দেশ ও মানুষ

অটো চন্দ্রনের কাহিনী

উমা ভট্টাচার্য

desh5501 (Medium)

‘অটো চন্দ্রন’ নামটা শুনেই একটু অদ্ভুত লাগছে না? ঠিক। আমারও লেগেছিল। এ আবার কেমন নাম? না, ভালো নাম তাঁর একটা আছে। সেটা হল এম চন্দ্রকুমার। তিনি এক নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের বাড়ি থেকে পালানো ছেলে। স্কুলে দশম শ্রেণীর বেড়া টপকাতে না পেরে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেও আজ তিনি একজন নামকরা ঔপন্যাসিক। তাঁর লেখা বইটির গল্প নিয়ে তামিল সিনেমা হয়েছে আর সেই সিনেমা ২০১৫ সালের ৭২তম আন্তর্জাতিক ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছে। গত মাসে তিনিও সামিল হয়েছিলেন ভেনিসে, সেই উৎসবের পুরস্কার  বিতরণ অনুষ্ঠানে।

তামিলনাডুর কোয়েম্বাটোরে এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম এম চন্দ্রকুমারের। সালটা ছিল ১৯৬২। ছেলেবেলা থেকেই লেখাপড়ায় খুব একটা মনোযোগ ছিল না। তাঁদের একটি ছোট খামার ছিল,অর্থাভাবে বাবাকে সেটা বিক্রি করে দিতে হয়। এই পারিবারিক অবস্থায় ছেলে দশম শ্রেণীর পরীক্ষায় পাশ করতে পারল না। যথারীতি মা বাবার বকাঝকা। অভিমানী চন্দ্রন আগুপিছু না ভেবে কপর্দকহীন অবস্থায় বাড়ি ছাড়লেন। উদ্দেশ্যহীন ভবঘুরের জীবন শুরু হল। পায়ে হেঁটে,কখনো বিনাটিকিটে ট্রেনে চড়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন,চেন্নাই,মাদুরাই,তুতিকোরিন প্রভৃতি নানা জায়গায়।

খাবার জোটাতে নানা কাজ করেছেন তখন। কখনো কোন দোকানে,কখনো কারও বাড়িতে। এক জায়গায় বেশিদিন থাকতে পারতেন না। রাতে শোবার জায়গা হত কারো বাড়ির বাইরের দিকের বারান্দা, ফুটপাথের ধার, বা বাসস্টপের প্রতীক্ষালয়ে যাত্রীদের বসার সিটগুলিতে।

একবার রওনা দিলেন হায়দ্রাবাদের দিকে। ট্রেনে উঠে পড়লেন। দুঃখ আর হতাশাময় ভবঘুরে জীবনে সেদিন প্রথম আনন্দ পেলেন। ট্রেন চলতে চলতে এসে দাঁড়াল বিজয়ওয়াড়া স্টেশনে। হঠাৎ নীচে তাকিয়ে দেখেন এক বিশাল নদী, তাঁর দেখা কৃষ্ণা নদীর মত উচ্ছ্বসিত জলরাশি নিয়ে কলকল্লোলে বয়ে চলেছে। সূর্যের আলো পড়ে ঢেউয়ের মাথায় মাথায় জ্বলছে হাজার হাজার হিরে। সামলাতে পারলেন না নিজেকে। এক লাফ দিয়ে ট্রেন থেকে নেমেই ঝাঁপ দিলেন নদীতে। ছোটোবেলার মত আনন্দে সাঁতার কাটতে কাটতে চলে এলেন অনেক দূরে। জায়গাটা অন্ধ্রের গুন্টুর। অনেক চেষ্টা করে সেখানে এক গাঁয়ের দিকে একটা ছোটো হোটেলে কাজ মিলে গেল। তাঁর বয়সী আরও কিছু ছেলে সেখানে কাজ করত।

বেশ ভালই চলল কিছুদিন। তারপর হঠাৎ বিপর্যয় নেমে এল জীবনে। শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরের গাঁয়ে পুলিশ হানা দিল এক অপরাধীর খোঁজে। চন্দ্রন সেই গাঁয়ে নতুন ছেলে। বাড়ির কোন ঠিকানা নেই। কয়েকজন সন্দেহভাজনের সঙ্গে তাঁকেও সন্দেহবশত ধরে নিয়ে গেল পুলিশ। বয়স তখন তাঁর কুড়ি। শুরু হল লক-আপে এক বীভৎস জীবন। পুলিশের অত্যাচার কী নৃসংশ আর অমানবিক হতে পারে তা নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করলেন ১৫ দিনের লক-আপ বাসে। বুঝলেন বিনা অপরাধেও মানুষের জীবনে এই অবিচারের খাঁড়া নেমে আসতে পারে।

