টাইম মেশিন-সীমান্তের অন্তরালে-সমরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী

থাল ফোর্ট। কর্মমুখর দুর্গের ভিতর সেদিন বিকেলবেলায় হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এল। তারপর সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে বিউগলে লাস্ট পোস্টের বিষাদময় সুর কেঁপে কেঁপে ছড়িয়ে পড়ল দিগন্তে। একটি ছোটো বৃটিশ রক্ষিদল ‘প্রেজেন্ট আর্মস‘ করে শেষ অভিবাদন জানাল চিরনিদ্রায় শায়িত মেজর রলিন্সকে।

পেশওয়ারে ‘উইক এন্ড’ এর অবসর উপভোগ করার পর মেজর রলিন্স এবং তাঁর বন্ধু ইংরাজ লেফটেন্যান্ট ও তাঁর বেয়ারা ফিরছিলেন মোটরগাড়িতে। পেশওয়ার থেকে দু’সারি পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলেছে আফ্রিদি উপজাতি অঞ্চলের দর্রা হয়ে কোহাট, আর কোহাট গিরিবর্ত্ম অতিক্রম করে ওয়াজিরি উপজাতি এলাকার গা ঘেঁসে থাল পর্যন্ত । অগণিত পাখতুনের রক্তে সিঞ্চিত এই রাস্তা বৃটিশ শক্তির হৃদয়হীন দম্ভের পরিচয় নিয়ে এঁকেবেঁকে চড়াই উতরাই বেয়ে এগিয়ে চলেছে। উপজাতীয় পাখতুনরা কিন্তু কখনও মেনে নেয়নি বৃটিশের একাধিপত্য এই সড়কের ওপর।

মেজর রলিন্সের গাড়ি রাস্তার বিপদজনক অংশগুলি পেরিয়ে প্রায় থালের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে, সামান্য খানিকটা রাস্তা অতিক্রম করতে পারলেই একটা রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং , তার অনতিদূরেই বিমান অবতরণের ল্যান্ডিং স্ট্রিপ,আর কিছু দুরেই থাল ফোর্ট, সবশুদ্ধ মাত্র মিনিট দশেকের পথ মোটরে। হঠাৎ মেজর রলিন্স গাড়ির ব্রেকে চাপ দিলেন। গাড়িটি ঝাঁকুনি দিয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে থেমে গেল লেভেল ক্রসিং এর বন্ধ ফটকের সামনে। মেজর রলিন্স ও তাঁর বন্ধু হতভম্ব হয়ে গেলেন। লেভেল ক্রসিং এর গেট তো এ’সময়ে বন্ধ থাকবার কথা নয়! খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার। রলিন্স সবে ভাবছেন যে গাড়ি থেকে নেমে অসময়ে লেভেল ক্রসিং বন্ধ থাকার কারণ অনুসন্ধান করবেন,ঠিক সেই সময় রাস্তার ধারের একটি ছোট্ট পাহাড়ের দিক থেকে কড়কড় শব্দে একঝাঁক গুলি এসে পড়ল তাঁর গাড়ির ওপর। মেজর রলিন্স ও তাঁর বন্ধু তৎক্ষণাৎ গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে বুকে হেঁটে কাছেই একটা কালভার্টের নীচে আশ্রয় নিলেন। জায়গাটি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ,কালভার্ট এর দেয়াল শত্রুর রাইফেলের গুলি থেকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য তাঁদের বাঁচাতে পারবে।

কিন্তু রলিন্স সাহেবের বেয়ারা গাড়ি থেকে বেরোতে পারেনি! রলিন্স সাহেব আবার ছুটে ফিরে গেলেন নিজের গাড়িতে। তাঁর বন্ধু কালভার্টের আড়াল থেকে গুলিবর্ষণ করে রলিন্সকে ফায়ার কভার দিলেন। গাড়ির পিছনের সিটে তখন বেয়ারা কশ গড়িয়ে রক্ত পড়ছে,বুকের নীচে কাপড়চোপর রক্তে ভিজে গেছে। রলিন্স সাহেব তাঁর বেয়ারাকে কাঁধে তুলে নিয়ে ছুটলেন কালভার্টের দিকে।

