টাইম মেশিন-হাইডাস্পাসের তীরে-অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়-শরৎ ২০২০

হাইডাস্পাসের তীরে

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

তাঁবুর উপর একটানা ঝরঝর বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছে। খোলা জায়গায় ভিজতে ভিজতে ঘোড়াগুলো মাঝেমধ্যে চিঁহি ডাক ছাড়তে ছাড়তে পা ঠুকে ঠুকে জানান দিচ্ছে তাদের অস্তিত্ব। নদীর অপর পাড় থেকে ছুটে আসা শনশন হাওয়া আরও খরতর হয়ে উঠছে। শিবিরের বাইরে প্রহরীদের আওয়াজ এখন একটু স্তব্ধ হয়েছে। বৃষ্টিতে তারাও হয়তো আড়াল নিয়েছে কোথাও।

বিছানায় আধশোয়া হয়ে সিকন্দর অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিলেন। কখনও শয্যা থেকে উঠে গিয়ে সুদৃশ্য সুরাপাত্র থেকে একটু সুরা গলায় ঢেলে দিচ্ছিলেন। অন্ধকারে তাঁর চোখদুটো শ্বাপদের মতো জ্বলছিল ধিকধিক করে। বাইরে তলোয়ার হাতে একজন গ্রিক প্রহরী, আর একজন হিন্দুস্তানের বল্লমধারী সৈনিক সিকন্দরের পাহারায়। হাতে তালি দিতেই পার্শ্বচর দৌড়ে এল। ইশারায় আলো জ্বালাতে বললেন সিকন্দর।

“ক্রেটেরাসকে এত্তেলা দাও এখুনি।”

সিকন্দরের চকিত মর্জির সঙ্গে বেশ পরিচয় আছে এই বিশেষ পরিচারকটির। তবুও সে এই ঝড়বাদলের রাতে খানিক অসহায় গলায় বলে উঠল, “বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করলে…”

“আহ্‌, যা বলছি কর। এখুনি ডাক তাকে।”

পরিচারকটি বেরিয়ে যেতেই বিছানা ছেড়ে বাইরে এলেন সিকন্দর। রাত পোশাকে মুকুট বিহীন আলেক্সান্দ্রিয়ার রাজাকে এখন দেখাচ্ছে এক অতি সাধারণ মানুষের মতো। কিছুটা বিধ্বস্তও। হিন্দুস্তানের আবহাওয়ার মতিগতি বুঝে ওঠা দায়। যেদিন থেকে এদেশের মাটিতে পা রেখেছেন, সেদিন থেকেই একথা তাঁর জানা আছে। এই সময়ে বর্ষণ অযাচিত। গোটা শীতকাল এই নদীর পারে কাটিয়ে দিয়েছে সিকন্দরের সেনাবাহিনী। গ্রিকরা এই নদীকে বলে হাইডাস্পাস। স্থানীয় নাম ঝিলম। এখন শুধু একটা বিশেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা। চকিত আক্রমণে জিতে নিতে হবে পুরু-রাজ্য। তবেই আকিমিনিড সাম্রাজ্যের শেষপ্রান্ত হস্তগত হবে গ্রিকদের।

সেনাপতি ক্রেটেরাস আসবার খবর পেতেই তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়ালেন সিকন্দর। একটু তফাতে দাঁড়িয়ে ক্রেটেরাস রাজার আদেশের অপেক্ষায়।

“এখুনি সৈন্য সমাবেশ করো পুব্রাল গ্রামের বিপরীতে। কাড়া নাকাড়া বাজাও। ঘোড়াগুলোকে খুঁচিয়ে হৈ-হট্টগোল বাধিয়ে দাও। আক্রমণ করো না। সেনাদের শুধু জানিয়ে দাও হাইডাস্পাসের পশ্চিম পাড়ে যাবার প্রস্তুতি চলছে। সেনা অধিনায়কদের ছোটো ছোটো দলে ভাগ করে নদীর পাড়ে আধ ক্রোশ ঘিরে ফেলো। যাও, দেরি কোরো না।”

