ধারাবাহিক অভিযান অন্নপূর্ণা মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক শীত ২০১৬

আগের পর্বগুলো একত্রে এই লিংকে

 image-page1

এক আশ্চর্য দৃশ্য পরদিন সকালে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ল্যাচেনাল আর রেবুফত বাইরে একটা শুকনো বোল্ডারের ওপর বসে আছে, ওদের চোখ অন্নপূর্ণার ওপর স্থির। আমাকে যেটা তড়িঘড়ি তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করল, সেটা ল্যাচেনালের একটা ছোট্ট কথা, তীক্ষ্ণ গলায় হঠাৎ তিনটে শব্দ, “পেয়েছি! রাস্তা পেয়েছি!” বাইরে বেরিয়ে প্রথমেই চোখটা ধাঁধিয়ে গেল, তাড়াতাড়ি ওদের কাছে এগিয়ে গেলাম। এই প্রথম অন্নপূর্ণা তার সমস্ত গোপন রহস্য আমাদের চোখের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছে, তার বিশাল বিপুল উত্তরগাত্র সমস্ত বরফের ঢাল আর হিমবাহ-টাহ নিয়ে প্রভাত সূর্যের আলোয় হিরের মতো ঝলকাচ্ছে। এরকম রাজকীয় কোনও পর্বতশৃঙ্গ আমি আমার জীবনে কোনওদিন দেখিনি, দেখব বলে কল্পনাও করতে পারিনি। হৃদয় যেমন মুগ্ধ আবিষ্ট হয়ে পড়ে, তেমনি সম্ভ্রমও জাগে, ভয় হয়। এ এক ভয়ঙ্কর সুন্দরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা, চোখ ফেরানো মুশকিল। আর, বোধহয় এই প্রথম, এখানে কোনও সটান খাড়া বরফের দেওয়াল আমাদের দৃষ্টিকে প্রতিহত করছে না, সামনে নেই কোনও ভাঙাচোরা গিরিশিরা, নেই ঝুলন্ত বরফের চাঁই ওপর থেকে ঘাড়ের ওপর ভেঙে পড়ার ভয় – অন্যান্য জায়গায় যেসব বেয়াড়া কারণে মনে হয় কতক্ষণে পালাই!

ল্যাচেনাল বলল, “দ্যাখো, যে করে হোক আমাদের ওই কাস্তের মতো দেখতে হিমবাহটার গোড়ায় পৌঁছতে হবে, ওপরে যেটা দেখা যাচ্ছে। তুষারধ্বসের ঝুঁকি এড়িয়ে ওখানে পৌঁছতে গেলে এই ঢালু তুষারের চাতালটার একেবারে বাঁদিক ঘেঁষে অনেক ওপর দিয়ে এগোতে হবে।”

“ও পথে হিমবাহটার গোড়ায় পৌঁছবে কী করে?” রেবুফত বাধা দিল, “চাতালটার বাঁদিকে ওপাশে একটা প্রচণ্ড ভাঙাচোরা হিমবাহ আছে, ক্রিভাসে ভর্তি। ওটা পেরোনো যাবে না।”

সবাই ফের ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলাম। কিন্তু, বলতে বাধ্য হচ্ছি, ল্যাচেনালের রুটটা ঠিক আমার বোধগম্য হল না। আমার মন তখনও খুশির জোয়ারে ভাসছে, এত কাছ থেকে অবশেষে অন্নপূর্ণাকে পরিস্কার দেখতে তো পেলাম! কোনও সন্দেহ নেই, আজ এই তেইশে মে এখনও অবধি আমাদের অভিযানের সবচেয়ে ভালো দিন।

ল্যাচেনাল অবশ্য সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। উত্তেজনায় মাথার উলের টুপিটা খামচাতে খামচাতে বলে চলল, “কিন্তু ওপাশের হিমবাহের ভাঙাচোরা অংশটা আমরা আরও বাঁদিক দিয়ে গিয়ে এড়িয়ে যেতে পারি। তারপর শুধু হিমবাহটার আইস ফল জোন বেয়ে ফের এই চাতালটার ওপর উঠে আসতে হবে, তাহলেই ওই কাস্তের মতো হিমবাহটার পায়ের কাছে পৌঁছে যাব।”

আইস অ্যাক্সের শব্দে আমাদের আলোচনায় ছেদ পড়ল। দেখি আজীবা অ্যাক্স দিয়ে বরফের চাঙড় ভাঙছে, গলিয়ে গরম জল করবে।

“তোমার রুটে অনেক ঘোরপ্যাঁচ, ল্যাচেনাল,” বললাম আমি, “অত ঘুরপথে গেলে চলবে না, প্রচুর সময় লেগে যাবে। তাছাড়া ওপাশের হিমবাহটা এখান থেকে দেখতে পাচ্ছি না আমরা, হয়ত দেখা গেল সেটা আলগা নরম তুষারে ঢাকা, পেরোতে গিয়ে কোমর অবধি ঢুকে গেলাম, তখন? রুট হবে সরাসরি, চূড়া অবধি পৌঁছনোর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত রাস্তা আমাদের খুঁজে বার করতে হবে।”

“আর তুষারধ্বস? সে রাস্তায় যদি তুষারধ্বসের ভয় থাকে?” রেবুফত জিগ্যেস করল।

“দ্যাখো, ডানদিক ঘেঁষে গেলেও তুষারধ্বসের ভয়, বাঁদিক ঘেঁষে গেলেও তাই। সবচেয়ে ছোট রাস্তাটা বাছাই সেক্ষেত্রে বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি? ধ্বসের আশঙ্কায় কাটানো সময়টা তো কমবে!”

“ডানদিকের রাস্তায় ওই খাড়াই নালাটা দেখেছ? ওই নালা ধরে তো অনবরত তুষারধ্বস নেমে আসে, ধ্বস নামার চিহ্ন দেখতে পাচ্ছ না?” ল্যাচেনাল বলল।

“নালাটা যদি আমরা যতটা সম্ভব ওপর দিয়ে পেরোতে পারি তাহলে তুষারধ্বসের সম্ভাবনা অনেকটা কমে আসবে। বাঁদিকের রুটে কি তুষারধ্বসের ভয় নেই? চেয়ে দ্যাখো ধ্বসের কত চিহ্ন!”