কাঁধে একজন মানুষের ভার নিয়ে শত্রুর গুলিবর্ষণ থেকে আত্মরক্ষা মোটেই সহজসাধ্য নয়,তথাপি রলিন্স সাহেব সেই গুরুভার নিয়ে পৌঁছে গেলেন কালভার্টের  প্রায় মুখের কাছে। আর দু’পা এগোতে পারলেই কালভার্টের নিরাপদ আশ্রয়। রলিন্সের বন্ধুও কালভার্ট থেকে বেরিয়ে এলেন বন্ধুকে সাহায্য করতে।

কড়াক কড়াক শব্দ করে আবার শত্রুর রাইফেল গর্জে উঠল। ক্ষণিকের জন্য রলিন্সের মনে হল যেন বুকে সামান্য একটু ধাক্কা লাগল। তারপর সব অন্ধকার,তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁর লেফটেন্যান্ট বন্ধুর পায়ের একটু মাংস কেটে বেরিয়ে গেল আর একটি গুলিতে।

কিছুদূরে একটি পাহাড়ের চুড়ায় বৃটিশ সামরিক পিকেট থেকে হেলিওগ্রাফে খবর পেয়ে থাল ফোর্ট একটি সশস্ত্র দল গিয়ে মৃত এবং আহতদের উদ্ধার করে ফোর্টে নিয়ে এল। ডাক্তাররা রলিন্সকে মৃত বলে ঘোষণা করলেন ও তাঁর বেয়ারার জখমে অস্ত্রোপচার করা হল। কিন্তু সে-ও কিছুক্ষণ পরে মারা গেল। রলিন্সের বন্ধুর আঘাত সামান্যই ছিল।

এই হত্যাকাণ্ডে ফোর্টের বৃটিশ অফিসাররা চঞ্চল হয়ে উঠলেন। ব্রিগেড কম্যান্ডার এর হুকুমে তৎক্ষণাৎ এক ব্যাটারি গোলন্দাজ ও এক ব্যাটালিয়ান পদাতিক সৈন্য  প্রস্তুত হল এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেবার জন্য। কিন্তু পলিটিক্যাল কর্তাদের নির্দেশে সৈন্যদল ব্যারাকে ফিরে গেল আর তার বদলে পাঠানো হল একদল সশস্ত্র ফ্রন্টিয়ার কন্সটিবিউলারি ও এক ব্যাটেলিয়ান কুরাম মিলিশিয়া। এই দুটি আধা সামরিক দল থাল এর আশেপাশে দশ মাইল ব্যাসের মধ্যে কোনও উপজাতীয়  যোদ্ধার দলের অস্তিত্ব  খুঁজে পেল না। সন্ধ্যার দিকে তারা রিপোর্ট দিল যে উপজাতীয় লশকর প্রত্যাঘাতের ভয়ে সে অঞ্চল ছেড়ে অনেক দূরে পাড়ি দিয়েছে।

সন্ধ্যাবেলা,সূর্যদেব আফগানিস্থানের সুলেমান পর্বত শ্রেণীর পিছনে ডুব দিয়েছেন কিন্তু গোধুলির ক্ষীণ আলো তখনও ছড়িয়ে রয়েছে কুরাম উপত্যকার ওপর ; দূরে কুরাম নদী দেখা যায়। পাহাড়ের গা ঘেঁসে কালনাগিনীর মত এঁকে বেঁকে চলেছে,তার ধারেই থাল গ্রামের বাড়িগুলির আবছা আকৃতি তখনও দেখা যাচ্ছে। ফোর্টের ভিতর একখানি দোতলা ব্যারাকে আমার ঘরের বারান্দায় ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে মনে মনে ভাবছিলাম, দিনের বেলার ওই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের কথা। মেজর রলিন্স ও তাঁর বেয়ারার অহেতুক প্রাণহানির কথা ভেবে মনটা যদিও কিছুটা বিষাদগ্রস্ত ছিল কিন্তু কতকটা নিশ্চিন্তও হয়েছিলাম খবরটা শুনে যে,উপজাতীয় লশকর থাল থেকে অনেক দূরে পাড়ি দিয়েছে। মনে করলাম যাক এখন কয়েকদিন কার্যোপলক্ষে ফোর্টের বাইরে গেলে উপজাতীয় স্নাইপিং এর আশঙ্কায় ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে না।

