দেশ ও মানুষ জারোয়া উমা ভট্টাচার্য শীত ২০১৬

দেশ ও মানুষ আগের সব পর্ব একসাথে

deshomanushjarawa02ভারতবর্ষে  এখনো এমন কিছু  আদিম  উপজাতির মানুষ আছে যারা  সভ্য সমাজের সঙ্গে মিলেমিশে নিজেদের আদিম পরিচয় হারিয়ে ফেলেনি। আপন বিশিষ্টতা নিয়ে যারা এখনও আদিম আরণ্যক পরিবেশে বাস করতে ভালবাসে বা বাস করছে। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আন্দামানের নেগ্রিটো জনগোষ্ঠীর জারোয়ারা। সুদূর অতীতে এইসব আদিম মানুষদের পূর্বপুরুষরা কোনও কারণে আগেকার বাসস্থান ছেড়ে দলে দলে এই  নির্জন, অরণ্যময় ভূভাগে এসে ঠাঁই নিয়েছিল, তারপর ক্রমে বিভিন্ন দ্বীপে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই বিশাল নেগ্রিটো জনগোষ্ঠীতে  অনেক উপশাখা ছিল।

ভূমিকম্পের ফলে জেগে ওঠা পাহাড়,জঙ্গল,গভীর অরণ্যময় আন্দামান নামে এই লম্বাটে এই ভূভাগের কথা যখন সভ্য জগতের মানুষের অজানা তখন থেকেই এরা এখানে এসে বসতি করেছিল। পৃথিবীর সব দেশেই আদিম উপজাতীয় মানুষেরা ছিল প্রধানত  বনজীবী ও শিকারজীবি, ইংরাজিতে যাকে বলে ‘হান্টার গ্যাদারার’। বন আর শিকারনির্ভর হওয়ায় এরা ছিল যাযাবর। অস্থায়ী বাসস্থানের আশেপাশে শিকারের অভাব দেখা দিলে, এরা সে জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেত। যেমন ভারতের মূল ভূখণ্ডে এসেছিল আর্যরা। তেমনই নেগ্রিটো জনগোষ্ঠীর এই মানুষেরা এসেছিল মনুষ্য বিবর্জিত আন্দামানে।

আন্দামানের দ্বীপগুলির ভূ-পৃষ্ঠ ছোট ছোট পাহাড়,উপত্যকা, নদী-নালা,খাঁড়ি,সমূদ্রের উপকূল জুড়ে বিস্তৃত জলাভূমি,মৃত কোরালের চাদর,ম্যানগ্রোভ অরণ্য,চিরহরিৎ গভীর বর্ষণবন নিয়ে গঠিত। অরণ্যে শিকার, বনজ ফলমূল ও মধুর প্রাচুর্য তাদের এখানে বাস করার সুযোগ করে দিয়েছিল।

সপ্তম শতকে চৈনিক পরিব্রাজক ইৎসিঙ ভারতে এসেছিলেন। তাঁর লেখাতে আছে আন্দামান আর এখানকার  কালো, জংলি মানুষদের কথা। ১২৯২ খ্রিস্টাব্দে লেখা মার্কোপোলোর ভ্রমণ কাহিনীতে এই আন্দামান-নিকোবরের মানুষদের বিষয়ে আরও বেশি করে জানা গেল। তিনি যেমন দ্বীপগুলির সৌন্দর্যের বর্ণনা  দিলেন, তেমনই লিখলেন এখানকার কালো জংলি মানুষদের বিষয়ে নানা কথা। এরা অত্যন্ত হিংস্র, নগ্ন থাকে, কাঁচা মাংস খায়, এমনকি নরমাংসও খায়।

আসলে জাহাজে যাতায়াতের পথে দ্বীপের সাগর উপকুলে তীর- ধনুক,বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা নগ্ন, কালো মানুষদের গলায় দেখেছিলেন হাড়ের মালা। ভেবেছিলেন ভুক্ত মানুষের হাড়গুলি দিয়েই এরা মালা বানিয়ে পরে। এ কারণেই নরখাদক বলে এই মানুষরা পরিচিত হয়ে গিয়েছিল সভ্যজগতের কাছে। অবশ্য পরে জানা গেছে যে এরা মৃত পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ পেতে আর অপদেবতার নজর  থেকে বাঁচতে মৃত পূর্বজদের হাড়ের মালা বানিয়ে অঙ্গে ধারণ করে।