“তা আছে বটে!” স্বীকার করল ল্যাচেনাল।

“সোজাসুজি এগোনোটাই ভালো নয় কি তাই? এই ঢালু তুষারের চাতালটা ধরে একেবারে চূড়ার দিকে মুখ করে? ক্রিভাস কিম্বা অন্যান্য বাধাবিঘ্ন এড়াতে যতটা ঘুরতে হবে ঠিক ততটাই ঘুরব, তারপর বাঁদিকে এগিয়ে কাস্তের মতো হিমবাহটার গোড়ায় পৌঁছে যাব, সেখান থেকে একেবারে সোজা শৃঙ্গের দিকে।”

রেবুফতের হাবভাব দেখে মনে হল আমার রুটটা ঠিক পছন্দ হয়নি ওর। তার পরনে একটা পুরনো টাইট ফিটিং সোয়েটার, আল্পসে পাহাড়ে চড়ার সময়ও সর্বদা এটাই পরে সে। এ সোয়েটারটা পরলে আরও লম্বা দেখায় ওকে। সাধে কি শেরপারা ওর নাম দিয়েছে ‘লম্বা সাহিব’!

“কিন্তু,” ল্যাচেনালের মনে তবু সংশয়, “ডানদিকের ওই খাড়া বরফের দেওয়ালটার নিচ দিয়ে সোজা এগিয়ে তারপর বাঁদিকে ঘুরে চাতালটা পেরিয়েও তো ওই একই জায়গায় পৌঁছনো সম্ভব।”

“সোজা এগোলে রাস্তা নিঃসন্দেহে আরও কম পড়বে, একটা সমকোণী ত্রিভুজের অতিভূজ তার দুই বাহুর যোগফলের থেকে সবসময়ই ছোট।”

“সেটা অবশ্য ঠিক! তোমার রাস্তায় এগোনোটা একেবারে দুঃসাধ্য হবে বলেও মনে হচ্ছে না,” শেষমেশ হার মানে ল্যাচেনাল। রেবুফতের শরীরী ভাষাও একটু সহজ হয়েছে দেখলাম।

“টেরে, একবার দেখে যাও এসে,” হাঁক পাড়লাম আমি।

টেরে যথারীতি একটা প্যাকিং বাক্সের ভেতরে ঝুঁকে গম্ভীরভাবে মালপত্র গোছগাছ করছিল, মাথা তুলল ডাক শুনে। মাথায় স্কিইং করার একটা হেলমেট চাপিয়েছে সে, একমুখ লম্বা লম্বা দাড়ি বাতাসে উড়ছে। হেলমেট পরা সাধুবাবা! ভণিতা না করে সোজা জিগ্যেস করলাম ‘তার’ রুটটা কী? দেখা গেল সকালে উঠে আমাদের আগেই সে তন্নতন্ন করে অন্নপূর্ণার গায়ে সব খুঁটিয়ে দেখেছে, আর শৃঙ্গে ওঠার রাস্তার ব্যাপারে তার নিজস্ব সিদ্ধান্তেও পৌঁছে গেছে!

“জলের মতো পরিস্কার,” বলতে শুরু করে টেরে। উত্তেজিত হয়ে কথা বলার সময় তার ঠোঁটদুটো সামনে এগিয়ে ছুঁচলো হয়ে যায়, যাতে চোখা চোখা শব্দ বলতে সুবিধে হয়, “সোজা শৃঙ্গটা তাক করে এগিয়ে গেলেই হবে, চাতাল ধরে সোজা উঠব, ওই ওপর দিয়ে নালাটা পেরোব, তারপর বাঁদিকে ঘুরে ওই হিমবাহটার গোড়ায়…” দেখা গেল টেরে হুবহু আমার রাস্তাটার কথাই বলছে। তার মানে দেখা যাচ্ছে রুট সম্বন্ধে একমত সবাই।

“এক্ষুনি রওনা হওয়া উচিত আমাদের,” টেরে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে।

তার ছোঁয়াচ লেগে ল্যাচেনালও চনমন করে ওঠে। আমার কানের কাছে মুখ এনে চিৎকার করে বলে, “আর দেরি কেন! চলো বেরিয়ে পড়া যাক। এ রাস্তায় ব্যর্থতার সম্ভাবনা একশোয় শূন্য।”

সবচেয়ে খুঁতখুঁতে যে রেবুফত, সে পর্যন্ত বলে কিনা, “হুম, বিকল্পগুলির মধ্যে এ রাস্তাটাই তুলনায় কম কঠিন, আর যুক্তিসঙ্গতও বটে!”

অসাধারণ আবহাওয়া আজ, চারদিক ঝকঝকে পরিস্কার। হিমালয়কে এর চেয়ে বেশি সুন্দর আর কোনদিনও মনে হয়নি। আমাদের উৎসাহ-উদ্দীপনাও চরমে, বোধহয় একটু বেশিই। হিমালয়ে পৌঁছনো ইস্তক এই দৈত্যাকার অত্যুচ্চ পর্বতমালা আমাদের সামনে পর পর এমন সব বাধাবিঘ্ন খাড়া করে এসেছে যা আল্পসের অভিজ্ঞতায় লালিত আমাদের মন কোনওদিন আন্দাজই করতে পারেনি। এতদিন পরে অবশেষে একটু আশার আলো দেখা গেছে। তবে আসল পর্বই বাকি এখনও! আর সবচেয়ে বড় এবং চিন্তার কথা হল হাতে সময় খুবই কম আমাদের। সময় নেই আর। যদি সফল হতে হয় তাহলে আর একমুহূর্তও নষ্ট করা চলবে না। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী জুন মাসের পাঁচ তারিখ এখানে বর্ষা চলে আসার কথা। সে হিসেবে আমাদের হাতে আর মাত্র বারো দিন সময় আছে। তাড়াতাড়ি এগোতে হবে, অত্যন্ত দ্রুত। হিসেবটা মাথায় পরিস্কারভাবে গেঁথে যেতেই মনে মনে আতঙ্কিত হয়ে উঠলাম। এই অল্প সময়ের মধ্যে শৃঙ্গজয় করে নেমে আসতে হলে আমাদের পরপর দুটো ক্যাম্পের মধ্যে দূরত্ব যথাসম্ভব বাড়াতে হবে যাতে ক্যাম্পের সংখ্যা কম হয়; ক্যাম্পগুলির মধ্যে নিয়মিত লোড ফেরি চালু করতে হবে যাতে নিচের ক্যাম্প থেকে ওপরের ক্যাম্পগুলিতে রসদ এবং সাজসরঞ্জাম সব ঠিক সময়ে পৌঁছে যায়; আমাদের শরীরকে হিমালয়ের অতি উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে এবং সর্বোপরি তুকুচা বেস ক্যাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে যাতে সরবরাহ ঠিক থাকে।

