টাইম মেশিন সীমান্তের অন্তরালে সমরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী বসন্ত ২০১৭

আগের পর্বগুলো

time07

কুদরৎ খাঁ গিরিপথ ছেড়ে পাহাড়ের গা বেয়ে পাহাড়ের চূড়া লক্ষ করে এগিয়ে চললেন কখনও বুকে হেঁটে কখনও হামাগুড়ি দিয়ে। পাহাড়ের শিখর অতিক্রম করে বিপরীত দিকে একটি ছোট উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছলেন। বেলা তখন পড়ে এসেছে। উপত্যকাটির তিন দিক পাহাড়ে ঘেরা, দক্ষিণদিকে দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে গেছে একটি শুকনো পাহাড়ি নদী। উপত্যকায় অজস্র ঝোপঝাড় আর গাছপালা, গাছপালার ভিতর থেকে একটি ছোট ঝর্না বেরিয়ে খানিক দূরে গিয়ে আবার ঝোপঝাড়ের ভিতর অদৃশ্য হয়েছে। কুদরৎ খাঁ ঝর্নার জলে হাত মুখ ধুয়ে নমাজ পড়লেন, তারপর ঝর্নার উৎসের কাছে বসে তাঁর চাদরের খুঁটে বাঁধা রুটি বার করে খেতে আরম্ভ করলেন। কয়েক গ্রাস খাওয়ার পর খুব হাল্কা একটা শব্দ শুনে সেইদিকে চোখ ফেরাতেই দেখলেন একটি ঝোপের ভিতর থেকে একটি রাইফেলের নল এবং তার লক্ষ কুদরৎ খাঁর বক্ষস্থল। ঝোপের ভিতর থেকে গুরুগম্ভীর স্বরে নির্দেশ এল “রিভলবার বার করবার চেষ্টা কোরো না, দু’হাত মাথার ওপর তোলো।”  কুদরৎ দেখলেন শুধু একটি নয়, গোটা ছয় রাইফেলের নল তাঁকে লক্ষ করে ঘিরে আছে। তিনি দেখলেন যে সেই বেড়াজাল থেকে তাঁর নিস্তার নেই, তিনি নির্দেশমত মাথার ওপর হাত তুলে দাঁড়ালেন। দুজন লোক ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর পোশাকের তল্লাশি নিয়ে তাঁর রিভলবার আর সেই সিলমোহর করা লেফাফাটি হস্তগত করল। তারপর ছ’জন সশস্ত্র শত্রু  তাঁকে রাইফেলের লক্ষের মধ্যে রেখে হাঁটতে বাধ্য করল পারাচিনারের দিকে। কুদরৎ খাঁ তাঁর প্রতি এরূপ ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেন, অনেক মিনতি করলেন তাঁকে মুক্তি দিতে ও লেফাফাটি ফেরত দিতে কিন্তু তাঁর শত্রুরা কোনও কথা কানে তুলল না আর জানিয়ে দিল যে তাদের ওপর হুকুম আছে কুদরৎ খাঁকে জীবন্ত অবস্থায় তাদের মনিবের সামনে হাজির করতে, অন্যথা অনেক আগেই কুদরৎ খাঁর মৃতদেহ ওই ঝর্নার পাশে লুটিয়ে পড়ত।

সুতরগর্দন গিরি সংকটের উত্তরে সফেদ কোহ পর্বতশ্রেণীর প্রায় দশ হাজার ফুট ঊঁচু যে পাহাড়টি দাঁড়িয়ে আছে সেটি ওই অঞ্চলের অন্যন্য রুক্ষ পাহাড়গুলির চাইতে ভিন্ন রকমের। খাড়া পাহাড়টির গায়ে ফার জাতীয় গাছের বেশ ঘন জঙ্গল আছে, কয়েকটি ছোট ছোট ঝর্ণাও গড়িয়ে চলেছে পাহাড়ের গা বেয়ে মাঝে মাঝে। এক জায়গায় ঘন জঙ্গলের মধ্যে একটি বড় গুহা আছে যার অস্তিত্ব একেবারে গুহার মুখে না পৌঁছলে জানতে পারা যায় না। গুহার প্রবেশপথের চারধারে প্রায় মাইলখানেক ব্যাসের মধ্যে জঙ্গল অত্যন্ত নিবিড়। সেই গুহার ভিতর মাঝরাতে আলেফ সাহেবের কাছে হাজির হল দুজন অনুচরকে। অনুচরদ্বয় আলেফ সাহেবকে কুদরৎ খাঁর ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স এজেন্টদের হাতে বন্দি হওয়ার খবর জানাল আর পরামর্শ দিল একটি ছোট কিন্তু শক্তিশালী যোদ্ধৃদল পাঠিয়ে সত্বর কুদরৎ খাঁকে এজেন্টদের কবল থেকে উদ্ধার করতে।

আলেফ সাহেব সে প্রস্তাবে সম্মত হলেন না। তিনি বললেন বলপ্রয়োগ দ্বারা কুদরৎ খাঁকে উদ্ধার করার চেষ্টা সঙ্গত হবে না, কারণ তাহলে কুদরৎ খাঁর এবং কয়েকটি বিশিষ্ট কর্মীর আমাদের সঙ্গে সম্বন্ধের কথা প্রকাশ হয়ে পড়বে, তাতে আমাদের অনিষ্ট ছাড়া কোনও সুবিধা হবে না এবং ভবিষ্যতে আমাদের কর্মপন্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হবার সম্ভাবনাই প্রবল হয়ে পড়বে। কুদরৎ খাঁর ওপর আমার অতল বিশ্বাস আছে, সে নিজেই এ অবস্থা থেকে নিজেকে  উদ্ধার করতে পারবে। অবশ্য জার্মান এজেন্টদের হাতে ধরা পড়লে আমরা কুদরৎ খাঁকে যে কোনও উপায়ে হোক উদ্ধার করে আনতাম।

পরদিন বমাল অর্থাৎ সেই সিলমোহর করা লেফাফাটি সমেত ব্রিটিশ কর্তাদের কাছে কুদরৎ খাঁকে হাজির করা হল। ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স এর দুজন অফিসারও সেখানে ছিলেন। কুদরৎ খাঁকে সোজাসুজি অভিযুক্ত করা হোল প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার নকশা প্রভৃতি চুরি করে ব্রিটিশ শত্রু শক্তির কাছে পাচার করার অপরাধে। প্রমাণস্বরূপ তখনই সেই সিলমোহর করা লেফাফাটি খোলা হোল কুদরৎ খাঁর সামনেই। কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার, লেফাফাটির ভিতর থেকে বেরোল এক গোছা কাগজ যাতে টাকাপয়সার হিসাব লেখা – মালেক গুল এর মোটর লরিতে মিলিটারি ঠিকাদার শাহ্‌ আলম খাঁর যত মাল বহন করা হয়েছে এবং তাঁর কাছে ঐ কাজ বাবদ পাওনার হিসাব।

ইন্টেলিজেন্স বিভাগের ধুরন্ধরেরা হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁদের ধারনা যে তাঁরা নিশ্চিতভাবে জানেন প্রতিরক্ষার প্ল্যান প্রভৃতির নকল এই লেফাফার ভিতর ছিল আর সেটা দেওয়া হয়েছিল কয়েকজন স্থানীয় মালেকদের যোগসাজসে কুদরৎ খাঁকে শত্রুপক্ষের কাছে পৌঁছে দিতে। সেই মুহূর্ত থেকে কুদরৎ খাঁকে এক পলকের জন্যেও চোখের আড়াল করেনি ইন্টেলিজেন্স এজেন্টরা, কাজেই কুদরৎ খাঁ লেফাফাটি হস্তান্তর করার সুযোগ পাননি। কোথায় যে গলদ হল তা ইন্টেলিজেন্স ধুরন্ধররা বুঝতে অক্ষম। পলিটিক্যাল বিভাগের কর্তারা বিরক্ত হয়ে টিটকারি দিলেন ইন্টেলিজেন্স বিভাগেকে তাদের অকর্মণ্যতার জন্যে। কুদরৎ খাঁ নিজেই সাফাই স্বরূপ বললেন যে তিনি প্রতিরক্ষার নকশা বা সেগুলি চুরির সম্বন্ধে কিছুই জানেন না। প্রতিরক্ষার নকশা কথাটি তিনি এই প্রথম শুনলেন। তিনি পেওয়াড়ের দিকে যাচ্ছিলেন ঠিকাদার শাহ্‌ আলমের সঙ্গে দেখা করে তাঁর মাল বহন করার হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য। কুদরৎ খাঁকে বেকসুর খালাস করা হোল, তিনি বিদায় নেবার সময় তাঁর লেফাফাটিও চেয়ে নিলেন।   

কুদরৎ খাঁ গত দু তিন দিনের ধকলে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন তাই স্থির করলেন কাছেই শালোজান গ্রামে সলমার পিতৃগৃহে দিনটা বিশ্রাম করবেন। শালোজান গ্রামে পৌঁছে প্রথমেই দেখা হল সলমার সঙ্গে। সলমাকে সেখানে দেখে আপাতদৃষ্টিতে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। দুজন পরস্পরের কুশল জিজ্ঞাসা করার পর তাঁরা চলে গেলেন সলমার পিতৃগৃহে, সেখানে আহারাদি করে নিভৃত ঘরে কুদরৎ খাঁ সলমাকে তাঁর গত দু দিনের অভিজ্ঞতা আর দুর্যোগের কথা জানালেন আর জিজ্ঞাসা করলেন সলমা কোনও বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন কী না। উত্তরে সলমা বললেন তাঁকে কোনও ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়নি। আসল লেফাফাটি তিনি যথাসময়েই পেয়েছিলেন এবং যখন ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স এর এজেন্টরা কুদরৎ খাঁর পশ্চাদ্ধাবনে ব্যস্ত ছিল সেই সময়ে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার নকশা প্রভৃতি আলেফ সাহেবের হাতে নিরাপদে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

মোহম্মদ জান এর গল্পের সত্য মিথ্যা নির্ধারণের চেষ্টায় রশীদ  খাঁ ও কুদরৎ খাঁকে প্রশ্ন করায় তারা শুধু হেসেছিল, কোনও উত্তর দেয়নি। যাক, গল্পটি সত্যই হোক আর মিথ্যাই হোক, জার্মান সৈন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতবর্ষের দিকে এগোতে পারেনি কাজেই পাখতুনিস্তানের গিরিবর্ত্মগুলিতে ব্রিটিশের সঙ্গে তাদের যুদ্ধও হয়নি , অতএব প্রতিরক্ষার প্ল্যান পাখতুন নেতাদের হাতে পৌঁছলেও সে প্ল্যানের নকশা প্রভৃতি তাঁদের কোনও কাজে লাগেনি। বন্ধু রশীদ খাঁ আমাকে পরামর্শ দিল যে অবান্তর গুজব সম্বন্ধে মাথা না ঘামিয়ে আমি যেন পাখতুনদের বিগত দিনের মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাস বুঝবার চেষ্টা করি। আজকের দিনের পাখতুনদের ও তাদের দেশকে জানতে হলে তাদের বিগত দিনের কাহিনী জানতে হবে আগে। ইউসুফজাইদের আর একটা যুদ্ধের কাহিনী আরম্ভ করল রশীদ খাঁ। 