আন্দামানের সব আদিম মানুষই জঙ্গলের অফুরান শিকার, ফলমুল, কাঁঠাল এসব সংগ্রহ করত, সমুদ্র থেকে মাছ, কাঁকড়া, শামুক, কচ্ছপ ধরে খাবারের চাহিদা পূরণ করত। বর্তমানে একমাত্র জারোয়ারা আর সেন্টিনেলিজরা  ছাড়া আর কোনও আদিবাসী আন্দামানে নেই যারা বন বা শিকারজীবি। নেগ্রিটো জনগোষ্ঠীর অন্যান্য জনজাতিরা সভ্য জগতের কাছে হার স্বীকার করেছিল সহজেই। তাই কিছুদিনের মধ্যেই নিজেদের অস্ত্বিত্ব হারিয়ে মিশে যেতে বাধ্য হয়েছে মুল জনস্রোতের সঙ্গে বা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সেন্টিনেলিজরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য আন্দামানের ভূখণ্ড ছেড়ে, স্বজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে গেল দক্ষিণের সেণ্টিনেল দ্বীপে। বর্তমানে একমাত্র  সেন্টিনেলিজরাই বিশুদ্ধ হান্টার গ্যাদারার, সত্যিকারের শিকারনির্ভর প্রস্তরযুগীয় পর্যায়ে রয়েছে। আর,  সংখ্যায় খুব কম হলেও মূল আন্দামানের জঙ্গলে নিজেদের সংস্কৃতি বজায় রেখে বেঁচে আছে শুধু এই জারোয়ারা।

জারোয়াদের সঙ্গে গ্রেট আন্দামানিজদের ছিল চিরকালীন শত্রুতা। গ্রেট আন্দামানিজরা জারোয়াদের বলত ‘এরেমটাগা’, বা জঙ্গলের মানুষ। আর  নিজেদের বলত আডাজিগ-মানে যারা জংলি নয়, যারা উপকূল,খাঁড়ি, জঙ্গল  এলাকা মিলিয়ে বাস করে। গ্রেট আন্দামানিজদের এক শাখা আকা-বিয়াদের ভাষায় জারোয়া মানে আগন্তুক অর্থাৎ যারা অনেক পরে এসে এলাকা দখল করেছিল। তাই জারোয়ারা ছিল তাদের কাছে আক্রমণকারী শত্রু। এইসব কথাই জানা গেছে ইংরেজদের আন্দামানের ভূখণ্ডে উপনিবেশ স্থাপন করার পর।

আগে বলি গ্রেট আন্দামানিজ কারা ? কেনই বা তারা আর জারোয়ারা একই জনগোষ্ঠীর হলেও একে অপরের শত্রু?  

ইংরেজরা উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের  স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবীদের আর  সাধারণ  কয়েদিদের দ্বীপান্তরিত করার জন্য আন্দামানে বসতি করার কথা চিন্তা করলেন। সকলের থাকবার জন্য বাসস্থান আর কয়েদিদের জন্য জেল স্থাপন করতে গিয়েই এই অরণ্যচারী আদিম মানুষদের সংস্পর্শে আসেন। তখনই সংঘর্ষ বাঁধে। এই সময় ব্রিটিশ অফিসাররা বুঝলেন যে দ্বীপগুলির সব মানুষরাই এক গোত্রের নয়,এদের মধ্যে আলাদা আলাদা উপগোষ্ঠী আছে,যাদের প্রত্যেকের বিচরণের সীমানা নির্দিষ্ট  আছে,আলাদা আলাদা শিকার ক্ষেত্র আছে,ভাষা ও সংস্কৃতিতে বিস্তর পার্থক্য আছে। নিজেদের  মধ্যেও শত্রুতাও  আছে। ব্রিটিশ অফিসারেরা এদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা শুরু করলেন।

আন্দামানে বসতি স্থাপনের ব্যাপারে  দায়িত্বপ্রাপ্ত ইংরেজ অফিসার ডাক্তার জ়ে পি ওয়াকার বিস্তর অনুসন্ধান করে  জানতে পারলেন যে, দক্ষিণ আন্দামান থেকে উত্তর আন্দামানের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে বাস করে নেগ্রিটো জনগোষ্ঠীর দশটি স্বতন্ত্র উপগোষ্ঠী।

এদের নাম হল আকা-কারি, আকা-বো, আকা-কেড়ে, আকা-বিয়া, আকা-বালাওয়া, আকা-কোল, আকা- জ়েরো, আকা-কোরা, আকা-বোজিগয়াব, আর ওকু-জুয়াই।

এরা ছিল এক গোষ্ঠীভুক্ত। আর ছিল   ওঙ্গি্রা, অঙ বা জারোয়ারা, আর সেন্টিনেলিজরা। প্রথমোক্ত দশটি উপগোষ্ঠীর স্বতন্ত্রতার মধ্যেও বেশ কিছু  সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের মিল দেখে এবং নিজেদের কাজের সুবিধার জন্য এদের এক বৃহৎ দলভুক্ত করলেন জে পি ওয়াকার,  নাম দিলেন ‘গ্রেট আন্দামানিজ’।  

