ধারাবাহিক অভিযান অন্নপূর্ণা মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক শরৎ ২০১৬

অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ—সব পর্ব একত্রে

khelaannapurna01 (Medium)

পরদিন ১৯শে মে ভোরের আলো ফোটার আগেই উঠে পড়লাম। উত্তর-পশ্চিম উপগিরিশিরার পায়ের কাছে আমাদের বেস ক্যাম্পের চারপাশে তখনও ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। শেরপারা খুব অবাক। অন্যান্য অভিযানে কখনও সূর্য ওঠার আগে রওনা হয়নি ওরা। ঘুমজড়ানো চোখে ওরা জলখাবার তৈরি করল, আর আমরা স্যাক-ট্যাক গুছিয়ে একে একে রওনা দিলাম। প্রথমে বেরোল রেবুফত, টেরে আর শ্যাজ; নুড়িপাথরে ঢাকা বিস্তীর্ণ মোরেন অঞ্চলে নিমেষে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল। আমিও একটু পরেই বেরোলাম, ঘুমে আধবোজা চোখে অন্ধকার রাস্তার প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না, নুড়িপাথরে হোঁচট খেতে খেতে কোনওরকমে এগিয়ে চললাম। গিরিশিরার নিচে পৌঁছে পাথরে আইস অ্যাক্সের ঠোকাঠুকির টুংটাং আওয়াজ শুনে বুঝলাম, খুব একটা পিছিয়ে নেই আমি।

আমাদের সবারই পিঠে আজ প্রচুর বোঝা; মোট তিনটে তাঁবু, পাহাড় চড়ার সমস্ত সাজসরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি আর বেশ কয়েকদিনের খাবারদাবার। শেরপারা বোঝা নিয়ে যতদূর সম্ভব ওপরে উঠবে, তারপর বোঝা নামিয়ে যত দ্রুত সম্ভব বেস ক্যাম্পে ফিরে আসবে, যাতে বয়ে নিয়ে চলা রসদ ওদের জন্য খরচ না হয়। তুষার অঞ্চলে যখন পৌঁছলাম তখন দিনের আলো ফুটেছে। বরফ তখনও শক্ত। বোঝার ভারে ন্যুব্জ হয়ে ধীরে কিন্তু না থেমে ওপরে উঠে চলেছিলাম আমরা।

এ যাত্রা আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করে আছে কে জানে! তুকুচা ছাড়ার পরে একবারের জন্যও নীল আকাশের দেখা পেয়েছি কিনা সন্দেহ! শক্ত বরফের খাড়াই ঢালে উঠতে উঠতে ঝুঁকি আছে জেনেও তাই ভোরের ঝকঝকে আবহাওয়ায় চারপাশের দৃশ্য দেখার লোভে বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিলাম। আমাদের দৃষ্টি জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে অন্নপূর্ণা পর্বতপুঞ্জের সেই দানবাকৃতি পর্বতপ্রাচীর। তার গড় উচ্চতা প্রায় ২৩০০০ ফিট। দু’পাশের অপেক্ষাকৃত নিচু শৃঙ্গগুলি একের পর এক উঁচু হয়ে হয়ে মাঝখানে সবচেয়ে উঁচু একটা দৈত্যাকার ও অগম্য শৃঙ্গে মিলিত হয়েছে। কেন্দ্রের সেই শৃঙ্গটার খাড়া দেওয়াল আমাদের বেস ক্যাম্পের ওপরে সটান ১০০০০ ফিট উঠে গেছে; তার গা একেবারে মসৃণ, কোথাও কোনও ফাটল বা খাঁজখোঁজ নেই। শৃঙ্গে ওঠার সম্ভাব্য রাস্তার খোঁজে সদা-উৎসুক অভিজ্ঞ পর্বতারোহীর চোখও সে দেওয়ালের রক্ষণে কোনও দুর্বলতা খুঁজে পাবে না। অন্নপূর্ণা পর্বতপুঞ্জ এক অভাবনীয় সুবিশাল দুর্গ; আমরা সবে তার বাইরের প্রাকারে এসে উপস্থিত হয়েছি।

          তুষারপর্বত পরিবেষ্টিত প্রাণশূন্য আদিম এক চক্রব্যূহে যেন আমরা প্রবেশ করেছি। কখনও এখানে মানুষের পা পড়েনি। কোনও প্রাণী বা উদ্ভিদের পক্ষে এ পরিবেশে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। ভোরের নরম আলোয় সেই প্রাণহীন স্তব্ধতা, প্রকৃতির সেই রিক্ত রুক্ষ্ম রূপ আমাদের মানসিক শক্তি যেন আরও বাড়িয়ে দিল। এরকম দুর্গম জনপ্রাণীশূন্য তুষারাবৃত পার্বত্য অঞ্চলে এলে আমাদের মনে কেন যে এমন উল্লাস হয় তা সাধারণ লোককে বুঝিয়ে বলা খুব শক্ত। তারা তো সব ফুল, পাখি, চাঁদ আর ঝরনার সৌন্দর্য দেখেই ব্যাকুল! প্রকৃতি যেখানে তার অফুরন্ত সম্ভার অকৃপণভাবে উপুড় করে দিয়েছে মানুষ স্বাভাবিক প্রবৃত্তির বশে সেদিকেই ছুটে যায়। সাধ করে কে আর এসব জায়গায় আসে!

          আমরা প্রায় মঁ ব্লা-র সমান উচ্চতায় পৌঁছে গেছি। প্রচন্ড ঠাণ্ডা। দমের বেশ ঘাটতি হচ্ছে, হাঁপাচ্ছে সবাই। যে যার নিজের মতো ধীরে ধীরে ওপরে উঠে চলেছিলাম, যে গতিতে যে স্বচ্ছন্দ। টেরে বর্ণিত সেই চত্বরটায় যখন পৌঁছলাম আমরা, তখন সূর্য উঠে গেছে। একটু আগেই যে বরফঢাকা পাহাড়ের দেওয়ালগুলো অন্ধকার আর ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল, এখন সেগুলো রোদ্দুরে ঝলমল করছে।

          এখান থেকেই আসল আরোহণ শুরু। গতকালের দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি সত্ত্বেও টেরে আজ আমাদের সঙ্গে এসেছে, রাস্তা দেখাবে বলে। স্যাক থেকে দড়িদড়া সব বার করলাম আমরা। গতকাল টেরেরা এখানে চড়াইয়ের শুরুতেই একটা স্থায়ী রোপ লাগিয়ে রেখে গেছে। সেই রোপ ধরে পাথুরে ঢাল বেয়ে আমাদের ওঠা শুরু হল। ঢালটা চূনাপাথরের হলেও বেশ শক্তপোক্ত। নিরাপত্তার জন্য আমরা তিনটে দলে ভাগ হয়ে নিজেদের কোমরে দড়ি বেঁধে নিলাম। একটা দড়িতে বাঁধা রইলাম আমি আর সরকি, রেবুফত রইল আজীবার সঙ্গে, আর তৃতীয় দড়িতে টেরের সঙ্গে বাঁধা রইল শ্যাজ আর আয়লা।