অ্যাক্লাইম্যাটাইজেশন অর্থাৎ অতি-উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে। এটা একেকজনের ক্ষেত্রে একেকরকম হয়, কারও বেশি সময় লাগে, কারও কম। অতি উচ্চতায় রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা যার যত বেশি তার তত কম সময় লাগে। কয়েকবার উঁচুতে রাত কাটিয়ে নেমে এলে মানিয়ে নিতে পরে সুবিধে হয়। অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, একটা নির্দিষ্ট উচ্চতার ওপরে বেশিক্ষণ থাকলে প্রত্যেকেরই শরীর ভেঙে যায়, তার নিচে শরীর নিজেকে সইয়ে নিতে পারে। এই নির্দিষ্ট উচ্চতাটা একেকজনের ক্ষেত্রে একেকরকম, বারবার ওঠানামা করে সেই উচ্চতার সীমা ক্রমে ওপরে ঠেলে তোলা সম্ভব। এই অভিযানের এখন অবধি যা গতিপ্রকৃতি, অনুসন্ধান পর্বের নানা রুটে নানা আরোহণ ধরে, তাতে আমাদের ক্ষেত্রে সেই উচ্চতার সীমাটা এখন ১৬০০০ থেকে ২০০০০ ফিটের মধ্যে থাকা উচিত। ওদিকে শৃঙ্গজয় করতে হলে সাড়ে ছাব্বিশ হাজার ফিটে উঠতে হবে আমাদের।

image-page4


তবে আমায় সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলল শেষ ব্যাপারটা, অর্থাৎ তুকুচা বেস ক্যাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন। আমরা এখানে এসেছি বড়জোর একটা মাঝারি মাপের অনুসন্ধান দলের মতো তৈয়ারি নিয়ে। ভাঁড়ারে আর মাত্র পাঁচ দিনের খাবারদাবার আছে, পর্বতারোহণের সাজসরঞ্জামও এনেছি খুবই সীমিত সংখ্যায়। আজ হঠাৎ ভাগ্যাকাশে শৃঙ্গজয়ের সম্ভাবনা উঁকি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এতরকম সমস্যা, এত হাজার রকম হিসেবনিকেশ হুড়মুড় করে মাথায় ভিড় করে এল যে প্রায় পাগল পাগল অবস্থা!

দলের বাকি সবাই তো উৎসাহে ডগমগ করছে, এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ার জন্য রীতিমতো তাল ঠুকছে, ক্যাম্পে বেশ একটা হৈচৈ পড়ে গেছে, শেরপারাও এ তাঁবু থেকে ও তাঁবুতে দৌড়োদৌড়ি শুরু করেছে। আছে তো মোটে দু’জন শেরপা এখানে! মাত্র দু’জনকে নিয়ে লোড ফেরি চালু করে দেওয়ার কোনও মানেই হয় না। তারচেয়ে বরং কেবল আমাদেরই এগিয়ে যাওয়া উচিত এখন, শেরপা ছাড়া। মালপত্র নিজেদেরই বইতে হবে। তাহলে আগামীকালই দু’নম্বর ক্যাম্প স্থাপন করতে পারব আমরা। এ ব্যাপারে সবার মতামত জানতে চাওয়ায় সোৎসাহে রাজী হয়ে গেল সবাই; অন্তত দু’দিন সময় বাঁচবে জেনে মালপত্র বইতেও কারও আপত্তি নেই। আজীবা নিচের বেস ক্যাম্পে নেমে গিয়ে সেখানকার লোকজনকে এই এক নম্বর ক্যাম্পের রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে আসবে। এখানকার সমস্ত মালপত্র সঙ্গে নিয়ে আমরা সাহেবরা দু’নম্বর ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাব, তাই এক নম্বর ক্যাম্প ফের নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। আর সরকির জন্য একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। আমাদের শৃঙ্গজয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত সে অভিযানের অন্য সব সদস্যের কাছে বয়ে নিয়ে যাবে।

তাড়াতাড়ি একটা লম্বা কাগজ টেনে নিয়ে আমি লিখতে শুরু করলাম –

জরুরি বার্তা                                        

২৩.০৫.১৯৫০

এক নম্বর ক্যাম্প থেকে তুকুচা বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে প্রেরিত বিশেষ বার্তা (বার্তাবাহক সরকি)

এক নম্বর ক্যাম্পঃ অন্নপূর্ণা হিমবাহ

আমরা অন্নপূর্ণা শৃঙ্গজয়ের লক্ষ্যে বেরিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যদি আমরা মনস্থির করি যে এক দিনও, এমনকি এক ঘন্টাও সময় নষ্ট হতে দেব না, তাহলে সাফল্য আমাদের হাতের মুঠোয়।

