের শায়েস্তা করার উদ্দেশে, নবাব আসফ উদ দৌলা  (লখনউ থেকে) নিজের বাহিনী নিয়ে রওনা হলেন। ফৌজদার ও খাজা দুজনেই নবাবকে খাজনা দিতে অস্বীকার করেছিলেন। এই ফাঁকে রওনা হবার আগেই তিনি জেনারেল স্টিবার্টকে আসন্ন অভিযানের কথা লিখে, সাহায্য প্রার্থনা করে, বার্তা পাঠিয়ে রেখেছিলেন। স্টিবার্ট ছিলেন আমাদের কমান্ডার, সর্বাধিনায়ক। আসফ উদ দৌলার কথা শুনেই কর্নেল পার্কারের নেতৃত্বে দুই রেজিমেন্ট সৈন্য পাঠানোর হুকুম হল। আদেশ হল বিলগ্রাম থেকে ৮০ মাইল দূরে কোরা বলে একটা জায়গায় যাবার। যাতে নবাবের সামরিক শক্তিবৃদ্ধি করা যায়। এবং পথেই নবাবের সৈন্যদের সাথে মিলিত হওয়া যায়।

নবাবের সৈন্যদল সঙ্গে সামান্য কিছু কামান নিয়ে এগোচ্ছিল। মাহবুব, চর মারফত আমাদের সৈন্যদলের খবর পেয়ে কর্নেল পার্কারের সঙ্গে দেখা করার প্রার্থনা জানিয়ে তার পার্ষদ পাঠালেন। যুদ্ধের বিভীষিকা এড়িয়ে যদি সমাধান আসে এই ভেবে কর্নেল রাজিও হলেন। ফল, বৈঠক সফল, দুতরফেই। পরদিন আমাদের সেনা অফিসারদের মাহবুব আমন্ত্রণ করলেন, নৈশভোজে। অথচ গোপনে গোপনে আচমকা হামলার জন্য প্রস্তুতিও নিয়ে রাখলেন। শুধু তাইই নয়, অতিথিদের খাবারদাবারেও বিষ মিশিয়ে রাখলেন। বিশ্বাসঘাতক অতিথির এমন কূটিল ষড়যন্ত্রের কিছুই টের না পেয়ে আমাদের লোকেরা খুশিমনেই আতিথ্যগ্রহণ করতে চলেছিলেন। অবধারিতভাবে সেদিন তারা নৈশভোজ আসরেই বেঘোরে মারা পড়তেন, যদি না মাহবুবের কাজের লোকেদের মধ্যে একজন, সুবুদ্ধি ফেরার ফলে, এসব গোপন খবর ফাঁস করে দিত; যদি না জানিয়ে দিত এই আতিথেয়তার আড়ালে অতর্কিতে, তাদের অনুপস্থিতিতে, মূল শিবিরে হামলার ব্যবস্থাও পাকা।  কর্নেল, ক্যাপটেন গ্রেভলি এবং অন্যান্য অফিসারেরা এই ষড়যন্ত্র টের পেয়েই তক্ষুণি শিবিরে ফেরৎ গেলেন এবং শিবিরের বেশ খানিকটা আগেই টের পেলেন মাহবুবের লোকজন সার বেঁধে হামলার জন্য চলেছে। আমাদের সৈন্যরাও এ খবর পেয়েই মুহূর্তের মধ্যে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত হল আর শত্রুর দল কাছাকাছি হতে প্রথমেই প্রবল বিক্রমে আক্রমণ করল। এতে করে হামলাকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তারা ভেবে এসেছিল সহজেই প্রতিরোধহীন যুদ্ধজয় করা যাবে, অথচ আক্রমণের মুখে পড়ে যারপরনাই নাজেহাল হয়ে পড়ল আর দলে দলে দিগ্বিদিকে পালাতে শুরু করল। ফলে খুব শিগগিরই শত্রু সৈন্যদের দল পেছু হটল। খাজা বসন্ত যুদ্ধের মাঝেই পালাল। মাহবুব খানকে ধরে বন্দি করা হল। এবং তাকে লখনউতে আসফ আলির কাছে পাঠানো হল। সেখানে তার বিশ্বাসঘাতকতার জন্য উপযুক্ত শাস্তি পেল সে।