********

ইউসুফজাই উপজাতীয় পাখতুনরা  ছড়িয়ে আছে তাদের পাহাড়  অঞ্চলে এবং দক্ষিণের সমতলভূমিতে। পাহাড় অঞ্চলের ইউসুফজাইরা ১৮৬৩ সালের যুদ্ধে ইংরাজের কাছে পরাভূত হয়েছিল, কিন্তু সে সময় সমতল ভূমির ইউসুফজাই গোষ্ঠি সে যুদ্ধে যোগদান করেনি। তারা যে ব্রিটিশের কাছে স্বচ্ছন্দে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছিল তা নয়, তারা তখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না। দুর্গম পাহাড়ের আড়ালে ব্রিটিশের নজর এড়িয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি করা অপেক্ষাকৃত সহজ কিন্তু সমতল এলাকায় ইংরাজের সতর্ক দৃষ্টির সামনে প্রস্তুতির গতি স্বাভাবিকই শ্লথ ছিল।

ধীরে ধীরে সমগ্র দক্ষিণপূর্ব আফগানিস্তান গ্রাস করার পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৮৬৮ সালে ইংরাজ এই উপজাতীয় অঞ্চলের আগরোর উপত্যকায় একটি সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত করল স্থানীয় পাখতুনদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। আগরোর উপত্যকার পাখতুনরা অবস্থার গুরুত্ব উপলব্ধি করে আর চুপ করে থাকতে পারল না। পরাধীনতার শিকল তাদের গলায় পরাবার জন্যে ব্রিটিশ পাকাপোক্ত ব্যবস্থায় এগিয়ে চলেছে। মৌখিক প্রতিবাদে ব্রিটিশকে নিরস্ত করা যাবে না। তারা স্থির করল অসিকে বাধা দিতে হবে অসি দিয়ে। শান্ত আগরোর উপত্যকায় যুদ্ধের অশান্ত আগুন জ্বলে উঠল।

যুদ্ধের প্রথম পর্ব আরম্ভ করলেন স্থানীয় পাখতুনদের অন্যতম নেতা আতা মোহম্মদ খাঁ। তিনি মাত্র পাঁচশ লোকের লশ্‌কর নিয়ে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ঘাঁটি আক্রমণ করে ঘাঁটিরক্ষী ব্রিটিশ সৈন্যকে পরাস্ত করলেন। ইংরাজ কর্তাব্যক্তিদের ধারনা ছিল যে সমতল ভূমির ইউসুফজাইরা ইংরাজের অনধিকার অগ্রগতিতে বাধা দান করবে না, তাই তাঁরা আগরোর ঘাঁটিতে বৃহৎসংখ্যক ফৌজ রাখেনি। আতা মোহম্মদ খাঁ দ্বারা ব্রিটিশ ঘাঁটি জয়ের খবর পেয়ে তাঁরা সত্বর একটি গুর্খা সৈন্য বাহিনী পাঠালেন সেখানে কর্নেল রডনের অধীনে, এক ব্যাটারি গোলন্দাজ সৈন্যও দেওয়া হল তাঁর সঙ্গে। সংঘর্ষে আতা মোহম্মদ খাঁ পরাস্ত হয়ে বন্দি হলেন কর্নেল রডনের হাতে।

দেশদ্রোহী কুইজলিং এর অভাব কোনও দেশে নেই , পাখতুনিস্তানেও ইংরাজের তল্পিদার ছিল। কর্নেল রডনের সঙ্গে যুদ্ধে আতা মোহম্মদ খাঁর পরাজয়ের সংবাদে উৎসাহিত হয়ে ইংরাজের তল্পিদার এক সামন্ততান্ত্রিক উপজাতীয় প্রধান, আম্বের নবাব তাঁর ইংরাজ মুরুব্বিদের খুশি করার উদ্দেশ্যে তাঁর নিজস্ব লশ্‌কর নিয়ে আগরোর উপত্যকায় ইউসুফজাইদের দিলরোবি গ্রামের ওপর চড়াও হয়ে গ্রামটি দখল করে নিলেন। আগরোরে কর্নেল রডনের সাফল্যে ও আম্ব এর নবাব কর্তৃক দিলরোবি গ্রাম দখল দেখে ইংরাজ কর্তারা ধরে নিলেন যে আগরোর উপত্যকার উপজাতীয়দের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। ইংরাজ কর্তারা উপজাতীয় নেতাদের কাছে হুকুম পাঠালেন তাদের আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মসমর্পণ করতে। ইউসুফজাইরা সে হুকুম অগ্রাহ্য করে পাল্টা দাবি করল যে সর্দার আতা মোহম্মদ খাঁকে মুক্তি দিতে হবে। ইউসুফজাইদের দাবি স্বীকার করে নেবার ইচ্ছে উদ্ধত ইংরাজ কর্তাদের ছিল না, তাঁরা আতা মোহম্মদ কে মুক্তি দেবার কথা কানে তুললেন না, ফলে ইউস্যফদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিল আর সেই অসন্তোষ দমন করা স্থানীয় ব্রিটিশ সৈন্যের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।

ইউসুফজাইদের মনোবল যে ভেঙে পড়েনি সেটা  প্রমান হলো তাদের দিলরোবি  গ্রামে  আম্ব এর নবাবের সৈন্যকে প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ করায়। আম্ব এর নবাব ব্রিটিশের কাছ সৈন্য সাহায্য প্রার্থনা করায় কর্নেল রডন তাঁর সৈন্য দল পাঠালেন আম্ব এর নবাবের সৈন্যদের উদ্ধার করতে কিন্তু ব্রিটিশ সৈন্য  ইউসুফজাই লস্করের ব্যূহের মধ্যে ঘেরাও হয়ে গেল। সেই মুহূর্তে তিনটি বড় রকমের উপজাতীয় লশ্‌কর ব্রিটিশের বিরুদ্ধে এগিয়ে এল। সায়াদ এবং চগরজাই খণ্ড জাতীয় লশ্‌কর উপত্যকার মধ্যভাগ দিয়ে, হাসানজাই ও আকাজাই লশ্‌কর বাম দিক দিয়ে নেমে এল ও কর্নেল রডনের সৈন্যদলকে তিন দিক দিয়ে সাঁড়াশি আক্রমণ করল। কর্নেল রডেন সেই সাঁড়াশি আক্রমণের সামনে দাঁড়াতে না পেরে নিজের সৈন্য সমেত আগরোর উপত্যকা থেকে পশ্চাদপসরণ করলেন। 

আগরোর উপত্যকা থেকে কর্নেল রডনের পিছু হটার সঙ্গে সঙ্গেই পার্বত্য ইউসুফজাইরাও ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল। সমগ্র ইউসুফজাই এলাকায় ইংরাজের শাসন ভেঙে পড়ল, ব্রিটিশ প্রতিপত্তি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

পার্বত্য ইউসুফজাই অঞ্চলে ১৮৬৩ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতা ইংরাজের স্মৃতিপট থেকে তখনও মুছে যায়নি তাই তড়িঘড়ি কোনও ব্যবস্থা না নিয়ে একটি প্রভূত শক্তিশালী ব্রিটিশ বাহিনী গঠন করা হল আগে। অভিজ্ঞ সমরবিদ মেজর জেনারেল ওয়াইল্ড এর সেনাপতিত্বে যে বাহিনী পাঠানো হল ইউসুফজাইদের দমন করতে, তাতে ছিল চৌদ্দ হাজার পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য, দুশো পঁয়ত্রিশ জন অফিসার এবং ছাব্বিশটি দূরপাল্লার কামান ও তাঁর উপযোগী গোলন্দাজ সৈন্য। বিশাল ফৌজটিকে দু’ভাগে ভাগ করে এক ভাগের ভার দেওয়া হল ব্রিগেডিয়ার ভওগানকে এবং অন্যটির পরিচালনা করলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ব্রাইট।

গোলন্দাজ সৈন্য তাদের দূরপাল্লার কামান সব উপজাতীয় গ্রামগুলিকে লক্ষ করে সাজাল। তারপর আরম্ভ হল বিধ্বংসী অগ্নিময় গোলার উদ্গিরণ। গ্রামের পর গ্রাম ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্য প্রস্তুত ছিল, তারা প্রচণ্ড বেগে চার্জ করে আক্রমণ করল। শত শত ইউসুফজাইদের প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ইউসুফজাই লশ্‌কর পশ্চাদপসরণ করে পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিল। জেনারেল ওয়াইল্ড তাদের আত্মসমর্পণ করার দাবিতে তারা সাড়া দিল না।

timemachineseemanter01-mediumসেই সুসজ্জিত বিরাট ব্রিটিশ সৈন্য বাহিনীর সঙ্গে ইউসুফজাইদের পক্ষে সম্মুখ যুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব ছিল না, তারা গেরিলা যুদ্ধের পথ ধরল। যখনই ব্রিটিশ ফৌজ এগিয়ে যায় তাদের আক্রমণ করতে, উপজাতীয় লশ্‌কর সব উধাও হয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়, আবার ব্রিটিশ ফৌজ পিছু ফিরলেই লশ্‌কর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের হঠাৎ আক্রমনে ব্রিটিশ বাহিনীর রিয়ারগার্ডের অনেক মরে। এইরকম লুকোচুরি খেলা চলতে থাকে। ইউসুফজাইদের বিরুদ্ধে সেই অভিযান অমিমাংসিত অবস্থার মধ্যেই শেষ করতে হয় ইংরাজকে। কোনও পক্ষই পরাজয় স্বীকার করতে  রাজি ছিল না। একদিকে অস্ত্রবলে বলীয়ান ইংরাজের সাম্রাজ্য বিস্তারের তাগিদ, অন্যদিকে পাখতুনদের স্বাধীনতা রক্ষার প্রচেষ্টায় অটলতা।

আগরোর উপত্যকায় ব্রিটিশ রক্ষীদলকে বর্ধিত ও আরও শক্তিশালী করে জেনারেল ওয়াইল্ড তাঁর বাহিনী নিয়ে ১৮৬৯ সালে ফিরে গেলেন হিন্দুস্থানে। আগরোর উপত্যকা থেকে ব্রিটিশ বাহিনী অপসারণের পরক্ষণেই হাসনজাই, আকাজাই ও সায়াদ (ইউসুফজাই খণ্ডজাতি) লশ্‌কর এসে হানা দিল ব্রিটিশের নবপ্রতিষ্ঠিত ঘাঁটিগুলিতে। তাদের আক্রমণে কয়েকটি ঘাঁটি ধ্বংস হয়ে গেল, ব্রিটিশ রক্ষীদল আক্রমণ ঠেকাতে পারল না। কর্নেল রডনে আবার ছুটলেন আগরোরে একদল সৈন্য নিয়ে ঘাঁটি রক্ষীদের সাহায্য করতে।

উপত্যকায় তখন শীত পড়ে গেছে। ধীরে ধীরে শীতের প্রকোপ বেড়ে চলল আর উপত্যকায় তুষারপাত আরম্ভ হল। চারদিক বরফে ঢেকে গেল এবং সেই সঙ্গে পাখতুন লশ্‌করদের গতিবিধি হ্রাস পেল। কর্নেল রডনে নিশ্চিন্ত হলেন, মনে করলেন যে তাঁর সৈন্যদলের উপস্থিতির দরুন উপত্যকায় ইংরাজের মর্যাদা আবার কায়েম হল।

