টাইম মেশিন

ঠাকুরবাড়ির পাদুকাবিলাস

অনুপূর্বা রায়

juto juto02

আভিজাত্য আর বনেদিয়ানায় যে’সব পরিবার কালের যাত্রায় বাঙালির সাহিত্য এবং শিল্পচর্চায় ছাপ রেখে গেছে, কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পরিবার তার মধ্যে অন্যতম। উনিশ শতকে পশ্চিম দিগন্তের আলো এসে পড়েছিলো পুব আকাশে। শুরু হল বাংলার নবজাগরণ। আর এই নবজাগরণের প্রথম ঊষার সবটুকু উষ্ণতা গ্রহন করেছিলো জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। সংস্কারমুক্ত আলো চুঁইয়ে পড়েছিলো এই পরিবারের শুধুমাত্র শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা কিংবা কৃষ্টিতে নয়; সাজেগোজেও। পোশাক এবং অলংকারের পাশাপাশি এই পরিবারের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই ছিলেন পাদুকাবিলাসী।

ঠাকুরবাড়ির পাদুকাবিলাসের কাহিনী এই পরিবারের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিত্ব প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরকে দিয়েই শুরু করি। যে দ্বারকানাথকে মহারাণী ভিক্টোরিয়া “My prince” বলে সম্বোধন করতেন কিংবা যার সাথে Charles Dickens, Max Muller এর বন্ধুত্ব ছিল সেই দ্বারকানাথের জীবনযাত্রা যে রাজকীয় হবে সেটাই স্বাভাবিক। সেই রাজকীয় জীবনযাত্রায় তিনি যে শুধু পোশাককেই প্রাধান্য দিতেন তা নয়; তাঁর জুতোবিলাসও ছিল নজর কাড়া। নিজের জাহাজে চড়ে তিনি যখন বিলেত যেতেন তখন সঙ্গে নিতেন কুড়ি থেকে পঁচিশ জোড়া জুতো। লন্ডন এবং প্যারিসে তিনি ছিলেন রাজপুরুষের মতো। ফ্রান্সের রাজার সম্মানে তিনি একটি প্রীতিভোজের আয়োজন করেছিলেন এবং সেই অনুষ্ঠানে তিনি পরেছিলেন সোনার জালিকাজ করা একটা জুতো। সেই জুতোয় সোনার সাথে গাঁথা ছিল অসংখ্য দামি পাথর। কলকাতার বিশেষ জহুরিকে অর্ডার দিয়ে বানানো হত এই জুতোগুলো। যে জুতো দ্বারকানাথ একবার পরতেন তা আর একমাসের মধ্যে পরতেন না। দামী মখমল, তসর দিয়ে বানানো মুক্তাখচিত দ্বারকানাথের জুতোগুলোর দাম তখনকার বাজারদর অনুযায়ী ছিল প্রায় দু’থেকে আড়াই হাজার টাকার কাছাকাছি।

১৮৪৬ সালের ১লা আগস্ট লন্ডনের সেন্ট জর্জেস হোটেলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। মারা যাওয়ার আগে তিনি বাজারে রেখে গেছিলেন ৫০ লক্ষ টাকার কাছাকাছি দেনা। তাঁর পাদুকাবিলাস থেকে শুরু করে বিপুল বৈভবের জীবনযাত্রাই এই দেনার উৎস ছিল।

এবার আমি প্রিন্সের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাদুকাবিলাসের কথায়। বাবার মতো সোনার জালিকাজ করা জুতো তিনি হয়ত পরতেন না কিন্তু পাদুকাবিলাসী হিসাবে তিনিও কম খ্যাতি পাননি। ব্রাহ্মধর্ম গ্রহনের আগে পর্যন্ত তিনি যথেষ্ট শৌখিন জীবনযাপন করতেন এবং বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে জুতোর জৌলুশে আমন্ত্রিতদের চমকে দেওয়া ছিল তাঁর নেশা।

একবার শোভাবাজার রাজবাড়িতে সেকালের কলকাতার বড়লোক বাবু এবং রাজাদের নিমন্ত্রণসভায় দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মুক্তোখচিত জুতো পরে গিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ঠাকুরবাড়ির অতি পুরনো করমচাঁদ জহুরিকে দিয়ে জুতোটা বানানো হয়েছিলো। করমচাঁদ দামী মখমলের ওপর পাথর আর দানা দানা মুক্তোয় ভরে দিয়েছিলেন। যথাসময়ে নিমন্ত্রণসভা শেষ হওয়ার পরেও আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে দেবেন্দ্রনাথের জুতোর ঘোর কাটেনি। তিনি যতক্ষণ আসরে ছিলেন সকলের দৃষ্টি ছিল তাঁর জুতোর ওপর।

ঠাকুরবাড়ির মেয়ে বউরাও পাদুকাবিলাসে পিছিয়ে ছিলেন না। সেই সময় মেয়েদের মধ্যে জুতো পরার প্রচলন একেবারেই ছিলনা। কিন্তু যে ঠাকুরবাড়ির মেয়ে বউরা ইংরিজি ভাষায় পারদর্শী হয়ে ওঠার জন্য তখনকার দিনে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়তেন, বাড়িতে ফরাসি ভাষা শিখতেন এবং পিয়ানো বাজাতেন সেই মেয়েবউরা যে জুতো পরবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে দোকানে গিয়ে জুতো কেনার চল ঠাকুরবাড়িতে তখনও ছিলনা। চীনা জুতোর কারিগররা বাড়িতে আসতেন। খবরের কাগজে ভাঁজ করে সরু ফিতের মতো বানিয়ে বাড়ির মেয়ে-বউদের এবং কচিকাঁচাদেরও পায়ের মাপ নিয়ে যেতেন।

