টাইম মেশিন

time01পত্র ১৬

কলকাতায় সৈন্যদলের যে অংশটা আমরা ছেড়ে এসেছিলাম সেটা বহরমপুরে এসে গেল। আমরা বহরমপুর ছাড়ার আগেই। আর তার পরপরই গোটা পল্টন, হুকুম হল, দেনাপুর রওনা হবার। ১৭৭৫ সাল নাগাদ পৌঁছলাম সেখানে। এই বাংলায় মোট তিনটে পল্টন ছিল। সকলেরই উর্দি ছিল একই রকম, গাঢ় লাল রঙের। প্রথম দলের পোশাকে নীল রঙের, দ্বিতীয়ের কালো আর তৃতীয়ের হলদে রঙের ছোঁয়া। প্রতিটা সৈন্যদলেই একদল ইউরোপীয়, ছয় রেজিমেন্ট অর্থাৎ বারো ব্যাটালিয়ান দেশীয় সেপাই, তিন কম্পানি ইউরোপীয় গোলন্দাজ, পাঁচ কম্পানি দেশীয় গোলন্দাজ, আর দুই কম্পানি পদাতিক সেনা রয়েছে। এক রেজিমেন্ট সেপাই মানে দুই ব্যাটেলিয়ান সৈন্য। এক এক ব্যাটেলিয়ানে ৫০০ করে সৈন্য মানে পাঁচ কম্পানি সৈনিক। প্রত্যেক কম্পানিতে রয়েছে একজন ক্যাপটেন, দুজন লেফট্যানেন্ট, তার চেয়ে একধাপ নীচে আরও তিন এনসাইন অফিসার, একজন সার্জেন্ট মেজর। সকলেই ইউরোপীয়। দেশীয় সেপাইদের পদ ছিল এরকম; একজন সর্দার, পাঁচ সুবেদার, দশজন জমাদার, তিরিশজন হাবিলদার, তিরিশজন হোমালদার*, পাঁচ জয়ঢাক বাদক, পাঁচ বাঁশিওয়ালা আর পাঁচজন শিঙাবাহক।

এই নামগুলো আপনার বুঝতে অসুবিধে হবে ভেবে আমি ব্যাপারটা আরেকবার এইভাবে সাজিয়ে লিখলাম,

ক্যাপটেন = সর্দার, লেফট্যানেন্ট = সুবেদার, এনসাইন = জমাদার, হাবিলদার = সার্জেন্ট, হোমালদার = একধাপ নীচের অফিসার, সেপাই = ভাড়াটে সৈন্য, ড্রামার = জয়ঢাক বাজিয়ে, ফাইফ = বাঁশিওয়ালা আর ট্রাম্পেট বাজিয়ে = শিঙাবাহক।

সেপাইদের মধ্যে হিন্দু মুসলমান দুইই আছে। বাইরে থেকে দেখে আলাদা করার উপায় নেই। শুধুমাত্র হিন্দুরা কপালে আর গালে চন্দনের তিলক কাটে। দুজনেরই পরনে মসলিনের শার্ট, লাল কোট, মাথায় পাগড়ি, কাঁধে একটা ভাঁজকরা কাপড়, আর হাফপ্যান্ট। কাঁধের চাদর আর পাগড়ি, মূলত মসলিনের এবং নীল রঙের। পাগড়িগুলি বেশ আঁটোসাঁটো। গড়নে স্কটিশ টুপির কাছাকাছি বলা যায়, শুধু সামনেটা সমান। যার ওপর রুপোর ঘের-লাগানো ব্যাজ লাগায় সৈনিকেরা। মধ্যিখানে অবশ্যই একখানা তারা। পাগড়িতে তার দিয়ে বানানো আরও সব অলঙ্কারের মতো লাগানো থাকে। গলায় দু তিন থাক কাঠের তৈরি মালা। বাঁ কাঁধে একটা ঢাল। অফিসারেরা রুপোর বা কাচের বোতাম লাগান, গাঢ় লাল রঙের কোট পড়েন, তার দলের ইউনিফর্মের সাথে মিলিয়ে। বিশহাতি লম্বা নীল রঙের উত্তরীয় আর পাগড়ি, লম্বা পাজামা, বড়ো জুতো আর বাঁ কাঁধে ঢাল।