কোজিঃ তুমি মোরেনের ওপরে যে বেস ক্যাম্পে আছ সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তুলে নিয়ে আরও এগিয়ে বসাও। আমরা যে পথে এসেছি সে পথে ঘন্টা দুয়েক এগোলে একটা বেশ বড়ো আর আরামদায়ক ক্যাম্প লাগাবার জায়গা পাবে, অন্নপূর্ণার উত্তর হিমবাহের মোরেনের ঢাল সেখানে উত্তর দিক থেকে নেমে ছড়িয়ে গিয়ে এক প্রায়-সমতল প্রান্তর তৈরি করেছে। সমস্ত মালপত্র নতুন বেস ক্যাম্পে নিয়ে এস। যতগুলো হাই অল্টিচিউড ইউনিট আছে সব এবং ওয়্যারলেস সেটটা ওপরে এক নম্বর ক্যাম্পে পাঠাও, যতটা পারো খাবারদাবার পাঠাও, সঙ্গে রেবুফত আর আমার রুকস্যাক দুটো আর টেরের ক্যাম্পিং বুটজোড়া পাঠাবে। (সরকিকে পনেরো টাকা দিও, আমার স্লিপিং ব্যাগের ইনারের মধ্যে পাবে। ইনার-টাও নিয়ে এসো কিন্তু।)

শ্যাজঃ তুমি যদি তোমার অনুসন্ধান পর্ব শেষ করে ফিরে এসে থাক তবে এক নম্বর ক্যাম্পটা ফের নতুন করে বসানোর দায়িত্ব নাও; কারণ ল্যাচেনাল, টেরে, রেবুফত আর আমি এক নম্বর ক্যাম্প তুলে এখানকার যাবতীয় জিনিসপত্র নিয়ে দু’নম্বর ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাব। এক নম্বর ক্যাম্প উত্তর হিমবাহের হিমানীপ্রপাতের ডান তীর বেয়ে উঠে হিমবাহের কিনারায়, নুড়িপাথরের একটা বড়ো স্তূপ বানিয়ে চিহ্ন রাখা আছে। যতটা পারো খাবারদাবার আর সাজসরঞ্জাম কোজির বেস ক্যাম্প থেকে এক নম্বর ক্যাম্পে তুলে আনো।

আইজ্যাকঃ তাড়াতাড়ি চলে এস। আমার কাছে শুধু একটা ছোট্ট ক্যামেরা আছে। ফিল্ম-টিল্ম সব নিয়ে এস, ওপরে আমার কাছেও পাঠাও। বেস ক্যাম্প অবধি কুলিরা আরামসে আসতে পারবে, সেখানে তোমার ফটোগ্রাফির সাজসরঞ্জাম আর ফিল্ম মজুত রাখতে পার।

অডটঃ যত শীঘ্র পারো আপৎকালীন ওষুধপত্র নিয়ে এক নম্বর ক্যাম্পে চলে এসো। অতিরিক্ত ওষুধপত্তর (বিশেষ করে ভারী জিনিস, যেমন অপারেশন ইত্যাদি করতে গেলে যেগুলো লাগবে) বেস ক্যাম্পে মজুত রাখার ব্যবস্থা করো।

নোয়েলঃ এই চিঠির সঙ্গে পর্বতারোহণের সাজসরঞ্জাম আর অন্যান্য জিনিসপত্রের একটা তালিকা পাঠালাম। জরুরি ভিত্তিতে, এক ঘন্টাও সময় নষ্ট না করে তালিকা অনুযায়ী সমস্ত জিনিস নিচের বেস ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। শেরপাদের জন্য সাম্পা কিম্বা চাল পাঠাও। তারপর ভবিষ্যতের জন্য আরও ১০ দিনের হাই অল্টিচিউড ক্যাম্পের রসদ এবং ৬ দিনের ট্রেকিং ক্যাম্পের রসদ প্রস্তুত রাখো, পরে কোনও শেরপা গিয়ে সেসব এখানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারবে। কাজ শেষ হলে নিচের বেস ক্যাম্পে চলে এস, ওখানেই থাকবে তুমি এখন। জি বি রানা এখানকার বেস ক্যাম্পেও আসতে পারে, তুকুচাতেও থাকতে পারে –সিদ্ধান্তটা ওর ওপরই ছেড়ে দিলাম।

আইজ্যাকঃ লুসিয়ান ডেভিসকে একটা টেলিগ্রাম করতে হবে – ‘১৬,৭০০ ফিট উচ্চতায় এক নম্বর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন রুটে অনুসন্ধান চালানোর পর অন্নপূর্ণার উত্তর হিমবাহ ধরে শৃঙ্গজয়ের লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখান থেকে গোটা রাস্তাই তুষার এবং কঠিন বরফে ঢাকা। আবহাওয়া অনুকূল। সবাই সুস্থ আছে। শৃঙ্গজয়ের ব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী। শুভেচ্ছা।’

                                         মরিস হারজগ

দীর্ঘ অনুসন্ধান পর্বের পর অবশেষে আমরা এবার অভিযানের চূড়ান্ত লক্ষ্যের পথে। কোনও সন্দেহ নেই খবরটা অভিযানের সমস্ত সদস্যকে উৎফুল্ল করে তুলবে। কিন্তু চিন্তা হচ্ছে চিঠিটা তুকুচা পৌঁছোতেই যে চার দিন লেগে যাবে! সরকিকে ব্যাপারটার গুরুত্ব যতটা পারি বুঝিয়ে বললাম। অন্নপূর্ণা শৃঙ্গের দিকে হাত দেখিয়ে বললাম, “অন্নপূর্ণা, এক্ষুনি বেরোচ্ছি আমরা, সব সাহেবরা, বুঝেছ?”

