দেশ ও মানুষ-রাখে হরি মারে কে-আবীর গুপ্ত-শরৎ২০২০

দেশ ও মানুষ সব পর্ব একত্রে

আবীর গুপ্ত

আমি ভার্টিব্রেট প্যালিওনটোলজিস্ট, মেরুদণ্ডী প্রাণীর জীবাশ্ম অর্থাৎ ফসিল অনুসন্ধান ও তাই নিয়ে গবেষণা করাই আমার কাজ। সরকারি চাকরি করি। চাকরি সূত্রে অনুসন্ধান করছিলাম এক আশ্চর্য প্রাণীর যার নাম সাইনোডন্ট। সকলেই জানে যে সরীসৃপ থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবির্ভাব ঘটেছে। সাইনোডন্ট হল এই দুই গ্রুপের সংযোগকারী প্রাণী। অর্থাৎ এদেরকে মিসিং লিঙ্ক প্রাণী বলা যেতে পারে। এদের মধ্যে সরীসৃপের গুণাবলী যেমন আছে, তেমনই স্তন্যপায়ীদের গুণাবলীও আছে। এদের খোঁজেই অনুসন্ধান চালাচ্ছিলাম পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও বর্ধমান জেলার কিছু কিছু অংশে প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশ কোটি বছর আগেকার পাথরে।

অনুসন্ধান চলছিল পুরুলিয়ার দুমদুমি গ্রামের কাছে বাসপেটালি নালা অঞ্চলে। ক্লান্ত শ্রান্ত অবস্থায় একটা গাছের ছায়ায় পাথরের ওপর বসে আটার রুটি আর তরকারি দিয়ে দুপুরের লাঞ্চ সারছি। পায়ের অনেকটা নিচ দিয়ে নালার জল তিরতির করে বয়ে চলেছে। আমার সঙ্গের তিনজন লেবার ফসিল অনুসন্ধানের কাজে বেশ দক্ষতা অর্জন করেছে, আমার সঙ্গে বহুবছর কাজও করছে। ওদের একজনের চোখ বাজপাখির মতন। বাকি দু’জন খাচ্ছে, কিন্তু ও ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ একটা বড়ো বোল্ডার নিয়ে এসে বলল, “স্যার, এতে ফসিল লেগে আছে।”

বড়ো বোল্ডারের গায়ে এক সেন্টিমিটার মাপের ফসিলের একটু অংশ উঁচু হয়ে বেরিয়ে আছে। যদি হাড়ের টুকরো হয় তাহলে নিয়ে গিয়ে কোনও লাভ নেই, সনাক্ত করা যাবে না। কিন্তু যদি ওটা ছোট্ট টুকরো না বড়ো ফসিলের অংশ হয়? একটু ইতস্তত করে স্যাম্পল ব্যাগে ঢুকিয়ে সেটার কথা ভুলেই গেলাম।

এর দু’দিন পরের কথা। তেঁতুলরাখা নালার কাছাকাছি এক অঞ্চলে জিপ নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছি। এক জায়গায় একটা ফুট দশেক চওড়া সরু নালার দু’পাশের পাথর দেখছি, এমন সময় খেয়াল করলাম, জনা চল্লিশেক গ্রামবাসীদের দ্বারা ঘেরাও হয়ে গেছি। মহিলাদের হাতে হাতা, খুন্তি, দা, কাস্তে—যে যা পারে নিয়ে এসেছে। পুরুষদের হাতে লাঠি থেকে লোহার রড, এমনকি দুয়েকজনের হাতে বল্লমও চোখে পড়ল। সময়টা ২০০৪ কি ২০০৫ সাল। সঙ্গের লেবার ছেলে তিনটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেকটা দাদা-ভাইয়ের মতন। ওরা লোকাল ছেলে হলেও কথা বলতে গিয়ে চড় থাপ্পড় খেয়ে গেল। এরপর গ্রামবাসীদের তেড়ে আসার কারণ বোঝা গেল। এই ছোট্ট নালার ওপর ছোট্ট একটা বাঁধ তৈরির জন্য বারো লাখ টাকা পাঁচ বছর আগে রাজ্য সরকার স্যাংশন করা সত্ত্বেও কোনও কাজ হয়নি। একথা কতটা সত্য তা জানি না। আমাদের সঙ্গে সরকারি গাড়ি দেখে পি.ডব্লিও.ডির লোক ভেবেছ। তাই ঠ্যাঙাতে এসেছে। মনে মনে হিসাব কষে দেখলাম, এই ছোট্ট বাঁধ তৈরি করতে খুব বেশি হলে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকার ধাক্কা। সেখানে বারো লাখ! তাও কাজ হয়নি! আমরা কী করতে এসেছি বোঝানোর পর ওদের জরুরি মিটিং বসল। আমি তখন টেনশনে ঘন ঘন সিগারেট খাচ্ছি। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক উত্তপ্ত ডিসকাশনের পর ডিসিশন হল কাজ করতে পারব, তবে ওদের হয়ে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাজে দরবার করতে হবে।