আমাদের  সৈন্যও কিছু মারা পড়েছিল। ক্যাপ্টেন গ্রেভলি, যুদ্ধক্ষেত্রে অসামান্য শৌর্য ও পরাক্রম দেখিয়েছিলেন। সাধারণ জীবনে যতটা ক্ষিপ্র যুদ্ধেও তেমনই চমকপ্রদ ক্ষিপ্রতার পরিচয় রেখেছিলেন। যাই হোক যুদ্ধক্ষেত্রে গ্রেভলি মারাত্মক আহতও হয়েছিলেন। এর কিছুমাস পর কর্নেল পার্কার ও তার অধীনস্থ দুই রেজিমেন্ট সেপাই বিলগ্রামে ফিরে যাবার পর ওই আঘাতজনিত কারণেই তিনি মারা যান।  তাঁর সহযোগী অফিসারেরা সত্যিই ব্যথিত হয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুতে। সহযোগী অফিসার এবং তাঁর দলের সৈন্যরা চোখের জলে বিদায় জানাল তাদের ক্যাপ্টেনকে। উপযুক্ত সামরিক কায়দায় তাঁকে সমাহিত করা হল। তার বিধবা স্ত্রী তাঁর স্মরণে কুচকাওয়াজের মাঠের পাশেই একটি সুন্দর সমাধিসৌধ স্থাপন করলেন।

timemachonedin02 (Medium)মাহবুব খানকে পাঠানো হল যেখানে, সেটা লখনউ, একটা বেশ জমজমাট বাণিজ্য-নগরী, আর মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র। মানুষজন বিলাসী ও ব্যবসায়ী মনোভাবাপন্ন। নবাব আসফ উদ দৌলা অন্যান্য গণ্যমান্যদের সঙ্গে প্রায়শ এখানেই থাকেন। এবং যথেষ্ট বিলাসব্যসন ও বৈভবের সঙ্গে। নাচ গান কিছুই বাকি থাকে না। লক্ষ্ণৌ শহরে বেশ কিছু উৎকৃষ্ট বাড়ি আছে যেগুলিতে ব্যবসায়ীরা ও কারখানার পরিচালকেরা [ফ্যাকটরঃ স্কটল্যান্ডে প্রচলিত অর্থে স্কটিশ এস্টেটের দেখভালকারীঃ অনুবাদক] থাকেন। চীনেমাটি বা পোর্সেলিন ও মাটির জিনিসের জন্য তো বটেই তাঁতশিল্পের কারণেও লক্ষ্ণৌ কম বিখ্যাত নয়।

নবাবের নিজস্ব একটি সেনাবাহিনীও আছে। যাদের বলে বরকন্দাজ। সেপাইদের মতো নির্দিষ্ট উর্দিধারী না। তাদের অস্ত্র গাদাবন্দুক, তীরধনুক, বল্লম, ছোরা, তরোয়াল আর ঢাল।

পত্র ২১

লখনউয়ের খানিক দূরেই আওধ [অনুবাদকঃ অযোধ্যা বা ফৈজাবাদ] । জায়গাটা ভ্রমণের জন্য আদর্শ, এখানেই সুজা উদ দৌলার সমাধি। সমাধিসৌধে প্রতিরাতে বাতি জ্বালানো হয় এবং কারুকাজকরা মসলিন কাপড়ে সমাধিস্থল ঢেকে দেওয়া হয়। সৌধটি থাম লাগানো গম্বুজাকৃতি; চার কোনে চারটি রুপোর জালা, যাতে জল ভরে রাখা। এমন ভাবনা থেকে কাজটা করা, যে, সুজা উদ দৌলা যদি কোনো রাতে উঠে স্নানের প্রয়োজন বোধ করেন! মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের প্রচলিত বিশ্বাস, বেহেস্তে যাবার আগে এমন শুদ্ধিকরণ স্নানের প্রয়োজন আছে।