“হাঁ, সাহিব।”

তারপর চিঠিটা ওর হাতে ধরিয়ে দৌড়নোর ভঙ্গি করে বললাম, “যাও। তুকুচা। দৌড়ে যাও। তাড়াতাড়ি। যত তাড়াতাড়ি পারো। এটা সব সাহেবকে দেখাবে – কোজি সাহেব, ডাক্তার সাহেব, নোয়েল সাহেব – সবাই।”

সরকির মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। মনে হল চিঠিটার গুরুত্ব ও বুঝেছে। আমার চোখের ভাষা পড়েই ও ধরে ফেলেছে এটা কোনও সাধারণ চিঠি নয়; ওর কাছে আমার কী প্রত্যাশা তাও বুঝেছে। সরকি বুদ্ধিমান ছেলে। ও জানে আমাদের খাবারদাবার খুব অল্পই বেঁচে আছে আর, পাহাড়ে চড়ার সাজসরঞ্জামও সঙ্গে বেশি আনিনি। তাই এই মুহূর্তে শৃঙ্গের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়তে হলে খুব তাড়াতাড়ি তুকুচা বেস ক্যাম্প থেকে সরবরাহ আসা দরকার।

সরকি আমাদের শেরপাদের মধ্যে সবচেয়ে চটপটে আর বলিষ্ঠ। ওর এই তুকুচা যাত্রার ওপর অভিযানের অনেককিছু নির্ভর করছে। আমার সামনে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে। পা ফাঁক করে একটু ঝুঁকে দাঁড়ানোটা ওর অভ্যেস, মাথাটা নীল রঙের একটা উইন্ডচিটারের হুড দিয়ে ঢাকা, চোখে রোদচশমা।

“বেরিয়ে পড়ো। সাবধানে যেও। খুব জরুরি চিঠি এটা,” বলে আমি ওর হাত ধরে ঝাঁকিয়ে দিলাম। সরকি একমুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। ছোট ছোট বাক্যে আজীবার সঙ্গে দরকারি কথা সারতে সারতে তুরন্ত নিজের রুকস্যাক গুছিয়ে বেরিয়ে গেল। কয়েক মিনিট পরেই দেখি আজীবা আর ও হিমপ্রপাতের নিচের সেই বিশাল তুষারপ্রাচীরটার কোল ঘেঁষে নেমে চলেছে। একটু পরেই ওরা উত্তর হিমবাহের বিস্তীর্ণ মোরেনে হারিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে অন্নপূর্ণার দিকে দৃষ্টি ফেরালাম। প্রখর সূর্যালোকে স্নান করছে আজ হিমালয়। চারপাশে কোথাও কোনও ছায়া নেই। কিছুক্ষণ আগেই ঠান্ডায় কাঁপছিলাম, আর এখন গরমের চোটে ফেদার জ্যাকেট, সোয়েটার, শার্ট সমস্ত খুলে ফেলতে হল। দূরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ধৌলাগিরি, আর নীলগিরি শৃঙ্গকে মনে হচ্ছে একদম হাতের কাছে। বসে বসে অভিযানের প্রথম দিনগুলোর কথা ভাবছিলাম। কোথায় কোথায় না ঘুরে মরেছি আমরা – দাম্বুশ খোলা ধরে সেই প্রথম অনুসন্ধান, ধৌলাগিরির কোলে গুপ্ত উপত্যকা আবিষ্কার, সেই বিশাল বরফজমা তিলিচো হ্রদ, মানাংভোট উপত্যকা। হিমালয় সম্পর্কে যে ধারণা নিয়ে এসেছিলাম বাস্তবের সঙ্গে তার কত ফারাক! প্যারিসে বসে কতই না দুর্দান্ত সব পরিকল্পনা ভেঁজেছি আমরা! ‘হালকা হয়ে চলতে হবে’; ‘দ্রুত অভিযান, হালকা অভিযান; সময় যত কম লাগবে, রসদও তত কম লাগবে, মাল বইতেও হবে কম’। মূল চিন্তাধারাটা ছিল কী করে হিমালয় অভিযানে আলপাইন পদ্ধতি কাজে লাগানো যায়। সবাই আলোচনা করতাম, হিমালয় অভিযানে বিপদের আশঙ্কা তো কেবল তুষারধ্বস থেকে, তা কোনও গিরিশিরা ধরে উঠলেই চলবে! আর শেরপারাও যাতে সহজে উঠতে পারে কষ্ট করে খুঁজে খুঁজে এমন রুট বার করা বা তৈরি করার দরকারটা কী? আমরা উঠতে পারলেই তো হল! শেরপা নেওয়ার আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে কি? না নিলেই হয়। রুট খোঁজা, রাস্তা তৈরি, লোড ফেরি সব আমরাই করব না হয়। শেরপা নেই, ঝামেলাও নেই! এখন বুঝি, কী মূর্খের মতো সব ফন্দি আঁটতাম আমরা! গিরিশিরা ধরে উঠবে? প্রশ্নই নেই। শেরপা ছাড়াই অভিযান? বটে! মনে হয় না শেরপারা আছে বলে আমাদের দলের কারও মনে কোনও আক্ষেপ আছে! আর হালকা অভিযান, দ্রুত অভিযান? আল্পসের তুলনায় হিমালয় এতটাই বিশাল-বিপুল ব্যাপার, দূরত্ব উচ্চতা ইত্যাদি সবকিছু এতটাই বেশি বেশি যে, এখানে যে কোনও প্রধান শৃঙ্গে চড়তে গেলে পরপর বেশ কয়েকটা ক্যাম্প না বসিয়ে উপায় নেই। তাছাড়া পরিকল্পনা-পর্বে আমরা শৃঙ্গ অবধি পৌঁছনোর সঠিক রাস্তা খুঁজে বার করার ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দিইনি। একদল পর্বতারোহী হঠাৎ একদিন পৃথিবীর উচ্চতম পর্বতমালায় এসে উপস্থিত হল, যাদের মধ্যে একজন ছাড়া কেউ আগে হিমালয় চোখেই দেখেনি! আট হাজার মিটারের চেয়ে উঁচু একটা শৃঙ্গ জয় করার উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তারা টগবগ করে ফুটছে! ঝাঁপিয়ে তো পড়বে! কিন্তু কোন রাস্তায়? কোন দিক দিয়ে?

