টাইম মেশিন সীমান্তের অন্তরালে সমরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী বর্ষা ২০১৬

আগের পর্বগুলো এই লিংকে

বন্ধু রশীদ খানকে বললাম, “আচ্ছা রশীদ বল তো তুমি নিজেকে পাখতুন আর এই দেশটাকে পাখতুনিস্তান বলে আখ্যাত কর কেন? ইতিহাসে পাখতুন বলে কোনও জাতির বা ভূগোলে পাখতুনিস্তান বলে কোনও দেশের উল্লেখ আছে বলে তো মনে পড়ে না। এ অঞ্চলটা তো ইন্ডিয়ার নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স।”

রশীদ খান মুর্গির ঠ্যাং চর্বন করছিলেন একমনে। কয়েক মিনিট কোনও উত্তর দিলেন না। মুর্গির ঠ্যাং চিবানো শেষ করে আমার দিকে মুর্গি কারির বোল এগিয়ে দিয়ে বললেন, “মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড, আমাদের দেশ ও দেশবাসীদের সম্বন্ধে তোমার জ্ঞানের বহর নিতান্তই অল্প দেখছি। এখনই তো ইতিহাস ও ভূগোল এর নজির দেখাচ্ছিলে, অথচ আমাদের দেশের অর্থাৎ আফগানিস্তানের ইতিহাস তুমি কতটুকুই বা জানো! এ দেশটা ইন্ডিয়ার অংশ নয় আর আমরাও ইন্ডিয়ান নই। আমরা আফগান কিন্তু নিজেদের আফগান বলে পরিচয় দেবার অধিকার থেকে ইংরাজ আমাদের বঞ্চিত করে রেখেছে। তাই বলে আমরা নিজেদের ইন্ডিয়ান বলে মেনে নিতে পারি না। আফগানিস্তানের জনসাধারণের ভাষা ‘পস্তো’ বা ‘পাখতো’। তাই আমরা নিজেদের দেশটাকে অর্থাৎ আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলকে ‘পাখতুনিস্তান’, ও নিজেদের বলি পাখতুন। আমাদের দেশ ও দেশবাসী সম্বন্ধে  জানতে হলে আফগানিস্তানের ইতিহাস কিছুটা ওয়াকিফহাল হওয়া দরকার তোমার।”

আমাদের মধ্যে আপ সম্বোধন থেকে তুম এ কখন এসে গেছি জানতেই পারি নি।  মনে পড়ে গেল Sir William Barton তাঁর “India’s North West Frontier”বইটিতে লিখেছেন “The Afgan border land is central Asian in characteristic. No apology is needed for again stressing an outstanding fact too easily forgotten “.

আফগানিস্তান একটি রহস্যময় কিন্তু মনোমুগ্ধকর দেশ এবং এ দেশের বাসিন্দারা অত্যন্ত যুদ্ধপ্রিয় ও প্রভূত গুণসম্পন্ন। যদিও আপাতদৃষ্টিতে অনেকগুলি গুণ পরস্পরবিরোধী বলে মনে হয় বিদেশিদের কাছে। আফগানিস্তানের সহজাত সীমানা উত্তরে অক্ষ নদী (অক্সাস)থেকে আরম্ভ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে সিন্ধু নদ পর্যন্ত প্রসারিত। এই বিস্তৃত ভূমি সবটাই প্রকৃতপক্ষে আফগানিস্তান। কিন্তু ইংরাজ দেশের অর্ধেকটা অপহরণ করে ইন্ডিয়ার সঙ্গে জোড়াতালি দিয়ে নাম দিয়েছে ইন্ডিয়ার ‘নর্থ ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স’।

