ধারাবাহিক অভিযান অন্নপূর্ণা মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক শরৎ ২০১৮

  এই লেখার আগের পর্বগুলো              তাপস মৌলিকের সব লেখা

আমরা শৃঙ্গজয় করেছি শুনে রেবুফত আর টেরে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।

“কিন্তু ল্যাচেনাল কোথায়?” উদ্বিগ্নভাবে জিজ্ঞেস করল টেরে।

“এখুনি আসবে দেখ! ও তো আমার সামনে ছিল! বাপ রে বাপ, দিন গেল বটে একটা! সেই ভোর ছ’টায় বেরিয়েছি, একবারও থামিনি… অবশেষে দুপুর দুটোয় চুড়োয় পৌঁছলাম!”

কী বলব কিছু বুঝতে পারছিলাম না! কোনটা আগে, কোনটা পরে! এত কিছু বলার আছে, গুছিয়ে বলা মুশকিল! সকাল থেকে যে ঘোরের মধ্যে ছিলাম, পরিচিত মুখ দেখে সেটা কেটে গেল। এখন ফের আমি স্রেফ একজন পর্বতারোহী মাত্র।

আনন্দে টেরে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। আবেগের বশে আমার হাতদুটো জড়িয়ে ধরল সে। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল, “মরিস! এ কী অবস্থা তোমার হাতের!!”

তাঁবুর ভেতর এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। আমার গ্লাভস দুটো যে হারিয়েছি সে কথা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। হাতের আঙুলগুলো ফ্যাটফেটে সাদা হয়ে গেছে, জায়গায় জায়গায় গাঢ় বেগুনী হয়ে রক্ত জমে গেছে, কাঠের মতো শক্ত। টেরে আর রেবুফত অবিশ্বাসের চোখে হাতদুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। এর পরিণতি যে কী হতে চলেছে তা ওরা ভালোমতোই জানে। কিন্তু আমি তখন বাস্তবের মাটিতে নেই, আনন্দের বন্যায় ভেসে যাচ্ছি! টেরের দিকে ঝুঁকে পড়ে বললাম, “তুমি এত ফিট, এরকম দুর্দান্ত ফর্মে আছ, আমাদের সঙ্গে তুমিও যদি প্রথম শৃঙ্গে উঠতে পারতে কত ভালো হত বলো তো! তোমাকে সেদিন অত করে বললাম, শুনলে না!”

“অভিযানের স্বার্থে ওইসময় আমার যা করা উচিত বলে মনে হয়েছিল তাই করেছিলাম মরিস। যাক গে, এখন আর ওসব নিয়ে ভেবো না। তোমরা দু’জন শৃঙ্গজয় করেছ, এটা গোটা দলের জয়, আমাদের সবার কৃতিত্ব, পুরো অভিযানের সাফল্য।”

আমার চোখমুখ খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। টেরের এই একটা কথার মূল্য যে আমার কাছে কতখানি তা ওকে কী করে বোঝাই! শৃঙ্গে ওঠার পরে মনে যে আবেগটা এসেছিল সেটা ছিল একান্তই আমার, ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরনের আনন্দ। এতক্ষণে তা পূর্ণতা পেল। পবিত্র, কলুষমুক্ত আনন্দে ভরে গেল আমার হৃদয়। ঠিকই তো বলছে টেরে! এই জয় তো কারও একার সাফল্য নয়, ব্যক্তিগত গর্বের বিষয় নয়, এ জয় আমাদের সবার। এমনকি, এই জয় সমগ্র মানবজাতির জয়! টেরেই প্রথম সেটা হৃদয়ঙ্গম করেছিল।

“বাঁচাও! বাঁচাও!”

“ল্যাচেনালের গলা না?” টেরে আর রেবুফত বলে উঠল।

আমার তখনও ঘোর পুরো কাটেনি নিশ্চয়ই! বাস্তবের রুক্ষ্ম জমিতে আছড়ে পড়িনি তখনও! তাই আমার কানে কোনও আওয়াজই পৌঁছল না।

টেরের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। পর্বতারোহণে ল্যাচেনাল ওর বহুদিনের সঙ্গী। দু’জনে মিলে দুর্দান্ত সব শৃঙ্গারোহণ করেছে আল্পসে, একসঙ্গে বহুবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। তাড়াতাড়ি তাঁবুর দরজা ফাঁক করে মাথাটা বাইরে বার করে টেরে দেখল প্রায় একশো গজ নিচে বরফের ঢালের এক প্রান্তে ল্যাচেনাল কোনওমতে ঝুলে আছে।