চারজন তৈরি হয়ে নিলাম আমরা – ল্যাচেনাল, টেরে, রেবুফত আর আমি। খাবারদাবার, সাজসরঞ্জাম, তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ যা পারা যায় সব চারজনের পিঠের বোঝায় ঢুকিয়ে বা বেঁধে নিলাম। একটা প্যাকিং বাক্স কেবল পড়ে রইল এক নম্বর ক্যাম্পে। কিছু মালপত্র, যা অদূর ভবিষ্যতে নিতান্তই দরকার নেই, রাখা রইল সেই বাক্সে। পাহাড়ে চড়ার সরঞ্জাম চারজনের মধ্যে ভাগাভাগি হল। দেখা গেল কারও পছন্দ আকারে ছোটোখাটো কিন্তু ওজনে ভারী মাল, কেউ আবার বড়সড় কিন্তু হালকা জিনিসের পক্ষপাতী। গড়ে একেকজনের বোঝার ওজন দাঁড়াল প্রায় ৪৫ পাউন্ড। হিমালয়ের এই উচ্চতায়, যেখানে সামান্য পরিশ্রমেই দম বেরিয়ে যায়, সেখানে এই বিপুল বোঝার ভারে ন্যুব্জ হয়ে পাহাড়ে চড়া যে কী কষ্টকর! রুকস্যাকের স্ট্র্যাপদুটো যেন কেটে বসে যাচ্ছে কাঁধে! মনে হচ্ছে বিশ্রাম না নিয়ে এভাবে পাঁচ মিনিটের বেশি একটানা হাঁটা একেবারেই অসম্ভব। যাই হোক, কষ্টেসৃষ্টে কোনওমতে এগোতে শুরু করলাম। দু’দিন সময় বাঁচাচ্ছি – মনে মনে সারাক্ষণ এই ভেবে বোঝার ভার লাঘব করার চেষ্টা চালাতে লাগলাম।

এক লাইনে চারজন নিজেদের মধ্যে দড়ি বেঁধে সামনের ঢালু তুষারাবৃত চাতালটা ধরে আস্তে আস্তে ওঠা শুরু করলাম। সূর্য একেবারে মাথার ওপরে এখন। রোদের তাপে হিমবাহের বুক গরম কড়াইয়ের মতো তেতে উঠেছে। সূর্যের প্রতিটা রশ্মি যেন তুষারে প্রতিফলিত হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। অচিরেই পথচলা একটা একঘেয়ে যন্ত্রণাবিশেষ হয়ে দাঁড়াল। ঘামে আর গরমে একেবারে নাজেহাল অবস্থা। থামতে হল একটু পরেই। আমি আর টেরে মুখে পুরু করে সানবার্ন লোশন মেখে নিলাম। ল্যাচেনাল আর রেবুফত স্লিপিং ব্যাগের সাদা পাতলা সুতির ইনার লাইনারটা বার করে মুখে মাথায় জড়িয়ে নিল। দুটো লক্ষ্মী প্যাঁচার মতো দেখাচ্ছিল ওদের। পরিস্কার দেখতে পাচ্ছিলাম মুখে-মাথায় কাপড় জড়িয়ে ওদের হাঁসফাঁস অবস্থা, কিন্তু ওরা বলল সানবার্ন লোশন মাখার চেয়ে ওটাই নাকি বেশি কাজ  দেয়!

এই অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে মনে হচ্ছে বুকে টেনে নেবার মতো একফোঁটা অক্সিজেনও নেই। বোঝার ভারে নুয়ে পড়া অবস্থায় শরীর-মনের সমস্ত শক্তি একত্র করে একটু একটু করে এগোতে হচ্ছিল আমাদের। হিমবাহের ঢালটার মাঝবরাবর পৌঁছে একটা পাথুরে অংশ পড়ল, ওটা বেয়ে উঠতে হবে এবার। মাথার ওপর কিছু বিশাল বরফের চাঙড় বিপজ্জনকভাবে ঝুলে থেকে আমাদের ভয় দেখাচ্ছে। দু’পাশে বরফের তৈরি শূলদন্ডের মতো খাড়া হয়ে আছে অসংখ্য আইসিকল; বরফের বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন হারে গলনের ফলে এরকম শূলের মতো খাড়া খাড়া দন্ডগুলি তৈরি হয়। সূর্যের আলো আইসিকলের জঙ্গলে পড়ে রামধনু তৈরি করেছে। টেরে আর আমি পালা করে রাস্তা তৈরি করতে করতে সামনে হাঁটছিলাম। বাকি দু’জন খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে মনে হল। আমাদেরও দমছুট অবস্থা। প্রচণ্ড হাঁপ ধরছে সবার। স্বাভাবিক! কারণ প্রায় ২০,০০০ ফিট উচ্চতায় পৌঁছে গেছি আমরা।

“আমাদের কি শেরপা পেয়েছে নাকি?” তেতো সুরে বলে ল্যাচেনাল।

“ঠিক। হিমালয় অভিযানে এসেছি কি গাধার মতো মাল বইব বলে?” রেবুফতও গজগজ করে।

টেরে তৎক্ষণাৎ জবাব দেয়, “একজন পর্বতারোহীর নিজের মালপত্র নিজে বইবার ক্ষমতা থাকা উচিত। বলতে পারো আমরা শেরপাদের মতোই দক্ষ পর্বতারোহী!”

ল্যাচেনাল তার আইস অ্যাক্সে ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ে হাঁপাচ্ছে। রেবুফত রুকস্যাকটা মাটিতে ফেলে দিয়ে তার ওপর বসেই পড়ল। পরিশ্রমে ওদের মুখগুলো বেগুনি হয়ে গেছে, দরদর করে ঘাম বইছে মুখ বেয়ে। সাধারণত ওরা অসন্তোষ বা ক্ষোভ সহজে প্রকাশ করে না, কিন্তু এখন দেখে মনে হচ্ছে রেগে গেছে খুব।

“এরকম মাল বয়ে বয়ে আমরা যদি নির্বোধের মতো সমস্ত শক্তি ক্ষয় করে ফেলি তবে কয়েক দিনের মধ্যেই আরও ওপরে গিয়ে সামাল দেব কী করে? ওপরে রুট ওপেন করবে কারা? তোমার পেয়ারের শেরপারা?”

টেরে রেগে লাল হয়ে গেল, “হুঃ, তোমরা আবার শ্যাময়ের গাইড বলে নিজেদের পরিচয় দাও! ছোঃ! আর বোলো না! হাসি পায়। তার চেয়ে স্রেফ ট্যুরিস্ট বলো, মানাবে। আবার হিমালয় অভিযানে এসেছেন!”