শীতকাল চিরদিনের জন্য থাকে না, গ্রীষ্মের আমেজ ফিরে আসতেই উপজাতীয় লশ্‌কররা আবার নব উদ্যমে গেরিলা যুদ্ধ আরম্ভ করে ব্রিটিশ সৈন্যকে হয়রান করা আরম্ভ করে দিল। ইউসুফজাইদের লশ্‌কর আলেয়ার মত উদয় হয়ে ব্রিটিশ অধিকৃত এলাকা ও ঘাঁটিগুলিকে তচ নচ করে দিয়ে আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। কর্নেল রডনে হালে পানি না পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন ও অবস্থা কতৃপক্ষকে জানালেন। পেশাওয়ারে ইংরাজের হাইকমান্ডে পরামর্শ সভা বসল সমরবিদ ও কূটনীতিজ্ঞদের নিয়ে। কী কৌশলে অবস্থা আয়ত্বে আনা যায় তাই নিয়ে অনেক আলোচনার পর স্থির হলো ইউসুফজাইদের প্রতি অল্প কিছুটা বদান্যতা দেখানো আর সেই সঙ্গে তাদের শক্ত হাতে দমন করা।

বদান্যতা হিসাবে বন্দি আতা মোহম্মদ খাঁকে মুক্তি দেওয়া হল আর দমননীতির প্রয়োগ করা হল ইউসুফজাইদের আগরোর উপত্যকায় চাষ-আবাদের কাজ নিষিদ্ধ্ব করে, উপরন্তু যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া গ্রামগুলির পুণর্নির্মাণ করাও অপরাধ বলে ঘোষণা করা হল। বলাবাহুল্য যে, নিষেধাজ্ঞা পালনের তদারকি করার জন্য উপত্যকায় বেশ বড় আর শক্তিশালী সৈন্য দলও মোতায়েন করা হল। 

ইংরাজ কর্তারা মনে করেছিলেন যে আতা মোহম্মদকে মুক্তি দেওয়ায় ইউসুফজাইদের মধ্যে অনেকেই ইংরাজের প্রতি কৃতজ্ঞ হবে আর কতক ইংরাজি ফৌজের উপস্থিতির জন্য শায়েস্তা থাকবে। ইংরাজের সেই বহুমুখি চাল কিন্তু সফল হল না। ইউসুফজাই অঞ্চলে যুদ্ধ ও রক্তক্ষয় দৈনন্দিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল , ইউসুফজাইর কোন না কোনও খণ্ড জাতি প্রায় প্রত্যহ হানা দিত ব্রিটিশ রক্ষীসৈন্যের ওপর। ইউসুফজাই এলাকায় টিঁকে থাকার জন্য ইংরাজকে অভিযানের পর অভিযান চালিয়ে যেতে হয় তাদের বিরুদ্ধে। 

রশীদ যথানিয়মে গোটা দুই স্কচের পেগ খেয়ে আরম্ভ করল,  

আজ যে গল্প আরম্ভ করব তার মধ্যে কতকগুলি বাইরের ঘটনার অবতারণা করতে হবে। সেগুলি আফগানিস্তানের তথা পাখতুনিস্তান এর সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে জড়িত ও যে সব ঘটনার প্রভাব এই দেশের গতি ও ধারার ওপর প্রবল ভাবে পড়েছে।

১৮৪৪ সাল থেকে দোস্ত মহম্মদের শাসন কালে আফগানিস্তানে ব্রিটিশের স্বার্থ বা প্রভাব ক্ষুণ্ণ হয়নি আর পাখতুনিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিতে ব্রিটিশের ক্রমশ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দোস্ত মোহম্মদ নিষ্ক্রিয়ই ছিলেন। ১৮৬৩ সালে দোস্ত মোহম্মদের মৃত্যুর পর দেশের শাসনভার চলে যায় তাঁর এক পুত্র শের আলির হাতে। সেই সময় রাশিয়ার রাজদরবারে ও ইংল্যান্ডে পার্লামেন্টের নীতির পরিবর্তনের ফলে আফগানিস্তানের তথা পাখতুনিস্তানের আকাশে দুর্ভাগ্যের মেঘ ঘন থেকে ঘনতর হয়ে উঠল।

১৮৬৪ সালে রুশ সম্রাটের প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স গরশাভক লক্ষ করলেন যে রুশ সাম্রাজ্যের দক্ষিণ পশ্চিমে মধ্য এশিয়ার ছোট ছোট রাজ্যগুলির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ , ঘুন ধরা কাঠের মত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে চলেছে। সে অবস্থায় রুশ সাম্রাজ্যের দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া সম্ভব। প্রিন্স গরশাভক পরামর্শ দিলেন যে সাম্রাজ্যের সীমান্ত সুদৃঢ় করার প্রয়োজনে ওই সব পঙ্গু রাজ্যগুলিকে রাশিয়ার অধিকারে আনা অপরিহার্য।

প্রিন্স গরশাভকের পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৮৬৫ সালে তাশকন্দ ও বছর দুই পরে সমরকন্দ ও আরও কিছু সময়ের মধ্যে খীভা, রুশ সম্রাট অধিকার ও নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করে নিলেন। কোনও কোনও ইংরাজ রাজনীতিজ্ঞের মতে রাশিয়ার এই পদক্ষেপ ভারত সাম্রাজ্যের পক্ষে অশুভ ইঙ্গিত। যাইহোক রুশ সাম্রাজ্য আফগানিস্তানের উত্তর সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তারিত হল।

স্যর হেনরি রলিনসন অ্যাংলো আফগান যুদ্ধে সামরিক অফিসার রূপে কাজ করেছিলেন এবং তিনি মধ্য এশিয়া সম্বন্ধে প্রচুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন সেই সময়। তিনি ছিলেন ঘোরতর রুশবিদ্বেষী ও কট্টর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদি। স্যর হেনরি রাশিয়ার আফগানিস্তানের দিকে গুটি গুটি এগিয়ে আসা দেখে বিচলিত হলেন। তিনি ১৮৬৮ সালে ইংল্যান্ডে ভারত সচিব স্যর নর্থকোটের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন রাশিয়ার এগিয়ে এসে বোখারা অধিকার করায় রুশ সম্রাটের পক্ষে আফগানিস্তানে নিজের প্রভাব কায়েম করা সুনিশ্চিত এবং তার ফলে এশিয়াতে ব্রিটিশ প্রাধান্য খর্ব হওয়া স্বাভাবিক। এরূপ অবস্থায় ব্রিটিশের পক্ষে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থেকে রুশ সম্রাটকে আফগানিস্তানে নিরঙ্কুশ প্রভাব বিস্তার করার সুবিধা দেওয়া উচিত হবে না। তিনি পরামর্শ দিলেন যে ইংরাজের স্বার্থরক্ষার তাগিদে বর্তমান আফগান নৃপতি শের আলিকে বশীভূত ও কিছুটা শক্তিশালী করা একান্তই প্রয়োজন। কিন্তু সে সময় ইংরাজের নীতি ছিল রাশিয়ার সঙ্গে বিবাদ বা আফগানিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা। কাজেই স্যর হেনরি রলিনসন এর পরামর্শ আপাতত বিশেষ আমল পেল না। ভারতের ইংরাজ কর্তারা আমীর শের আলিকে কিছু টাকা খয়রাত করলেন শুধু।

শের আলি চাইছিলেন যে ইংরাজ তাঁর সঙ্গে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকারস্বরূপ একটি চুক্তি সম্পন্ন করুক। তখন রাশিয়া তাঁর দ্বার দেশে এসে পৌঁছেছে, কাজেই শের আলি ইংরাজের কাছ থেকে শুধুমাত্র কিছু খয়রাতি টাকা নিয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না। তিনি ইংরাজের কাছ থেকে সুস্পষ্টভাবে জানতে চাইলেন যে রাশিয়া যদি আফগানিস্তান আক্রমণ করে সে ক্ষেত্রে ব্রিটিশ কী পন্থা অবলম্বন করবে। ভারতের বড়লাট ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট এর তরফ থেকে শের আলিকে জানিয়ে দিলেন যে ইংরাজের সঙ্গে রুশ সম্রাটের চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া আফগানিস্তানের স্বাধীনতা খর্ব না করার অঙ্গীকারে আবদ্ধ। শের আলি তাঁর প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর ইংরাজের কাছ থেকে পেলেন না, অথচ তাঁর সিংহাসন নিরাপদ রাখার জন্য দুই দৈত্যের ,( রাশিয়া ও ইংরাজ)  মধ্যে যে কোনও একটিকে পৃষ্ঠপোষক হিসাবে প্রয়োজন।ইংরাজের কাছে কোনও প্রতিশ্রুতি না পেয়ে ১৮৭৫ সালে শের আলি রাশিয়ান তুর্কিস্তানের গভর্নর জেনারেল কফম্যানের দ্বারস্থ হলেন। অনিবার্য ভাবে শের আলির সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক স্থাপিত হল।

ইতিমধ্যে ইংল্যান্ডে গ্ল্যাডস্টোনের পার্টির পরাজয় ঘটায় ইংল্যান্ডের শাসন ভার চলে গেল ডিজ়রেলির হাতে ও সেই সঙ্গে আফগানিস্তান সম্বন্ধে ইংরাজের নীতিরও পরিবর্তন হল।আফগানিস্তানের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতির অবসান হল। নতুন নীতি হল আফগানিস্তানের দিকে অগ্রগতি ও সেখানে ইংরাজের অপ্রতিহত প্রভাব ও প্রতিপত্তি কায়েম করা। নতুন নীতির সমর্থক লর্ড এডওয়ার্ড রবার্ট লিটনকে পাঠানো হল ভারতে রাজপ্রতিনিধি ও বড়লাটের পদে। লর্ড লিটন আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালানো মনস্থ করলেন শের আলির সঙ্গে রাশিয়ার আঁতাত চূর্ণ করার উদ্দেশ্যে।

আফগানিস্তানে সাফল্যের সঙ্গে অভিযান চালাতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন যোগাযোগ রক্ষা ও রসদ প্রভৃতি চলাচলের জন্য ভালো সড়ক এবং দুর্ধর্ষ আফগান উপজাতি পাখতুনদের আয়ত্বে রাখা। কোহাট গিরিবর্ত্মের ভিতর দিয়ে যে সড়ক পেশাওয়ার এর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করত সেটা গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত ছিল না , শুধু মালবাহী খচ্চর প্রভৃতি সে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে পারত। সংকীর্ণ সড়কের দু পাশে সব খাড়া পাহাড়ের সারি চলে গেছে কোহাট গিরিসংকট থেকে পেশাওয়ার পর্যন্ত। সীমান্তের সড়কগুলিকে প্রশস্ত করে খচ্চরচালিত মালবাহী গাড়ি ও ভারি কামানের গাড়ি চলার উপযুক্ত করা অবশ্য প্রয়োজন আফগানিস্তান অভিযানের জন্য। ব্রিটিশ সামরিক কর্তারা প্রথমে কোহাট গিরিসংকটের সড়ক সম্প্রসারণের কাজ আরম্ভ করা মনস্থ করলেন।

কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে ও নিরুপদ্রবে সড়ক নির্মাণের কাজ শেষ করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন ওই অঞ্চল সমূহের আফ্রিদি খণ্ডজাতিগুলির সম্মতি ও সহযোগ। কোহাট গিরিসংকটের আশেপাশে যে খণ্ডজাতির লোকেরা বাস করত তাদের বোঝাবার চেষ্টা করা হল যে তারা যদি রাস্তা তৈরি করার কাজে বাধা না দেয় তাহলে তাদের প্রভূত মঙ্গল হবে। সড়ক তৈরির কাজে তারা অর্থ উপার্জন করতে পারবে ও ভবিষ্যতে সড়কের কল্যাণে তাদের ব্যবসাবাণিজ্যের পথ সুগম হবে।