বহু অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা। কখনও সেসব মনে করে আতঙ্কে শিউরে উঠেছি, কখনও হেসেছি, কখনও নিজের মনে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছি। আমাদের ফিল্ডে গিয়ে প্রথম কাজ হল ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে আর লোকাল পুলিশ স্টেশনে ইনফর্ম করা যে ফিল্ড করতে যাচ্ছি। পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরতে হয়, যেকোনও সময় ওদের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। তাই পুরুলিয়ার নেতুরিয়া থানায় গেছি চিঠি দিতে। বড়বাবুর সঙ্গে দেখা করলাম। উনি শুনেই ধমকাতে শুরু করলেন। সে সময়ে একটি অতি বামপন্থী সংগঠন সেইসব অঞ্চলে অতিমাত্রায় সক্রিয় ছিল। জঙ্গলে পাহাড়ে ঘুরতে হবে, যদি ওরা অ্যাটাক করে, আমাকে বন্দি করে? আমার সিকিউরিটির দায়িত্ব নিতে ওঁরা পারবেন না, সেকথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন। সবিনয়ে জানালাম, সরকারি কর্মী, তাই আমরা প্রায় ভিখিরি, আমাকে বন্দি করে ওরা কিছু আদায় করতে পারবে না। উলটে অফিস মনে মনে হয়তো ভাববে, একটা আপদ বিদায় হল।

আমি যাবই শুনে মেজো বাবু, যিনি চুপচাপ আমাদের কথা শুনছিলেন, বললেন, “দেখুন, আমরা ওইসব অঞ্চলে যখন দায়ে পড়ে যাই তখন জিপের ‘পুলিশ’ লেখা বোর্ডটা খুলে রেখে যাই। বোর্ডটা দেখলে অ্যাটাক করতে পারে। আপনাকে যদি যেতেই হয়, জিপ থেকে ‘ভারত সরকার’ বোর্ডটা খুলে রেখে যাবেন।”

সবিনয়ে জানালাম, “ওটা জিপের গায়ে লেখা রয়েছে। আলগা কোনও বোর্ড নেই, তাই খোলা যাবে না।”

শুনে খিঁচিয়ে বললেন, “তাহলে রং করে নিন।”

ওঁকে বোঝাই কী করে, জিপে রং দিয়ে লেখা মুছলে অফিস আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। যাই হোক, সেদিন থানা থেকে হাসতে হাসতে বেরোলেও কিছুদিন বাদে আতঙ্কে শিউরে উঠতে হয়েছিল। ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল।

আমার চেহারাটা বোধহয় পুলিশের টিকটিকি বা খোঁচরের মতন। তাছাড়া সবসময় সঙ্গে থাকত শক্তিশালী বাইনোকুলার আর ৫০০ মিমি টেলিক্টো লেন্স সহ এস.এল.আর ক্যামেরা। আমি ব্যাচেলার অর্নিথোলজিস্ট। তাই পাখি দেখা ও চেনার জন্য বাইনোকুলার। সে সময় একটা পাখির ওপর বই লিখছিলাম। উদ্দেশ্য, এমন একটা বই বার করব যাতে সমস্ত পাখির ছবি থাকবে আমার তোলা, যে কারণে টেলিক্টো লেন্স সহ আমার ক্যামেরা। ২০০২ সালে যে পাখির বইয়ের কাজ শুরু করেছিলাম তা প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬ সালে কলকাতা বইমেলায়। নাম ‘পাখির জগত’।

