দেশ ও মানুষ অনুরাধা রাও উমা ভট্টাচার্য বর্ষা ২০১৬

দেশ ও মানুষ -আগের পর্বগুলো

desh57 (4) (Medium)আন্দামানের ‘রস’ দ্বীপের প্রাইভেট গাইড অনুরাধা রাওয়ের দেখা পেয়েছিলাম আন্দামানের ‘রস’ দ্বীপে বেড়াতে গিয়ে।তিনি আমার গাইড ছিলেন না। আমি তাঁকে খুব কাছ থেকে অন্য একটি পর্যটক দলের সঙ্গে দেখি।কাছে কাছে থেকে তাঁর কথাবার্তাও শুনি। দেখি তাঁর পশুপ্রীতি।

প্রথম দেখায় তাঁর চেহারাতে কোন আকর্ষণীয় কিছুই নজরে পড়বে না। অনেকে মনে করেন তিনি আন্দামানের একজন উপজাতীয় মহিলা, চেহারাতে সেই ছাপ স্পষ্ট। গায়ে থাকে একটি হাতকাটা চেকশার্ট আর একটি জিনসের প্যান্ট। পোশাকের উজ্জ্বলতা বলতে কিছুই নেই। কাঁধে একটি ঝোলা ব্যাগ,তাতে থাকে কিছু খাবার, ওখানকার পোষ্যদের জন্য। পোষ্যদের মধ্যে আছে প্রচুর হরিণ, ময়ূর,কাঠবেড়ালি,খরগোশ। রাজ্যের পাখিও আসে তাঁর কাছ থেকে খাবার পাবার আশায়। 

অনুরাধা রাও-এর প্রতিদিনের কাজ হচ্ছে পর্যটকদের পোর্ট ব্লেয়ার থেকে সঙ্গে নিয়ে নৌকা করে রস দ্বীপে নিয়ে আসা। টিকিট কাটা ইত্যাদি পর্ব শেষ হলে তিনি পর্যটকদের ‘রস’ দ্বীপের নানা স্থান,পুরনো বাড়িঘর,ওয়াটার প্ল্যান্ট, প্রেসবিটারিয়ান চার্চ, কবরখানা, সাহেবদের নাচঘর, বেকারি, হাসপাতাল, মিউজিয়াম সব ঘুরে ঘুরে দেখান খুব যত্ন নিয়ে,আর সঙ্গে বলে চলেন অজস্র অজানা কাহিনী, বর্তমানে মনুষ্যবর্জিত এই দ্বীপের অতীতের ইতিহাস। ‘রস’ দ্বীপের জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া তিনি। শৈশব থেকে আজ এই প্রবীণ বয়স পর্যন্ত দেখা নানা ঘটনার সাক্ষী তিনি।রস দ্বীপের ইতিহাস ,ভূগোল নিজের হাতের তালুর রেখাগুলির মতই তাঁর জানা।

 এই দ্বীপে রাতে মানুষ থাকার নিয়ম নেই। এখানে শুধু ১৯৭৯ সালে তৈরি ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি ঘাঁটি আছে। নৌবাহিনীর অফিসাররা আর তাঁদের সাহায্যকারী কিছু অসামরিক মানুষজন এখানে থাকেন। অনুরাধাও রাতে এখানে থাকেন না। তিনি প্রতিদিন কয়েক দফা পর্যটকদের নিয়ে আসা-যাওয়া করেন পোর্টব্লেয়ার থেকে।

desh57 (3) (Medium)

‘রস’ দ্বীপের এই প্রাণীরাজ্যের স্থাপন হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। শুরুতে তিনি এনেছিলেন তিনটি হরিণ,দু’টি ময়ূর-ময়ূরী,আর একটি খরগোশ। তারপর এদের সংখ্যা বেড়েছে। এখন সংখ্যায় অগুণতি। এই প্রায় মৃত দ্বীপে এই সুন্দর জীবদের দেখে মনে হয় যেন একটি সাফারি পার্কে এসেছি। এদের জন্য তিনি নিয়ে আসেন ‘ইস্টমুক্ত’কেক, পাউরুটি, বিস্কুট।

তাঁর কাছ থেকে জানা গেল পর্যটকেরা আগে এখানকার প্রাণীদের খাবার দিত,কিন্তু ‘ইস্ট’ দেওয়া খাবারে এদের ক্ষতি হয়। তাই এখন এখানে প্রাণীদের কোনরকম খাবার দেওয়া বারণ হয়েছে।