ইংরেজরা নানা সুযোগ সুবিধা দিয়ে জারোয়াদের চিরশত্রু গ্রেট আন্দামানিজদের মিত্র করে নিয়েছিল। আজ আর গ্রেট আন্দামানিজদের আলাদা কোনও অস্ত্বিত্ব নেই। ইংরেজরা গ্রেট আন্দামানিজদের ব্যবহার করতো জারোয়াদের দমন করার কাজে। ইংরেজ জমানায়  নানা জনগোষ্ঠী ইংরেজের বশ্যতা স্বীকার করেছে,কোন গোষ্ঠী স্বাধীনভাবে থাকার জন্য আন্দামানের জঙ্গল ছেড়ে চলে গেছে দূরের দ্বীপে, কিন্তু বশ্যতা স্বীকার করেনি একমাত্র স্বাধীনচেতা জারোয়ারা। নিজেদের বাসভূমির দখলও ছাড়েনি। দীর্ঘকাল ধরে  ইংরেজদের নিযুক্ত গ্রেট আন্দামানিজদের সঙ্গে, ইংরেজের তৈরি বুশ পুলিশদের সঙ্গে আর স্বাধীন ভারতে মূল ভূখন্ড থেকে আন্দামানে আসা উদ্বাস্তুদের সঙ্গে অবিরাম সংঘর্ষ করেও টিকে রইল আন্দামানের গভীর অরণ্যে। নিজেদের জাতির বৈশিষ্ট্য, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে বজায়  রেখে, বনবাসী জীবন বজায় রেখে চলেছে দীর্ঘকাল ধরে।এই বিষয়টি থেকেই প্রমাণিত হয় যে জাতি হিসাবে  জারোয়ারা সত্যিই কতটা ঐক্যবদ্ধ,শক্তিশালী ও নিজেদের  সংস্কৃতি বজায় রাখতে কতটা সক্ষম। তবে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের একটি ঘটনার পর থেকে চিত্রটা কিছুটা আলাদা হয়েছে।  

ঐ বছর উদ্বাস্তু সেটেলারদের এলাকায় রাতের অন্ধকারে চুরি করতে আসা একদল জারোয়ার মধ্যে একটি জারোয়া কিশোরের দুর্ঘটনা ঘটে। আহত ছেলেটি উদ্বাস্তু সেটেলার পরিবারের মানুষদের তৎপরতায় বেঁচে  যায় ও সরকারী চিকিৎসার সুযোগ পায়,ভালো হয়ে ফিরে আসে নিজের পরিবেশে,অরণ্যে। আর সেই কিশোর ‘এমেই’এর  মাধ্যমেই জারোয়ারা  সভ্য জগতের সঙ্গে শত্রুতা বন্ধ করে, যোগাযোগ করতে রাজি হয়।

কিন্তু তারা জঙ্গলজীবন  ছাড়েনি। সরকারের তরফেও সে চেষ্টা করা হয়নি,কারণ আগে দেখা গেছে যে,সভ্য দুনিয়ার পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস,মানুষজনের সংস্পর্শে এসে আন্দামানের উপজাতির নানা শাখার মানুষজন হাম,জ্বর বসন্ত,ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য নানা  রোগের শিকার হয়েছে, কখনও বা সেই রোগ মহামারীর আকারে দেখা দিয়ে অনেক আদিবাসীর প্রাণ নিয়েছে। তাদের জনসংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে, অনেক জনজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাই  জারোয়াদের ক্ষেত্রে স্বাধীন ভারতের সরকার অন্য নীতি নিয়েছেন। তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য নানা বন্দোবস্ত করেছে্ন।

১৯৫৬ সালে ভারত সরকার আদিম উপজাতিদের সুরক্ষার জন্য আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে ‘উপজাতীয় অঞ্চল’ বলে ঘোষণা করেছেন। দক্ষিণ ও মধ্য আন্দামানের যেসব এলাকা প্রধানত জারোয়াদের বিচরণক্ষেত্র ছিল সেসব এলাকা সংরক্ষিত বলে ঘোষিত হয় আর ১৯৭৯ সালে তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সংরক্ষিত বনাঞ্চলের এলাকা নির্ধারিত হয়েছে,‘জারোয়া রিজার্ভ ফরেষ্ট’। এই এলাকার মধ্যেই তাদের  গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত করা  হয়েছে। তবে বাস্তবে এই এলাকা আরও একটু বেশি,কারণ জারোয়ারা সংরক্ষণের সীমানাটিমানা বুঝত না।তাই  নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে নিজেদের পছন্দের এলাকায় চলেই আসত। ফলে সে’সব এলাকাও তাদের এলাকা বলে মেনে নেওয়া হয়। আন্দামানের পশ্চিম এলাকা বরাবর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকাও জারোয়াদের মাছ,শামুক,ঝিনুক,কাঁকড়া,কচ্ছপ ইত্যাদি শিকারের এলাকা বলে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে অনধিকার প্রবেশ শাস্তিযোগ্য।

জারোয়া রিজার্ভ ফরেষ্টের মধ্যে দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড ধরে যাতায়াতকারীদের উপর কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে-জারোয়াদের খাবার দেওয়া  যাবে না, তাদের ছবি তোলা যাবেনা, তাদের কাছে যাওয়া যাবেনা,তাদের কোনও নেশার দ্রব্য দেওয়া যাবেনা। ফলে প্রস্তরযুগীয় এই আদিম জনজাতির অস্তিত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।