সে সময় উঠেছিলাম পাঞ্চেত নাহারের কাছে লক্ষ্মণপুর ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের গেস্ট হাউসে। সঙ্গে আমার ডিরেক্টর বসও ছিলেন। আমাদের দেওয়া হয়েছিল অতি সাধারণ এসি রুম, অথচ ভি.আই.পি গেস্ট হাউস ফাঁকা। আমার ক্ষেত্রে রুম ঠিক থাকলেও ডিরেক্টর অত্যন্ত উচ্চপদস্থ অফিসার, তাঁর ভি.আই.পি গেস্ট হাউসে থাকা উচিত। একথা কর্তৃপক্ষকে জানাতে তাঁরা জানালেন, ‘ওই গেস্ট হাউসে চিফ মিনিস্টার এসে থেকে গেছেন। সেখানে আপনাদের বুকিং দেওয়া হবে ভাবলেন কী করে? তাছাড়া মিস্টার অমুক এসে কয়েকদিন থাকবেন।’ অমুকটা কে পরে জেনেছিলাম। উনি ওই অঞ্চলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ঠিকাদার এবং পার্টির লোকাল কমিটির সেক্রেটারি। আমরা থাকাকালীনই তিনি এসে ভি.আই.পি গেস্ট হাউস আলোকিত করেছিলেন।

যাই হোক, প্রসঙ্গে আসা যাক। সকাল থেকে গেস্ট হাউসের পিছনদিকে প্রায় দুই কিমি দূরে রিজার্ভারের পাশে আমাদের এলাহি কাণ্ডকারখানা চলছে। জনা ছয়েক লেবার পাথর জলে ভিজিয়ে নরম করে তা ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে আলাদা করে শুকিয়ে আমাদের দিচ্ছে। আমরা চেয়ার-টেবিল পেতে বসে মাইক্রোস্কোপে ওইসব স্যাম্পল খুঁটিয়ে দেখছি ওতে কোনও ফসিল আছে কি না। মাঝেমধ্যে আমি রণে ভঙ্গ দিয়ে পাখির খোঁজে ক্যামেরা নিয়ে এদিক ওদিক হানা দিচ্ছি। এমন সময় বাইকে চেপে ছ’জন মাঝবয়সী বড়ো দাড়িগোঁফওলা ভদ্রলোক, ওঁদের মধ্যে একজন আদিবাসী, এখানে এলেন। একজনের গলায় ঝুলছে নিকন ডি.এস.এল.আর ক্যামেরা উইথ জুম লেন্স। ওঁরাও নাকি পাখির খোঁজে ঘুরছেন। নিজেরাই এসে আলাপ করলেন। একটা বাঁশপাতি আর একটা বড়ো পানকৌড়ির ছবি তুলে আমায় দেখিয়ে পাখি দুটোর বৈজ্ঞানিক নাম বললেন। লোকে পাখির ছবি তুললে তার বাংলা নাম অথবা ইংরেজি নাম বলবে। একেবারে বৈজ্ঞানিক নাম! সন্দেহ হল। হাবেভাবে প্রকাশ না করে বরং উলটো আচরণ করলাম। ততক্ষণে আমরা কে কী করি তা ওঁরা জেনে নিয়েছেন। আমার সঙ্গে আমারই লেখা একটি রহস্য উপন্যাসের বই ছিল যেটির আমি ইংরেজি অনুবাদের চেষ্টা করছিলাম। সেটি ওঁদের দান করলাম। প্রায় ঘণ্টা খানেক কাটিয়ে আমাদের নামঠিকানা, ফোন নম্বর নিয়ে, নিজেদের ফোন নম্বর দিয়ে চলে গেলেন। আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল, এখন ওঁদের কারোরই মুখ বা নাম মনে নেই। শুধু ঘটনাটি মনে আছে।