          এই রাস্তায় সত্যিই সটান শৃঙ্গ অবধি ওঠা যাবে কিনা জানতে হলে আমাদের উপগিরিশিরাটার মাথায় পৌঁছতে হবে। তাই ঠিক করলাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এগোব। ঠিক হল, যে মুহূর্তে মনে হবে শেরপাদের স্বচ্ছন্দে এগিয়ে যেতে সমস্যা হচ্ছে, সেখানেই ওরা ওদের পিঠের বোঝা নামিয়ে রেখে নিচে ফিরে যাবে। তারপরে এগোব শুধু আমরা চারজন। আজ যতটা সম্ভব উঁচুতে উঠে আমরা তাঁবু ফেলব। সেই তাঁবুতে আমি আর রেবুফত রাত কাটাব, টেরে আর শ্যাজ নিচের সেই চত্বরটায় নেমে আসবে। সারাদিন বিশ্রাম নিয়ে ক্লান্তি-টান্তি দূর করে আজ সন্ধ্যেবেলা ল্যাচেনাল বেস ক্যাম্প থেকে ওই চত্বরে উঠে আসবে, তাঁবু ফেলে টেরের সঙ্গে রাত কাটাবে। শ্যাজ ওই চত্বরে না থেমে নেমে যাবে সোজা বেস ক্যাম্পে, আগামীকাল কোজিকে নিয়ে ফের চত্বরে উঠে এসে আরেকটা তাঁবু ফেলবে। অর্থাৎ, আমি আর রেবুফত রইলাম একেবারে প্রথমে, দ্বিতীয় দলে টেরে আর ল্যাচেনাল পেছন পেছন উঠবে, আর শ্যাজ এবং কোজি তৈরি করবে তৃতীয় দল।

          পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়টা কিছুক্ষণের মধ্যেই সারা হয়ে গেল; শেরপারা মালপত্র রেখে নেমে গেল নিচে। খাড়াই পাথুরে ঢালটায় ওঠা বেশ শক্ত, ওদের জন্য বরং সময় নষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম, রক ক্লাইম্বিং-এর এত কঠিন রুটে যৎসামান্য অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও ওরা খুব তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা আয়ত্ত করে ফেলেছিল। বিশেষ করে সরকি-কে যা দেখলাম, খুব কঠিন পাথুরে রুটেও ও একটা দলকে রীতিমতো নেতৃত্ব দিতে পারে। শেরপারা ফিরে যাবার পর আমাদের গতি বাড়ল। এখান থেকে উপগিরিশিরার রুটটা তো বেশ আকর্ষণীয়ই মনে হচ্ছে! গিরিশিরার দু’পাশে হিমবাহের ঢাল নেমে গেছে। চারদিকের পর্বতশৃঙ্গগুলি অবশ্য আর দেখা যাচ্ছে না, কেননা বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনের মতো আজও মেঘ নিচে নেমে এসেছে।

          গিরিশিরাটা ধীরে ধীরে সরু আর ধারালো হয়ে এল। আল্পসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। বেশ মজবুত পাথর, আলগা হয়ে খুলে আসার ভয় নেই। পিঠে বিশাল বোঝাটা না থাকলে আর উচ্চতার জন্য হাঁপ না ধরলে রুটটা বেশ উপভোগ করা যেত! হঠাৎ তুষারপাত শুরু হল। আবহাওয়া প্রচন্ড ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আমরা নিশ্চিতভাবে ১৮০০০ ফিটের ওপরে আছি। গিরিশিরা বরাবর ওপরে তাকিয়ে তন্নতন্ন করে তাঁবু ফেলার একটা সুবিধেজনক জায়গা খুঁজছিলাম আমি। এখানে সেখানে দূরে দূরে পাহাড়ের গা থেকে ব্যালকনির মতো বেরিয়ে থাকা কয়েকটা পাথর ছাড়া কোনও জায়গা চোখে পড়ল না। আবহাওয়া খারাপ হয়ে আসছে, খুব দ্রুত কিছু একটা ঠিক করতে হবে। শ্যাজ আর টেরেকে এর মধ্যে আবার ফিরে যেতে হবে সেই চত্বরে! ওদের দেরি হয়ে যাচ্ছে। ব্লেডের মতো ধারালো একটা পাথরের শিরাকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে আমরা তখন ঝুলছিলাম, পা’গুলো পাথরের খাড়া দেওয়ালে ঠেস দেওয়া, নিচে অতল খাদ। এই পাহাড়গুলোর মতো এত খাড়াই ঢাল আল্পসে দেখেছি কিনা মনে করতে পারলাম না। মসৃণ ঢাল থেকে খোঁচার মতো বেরিয়ে থাকা পাথরগুলোর ওপর বরফ জমে আছে। এত খাড়া ঢালে কী করে যে বরফ জমে থাকে কে জানে! এই জন্যই এত ঘন ঘন তুষারধ্বস নামে এখানে!

          গিরিশিরার ওই বিপজ্জনক অংশটা পেরিয়ে একটা ছোট্ট ত্রিভুজাকৃতি বরফাবৃত চাতাল পেলাম আমরা। আবহাওয়া খুবই খারাপ হয়ে গেছে। আর কিচ্ছু না ভেবে ওখানেই আমাদের তাঁবু ফেলব ঠিক করলাম। সঙ্গে সঙ্গে কাজে লেগে পড়লাম সবাই। আইস অ্যাক্স দিয়ে আলগা তুষার সরিয়ে সরিয়ে গিরিশিরার দু’পাশে ফেলছিলাম আমরা, তা থেকে দু’পাশেই ছোটখাটো তুষারধ্বস শুরু হয়ে গেল, বরফে ঢাকা কিছু বোল্ডারও সেই ধ্বসে যোগ দিল। কিন্তু ওভাবে সাফাই করার পরও চাতালটায় স্রেফ কোনওরকমে দু’জনের বসার জায়গা বার করা গেল। আইস অ্যাক্স দিয়ে চাগাড় দিয়ে বরফে গেঁথে থাকা কিছু পাথর উপড়ে ফেলার চেষ্টা করলাম। টেরে আমার আইস অ্যাক্সটা নিয়ে রেগেমেগে একটা পাথরের গায়ে এমন কতক ঘা কষাল যে ভাবলাম পাথরটা এই বোধহয় ফেটে দু’টুকরো হয়ে গেল। হা ভগবান! দেখি আইস অ্যাক্সের ফলাটাই বেঁকে দুমড়ে গেছে! তাও ভাগ্যি, টেরে ফের ফলাটা সোজা করতে পেরেছিল। অনেক কষ্টে একটা তাঁবু ফেলার মতো জায়গা বার করা গেল। টেরে আর শ্যাজ এবার ফেরার রাস্তা ধরল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ওরা আমাদের চোখের আড়াল হয়ে গেল। আমার খুব চিন্তা হচ্ছিল ওদের জন্য, তুষারপাতের মধ্যে এই রাস্তায় নামা যথেষ্ট বিপজ্জনক।

          এবার রেবুফত আর আমি একা। একটু পরিশ্রম করলেই হাঁপ ধরে যাচ্ছিল, সে অবস্থায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁবু খাটানোর তোড়জোড় শুরু করলাম আমরা। একটা বিশাল বড় বোল্ডার চাগাড় দিয়ে তুলে সরিয়ে সাবধানে খাদের ধারে রাখার পর জায়গাটা বেশ বড় হয়ে গেল। পুরো জায়গাটায় আলগা তুষার বিছিয়ে পা দিয়ে দাবিয়ে দাবিয়ে সমতল করার পর টেন্ট খাটানো গেল। তাঁবুর সামনের দড়ি দুটো পাথরের গায়ে গাঁথা দুটো রক পিটনে বাঁধা হল, আর পেছনের দুটো দড়ি আমাদের আইস অ্যাক্স দুটোর মাথায় বেঁধে সেগুলো পুরোটা বরফে গেঁথে দেওয়া হল; দু’পাশের টানা দেওয়ার দড়িগুলো খুঁটির বদলে বড় বড় পাথরে বেঁধে রাখা হল। হাওয়ার ঝাপটা থেকে কিছুটা বাঁচার জন্য রেবুফত আবার একপাশে খাদের কিনারায় বরফ দিয়ে নিচু একটা দেওয়াল মতো তৈরি করল। তারপর নিরাপত্তার জন্য অভিজ্ঞ পর্বতারোহীর মতোই একটা পিটন পাথরের গায়ে শক্ত করে গেঁথে তার সঙ্গে আমাদের কোমরের দড়িদুটো বেঁধে রাখল, যাতে কোনও কারণে চাতাল থেকে পড়ে গেলেও দড়িতে ঝুলতে থাকি। সারারাত গরুর মতো আমরা সেই খোঁটায় বাঁধা রইলাম!