স্থানীয় আফ্রিদিরা ইংরাজের পরামর্শ কানে তুলল না, ইংরাজের বার্তাবহকে তারা রূঢ় ভাষায় অসম্মতি জানিয়ে বিদায় দিল। এরপর ব্রিটিশ কর্তাদের পক্ষে আর আফ্রিদি খণ্ড জাতিটির মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী সেজে থাকা গেল না। ইংরাজ অধিকারি স্থানীয় আফ্রিদিদের নির্দেশ দিলেন তাদের প্রতিনিধি জির্গা কোহাট ব্রিটিশ হেডকোয়ার্টার্সে পাঠাতে ও সড়ক তৈরিতে কোনও বিঘ্ন সৃষ্টিা না করার অঙ্গীকারপত্র স্বাক্ষর করতে। আফ্রিদিরা সে নির্দেশ অগ্রাহ্য করল এবং তারা যে ইংরাজের তাঁবেদার নয় সে কথাটা বুঝিয়ে দেবার জন্য কোহাট গিরিসংকটের প্রবেশ পথে যে ব্রিটিশ ওয়াচ টাওয়ার ছিল সেটা ধ্বংস করে দিল। ফলে কোহাট সামরিক অধিনায়ক স্থির করলেন আফ্রিদি খণ্ডজাতিটিকে শায়েস্তা করার জন্য তাদের পেটে মারতে হবে। খণ্ডজাতিটির এলাকা অবরোধ করা হল ঘেরাও করে ব্যবস্থা করা হল তাদের খেতের ফসল থেকে তাদের বঞ্চিত করার। লেফটেন্যান্ট কর্নেল রজার্সকে পাঠানো হোল সেই বর্বরোচিত কাজ সমাধা করতে। 

লেফটেন্যান্ট কর্নেল রজার্স রওনা হলেন কোহাট পাস এর দিকে। তাঁর সঙ্গে ছিল এক ব্যাটালিয়ান পদাতিক সৈন্য, কিছু অশ্বারোহী সৈন্য ও এক কোম্পানি সশস্ত্র স্যাপার্স, এ ছাড়া কিছু ভাড়াটে লোকও ছিল খেতের ফসল কাটার জন্য। কর্নেল রজার্সের সৈন্যবাহিনী আফ্রিদি গ্রামগুলির নিকটবর্তী হওয়া মাত্রই আফ্রিদিদের রাইফেলের গুলি অতর্কিতে ঝাঁকে ঝাঁকে এসে পড়ল ব্রিটিশ সৈন্য দলের ওপর। সৈন্যদলের অনেক হতাহত হওয়ায় রজার্স সাহেব আর এগোতে পারলেন না। তিনি সেদিনকার মত রণে ভঙ্গ দিয়ে কোহাট হেডকোয়াটার্সে ফিরে গেলেন। পর দিন সৈন্য পুণর্গঠন করে তিনি আবার চড়াও হলেন কোহাট পাস এ, এবার তাঁর সঙ্গে দুটি কামানও ছিল। তিনি আফ্রিদিদের রাইফেলের পাল্লার বাইরে তাঁর সৈন্য সাজালেন ও গোলন্দাজদের হুকুম দিলেন আফ্রিদিদের ওপর গোলাবর্ষণ করতে।

কামানের গোলায় আফ্রিদি খণ্ড জাতির যোদ্ধারা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তারপর পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্যের রক্ষণাবেক্ষণে তাদের খেতের সমস্ত ফসল লুণ্ঠন করা হল। কর্নেল রজার্স বুক ফুলিয়ে সেই সব ফসল নিয়ে কোহাটে চলে গেলেন। এলাকায় অবরোধের ফলে আফ্রিদি জাতিটির পক্ষে বাইরে থেকে খাদ্যদ্রব্য আমদানি করা অসম্ভব, অথচ তাদের ফসল ইংরাজ লুণ্ঠন করে নিয়ে গেছে , কাজেই তাদের স্ত্রীলোক শিশুরাও অনশনে দিন কাটাতে লাগল। তাদের অবস্থা অসহনীয় হয়ে উঠলো। অনন্যোপায় হয়ে তারা তাদের এলাকায় সড়ক তৈরি করায় সায় দিল।

ইংরাজের স্যাপাররা চলল সড়ক তৈরি করতে করতে,  কোথাও পাখতুনদের খেতখামার দলিত করে কোথাও পাহাড়তলি ডিনামাইটের বিস্ফোরণে ভেঙে দিয়ে। যে দেশে পায়ে হাঁটা দুর্গম পথ ছাড়া কিছু ছিল না সেখানে প্রশস্ত সড়ক তৈরি হল ব্রিটিশের রনসম্ভারবাহী গাড়ি যাতায়াতের জন্য।

এমনি করে ব্রিটিশের সশস্ত্র স্যাপাররা পৌঁছল আফ্রিদিদের আর একটি ছোট খণ্ডজাতির গ্রাম আয়মলচুরাতে। এই খণ্ডজাতিটি রুখে দাঁড়াল স্যাপারদের সামনে। তারা ইংরাজকে তাদের এলাকায় প্রবেশ করতে দেবে না আর এলাকার ভিতর রাস্তাও তৈরি করতে দেবে না এ কথা জানিয়ে দিল। স্যাপার দলের অধিনায়ক দেখলেন যে তাঁর দলের পক্ষে জবরদস্তি সড়ক তৈরির কাজে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয় , অস্ত্র ও লোকবলে গ্রামবাসীদের পাল্লা বেশ ভারি। তিনি সড়ক তৈরির কাজ বন্ধ করে পিছিয়ে গেলেন।

দু’দিন পরের ঘটনা। অন্ধকার রাত, অন্ধকারকে আরও নিবিড় করে রেখেছে আসে পাশের পাহাড়। দু’চার জন প্রহরী বাদে সমস্ত গ্রাম ঘুমন্ত , সেই সময় ভীমগর্জনে ব্রিটিশের কামান গর্জে উঠল। গ্রামবাসীরা ঘুমচোখে উঠে কোনওমতে ছুটল নিজের নিজের জাজয়েল নিয়ে গ্রামের মিনারের দিকে, কিন্তু সকলে সমবেত হবার আগেই শুনতে পেল লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাউক্রাফট এর মেগাফোন মারফত গুরুগম্ভীর আদেশ “ অস্ত্রশস্ত্র ফেলে দাও এবং আত্মসমর্পণ কর।”

গ্রামপ্রধান সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাসীদের বললেন  গ্রামের সমস্ত স্ত্রীলোক ও শিশুদের দ্রুত উত্তরদিকের পাহাড়ের কোলে আশ্রয়ের জন্য পাঠিয়ে দিতে এবং তারা পাহাড়ের ভিতর নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে গেলে পুরুষ মানুষেরা যেন জাজেয়েলের গুলিতে ব্রিটিশকে উত্তর দেয়। কিন্তু স্ত্রীলোক ও শিশুরা গ্রাম ছাড়ার পূর্বেই রাউক্রাফটের সৈন্য দল গ্রাম ঘিরে ফেলল। তখন গ্রামবাসীদের পক্ষে অস্ত্র পরিহার করা ছাড়া অন্য কোনও পথ থাকল না। তারা সড়ক তৈরিতে বাধা দান না করার অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করল। ইংরাজের স্টিমরোলার পাখতুনিস্থান এর বুকের ওপর দিয়ে এগিয়ে চলল।

কর্নেল রাউক্রাফট কিন্ত আয়মলচুরাবাসীদের লিখিত অঙ্গীকারপত্র নিয়েই সন্তুষ্ট হলেন না, তিনি খণ্ডজাতিটির সাতশ জন লোককে নিয়ে গেলেন বন্দি করে তাদের অঙ্গীকার পূরণের জামিনস্বরূপ আর তাদের সমস্ত খেতখামারের পাকা ফসল নষ্ট করে দিয়ে গেলেন।

কোহাট গিরিবর্ত্মের রক্তপিপাসা বড়ই নিষ্ঠুর। ইংরাজের সড়ক প্রস্তুতকারি স্যাপাররা আয়মলচুরা গ্রাম থেকে এগিয়ে পৌঁছল আফ্রিদিদের আর এক জাতি জোয়াকিদের গ্রামে। এবার স্যাপারদের থমকে দাঁড়াতে হল। তাদের সামনে সারি সারি জোয়াকিদের রাইফেল আর তাদের বজ্রগম্ভীর হুঙ্কার ‘ আর এক পা এগিয়ো না , রক্তপাত যদি না চাও তাহলে ফিরে যাও।’

কিছুক্ষণ পরেই জোয়াকিদের রাইফেল থেকে গুলিবর্ষণ হয়ে স্যাপারদের ও রক্ষী পদাতিক সৈন্যদলকে আচ্ছন্ন করে দিল। তারা পিছু হটতে বাধ্য হল। ইংরাজ সরকারের তরফ থেকে জোয়াকি নেতাদের কাছে জবাব তলব করা হল আর দাবি করা হল তাদের অপকর্মের (?) খেসারত। উত্তরে জোয়াকিরা ইংরাজের সদ্যস্থাপিত টেলিফোন লাইন সব নষ্ট করে দিল, একটি ব্রিটিশ রসদবাহি লরির কনভয় লুঠ করল আর কোহাট-খুশালগড় রাস্তার মাঝখানের সেতুটি ধ্বংস করে দিল। জোয়াকিরা অন্যান্য আফ্রিদি খণ্ডজাতির তুলনায় অধিক শক্তিশালী। দেখা গেল যে কাছাকাছি যে ব্রিটিশ সৈন্য দল মোতায়েন আছে, তাদের দিয়ে জোয়াকিদের দমন করা অসম্ভব। অথচ সড়ক সম্প্রসারণের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ না করতে পারলে আফগানিস্তানে যুদ্ধাভিযান সুষ্ঠুভাবে চালানো সম্ভব নয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আফগানিস্তানকে তিন দিক থেকে যুগপৎ আক্রমণ করার কথা।জেনারেল স্যাম ব্রাউন এর বাহিনী খাইবার পাস এর পথ হয়ে জালালাবাদ ও কাবুলের ওপর , জেনারেল রবার্টস এর বাহিনী গজনির ওপর এবং জেনারেল স্টুয়ার্ট এর বাহিনী কোয়েটা হয়ে কান্দাহার এর ওপর। তিনটি বাহিনী একই সময় আক্রমণ করতে না পারলে অভিযান পণ্ড হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কাজেই সড়ক তৈরির কাজ চটপট করার তাগিদে জোয়াকিদের দমন করার জন্য কর্নেল মোকাটার অধিনে একটি শক্তিশালী সৈন্যদল পাঠানো হল সত্বর। তাদের সঙ্গে পেশাওয়ার এর কমিশনার সাহেবও ছিলেন। মোট কোথা, এক হাতে অস্ত্রের ঝনঝনা আর এক হাতে কূটনীতির ঝুলি। কর্নেল মোকাটার সৈন্য দলকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হল। প্রথম ভাগটিকে নির্দেশ দেওয়া হল সরাসরি জোয়াকি এলাকায় প্রবেশ করতে। দ্বিতীয় ভাগটি সেই সময় ছোট ছোট খণ্ডযুদ্ধ করে জোয়াকি যোদ্ধাদের তাদের এলাকার সীমানায় ব্যস্ত রাখতে , যাতে তারা টের না পায় যে ব্রিটিশ সৈন্য দলের একটি শক্তিশালী অংশ তাদের এলাকার অভ্যন্তরে ক্রমাগ্রসর হচ্ছে। সৈন্য দলের তৃতীয় অংশটিকে পাঠানো হল জোয়াকিদের পিছন দিক আগলাবার জন্য যাতে জোয়াকিরা পশ্চাদপসরণ করে পাহাড়ের মধ্যে আত্মগোপন করতে না পারে।