অনুরাধা ভারতবাসী হিসাবে অত্যন্ত গর্বিত।তাই তাঁর বক্তব্য,“আমি ইংরেজি খুব ভালোভাবেই বলতে পারি, কিন্তু আমি আপনাদের গাইড হিসাবে হিন্দিতেই কথাবার্তা বলব, কারণ আমি ভারতীয় নাগরিক আর আমাদের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি। আপনারা যখন প্যারিসে বেড়াতে যান তখন কি সে দেশের মানুষ হিন্দিতে কথা বলে? তাঁরা তো আমাদের সাথে নিজেদের মাতৃভাষাতেই কথা বলে। তাই আমিও গাইড হিসাবে হিন্দিতেই কথা বলব।”

তিনি ঝাড়া এক থেকে দেড়ঘণ্টা নানা বিষয়ে পর্যটকদের জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়ে যান। অনুরাধার কাছেই জানা যায় রস দ্বীপটি শুরুতে ছিল আয়তনে ২০০ একর, ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকম্পে ১৩০ একর জমি তলিয়ে গিয়েছিল সাগরে। 

অনুরাধা রাওয়ের ঠাকুর্দা ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সেনা। মধ্যভারতে ছিল তাঁর বাড়ি। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক কাজকর্মের অপরাধে তাঁর যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়েছিল। তাঁকে পাঠানো হয়েছিল আন্দামানের ‘রস’ দ্বীপে।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহের পরে ব্রিটিশ  সরকার ‘রস’ দ্বীপে একটি ‘পেনাল সেটেলমেণ্ট’ স্থাপন করেছিল, ভারতের দ্বীপান্তরিত আসামীদের জন্য। ভারতের সাজাপ্রাপ্ত বিপ্লবীদের দিয়েই এই বাসযোগ্য স্থান গড়ে তোলা হয়েছিল। সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের  থাকার জন্য ছিল বস্তির মত কুটির আর তা এঁদের শ্রমেই নির্মিত হয়েছিল।

কিন্তু এই  সাজাপ্রাপ্ত আসামীরা মানুষের যোগ্য সম্মান কোনদিনই পেত না। অনুরাধার কাছ থেকেই পর্যটকরা জানতে পারেন যে, তাঁর দাদু ছিলেন দ্বিগুণ  দুর্ভাগা। তিনি ব্রিটিশদের হাতে লাঞ্ছিত তো হয়েই ছিলেন, তদুপরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান ‘রস’  দ্বীপের দখল নিলে তাঁকে ব্রিটিশের চর বলে সন্দেহ করে। এক বছর ধরে জাপানিরা তাঁর ঠাকুর্দা আর আরও কয়েকজন বন্দির ওপর নৃশংস অত্যাচার করেছিল। তারপর একদিন এঁদের এক  লাইনে দাঁড় করিয়ে মাথায় গুলি করেছিল। গুলি তাঁর দাদুর মাথার খুলি ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছিল। আলি নামে আর একজন ভারতীয় বন্দি, যিনি ছিলেন দাদুর বন্ধু,আর দ্বীপের  প্রথম স্থাপিত একমাত্র মুদি দোকানের মালিক, তিনিও একসঙ্গে মারা গিয়েছিলেন জাপানিদের হাতে।   

desh57 (1) (Medium)সে সব কথা ভুলতে পারেন না অনুরাধা রাও। তাই এই দ্বীপের প্রতি তাঁর অসীম মায়া। তাঁর  ছেলেবেলার বাসভূমিতে প্রতিদিনই আসেন গাইডের কাজ করতে আর এই অবোলা প্রাণীদের যত্ন করতে। কখনো বাচ্চা কাঠবেড়ালিকে ফিডিং বট্‌লে করে দুধ খাওয়ান, একটি অন্ধ হরিণকে সাংকেতিক শব্দে সাড়া দিতে শেখান, সেটিকে পরম মমতায় খাইয়ে দেন। প্রায় শতাধিক হরিণ তাঁর আহ্বানে ছুটে আসে খাবার খেতে, যে স্বাদু খাবার তিনি প্রতিদিন পোর্ট ব্লেয়ার থেকে ব্যাগে করে নিয়ে আসেন এদের জন্য। 

অনুরাধা রাওয়ের কাছেই জানা যায় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ‘রস’ দ্বীপের শেষ ব্রিটিশ  চীফ কমিশনার ছিলেন স্যার চার্লস্‌ ফ্রান্সিস ওয়াটারফল। তিনি দ্বীপের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে। জাপানি সেনারা ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে তাঁকেও বন্দি বানিয়েছিল। আর তাঁর ডেপুটি মেজরকে জাপানিরা পোর্টব্লেয়ারে নিয়ে গিয়ে জনসমক্ষে, ‘সেন্ট্রাল স্কোয়ারে’, তাঁর মাথা কেটে ফেলেছিল।