          অবিরাম তুষারপাত হয়ে চলল, অসহ্য ঠাণ্ডা। এরকম সাংঘাতিক ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে এমন বেখাপ্পা জায়গায় কখনও তাঁবুতে রাত কাটিয়েছি কিনা মনে করতে পারলাম না। চা খাওয়ার পর ধড়ে যেন প্রাণ এল। দু’জনের কারও খিদে নেই একদমই, তবে ডাক্তারের নির্দেশ তো আর অমান্য করা যায় না! তাই বাধ্য ছেলের মতো ভিটামিন বি টু-র বড়ি খেয়ে শুয়ে পড়লাম। হাহাহাহা করে সারাক্ষণ হাওয়া বয়ে চলেছে, টেন্টটা থরথর করে কাঁপছে, আবোলতাবোল নানা চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। বহুক্ষণ পরে চোখে ঘুম এল।

          ভোর হল। তখনও হালকা বরফ পড়ছে। পাথুরে জায়গাগুলোর ওপর আলগা তুষারের পুরু আস্তরণ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এগোনো প্রায় অসম্ভব। ভাবলাম আবহাওয়া ভালো হয় কিনা দেখি, নইলে দুপুরে নিচে নেমে যাব। এখানে সব যেরকম আছে থাক, ফিরে এলে কাজে লাগবে। এর পরের অংশটাই সবচেয়ে শক্ত। আমাদের তাঁবুর ঠিক ওপরেই একটা খাড়াই বিশাল পাথরের চাঁই, তার মাথার কাছে একটা সরু ফাটল আছে। কিন্তু সেই ফাটল অবধি পৌঁছব কী করে ভগবান জানে! ওই পর্যন্ত পুরো চাঁইটাই আলগা তুষারে ঢাকা পড়েছে, নিচে কী আছে কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। রেবুফত বলল, এখানে বসে থাকার কোনও মানে হয় না আর, এক্ষুনি নিচে নেমে যাওয়া যাক। আমি ভাবলাম, দেখাই যাক না শেষ অবধি! এসেছি যখন একেবারে শেষ দেখে ছাড়ব। নইলে পরে হয়ত আক্ষেপ থেকে যাবে। আকাশ পরিষ্কার হয়ে রোদ উঠলে এই তুষার হয়ত অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই গলে যাবে, তখন ভালোই এগোনো যাবে।

          “ওই ওরা আসছে, আইস অ্যাক্সের আওয়াজ শোনো।”

          দেখা গেল ল্যাচেনাল আর টেরে গিরিশিরা ধরে ওপরে উঠে আসছে।

          “তোমরা এখনও তাঁবুর ভেতরে কী করছ? ভ্যারেন্ডা ভাজছ?” চেঁচিয়ে জিগ্যেস করল ওরা।

          “বরফ দেখতে পাচ্ছ না!”

          “দেখেছি। আপনাদের চেয়ে ঢের বেশি দেখেছি। ভোরবেলা থেকে এর মধ্যে ক্লাইম্ব করেই এখানে পৌঁছলাম বন্ধুরা!”

          “তোমাদের দেখি একেবারে পিপুফিশু অবস্থা!” ল্যাচেনাল ফোড়ন কাটল।

          “আরে, পাগল নাকি এরমধ্যে বেরোব?” রেবুফত বলল, “আমি বাবা তাঁবু থেকে নড়ছি না।”

          “হুমম, দেখা যাক কে বেরোয় আর কে না বেরোয়!” বিদ্রুপের সুরে বলল ল্যাচেনাল। তারপর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ওপরে উঠতে শুরু করল। এই রাস্তায় ও দু’দিন আগে উঠেছে। প্রথমে আলগা তুষারের ওপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে বাঁ দিকে এগোতে আরম্ভ করল সে। ঝুরো বরফ খাড়া পাথরের ঢালে স্রেফ আলগাভাবে পড়ে আছে, কিন্তু ল্যাচেনাল যখন তার ওপর পা ফেলল, পায়ের চাপে সেই তুষার পাথরের গায়ে মোটামুটি দৃঢ়ভাবে সেঁটে গেল। বাঁ দিকে কিছুটা এগোনোর পরে ফিট দশেক ওপরে একটা ফাটল দেখা যাচ্ছিল, ল্যাচেনাল সেই অবধি পৌঁছে গেল। রক ক্লাইম্বিং করার জন্য হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরার কিম্বা পা রাখার যত খাঁজখোঁজ বা ‘হোল্ড’ সবই শক্ত বরফে ঢেকে আছে। টেরে আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, ল্যাচেনালের কোমরে বাঁধা দড়িটার এক প্রান্ত টেরের হাতে ধরা, একটু একটু করে সে দড়ি ছাড়ছিল, যাকে বলে ‘বিলে’ (belay) করা। ল্যাচেনাল এবারে একটা তাকের মতো জায়গায় পৌঁছতে চাইছে, সে জন্য একটা ফাটল ব্যবহার করবে বলে আইস অ্যাক্স দিয়ে ভেতরটা সাফ করছিল। হঠাৎ ওর পা পিছলে গেল। প্রায় অলৌকিকভাবে হাতে একটা হোল্ড পেয়ে যাওয়ায় সে ঝুলতে লাগল। সামলে নিয়ে কিছুটা নেমে এল সে, পাথরের গায়ে একটা ‘পিটন’ বা গজাল পুঁতল। পিটনটা দেখে মোটেই ভরসা হচ্ছিল না, নড়বড় করছিল। ল্যাচেনাল কিন্তু নির্দ্বিধায় ওটার ওপর পা রেখে উঠে পড়ল। এবার? এরপর কী করে ওঠে সে দেখা যাক! ওর আইস অ্যাক্সের ফলাটা সেই ফাটলটার ভেতরে ইঞ্চিখানেক ঢুকিয়ে দিল ল্যাচেনাল, তারপর অ্যাক্সের ভেজা হাতলটা ধরে টানাটানি করতে লাগল, দেখছে অ্যাক্সটা ঠিকমত ফেঁসেছে কিনা। ফলাটা প্রথমে ফাটল বরাবর ওপরনিচে ওঠানামা করছিল, কিন্তু ল্যাচেনালের টানাহেঁচড়ায় সেটা দিব্যি পোক্তভাবে ফেঁসে গেল। এরপর সে দু’হাতে অ্যাক্সের হাতলটা শক্ত করে ধরে ঝুলে পড়ে পিটন থেকে পা সরিয়ে নিল, প্রাণপণ চেষ্টায় শরীরটা ওপরদিকে টেনে তোলার চেষ্টা করতে লাগল। ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগছিল না আমার। অভিযানের এই পর্বে এরকম মারাত্মক ঝুঁকি নেবার কোনও যুক্তি নেই। আমি টেরের দিকে এগিয়ে গেলাম, যাতে ল্যাচেনাল পড়ে গেলে দড়ি ধরে টেরেকে সাহায্য করতে পারি। কিন্তু কিছু বলার আগেই দেখি ল্যাচেনাল উঠে পড়েছে, পৌঁছে গেছে সেই তাকটায়। এলেম আছে বটে! এক সেকেন্ডও দেরি না করে টেরে একই রাস্তায় রওনা দিল, রুটের সবচেয়ে কঠিন অংশটার ওপরে আরেকটা পিটন পুঁতে তার থেকে আমাদের জন্য দড়ি ঝুলিয়ে দিল।