এই অঞ্চলের জোয়াকিরা ব্রিটিশের রণকৌশল বুঝতে না পেরে ফাঁদে পা দিল। জোয়াকি লশ্‌করটি তাদের সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করল ব্রিটিশের দ্বিতীয় কলম এর সঙ্গে যুদ্ধে। ইতিমধ্যে প্রথম ও তৃতীয় কলম এগিয়ে গেল তাদের নির্দিষ্ট লক্ষের দিকে। দ্বিতীয় কলমটি কিছুক্ষণ ছোট ছোট আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণ করার পর তাদের আর্টিলারি গোলাবর্ষণ আরম্ভ করল। জোয়াকি লশ্‌করটির ব্যুহ ভেদ হয়ে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। ব্রিটিশ সৈন্য দলের প্রথম ও তৃতীয় কলমের সঙ্গে জোয়াকিদের আর একটি লশ্‌করের মোকাবেলা হল জোয়াকি এলাকার অন্তর্দেশে তুরকাই নামক গ্রামে। গ্রামটি ছিল একটি ছোট উপত্যকার মধ্যে সমতলভূমিতে, ব্রিটিশ অশ্বারোহী সৈন্যের চার্জ করার জন্য অনুকূল জায়গা। অশ্বারোহী সৈন্য দলের তীব্র আক্রমণের সামনে জোয়াকি লশ্‌করটি টিকে থাকতে পারল না।

যুদ্ধের ফলাফল কর্নেল মোকাটার পক্ষে খুবই সন্তোষজনকভাবে শেষ হল। জোয়াকিরা  দুটি খণ্ডযুদ্ধেই ব্রিটিশ সৈন্য দলের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হল। সড়ক তৈরির কাজ এগিয়ে চলল এবং কর্নেল মোকাটা কিছু পদাতিক সৈন্য নিয়ে সেখানে রেখে বাকি পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হলেন জোয়াকি এলাকার আরও অভ্যন্তরে। রওনা হবার আগে নির্দেশ দিয়ে গেলেন যে পদাতিক সৈন্যদল যেন তুরাকাই গ্রামটি ঘিরে রাখে আর কোনও গ্রামবাসীকে গ্রামের বাইরে যেতে না দেওয়া হয়। কিন্তু রাতের অন্ধকারে একটি লোক চুপিসাড়ে ব্রিটিশ সৈন্যের বেড়াজালকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল উত্তরদিকের পাহাড়ের মধ্যে। তার লক্ষস্থল পাহাড়ের আড়ালে জোয়াকিদের অন্য একটি ছোট গ্রাম। সেখানে পৌঁছে সে সেই গ্রামের নেতা বাবর খাঁর সাহায্য প্রার্থনা করল।

 বাবর খাঁ এর সম্বল মাত্র শ’খানেক লোক। তিনি তাদের নিয়ে এগিয়ে গেলেন রাতের অন্ধকারে তুরাকাই গ্রামের দিকে। তাঁর যোদ্ধারা নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ল গ্রামের চারদিকের পাহাড়গুলিতে। তারা কেউ পাহাড়ের ফাটলে, কেউ বা বিরাটকায় পাথরের আড়ালে তাদের জাজয়েল নিয়ে দিনের আলোর অপেক্ষা করতে লাগল। ব্রিটিশ সৈন্য দলটি তখন টহল দিচ্ছে গ্রামের চারদিক ঘিরে।

বাবর খাঁ এর  যোদ্ধা সংখ্যা অল্প হলেও তারা প্রত্যেকেই দক্ষ মার্ক্সম্যান অর্থাৎ অব্যর্থ লক্ষভেদী। রোশন খাঁ তাদেরই একজন। তাঁর ওপর ভার পড়ল সংকীর্ণ সর্পিল পথটি আগলাবার , যেটি গ্রামের পাশ থেকে উঠে গেছে পাহাড়ের একটি চূড়া পর্যন্ত।

ভোরের আবছা আলো গ্রামের ওপর পড়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে পাহাড়ের একদিক থেকে জাজয়েলের কয়েকটি ফায়ারের শব্দ হল। টহলদার ব্রিটিশ সৈনিকরা প্রথমটা সেই আকস্মিক ফায়ারের শব্দ শুনে অবাক হয়ে গেল , তারপর বেয়নেট চড়ানো রাইফেল উঁচিয়ে ছুটল সে দিকে কিন্তু জাজয়েলের ফায়ার তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে গেল। টহলদার সৈন্যের দলপতি চোখে দুরবিন লাগিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন পাহাড়ের দিকে, কিন্তু শত্রুর কোনও হদিশ পেলেন না। টহলদার সৈনিকরা তাদের দলপতির নির্দেশে পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠতে আরম্ভ করল। সেই সময় বিপরীত দিকের পাহাড় থেকে একটিমাত্র ফায়ার হল আর টহলদার দলপতি মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়লেন। দলের অন্যান্য সৈনিকরা সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের গায়ে শুয়ে পড়ল আত্মরক্ষার জন্য কিন্তু পাহাড়ের এদিক সেদিক থেকে একটি করে ফায়ার হয় আর এক একজন টহলদার গুলিবিদ্ধ হয়ে চিরতরে নিশ্চল হয়ে যায়।

এবার গ্রামের পাশে মূল সৈন্যশিবির থেকে সব ব্রিটিশ সৈন্য নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ল জাজয়েল ফায়ারের শব্দ শুনে। তারা টহলদারদের অবস্থা দেখে ছুটল পাহাড়ের দিকে তাদের সেই মৃত্যুজালের ভিতর থেকে উদ্ধার আর শত্রুদের খুঁজে বার করার উদ্দেশ্যে। ব্রিটিশ সৈন্যদল ছড়িয়ে পড়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে লাগল কিন্তু যে জোয়াকিদের জাজয়েলের পাল্লার ভিতর গিয়ে পড়ে, চোরা ফায়ার এর গুলি তাকেই বিদ্ধ করে।

এমনি করে ইংরাজ সৈন্য দলের বেশ কিছু লোক হতাহত হওয়ায় তাদের কম্যান্ডার অদৃশ্য শত্রুর পিছনে ধাওয়া করার চেষ্টা ত্যাগ সেনাধ্যক্ষ কর্নেল মোকাটার কাছে বার্তা পাঠালেন যে জোয়াকি পাখতুনদের একটি বড় ও শক্তিশালী লশ্‌কর তুরাকাই গ্রামে ব্রিটিশ রক্ষী সৈন্যদলকে আক্রমণ করেছে। সংবাদ পাওয়া মাত্র কর্নেল মোকাটা তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে রওনা হলেন তুরাকাই গ্রামের দিকে।

কর্নেল মোকাটা সৈন্যবাহিনী সুষ্ঠুভাবে সাজিয়ে তাদের হুকুম দিলেন গ্রামের চারদিকের পাহাড়ে উঠে শত্রুর সন্ধান করে তাদের শেষ করে দিতে। কিন্তু পাহাড়ের খানাখন্দ থেকে অব্যর্থ গুলির নিশানার বিরুদ্ধে তাদের অগ্রগতি অত্যন্ত শ্লথ হয়ে পড়ল। অদৃশ্য শত্রুর সম্ভাব্য আত্মগোপনের স্থলগুলি লক্ষ করে ঝাঁকে ঝাঁকে মাসকেটের গুলিবর্ষণ করা হয় আর উত্তরে এদিক সেদিক থেকে  কয়েকটি করে শত্রুর ফায়ার শোনা যায় আর প্রত্যেকটি ফায়ারের গুলিতে একটি করে সৈনিক  ধরাশায়ী হয়। বার বার ঝটিকা আক্রমণ চালিয়েও পাখতুন যোদ্ধাদের চোরা গুলির ব্যূহ ভেদ করে পাহড়ের ওপরে উঠতে পারল না ব্রিটিশ সৈন্যদল। একমাত্র ল্যান্স কর্পোরাল উডস্ একটি সংকীর্ণ সর্পিল পথ ধরে নিপুণতার সাথে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল।

ল্যান্স কর্পোরাল উডস্ যখন প্রায় শিখরের কাছে পৌঁছেছে তখন একটা মোড় ঘুরে একটু গাছের আড়ালে গিয়ে পড়ল একেবারে রোশন খাঁর সামনে। রোশন খাঁ তার জাজে়য়েল উডস্ এর বুকের কাছে তুলে ট্রিগার টানল কিন্তু শুধু খট করে একটা শব্দ হল, ফায়ার হল না।  তাঁর জাজায়েলে তখন গুলি শেষ হয়ে গেছে। রোশন খাঁ তার জাজ়েয়েল ফেলে দিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে কোমরবন্দ থেকে ছোরা বার করল, ঠিক সেইক্ষণে উডস তার মাস্কেটে লাগানো  বেয়নেট রোশন খাঁর পেটে আমূল বিদ্ধ করে দিল। প্রায় একই সময়ে রোশন খাঁ তার ছোরা চালাল উডস এর পেটে। দুজনেই প্রায় একই সঙ্গে ধরাশায়ী হল পাশাপাশি।  দুজনেরই পেট থেকে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে চলেছে, যন্ত্রণায় সমস্ত শরীর মোচড় দিয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে দুজনেরই চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল আর সেইসঙ্গে জাগল প্রচণ্ড জল পিপাসা। ল্যান্স করপোরাল উডস তার দুর্বল ও নিস্তেজ হাতে নিজের জলের ক্যানটিনটা টেনে নিয়ে মুখে দিল। জল দেখে রোশন খাঁ ক্ষীণ স্বরে ‘ উবও’ (জল) বলে তার কম্পিত হাত বাড়িয়ে দিল।