ঠাকুরবাড়ির মেয়েবউদের সাজগোজের ধারায় নতুন বাতাস এনেছিলেন দেবেন্দ্রনাথের পুত্র প্রথম ভারতীয় I.C.S সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। তিনি ছিলেন এই পরিবারের ফ্যাশন আইকন । তিনি যে শুধু বাঙালি মেয়েদের জ্যাকেট, শেমিজ, পেটিকোট পরা চালু করেছিলেন তা নয়, বাহারী তসর কিংবা মখমলের পাম্পশু পরে স্বামীর সাথে ঘোড়ার গাড়ি চড়ে গড়ের মাঠে বেড়াতে পর্যন্ত যেতেন। এই জন্য তাঁকে কম নিন্দা সহ্য করতে হয়নি! দেবেন্দ্রনাথের আরেক পুত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী কাদম্বরী দেবীও জুতো পরতেন। তবে জরির কাজের চটিই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়।

    খুলনা জেলার ফুলপুর গ্রামের ভবতারিণী রায়চৌধুরী ঠাকুরবাড়িতে এসেছিলেন দেবেন্দ্রেনাথের কনিষ্ঠ পুত্রবধু হিসাবে। তখন তিনি মৃনালিনী। ঠাকুরবাড়ির অন্যতম নক্ষত্রের স্ত্রী হয়েও মৃনালিনী সাজগোজে ছিলেন খুব সাদামাটা। তাই জুতো পরলেও সে ব্যাপারে কোনো বিলাসিতা তাঁর ছিলনা। সামনে ঢাকা কাপড়ের চটিই তিনি বেশি পছন্দ করতেন। খুব বেশি হলে তাতে কাশ্মীরি কাজ করা থাকত সুতো দিয়ে। মৃনালিনী দেবী যেদিন ঠাকুরবাড়ি থেকে চিরবিদায় নিলেন, শেষকৃত্য সেরে এসে সেদিন রবীন্দ্রনাথ-পুত্র রবীন্দ্রনাথকে ডেকে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন স্ত্রীর ব্যবহৃত শেষে চটিজোড়া। বলেছিলেন, ‘এটা তোর মার, তোকে দিলুম- তোর কাছে রেখে দিস।’ সেই নীল রঙের চটিজোড়া আজও  ঠাকুরবাড়িতে রাখা আছে সকলের দেখার জন্য।

পাদুকা নিয়ে শুধু বিলাসিতা নয়,এই পাদুকাই একসময় ঠাকুরবাড়ির সন্তানদের কাছে স্বদেশী আবেগের প্রাণবস্তু হয়ে উঠেছিল। সেই সময় ইঙ্গবঙ্গ সমাজে কোনো নিমন্ত্রণ থাকলে ঠাকুরবাড়ির আরেক প্রতিভাময় সন্তান অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তাঁর ‘রবিকাকা’ ধুতির সাথে স্বদেশী জুতো পরে হাজির হতেন। জুতো নিয়ে সেই অর্থে কোনো বিলাসিতা ঠাকুরবাড়ির বিশ্বখ্যাত নক্ষত্রটির ছিলনা। তবে হ্যাঁ কট্‌কি জুতোর প্রতি তাঁর বিশেষ দুর্বলতা ছিল। তার প্রমাণ শিশুপাঠ্য ‘দামোদর শেঠ’ কবিতাতেই তিনি তুলে ধরেছেন, ‘আনবে কট্‌কি জুতো, মটকিতে ঘি এনো’। তবে শুধু কবিতায় নয়, কটকি জুতোর জন্য তিনি একবার জলে পর্যন্ত ঝাঁপ দিয়েছিলেন। সে গল্প খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর পুত্রের ‘পিতৃস্মৃতি’ গ্রন্থে। শিলাইদহে থাকার সময় একদিন কবি এবং পুত্র রথী ‘পদ্মাবোটে’ ঘুরেছিলেন। বোটের খুব ধারে বসে পা দোলাতে গিয়ে কবির কট্‌কি জুতো পড়ে যায় জলে। তিনি ঝপাং করে ঝাঁপ দেন পদ্মার বুকে। অনেকদূর সাঁতার কেটে তিনি জল থেকে তুলে আনেন তাঁর প্রিয় কট্‌কি জুতোজোড়া।

 তবে কট্‌কি জুতো নিজের খুব পছন্দের হলেও বিদেশ ভ্রমণের সময় কবি লম্বা জোব্বার সাথে পা ঢাকা পাম্পশু জুতোই পড়তেন আর শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ‘গুরুদেব’ হিসাবে পৌরহিত্য করার সময় জুতোর বদলে খালি পায়েই তাঁকে বেশি দেখা যেত।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সৃষ্টির একটা অংশেও জুতোর উপস্থিতি উজ্জ্বল। ‘নষ্ট নীড়’ উপন্যাসে চারুলতা পান মুখে দিয়ে কাপড়ের জুতোয় সুতোর নকশা তুলেছিলেন দেওর ‘অমর’ এর জন্য। ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের বিমলাকে অচলায়তন ভেঙে অন্দরমহল থেকে জুতো পরে বাইরে আসতে দেখা গেছে।

তবে সব উদাহরণকে ছাপিয়ে গেছে ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতাটি। রাজা হবুচন্দ্রের পা ধুলো থেকে রক্ষা করার জন্য উপায় বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো মন্ত্রী গবুচন্দ্রকে। শেষ অনেক সাধ্যসাধনায় আবিষ্কার হল ‘জুতা’ বস্তুটি। মানুষের পা ধুলো থেকে বাঁচল, মন্ত্রীরও প্রাণরক্ষা হল-

সেদিন হতে চলিল জুতা পরা

বাঁচিল গোবু, রক্ষা পেল ধরা ।।