          অগত্যা তাঁবু গুটিয়ে স্যাক কাঁধে নিয়ে আমি আর রেবুফতও রওনা দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই টেরে আর ল্যাচেনালের কাছে পৌঁছে গেলাম। তাকটা বেশ নিরাপদ জায়গা। একটা বড় পাথরের চাঁই জায়গাটাকে হাওয়া থেকে আড়াল করে রেখেছে। গতকাল আমাদের এখানেই তাঁবু ফেলা উচিত ছিল, খারাপ আবহাওয়ায় সব গুবলেট হয়ে গেছে। আজও আকাশে মেঘ আছে, তবে মেঘের ফাঁক দিয়ে বাঁ দিকে দূরে অন্নপূর্ণার উত্তর হিমবাহের একেবারে ওপরের অংশের হিমানী প্রপাতটা দেখা যাচ্ছে। এর আগে হিমবাহটা পরিষ্কার দেখতে পাইনি।

khelaannapurna02 (Medium)নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলাম আমরা। এই রুটের ব্যাপারে একমাত্র আশাবাদী মনে হল টেরেকে। সকালে যে অমন চনমনে ছিল, সেই ল্যাচেনালও এখন বলছে এ রাস্তা ফুরোবার নয়, বড্ড লম্বা রুট। রেবুফতও সেই দলে। আমার মন বলছে, অন্নপূর্ণার শৃঙ্গে পৌঁছতে হলে খুব সম্ভবত এটা সঠিক রাস্তা নয়। যদি পরে দেখাও যায় যে গিরিশিরাটা সটান চূড়ো অবধি উঠে গেছে, তাও পুরো দল নিয়ে এ রাস্তায় আসার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। রুটটা এত লম্বা আর এতটাই কঠিন যে বেশ কয়েকদিন আবহাওয়া খারাপ থাকলে বা তাড়াতাড়ি বর্ষা চলে এলে, কিম্বা কোনও আহত অভিযাত্রীকে নিচে নামিয়ে আনার প্রয়োজন হলে আমরা সাংঘাতিক বিপদে পড়ে যাব। এই একই কারণে আমরা ধৌলাগিরি ছেড়ে দিয়েছি।

          কিন্তু টেরেকে বোঝায় কার সাধ্য! সে যথারীতি উৎসাহে টগবগ করে ফুটছে। এসব সাবধানী যুক্তিতে সে মোটেও দমবার পাত্র নয়। ওর এই প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস, এই হাল না ছাড়া জেদ; সর্বোপরি ওর অদম্য ইচ্ছা, সর্বস্ব পণ করে চূড়ান্ত লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগ্রাসী মনোভাব দেখে ওকে নিরাশ করতে মন চায় না। অন্যদিকে অভিযানের একটা দিনও বাজে খরচ করতে চাই না আমি।

          অন্নপূর্ণার উত্তর হিমবাহ আর তার তলার বিশাল হিমানী প্রপাতটার দিকে আরেকবার তাকিয়ে আমার কেমন যেন মনে হল, অন্নপূর্ণার শৃঙ্গে ওঠার যদি সত্যিই কোনও রাস্তা থেকে থাকে তবে সেটা ওখানে। আরেকটা পরিকল্পনা ধীরে ধীরে আমার মনে দানা বাঁধতে শুরু করল। এই রুটে রেবুফত আর ল্যাচেনালের এগোনোর আর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। ওরা যত শীঘ্র সম্ভব গিরিশিরার নিচে বেস ক্যাম্পে ফিরে যাক। সেখান থেকে একজন শেরপাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুক ওই হিমানী প্রপাতটার উদ্দেশে, ওটা ধরে উঠে দেখুক উত্তর হিমবাহের উচ্চতর উপত্যকায় পৌঁছনো যায় কিনা। এখান থেকে দেখে যা আন্দাজ করা যাচ্ছে, হিমবাহের ডান তীর (true right bank) ধরে এগোতে হবে ওদের। হিমবাহের ওপরের অংশে পৌঁছতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে নিচে খবর পাঠাবে ওরা। এদিকে টেরের সঙ্গে আমি এই উপগিরিশিরা ধরে কতটা এগোনো যায় দেখি। সেইমতো ল্যাচেনাল আর রেবুফত নেমে গেল। কোজি আর শ্যাজকে ওরা বলে যাবে তারা যেন আগামীকাল এখানে উঠে আসে। আমরা আরও এগিয়ে গেলে পেছনে কোজি আর শ্যাজ আছে জেনে ভরসা পাব, ফিরে যেতে হলেও তাঁবু আর মালপত্র নিয়ে নেমে যাওয়ার জন্য ওদের সাহায্য লাগবে।

          টেরে আর আমি তাঁবু খাটালাম। এই প্রথম ওর সঙ্গে এক তাঁবুতে রাত কাটাব। আবহাওয়া ফের খারাপ হয়ে এল, তা সত্ত্বেও নিঃসাড়ে ঘুমোলাম দু’জনে। টেরে প্রতিদিন ঠিক সময়মত উঠে পড়ে। ভোর হওয়ার একটু পরেই উঠে সে চায়ের জল বসাল। আমি স্লিপিং ব্যাগের ভেতর গুটিসুটি মেরে ঘুমের ভান করে পড়ে রইলাম। ‘বড়া সাহিব’ হওয়ার এই সুবিধে! শেষে জলখাবার বানানোর পর টেরে আমায় তুলে চা আর খাবার দিল।