“ শত্রু, শত্রুকে জল কোন মতেই দেব না” এ কথাটি উডস এর মনে উদয় হতেই তার ভিতর থেকে আর একজন যেন বলে  উঠল ‘এই বিদেশী আমার শত্রু কোন যুক্তি অনুসারে ? এর সঙ্গে তো আমার ব্যক্তিগত কোনও শত্রুতা নেই ? আমি এসেছি নিজের দেশ ও স্ত্রী পুত্র কন্যা ছেড়ে আমাদের সাম্রাজ্যবিস্তার করবার কাজে , কিন্তু কার সাম্রাজ্য ? কিছু সংখ্যক বণিকের স্বার্থ বই ত নয়। এই বণিকরাই কি আমাদের  দেশে আমাদের মত লক্ষ লক্ষ দরিদ্র লোকের রক্ত শোষণ করছে না ? সেই বণিকদের স্বার্থের খাতিরে আমরা এসেছি অপরের দেশ লুণ্ঠন করতে, এই সব দেশের মানুষকে পদানত করতে ও তাদের গলায় দাসত্বের জঘন্য শিকল পরাতে যাতে আমাদের অর্থশালী বনিক সম্প্রদায় মানুষের রক্তস্রোত ছেঁকে আরও সম্পদ রত্ন ঘরে তুলতে পারে। আমাদের সামনে তুলে ধরা হয় বড় বড় ভূয়ো আদর্শ , শোনানো হয় বড় বড় বুলি- ইংরাজের সাম্রাজ্য , ইংরাজের সিংহাসন, ইংরাজের গৌরব। কার সাম্রাজ্য, কার সিংহাসন , কার গৌরব’? উডস এর ঠোঁটের কোনে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল, সে তার জলের ক্যানটিনটা কম্পিত হাতে রোশন খাঁর মুখের কাছে তুলে ধরল। রোশন খাঁ দু ঢোক জল খেল, তারও ঠোঁটের কোনে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল, তার পর কষ গড়িয়ে জল পড়ে রক্তের সঙ্গে মিশে গেল। তাদের দুজনেরই চোখের সামনে গাঢ় অন্ধকার, আর কোনও যন্ত্রণা নেই শুধু গলায় একটু ঘড় ঘড় শব্দ। দুজনের রক্ত এক ধারায় মিশে গড়িয়ে চলেছে একটা মসৃণ পাথরের ওপর দিয়ে। জলের ক্যান্টিনটা পড়ে গেছে মাটিতে, একজনের হাত অন্যজনের হাতের ওপর তখনও মৃদু মৃদু কম্পিত হচ্ছে। দুজনের শেষ নিঃশ্বাস এক সঙ্গে মিশে চলে গেল মহাসৃষ্টির কোন সুদূর নীহারিকায়।

কর্নেল তুরাকাই গ্রাম ছেড়ে পশ্চাদপসরণ করলেন।বাবর খাঁও নিজের লশ্‌কর গুটিয়ে নিয়ে ফিরে গেলেন। সেই পাহাড়ের গায়ে এক দুর্গম যায়গায় পড়ে রইল ল্যান্স করপোরাল উডস ও রোশন খাঁ , যাদের শত্রুতা মৃত্যুর আলিঙ্গনে অনন্ত কালের জন্যে পরম বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছে।

কর্নেল মোকাটা আপাতত রণে ভঙ্গ দিলেও ইংরাজের দূরপ্রসারি কায়েমি স্বার্থের তাগিদে জোয়াকিদের বিরুদ্ধে নিস্পত্তিমূলকভাবে যুদ্ধ করতে হবে। নিখুঁত ভাবে আফগানিস্তানে অভিযান চালাবার জন্য চাই সুষ্ঠু যোগাযোগের ব্যবস্থা, চাই রসদ ও সৈন্য চলাচলের জন্য প্রশস্ত সড়ক। কিন্তু জোয়াকিদের মেরুদণ্ড ভাঙতে না পারলে তারা পদে পদে বিঘ্ন সৃষ্টি করে চলবে। জোয়াকিরা যে ইংরাজের পোষ মানতে নারাজ , সেটা তারা প্রমাণ করে চলছিল। কর্নেল মোকাটার জোয়াকি এলাকা থেকে পশ্চাদপসরণ করার কয়েকদিনের মধ্যেই তারা ব্রিটিশের খাস এলাকায় প্রবেশ করে ব্রিটিশ সৈন্যের বেশ কিছু সংখ্যক মালবাহী উট লুট করে নিয়ে গেল। ব্রিটিশ অধিকৃত শাদিপুরে একটি সশস্ত্র কন্সটাবিউলারি পোস্ট ধ্বংস করে দিল। মেজর ল্যান্স নামক এক ইংরাজ অফিসারকে গুলি মেরে  আহত করল, আর কয়েকটি ছোট ছোট সৈন্য দল আক্রমণ করে কিছু সোলজার হতাহত করল।

অতএব জোয়াকিদের দমন করার জন্য ফের একটি ফৌজ গঠন করা আরম্ভ হল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিজ় এর অধীনে। কিন্তু জোয়াকি ছাড়া আরও কয়েকটি আফ্রিদি খণ্ডজাতি বাস করে জোয়াকি এলাকার আশেপাশে। ইংরাজের আশঙ্কা যে জোয়াকিদের বিরুদ্ধে বড়রকম অভিযান চালালে ঐ খণ্ডজাতিগুলি জোয়াকিদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। ইংরাজ কর্তারা ঐ খণ্ডজাতিগুলির সর্দারদের আমন্ত্রণ জানালেন পেশাওয়ারে ব্রিটিশ কর্তাদের সঙ্গে সড়ক নির্মাণ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে। বিনা রক্তপাতে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ নিষ্পত্তিতে পাখতুনদের আপত্তি ছিল না। কাজেই খণ্ডজাতিগুলির সর্দাররা এসে উপস্থিত হলেন পেশাওয়ারে ব্রিটিশ হেড কোয়ার্টারসে। সর্দাররা পৌঁছনমাত্রই তাদের গ্রেপ্তার করে অবরুদ্ধ করলেন ব্রিটিশ করতৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট খণ্ডজাতিগুলিকে এই ভাবে নেতৃহীন করার পর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিজ় এর ফৌজ যাত্রা করল জোয়াকি এলাকা অভিমুখে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিজ় এর বাহিনীতে ছিল দু ব্যাটারি গোলন্দাজ, একটি অশ্বারোহী ক্যাভালরি ও দু হাজারের ওপর পদাতিক সৈন্য। কিজ় এর অধীনে তিনজন সেনাপতি, কর্নেল মোকাটা, কর্নেল গারর্ডিনার, কর্নেল উইলিয়ামস। প্রত্যেকে বাহিনীর এক তৃতীয় অংশ পরিচালনার ভার নিয়ে তিন দিক দিয়ে জোয়াকিদের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি পায়া গ্রাম আক্রমণ করতে রওনা হলেন।              

বন্ধু রশিদ খাঁ এর সঙ্গে পরিচয় পর্বটা এইখানে একটু বলে নিই। রশিদ খাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল থাল্‌ রেল স্টেশানে পদার্পন করতেই। খাঁ আমাকে স্বাগত জানিয়ে ছিলেন- করমর্দন করে বলেছিলেন “আই ওয়েলকাম ইউ টু আওয়ার ল্যাণ্ড, দি ল্যণ্ড অফ দি পাখতুন্‌স্‌।” সুন্দর সুঠাম চেহারা,   ছ-ফুটের ওপর লম্বা, পেশীবহুল শরীর, ফর্সা রং, চোখের তারা নীলাভ, বয়স চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ। তাঁর বেশভূষা আধা পাখতুনি আধা ইংরাজি- মাথায় কুল্লার ওপর পাগড়ি,পরনে সালওয়ার পায়ে চপ্পল কিন্তু গায়ে শার্ট, কোট ও গলায় নেকটাই। তিনি নিজের মাতৃভাষা পশ্তোর(পাখ্‌তো) মতই উর্দু ও ইংরাজি অনর্গল বলতে পারতেন। আমার ধারনা ছিল যে পাখতুনরা সবুজ চা অপেক্ষা কড়া কোনও পানীয় ব্যবহার করে না কিন্তু দেখলাম যে রশিদ খাঁ স্কচ্‌ হুইস্কির বিশেষ ভক্ত। সাধারনত রসিক তবে স্বল্প-ভাষী কিন্তু কয়েক পেগ্‌ স্কচ্‌ পেটে পড়লেই তিনি বাগারম্বরপূর্ণ হয়ে পড়তেন যদিও তাঁর মনের গভীরতম দেশে পৌঁছান অসম্ভব ছিল। স্কচের প্রভাবে আবেগময় হয়ে মাঝে মাঝে ইংরাজি ও উর্দু কবিতা আউড়াতেন। তিনি ইংরাজবিদ্বেষী ছিলেন অথচ ইংরেজ সরকারের চাকরি করতেন আর তাঁর বিরুদ্ধে কাজে অবহেলা বা নিয়মানুবর্তিতার অভাবের অভিযোগ শোনা যায়নি। তাঁর চরিত্র আমার কাছে প্রহেলিকাময় লাগত। একদিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে একজন পাক্কা পাখতুন হওয়া সত্বেও স্কচ্‌ হুইস্কির ভক্ত কেন, পাখতুনদের ভূষণ রাইফেল ছেড়ে কলম ধরেছেন কেন, আর ইংরেজবিদ্বেষী হয়েও ইংরেজ সরকারের চাকরি করেন কেন। রশিদ  খাঁ হেসে উত্তর দিয়ে ছিলেন, “ভাই সাহেব, আপনি দেখছি দু’মিনিটে আমার অন্তস্থলে পৌঁছাতে চান , অনায়াসে পাখতুন চরিত্র সম্বন্ধে ওয়াকিফ্‌ হাল হতে চান। ধীরে বন্ধু ধীরে, ধৈর্য ধরে বুঝতে চেষ্টা করলে ভবিষ্যতে হয়ত পাখতুন চরিত্র কিছুটা উপলব্ধি করতে পারবেন। কিন্তু আমাদেরকে পুরোপুরি চেনা ভারতীয়দের পক্ষে সম্ভব নয়।”

বাদামা থেকে ফিরে যখন সাদ্দায় পৌঁছলাম তখন প্রায় সন্ধ্যা। থালে যেতে হলে আরও চল্লিশ মাইল রাস্তা নো-ম্যান্‌স্‌-ল্যান্ডের ভিতর দিয়ে পাড়ি দিতে হয় আর সেটা করার চেষ্টা মূর্খতা, কাজেই সে রাতটাও আমার আতিথ্য রশিদ খাঁ এর  ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে বাধ্য হলাম।

রশিদ খাঁ সাহেব তো আমার প্রস্তাব শুনে ভারি খুশি।  রাতের বেলা সেই নড়বড়ে টেবিলটা টেনে নিয়ে রশিদ খাঁ আবার হোয়াইট হর্সের বোতলটা নিয়ে বসলেন। আমি বললাম, কী রশিদ  সাহেব বাদলের রঙ কি রোজই বদলায় নাকি? আমি এ পর্যন্ত আর কোনও পাখতুনকে মদ খেতে দেখিনি , আপনি এই দেশের লোক হয়ে হুইস্কি ধরলেন ক্যান ? তিনি বললেন ‘ যে দিন রাইফেল ছেড়ে কলম ধরেছি হাতে ,আমার পাঠানত্ত্বের বিসর্জন তো সেই দিনই হয়ে গেছে। কলম যখন ধরলাম তখন হুইস্কিই বা কী দোষ করেছে? একটা কথা কিন্তু মানতেই হবে স্যার যে ইংরাজরা রাইফেল আর হুইস্কি এই দুটো জিনিসই তৈরি করে একেবারে লা জবাব। আই টেক অফ মাই কূল্লা (হ্যাট তো পরি না ) টু দেম। যাঃ আপনি তো হাত গুটিয়ে বসে রইলেন দেখছি। আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে না , আমি তো আকণ্ঠ ডুবে আছি, আপনাকে একটি ছোট্ট পেগ মাত্র দিয়েছি , পেয়ালার অপমান করবেন না।