আফগানিস্তানের উল্লেখযোগ্য ইতিহাস আরম্ভ হল আহমদ শাহ আবদালির সময় থেকে। তিনিই প্রথম দুরানি রাজ বংশ প্রতিষ্ঠা করেন ১৭৪৭ সালে। এর আগে পশ্চিম আফগানিস্তান ছিল পারস্যের (অধুনা ইরান) অধিকারে এবং বাদবাকি দেশটা বিভিন্ন উপজাতীয় সর্দাররা নিজ নিজ এলাকার মধ্যে শাসন করতেন। আহমদ শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র তিমুর শাহ সিংহাসনে বসেন ও দক্ষতার সঙ্গে শাসনকার্য চালান। গোল বাধল ১৭৯৩ সালে তিমুর শাহের মৃত্যুর পর। তাঁর পুত্রসংখ্যা ছিল গোটা কুড়ির ওপর। সিংহাসন দখল করার জন্য তাদের মধ্যে রক্তাক্ত যুদ্ধ বেধে গেল। এক রাজপুত্র সিংহাসন দখল করে বসতে না বসতে আর একজন তাকে তাড়িয়ে নিজে রাজা হয়ে বসে। এমনি চলল কিছুদিন। শেষে শাহ শুজা নামে এক রাজপুত্রকে হারিয়ে মোহমুদজাই উপজাতীয় সর্দার দোস্ত মোহম্মদ ১৮১০ সালে সিংহাসনারূঢ় হলেন।

শাহ শুজা হিন্দুস্থানে পালিয়ে গিয়ে ইংরাজের আশ্রয় নিলেন। দোস্ত মোহম্মদ বিচক্ষণ শাসক ছিলেন ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন অল্প সময়ের মধ্যে। তিনি ব্রিটিশের অর্থ সাহায্যে শাহ শুজার সিংহাসন পুণরুদ্ধারের চেষ্টায় দু’দুটো অভিযান নিষ্ফল করে দেন।

সে’সময় ইংরাজের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রাসার করে চলেছে। কথিত আছে ওদিকে রুশ জারও নাকি নিজের দক্ষিণ সীমান্তের বাইরে পা বাড়াবার মতলব আঁটছিলেন। একই সময়ে পারস্যের (অধুনা ইরান) শাহের দরবারে রুশ সম্রাটের প্রভাব ছিল প্রচুর। সেই প্রভাবের সুযোগ নিয়ে রাশিয়ার রাজদূত শাহকে প্ররোচিত করলেন আফগানিস্তানের হিরাট অঞ্চল আক্রমণ করার জন্য। পারস্যে ব্রিটিশ রাজদূত স্যর হেনরি এলিস শাহকে এ বিষয়ে নিরস্ত করতে না পেরে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভাইকাউন্ট পামরস্টোনকে ব্যাপারটা জানালেন এক বার্তা পাঠিয়ে। মন্তব্য করলেন যে পারস্যের হিরাট দখলে প্রকৃতপক্ষে হিরাটের ওপর রাশিয়ার অধিকারই কায়েম হবে ও সে ক্ষেত্রে ক্রমে গোটা আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তার করা রুশ সম্রাটের পক্ষে অসম্ভব হবে না। সেরূপ অবস্থা ব্রিটিশ স্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর হবে ও ব্রিটিশের ভারত সাম্রাজ্য  বিপদগ্রস্ত হতে পারে। ভারতের ইংরাজ গভর্নর জেনারেল পারস্যের শাহকে প্রতিবাদ জানিয়ে লিখলেন যে, পারস্যের হিরাট অভিযান ইংরাজ সমর্থন করে না এবং ঘোর অসন্তুষ্টির চোখে দেখে। সে প্রতিবাদে কোনও কাজ হল না। হিরাট আক্রমণের  জন্য তোড়জোড় আরম্ভ হয়ে গেল।