ক্রেটেরাস এক দক্ষ সেনাধ্যক্ষ। সিকন্দেরর মাথায় যা পাক খাচ্ছে, সেটা যে নিছক পুরুরাজের চোখে ধুলো দিয়ে বিপরীত দিক থেকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা, তার সেটা জানা আছে। অর্ধেকের বেশি জীবন রাজা সিকন্দরের সেনাবাহিনীতে কাটিয়েছে সে। ঝড়ের হাওয়ায় ভর করে যেন ক্রেটেরাসের বলিষ্ঠ দেহ মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।

ঝড় থামার লক্ষণ নেই আজ। তবে সেটাই আজ গ্রিক বাহিনীর যুদ্ধের ঢাল। সকালের আলো ফোটার আগেই করতে হবে আক্রমণ। একমাস ধরে পুরুকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য ঝিলমের পুব পাড়ে গ্রিক সেনারা তাণ্ডব নৃত্য করছে। ভাবটা এমন, যেন এখুনি যুদ্ধে সব ঝাঁপিয়ে পড়বে। অপর প্রান্তে পুরুর বিশাল সৈন্যবাহিনী হাতি আর ঘোড়া নিয়ে সদা সতর্ক। পুরুর রাতের ঘুম ছুটিয়ে দিচ্ছে তারা। রণংদেহী চিৎকারে কান পাতা দায়। কাড়া-নাকাড়ার আওয়াজে হাতির দল ভয়ে চিৎকার করে উঠছে। গ্রিক বাহিনীর হাজার হাজার ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনিতে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে পুরুর হস্তিযূথ। মাহুতেরা ছপটির বাড়ি মেরে শাসন করছে হাতিদের। পুরুসেনারা শুনেছে, আলেক্সান্ডারের অশ্ববাহিনী ঝটিকা বেগে আক্রমণ করে শত্রুদের পরাস্ত করে। তাদের ধারালো অসিচালনা যেন আকাশের এক কোণ থেকে আর কোণে প্রবাহিত বিদ্যুল্লতা।

সাধে কি বলে, ‘অশ্ব যস্য জয়স্তুস্য!’ ঘোড়া যার, তার জয় অনিবার্য। অবশ্য পুরুরাজের কাছেও হাজার চারেক ঘোড়া আছে। কিন্তু অ্যালেক্সান্ডারের অশ্ববাহিনীতে তার দুই-তিনগুণ বেশি ঘোড়া আছে, যাদের প্রশিক্ষণের ধরনই আলাদা।

সিকন্দর শিবিরের বাইরে পায়চারি করছেন। এখন তার দেহ লৌহ বর্মে আবৃত। শিরস্ত্রাণে আচ্ছাদিত মুখমণ্ডল প্রায় ঢাকা। শাণিত তরবারি কটিবন্ধে শোণিত দর্শনের অপেক্ষায়। বৃষ্টি থেকে রাজার মাথা বাঁচাতে পরিচারক ছাতা হাতে তাঁর পিছন পিছন। কিছুক্ষণ আগে তাঁর দুই দক্ষ সেনাপতি হেফাইসম্যান ও পাড্ডিকাস পৃথক সেনাদল নিয়ে ঝিলমের পাড় বরাবর উজানের দিকে রওনা দিয়েছে। ছক বাঁধা হয়ে গেছে সিকন্দরের। ক্রেটেরাস সৈন্যবাহিনী নিয়ে হল্লা করে পুরুকে ঝিলমের পাড়ে আমন্ত্রণ জানাবে, আর সেই অবসরে সিকন্দর নদী পার হবেন। কিন্তু খরস্রোতা ঝিলম পার হওয়া অত সহজ নয়। নদীর ধার পিছল হয়ে আছে। অপর পাড়ে ঘোড়া নিয়ে সরাসরি পার হওয়ায় বিপদ আছে। পুরুর হস্তিযূথের সামনাসামনি মোকাবিলা করার জন্য ঝটিকা আক্রমণ প্রায় অসম্ভব। হিন্দুস্তানের এই হাতিগুলো যেন এক একটা দুর্গ। তাই সিকন্দরের দৃষ্টি নদীর উপর জঙ্গলে ঢাকা দ্বীপটা। একবার যদি চুপিচুপি দ্বীপ পর্যন্ত পৌঁছানো যায়, নদীর বাকি অংশ পার হতে অসুবিধা হবে না। একটাই শঙ্কা, পুরুর গুপ্তচরেরা যেন টের না পায়।