“আমার ওয়াজিরি ভাই-বেরাদররা বলেন যে আমি ইংরাজি লেখাপড়া শিখে আর হুইস্কিতে ডুবে কাফের বনে গিয়েছি। কিন্তু চিরকাল কী শুধু রাইফেল নিয়েই শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করা যায় ? রাইফেলের সঙ্গে কলমও দরকার। জানেন তো যে, আমরা শুধু বর্তমানটাই জানি, পিছনপানে আমরা তাকাই না, বিগত দিনের কথা জানি না বা জানবার উপায়ও নেই কারণ আমাদের যথার্থ ইতিবৃত্ত কেউ লিখে যায় নি। কিন্তু এমন একদিন আসবে  যেদিন আমাদের বিগত দিনের ইতিহাস জানবার প্রয়োজন হবে সামনে এগিয়ে যাবার প্রেরণা জোগাবার জন্য। আপনারাও মনে করেন যে রশীদ ইংরাজের সরকারি অফিসে বসে শুধু ‘উইথ রেফারেন্স টু ইওর লেটার নাম্বার’ ইত্যাদি লিখেই নিজের কাজ শেষ করে। কিন্তু তা নয় লাহিড়ী সাহেব, আমি হুইস্কি খাই আর লিখে যাই ইংরাজ শাসনের অত্যাচার আর পাখতুনদের বীরত্বের কাহিনী, পাখতুনদের সুখ দুঃখের কাহিনী, পাখতুন রাষ্ট্রজীবনের জোয়ারভাঁটার কাহিনী। আগামি দিনের আত্মবিস্মৃত পাখতুনদের প্রাণে আলোড়ন আনবে তাদের বিগত দিনের ইতিহাস আর তার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়বে গোটা পাখতুনিস্তানে –The echoes shall roll from soul to soul , and grow for ever and  ever,’

“কোহাট পেশাওয়ার রাস্তাটা দেখেছেন তো ? আজকাল মজবুত আর মসৃণ রাস্তা তৈরি করতে তার ওপর পীচ ঢালা হয়, কিন্তু কোহাট- পেশাওয়ার রাস্তাটা বলতে গেলে পাখতুনদের রক্ত ঢেলে তৈরি করা হয়েছে। শোনা যায় পুরাকালে ইংরাজরা যেখানে নিজেদের রাজ্যবিস্তার করবার মতলব করতেন সেখানে তাঁরা বাইবেল হাতে পাদ্রিদের পাঠিয়ে দিতেন আগে , সৈন্যসামন্ত পাঠাতেন পরে। কিন্তু পাখতুনিস্তানে তাঁদের পাদ্রিরা দাঁত ফোটাতে পারবে না দেখে সেখানে পাঠানো হোল স্যাপারদের। স্যাপারদের কাজ , তারা পাখতুন এলাকার ভিতর দিয়ে রাস্তা গড়বে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, ইংরাজদের এক ঘাঁট থেকে আর এক ঘাঁটি। এমনি করে গোটা পাখতুনিস্তানে সড়কের জাল বিছিয়ে দেবে,আর সেই জালের ভিতর জড়িয়ে ধরা পড়বে গোটা পাখতুন জাতি। পাখতুনরা কিন্তু ইংরাজের ফন্দি বুঝতে পেরে প্রত্যেক যায়গায় রাস্তা তৈরি করায় বাধা দিতে লাগলো আর সেই অজুহাতে ইংরাজ সরকার বড় বড় সৈন্য বাহিনী পাঠিয়ে দিলেন বাধাদানকারি পাখতুনদের শায়েস্তা করতে। গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দেওয়া হল, হাজার হাজার পাখতুনদের রক্তাক্ত দেহ লুটিয়ে পড়ল মাটির ওপর আর তাঁদের ওপর দিয়ে ইংরাজের সড়ক চলল গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, এক ঘাঁটি থেকে আর এক ঘাঁটি , যা আজও চলছে নির্মম নির্দয়ভাবে।

কোহাট পাসের ঠিক ওপিঠেই আছে একটি আদম- খেল। আফ্রিদিদের গ্রাম। এই গ্রামের পাশ কাটিয়ে চলে গেছে পায়েহাঁটা রাস্তা, দুসারি পাহাড়ের মধ্যে দর্রা হয়ে পেশওয়ার পর্য্যন্ত। আফ্রিদিদের অস্ত্রশস্ত্রের একটা বেশ বড় রকম অংশ তৈরি হয় এই দর্রার পাহাড়ের গুহায় ছোট ছোট কামারশালে।

“যে সময়টার কথা বলছি তখন কোহাট পাস এ তৈরি করা কোনও পাকা রাস্তা ছিল না। প্রকৃতি নিজের খেয়ালখুশি মত যেটুকু পথ করে দিয়েছিল আফ্রিদিরা তাতেই সন্তুষ্ট ছিল। এ পথটি এতই অপ্রশস্ত ছিল যে পাশাপাশি দুজন লোক পাস এর ভিতর দিয়ে হেঁটে যেতে পারত না। তার ওপর পাস পর্য্যন্ত পৌঁছতে হোলে পাক্কা দু মাইল খাড়া পাহাড়ের চড়াই। কাজেই এ অঞ্চলের আফ্রিদিরা মনে করত তারা অভেদ্য দুর্গের মধ্যেই বাস করছে। কোহাটের ময়দান থেকে যদিও ইংরাজ আফ্রিদিদের উৎখাত করে ছাউনি গড়তে আরম্ভ করেছে কিন্তু আফ্রিদিদের ধারনা ছিল যে, কোহাট পাসে এর মধ্যে ঢুকে ইংরাজ তাদের স্বাধীনতায় হাত দিতে পারবেনা। কিন্তু এই ভুল ধারনা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

“১৮৫০ সালের এপ্রিল মাস। শীত নিজের নিষ্ঠুর সাদা হাত ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছে, যদিও দূরের পাহাড়গুলির চূড়া তখনও বরফে ঢাকা। আফগানিস্তানের ওপর থেকে যে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া শীতকালভর বয়েছে, তার ছুঁচ বিঁধানো তীব্রতা আর নেই , বরং হাওয়াতে একটু আরামের আমেজ এসে গেছে।এই সময় একদিন সকালবেলা কোহাট পাস এর আফ্রিদিদের ঘুম ভেঙে গেলো পাহাড়ের নীচে গুড়ুম গুড়ুম শব্দে। দেখা গেল ইংরাজ  স্যাপাররা পাহাড়ের গায়ের অতিকায় সব পাথর টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে বিস্ফোরণ করিয়ে, রাস্তা তৈরি করতে করতে এগিয়ে আসছে পাহাড়ের গা বেয়ে কোহাট পাস এর দিকে।  গ্রামের মিনারে বেজে উঠলো দৃম দৃম দৃম শব্দে “চীগা”,পাখতুনদের রণবাদ্য। গ্রামের লোক সব ছুটে এলো ঢালতলওয়ার আর গাদা বন্দুক নিয়ে মিনারের তলায়। তারপর তারা দুটো দলে বিভক্ত হয়ে, গেল কোহাট পাহাড়ের মাথায়। পাস এর দক্ষিণ দিকের দলটি পরিচালনা করছিলেন বৃদ্ধ গ্রামপ্রধান সমীর খান আর উত্তর দিকের দলের নেতৃত্বের ভার ছিল গ্রামের ওস্তাদ মিস্ত্রি সিকন্দর খান এর ওপর। থাল গ্রামের কুদরৎ খানকে বোধহয় আপনি চেনেন, সিকন্দর ছিলেন কুদরৎ এর প্রপিতামহ। সিকন্দর খান ছিলেন ওস্তাদ মিস্ত্রি, তাঁর হাতের তৈরি তলওয়ার আর গাদা বন্দুকের খ্যাতি ছিল গোটা পাখতুনিস্তানে। বুদ্ধিতে ছিলেন তিনি বিচক্ষণ আর চেহারা ছিল অ্যাপোলোর মত সুন্দর, শরীরে শক্তি আর মনে উৎসাহ ছিল অফুরন্ত। 

timemachineseemanter02-medium

“সমীর খান বয়সে বৃদ্ধ হলেও প্রাণ প্রাচুর্যে ছিলেন ভরা। যৌবনের উদ্দাম চঞ্চলতা তখনও তাঁর মধ্যে বর্তমান। তিনি নিজের দলটি নিয়ে খোলা তলওয়ার হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কোহাট পাসের নীচে স্যাপারদের অ্যাডভান্স পার্টির ওপর। কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাডভান্স পার্টির কতক স্যাপাররা সমীর খান এর দলের হাতে প্রাণ দিল, আর কতক পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচাল।

“অ্যাডভান্স পার্টির স্যাপারদের হটিয়ে দিয়ে তিনি কিন্তু ফিরলেন না, তাজা রক্তমাখা তলওয়ার নিয়ে দলশুদ্ধ ছুটে গেলেন পাহাড়ের নীচে  স্যাপারদের প্রধান ঘাঁটির দিকে। স্যাপারদের মাসকেটের পাল্লার মধ্যে পৌঁছেই সমীর খান নিজের ভুল বুঝতে পারলেন, কিন্তু তখন আর ফিরবার উপায় ছিল না -স্যাপারদের মাসকেট থেকে তখন মৃত্যুবৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেছে। কয়েকজন আফ্রিদি যারা তখনও  মাসকেটের গুলির নাগালের মধ্যে পৌছয়ইনি, সমীর খান চিৎকার করে তাদের ফিরে গিয়ে সিকন্দর খানকে খবর দিতে বললেন। তারপর মাসকেটের গুলি অগ্রাহ্য করে দলশুদ্ধ ঢুকে পড়লেন স্যাপারদের মধ্যে। এদের তলওয়ারের সামনে যে পড়ল সে আর উঠল না, কিন্তু স্যাপারদের মাসকেটের সামনে বেশিক্ষণ তারা টিকে থাকতে পারল না, একে একে ধরাশায়ী হল। সমীর খানের গোটা দলটি নিঃশেষ হয়ে গেল।

“স্যাপাররা কিন্তু জয়ের নেশায় ঠিক সেই ভুলই করে বসল যা সমীর খান করেছিলেন। সমীর খান আর তাঁর দলকে ধরাশায়ী করে তারা এগিয়ে গেল পাহাড়ের গা বেয়ে সরাসরি কোহাট পাসের দিকে। 

সমীর খানের মৃত্যুতে গ্রামরক্ষার দায়িত্ব পড়ল সিকন্দর খানের ওপর। তিনি তাঁর দলের লোকদের নিয়ে পাসের দক্ষিণ দিকের ওপর নিঃশব্দে উঠে বসে রইলেন। স্যাপাররা যখন মাসকেটের গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পাসের প্রায় তিনশ গজের মধ্যে এসে গেছে তখন তিনি আক্রমণের আদেশ দিলেন। স্যপাররা আতঙ্কবিহ্বল চোখে দেখল রাশি রাশি বড় বড় পাথর সাক্ষাত মৃত্যুরূপ ধরে তাদের দিকে পাহাড়ের ওপর থেকে গড়িয়ে পড়ছে। মৃত্যুর গ্রাস থেকে রক্ষা পাবার প্রয়াসে তারা ছুটল পাহাড়ের নীচের দিকে কিন্তু কেউই পৌঁছতে পারল না। কেবলমাত্র স্যাপারদের কমান্ডার আর তার কয়েকজন সেপাই যারা পাহাড়ের নীচেই ছিল, প্রাণ নিয়ে কোহাট ছাউনিতে ফিরতে পেরেছিল এই বিপর্যয় এর খবর নিয়ে।