সেপাইরা সাধারণনত অস্ত্রশস্ত্র চালাতে সিদ্ধহস্ত এবং যথেষ্ট নিয়মানুবর্তী। ইয়োরোপীয়রা সংখ্যায় অল্প। দেশীয় সেপাইরাই মূল শক্তিটা জোগায়। প্রায়শই এরা বলিষ্ঠতা আর কার্যকারীতার প্রমাণ দিয়ে থাকে। এই চিঠির সাথে আমি হিন্দি আর পার্শি শব্দের ইংরিজি অর্থগুলির একটা তালিকা দিলাম। কেননা এদেশে, ইওরোপে, এই শব্দগুলোর সাথে অধিকাংশ মানুষই পরিচিত নন।

আমদানি -বাইরে (দেশ) থেকে আনা। আরজি – আবেদন জানানো। আসামী – নানান ধরনের ব্যবসায়ী (অসম প্রদেশের ব্যবসায়ী মানুষ – অনুবাদক) ভাং – একধরনের উদ্ভিদ যা মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাজার – জিনিসপত্র কেনাবেচার জায়গা। বাদশা – রাজা। বাদশাজাদি – রানি। বেগম – রাজকন্যা। বিটেল – পানপাতা। ব্রাহ্মিন – পুরোহিত। বক্সিয়ার – তলোয়ারধারি পদাতিক সৈনিক। বন্দর – শুল্ক আদায়গৃহ। খান – সম্মানীয় পদবী। গাজি – যাজক। মোহরছাপ – মোঘল বাদশাদের সিলমোহর। ছত্রী – ভ্রমণকারিদের জন্য ছাউনি। চৌথ – এক চতুর্থাংশ অথবা সৈন্যবাহিনীর আদায়ী খাজনা। চৌকি – পাইক বা পাহারাদার। কাফ্রি – আফ্রিকান নিগ্রো সম্প্রদায়ের মানুষ যাদের সৈনিকের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কুলি মালবাহক। ক্রোশ – দু মাইল। কসিদ  – রানার বা ডাকহরকরা। কাওল – মাপ করে দেওয়ার আদেশ। দারোগা – শুল্ক আদায়কারী। ডাকাত – লুটেরা। সর্বস্ব কেড়ে নেয় যে। দেওয়ান – রাজার খাজাঞ্চি। দেওয়ানি – রাজস্ব বা কর আদায় দেখভালকারী। ডুলি – বহনযোগ্য কেদারা, মূলত মেয়েদের জন্য ব্যবহৃত। দামোদর – পূর্বভারতের একটি নদী। দরবার – মোঘলদের রাজসভা বা বিচারসভা। দস্তক – আদেশনামা। ফরমান – রাজ আদেশ বা হুকুম। ফৌজদার – স্থানীয় শাসক, সেনা অফিসার অথবা মালিক যে ভাড়া দেয়। হিন্দু – একজন সাধারণ ভারতীয় মানুষ। গোমস্তা – দালাল। গঞ্জ – শস্যবাজার। কাহার – পালকিবাহক। ছ্যাকরাগাড়ি – বলদে টানা গাড়ি। হরকরা – গুপ্তচর।  জায়গীর – সম্মান জানানোর জন্য অথবা অবসরভাতা হিসেবে প্রদত্ত এলাকা বা জেলাবিশেষ। (ঠুঁটো) জগন্নাথ – অকর্মন্য। জমাদার  – পতাকাবাহক। কিলাদার – কেল্লার অধিনায়ক। কিস্তিবন্দী – রাজস্ব প্রদানের সময়সীমা। লাখটাকা – ১২৫০০ স্টার্লিং। মন – ৭০-৮০ পাউন্ড, সুরাটপ্রদেশে ৩৭ পাউন্ড। মুন্সি – পার্শি সহকারী। মৌলানা – মুসলমান পাদ্রী। মুহুরি – মুসাবিদা করার লোক। মুচলেকা -বাধ্যতামূলক দস্তখত। মসনদ – ভারতীয় রাজপুত্রের