চামড়ার তৈরি নৌকোতে একে একে ঘোড়সওয়ার আর পদাতিক সৈন্য পার হয়ে যায় নদী। আকাশের রং হালকা লাল। বিদ্যুৎ তার বুক চিরে দিয়ে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। সেই আলোয় সৈন্যদলের প্রায় নিঃশব্দ পারাপার চোখে পড়ছে সিকন্দরের শিবির থেকে। চিন্তিত রাজার সামনে পরিচারিকা ফলের পাত্র ধরল। সিকন্দর নিত্যনতুন ফল খেতে বড়ো ভালোবাসেন। তিনি কাটা ফল হাতে তুলে পরখ করে বেশ উৎসাহী হয়ে পড়লেন। সামনে আসন্ন যুদ্ধের জন্য শরীর ঠিক রাখাও খুবই জরুরি। আর এক পরিচারিকা পানপাত্র এগিয়ে দিতে রাজা হাতের ইশারায় নিষেধ করলেন। সুরা পান করে যুদ্ধযাত্রা অনুচিত।

এই সময়ে সিকন্দরের সাক্ষাতের অনুমতি প্রার্থনা নিয়ে এল তক্ষশীলার রাজা অম্ভির অনুচর। সিকন্দর ইশারায় অম্ভিকে তাঁর সামনে নিয়ে আসবার অনুমতি দিলেন। হাতি থেকে নেমে এসে সিকন্দরের সঙ্গে করমর্দন করলেন রাজা অম্ভি। সিকন্দর কিন্তু এতটুকু বিশ্বাস করেন না হিন্দুস্তানের আঞ্চলিক রাজাদের। ছোটো ছোটো রাজ্যগুলিতে শাসকেরা ক্ষুদ্র স্বার্থে প্রতিনিয়ত লড়ে চলেছে, তা তিনি জানেন। রাজা পুরুর বিশাল ঐশ্বর্যের হাতছানিতে লালায়িত এই রাজা নেহাত দায়ে পড়ে যে তার সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সিকন্দরের তা জানতে বাকি নেই। তবে লোকটা নিজের পাঁচ হাজার সৈন্য সিকন্দরের অধীনে ছেড়ে দিয়ে বড়ো কাজের কাজ করেছে। নইলে মুষ্টিমেয় গ্রিক সৈন্য নিয়ে এতদিনে এই ভারত ভূখণ্ড থেকে সিকন্দরকে পালাতে হত তাঁর নিজের দেশ আলেক্সান্দ্রিয়ায়। পুরু রাজা মহা পরাক্রমশালী। তার পদাতিক সৈন্যই নাকি পঞ্চাশ হাজারের উপরে। বর্শাধারী আর তিরন্দাজেরাও মহা শক্তিশালী। সামান্য হিসেবের ভুল হলে পরাজয় অনিবার্য।

“নদী পার হচ্ছেন এই ঝড়ের রাতে? মনে হচ্ছে বেশ বড়সড় পরিকল্পনা ঘুরছে আপনার মাথায়!” কাছে এসে বলেন রাজা অম্ভি।

সিকন্দরের মুখের ভাব বোঝা গেল না, কারণ শিরস্ত্রাণে তার মুখমণ্ডল প্রায় ঢাকা। “আপাতত ওই দ্বীপটায় যাওয়া যাক, তারপর ভাবব। আপনি নিজের শিবির সামলান।”

“মানে আমার সৈন্য নদীর ওই পাড়ে যাবে না বলছেন বন্ধু?”