“তোমার তো যত ভারী বোঝা ঘাড়ে নিতে হয় তত ভালো! বেশ বীরত্ব দেখানো যাবে! দ্যাখো, আমি কত শক্তিমান!” ল্যাচেনাল ফোড়ন কাটে, “এরপর বলবে মাল বওয়াটাই হিমালয় অভিযানের আসল কাজ, সবচেয়ে উপভোগ্য কাজ! ব্যাটা ঘটোৎকচ! বুদ্ধির ঢেঁকি!”

“যদি মাল বওয়ার দরকার হয় তো বইতে হবে। ব্যস!”

পরিস্থিতি ঠান্ডা করার চেষ্টা করি আমি, “জানি সবারই কষ্ট হচ্ছে। ব্যাপারটা অসহ্য সন্দেহ নেই। কিন্তু ভেবে দ্যাখো, আমাদের পুরো দু’দিন সময় বেঁচে যাচ্ছে। যদি এই অভিযানে সফল হই আমরা, হয়তো দেখা যাবে আজ এই যে কষ্টটা করছি সে কারণেই সফল হলাম।”

রেবুফত বলল, “মাল বইতে তোমার আর টেরের অসুবিধে হচ্ছে না, আমাদের হচ্ছে।”

“তোমরা হলে গিয়ে সুপারম্যান!” ল্যাচেনাল বলে, “সত্যিকারের সব মাউন্টেনিয়ার! আমরা দীনদুঃখী গরীব মানুষ! ট্যুরিস্ট!”

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবার পর মনে হল ল্যাচেনাল আর রেবুফত একটু ঠান্ডা হয়েছে। পিঠে ভারী বোঝা নিয়ে ওই উচ্চতায় এই গরমে পাহাড়ে চড়ার অসহ্য পরিশ্রমের ফলস্বরূপ মনে যে ক্ষোভ জমা হয়েছিল আমার আর টেরের ওপর গায়ের ঝাল ঝেড়ে সে জ্বালা কিছু জুড়িয়েছে। ফের রওনা দিলাম আমরা। আমি আর টেরে দুই ‘সুপারম্যান’ পালা করে সামনে থেকে রাস্তা তৈরি করতে করতে এগিয়ে চললাম। অসম্ভব ক্লান্ত সবাই। অবসন্ন পদযুগল কোনওরকমে শরীরগুলোকে খাড়া করে রেখেছে। ধীর অনিয়মিত পদক্ষেপে প্রাণপণে এ অনন্ত দীর্ঘ পথ থেকে আরও কিছু গজ বা ফিট ছিনিয়ে নেওয়ার প্রয়াস! প্রতিমুহূর্তে বিশ্রাম নেবার বা আজকের মতো এখানেই থেমে পড়ার লোভ সম্বরণ করে চলা। প্রতিটি পদক্ষেপ যন্ত্রের মতো, দৃষ্টি সামনের লোকটার গোড়ালিতে স্থির। ভেতরে ভেতরে সবাই আমরা জানি যে টেরে যা বলেছে ঠিকই বলেছে, যদিও অতটা রুঢ় হওয়ার কোনও দরকার ছিল না ওর।

বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ মনে হচ্ছিল পেছন থেকে কার যেন চিৎকার শুনছি। এবারে একবার পরিষ্কার  শুনলাম। এ তো শ্যাজের গলা! ও যে রুটটার কথা বলেছিল সেটা তো এখানেই আমাদের রুটের সঙ্গে এসে মেলার কথা। এ শ্যাজ না হয়েই যায় না! ও কি আরও সহজ কোনও রাস্তা খুঁজে পেয়েছে? যাই হোক, বিশ্রাম নেবার একটা সুবর্ণসুযোগ পাওয়া গেল অবশেষে। আইস অ্যাক্সগুলো তুষারে অনেকটা গেঁথে ওতে রুকস্যাকগুলো হেলান দিয়ে রেখে বেশ আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা করে ফেললাম সবাই। কয়েকটা খাবারের টিন খোলা হল। তড়িঘড়ি যার যার জলের বোতল বার করল সবাই, কিন্তু অল্প কয়েক ঢোঁক, ব্যস! রাস্তা এখনও বাকি।

শ্যাজ এসে হাজির হল, সঙ্গে দু’জন শেরপা।

“যাক, ধরে ফেলেছি! উফফ, প্রচণ্ড ক্লান্ত আমি।”

শ্যাজের চোখেমুখে পরিশ্রম আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। আমাদেরও নিশ্চয়ই সেরকমই দেখাচ্ছে। তবে মানতে হবে শ্যাজ একা একাই দু’জন শেরপাকে নিয়ে এতদূর উঠে এসেছে।

“বলো, কী খবর?”

“যে রাস্তা ধরে এলাম সেটা মোটেই সুবিধের নয়। তোমাদের রুটটা যদি খুব গোলমেলে না হয় তো আমারটা বাদ দেওয়াই ভালো।”

“খুব শক্ত?”

“শক্ত তো বটেই, সেই সঙ্গে প্রচণ্ড বিপজ্জনক। যে উপগিরিশিরাটা বেয়ে উঠলে ভেবেছিলাম এই মূল হিমবাহের তুষারঢালটায় নামা যাবে, সেটার মাথায় উঠে দেখি একটা ছোট শাখা-হিমবাহে পৌঁছলাম। হিমবাহটা প্রচণ্ড খাড়াই আর যে কোনও মুহূর্তে ওপর থেকে তুষারধ্বস নেমে আসার সম্ভাবনা। কোনওরকমে একটা ছোট্ট জায়গায় কাল রাতে তাঁবু খাটিয়েছিলাম। তারপর আজ সকালে একটা খাড়া বরফের দেওয়ালের নিচ দিয়ে আসতে হল যার গায়ে বড় বড় বরফের চাঁই বিপজ্জনক ভাবে ঝুলে রয়েছে, মাথার ওপর শুধু ভেঙে পড়ার অপেক্ষা। তারপর আবার একটা সাঙ্ঘাতিক খাড়াই তুষারের ঢাল, সেটা বেয়ে উঠে এই চাতালে পৌঁছলাম। ওফফ, এই শেষ তুষারঢালটা যা খাড়া ছিল! লাখ টাকা দিলেও ও রাস্তায় আর নামছি না আমি…”

“তারপর?”