তারা অরণ্যের গভীরে বাস করে, বনের পশুপাখি শিকার করে, জলের মাছ, কাঁকড়া, ঝিনুক, শামুক, কচ্ছপ এসব ধরে, ফলমুল সংগ্রহ করে। তবে এখন তাদের সঙ্গে সভ্য দুনিয়ার যোগাযোগ আছে। অসুখ-বিসুখ হলে তারা  সরকারি হাসপাতালে আসে। সরকার থেকে সভ্য জগতের সামনে আসবার জন্য তাদের পোশাক দেওয়া হয়, তবে নিজেদের বাসস্থানে তারা আগের মতই নিরাবরণ থাকে। খাবার রাখার ও সেদ্ধ করার জন্য বাসনপত্র দেওয়া হয়। অরণ্যের অন্তরালে তারা তাদের ঐতিহ্য অনুসারে জীবন যাপন করে। এখন তাদের সঙ্গে সরকারের আর শত্রুতার সম্পর্ক নেই। সেটলারদের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক ভালো। কিন্তু তাদের এলাকায় অনুপ্রবেশকারী, অরণ্যসম্পদ হরণকারী, গাছপালার ক্ষতি করতে আসা চোরা শিকারীদের তারা ক্ষমা করেনা। তারা যে আন্দামানের অরণ্যসন্তান,অরণ্যপ্রহরী!

deshomanushjarawa03বর্তমানে এদের বিচরণ ক্ষেত্রের এলাকা অনেকটাই কমে গেছে, কিন্তু এদের লোকসংখ্যাও অনেক কমে  গেছে।বর্তমানে ১০২৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা বিশিষ্ট নির্ধারিত বনাঞ্চলে বাস করে ৩৬০-৪০০ জনের মত জারোয়া। তাই তাদের বিশেষ অসুবিধা হয়নি। যেভাবে এদের টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছে সরকার তাতে    হয়তো আগামী দশ-পনেরো বছরের মধ্যে এদের সংখ্যা বেড়ে পাঁচশো হতে পারে বলে পরিসংখ্যানবিদদের মত।

এবার বলি এদের জীবনযাত্রা,বাড়িঘর,খাদ্যসংগ্রহ,খাদ্য সংরক্ষণ,নানা সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠানের বিষয়ে।

এরা  আজও প্রাচীন পদ্ধতিতে শিকার করে,অস্ত্র বানায়, নানা উৎসব পালন করে, নবজাতকের নামকরণ করে, কাঠের গুঁড়ি ভেতর থেকে চেঁছে বালতি, মধুর পাত্র বানায়, বেতের ঝুড়ি, মাছ ধরবার হাতজাল, তৈরি করে। কাঠ বা বাঁশের খুঁটি, গাছের ডালপালা, লতাপাতা দিয়ে ঘর বানায়।

এদের ঘর গুলিকে বলে চাড্ডা।দুই রকমের চাড্ডা হয়-ছোট পরিবারের থাকার জন্য পারিবারিক চাড্ডা বা তুতিমে চাড্ডা,আর সামুদায়িক বা চাড্ডা-ডি-ঠুমা। সেলাই পাতা আর লম্বা পাতি-যাকে জারোয়ারা বলে ‘থুইয়া পিপি’, স্থানীয় নাম লম্বাপাতি,(বৈজ্ঞানিক নাম ‘নিপা ফ্রুক্টিকান’) দিয়ে চাড্ডার চাল বানায়।সম্পূর্ণ জৈব বস্তু দিয়েই তৈরি হয় সেসব অস্থায়ী বা আধা অস্থায়ী চাড্ডা। কাঠ , বাঁশ, গাছের ডাল,অর্কিডের ছাল থেকে তৈরি শক্ত সুতো বা লতা এসবই ব্যবহার করে। সমুদ্র  থেকে দূরে,অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গা বা টিলার ওপরে দেখা যায় এদের  চাড্ডাগুলি। এদের চাড্ডার চারদিক থাকে খোলা।চাল খুব উঁচু থেকে প্রায় মাটির হাতখানিক উঁচু পর্যন্ত নেমে আসে।জানলা,দরজা,দেওয়ালের দরকার হয় না। এরা প্রধানত সামুদায়িক বা কমিউনিটি চাড্ডা বানায়,যাতে এক একটি চাড্ডায় বেশ কয়েকটি পরিবার-(আগে পঁচিশ-ত্রিশটি পরিবারও থাকত) একসঙ্গে বাস করতে পারে। এদের সামাজিক বন্ধন যে কতটা  দৃঢ় তার প্রমাণ এইসব কমিউনিটি বা সামুদায়িক চাড্ডা। এইসব চাড্ডাতে প্রতি  দুটি পপরিবারের নির্দিষ্ট থাকার জায়গার মাঝখানে খানিকটা  ফাঁকা জায়গা  থাকে, সেখানে এক টুকরো লম্বা কাঠ রাখা হয় সীমানা বোঝাতে। সেই  ফাঁকা জায়গায় উনুন করা হয়, সেখানেই রাতে আগুন জ্বালানো হয়, ‘হুইনাং’ (মশা) আর ‘ফিকিজিম’(স্যান্ডফ্লাই)য়ের থেকে বাঁচার জন্য আর আলোর জন্য। তবে এদের কামড় থেকে বাঁচার জন্য আবার মধু সংগ্রহের সময় মৌমাছির আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য, আমাদের ওডোমসের মত ওরাও একরকম ভেষজ গাছের রস গায়ে মাখে তবে  সেসব চাড্ডায় বেশিদিন থাকেনা,তবে যাবার সময় ঘর  ভাঙে না।খালি ঘর ছেড়ে চলে যায়। ঘরের চালে  ঝোলানো থাকে পুরনো  বাতিল তীর ধনুক,শিকার করা বড় শূয়োরের মাথার খুলি, পরিবারের মৃত সদস্যদের দেহের হাড়।              