“সেটাই মনে হয় শ্রেয়। পুরুরাজ আবার যদি আপনার সামনাসামনি পড়ে যান, তাহলে কী ঘটবে বলা যায় না। তাই পরবর্তী আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করুন।”

“বাহ্‌! সুন্দর রসিকতা বোধ আপনার রাজা। তবে বুঝতে পারছি, পুরুরাজের আজ রাতের ঘুম আপনি কেড়ে নিয়েছেন। জয়ী হন রাজা। আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করি।” তিন পা পিছিয়ে গিয়ে হাতির হাওদায় নিজেকে সঁপে দিয়ে ফিরে গেলেন রাজা অম্ভি।

সিকন্দর আবার চিন্তিত হয়ে পড়লেন।

নদী পার হয়ে দেখা গেল দ্বীপটা প্রায় জঙ্গলে ঢাকা। ভিতরের দিকে উর্বর জমি পরিষ্কার করে পুরুর প্রজারা চাষাবাদ করেছে। অবহেলিতের মতো দু-চারটি ঘর ছড়ানো ছিটানো পড়ে আছে। জনমানুষ নেই। বোঝা যায়, অনেক আগেই তারা গ্রিক সৈন্যের আক্রমণের আশঙ্কায় পালিয়ে গেছে। অ্যালেক্সান্ডার এখন তাঁর প্রিয় ঘোড়া বাক্কাফেলাসের উপর আচ্ছাদিত আসনে বিরাজিত। অন্য ঘোড়াদের মতো বাক্কাফেলাসের মুখেও পুলটিশ আটকে দেওয়া হয়েছে, যাতে তার ডাক পুরুর সৈন্যদের কানে না যায়।

দ্বীপটা যে এত চওড়া হতে পারে, সে ধারণা অ্যালেক্সান্ডারের ছিল না। চাষের জমিতে বৃষ্টির জল পড়ে আঠালো হয়ে উঠেছে। বেশ কিছু ঘোড়া পা পিছলে আছাড় খেয়েছে। পদাতিক সৈন্যদের মধ্যে যারা ভারতীয়, তারা খানিকটা হলেও অভ্যস্ত। কিন্তু গ্রিক সৈনিকরা নাজেহাল হচ্ছে। সিকন্দরের ঘোড়া বেশ কয়েকবার পড়ে যেতে যেতে সামলে নিয়েছে।

তিন মাইল পার হবার পর আবার ঝিলমের দেখা পাওয়া গেল। তবে এখানে নদী তত চওড়া নয়। অনায়াসে পার হয়ে যাওয়া যাবে। বৃষ্টির ধার কমে এসেছে। সামনে অশ্বারোহী আর পদাতিক বাহিনী। মাঝে সিকন্দরের ঘোড়া। বৃষ্টিতে রাজার বসন সিক্ত। যুদ্ধ জয়ের আশা তার ধমনীতে গরম রক্ত সঞ্চারিত করছে। বাক্কাফেলাসকে আস্তে আস্তে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন সিকন্দর। তাঁর দুই পাশে যোদ্ধাদের আড়াল। ঢালু হয়ে জমি নেমে গেছে নদীর পাড়ে। পুব আকাশ ফর্সা হয়ে আসছে। এখানে নাকি চোরাবালি আছে। হিন্দুস্তানের সিপাইরা সেই চোরাবালির সুলুকসন্ধান জানে। তারাই পথ দেখিয়ে নদীর পাড়ে সেনা সমাবেশ করাচ্ছে।

আবার চামড়ার নৌকো ভাসিয়ে নদী পার। অপর পাড়ে ঘন জঙ্গল। সামনে পদাতিক বাহিনী কুঠারের সাহায্যে জঙ্গল কেটে পথ করে দিচ্ছে। সিকন্দরের নির্দেশে ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে সেনারা এগিয়ে চলেছে। এবার ডানদিকে বাঁক নিয়ে পুরুকে ঘিরে ফেলতে হবে। গুপ্তচর পাঠানো হয়েছে ক্রেটেরাসের কাছে। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নদী পার হবার। গ্রিক সেনাপতি হেফাইসম্যান পুরুকে পিছন থেকে আক্রমণ করবেন। সিকন্দর পুরুর বামদিকে, আর ক্রেটেরাস ডানদিক থেকে আক্রমণ চালাবেন। নদীতে পুরুর হস্তিযূথ নামতে পারবে না। হাতিদের কাদায় আটকে পড়ার ভয় আছে। হিসেব মতন চারদিক থেকে ঘিরে ধরলে পুরু আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য।