এই শহরের উন্নতির পেছনে সুজা উদ দৌলার বিরাট অবদান আছে। তার রাজত্বকালেই এ শহরের এবং আশপাশের অঞ্চলের প্রভূত শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল। যেন গোটা শহরটাই একটিই বিস্তৃত বাগানের অংশ। অবধে তার প্রাসাদ যথেষ্ট প্রাচীন কিন্তু সাধারণ আটপৌরে বড়োসড়ো অট্টালিকা মাত্র। এখনও প্রাচীনত্বের সৌন্দর্য নিয়ে অবিকৃতভাবে চমৎকার দাঁড়িয়ে আছে। শহরের মধ্যে বনানী আর বিস্তৃত বাগিচার অভাব নেই, স্থানীয়রা বলেন চরাগাহ (পশুচারণভূমিঃঅনুবাদক)। এখানে অবসর সময়ের বেশিরভাগই নবাব অতিবাহিত করতেন দাবা খেলে বা ঘোড়ায় চড়ে। তাঁর পুকুরে হরেকরকম সব মাছ পোষা হত, স্বদেশী বিদেশি দুরকমই। পাখনায়, লেজে সোনার আংটা পরানো হত। সান্ধ্যপ্রমোদের সময় প্রায়শই তিনি তাদের খাওয়াতেন, মাছেরা জল থেকে লাফ দিয়ে উঠে তাঁর হাতের দানা খেত; কৌতূহলী মানুষ ছিলেন, ভালোও বাসতেন এসব কান্ডকারখানা।আশ্চর্য সব শখ ছিল । কর্মচারী রেখেছিলেন, যারা আজব জানোয়ার, বন্য জন্তু, সারা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে এনে দিত। সেসব তিনি লোহার খাঁচায় ভরে সংগ্রহে রাখতেন। এত বিলাসব্যসন ও শখ মেটানোর জন্য তাঁর কোষাগারের রাজস্ব যদিও যথেষ্ট ছিল না। 

সুজা উদ দৌলা মৃত্যুর কিছু আগে রোহিলার নবাব মৌলানা হাফিজ রহমত খান এর কাছে বারংবার দূত পাঠিয়েছিলেন তাঁর অধীনতা মেনে খাজনা দেবার জন্য, কিন্তু প্রতিবারই মৌলানা তার সভাসদদের সাথে পরামর্শ করে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকী বিরোধিতার হুমকি ও প্রত্যাক্রমণের ভয়ও দেখান।

সুজা উদ দৌলা আর দেরি না করে জেনারেল চ্যাম্পিয়নকে গোটা ঘটনা জানিয়ে তাঁরই সাহায্যে রোহিলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ অভিযানে রওনা হলেন। যুদ্ধে বিশাল শত্রুসৈন্যের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। শেষাবধি আমাদেরই, অর্থাৎ কোম্পানির সৈন্যদলেরই জয় ঘোষিত হয়, সেনাবাহিনীর অসামান্য সামরিক দক্ষতার কারণে। কর্নেল উইলিয়াম অ্যান বেলি, গোলন্দাজ বাহিনীর মেজর, এই যুদ্ধে বিশেষ পারদর্শীতা দেখান। শত্রুসৈন্যের একটা বড়ো অংশ নিহত হয়। কিছু পালাতে পারে, বাকিদের ধাওয়া করে ধরে ফেলে বন্দি করা হয়। জেনারেল চ্যাম্পিয়ন বিলগ্রামে সেনার সদর দপ্তরে ফেরত আসেন। সুজা উদ দৌলা এবারে মৌলানা হাফিজের প্রাসাদ আক্রমনের আদেশ দেন এবং সেখানেই মৌলানাকে কোতল করা হয়।  তার সুন্দরী মেয়েটিকে একরকম জোর করেই বন্দিনী হিসেবে অবধে নিয়ে আসা হয়। রাগে, অপমানে প্রতিশোধ নিতে মেয়েটি সুজা উদ দৌলাকে হত্যা করতে চান কিন্তু শেষমেষ অসমর্থ হন। অপমানের গ্লানিতে সেই মহিলা পরবর্তীতে আত্মঘাতী হন।