এরা ঘরের মেঝে সব সময় পরিস্কার রাখে। দরকারি জিনিসপত্র, তীরধনুক, বল্লম, কুঠার প্রভৃতি অস্ত্র, জলের আর মধুর পাত্র, এসব চাড্ডার খুঁটির গায় বা চালে ঝুলিয়ে রাখে। চাড্ডার মেঝেতে সেলাই পাতা (ছোট ছোট একরকম তালজাতীয় গাছের পাতা) বিছিয়েই বিছানা করে, ছোটো পাথরের টুকরো বা মোটা কাঠের গুঁড়ির বালিশে মাথা রেখে উমো করে, মানে ঘুমায়। নবজাত শিশু আর মায়ের জন্য কাঠের খুঁটি দিয়ে মেঝে থেকে সামান্য উঁচুতে একটি মাচান বানিয়ে তার ওপর টাটকা  সেলাই পাতা বিছিয়ে বিছানা করে দেয়,কাছেই আগুন জ্বালিয়ে রাখে,পাতার মশালে ধুনোর  ধোঁয়া দেয় (ঠিক আমাদের দেশে যেমন রোগীর ঘরে বা প্রতিদিন সন্ধে বেলায় দীপ, ধুনো এসব দেওয়া হয়)। এদের কোন দেবতার ধারণা নেই। বিশ্বাস করে অতিপ্রাকৃতিক শক্তির আর শয়তানের অস্ত্বিত্বে। পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদে বা অসন্তুষ্টিতে বিশ্বাস রাখে। বিশ্বাস রাখে তাদের দলপতি যার রোগ নিরাময়কারী শক্তি আছে বা যারা মৃত পূর্বপুরুষদের আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে-তাদের ওপর। তবে  এদের ঐতিহ্যে কোন  দেবদেবীর অস্তিত্ব নেই। সন্ধের পর  এরা ঘরের সামনে আগুন জ্বালিয়ে চারদিক ঘিরে বসে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করে,নাচ-গান করে সময় কাটায়।

এরা সকাল হলেই সকলে মিলে শিকারে যায়। শিকার করে ফিরে চলে রান্নাবান্নার কাজ। এরা এখনো নিজেদের রান্নায় তেল,নুন বা মশলা ব্যবহার করে না। শুয়োর এদের সবচেয়ে প্রিয় শিকার। প্রাচীনকাল থেকে এরা যে পদ্ধতিতে শিকারকে খাদ্যযোগ্য করত সেই পদ্ধতিটি যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত ছিল,তা আজও বজায় আছে। শিকার করা মাংসকে এরা তিনটি পদ্ধতিতে প্রস্তুত করে-রোস্টিং,বয়লিংআর বেকিং।

ছোট্ট কচি নরম বুনোশুয়োর পেলে এরা আগুনের ওপর সেঁকে রোস্ট করে নেয়। মাঝারি আকারের শুয়োর শিকার পেলে সেই মাংস সেদ্ধ করে খায়। আর বড় আকারের বুনো শুয়োর পেলে সেটিকে রান্না করে বেকিং পদ্ধতিতে।

শিকার খাদ্যযোগ্য করার আগে শিকারের নাড়িভুঁড়ি বের করে নেয়। এরপর সমুদ্রের ধার থেকে পাওয়া  একরকমের সাদা কাদামাটির প্রলেপ লাগায় শিকারের সারা গায়। এবার একটি কাঠের পাটাতনের ওপর সেটিকে রেখে নীচে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।তপ্ত কাঠের স্পর্শে মাটির প্রলেপ শুকিয়ে গেলে,শুয়োরের লোমশুদ্ধ চামড়াটি টেনে  সহজেই ছাড়িয়ে নেয়।এরপরে সেটিকে কেটে ছোট ছোট টুকরো করে পাটাতনের ওপর রেখে বা সরু কাঠিতে কিংবা শিকে গেঁথে ওপর থেকে ঝুলিয়ে দিয়ে নীচে আগুন  দিয়ে ঝল্‌সে নেয়। খাবার তৈরি হয়ে যায়,সকলের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে।