নিজের বেঁধে ফেলা ছকে যখন নিজেকেই নিজে তারিফ করছেন সিকন্দর, ঠিক তখনি ঘন জঙ্গল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তির সিকন্দরের সেনাবাহিনীর উপর বৃষ্টিধারার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঘোড়সওয়াররা পর্যুদস্ত হয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল। সকালের আলো ফুটে গেলেও জঙ্গল তখনও আলো-আঁধারির খেলা দেখাচ্ছে। শত্রুর উপস্থিতির দিকনির্ণয় করতে না পেরে সিকন্দরের সেনাবাহিনী পিছিয়ে এল। বাধ্য হয়েই অনেকটা পিছিয়ে এলেন সিকন্দরও। হতাহতও কম হল না। জখম হওয়া ঘোড়াগুলো মাটিতে শুয়ে কাতরাচ্ছে। হিন্দুস্তানি সেনাদের চাইতে বেশি ভয় পেয়েছে গ্রিক সেনারা। তারা এমনিতেই যুদ্ধে অনেকদিন ধরে অনিচ্ছুক। ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য অনেক আর্জি জানিয়েছে। কিন্তু সিকন্দেরর এক গোঁ—আকিমিনিডদের বিস্তার করা সাম্রাজ্য দখল না করে তিনি ছাড়বেন না।

গ্রীক সৈন্যরা অনেকটা পিছিয়ে আসায় তির-বৃষ্টি কমে গেল। সেনাধ্যক্ষদের সঙ্গে পরামর্শ করে জানা গেল হাজারে হাজারে পুরুসেনা গাছের মাথা থেকে তির নিক্ষেপ করেছে। সিকন্দরের সম্মুখভাগের সেনাদের অধিকাংশই প্রাণ দিয়েছে। গ্রিকরাজ মনে মনে ভাবলেন, ক্রেটেরাস আর হেফাইসম্যান সৈন্যবাহিনী নিয়ে এসে পড়া না পর্যন্ত এখানেই শিবির পেতে বসে থাকা শ্রেয়।

ক্রেটেরাস আর হেফাইসম্যান সৈন্যবাহিনী নিয়ে পুরুর সেনাদের দুইদিক থেকে ঘিরে ধরার সংবাদ পেয়ে সিকন্দর সেনাবাহিনীকে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। কিছুটা এগোতেই আবার বাধা। এবার দেখা গেল, হাজারে হাজারে হাতি সাজিয়ে পুরুরাজ একেবারে দুর্ভেদ্য দেওয়াল তৈরি করে রেখেছেন। পদাতিক সৈন্যরা এগিয়ে যেতেই হাতির দেওয়ালের আড়াল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তির ধেয়ে এসে সিকন্দরের সেনাবাহিনীর অগ্রভাগ ভেঙে দিল। বল্লমধারী পুরুসেনা ঝাঁপিয়ে পড়ল সিকন্দরের সেনাবাহিনীর উপর। গ্রিকরাজের শিরায় শিরায় জেগে উঠল পূর্বপুরুষের রক্ত। তিনি হারকিউলিসের যোগ্য উত্তরাধিকারী। হার মানবেন না কিছুতেই। মরণপণ করে রণক্ষেত্রে সবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন অ্যালেক্সান্ডার। পৃথিবী জয় করার সঙ্কল্পে তিনি আজ বদ্ধপরিকর।

হঠাৎ পদাতিক হিন্দুস্তানি সামান্য সিপাইয়ের ছোড়া বর্শা সরাসরি ঢুকে গেল বাক্কাফেলাসের গলা চিরে। একটুর জন্য ধারালো সেই বর্শার আঘাত থেকে বেঁচে গেলেন সিকন্দর। মাটিতে পড়ে বাক্কাফেলাস ছটফট করতে লাগল। অ্যালেক্সান্ডারও মাটিতে পড়ে গেলেন। বাক্কাফেলাসের ফিনকি দিয়ে ওঠা রক্তে সর্বাঙ্গ ভিজে গেল গ্রিকরাজের। সামনে দু’জন পুরুসেনা বল্লম নিয়ে উদ্যত। ঠিক সেই মুহূর্তে গ্রিক সৈন্যরা রাজার প্রাণ বাঁচাতে তলোয়ার নিয়ে সামনে ঝাঁপ দিয়ে পুরু সৈন্যের মুণ্ডু ছিন্নভিন্ন করে দিল। পুরুরাজের সেনাপতির নির্দেশে সিপাইরা অ্যালেক্সান্ডারকে লক্ষ্য করে তির ছুড়তে শুরু করল। হাতের ঢাল দিয়ে অ্যালেক্সান্ডার আক্রমণ প্রতিহত করে ছুটে গেলেন খোলা তরোয়াল নিয়ে। ছুটে আসা তির অ্যালেক্সান্ডারের ডান কাঁধে গেঁথে গেল। গ্রিক সৈন্যেরা অ্যালেক্সান্ডারকে পাঁজাকোলা করে সরিয়ে নিয়ে গেল নিরাপদ দূরত্বে।