বিদ্যুৎগতিতে তৈরি হয়ে টেরে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু বরফের ঢালটা তখন ফাঁকা। ল্যাচেনাল আর সেখানে নেই! কিছুক্ষণের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল টেরে, মুখ থেকে বেরিয়ে এল দুর্বোধ্য কিছু শব্দ। একটা জোরালো হাওয়ার ঝাপটা এল এইসময়। সাদা কুয়াশার চাদরটা ছিঁড়ে গিয়ে আরও কিছুদূর অবধি পরিষ্কার হল চোখের সামনে।

“ল্যাচেনাল! ল্যাচেনাল!”

কুয়াশার ফাঁক দিয়ে টেরে দেখতে পেয়েছে ল্যাচেনালকে। একশো গজ নয়, আরও অনেক নিচে একটা তুষারঢালের প্রান্তে ল্যাচেনাল পড়ে আছে। চারদিক সাদা হয়ে যাওয়া এরকম কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় প্রায়ই দৃষ্টিবিভ্রম হয়, দূরত্ব ঠিকঠাক আন্দাজ করা যায় না।

দাঁতে দাঁত চেপে পাগলের মতো সেই তুষারঢালের গা বেয়ে গ্লিসেড করে নামতে শুরু করল টেরে। কিন্তু থামবে কী করে ও? ঢালের ওপরের তুষারের আচ্ছাদন শক্ত হয়ে জমাট বেঁধে আছে। টেরে তো পায়ে ক্র্যাম্পনও বেঁধে যায়নি! কী করে ওই গতিতে পিছলে নামতে নামতে ব্রেক কষবে?

কিন্তু টেরে একজন অত্যন্ত দক্ষ স্কি খেলোয়াড়। তড়িৎগতিতে নামতে নামতে আইস অ্যাক্সের সাহায্যে হঠাৎ একটা বাঁক নিয়ে গতি কমিয়ে একেবারে ল্যাচেনালের পাশে গিয়ে থামল সে।

অতটা নিচে পড়ে গিয়ে কেমন এক অর্ধচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে তখন ল্যাচেনাল। হাতে আইস অ্যাক্স নেই, গ্লাভস নেই, মাথায় টুপিও নেই, একটা মাত্র পায়ে ক্র্যাম্পন বাঁধা। টেরের দিকে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সে। তারপর গোঙানির মতো বলতে শুরু করল, “আমার পায়ে তুষারক্ষত হয়ে গেছে, নিচে নিয়ে চলো আমায়… এক্ষুনি নামিয়ে নিয়ে চলো, অডটকে এখনই দেখাতে হবে পা’টা…”

“আজ আর সম্ভব নয়,” দুঃখের সঙ্গে মাথা নাড়ল টেরে, “দেখছ না তুষারঝড় চলছে! এখনই অন্ধকার হয়ে যাবে।”

কিন্তু পায়ের পাতা কাটা পড়ার আশঙ্কায় ল্যাচেনালের তখন প্রায় পাগলের মতো অবস্থা। মরিয়া হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে টেরের হাত থেকে আইস অ্যাক্সটা ছিনিয়ে নিয়ে সে নিচের দিকে নামা শুরু করল। খুব শিগগিরই অবশ্য সে বুঝল যে ব্যাপারটা অবাস্তব! আইস অ্যাক্স নামিয়ে তুষারঢালের ওপর ফের বসে পড়ল সে। তারপর টেরের পেছন পেছন এই পাঁচ নম্বর ক্যাম্পে ফিরে আসাই ঠিক করল।

তুষারঢালের গা বেয়ে ক্যাম্প অবধি পুরোটা রাস্তা টেরে আইস অ্যাক্সের সাহায্যে ধাপ কেটে দিল। ক্লান্ত বিধ্বস্ত ল্যাচেনাল সে পথ ধরে চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে তাঁবুতে উঠে এল। আমি এতক্ষণে বুঝতে পারলাম কেন ও নামার জন্য অত তাড়া দিচ্ছিল বা অত তাড়াতাড়ি নামার চেষ্টা করছিল। ওর উদ্দেশ্য ছিল আজই আরও নিচের ক্যাম্পে পৌঁছে যাওয়া।