          ঠিক হল যথাসম্ভব কম মালপত্র নিয়ে হালকা হয়ে আজ বেরোব দু’জনে, যাতে তাড়াতাড়ি এগোতে পারি। গিরিশিরাটার শেষ দেখতে হবে! গত রাতেও প্রচুর তুষারপাত হয়েছে। টাটকা ঝুরো বরফের ওপর দিয়ে রওনা দিলাম আমরা। এত উচ্চতায় দমের বেশ ঘাটতি হচ্ছে। ঠান্ডায় হাত-পা জমে আছে তখনও। খুব কম মালপত্র নিয়ে রওনা হলেও প্রথম প্রথম চড়াই ভাঙতে দম বেরিয়ে যাচ্ছিল। দাঁতে দাঁত চেপে বিশ্রাম না নিয়ে এগিয়ে চললাম তাও, নষ্ট করার মত সময় নেই হাতে। একটা সহজ চিমনি ক্লাইম্বিং-এর পর উপগিরিশিরাটার পিঠের ওপর উঠে এলাম ফের। গিরিশিরাটা ক্রমশ এত সরু আর তীক্ষ্ণ হয়ে এল যে ভারসাম্য বজায় রেখে ওর ওপর দিয়ে পায়ে হেঁটে এগোনো অসম্ভব। বাধ্য হয়ে গিরিশিরার ফলাটা দু’হাতে ধরে, খাড়াই পাথরের ঢালের খাঁজেখোঁজে পা রেখে, প্রায় ঝুলে ঝুলে এগোতে হল। আমাদের পায়ের নিচে একটা বরফের নালা প্রায় ছ’সাত হাজার ফিট নেমে গেছে। ক্রমশ ল্যাচেনাল আর টেরে বর্ণিত অন্নপূর্ণার সেই বিখ্যাত তুষারাবৃত মূল গিরিশিরাটার কাছাকাছি চলে এলাম। ওদের কথাবার্তার ধরন শুনে প্রথম থেকেই এই রাস্তাটা সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। বাস্তবে, যত কাছে এগোলাম তত পরিস্কার হল গিরিশিরাটা প্রচন্ড খাড়াই আর উঁচু। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে টেরে এগিয়ে চলল, একটু পেছনে থেকে আমি ওকে অনুসরণ করলাম। প্রথমে একফালি চাঁদের মতো দেখতে একটা সুন্দর খাঁজ পড়ল, তারপর রাস্তা সত্যিই খুব খাড়াই হয়ে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম, জুতোয় বাঁধা ক্র্যাম্পনের নিচে শুধু আলগা তুষার নেই আর, রয়েছে শক্ত বরফ। টেরে বেপরোয়া আইস অ্যাক্স চালিয়ে ধাপ কেটে চলেছে, আমি আইস-পিটন পুঁতে পুঁতে তার ভেতর দিয়ে টেরের কোমরে বাঁধা দড়িটা গলিয়ে বিলে করে গেলাম, ওকে সুরক্ষিত রাখার জন্য। ভাগ্য ভাল বরফের আস্তরণটা প্রচন্ড শক্ত, তাই খুব বড় বড় ধাপ কাটার দরকার হচ্ছিল না। একটা খাড়াই বরফের দেওয়াল পড়ল সামনে, বাঁ দিক দিয়ে ঘুরে সেটা এড়ানো গেল। টেরে আইস-পিটন গেঁথে গেঁথে তার ভেতর দড়ি গলিয়ে এগিয়ে চলল, আমি পেছন পেছন সেগুলো খুলতে খুলতে এগোলাম। খুব বেশি পিটন নেই সঙ্গে, তাই এই কিপটেমি। রাস্তা এত খাড়াই যে আমাদের প্রায় নাকের সামনে বরফের দেওয়াল। অনবরত হাতে ধরার আর পা রাখার জন্য বরফে ধাপ কেটে উঠতে হচ্ছে। এবারে সামনে পড়ল উপগিরিশিরার পিঠের ওপর কুঁজের মতো কতগুলো পাথরের স্তূপ; প্রথম স্তূপের সামনের পাথরের দেওয়ালটা আমাদের দিকে ঝুঁকে আছে, অর্থাৎ খাড়াই নব্বই ডিগ্রীরও বেশি, যাকে বলে ওভারহ্যাং। উফ, রাস্তা বটে একখানা!

          টেরে তরতর করে ডানদিকে কিছুটা এগিয়ে পাথরের গায়ে একটা ফাটলে দুটো গজাল পুঁতে দড়ি লাগিয়ে দিল। তারপর দড়িতে নিজেকে সুরক্ষিত রেখে প্রায় মাকড়শার মতো ওভারহ্যাং রকটা বেয়ে উঠে গেল, নিচে ওই অতল খাদ। এরপর সে আমায় টেনে তুলল। এদিকটায় ছায়া হওয়াতে ঠাণ্ডায় কাঁপছিলাম দুজনে। পাথরের কুঁজগুলো এড়ানোর জন্য এবার টেরে ডানদিকের বরফের ঢালে নেমে এগোতে শুরু করল, আমি দড়ি ধরে ওকে বিলে করে গেলাম। অংশটা খুবই বিপজ্জনক, মোটেই ভালো লাগছিল না ব্যাপারটা। ফের রোদ্দুরের এলাকায় চলে আসায় আর অত ঠাণ্ডা লাগছিল না বটে, কিন্তু রোদের তাপে শক্ত বরফ গলে প্রায় মাখনের মতো হয়ে আছে, এগোতে আরও অসুবিধে হচ্ছিল। কোনওরকমে শেষ চড়াইটা পেরিয়ে উপগিরিশিরার মাথায় পৌঁছে গেলাম আমরা, জায়গাটার উচ্চতা প্রায় ২০০০০ ফিট। আবহাওয়া একদম পরিস্কার এখন; ছবি তুললাম কয়েকটা। অন্নপূর্ণার শৃঙ্গ মনে হচ্ছে যেন ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে।

          আমাদের উপগিরিশিরাটা মূল গিরিশিরার সঙ্গে মিলিত হয়ে একেবারে অন্নপূর্ণার শৃঙ্গ অবধি পৌঁছে গেছে ঠিকই, তবে যা দেখলাম, মূল গিরিশিরাটা বেজায় ভাঙাচোরা! আর উপগিরিশিরার নিচ থেকে শৃঙ্গ যতটা দূরে মনে হচ্ছিল, এখান থেকেও যেন ততটাই দূরে লাগছে। খুবই দীর্ঘ আর কঠিন ওই গিরিশিরার রাস্তা। এত পরিস্কার আবহাওয়ায় ঠিকঠাক দূরত্ব আন্দাজ করা মুশকিল, নিচ থেকে দেখে তাই ঠিক বুঝতে পারিনি আমরা। সামনের দিকে তাকিয়ে আমি আর টেরে চুপচাপ রুটটা জরিপ করে যাচ্ছিলাম, এতক্ষণে ব্যাপারটা বোঝার মতো জায়গায় পৌঁছেছি। এ রুটে শৃঙ্গে পৌঁছতে দীর্ঘদিন লেগে যাবে, এতদূর আমরা যে গতিতে এগিয়েছি সেভাবে এগোলেও। হায়, প্রকৃতির এই বিশালত্বের কাছে আমাদের ক্ষমতা কত তুচ্ছ! আলোচনা করার কোনও দরকার ছিল না আর। এ পথে পুরো অভিযান চালনা করা পাগলামিরই নামান্তর। মূল গিরিশিরার পথে এখান থেকে অদৃশ্য আর কোনও ফাঁক বা বাধাবিপত্তি যদি নাও থাকে, তাও এ রুটে যাবার কোনও প্রশ্ন ওঠে না। আল্পসের কোনও রুটের সঙ্গে এর কোনও তুলনাই হয় না। প্রার্থনা করছিলাম, ল্যাচেনাল আর রেবুফত যেন উত্তর হিমবাহের ওপরের ঢাল অবধি পৌঁছতে পারে। এখান থেকে খুব ভালো দেখা যাচ্ছে ঢালটা, মনে হল পরিকল্পনামাফিক হিমানী প্রপাতের পথে ওদের ওখানে পৌঁছতে পারার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। আর ওরা যদি বিফল হয়, তাহলে আমাদের শেষ আশাও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। এই বিপুল কর্মকাণ্ড, এত চেষ্টা, এত পরিশ্রম, এত কষ্ট – সবই কি শেষমেশ বেকার হয়ে যাবে? হলে খুবই দুঃখের কথা!