এদিকে গুরুতর আঘাতের পরও নবাবের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন অচিরেই মৃত্যু ডেকে আনল। তার অনুগামীরা যথেষ্ট আড়ম্বর ও জাঁকজমক করে শেষযাত্রার আয়োজন করল। শোভাযাত্রার সামনে ছিল তাঁর সৈন্যরা আর সভাসদরা। শোকাবহ সংগীত বাজল, সেই যাত্রায়, এবং সমাধিও দেবার সময়েও।  নবাবের মৃত্যুর পর অন্দরমহলের স্ত্রীলোকেরা শোকজ্ঞাপন করার জন্য তাদের সমস্ত অলঙ্কার খুলে রাখল, অন্তত প্রকাশ্যে।

পত্র ২২

timemachinedin03 (Medium)এবার আপনাকে দিল্লি শহরের কথা শোনাব। দিল্লি, গোটা দেশের রাজধানী এবং সাম্রাজ্যের একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে। দিল্লির অবস্থান লন্ডনের ৭৮ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে এবং ২৬ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে। শহরের মাঝ দিয়ে গেছে যমুনা নদী। তার বাঁকের মুখেই দিল্লি শহর। এখন শহরটা তিনটে আলাদা আলাদা বড়সড়ো গঞ্জে বিভক্ত।  আগ্রার ১৩০ মাইল উত্তরে সুন্দর জায়গায়, খাঁটি বাতাসে চমৎকার পরিবেশে গড়ে উঠেছে এই দিল্লি শহর।

দিল্লির প্রথম গঞ্জটিতে নটা দুর্গপ্রাসাদ আর বাহান্নখানা তোরণ। এর থেকে খানিক দূরে একটা পাথরের সেতু। দ্বিতীয় শহরটি একঝলকে খুব সুদৃশ্য আর সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে তোলার মতো। মোঘলদের পূর্বপুরুষদের কেউ ভারতীয়দের কাছ থেকে এই এলাকা দখল করেছিলেন, বহু আগেই। এখানেই পূর্ব যুগের বিখ্যাত নায়কদের প্রচুর সৌধপ্রাকারের ধ্বংসাবশেষ এবং অন্যান্য বহু প্রাসাদেরও ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এগুলি, কথিত, আওরঙ্গজেবের বাবা শাহজাহানই গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়টির কাছাকাছি তৃতীয়টি শহরটি প্রায় এই ধ্বংসস্তূপের ওপরেই গড়ে তোলা। এর নাম ছিল শাহজাহানাবাদ। মুঘলরাই নাম বদল করে রেখেছিল দিল্লি। সহজেই বোঝা যায় অনবরত যুদ্ধ, পাঠান আগ্রাসনের সময়ে হিন্দুস্থানের এক বিরাট অঞ্চলকে এত দুঃখদুর্দশায় ডুবিয়ে রেখেছিল  যে শাহজাহান এ শহর সেই রক্তস্রোতের ওপরেই প্রায় গড়ে তুলেছিলেন।  চারপাশের চমৎকার বাগান শহরটারকে আলাদা মাত্রার সৌন্দর্য এনে দিয়েছে। শহরে ঢোকার রাস্তা, বলাই বাহুল্য, প্রশংসনীয়ভাবে যথেষ্ট চওড়া। দুপাশে দুটি আর্চ। রসদ ও গুদামের প্রয়োজনে। যেখানে ব্যাপারী ও বণিকের দল সারা ভারত থেকে মূল্যবান ও অত্যাশ্চর্য জিনিসপত্র সংগ্রহ করে এনে জড়ো করে। রাস্তা সোজা শাহি প্রাসাদের দিকে গেছে। প্রাসাদের মূল ফাটকে দুটি বিরাট হাতির মূর্তি এবং তাদের পিঠে বসা দুই রাজা।  হিন্দুস্থানের দুই বিখ্যাত রাজা, তাঁদেরই মূর্তি এ দুটি, দুই ভাই, শৌর্য ও বীরত্বের জন্য বিশেষভাবে খ্যাত। আকবরের সৈন্যদলের হাতে এঁদের পরাজয় ও মৃত্যু ঘটে।