অনুরাধা দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে বলেন যে জাপানিরা পোর্টব্লেয়ার পর্যন্ত একটি দীর্ঘ টানেল খুঁড়েছিল আর সেই টানেলে তারা অনেক লুন্ঠিত সম্পদ লুকিয়ে রেখেছিল। আর তারা টানেলের মুখের  দিকটা দাহ্য পদার্থ দিয়ে ঠেসে বন্ধ করে রেখেছিল। যেন সেই সম্পদের খোঁজ কেউ না পায় তাই এরকম করেছিল। তিনি বারবার কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন সে কথা। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শোনে নি। তাঁর আক্ষেপ যদি সেই সম্পদ উদ্ধার করা যেত তাহলে স্বাধীন ভারতের সম্পদ বাড়ত। অনুরাধার আক্ষেপ আজ সেই ‘রস’  আর নেই, বিরাট আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আধার, সুখ-দুঃখের স্মৃতি মেশানো ‘রস’ দ্বীপ আজ সেই বিশাল আয়তন খুইয়ে এখন হয়েছে ছোট্ট-মাত্র ৭০ একর জায়গা জুড়ে এর অবস্থান। তাঁর কথায় একদা ‘প্রাচ্যের প্যারিস’ বলে খ্যাত ‘রস’ দ্বীপ আজ হানা-দ্বীপের অবস্থায় থাকলেও এর টান তাঁর কাছে অসীম। এর মাটিতেই ঘুমিয়ে আছেন তাঁর দাদু,ঠাম্মা,মা-বাবা,ভাই-বোন সবাই। আজ তিনি একা। তাই এই দ্বীপের মাটি তাঁর কাছে অমূল্য।

ছেলেবেলা থেকে খুব কষ্টের মধ্যে কাটিয়েছেন অনুরাধা। স্বাধীনতা সংগ্রামী পিতার সন্তান হলেও অনুরাধার বাবা দুঃখকষ্টের মধ্যে বড়ো হতে হতে অমানুষ হয়ে উঠেছিলেন। অনুরাধা বলেছিলেন, তাঁর বাবা তাঁর আর ভাইবোনদের কাছে ছিলেন হিটলার। মারধোর, না খাওয়া ছিল তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিত্যকারের পাওনা। একে একে সবাই চলে গেলেও তিনি বেঁচে রইলেন একা। তাই ‘রস’ তাঁর জন্মভূমি, সেই মধুর দিনের স্মারক, ভালবাসার জায়গা। তাই তিনি মনে করেন ‘রসের’ প্রতি তিনি   দায়বদ্ধ, কারণ এখানেই ঘুমিয়ে আছেন তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামী দাদু। তাঁদের কথা পর্যটকদের জানানো তাঁর কর্তব্য।         

পর্যটকদের উদ্দেশ্যে  অনুরাধার আবেদন, যাঁরা এখানে এসে ‘রস’ দ্বীপ ঘুরে  দেখেশুনে  চলে যান তাঁদের, বিশেষ  করে যুব সমাজের মনে রাখা উচিৎ যে এই দ্বীপের উন্নতির জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছিলেন  তাঁরা সবাই  ছিলেন ভারতমাতার শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁরা নিজেদের পরিবার, সমাজ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ,সব বিসর্জন দিয়েছিলেন স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখে। নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে, শাস্তিস্বরূপ পেয়েছিলেন দ্বীপান্তর।আজ ভারত স্বাধীন আর অনেক প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া সেই স্বাধীনতা বজায় রাখতে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

desh57 (2) (Medium)

১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি নিজে থেকেই গাইডের কাজ শুরু করেন । দীর্ঘদিন ধরে এই কাজে তাঁর একাগ্রতা,আগ্রহ,ও দায়িত্বজ্ঞান দেখে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের শাসক কর্তৃপক্ষ তাঁকে বাৎসরিক চুক্তিতে ‘ট্যুরিস্ট ফেসিলিটেটর’নিযুক্ত করেছেন। 

 

ছবিঃ লেখক

১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি নিজে থেকেই গাইডের কাজ শুরু করেন । দীর্ঘদিন ধরে এই কাজে তাঁর একাগ্রতা,আগ্রহ,ও দায়িত্বজ্ঞান দেখে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের শাসক কর্তৃপক্ষ তাঁকে বাৎসরিক চুক্তিতে ‘ট্যুরিস্ট ফেসিলিটেটর’নিযুক্ত করেছেন। 

ছবিঃ লেখক