একইভাবেই মাঝারি মাপের শিকারের ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে,লোহার পাত্রে সেদ্ধ করে নেয়।আজকাল সরকার থেকে পাওয়া সিলভারের ডেকচিতেও সেদ্ধ করে। তবে তৃতীয় পদ্ধতিটি বেশ সময়সাপেক্ষ।

এই পদ্ধতিতে প্রথমে শিকারটিকে পরিষ্কার করে,ছাল ছাড়িয়ে,টুকরো টুকরো করে রাখে। এবার মাটিতে খুব যত্ন করে একটি ছোট আকারের অল্প গভীর গর্ত খোঁড়ে, এবার গর্তের মধ্যে সযত্নে বিছিয়ে দেয় লম্বাপাতি নামে বহুল ব্যবহৃত একরকম পাতা, গর্তের মেঝে আর দেওয়ালটা যত্ন করে পুরো ঢেকে দেয়, যাতে কোন মাটি না মেশে  খাবারের সঙ্গে। এবার মাংসের কাটা টুকরোগুলি পাতার ওপর পরতে পরতে বিছিয়ে দেয়। এবার কয়েক পরত  লম্বাপাতি দিয়ে মাংসটা ঢেকে দেয়। সেই পাতার ওপরে পাথরের টুকরো সাজিয়ে পুরো ঢেকে দেয়। তার ওপরে জ্বলন্ত কাঠের টুকরো পরতে পরতে সাজিয়ে দেয়। এভাবে দু-তিন ঘন্টা রাখার পর কাঠের আগুন নিভে গেলে সেগুলি সরিয়ে নিয়ে উত্তপ্ত পাথরগুলিও সরিয়ে নেয়। এবার পাতা সরিয়ে বেক করা মাংসের টুকরোগুলি তুলে নেয়। নরম তুলতুলে মাংস এবার খাবার পালা।

উৎসবে,পরবে গোষ্ঠীর সকলের জন্য এইভাবেই মাংস রান্না হয়  সবার জন্য। মাংস খাবার আগে এরা ওই সাদা কাদা মাটির প্রলেপ লাগায় মুখে ,হাতে ও শরীরে। মনে হয় তেল তুলে ফেলার জন্যই এই মাটি মাখে। খাবার পর নাচ গান হয়,তারপর এই মাটির প্রলেপ ধুয়ে ফেলে। এই মাটি দিয়ে এরা মুখ, শরীর,হাত,পা চিত্রিতও করে।

deshomanushjarawa01মাংস ছাড়া মাছও এরা খায়,সেদ্ধ করে বা ঝল্‌সে নিয়ে। কচ্ছপও খায়। শিশুরা কাঁচা শামুক, ঝিনুক খোলা ছাড়িয়েই খেয়ে নেয়। এদের নিরামিষ খাদ্যের তালিকায় আছে (গরমকালে) থুইয়া ফলের শাঁস,কাঁচা ও পাকা কলা,বাঁশের দানা বা ফল, বাদাম, লাল ফল,কাম ফল, জংলি কাজুবাদাম, জংলি আম, কাঁটাফল প্রভৃতি নানা মরসুমি ফলমূল, কেওড়া, হলুদ ও  আলুর মত কন্দমূল। এসব এরা কাঁচাও খায় আবার প্রয়োজনে সেদ্ধ বা রোস্ট করেও খায়। নারকেলের জল বাদ দিয়ে শাঁসটুকু খায়। এদের সবচেয়ে ভালো নিরামিষ খাবার হল জংলি কাঁঠাল।

আগুনের ব্যবহার এরা আদি থেকেই জানে, পাথর ঠুকে বা কাঠে কাঠে ঘসে এখনও আগুন জ্বালায়।তবে সরকারের কাছ  থেকে পাওয়া দেশলাইও আজকাল ব্যবহার করে।

এদের কাঁঠাল খাওয়ার পদ্ধতিটিও জানার মত। জংলি কাঁঠালের বীজগুলিই এরা খায়,তবে কাঁচা নয়। মাংস রোস্ট করার পদ্ধতিতেই কাঁচা কাঁঠাল জড়ো করে রোস্ট করে, ঠান্ডা হলে ভেতরের বীজ বার করে নেয়।  তারপর সেগুলি গাছের ছালের থেকে তৈরি সরু সুতো দিয়ে বানানো জালের মধ্যে করে খাড়ির জলে ডুবিয়ে  রাখে, তারপর তুলে এনে ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে নিয়ে কাঠের বালতিতে জমিয়ে রাখে দরকারে খাওয়ার জন্য। মহুয়া ফল এদের খুব প্রিয়। এছাড়া এরা চাকের মধু সংগ্রহ করে আনে, কাঠের বালতিতে রেখে দেয়। বর্ষাকালে, বা শিকার না পেলে খাওয়ার জন্যই তারা সঞ্চয় করে।