রাতে গেস্ট হাউসে ফিরে চিন্তায় পড়লাম। ওঁরা কি আমার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য এসেছিলেন? আমার সঙ্গে ওঁদের হওয়া কথাবার্তা মনে করার চেষ্টা করলাম। আমি পাশ করেছি, নাকি ফেল করেছি? চিন্তায় কাতর হয়ে ওঁদের স্বরূপ বোঝার জন্য রাতে দুটো ফোন নম্বরেই ফোন করলাম। ওই ফোন নম্বরের নাকি কোনও অস্তিত্বই নেই! অর্থাৎ ওঁরা আমাকে ফলস ফোন নম্বর দিয়েছেন। আতঙ্কে, চিন্তায় দু’রাত ঘুমাতে পারিনি। প্রতিমুহূর্তে ভয়, যেকোনও সময় আমি বিপদে পড়তে পারি। ভাবলাম কলকাতা ফিরে যাই। কিন্তু তাহলে অফিসকে কী জানাব? আমাকে তো শো-কজ করবে।

এরকম রাতে ভয়ে না ঘুমাতে পারার অভিজ্ঞতা পরের বছরে আবার হল। এবারে অন্যরকম। ফিল্ডে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে যাওয়া যায়, এটার অনুমতি আছে। স্ত্রী-পুত্রদের নিয়ে ওই গেস্ট হাউসেই উঠেছি। পাঞ্চেত পাহাড়ের আশেপাশে গভীর জঙ্গল। জঙ্গলে প্রচুর হায়নার বাস। দু’রাত আমার গিন্নি হায়নার ডাকের শব্দে ভয়ে ঘুমাতে পারেননি। পরের বছর অবশ্য গিয়ে হায়নার ডাক শুনিনি। শুনলাম আশেপাশের গ্রামবাসীরা নাকি সব হায়নাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।

তালকুরি গ্রামের আশেপাশে অনুসন্ধান চালাচ্ছি। আমার বস সঙ্গে আছেন। তিনি অত্যন্ত ভালো ভার্টিব্রেট প্যালিওনটোলহিস্ট। খুঁজতে খুঁজতে রেড ক্লে বেড থেকে একটা বড়ো ফসিল এনে আমায় দিয়ে জানালেন ওটি সম্ভবত কোনও সরীসৃপের মাথার খুলি। সঙ্গে সঙ্গে নাম্বারিং করে তুলো দিয়ে মুড়ে স্যাম্পল ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। এর দু’দিন বাদে উনি কলকাতা চলে এলেও আমি কন্টিনিউ করলাম। ফসিলের খোঁজে গেলাম জামুরিয়া গ্রামের দিকে। দামোদরের তীরে নাকি অনেক অবৈধ কয়লার খাদান আছে। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় দেখলাম বহু লোক সাইকেলে করে কয়লা পাচার করছে। সরকারি জিপ দেখে পুলিশ ভেবে সাইকেল ফেলে পালাচ্ছিল। ওই অঞ্চলে কোল মাফিয়ারা অত্যন্ত সক্রিয়, এ তথ্য পরে জেনেছিলাম, তখন জানতাম না। নদীর ধারে ফিল্ড ওয়ার্ক করছি। বহুদূরে গোটা তিনেক ট্রাক দাঁড়িয়ে। আমি সরল সোজা মানুষ, এসব খেয়াল করিনি। নিজের জগতেই আচ্ছন্ন ছিলাম। তিনজন মানুষ কথা বলতে বলতে আমাদের কাছে এলেন। আমরা তখন লাঞ্চ শেষ করে কাঠকুটো জ্বালিয়ে চা তৈরি করছি। ওঁরা এলেন, আমাদের সঙ্গে গল্প-টল্প করে জিপটাকে ভালো করে দেখে চলে গেলেন। ওঁরা যাবার পর ট্রাকগুলোও রওনা দিল।

দ্বিতীয় দিনে আবার এলেন। এবারেও চা খাওয়ানো হল। আমাদের জলের জারিক্যান দেখে জানালেন ওঁদের ওখানে কুয়ো থেকে জল নেওয়ার জন্য। ওঁদের বোধহয় আমাকে পছন্দ হয়েছিল। কারণ, বারবার করে জানালেন যেকোনও দরকারে ওঁদেরকে বলতে। শুধু যাবার সময় আমাকে আড়ালে ডেকে বলে গেলেন, যখন জিপ নিয়ে আসব তখন হর্ন বাজাতে বাজাতে আসতে। তা না হলে যেকোনও রকমের বিপদ ঘটে যেতে পারে। কারণ, পুলিশ নাকি জিপ নিয়ে নিঃশব্দে আসে। একথা শোনার পর পুলিশের ঠ্যাঙানির ভয়ে আর ও-মুখো হইনি। ফসিলও পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই শুধু শুধু গিয়ে তো লাভ নেই।