“তারপর মানে? একা একা আর কত করব? তারপর তোমাদের দেখতে পেলাম। কখন থেকে চিৎকার করছি তোমাদের ধরব বলে! খাবারদাবার সব শেষ, খিদেয় মরে যাচ্ছি, আর সেই থেকে খালি বকরবকর করিয়েই চলেছ! আবার বলে তারপর!”

খাবার তখন কোনওমতে সবে গরম করা হয়েছে। গোগ্রাসে খাওয়া শুরু করল শ্যাজ।

লাঞ্চ শেষ হওয়ার আগেই চারদিকে কুয়াশা ঘিরে এল। প্রতিদিনের মতো আজও মনে হচ্ছে বিকেলের দিকে আবহাওয়া ক্রমশ খারাপ হয়ে পড়বে।

“চলো, ফের এগোনো যাক,” টেরে উঠে দাঁড়াল।

দৃশ্যমানতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। সাদা কুয়াশায় সবকিছু অস্পষ্ট হয়ে এল। তারপর শুরু হল তুষারপাত। আন্দাজে আন্দাজে আমি আর টেরে যে রাস্তা তৈরি করে এগিয়ে চলেছিলাম সেটাই যে সবচেয়ে শর্টকাট তা নিশ্চয়ই নয়। তবে ওতে কিছু যায় আসে না। সন্ধের ভেতর এই বিশাল ঢালু তুষার-চাতালটার মোটামুটি মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছে আমাদের দু’নম্বর ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে, আর দেখতে হবে সে জায়গায় যেন তুষারধ্বসের ভয় না থাকে। বেশ জোর তুষারপাত শুরু হল, তাই স্যাক থেকে বার করে রেনকোট চাপাতে হল গায়ে, মাথা ঢাকতে হল হুডে। সামনে আমি, তারপর টেরে। আমরা এগোচ্ছিলাম ঠিকই তবে দিক ঠিক রাখতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। আশঙ্কা হচ্ছিল একই জায়গায় গোল হয়ে ঘুরে মরছি না তো? এ ধরনের পরিস্থিতিতে আগে সেরকমই হয়েছিল আমার একবার। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর বুঝলাম তুষারঢালটার মোটামুটি মাঝবরাবর পৌঁছে গেছি আমরা। তাই ঠিক হল, অনেক হয়েছে, আর নয়! যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানেই অন্তত আজ রাত্রের জন্য তাঁবু ফেলা হোক। এটাকেই আপাতত আমাদের দু’নম্বর ক্যাম্প বলা যাক।

একে একে দলের বাকিরা আর দু’জন শেরপা এসে উপস্থিত হল সেখানে, পিঠের বোঝা নামিয়ে রেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল সবাই। নিজেদের মধ্যে তাড়াতাড়ি একটা ছোট্ট আলোচনা করে ঠিক হল শেরপা দু’জনকে একা একা এই আবহাওয়ায় এক নম্বর ক্যাম্প অবধি ফিরে যেতে দেওয়া ঠিক হবে না। টেরে আজ পুরো ফর্মে আছে। সে বলল, “আমি যাচ্ছি ওদের সঙ্গে।”

বিকেল গড়িয়ে এসেছে। অবিরাম তুষারপাত হয়ে চলেছে তখনও। নেমে যাওয়ার জন্য ছটফট করছিল টেরে, কারণ আমাদের ওপরে উঠে আসার পায়ে চলা পথের চিহ্ন তুষারপাতের ফলে তখনই প্রায় আবছা হয়ে এসেছে। টেরে বলল, সে আজ এক নম্বর ক্যাম্পেই থেকে যাবে, শেরপা দু’জনকে পাঠিয়ে দেবে নিচে বেস ক্যাম্পে। এ দু’জন শেরপার সাহায্য পেলে বেস ক্যাম্প এগিয়ে আনার কাজে কোজির সুবিধে হবে। আর এক নম্বর ক্যাম্প থেকে নিচের বেস ক্যাম্প সহজ রাস্তা, সময়ও লাগে কম, শেরপা দু’জন একাই চলে যেতে পারবে। বেশ, ভালো কথা, কিন্তু এক নম্বর ক্যাম্পে তো তাঁবু-টাবু নেই কিছুই, সবই তো ওপরে নিয়ে এসেছি আমরা। টেরে থাকবে কীভাবে সেখানে? সে বলল, এক নম্বরে রেখে আসা প্যকিং বাক্সটায় সরকির স্লিপিং ব্যাগটা আছে, একটা রাত ও খোলা আকাশের নিচে সেই স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেবে।

“টেরে পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে গেছে!” ল্যাচেনাল তার মনোভাব প্রকাশে কোনও রাখঢাক করে না কখনও, “তুমি কী শহীদ হতে চাও? হিমালয় অভিযানে আত্মবলিদান করা বীর শহীদদের একজন! এই বরফের রাজ্যে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাবে? তার চেয়ে তুমিও শেরপাদের সঙ্গে বেস ক্যাম্প অবধি নেমে গেলে তো রাতটা আরামে ঘুমোতে পারতে, খাওয়াদাওয়াও ভালো পেতে। কী আর বলি! মোটা মাথার যত মোটা বুদ্ধি!”

রেবুফত মুখে কিছু বলল না, তবে হাবেভাবে পরিস্কার বুঝিয়ে দিল এ পাগলামির কোনও অর্থ হয় না। আমিও কিছু বললাম না আর। মাউন্টেনিয়াররা পাগলই হয়! পৃথিবীতে তাদের চেয়ে বেশি পাগল কোনও প্রজাতি নেই।

image-page10

(এরপর আগামী সংখ্যায়)

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s