দোস্ত মোহম্মদ খবরটা পেয়ে বিচলিত হলেন কারণ তিনি জনপ্রিয় শাসক হলেও দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁর শত্রুর অভাব ছিল না। শক্তিশালী বহিঃশত্রুর হিরাট অভিযানের ফলে দেশের ভিতরের শত্রুরাও মাথা চাড়া দিয়ে উঠে দোস্ত মোহম্মদকে বিপদে ফেলতে পারে সে আশঙ্কা ছিল। তিনি ভারতের ইংরাজ গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ডের কাছে দূত পাঠিয়ে আসন্ন হিরাট আক্রমণ প্রতিহত করতে ও শিখ রাজা রণজিৎ সিং এর কবল থেকে পেশাওয়ার পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য প্রার্থনা করলেন ( আগে পেশাওয়ার ছিল আফগান নৃপতির শীতকালীন রাজধানী)। লর্ড অকল্যান্ড স্যর অ্যালেকজান্ডার বার্নসকে নিজের প্রতিনিধি হিসাবে পাঠালেন আফগানিস্তানে দোস্ত মোহম্মদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতে, কিন্তু তাঁর আসল উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অর্থাৎ দোস্ত মহম্মদকে সামরিক ও আর্থিক সাহায্যদানের প্রস্তাবটা একেবারে এড়িয়ে গেলেন। অকল্যান্ডের নিদেশ মত স্যর বার্নস কতকগুলি নিছক বাণিজ্যিক প্রস্তাব ও সিন্ধুনদের অববাহিকার উৎকর্ষ সাধনের কথা পাড়লেন। দোস্ত মোহম্মদ এসব অবান্তর আলোচনায় মোটেই আগ্রহী ছিলেন না। তিনি স্পষ্ট জানতে চাইলেন যে ইংরাজ তাঁকে ইপ্সিত সাহায্য দেবেন কী না এবং জানিয়ে দিলেন যে ইংরাজের কাছে সাহায্য না পেলে তিনি রাশিয়ার দ্বারস্থ হবেন। স্যর বার্নস অতঃপর চাটিবাটি গুটিয়ে ফিরে গেলেন হিন্দুস্তানে, কারণ দোস্ত মোহম্মদকে সেরূপ কোনও প্রতিশ্রুতি দেবার অধিকার তাঁর ছিল না ।  

মনে হয় স্যর বার্নসকে আফগানিস্থানে পাঠাবার আগেই লর্ড অকল্যান্ড নিজের লক্ষ্যস্থির করে ফেলেছিলেন। অকল্যান্ডের উদ্দেশ্য ছিল দোস্ত মহম্মদকে সিংহাসনচ্যুত করে ইংরাজের আশ্রিত ও তল্পিদার শাহ সুজাকে গদিতে বসিয়ে পরোক্ষে আফগানিস্তানের ওপর নিরঙ্কুশ প্রভুত্ব করা। ইতিমধ্যে শাহ সুজা ব্রিটিশের অর্থ সাহায্যে নিজের সৈন্যদল গঠন করে দুবার দোস্ত মোহাম্মদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়েছিলেন ও মার খেয়ে পালিয়েগিয়েছিলেন। এবার অকল্যান্ড স্থির করলেন যে সরাসরি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈন্যবাহিনী দিয়ে আফগানিস্তান আক্রমণ করে নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করবেন। এইভাবে প্রথম অ্যাংলো আফগান যুদ্ধের  সুত্রপাত হল।

১৮৩৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিশাল ফৌজ এসে জড়ো হল ফিরোজপুরে। ফৌজে ছিল ব্রিটিশ ও ভারতীয় মিলিয়ে ষোল হাজারের ওপর সৈন্য। ফৌজের মালপত্র বহনের জন্য সঙ্গে ছিল আটত্রিশ হাজার উট ও ফৌজ এর রসদাদি সরবরাহ ও অন্যান্য কাজের জন্য সাধারণ লোক ছিল ত্রিশ হাজার। এছাড়া শাহ সুজার তথাকথিত নিজস্ব ফৌজ ছিল প্রায় সাত হাজার।