ইতিমধ্যে আমি রেবুফতের সঙ্গে ওর তাঁবুতে ঢুকে পড়েছি। আমার হাতদুটোর অবস্থা দেখে রেবুফত খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। একটা ছোটো দড়ি অর্থাৎ স্লিং দিয়ে সে আমার হাতের আঙুলগুলো রগড়াতে শুরু করল। আমি নেশাগ্রস্তের মতো সারাদিন কী কী ঘটেছে সবিস্তারে ওকে শোনাতে শুরু করলাম। পা দুটো অসম্ভব ফুলে গেছিল আমার। অনেক কসরত করে জুতোজোড়া পা থেকে খুলে দিল রেবুফত, তারপর পায়ের পাতা দুটোও দড়ি দিয়ে রগড়াতে থাকল। আমাদের তাঁবু থেকে শুনেই বুঝতে পারলাম অন্য তাঁবুতে টেরেও তখন একই কায়দায় ল্যাচেনালের চিকিৎসা করে চলেছে।

টেরে আর রেবুফতের কাছে পরিস্থিতিটা খুবই বেদনাদায়ক। অন্নপূর্ণা শৃঙ্গ জয় করেছি আমরা, আট হাজার মিটারের চেয়ে উঁচু কোনও পর্বতশৃঙ্গে প্রথম আজ কোনও মানুষের পা পড়ল। আমাদের সবাই এর জন্য সর্বস্ব পণ করেছিলাম। তা সত্ত্বেও, আমাদের দু’জনের হাত-পায়ের পরিণতি দেখে টেরে আর রেবুফতের বিষণ্ণ হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না!

বাইরে হা হা শব্দে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে চলেছে, তুষারপাতও চলছে অবিরাম। কুয়াশা ক্রমে আরও গাঢ় হয়ে এল। অন্ধকার নামল। গত রাত্রের মতো আজও আমাদের তাঁবুর খুঁটি আঁকড়ে বসে থাকতে হল যাতে হাওয়ার দাপটে তাঁবু উড়ে না যায়। দুটোমাত্র হাওয়া-তোশক বা এয়ার ম্যাট্রেস ছিল আমাদের কাছে। সে দুটো ল্যাচেনাল আর আমায় দিয়ে টেরে আর রেবুফত দড়িদড়া, রুকস্যাক আর খাবারদাবারের প্যাকেটের ওপর বসে রইল। রক্তসঞ্চালন চালু করার জন্য দড়ি দিয়ে ওরা আমাদের হাত-পায়ে ক্রমাগত রগড়াল, চাপড়াল, চাবুকের মতো ঘা মারল। কখনও কখনও সেই ঘা অসাড় জায়গায় না পড়ে ওপরের স্বাভাবিক অংশে পড়ছিল। প্রচণ্ড ব্যথা লাগছিল। দুই তাঁবু থেকেই আর্তনাদ উঠছিল মাঝে মাঝে, একবার আমার তো আরেকবার ল্যাচেনালের। কিন্তু এ পদ্ধতি ছাড়া কোনও উপায়ও নেই আর। সহ্য করতে হবে। ধৈর্য আছে বটে রেবুফত-টেরের! অনেকক্ষণ রগড়ানির পর ক্রমশ আমাদের হাত-পায়ে সাড় ফিরতে শুরু করল, রক্ত চলাচল শুরু হল ফের।

টেরের প্রাণশক্তির যেন কোনও শেষ নেই। এর মধ্যেও সে গরম পানীয় তৈরি করতে বসল। বায়ুচাপ এখানে এতই কম যে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেই জল ফুটছে। স্যুপ তৈরি হলে হাঁক পাড়ল টেরে, তাঁবুর দরজার চেন ফাঁক করে পানীয়ভর্তি একটা মগ বাড়িয়ে ধরল, এ তাঁবু থেকে হাত বাড়িয়ে রেবুফত নিয়ে নিল সেটা। ওটুকু সময়ের মধ্যেই দু’জনের হাত তুষারপাতে পুরো সাদা হয়ে গেল! যাই হোক, গরম গরম স্যুপ খেয়ে ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম।

শুরু হল আরেকটি বিভীষিকাময় রাত। তীব্র হাওয়ার দাপটে প্রায়ই আমাদের তাঁবুদুটো থর থর করে কেঁপে উঠছিল। তুষারপাতেরও বিরাম নেই কোনও।

মাঝেমধ্যে পাশের তাঁবু থেকে কথাবার্তা ভেসে আসছিল। টেরে বিরামহীনভাবে ল্যাচেনালের হাত-পা মালিশ করে চলেছে, মাঝে মাঝে গরম পানীয়ও খাইয়ে চলেছে। আমার তাঁবুতে রেবুফত খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তবে সে দেখে আশ্বস্ত হল যে আমার হাত-পায়ে ফের সাড় ফিরে আসছে।