বাড়ি থেকে পালানোর পর অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে কাটানো কয়েকটা বছরে জীবনের কাছে শিখেছিলেন অনেক কিছু। সাহসী আর ব্যতিক্রমী চরিত্রের যুবক জীবনকে দেখতে শুরু করলেন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। ভাবতে শুরু করলেন সাধারণ মানুষদের কথা। যাদের অর্থবল নেই,ক্ষমতা নেই,সমাজে বিশেষ পরিচিতি নেই,যারা খেটে খাওয়া নিম্নবর্গের মানুষ, তারা সবাই এক দলে। তাদের একটাই পরিচয়-তারা সর্বহারা। শুধু নামেই মানুষ এরা,অন্যথায় এদের জীবন পশুরই তুল্য। এ বিশ্বাস তাঁর দৃঢ় হয়েছিল পাঁচমাসের কারাবাসের দিনগুলিতে। মার্চ মাসের দুঃসহ গরমের মধ্যে ১০x১০ মাপের  খুপরির মত লকআপের ঘরে বেশ কয়েকজন অপরাধী বলে চিহ্নিত মানুষের সঙ্গে থাকতেন তিনিও। সেই স্বল্প পরিসরে কষ্টকর পরিবেশে অপরাধের সূত্রসন্ধানে প্রতিদিন পুলিশ যে শারীরিক নির্যাতন চালাত সে কথা ভাষায় বর্ণনা করা যায়না। ভাবলেন সব দেশেই কি পুলিশ লক-আপে একই ব্যাপার ঘটে,যা বাইরের মানুষ জানতেও পারে না? বুঝলেন কেন কিছু মানুষ নাচার হয়ে দাগী আসামীতে পরিণত হয়ে যায়।

এরপর শুরু হ’ল ৫ মাসের জেল জীবন। এখনও ওই লক-আপের দিনগুলি এক দুঃস্বপ্নের মত বেঁচে আছে তাঁর জীবনে,তাড়া করে বেড়ায় তাঁকে। সেই রক্তঝরা দিনগুলিতে ভোগ করা তিক্ত আর করুণ অভিজ্ঞতার ফসল হল তাঁর কলমে উঠে আসা “লক-আপ”-নামে ১৬০ পাতার মর্মস্পর্শী উপন্যাস। জেলজীবনে শুনলেন কত নিরপরাধ মানুষের জেল হওয়ার কথা। কেউ বা খেতে না পাওয়া মানুষ,লোভে পড়ে পাশের বাড়ির মুরগীটিকে(যেটি তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল)কেটে একদিন মাংসভাত খেয়েছিল পেটপুরে। কেউ বা ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাগের মাথায় স্ত্রীকে মেরে ফেলেছে,আর এখন অনুতাপে দগ্ধ হচ্ছে। আবার এক ভবঘুরে বন্দী সারাদিন গুনগুন করে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তানালাপ করে যেত আপনমনে। সে নাকি এক নামকরা নকশাল নেতা। আবার একজন আদিবাসী বন্দী ছিল যে নাকি পরিবারের মুখে আহার তুলে দেবার কোনও উপায় না পেয়ে ওয়াগন ভেঙে খাদ্যশস্য চুরি করেছিল। এদের সঙ্গেই কাটিয়েছিলেন ৫ মাস।

জেলে থাকতে থাকতেই তাঁর জীবনদর্শন পালটে গেল। চিন্তাধারার গতিপথ বদলে  গেল। ভাবতে শুরু করলেন সমাজের সম্বলহীন এইসব মানুষদের কথা।

একদিন যখন পুলিশ জানল তাঁকে ভুলবশত আটক করা হয়েছিল তখন তাঁকে ছেড়ে দিল। ঠিক করলেন সমাজের কাছে তুলে ধরতে হবে ‘ইহাদের কথা’, সমাজের বঞ্চনা আর অত্যাচারের শিকার এইসব মানুষের কথা,লক-আপে পশুর মত জীবন কাটানোর কথা আর পুলিশি নির্যাতনের নৃসংশতার কথা। ফিরে এলেন কোয়েম্বাটোরের বাড়িতে।