ওইবারই বাসপেটালি নালায় দুমদুমি গ্রাম দিয়ে না ঢুকে অন্যদিক দিক দিয়ে ঢুকছিলাম। এদিকে আগে কখনও প্রতিবন্ধকতা ছিল না তখন। একটা স্পঞ্জ আয়রনের ফ্যাক্টরি হয়ে সর্বনাশ হয়ে গেছে। এত এনভিরনমেন্টাল পলিউশন, কল্পনা করা যায় না। গাছপালার পাতা কালো হয়ে গেছে, জমিতে কার্বন পড়ে পড়ে জমির উর্বরতা হারিয়েছে। পাথরের ওপর কালো আস্তরণ পড়ে যাওয়ায় ফসিল খোঁজা দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। তাই মেজাজ খারাপ। ড্রাইভারকে ফ্যাক্টরির পাশ দিয়ে ক্ষেতের মধ্য দিয়েই যেতে বললাম। একজন বয়স্ক আদিবাসী মানুষ চিৎকার করতে করতে দৌড়ে এলেন। যখন বাদানুবাদ চলছে তখন ওঁর স্ত্রীও ওখানে চলে এলেন। ওঁর ভাষা সবটা বুঝতে পারছিলাম না। লেবার তিনজনের সাহায্যে ওঁর যা কথা শুনলাম, শুনে চোখের জল সামলাতে পারিনি। ভদ্রলোকের বেশ কয়েক বিঘে জমি ছিল। তাতে ছিল ফলের বাগান। ফল বিক্রি করে স্বছন্দে ওঁদের চলে যেত। একদিন ওঁর কাছে প্রস্তাব এল জমি বিক্রির। স্পঞ্জ আয়রন ফ্যাক্টরি হবে, তার জন্য জমি দরকার। লাখ লাখ টাকা দেওয়া হবে শুনে লোভে মাথা ঘুরে গেল। পুলিশ এবং পার্টি নেতাদের উপস্থিতিতে কীসে টিপ ছাপ দিচ্ছেন তা না জেনেই টিপ ছাপ দিলেন। স্পঞ্জ আয়রন ফ্যাক্টরি তৈরি হল। কিন্তু তিনি একটা টাকাও পেলেন না। যে এক বিঘে চাষের জমি বাঁচাতে পেরেছিলেন, তাই দিয়েই কোনোক্রমে ওঁদের দিন কাটছে।

এ ঘটনা সত্যি কি মিথ্যা জানি না, সব ওঁর মুখ থেকে শোনা। এর প্রতিকারও আমার জানা নেই। প্রতিবাদ করলাম। সে সময় একটা বই ‘সন্ত্রাস ডট কম’ প্রকাশ হওয়ার মুখে ছিল। এই ঘটনা তাতে জুড়ে দিলাম। বইয়ের কপি প্রতিকারের আশায় যথাস্থানে পাঠালাম। কিন্তু তাতেও মানুষটি প্রতিকার পেল না। পরে পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের পর মানুষটি প্রতিকার পেয়েছিল কি না তা যেমন জানা নেই, তেমনই দুষ্কৃতিকারীরা শাস্তি পেয়েছিল নাকি ভোল বদলে স্বমহিমায় রাজত্ব করছে তাও জানা নেই।

ফিল্ড ওয়ার্কের পাশাপাশি কলকাতার ল্যাবে চলছিল পাথর থেকে ফসিল উদ্ধারের কাজ। তালকুরি গ্রামের কাছে পাওয়া লিস্ট্রোসরাস নামক সরীসৃপের মাথার খুলিটাকে সহজেই রেড ক্লে থেকে ছাড়ানো গেল, কিন্তু তাতেও লেগেছিল প্রায় মাস খানেক সময়। পেয়েছিলাম প্রচুর মাছের আঁশের জীবাশ্ম। একটা বড়ো হাঙরের দাঁতও পাওয়া গেল। সে সময় ওই অঞ্চলে সমুদ্র ছিল না। অর্থাৎ এই হাঙরটি মিষ্টি জলের হাঙর ছিল। এর বিচরণ ক্ষেত্র ছিল নদী এবং হ্রদ। দাঁত থেকে আয়তন মেপে দেখা গেল, হাঙরটি প্রায় এক মিটারের মতো লম্বা ছিল।