          আর দেরি না করে নামতে শুরু করলাম; নামাটা যে একইরকম কঠিন হবে জানি। যেখানে যেখানে সম্ভব সেখানে পিটন পুঁতে দড়ির সাহায্যে বিলে করতে করতে দুজনে পালা করে নামছিলাম। যেখানে রোদ সেখানে প্রচন্ড গরম, আবার ছায়ায় গেলেই কনকনে ঠাণ্ডা। দেখা গেল বরফের ঢালের রৌদ্রালোকিত অংশগুলির উপরিভাগের তুষারস্তর আর আমাদের ভার বইতে পারছে না, গলে আলগা হয়ে গেছে। শক্ত বরফে চলা এর চেয়ে ঢের সোজা। খুব সাবধানে বিলে করে করে নামতে হচ্ছিল। উপগিরিশিরার ওপরে পৌঁছে কিছুটা এগোনোর পর পিটন গেল ফুরিয়ে, সীমিতসংখ্যক পিটন নিয়ে বেরিয়েছিলাম আমরা। এরপর আর পিটনে গলানো দড়ির নিরাপত্তাও রইল না। দু’জনে একে অন্যের সঙ্গে কোমরে দড়ি বাঁধা অবস্থায় এমনিই নামতে শুরু করলাম। আমি যখন নামি, টেরে দড়িটা ধরে খুব মন দিয়ে আমায় দেখে; টেরে নামার সময় দেখি আমি। খুব ভালো করেই জানি, একজন পড়ে গেলে পিটনের সাহায্য ছাড়া দ্বিতীয়জনের পক্ষে শুধু দড়ি ধরে প্রথমজনকে সামলানো সম্ভব নয়, সেও দড়ির হ্যাঁচকা টানে ঢালে গড়িয়ে পড়বে। টেরে অদ্ভুত কায়দায় ঢালের দিকে পেছন ফিরে বরফে জুতোর গোড়ালি দিয়ে গুঁতো মেরে মেরে ধাপ বানিয়ে খুব সন্তর্পণে ভারসাম্য বজায় রেখে নামছিল। ও আমায় পরে বলেছিল, দুবার ও পিছলে যেতে যেতে কোনওরকমে সামলে নিয়েছে। আমি অবশ্য ঢালের দিকে মুখ করে দু’পায়ের ক্র্যাম্পনের সামনের কাঁটা আর আইস অ্যাক্সের ফলা বরফে গেঁথে গেঁথে সনাতন ‘থ্রি পয়েন্ট ক্লাইম্বিং’ টেকনিকেই নামছিলাম।

          “হ্যালো, খবর কী?” দূর থেকে শ্যাজের গলা শোনা গেল। ও আমাদের সাহায্য করতে ওপরে উঠে আসছে। টেরে চিৎকার করে ঘোষণা করে দিল এই রুট বাতিল।

          “শ্যাজ, তাঁবু গোটাও, বেস ক্যাম্পে ফেরত চল সব।”

          শুনে শ্যাজ দাঁড়িয়ে পড়ল, কিছুক্ষণ আমাদের নামা লক্ষ্য করল, তারপর ফিরে চলল নিচে। আকাশে ফের মেঘ ঘিরে এসেছে, কুয়াশা আর তুষারে মিলেমিশে চারপাশ ধূসর হয়ে আছে। খাড়াই বরফের ঢাল আর কতটা বাকি আছে আন্দাজ করে আমি স্যাক থেকে একটা দড়ি আর শেষ পিটনটা বার করলাম, ওগুলো আপৎকালীন সহায় হিসেবে রাখা ছিল। গজালটা গেঁথে দড়িটা দু’পাল্লা করে ঝুলিয়ে দিলাম, র‍্যাপেলিং করে নামব। প্রথমে টেরে নেমে গেল। পিটনটার দিকে লক্ষ্য রাখছিলাম আমি; ঝাঁকুনির চোটে ওটা বেঁকে বেঁকে যাচ্ছিল, তবে টেরে পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর ফের সোজা হয়ে গেল দেখে আশ্বস্ত হলাম। নির্ভয়ে আমিও নেমে গেলাম দড়ি ধরে। নেমে যেখানে পা রাখব, টেরে সে জায়গাটা আইস অ্যাক্স দিয়ে সমান করে রেখেছিল। একটা প্রান্ত ধরে টেনে টেনে দড়িটাও উদ্ধার করা গেল। একটু পরেই পাথুরে ঢালে পৌঁছে গেলাম; ক্র্যাম্পন খুলতে পেরে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম দু’জনে। আজ সন্ধ্যেবেলার মধ্যে যদি অন্তত এ রুটে আমাদের প্রথম ক্যাম্প, ঘাসে ঢাকা সেই চত্বরটা অবধি নেমে যেতে পারি তো বেশ হয়। এক মুহূর্ত নষ্ট না করে প্রবল উৎসাহে আমরা গিরিশিরার সেই তীক্ষ্ণ ধারালো বিপজ্জনক অংশটা ধরে ঝুলে ঝুলে এগোতে শুরু করলাম। সকালে যে রাস্তা আধঘণ্টা লেগেছিল এখন তা কয়েক মিনিটেই পেরিয়ে গেলাম।

          সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু হল। চিমনি বেয়ে ঘষটে, তুষারাবৃত নালা দিয়ে পিছলে সোজা অংশগুলো হুড়মুড় করে নেমে গেলাম। অত ঠান্ডাতেও দরদর করে ঘামছিলাম দুজনে। রেকর্ড সময়ে সকালের ক্যাম্পে পৌঁছে গেলাম। দেখি শ্যাজ আর সরকি মিলে সবে তাঁবুটা গোটাতে পেরেছে। টেরে চটপট দুর্দান্ত চা বানিয়ে ফেলল। চায়ের সঙ্গে খাবারের টিন খুলে টম্যাটো সসে ডোবানো মাংস আর সয়াবিন খেতে খেতে সংক্ষেপে শ্যাজদের আজকের অভিজ্ঞতা বললাম। অভিযানটা বেশ রোমাঞ্চকর হয়েছে সন্দেহ নেই, ক্লান্তিকরও বটে, তবে এত কাণ্ডের পর আমরা একটা সামান্য উপগিরিশিরার মাথায় উঠতে পেরেছি মাত্র। টেরে অবশ্য পরে বলেছিল, এই যাত্রার মত আর কখনও সে পাহাড়ে এরকম সর্বস্ব পণ করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেনি। এতেই যেটুকু সার্থকতা।

          আকাশটা থম মেরে আছে, তবে দেখে মনে হল বিকেল অবধি এরকমই থাকবে। রওনা হয়ে টেরে আর ল্যাচেনালের খাটানো দড়িটা ধরে একে একে সেই ত্রিভুজাকৃতি জায়গাটায় নেমে এলাম সবাই, যেখানে আমি আর রেবুফত গত পরশু রাত্রে তাঁবু ফেলেছিলাম। চারজনেরই পিঠে প্রচুর বোঝা, দুটো তাঁবু আর আনুষঙ্গিক সমস্ত মালপত্র, রাস্তাও যথেষ্ট কঠিন আর বিপজ্জনক, তবে তাতে আমাদের গতি কমল না। আমাদের নামার স্পিড দেখে সরকি প্রথমে ঘাবড়ে গেল, কিন্তু একটু পরেই দেখি সেও বেশ তাল মিলিয়ে চলেছে। পুরু হয়ে তুষার জমে আছে রাস্তায়, বেশ সাবধানে চলতে হচ্ছিল। কঠিন অংশটুকু পেরিয়ে যেতেই ফের হুড়মুড় করে নামা শুরু হল। ঘাসের চত্বরটা দেখা যাচ্ছে, ধীরে ধীরে কাছে আসছে সেটা। চত্বরে পৌঁছনোর ঘাসের ঢালগুলো সব এখন তুষারে ঢাকা। প্রায় দৌড়ে সে ঢাল বেয়ে নেমে পৌঁছে গেলাম ক্যাম্পে। এই অস্থায়ী প্রথম ক্যাম্প থেকে উপগিরিশিরার মাথায় উঠতে আড়াই দিন লেগেছিল আমাদের, ফেরার সময় মাত্র কয়েক ঘন্টাতেই নেমে এলাম।