সিংহাসন। মুর্শিদাবাদ – বাংলার রাজধানি শহর। নবাব – সুলতান কর্তৃক নিযুক্ত আঞ্চলিক শাসনকর্তা। নায়েব – রাজ্যপালের সহকারী। ওমরাহ – মোঘল দরবারের প্রথম সারির অমাত্য ও পারিষদগন। ধান- চাল উৎপন্ন হয় যা থেকে, একধরনের খাদ্যশস্য। ধানজমি – ধানগাছ লাগানো চাষের জমি। প্যাগোডা – ভারতীয় মন্দির। প্যাগোডা  – ভারতীয় স্বর্নমুদ্রা, চল্লিশ পাউন্ডের কাছাকাছি। পালকি – একধরনের মনুষ্যবাহিত যান। পার্শি – সূর্যের উপাসক। পতমার – বার্তাবাহক। পিওন – লম্বা তলোয়ারবাহী পদাতিক সৈন্য। পরগনা – কয়েকটি গ্রামের সমষ্টি। পরোয়ানা – আদেশপত্র, পাত্তাহ (?) – দুর্গের চারপাশ ঘিরে অবস্থিত শহর। পোদ্দার – মুদ্রা বিনিময়কারী। পলিগর (পালাইয়াক্কারার বা পালেয়াগারা-এর ইংরিজি অপভ্রংশ-অনুবাদক ) – আঠারো শতকে, দক্ষিণ ভারতের জেলার অধিকর্তার পদ। পানসি – রক্ষীনৌকো। পাট্টা – দানপত্র, রাজা – হিন্দুদের সর্বোচ্চ খেতাব, মহারাজ। রায় রায়ান – খেতাব, রাজার রাজস্ব গ্রহণকারী (রাজার রাজা খেতাব – অনুবাদক)। রফতানি – অন্যত্র (দেশে) মালপত্র পাঠানোর প্রক্রিয়া। টাকা – রুপোর মুদ্রা , বারো পাউন্ডের সমান। সনদ – মোঘল সাম্রাজ্যে সুবাদার বা নবাবের পাঠানো আদেশ। সর্দার – অশ্বদলের দায়িত্বে থাকা অফিসার। সেপাই – ভারতীয় পদাতিক ভাড়াটে সৈনিক। শ্রফ – মহাজন। সরকার – দেশ পরিচালকবৃন্দ অথবা রাজকর্মচারীদের প্রচলিত ডাকনাম। শিরোপা – সাম্মানিক হিসেবে প্রাপ্ত একধরণের উষ্ণীষ। সুবা – দক্ষিনের বা বাংলার ভাইসরয়, ট্যাঙ্ক – পুকুর বা জলাশয়। টঙ্কা – সুরাতে মোঘলদের নৌবহর রাখার বিনিময় রাজস্ব। টাঁকশাল – মুদ্রা ছাপার জায়গা। তেলেঙ্গা – কর্নাটকি দেশ। তেলিঙ্গা – কর্নাটকি সৈনিক। টমটম – বড়ো ঢোলকবাদ্য বা ড্রাম বিশেষ। টোপাসে – পর্তুগীজ বংশোদ্ভূত পদাতিক সৈনিক, টুপি পরিহিত বলে সম্ভবত এমন নাম। টুনকা – কোম্পানিকে দেয়া জমির অধিকার। তোষাখানা – পোষাক রাখার জায়গা। জেনানা – মহিলামহল। উকীল – নবাবের রাজসভায় ইংরেজ প্রতিনিধি। উজিরি – উজির হবার সম্মতি প্রদান। জমিন – মাটি। জমিদারি – ব্যক্তিগত জমি থেকে খাজনা আদায়কারির কাজ।

আগের সংখ্যায় ১১ নং পত্র অবধি প্রকশিত হয়েছিল। ১২,১৩,  ১৪ ও ১৫ নং পত্র প্রধানত বড়োদের জন্য। সেগুলি জয়ঢাকে অন্তর্ভূক্ত হল না। উৎসাহী পাঠক  www.padokkhep.wordpress.org  সাইটের “প্রবন্ধ নিবন্ধ” অংশে সে চিঠিগুলির অনুবাদ দেখতে পারেন।

ক্রমশ

আগের সমস্ত এপিসোডগুলো একত্রে এইখানে