মনে মনে এইরকম আকাশপাতাল চিন্তা করছি,এমন সময় হঠাৎ কড়াক শব্দে একটা রাইফেলের ফায়ার হোল কুরাম নদীর ওপারে থাল গ্রামের বিপরীত দিকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আর একটি ফায়ার। আরাম করে গা এলিয়ে দিয়ে চেয়ারে আর বসে থাকা চলল না। উঠে দাঁড়ালাম নদীর ওপারে কী হচ্ছে দেখবার জন্যে। অত দূর থেকে কী হচ্ছে কিছুই দেখা গেল না , কারণ আকাশ সেদিন ধূলায় ভরা। ওপারের পাহাড়গুলো পর্যন্ত ঝাপসা আর অস্পষ্ট। সেই মুহূর্তেই কড়কড় শব্দে অজস্র ফায়ার শুনতে পেলাম আর সেই সঙ্গে দ্রিম দ্রিম শব্দে দামামা বেজে উঠল থাল গ্রামের মালেকের (উপজাতীয় প্রধান) বাড়ির ছাদে। হতভম্ব হয়ে গেলাম রাইফেল আর দামামার শব্দ শুনে,ব্যাপারখানা কী হচ্ছে তা বুঝতে পারলাম না। খাসাদার ( ইংরাজ সরকারের মাইনে করা উপজাতীয় রক্ষি) ইব্রাহিম খাঁ কাছেই দাঁড়িয়েছিলো,সে এই ধাঁধার সমাধান করে দিল, “কাবুলখেল ওয়াজিরি উপজাতির লশকর থাল গ্রামের কুরাম উপজাতীয়দের আক্রমণ করেছে। মালেকের দামামা বাজিয়ে গ্রামবাসিদের সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে আর তাদের আহ্বান করা হচ্ছে হাতিয়ার নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার জন্যে। আমাকেও যেতে হবে।”

প্রশ্ন করার আগেই ইব্রাহিম খাঁ ক্ষিপ্রগতিতে চলে গেল। সে কুরাম উপজাতীয় ও থাল গ্রামের বাসিন্দা। অনুসন্ধানকারী সশস্ত্র কন্সটাবিউলারি ও মিলিশিয়া বাহিনির চোখে ধূলা দিয়ে  কাবুলখেল ওয়াজিরি দল যে কোথাও লুকিয়ে ছিল সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ ছিল না। কাবুলখেল উপজাতীয় লশকর ইংরাজ সরকারের মিলিশিয়া ও কন্সটিবিউলারির সঙ্গে মহড়া নিয়ে সে সময় নিজেদের শক্তি অপচয় করতে চায় নি কারণ তাদের লক্ষ ছিল থাল গ্রামের কুরাম উপজাতি।

দ্রিম দ্রিম দ্রিম – মালেকের বাড়ির মিনার থেকে দামামা বেজে চলেছে। গ্রামের পুরুষ বাসিন্দারা,যুবক এবং বৃদ্ধ সকলেই ছুটে চলেছে কুরাম নদীর তীরে। সহস্র রাইফেল গর্জে উঠলো কুরাম নদীর এপার থেকে কাবুলখেল উপজাতীর ক্ষণপূর্বের গুলিবর্ষণের উত্তরে। কাবুলখেল ও কুরাম উভয় উপজাতিই আজ রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে এক ঘাসে ভরা জমিটার অধিকার কায়েম করতে বদ্ধ পরিকর।

দামামার দ্রিম দ্রিম শব্দ থেমে গেছে কিন্তু রাইফেলের গর্জন অব্যাহত। রাতের অন্ধকার নামার সঙ্গেসঙ্গে রাইফেলের নির্ঘোষ কিছুটা শ্লথ হয়ে এল। তারপর সব চুপচাপ। অন্ধকারের দরুন নদীর এপাড় থেকে অন্যপাড়ে তখন আর কিছুই দেখা যায় না। মনে হল যেন সে রাতটার জন্য যুদ্ধ স্থগিত রাখল দু পক্ষই।

কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। সেই মুহূর্তেই অজস্র হাউইবাজি দু’দিক থেকে উঠে স্বল্প পরিসর নদীর তীর আলোয় ঝলমলে করে তুলল তখন আর সেই ক্ষণিক আলোর সুবিধা নিয়ে আবার দু’দিকের রাইফেল কড় কড় শব্দে ডেকে উঠল। ভোরবেলা পর্যন্ত এইভাবেই অবিরাম যুদ্ধ চলতে থাকল।

পরদিন একটা সরকারি কাজে আমাকে থাল গ্রামে যেতে হল। গতরাতের যুদ্ধের কোনোরকম উত্তেজনা বা আতঙ্ক গ্রামে দেখা গেল না। গ্রামবাসীদের সাধারণ জীবনযাত্রার কোনোরকম ফেরবদল দেখতে পেলাম না। গ্রামের ব্যবসায়ীরা,যারা বেশিরভাগই হিন্দু, প্রতিদিনের মতোই আফগান ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কেনাবেচা করছে,আফগানী পণ্য যেমন পার্সিয়ান ও বোখারা কার্পেট,ভেড়ার ছালের কোট বা পোস্তিন এবং হিং প্রভৃতি। মুদ্রা বিনিময়ের প্রভুত লাভজনক ব্যাবসাও প্রতিদিনের মতোই থালের হিন্দুরা চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের মেয়েরা কুরাম নদী থেকে জল আনছে কলসি ভর্তি করে। গ্রামের রেস্তোরাঁগুলিতে তীব্রস্বরে গ্রামাফোন বেজে চলেছে আর আফগান খদ্দেররা মাথা নেড়ে নেড়ে সেই গান উপভোগ করছে,সবুজ চা আর মাংসের রোস্ট খেয়ে রেস্তোরাঁর পৃষ্ঠপোষকতা করছে। রাখাল বালকেরা কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে অথবা কোমরে রিভলভার বেঁধে ভেড়ার পাল নিয়ে যাচ্ছে গ্রামের বাইরে মাঠের দিকে। দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এমন স্বাভাবিকভাবে চলছে যেন যুদ্ধটা একটা অতি স্বাভাবিক ব্যাপার।

একটি ছোট্ট কাপড়ের দোকানের সামনে জনাপাঁচেক লোককে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তাদের দেখে থাল গ্রামের লোক বলে মনে হল না। তাদের পায়ে ঘাসের তৈরি চপ্পল। থাল গ্রামের বাসিন্দাদের গায়ে খানিকটা আধুনিক সভ্যতার হাওয়া কিছুটা লেগেছে বলে তারা চামড়ার চপ্পল পরে।

এই নবাগতদের দিকে একটু অবাক হয়ে আমাকে তাকাতে দেখে আমার পাখতুন দেহরক্ষী নজীব গুল বলল,  “আপনি ঠিকই ধরেছেন,এই লোকগুলি থাল গ্রামের বাসিন্দা নয়, এরা কাবুলখেল উপজাতি, গত রাতের যুদ্ধে এদের দলের যারা মারা গেছে,তাদের জন্য কফিনের কাপড় কিনতে এখানে এসেছে। কাবুলখেলদের গ্রামে কোনও কাপড়ের দোকান নেই। সেইসঙ্গে নজীব গুল এ কথাও  বুঝিয়ে দিল যে, যদিও ওরা শত্রুপক্ষের লোক কিন্তু ওরা এ’সময় নিরস্ত্র। ওদের মাথার চুলটিও কেঊ স্পর্শ করবে না থাল গ্রামে। নিরস্ত্র শত্রুকে পাখতুনরা আঘাত করে না,এটা হল পাখতুনদের অলিখিত আইন।

দিনটা কেটে গেলো শান্তিতে। ভাবলাম ঝড়ের অবসান ঘটেছে; রাতে নির্বিঘ্নে ঘুমোতে পারব। কিন্তু অদৃষ্টে তা আর হল না। সূর্য অস্ত যাবার সঙ্গে সঙ্গেই কুরাম নদীর দু পার থেকেই রাইফেল গর্জে উঠল। গোটা রাত রাইফেলের গর্জন চলল অবিরাম এবং পর পর তিন রাত ধরে অবস্থার কোনও পরিবর্তন ঘটল না।