          নিচে বেস ক্যাম্প পরিস্কার দেখা যাচ্ছে, আলগা নুড়িপাথরের বিস্তীর্ণ ধূসর প্রান্তরে উজ্জ্বল হলুদ রঙের তাঁবুগুলো দাঁড়িয়ে আছে। হালকা তুষারপাত থেমে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টেরে আর আমার মধ্যে একবার শুধু চোখ চাওয়াচাওয়ি হল; মুহূর্তের মধ্যে ক্যাম্প থেকে যতটা পারি মালপত্র স্যাকে ভরে আমরা দু’জন ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করলাম। শ্যাজ আর সরকি প্রাণপণে আমাদের নাগাল পাবার চেষ্টা করছিল, কিন্তু আমরা তখন উল্কার বেগে নেমে চলেছি। ওই ভারি রুকস্যাক পিঠে নিয়েও বোল্ডারের ওপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে, তুষারজমা ঢাল বেয়ে তুলির মসৃণ টানের মতো স্লিপ খেয়ে কয়েক মিনিটের ভেতরেই আমরা নুড়িপাথরের মোরেনে নেমে এলাম। শ্যাজ নিশ্চয়ই অবাক হয়ে ভাবছিল, এত তড়িঘড়ি নামার কারণটা কী! সত্যি কথা বলতে কি তেমন কোনও কারণ ছিল না। পনেরো মিনিটের বদলে ধীরেসুস্থে এক ঘণ্টায়ও দিব্যি নামতে পারতাম আমরা। বিপজ্জনক ও কঠিন এক অভিযান শেষে নিরাপদে নেমে আসার আনন্দই হয়ত এই উত্তেজনার কারণ।

          বেস ক্যাম্প পৌঁছে দারুণ খবর পাওয়া গেল। ল্যাচেনাল আর রেবুফত তাদের শেরপাকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছে উত্তর হিমবাহের সেই হিমানী প্রপাতের ডান তীর ধরে ওপরে ওঠা সম্ভব। হিমবাহের ওপরের ঢালটা ওরা এখনও দেখতে পাচ্ছে না, তবে নিশ্চিত যে ওখানে পৌঁছন যাবে। ওরা যে অংশটা দেখতে পাচ্ছে না, আমি আর টেরে উপগিরিশিরার মাথায় উঠে প্রায় ২০,০০০ ফিট উচ্চতা থেকে সে অংশটা সম্পূর্ণ দেখেছি। জানতাম যে একবার ওপরে পৌঁছতে পারলে আর তেমন বাধাবিঘ্ন নেই।

          অভিযানে এই প্রথম একটু আশার আলো দেখা গেল। তবে কি শেষমেশ আমাদের জেদ আর বিশ্বাসের পুরস্কার মিলতে চলেছে? দেখা যাক! আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অভিযানের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাবে।

          তুষারপাত, বৃষ্টি আর ঘামে ভিজে আমি আর টেরে পুরো ভূত হয়ে গেছি। জামাকাপড় বদলে একটু পরিস্কার হচ্ছিলাম। এমন সময় সরকির সঙ্গে পৌঁছেই শ্যাজ ঘোষণা করল, “শৃঙ্গে ওঠার রাস্তা আমি পেয়ে গেছি, আমার দু’জন শেরপা চাই…”

          “মাত্র দু’জন শেরপা! আর?” টেরে ফোড়ন কাটল।

          “দুটো হাই অল্টিচিউড তাঁবু, সরঞ্জাম, আর তিনদিনের খাবার।”

          “চিফ এবার একাই যেতে চান অভিযানে! আমাদের ওপর আর ভরসা নেই!” কোজি ফুট কাটে। নিখুঁত ব্যবস্থাপনার ভক্ত বলে আল্পসের পাহাড়ি এলাকায় শ্যাজকে সবাই ‘চিফ’ বলে ডাকে।

          “আহা, বলতে দাও না ওকে! বল শ্যাজ, তোমার প্ল্যানটা কী?”

          “উত্তর হিমবাহের ওপরের ঢালে পৌঁছনর জন্য একটা সহজ গিরিশিরা আবিস্কার করেছি। এ পথে হিমানী প্রপাতের ডানদিকের ভাঙ্গাচোরা অংশটা এড়ানো যাবে।”

          “শ্যাজ ঠিকই বলছে,” বললাম আমি, “ধরো যদি ল্যাচেনাল আর রেবুফত ব্যর্থ হয়, তখন কী করব আমরা? তূণে আরেকটা তীর থাকা ভালো।”

khelaannapurna03 (Medium)

          ঠিক হল পরদিন সকালেই শ্যাজ বেরিয়ে যাবে। কোজি ও অডটের সঙ্গে মিলে শ্যাজই মিরিস্তি খোলা ধরে এই বেস ক্যাম্প অবধি রাস্তা আবিস্কার করেছে, এখন অন্নপূর্ণার শৃঙ্গে ওঠার চূড়ান্ত রুটটা খুঁজে বার করার ব্যাপারেও সে যথেষ্ট আশাবাদী। টেরে, আমি আর সরকি ভয়ানক ক্লান্ত; তাই ঠিক করলাম পরদিন সকালটা বিশ্রাম নেব; দুপুরে আজীবাকে সঙ্গে নিয়ে ল্যাচেনালদের রাস্তায় বেরোব। সময় এখন এতটাই মূল্যবান যে এক ঘন্টা নষ্ট করতেও ইচ্ছে করে না। তবে মন বলছে এবারে ঠিক দিকে এগোচ্ছি আমরা, একটা সকাল তাই বিশ্রাম নেওয়াই যায়।

          “কোজি, তোমায় একটা বাজে কাজ দেব…”

          “কী কাজ?”

          “প্রথমে উপগিরিশিরার রুটে ঘাসের চত্বরে বসানো ক্যাম্পটা গুটিয়ে নামাতে হবে। তারপর এই বেস ক্যাম্পটা আরও এগিয়ে নিয়ে বসাতে হবে। কোথায় বসাবে বলে দেব আমি।”

          “বাজে কাজই বটে! তবে যদি করতেই হয়…”

          “করতেই হবে, কোজি। শেষ যে জায়গা অবধি সাধারণ কুলিরা মাল বয়ে নিয়ে যেতে পারবে, সেখানেই হবে আমাদের স্থায়ী বেস ক্যাম্প। সেরকমটাই হওয়া উচিত। ও, আরেকটা মুশকিল আছে! এ দুটো কাজের জন্য সঙ্গে মাত্র একজন শেরপা পাবে তুমি, নিজেকেও মাল বইতে হবে আর কি!”

          “হুম! বোঝা গেল! এ তো রীতিমত পিকনিক! বেশ।”

          আমাদের দলের সবচেয়ে কমবয়েসি সদস্য কোজি। খুব ভালো একজন পর্বতারোহী, যথেষ্ট চনমনেও বটে। তাও দিনের পর দিন ওকে নিচে ঘাঁটি গেড়ে বসে এইসব জরুরি কিন্তু কম দেখনদারি কাজ করে যেতে হয়েছে। কখনও কোনও অনুযোগ করেনি সে। সমস্ত দায়িত্বই নিখুঁতভাবে সম্পাদন করার চেষ্টা করে গেছে। কোজি ভালমতোই জানত, শৃঙ্গ অভিযানের চূড়ান্ত লক্ষ্যে যখন ঝাঁপিয়ে পড়ব আমরা, তখন দেখা যাবে সে নিজে অতি উচ্চতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার যথেষ্ট সুযোগ পায়নি, তাই শৃঙ্গে ওঠার চূড়ান্ত দলে ওর ঠাঁই হবে না। সেটা জেনেও সে নিঃস্বার্থভাবে চুপচাপ কাজ করে গেছে। এই হল টিম স্পিরিট, একেই বলে দলগত সংহতি।

          সেদিন সন্ধ্যেবেলা, বাইরে যথেষ্ট খারাপ আবহাওয়া সত্ত্বেও ক্যাম্পের ভেতরের পরিবেশ দিব্যি ফুরফুরে। আশার একটা আলো দেখা দেওয়ায় সবাই বেশ খোশমেজাজে। হাসিঠাট্টা, হৈ-হুল্লোড় আর আড্ডা চলল অনেকক্ষণ। তারপর তাঁবুর ওপরের ক্যানভাসের কাপড়ে অঝোরধারায় বৃষ্টি পড়ার কানে তালা লাগানো আওয়াজের মধ্যেও গরম স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে নিশ্চিন্ত আরামে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের মধ্যে শুনি কারা যেন জোরে জোরে কথা বলছে, পিটনের ঠুংঠাং শব্দ, স্টোভের সোঁ সোঁ আওয়াজ, খাবারের টিন খোলা হল যেন – শ্যাজ, পানসি আর আয়লা বেরনোর জন্য তৈরি হচ্ছে। বাইরে তখনও অন্ধকার, আমার তাঁবুর ভেতর মাথা গলিয়ে শ্যাজ বলল, “মরিস, চললাম।”

          “আবহাওয়া কেমন?”