এরা আদিকাল থেকে বংশানুক্রমিকভাবে জেনে আসা ঔষধশাস্ত্র অনুসারে নানা ভেষজ লতা গুল্ম ব্যবহার করে রোগের চিকিৎসার জন্য।আজকাল কঠিন রোগ হলে তবেই হাসপাতালে আসে,নতুবা নিজেদের টোটকা অষুধই ব্যবহার করে।রোস্টিং পদ্ধতিতে মাংস রান্নার সময় নীচের পাতায় মাংসের সমস্ত চর্বি গলে গিয়ে জমা হয়, সেই চর্বি এদের অষুধ তৈরির কাজে লাগে।।কাঁঠাল পোড়ানোর সময় পাতার ওপরে যে লালচে ভঙ্গুর পাথর চাপা দেয় কাঠের আগুনের নীচে,সেই পাথর গুঁড়ো করে তার সঙ্গে এই চর্বি মিশিয়ে  ব্যাথা কমানোর জন্য অ্যানালজেসিক মলম-অ্যালাম বানায়।নিজেদের চিকিৎসা পদ্ধতিতে এরা হাত বা পায়ের হাড় ভাঙার চিকিৎসা করে।ভেষজ গাছের ডাল,লতাপাতা ভাঙা জায়গার ওপর চাপা দিয়ে দুপাশে বাঁশের চটি দিয়ে টাইট করে বেঁধে দেয়,এখনও যেমন  গ্রামাঞ্চলে গরীব মানুষজন এই পদ্ধতিই ব্যবহার করে। সময়ের সাথে সাথে ভাঙা অংশ আপনিই জুড়ে যায়, সুনাম হয় গোষ্ঠীর জাদুচিকিৎসকের। কেটে যাওয়া অংশের রক্তপাত বন্ধ করার জন্য এরা ভেষজ উদ্ভিদের রস লাগায়। ক্ষতস্থান গভীর হলে ক্ষতের ওপর ভেষজ উদ্ভিদের পাতা চাপা দিয়ে তার ওপর লতা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে  দেয়। ক্ষতস্থান বিষাক্ত হয়ে গ্যাংগ্রিন দেখা দিলে তাদের জাদুবৈদ্য একজন অভিজ্ঞ শল,ইয়চিকিৎসকের মতই ধারালো ছুরি দিয়ে সেই অঙ্গ কেটে বাদ দিয়ে দেয়। পেটের গণ্ডগোলে এরা একরকম ধূসর বাদামী রঙের শুকনো মাটির গুঁড়ো জলে মিশিয়ে রোগীকে খাইয়ে দেয়। এই গেরুয়া মাটি সমুদ্র তীরের নিকটের জঙ্গলেই পাওয়া যায়।  এই মাটিতে ডায়রিয়া প্রতিষেধক গুণ আছে। গা-হাত-পা ব্যথায় ভেষজ গাছের লতা সেই জায়গায় বেঁধে দেয়। জ্বর হলে মধু খেয়ে নেয়,মধুতে যে ব্যাথানাশক ও অ্যান্টিসেপটিক গুণ আছে তা এদের জানা আছে। আজকের  সভ্য সমাজের অতীতের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে আমাদের সমাজেও এইসব ঔষধই ব্যবহার করা হত। সভ্য সমাজের সঙ্গে যোগাযোগের পর এদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারীদের, ও ডাক্তারদের ঘনঘন মেলামেশার ফলেই এসব জানা গেছে। আজকাল অবশ্য জটিল রোগে এরা সরকারী চিকিৎসার সুযোগ ব্যবহার করে।        

এরা সাজতে খুব ভালোবাসে। সাদা আর ধূসর কাদা মাটি দিয়ে তৈরি ‘পেলাব’ নামে পেইন্ট দিয়ে সারা শরীর চিত্রিত করে, হাড়ের মালা বানায়,ছোট ছোট হাড়ের টুকরো দিয়ে নেকলেস বানায়।নারী পুরুষ উভয়েই ব্যবহার   করে  মৃত পূর্বজদের হাড় দিয়ে তৈরি এই অলঙ্কার।বনের ফুল,লতাপাতা দিয়েও অলঙ্কার বানিয়ে নিজেদের সাজায়। ছেলেরা যে ‘কেকাড’ মানে বর্ম ব্যবহার করে সেগুলিও শিকার করা পশুর রক্ত বা রং দিয়ে সুন্দরভাবে চিত্রিত করে। মধুর  পাত্র,বালতি,তীর ধনুকও চিত্রিত করে।এসব চিত্রকর্ম দেখলে অবাক হতে হয় এদের শিল্পবোধ দেখে।