আহত অ্যালেক্সান্ডারের শরীর পরীক্ষা করে চিকিৎসক বললেন, “চিন্তার কিছু নেই, ক্ষত সারতে বেশি সময় লাগবে না। তবে যুদ্ধ স্থগিত রাখাই মনে হয় শ্রেয়।”

“যুদ্ধ স্থগিত হবে না। এতটা এগিয়ে এসে পিছু হটার অর্থ পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া। ডক্টরাস, আপনার কাজ শেষ হয়ে গেছে, এখন আপনি যেতে পারেন।” ডাক্তারকে উদ্দেশ্য করে বললেন আহত রাজা।

আঘাতের যন্ত্রণা সিকন্দরকে পীড়া দিচ্ছে, কিন্তু তিনি প্রাণপণ স্বাভাবিক থাকতে চেষ্টা করছেন। রাজা পুরুষোত্তমের শৌর্যের প্রশংসা করছেন মনে মনে। যুদ্ধে পুরুরাজের পুত্র মারা গেছে। হতাহতের সংখ্যা দু’দিকেই যথেষ্ট। সেনাপতি হেফাইসম্যান পুরু সৈন্যের পিছন থেকে আক্রমণ করেও বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। পুরুর হাতির পাল চারদিকে যেন এক দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলে রেখেছে। জীবনে প্রথম এমন দক্ষ সেনানীর সম্মুখীন হয়েছেন সিকন্দর। কিন্তু হারকিউলিসের বংশধর অ্যালেক্সান্ডার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিঠ ফেরাবেন কী করে? তার চাইতে মৃত্যু বরণ করা ঢের ভালো। কিন্তু এমন শক্তিশালী সেনার বিরুদ্ধে অস্ত্র চালাতে গ্রিক সৈন্যেরা যেকোনও মুহূর্তে অস্বীকার করতে পারে। শুধুমাত্র তক্ষশীলার সেনার ভরসায় যুদ্ধ জয়লাভ করা যাবে না, অভিজ্ঞ সিকন্দর সেকথা ভালোই বুঝতে পারছেন। আরও বিপদের কারণ—জানা গেল, কাশ্মীরের রাজা নাকি পুরুর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।

তিন সেনাপ্রধানকে ডেকে শলাপরামর্শ করেন সিকন্দর। মুখে স্বীকার না করলেও, তাদের কথা ও ব্যবহারে গ্রিকরাজের বুঝতে অসুবিধা হয় না, সবাই রণে ভঙ্গ দেওয়াই উচিত মনে করছে।

আসন ছেড়ে ধীর পায়ে বাইরে এলেন সিকন্দর। সন্ধে নেমে আসছে বন জঙ্গল জুড়ে। সেদিনের মতো যুদ্ধবিরতি। আকাশের গায়ে পাখিদের ঘরে ফেরা দেখতে দেখতে সিকন্দরের নিজের দেশের মাটির কথা মনে পড়ে যায়। আকাশে আবার মেঘের ঘনঘটা। বিচিত্র এই দেশ! এর জলবায়ুর চরিত্র বুঝে ওঠা দায়। পিছনে ঘুরে দাঁড়িয়ে রাজা দেখেন, তার তিন বীর সেনাধ্যক্ষ পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায়।