বাড়ি ফিরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে শুরু করলেন। জীবিকার জন্য অটো-রিকশা চালাতে শুরু করলেন। আর শুরু করলেন  দিনলিপি লেখা আর ফেলে আসা দিনগুলির টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতার কথা লেখা। এইসময় নানা পত্রপত্রিকা পড়ে জানলেন পৃথিবীর সব দেশেই পুলিশি নির্যাতনের চিত্র একই। ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকার সময়ে বা যাত্রীর অপেক্ষায় বসে থাকার সময়ই তিনি একটি খাতায় লিখতে লাগলেন নানা অভিজ্ঞতার বিবরণ। এক অটোচালক বন্ধুর পরামর্শে হাজত আর জেলবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০০৬ সালে লিখে ফেললেন মানুষের স্বাধিকারের অপমৃত্যুর দলিল ‘লক-আপ’। আর সেই উপন্যাসের তামিল চলচ্চিত্র রূপ “ভিশরনাই”,ভেনিসে চলচ্চিত্র উৎসবে পেল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ‘অ্যামেনেস্টি ইণ্টারন্যাশনাল ইটালিয়া’র পক্ষ থেকে জিতে নিল ‘সিনেমা ফর হিউম্যান রাইটস অ্যাওয়ার্ড’।  

তামিলনাডুর এক বিচারক ভি আর কৃষ্ণআয়ার ছিলেন একটি মানবাধিকার সংগঠনের প্রধান। তাঁর হাত থেকে চন্দ্রকুমারের লেখা বইটি ‘বেস্ট ডকুমেণ্ট অফ হিউম্যান রাইটস’ পুরস্কার জিতে নিয়েছিল ২০০৬ সালেই। এর পর তামিল পরিচালক ভেট্রারামনের হাত ধরে সিনেমা হয়ে যায় ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে।

চন্দ্রকুমার একটি উপন্যাসেই থেমে থাকেননি। সন্ত্রাসের ইতিহাস নিয়ে লেখা নানা প্রবন্ধের সঙ্কলন করে লিখেছেন, ‘বুমিয়াই কোলাইকালাম’। বিখ্যাত জনদরদী কমিউনিস্ট নেতা জীবনানন্দনমকে নিয়ে লিখেছেন, ‘কোভায়াইল জীভা’। প্রান্তিক জনজীবনের খেটে খাওয়া নারীদের নিয়ে লিখেছেন, ‘আজহাগু থোডাট্টুমা’। তাঁর সব লেখাই সমাজের দলিত,নির্যাতিত মানুষের জীবনের ইতিহাস,যা তুলে ধরতে চাইছেন সভ্য সমাজের কাছে। বর্তমানে কাজ করছেন ‘ইরিয়াম পাট্টাথাসারাই’ নামে একটি প্রকল্প নিয়ে। সে বিষয়ে লেখাতে থাকছে তাঁর বাসস্থানের আশেপাশের দলিত মানুষদের প্রতি ঘটতে থাকা অবিচারের খতিয়ান।

এখন তাঁর জীবন এক সুশৃঙ্খল নিয়মানুবর্তিতায় বাঁধা। সকালে উঠে যোগ-ব্যায়াম,হাঁটা,তারপর অটো নিয়ে জীবিকার সন্ধানে বেরোনো,দুপুরে বাড়িতে এসে খাওয়াদাওয়ার পর পত্রপত্রিকা পড়া ও বিশ্রাম। তারপর বিকেল ৩টে থেকে আবার রাত ৮টা পর্যন্ত অটো চালানো। তারপর অন্যান্যদের সঙ্গে নানা অসুবিধা,সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা,কারও সমস্যা থাকলে তার সমাধানের চেষ্টা, কর্মীসংঠনের কাজকর্ম দেখা। তারপর বাড়ি ফিরে খাওয়ার পর আবার লেখালেখি। তারপর বেশ রাতে ঘু্মোতে যাওয়া। বেশি রাতে ঘুমোতে গেলেও ঘুম ভাঙতে কোনোদিন দেরি হয়না। এইভাবেই চলে চন্দ্রকুমারের এক একটি দিন।    

বিচিত্র দেশ আমাদের ভারতের এক বিচিত্র,ব্যতিক্রমী মানুষ চন্দ্রকুমার। জীবনের প্রতিকুলতার  কাছে হার না মানা এমন মানুষ,যিনি জীবনকে দেখেন সুন্দর,নিজেকে করে তুলতে পারেন আদর্শস্থানীয়,চেষ্টা করেন নিজের আশেপাশের মানুষদের জীবনকেও সুন্দর,আশাব্যঞ্জক করে তুলতে।