এরা বাঁশ দিয়ে ভেলা বানায়,বাদাম কাঠ দিয়ে উহু বা মধুর পাত্র বানায়। মোটা বাঁশের টুকরো দিয়ে জলের বোতল বানায়।বাঁশের মাঝখানের ফাঁপা অংশটিতে জল রাখে। একটি মধুর পাত্র,একটি বাঁশের বর্ম বানাতে প্রায়  দু-তিন দিন লেগে যায়।অবসর সময়ে পুরুষেরাই এগুলি বানায়।শিকার ছাড়ানো থেকে রান্না সবটাই পুরুষেরা করে।মেয়েদের বিশেষ ভারী কাজ করতে দেয়না।মেয়েরা ঘরকন্নার টুকিটাকি করে আর ছোট ছেলেমেয়েদের যত্ন করে।বাচ্চাদের পিঠে নিয়ে সাঁতার কাটে। মায়ের পিঠে চড়ে সাঁতারের সময় ভয়ঙ্কর সমুদ্রের সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করতে শেখে,ভয় কেটে যায়।

এদের সমাজে মেয়েদের সম্মানের দাম অনেক বেশি। সুস্থ শিশুদের সারা শরীরে এরা ‘পেলব’ মাটির প্রলেপ লাগায় পোকামাকড়ের কামড় থেকে শিশুদের রক্ষা করতে। শিশুরা এদের সমাজে খুবই মূল্যবান, কিন্তু জন্ম থেকেই বিকলাঙ্গ শিশুকে এরা বাঁচিয়ে রাখে না। তবে সুস্থ শিশু অসুস্থতার কারণে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়লে তাকে সারিয়ে তোলার চেষ্টার ত্রুটি করে না।

মৃত্যুর পর এরা দেহ পোড়ায় না। আদিম রীতি অনুসারে মৃতদেহটি বাসগৃহের কাছাকাছি কোন মোটা আর বড় গাছের গোড়ায় শেকড়ের বা বাট্রেসের ফাঁকে বসিয়ে রেখে দেয়, উবু করে। ওপরে গাছের পাতা, পাথরের টুকরো, মোটা কাঠের লম্বা লম্বা টুকরো চাপা দিয়ে দেয়। তারপর চার-পাঁচ মাসের জন্য সেই স্থানত্যাগ করে যায়। মনে হয় ভয়ে এমন করে না। এই ব্যাপারটি কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত ,কারণ দেহটি পচতে থাকলে দুর্গন্ধ ছড়ায়, পরিবেশ দূষিত হয়, তাতে অসুস্থ হতে পারে অন্যরা। বৃষ্টির জলের সঙ্গে সেই পচতে থাকা মৃতদেহের অংশ পানীয় জলের নালাতে মিশে জলকে দূষিত করতে পারে। সেই জল তারা ব্যবহার করতে পারবে না, কারণ এরা নোংরা জল পান করে না, বাসি বা পচা খাবারও খায় না।

কিছুদন বাদেফিরে এসে কঙ্কালের দেহের হাড়গুলি ধুয়ে,পরিষ্কার করে ব্যবহার করে অলঙ্কার তৈরির জন্য। মাথার খুলিটি আর লম্বা হাড়গুলি সেই গাছের কোটরে বা গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখে সৎকার পর্ব সমাধান করে। এরা শিশুদের ক্ষেত্রে মৃতদেহ কবর দেয়।

আমাদের মতই এদের সমাজে মা,বাবা,দাদা,ভাই,বোউদি,ঠাকুমা,ঠাকুর্দা,ভাইপো,ভাইজির মত সম্পর্ক জোরালো।

এই আদিম মানুষদের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি এত সমৃদ্ধ যে সব ছোট্ট পরিসরে বলে শেষ করা যাবেনা। তবে শেষ করার আগে এদের ব্যবহৃত কিছু শব্দ ও বাক্য লিখে এই লেখা শেষ করব।

আমি=মি। তুমি=নি। মা=ওয়াকায়ে। বাবা=ওয়ামুমে, ভাই=আইকোটা। কাকা=নাহেটাই।কাকিমা=মুলিঠাঙ। দাদা=মাপো। বৌদি =মাপো-থা। দিদি =ওয়ামি। জামাইবাবু =ওয়ামি থাগি ।সন্তান =ইচেলে। ছেলে =দা।মেয়ে =দোয়েলে।শিশু =নোনোয়া ।বন্ধু =মিতাজিলে । বহিরাগত মানুষ = ইনেন। সূর্য=এহে। চাঁদ= তাপে। তারা =চিলাবে । মেঘ =এঠি-বিঠি। বৃষ্টি =ঈউয়া।মাটি =পেলা।পাথর =উলি।মধু =লেও। নারকেল =ডাগ্‌ ।খারাপ =বিটি বিটি ।ভালো =চেব চেব ।              

উমা ভট্টাচার্য র সমস্ত লেখার সংগ্রহ

 

 

Advertisements

1 Response to দেশ ও মানুষ জারোয়া উমা ভট্টাচার্য শীত ২০১৬

  1. মোঃ রবিউল ইসলাম মোললা says:

    পাহাড়িরা দরিদ্র কিন্তু এ জাতির মাঝে ভিক্ষা আর চৌর্যবৃত্তি নাই

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s