সকাল হতেই পুরুরাজের কাছে দূত পাঠিয়ে দিলেন সিকন্দর। উদ্দেশ্য, সমঝোতা। দূত ফিরে এল পুরুর পাঠানো শাণিত বল্লম নিয়ে। এর অর্থ যুদ্ধ, শান্তি নয়। প্রাথমিক সংবাদ প্রাপ্তিতে রাজার গ্রিক রক্ত ছলকে উঠল। একবার মনে হল যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে আদেশ দেন গ্রিক সেনাদের। পরমুহূর্তে নিজেকে সংযত করে দ্বিতীয় চাল ফেললেন। এবার গ্রিক সেনাদের হেফাজতে যুদ্ধবন্দী পুরুর অত্যন্ত নিকট বন্ধুকে বেঁধে আনার হুকুম দিলেন।

কিছুক্ষণ রাজা অ্যালেক্সান্ডার তার সঙ্গে নিভৃত আলাপচারিতা সারলেন। তাঁর ইশারায় বন্দীর বাঁধন খুলে দেওয়া হল। মুক্তি পেয়ে বন্দী চলল রাজা পুরুষোত্তমকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে যুদ্ধ স্থগিতের আবেদন করতে।

বন্ধুর প্রস্তাবে পুরুরাজ নরম হলেন। তিনি বিচক্ষণ। ভালোই জানেন অ্যালেক্সান্ডারকে দিয়ে স্থানীয় রাজারা তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে। গ্রিকদের সঙ্গে শত্রুতায় তাঁর লাভ নেই, বরং হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি হবে। তাই সিকন্দরের পাঠানো সন্ধি প্রস্তাব মেনে নিলেন। দূত ফিরে এল সিকন্দরের জন্য পাঠানো উপহার সামগ্রী নিয়ে। রাজা রুপোর রেকাব থেকে একটা আখরোট তুলে নিয়ে পুরুর সঙ্গে মিলিত হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে প্রস্তুতি নিতে বললেন।

হাজারে হাজারে হাতি, ঘোড়া আর পদাতিক সৈন্য সাক্ষী রেখে অ্যালেক্সান্ডার পুরুরাজকে প্রথম চাক্ষুষ করেই মুগ্ধ হলেন। এতদিন হারকিউলিসের বংশধর বলে নিজের শরীরের গঠন নিয়ে তার প্রচুর গর্ব ছিল। পুরুরাজ তার বিশাল হাতির হাওদা থেকে নেমে আসতে সিকন্দর অবাক হয়ে দেখলেন সেই বিশালকায় পুরুষকে। উচ্চতায় ও আয়তনে অ্যালেক্সান্ডারকে পুরুর কাছে খর্ব মনে হল সাধারণ গ্রিক সৈন্যটিরও।

একটু তফাতে বসে পুরুরাজ মুখ খুললেন, “বিদেশি রাজা, ঘরে ফিরে যাও। যুদ্ধ তোমাকে ক্লান্ত করেছে। আমি তোমাকে পাঁচশো হাতি ও মণিমাণিক্য দান করলাম। হিন্দুস্তান তোমার বসবাসের উপযুক্ত নয়। শুনলাম তোমার শরীরে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে!”

“ও কিছু নয় রাজা। যুদ্ধে ক্ষত অর্জন বীরের কর্তব্য। হারকিউলিসের বংশধরেরা শরীরের যন্ত্রণা নিয়ে মাথা ঘামায় না। আমি আপনাকে একহাজার আরবি ঘোড়া দিলাম। আর এই আমার হাতের আংটি আপনার কাছে স্মৃতি হয়ে থাক। আপনি সত্যিই বীর। অসাধারণ আপনার সমর কুশল। আপনি বয়োজ্যেষ্ঠ, আপনাকে প্রণাম। এই গ্রিক যোদ্ধা আপনাকে মনে রাখবে।”

দুই রাজা উঠে দাঁড়াতে কাড়া নাকাড়া দুন্দুভির আওয়াজ উঠল। অপসৃয়মাণ গ্রিকরাজ সিকন্দরের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাজা পুরুষোত্তমের দু’চোখের কোল ভিজে উঠল যুদ্ধে মৃত সন্তানের কথা মনে করে।

শীর্ষচিত্র:সের্গেই বুদিচিন (১৯৩৯)

জয়ঢাকের টাইম মেশিন সব লেখা একত্রে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s