বাসপেটালি নালা থেকে যে বোল্ডারটি পাওয়া গিয়েছিল যাতে এক সেন্টিমিটারের মতো ফসিলের অংশ বেরিয়েছিল সেটি প্রসেস করতে গিয়ে চমকে উঠলাম। ওটি একটি লিট্রোসরাসের মাথার খুলির জীবাশ্ম। মাথার খুলির জীবাশ্মটিকে শক্ত বেলেপাথর থেকে ছাড়িয়ে উদ্ধার করতে প্রায় মাস ছয়েক লেগে গেল। এরপর শুরু গবেষণা। দেখা গেল তালকুরির জীবাশ্মটি হল লিট্রোসরাস ডেক্লিভিস। এই দুটি জীবাশ্ম দক্ষিণ আফ্রিকাতে পাওয়া গেলেও ভারতে প্রথম পাওয়া গেল। এর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি প্রমাণ করে, অতীতে ভারত আফ্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

মাছের সমস্ত ফসিল এবং লিট্রোসরাসের দুটি জীবাশ্ম ছবি সহ বিভিন্ন সময়ে আমাদের অফিসের নিজস্ব ‘নিউজ’ পত্রিকায় বেরিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীদের জানানোর জন্য বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ বার করা দরকার। দুটি রিসার্চ পেপার তৈরি করা হল—একটি মাছেদের নিয়ে, আর অন্যটি লিট্রোসরাস নিয়ে। দুটিই গুরুত্বপূর্ণ পেপার। তাই প্রথমে পাঠানো হল বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘গন্ডোয়ানা রিসার্চ’ জার্নালে। পেপার দুটি ওঁরা ফেরত পাঠালেন এই যুক্তিতে যে ও-দুটোর কোনও গ্লোবাল সিগনিফিকেশনস নেই। আসল কারণটি হল, অতীতে একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী ফসিল চুরি করে নেপাল থেকে পাওয়া গেছে বলে রিসার্চ পেপার পাবলিশ করেন, পরে ধরাও পড়েন। তারপর থেকে ওঁরা ভারতীয়দের পেপার চট করে প্রকাশ করতে চান না। তবে সঙ্গে একজন সাদা চামড়া থাকলে কোনও অসুবিধা হয় না। আমার বস ওঁর পরিচিত একজন বিদেশি বিজ্ঞানীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন। কিন্তু মন সায় দিচ্ছিল না। একজন কোনও কাজ না করে আমাদের কাজের ভাগীদার হবেন! ভার্টিব্রেটের বিখ্যাত এক জার্নালে অনলাইনে পেপার দুটি পাঠাতে গিয়ে জানলাম, তাঁদের মেম্বার না হলে তাঁরা গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন না। বাধ্য হয়ে ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে গবেষণাপত্র দুটি অফিসের জার্নাল ‘ইন্ডিয়ান মিনারেলস’-এ প্রকাশ করলাম।

‘রিসার্চ গেট’ বলে বিদেশি একটি সংস্থা পৃথিবীর সমস্ত বিজ্ঞানীদের একটি প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করছে। ২০১১ সালে আমার নাম সার্চ করছিলাম কী কী বই অনলাইন স্টোরে বিক্রি হচ্ছে তা দেখার জন্য। চমকে গেলাম আমার নামে ‘রিসার্চ গেট’-এ প্রোফাইল দেখে। আমার সম্বন্ধে সমস্ত তথ্য পেল কোথা থেকে! অনেকগুলো রিসার্চ পেপার তাতে দেওয়া আছে। যে কেউ সেখান থেকে সেগুলো ডাউনলোড করতে পারে। এই রিসার্চ গেটের দৌলতে আমার গবেষণা পৌঁছে গেল পৃথিবীর নানান প্রান্তে গবেষণারত বিজ্ঞানীদের কাছে। কথায় আছে না, ‘রাখে হরি মারে কে!’ এখানে তাই হল। ইন্ডিয়ান মিনারেলস-এ প্রকাশ করেও আমার গবেষণা পৌঁছে গেল বিশ্বের দরবারে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s