“তারপর এক সপ্তাহ কেটে গেল ,ইংরাজদের দিক থেকে আর কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। অনেকের ধারনা হল যে ইংরাজের যথেষ্ট শিক্ষা হয়ে গেছে, তারা আর কোহাট পাসের দিকে পা বাড়াবে না। কিন্তু বিচক্ষণ সিকন্দর বোঝেন যে এই থমথমে ভাবটা প্রচণ্ড ঝড়ের পূর্বলক্ষণ মাত্র। ইংরাজ এই খণ্ডযুদ্ধে তাদের পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারে না। তাদের অজস্র সৈন্যসামন্ত আছে, গোলাগুলি আর রসদের অভাব তাদের নেই, তাছাড়া তারা তীক্ষ্ণধার এবং কূটবুদ্ধি সম্পন্ন। তারা একটা প্রচণ্ড আঘাত হেনে পাখতুনদের চূর্ণ করে দেবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এ সত্যটা সিকন্দর খান অনুমান করতে পেরেছিলেন। তিনিও নিজের ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে প্রস্তুতি আরম্ভ করলেন আসন্ন ঝড়ের মোকাবেলা করার জন্য।

“সিকন্দর অবিরাম কাজ করে যান নিজের কামারশালে। ঠক ঠক তাঁর হাতুড়ি চলে লাল টকটকে লোহার ওপর। তৈরি হয় ইংরাজদের  মাসকেটের অনুরূপ মাসকেট। দূরদূরান্তে পাখতুনদের গ্রামে গ্রামে পাঠানো হবে সেই ম্যাসকটের নমুনা যাতে ক্রমে ক্রমে গোটা পাখতুনিস্তানে তৈরি হতে পারে উন্নত ধরনের মাসকেট। প্রস্তুতির জন্য প্রচুর সময়ের প্রয়োজন , তা পাওয়া যাবে কী ? এই কথাই ভাবেন সিকন্দর।

“সিকন্দর এর কামারশালে তাঁর কাজে সমানে সাহায্য করে যান তাঁর স্ত্রী গুলশন। তাঁদের শিশুপুত্র আমীন ঘুম চোখে দেখে এই নতুন ধরনের মাসকেট তৈরির কাজ আর মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়ে কামারশালের এক কোনে। সিকন্দর খানের চেহারার তুলনা যদি অ্যাপোলোর সঙ্গে করা হয়, তবে গুলশনের সৌন্দর্যও ভেনাস এর সঙ্গে তুলনীয়। তাঁরা স্বামীস্ত্রী শুধু চেহারাতেই মানিকজোড় ছিলেন না, গুলশনও তাঁর স্বামীর মতই বিচক্ষণ, কর্মঠ এবং দেশপ্রেমিক ছিলেন। সিকন্দরের সমস্ত উদ্যম আর উৎসাহের উৎস ছিলেন গুলশন। এই মহীয়সী রমণীর কথা কোন ঐতিহাসিক লিখে যাননি।”

“থাল ফোর্ট। কর্মমুখর দুর্গের ভিতর সেদিন বিকেল বেলায় হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এল , তারপর সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে বিউগলে লাস্ট পোস্টের বিষাদ সুর কেঁপে কেঁপে ছড়িয়ে পড়ল দিগন্তে। একটি ছোট ব্রিটিশ রক্ষিদল ‘ প্রেসেন্ট আর্মস ‘ করে শেষ অভিবাদন জানাল চীরনিদ্রায় শায়িত মেজর রলিন্সকে। পেশওয়ারে ‘উইক এন্ড’ এর অবসর উপভোগ করার পর মেজর রলিন্স এবং তাঁর ইংরাজ বন্ধু লেফটেন্যান্ট ও তাঁর বেয়ারা  ফিরছিলেন মোটরগাড়িতে। পেশওয়ার থেকে দু সারি পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলেছে আফ্রিদি উপজাতি অঞ্চলের দর্রা হোয়ে কোহাট, আর কোহাট গিরিবর্ত   অতিক্রমণ করে ওয়াজিরি উপজাতি এলাকার গা ঘেঁসে থাল পর্যন্ত। অগণিত পাখতুনদের রক্তে সিঞ্চিত এই রাস্তা বৃটিশ শক্তির হৃদয়হীন দম্ভের পরিচয় নিয়ে এঁকে বেঁকে চড়াই উতরাই বেয়ে এগিয়ে চলেছে। উপজাতীয় পাখতুনরা কিন্তু এই সড়কের ওপর বৃটিশের একাধিপত্য  কখনও মেনে নেয়নি।

মেজর রলিন্সের গাড়ি রাস্তার বিপদজনক অংশগুলি পেরিয়ে প্রায় থালে এর কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে – সামান্য খানিকটা রাস্তা অতিক্রম করতে পারলেই একটা রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং, তার অনতিদূরেই বিমান অবতরণের ল্যান্ডিং স্ট্রিপ, আর কিছু দুরেই থাল ফোর্ট, সবশুদ্ধ মাত্র মিনিটদশেকের পথ মোটরে। হঠাৎ মেজর রলিন্স গাড়ির ব্রেকে চাপ দিলেন। গাড়িটি এক ঝাঁকানি দিয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে থেমে গেল লেভেল ক্রসিং এর বন্ধ ফাটকের সামনে। মেজর রলিন্স ও তাঁর বন্ধু হতভম্ব হয়ে গেলেন। লেভেল ক্রসিং এর গেট তো সে সময়ে বন্ধ থাকবার কথা নয় ! খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার। রলিন্স ভাবছিলেন যে গাড়ি থেকে নেমে অসময়ে লেভেল ক্রসিং বন্ধ থাকার কারণ অনুসন্ধান করবেন, ঠিক সেই সময় রাস্তার ধারের একটি ছোট্ট পাহাড়ের দিক থেকে কড়কড় শব্দে একঝাঁক গুলি এসে পড়ল তাঁর গাড়ির ওপর।  মেজর রলিন্স ও তাঁর বন্ধু তৎক্ষণাৎ গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে বুকে হেঁটে কাছেই একটা কালভার্টের নীচে আশ্রয় নিলেন। জায়গাটি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, কালভার্ট এর দেয়াল শত্রুর রাইফেলের গুলি থেকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য তাঁদের বাঁচাতে পারবে। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল হল, রলিন্স সাহেবের বেয়ারা তো গাড়ি থেকে বেরোতে পারেনি! রলিন্স সাহেব আবার ছুটে ফিরে গেলেন নিজের গাড়িতে। তাঁর বন্ধু কালভার্টের আড়াল থেকে গুলিবর্ষণ করে রলিন্সকে ফায়ার কভার দিলেন। গাড়ির পিছনের সিটে তখন বেয়ারার কষ গড়িয়ে রক্ত পড়ছে , বুকের নীচে কাপড় চোপড় রক্তে ভিজে গেছে।রলিন্স সাহেব তাঁর বেয়ারাকে কাঁধে তুলে নিয়ে ছুটলেন কালভার্টের দিকে। কাঁধে একজন মানুষের ভার নিয়ে শত্রুর গুলিবর্ষণ থেকে আত্মরক্ষা মোটেই সহজসাধ্য নয় , তথাপি রলিন্স সাহেব সেই গুরুভার কাঁধে নিয়ে পৌঁছে গেলেন কালভার্টের  প্রায় মুখের কাছে। আর দু’পা এগোতে পারলেই কালভার্টের নিরাপদ আশ্রয়। রলিন্সের বন্ধুও কালভার্ট থেকে বেরিয়ে এলেন বন্ধুকে সাহায্য করতে।

ঠিক তখন কড়াক কড়াক শব্দ করে আবার শত্রুর রাইফেল গর্জে উঠল। ক্ষণিকের জন্য রলিন্সের মনে হল যেন বুকে সামান্য একটু ধাক্কা লাগল। তার পর সব অন্ধকার, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁর লেফটেন্যান্ট বন্ধুর পায়ের একটু মাংস কেটে বেরিয়ে গেল আর একটি গুলিতে। কিছু দূরের একটি পাহাড়ের চুড়ায় ব্রিটিশ  সামরিক পিকেট থেকে হেলিওগ্রাফে খবর পেয়ে থাল ফোর্ট একটি সশস্ত্র দল গিয়ে মৃত এবং আহতদের উদ্ধার করে ফোর্টে নিয়ে এল। ডাক্তাররা রলিন্সকে মৃত বলে ঘোষণা করলেন ও তাঁর বেয়ারার জখমে অস্ত্রোপচার করা হল , কিন্তু সে-ও কিছুক্ষণ পরে মারা গেল। রলিন্সের বন্ধুর আঘাত সামান্যই ছিল।

এই হত্যাকাণ্ডে ফোর্টের ব্রিটিশ অফিসাররা চঞ্চল হয়ে উঠলেন। ব্রিগেড কম্যান্ডার এর হুকুমে তৎক্ষণাৎ এক ব্যাটারি গোলন্দাজ ও এক ব্যাটালিয়ান পদাতিক সৈন্য  প্রস্তুত হল এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেবার জন্য। কিন্তু পলিটিক্যাল কর্তাদের নির্দেশে সৈন্যদল ব্যারাকে ফিরে গেল আর তার বদলে পাঠানো হল একদল সশস্ত্র ফ্রন্টিয়ার কন্সটিবিউলারি ও এক ব্যাটালিয়ান কুরম মিলিশিয়া। এই দুটি আধা সামরিক দল থাল এর আশেপাশে দশ মাইল ব্যাসের মধ্যে কোনও উপজাতীয় লশ্‌কর যোদ্ধার দলের অস্তিত্ব  খুঁজে পেল না। সন্ধ্যার দিকে তারা রিপোর্ট দিল যে উপজাতীয় লশ্‌কর প্রতিঘাতের ভয়ে সে অঞ্চল ছেড়ে অনেক দূরে পাড়ি দিয়েছে।

সন্ধ্যাবেলা, সূর্যদেব আফগানিস্তানের সুলেমান পর্বত শ্রেণীর পিছনে ডুব দিয়েছেন কিন্তু গোধুলির ক্ষীণ আলো তখনও ছড়িয়ে রয়েছে কুরম উপত্যকার ওপর। দূরে কুরাম নদী দেখা যায় পাহাড়ের গা ঘেঁসে কালনাগিনীর মত এঁকেবেঁকে চলেছে, তার ধারেই থাল গ্রামের বাড়িগুলির আবছা আকৃতি তখনও দেখা যাচ্ছে। ফোর্টের ভিতর একখানি দোতলা ব্যারাকে আমার ঘরের বারান্দায় ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে মনে মনে  ভাবছিলাম , দিনের বেলার ওই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের কথা। মেজর রলিন্স ও তাঁর বেয়ারার  অহেতুক প্রাণহাহানির কথা ভেবে মনটা যদিও কিছুটা বিষাদগ্রস্ত ছিল কিন্তু কতকটা নিশ্চিন্তও হয়েছিলাম খবরটা শুনে যে, উপজাতীয় লশ্‌কর থাল থেকে অনেক দূরে পাড়ি দিয়েছে। মনে করলাম যাক এখন কয়েকদিন কার্যোপলক্ষে ফোর্টের বাইরে গেলে উপজাতীয় স্নাইপিং এর আশঙ্কায় ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে না।

ক্রমশ   

জয়ঢাকের টাইম মেশিনের লাইব্রেরি

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s