প্রাসাদের পরিধি প্রায় দু মাইল। চারপাশে মসৃণ করে কাটা পাথর বসানো উঁচু দেয়াল; কিছু দূরত্ব অন্তর অন্তর রক্ষীমিনার, তাতে রক্ষী মোতায়েন। প্রাসাদের চারপাশেই এমন প্রচুর রক্ষীমিনার। ভেতরে অনেকগুলি বাসস্থান। প্রথমটিই প্রধান রাজপুরুষটির, যেখানে হাতির পিঠে চড়ে প্রায়শই বেড়ান তিনি। সেই সাজসজ্জা আর আভিজাত্য চোখ চেয়ে দেখার। মহলগুলির মাঝখানে একখানা ফাঁকা জায়গা, উঠোন সদৃশ  আর পোর্টিকো। সেখান থেকে রক্ষীদের ঘরে যাওয়া যায় সহজেই। পূর্বদিকে বিচারকক্ষ, পশ্চিমদিকে স্ত্রীমহল। মধ্যিখানে শিল্প ও কারিগরির চরম উৎকর্ষের নিদর্শন হিসেবে একটি ক্যানালকে জলাধারের রূপ দেওয়া হয়েছে। প্রথম বাসস্থান থেকে চওড়া একটি রাস্তা গিয়েছে দ্বিতীয়টির দিকে। এই ভবনে ওমরাহ বা সভাসদেরা নিজেরাই পাহারা দেন; বাদশাহের দরবারে আসার জন্য অপেক্ষা করেন; বর্তমান মুঘল সম্রাট আহমদ শাহ বাদশাহর (দ্বিতীয় শাহ আলমঃ অনুবাদক) জন্য এই অপেক্ষা ও অভিবাদন ওমরাহ অমাত্যদের কাছে বিশেষ সম্মানেরও বটে।

এরপর তৃতীয় বাড়িটাই দেওয়ান মহল। সরাসরি এটাই নজরে আসবে, দেওয়ান ই আম যার পোশাকি নাম; সম্রাট এখানে জনতার দরবারে আসেন। এটা খুবই সুন্দর এবং একটা অসাধারণ প্রাসাদ। দুপাশ খোলা, ওপরে গোলাকার প্রশস্ত ছাত, তিরিশটি শ্বেতপাথরের স্তম্ভ ও খিলানের ওপর দাঁড় করানো। এগুলোর কারিগরি অসামান্য, ফুলকারি আঁকা প্রতিটা স্তম্ভ ও খিলানে। এরই মাঝে দরবার কক্ষ। শ্বেতপাথরের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে সেখানে। একেবারে মাঝখানে দেয়ালের গায়ে কারুকার্যখচিত বাহারি অংশ যেখানে মাননীয় মুঘল বাদশা একটা উজ্জ্বল সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনের গায়ে নানা রকম হিরেমানিক এবং প্রচুর দামি জহরৎ বসানো। 