          “আকাশ ভরা কোটি কোটি তারা।”

          “বাঃ, দারুণ! ঠিক আছে শ্যাজ, সাবধানে যেও।”

          তাঁবুর মধ্যে শুয়ে শুয়ে বাইরের নুড়িপাথরের প্রান্তরে ওদের পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুনলাম। সকাল সকাল ওঠার তাড়া না থাকলে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর সেঁধিয়ে থাকার যে কী আরাম! মটকা মেরে পড়ে থাকো, চোখ বন্ধ করে আকাশপাতাল ভাবো। অভিযানের শুরু থেকে এক মুহূর্তও ফুরসৎ পাইনি, আজ সকালের বিশ্রামটা তাই তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম। ধীরেসুস্থে উঠে একে একে অন্যদের তাঁবুতে ঢুঁ মারলাম। টেরের সবকিছু পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখার অভ্যেস। সে সারাক্ষণ তার রুকস্যাক আর সরঞ্জাম গুছিয়েই চলেছে। সামনে কঠিন সময়, কখনওই অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়তে চায় না ও। আমাকেও অবশ্য গোছগাছ শুরু করতে হবে। তার আগে বাইরে রোদে গিয়ে দাঁড়ালাম। সূর্য অনেকটা ওপরে উঠে গেছে, বেশ আরামদায়ক তাপমাত্রা, চারপাশে তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গগুলি ঝকঝক করছে, সুন্দর পরিস্কার দিন।

          তবে বেশিক্ষণ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করব কি, মাথায় ঘুরছে নানান চিন্তা! দু’দিন ধরে কেবলই মনে হচ্ছিল, খাবারদাবার বোধহয় কম পড়ে যাবে আমাদের। মেস টেন্টে ঢুকে তাই সমস্ত জিনিসপত্র মেঝেতে ছড়িয়ে হিসেবনিকেশ করতে বসলাম। সব আলাদা আলাদা ভাগে গুছিয়ে রেখে গুণেগেঁথে দেখলাম, নাঃ, ঠিকই আছে। দুশ্চিন্তার তেমন কোনও কারণ নেই। দুপুরবেলা পিঠে মস্ত মস্ত বোঝা নিয়ে রওনা দিলাম আমরা। আটদিন টানা পরিশ্রমের পর একটা সকাল বিশ্রাম পেয়েই শরীর যেন বেশ তরতাজা হয়ে উঠেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়াও আজ আর মেঘলা হয়ে এল না, আকাশ পরিষ্কারই রইল। নুড়িপাথরে ঢাকা একঘেয়ে মোরেন প্রান্তর মাইলের পর মাইল চলেছে, তার ওপর দিয়ে হাঁটা যথেষ্ট ক্লান্তিকর। কোথাও কোথাও আলগা নুড়ির নিচে লুকিয়ে রয়েছে শক্ত কালো বরফ, বুঝতে না পেরে সবাই বেশ কয়েকবার আছাড় খেলাম।

khelaannaurna04 (Medium)

কিছুক্ষণ পর দেখি উল্টোদিক থেকে আজীবা আসছে। দারুণ খবর! ল্যাচেনাল আর রেবুফত উত্তর হিমবাহের ওপরের ঢালে পৌঁছে গেছে। রেবুফত তার মেসেজে আরও লিখেছে, হিমানীপ্রপাতের ডানতীরের রাস্তা পুরোটাই পাথুরে, বরফ নেই, ওঠাও বেশ সোজা। অন্নপূর্ণার উত্তর হিমবাহের প্রকান্ড হিমানীপ্রপাতের বাধাটা তাহলে জয় করা গেল! আশায় বুক বেঁধে তাড়াতাড়ি এগিয়ে চললাম আমরা। বেশি ঠান্ডা নেই আজ, আবহাওয়া বেশ মনোরম। অন্নপূর্ণা পর্বতপুঞ্জের দানবীয় সেই তুষারপ্রাচীর ধীরে ধীরে আমাদের কাছে এগিয়ে আসছে, ধূসর মসৃণ এক উত্তুঙ্গ দেওয়াল, কোনও মানুষের সাধ্য নেই ওটা বেয়ে ওঠে। হিমবাহের ডান তীর (true right bank) ধরে রাস্তা বেশ সহজ। আজীবা আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। বিকেলবেলা সেই তুষারপ্রাচীরের একদম পায়ের গোড়ায় এসে উপস্থিত হলাম আমরা, অন্নপূর্ণা হিমবাহের মোরেনের ঢালটা যেন উত্তর থেকে নেমে ওই দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে গেছে, বেশ একটা সমতল মাঠের মতো তৈরি হয়েছে।

          এরপর হিমানীপ্রপাতের ডানতীরের খাড়াই পাথুরে ঢাল বেয়ে উঠতে হবে। সাধারণ কুলিরা এর পরে আর এগোতে পারবে না। বুঝলাম এই মাঠটাই হবে আমাদের ভবিষ্যৎ স্থায়ী বেস ক্যাম্পের উপযুক্ত জায়গা। দেরি হয়ে যাচ্ছে, আজ সন্ধেবেলাই হিমানীপ্রপাতের ওপরে হিমবাহের ঢালে পৌঁছতে চাইছিলাম আমরা। তাও বসে তাড়াতাড়ি জায়গাটার একটা স্কেচ করে নিলাম, যাতে পরে বেস ক্যাম্প বসাতে সুবিধে হয়। অতঃপর আজীবার নেতৃত্বে দ্রুতগতিতে এগোতে শুরু করলাম। তুষারপ্রাচীরের গোড়া থেকে একের পর এক খাড়াই চিমনি আর নালা ধরে ধাপে ধাপে নেমে আসা হিমানীপ্রপাতটার ওপরে পৌঁছে গেলাম। এই এত উচ্চতায় পিঠে ওই ভারি বোঝা নিয়ে তড়িঘড়ি উঠতে গিয়ে একেবারে দম বেরিয়ে গেল। ভরসন্ধেবেলা অবশেষে একটা বরফের উঁচু দেওয়ালের পায়ের কাছে হাজির হলাম যেখানে ল্যাচেনাল আর রেবুফত তাঁবু গেড়েছে। জায়গাটার উচ্চতা প্রায় ১৬,৭০০ ফিট। এটাই হবে আমাদের ভবিষ্যৎ ক্যাম্প ওয়ান।

          ল্যাচেনাল আর রেবুফত আমাদের সোৎসাহ অভ্যর্থনা জানাল। অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় তখন আর আমাদের পক্ষে চারদিকে কিছু দেখা সম্ভব হল না, তবে ওরা জানাল, “আর কোনও চিন্তা নেই, বস্! অন্নপূর্ণার চূড়ায় আমরা উঠছিই, বিন্দুমাত্র সন্দেহেরও অবকাশ নেই আর।”

_________

(এরপর আগামী সংখ্যায়)