হিন্দুস্তান থেকে আফগানিস্তানে প্রবেশ করার পথ আছে মাত্র তিনটি। একটি খাইবার পাস হয়ে জালালাবাদ ও কাবুল, দ্বিতীয়টি কুরাম পাস হয়ে গজনি ও তৃতীয়টি বালুচিস্থান হয়ে কান্দাহার। খাইবার পাস অত্যন্ত কঠিন পথ , পেশাওয়ারের পশ্চিমে জামরূদ দুর্গ ও সেখান থেকে তোরখাম পর্যন্ত ৮৫ কিলোমিটারের মত অপ্রশস্ত ও দুর্গম দু’সারি পাহাড়ের মাঝ দিয়ে চলে গেছে। পাহাড়ের গায়ে ও পাদদেশে দুর্ধর্ষ আফরিদিদের বাস । মোটের মাথায় ওই পথ দিয়ে যেতে হলে হয় আফরিদি উপজাতির বিভিন্ন গোষ্ঠীর সদিচ্ছা লাভ করতে হয় কিম্বা প্রতিপদে তাদের সঙ্গে লড়াই করে এগোতে হয়। কুরাম পাস কোহাট থেকে প্রায় একশ কিলোমিটার পশ্চিমে থাল থেকে আরম্ভ হয়েছে এবং পেওয়াড়ে শেষ হয়েছে ও তারপর সুতরগর্দন পাস অতিক্রম করে গজনি শহর ও দুর্গ, থাল থেকে কমবেশি দুশো কিলোমিটার। বেশিরভাগ পথ কুরাম উপত্যকার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। থাল থেকে চব্বিশ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মান্দুরিতে পথ কিছুটা সংকীর্ণ অন্যথা পেওয়াড় পর্যন্ত পথটি বেশ প্রশস্ত। অবশ্য এ পথেও দু পাশে পাহাড় ও পাহাড়ে ও উপত্যকায় দুর্দম ওয়াজিরি উপজাতির বিভিন্ন গোষ্ঠীর বাস। এ পথটি খাইবারের তুলনায় সহজ কিন্তু কুরাম পাস সম্বন্ধে বিশদ জ্ঞান সে সময়ে ইংরাজের ছিল না। ব্রিটিশ সামরিক মহলে স্থির করা হল যে পথ অত্যন্ত দীর্ঘ হলেও সিন্ধুনদ পার করে বালুচিস্তান হয়ে কান্দাহার, ও সেখান থেকে গজনি ও কাবুল এর ওপর চড়াও করা হবে।

পাঞ্জাবের ফিরোজপুর  থেকে রওনা হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফৌজ ও শাহ সুজার তথাকথিত নিজস্ব ফৌজ। সে কি তার জাঁকজমক, সোলজারদের ও অফিসারদের পরনে লাল রঙের টিউনিক, অফিসারদের (বলাবাহুল্য যে অফিসারমাত্রই ছিলেন ইংরাজ) ও গোলন্দাজ সৈনিকদের মাথায় পালিশ করা ঝকমকে শিরস্ত্রাণ, ঘোড়সওয়ার পল্টনের শান দেওয়া বল্লমের ফলক সূর্যের আলোয় এক অপূর্ব শোভা দিচ্ছিল। বাহিনীর অধিনায়কগন ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জন কীন, মেজর জেনারেল কটন ,সেল ও উইলশায়ার। শাহ সুজার ‘নিজস্ব বাহিনীর’ অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সিম্পসন। এছাড়া বাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হিসাবে ছিলেন স্যর আলেকজান্ডার বার্নস, স্যর উইলিয়াম ম্যাকনাটন্ ।

timemachinesimanto02 (Medium)

বিজয়লক্ষ্মী তখন ইংরাজ বাহিনীর প্রতি সদয়। কয়েকটি ছোটোখাট লড়াই করে বালুচিস্তান পার হয়ে ব্রিটিশ বাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করল। ব্রিটিশ বেয়নেটের প্রতাপে গ্রামের পর গ্রাম লুটিয়ে পড়ল, ব্রিটিশ বাহিনী সদর্পে এগিয়ে চলল কান্দাহারের দিকে। কান্দাহারে আফগান সৈন্যদল পরাজিত হল এবং সেখানেই শাহ সুজার রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন ব্রিটিশ সমরনায়করা। সে অনুষ্ঠানে আফগান সর্দাররা কোনও উৎসাহ দেখাল না। ইংরাজ কর্তাদের ধারণা ছিল যে শাহ সুজা আফগানিস্তানে জনপ্রিয় এবং তিনি দেশে প্রবেশ করা মাত্রই সর্দাররা ও জনতা তাঁকে নতজানু হয়ে অভিনন্দন করবে কিন্তু তার কোনও  লক্ষণ দেখা গেল না। তারপর আমীর (সুলতান) শাহ সুজাকে সঙ্গে নিয়ে ব্রিটিশ বাহিনী রাজধানী কাবুলের দিকে রওনা হল।

ক্রমশ

শুরুর ছবিঃ শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য

ভেতরের ছবিঃ এ ডি ম্যাক্রোমিক