ইতিমধ্যে থালের কুরাম উপজাতীয় পাখতুনরা বোধহয় বিরক্ত হয়ে উঠেছিল,চতুর্থ দিন সকালবেলা তারা রীতি অনুযায়ী যুদ্ধ বন্ধ করল না,মরিয়া হয়ে দিনের আলোতেই কুরাম নদী পার করে ছোট পাহাড়টির চূড়া দখল করে নিল আর পিছন থেকে নিজেদের দলের কভারিং ফায়ারের আওতায় চূড়ার ওপর একটি সাঙ্গড় (পাথরের দেয়াল )গড়ে তুলল ঘন্টাদুয়েকের মধ্যে। তারপর সাঙ্গড় থেকে গুলিবর্ষণ করে সেই জমিটির দখল নেওয়া  মোটেই কঠিন হল না । যুদ্ধ শেষ হল,  কিন্তু তা কিছুকালের জন্য মাত্র, কারণ পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া পাখতুনদের স্বভাববিরুদ্ধ। এই আত্মঘাতী অ্ন্তর্দ্বন্দ্ব কতদিন ধরে চলবে কে জানে, সেই সবুজ ঘাসে ভরা জমিটার রক্ততৃষ্ণা কখনো মিটবে কি না তাও কেউ জানে না।

পাখতুনরা ইংরাজের সঙ্গে সুদীর্ঘকালের যুদ্ধে যদিও কখনও জয়লাভ করতে পারে নি, কিন্তু পরাজয়ও স্বীকার করেনি তারা। ইংরাজদের পাখতুনিস্থান থেকে বিতারিত করতে না পারলেও তাদের নিরুদ্বেগে রাজত্বও করতে দেয় নি তারা। প্রথম অ্যাংলো আফগান যুদ্ধের সময় থেকে আরম্ভ করে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রায় শেষ দিন পর্যন্ত ইংরাজকে তারা ঘাত প্রতিঘাতে সর্বক্ষণ অস্থির ও সংকটময় অবস্থার মধ্যে রেখেছিল।

১৮৫১ সালের থাল অঞ্চলে যুদ্ধ শেষ হবার কিছু পরেই উত্তর সোয়াট উপত্যকার রানিজাই উপজাতির একটি লশকর একদিন মালকান্দের কাছে একটি ব্রিটিশ রক্ষিদলকে আক্রমণ করে পরাস্ত করল। তাদের এলাকায় ব্রিটিশদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করাতে এই উপজাতির আক্রোশ দিন দিন পুঞ্জিভূত হয়ে ফেটে পড়েছিল সেদিন। দুর্ঘটনার খবর পেশাওয়ারে পৌঁছোনমাত্রই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ক্যাম্বেলের অধীনে দু’হাজার সোলজার ও অফিসারের এক বাহিনী গঠন করে পাঠানো হল সোয়াট উপত্যকায়।

ব্রিটিশ বাহিনী যে অত তাড়াতাড়ি সরেজমিনে গিয়ে হাজির হবে রানিজাই উপজাতীয় পাখতুনরা সেটা ধারণা করতে পারেনি। কাজেই তারা ক্যম্বেলের গোলন্দাজ,অশ্বারোহী এবং পদাতিক বাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। রানিজাই উপজাতির নায়করা দেখলেন যে সে অবস্থায় ক্যাম্বেলের ফৌজের মোকাবেলা করার চেষ্টা করলে তাঁরা ইংরাজ সৈন্যবাহিনীর কোনও রকম ক্ষতিসাধন তো করতে পারবেনই না,উপরন্তু ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর হাতে তাঁরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন। রানিজাই নেতারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে স্যার ক্যাম্বেলের কাছে দূত পাঠালেন,প্রস্তাব করলেন যে স্যার ক্যাম্বেল যদি সোয়াট উপত্যকা থেকে নিজের সৈন্যসামন্ত অপসারণ করেন,তাহলে তাঁরা ইংরাজ সরকারের বশ্যতাস্বীকৃতির নিদর্শন স্বরূপ অর্থদণ্ড দেবেন। স্যার ক্যাম্বেল এ প্রস্তাবে খুশি হলেন বিনাযুদ্ধেই তিনি রানিজাই উপত্যকাকে পদানত করতে পারলেন মনে করে। তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনীকে ফেরত নিয়ে গেলেন পেশাওয়ারে ।

ক্রমশ

আগের পর্বগুলো এই লিংকে