এই স্থাপত্যের প্রকৃত ইতিহাসে এত অসংখ্য জয়পরাজয়, উত্থানপতন, বিপদ-আপদের কাহিনী জড়িত যে তার কার্যকারণ এবং পরম্পরা খুঁজতে চাওয়া অনর্থক ও অসম্ভব। তবু যদি স্থানীয় মানুষের পুরুষানুক্রমে জানা ঘটনার প্রতি নজর রাখি, জানব যে এই মুঘল সাম্রাজ্য পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম সাম্রাজ্য, এবং মুঘলসম্রাটেরাও ইতিহাসে অনন্য। তাঁদের আদেশ যতই অযৌক্তিক হোক, বিনা বাক্যব্যয়ে পালিত হয়েছে। তাঁদের হুকুম দুরদূরান্তের রাজ্যেও পালিত হয়েছে। তাদের নামই শত্রুর মনে ত্রাসের সঞ্চার করেছে। কিন্তু তা সত্যেও এত দ্রুত তাদের সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে, যে মহান তৈমুরের বংশের আর সেই মান্যতা নেই নিজাম উল মুলকের আমল থেকেই। মুঘল সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব এত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে যে শেষের ক’বছর আদেশের পরিধিটা চাকরবাকরদের মধ্যে এসে ঠেকেছে, প্রজাদের কথা বাদই রাখা যাক। মুঘলদের প্রভুত্ব পুরোনো দিনে পৃথিবীর তাবৎ রাজাদের ওপর ছিল, এখন তা কমে তার হারেম অবধি। সেখানেই সম্রাট বিলাসে আর পানভোজনে ডুবে। উজিরেরা, মুঘল সম্রাটের বদলে, তাদের নিজস্ব মতামত ধ্যানধারনার প্রভাব বিস্তারেই বেশি আগ্রহী। অনেক সময়েই সম্রাটের ক্ষমতার আড়ালে নিজেদের আখের গোছানোই লক্ষ্য হয়ে থাকে। সম্রাটকে না জানিয়েই যুদ্ধ বা সন্ধি ঘোষণা করে। আর তার জায়গিরদাররা, এই সেদিনও যাদের তিনি নিযুক্ত অথবা বিযুক্ত করেছিলেন তাঁর সভার পারিষদ পদে বা পদ থেকে, তারা বশ্যতা অস্বীকার তো করেইছে এমনকি তাদের নিজ নিজ এলাকার উত্তরাধিকার অবধি ঠিক করে ফেলেছে। তাদের এলাকার সুযোগ সুবিধে সম্পদ অন্য প্রদেশের মতোই ইউরোপীয়দের হাতে অথবা যাদের প্রতি তাদের আনুগত্য তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। ওমরাহরা অত্যন্ত অত্যাচারি এবং তাদের এই অবিবেচকের মতো রাজপাট চালানোর ফলে  সমগ্র সাম্রাজ্য হয়তো এখনই বা কদিন বাদে দ্রুত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এই শোষণের ফল হল এই, নগরে মাত্রই কজন উৎপাদনকারী রয়ে গেছেন যারা এই অত্যাচারীদের জন্য যেকোন মূল্যে কাজ করে দেন, এমনকি প্রায়শই তা সঠিক মূল্যমানের বেশ কমেই। এই নির্দয় ও নিরন্তর শোষণ দক্ষ কারিগরদের অন্যত্র চলে যেতে শুধু যে বাধ্য করেছে তাই নয়,  ইয়োরোপীয় কারখানায় উন্নত ও দক্ষ কারিগরেরও জোগান দিয়েছে। অপরদিকে দিল্লির বাসিন্দাদের ক্রয় পরিমাণ কমাতে বাধ্য করেছে কেননা এখন অন্যত্র তৈরি হওয়া মাল এবারে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। অথচ  নিজেদের উৎপাদনকারীদের সাহায্য করলে এমনটা ঘটতই না।

ক্রমশ

ভারতভ্রমণ–আগের সবকটি এপিসোড একত্রে এই লিংকে–>