আমি প্রায় অর্ধচেতন অবস্থায় শুয়ে ছিলাম। সময়ের কোনও বোধই ছিল না। মাঝে মাঝে আমাদের সত্যিকার অবস্থাটা বুঝতে পেরে বেশ কৌতুক বোধ হচ্ছিল বটে, ভাবছিলাম পৃথিবীর প্রথম আটহাজারি শৃঙ্গজয়ী বীরদের কী অবস্থা দেখ! তবে বেশিরভাগ সময়ই মাথাটা একটা থকথকে জেলির মতো বোধবুদ্ধিহীন লাগছিল।

রাত বাড়ল। তুষার জমে জমে তাঁবুর ছাদটা নিচু হয়ে গত রাতের মতো যেন ধীরে ধীরে চেপে ধরল আমায়। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম! মাঝে মাঝে প্রকৃতির এই নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার মতো শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে দু’হাত দিয়ে চেপে ধরা ছাদটা ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছিলাম। অল্প কিছুক্ষণ সেরকম ঠেলে রাখার পরই পরিশ্রমে হাঁপ ধরে যাচ্ছিল, হাল ছেড়ে দিয়ে হাত দুটো নামিয়ে নিতেই ফের যে কে সেই! গত রাত্রের তুলনায় অবস্থা আজ আরও করুণ।

“রেবুফত! রেবুফত!” টেরের গলা শোনা গেল পাশের তাঁবু থেকে, “উঠে পড়ো, বেরোনোর সময় হয়ে গেছে।”

ওদের কথাবার্তা আমার কানে আসছিল, কিন্তু তার অর্থ কিছু আমার মগজে ঢুকছিল না। বাইরে কি আলো ফুটেছে? টেরে আর রেবুফত যে শৃঙ্গজয় করার চিন্তা মাথা থেকে একেবারে মুছেই ফেলেছে সেটা বুঝতে পারছিলাম। ওদের এই সিদ্ধান্তে একেবারেই বিস্মিত হলাম না, কিন্তু এ যে ওদের তরফে কত বড়ো স্বার্থত্যাগ সেটা বোঝার মতো ক্ষমতা তখন আমার ছিল না।

সকাল হতেই তুষারঝড় যেন দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের ছোট্ট তাঁবু দুটোর ওপর। তাঁবুর পাতলা নাইলনের আচ্ছাদন হাওয়ার ঝাপটায় ফতফত করে আওয়াজ করছিল, ছিঁড়ে না যায় শেষটা! গোটা তাঁবুই থর থর করে কাঁপছিল, যেন যে কোনও মুহূর্তে উড়ে যাবে। সকালবেলাটা তো আবহাওয়া সাধারণত পরিষ্কার থাকত! তবে কি বর্ষা এখানে পৌঁছে গেল? বর্ষা যে খুব দূরে নেই সেটা আমরা জানতাম। এই কি তবে তার প্রথম আক্রমণ?

“রেবুফত, তৈরি?” টেরে ফের জিজ্ঞেস করল।

“এক মিনিট,” রেবুফত উত্তর দিল। ওর কাজটা খুব সহজ নয়! আমাকে তখন ও জুতো পরিয়ে দিচ্ছিল। তারপর জামাকাপড় পরানো থেকে শুরু করে বাইরে বেরোনোর জন্য যা যা দরকার সবই ওকে করে দিতে হল, আমি একটা অবোধ শিশুর মতো পড়ে রইলাম। অন্য তাঁবুতে টেরেও ল্যাচেনালকে জামাকাপড় পরিয়ে তৈরি করল। ল্যাচেনালের পা দুটো এখনও ফুলে আছে, জুতো সে পায়ে ঢুকবে না। তাই দেখে টেরে তার নিজের জুতোজোড়া ল্যাচেনালের পায়ে পরিয়ে দিল। টেরের পা অনেক বড়ো, তার জুতো ল্যাচেনালের ফোলা পায়ে দিব্যি ফিট করে গেল। আর ল্যাচেনালের জুতো দুটো চারপাশে ছুরি দিয়ে চিরে নিজের পায়ে গলাল টেরে। আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে টেরে তার রুকস্যাকে একটা স্লিপিং ব্যাগ আর কিছু খাবারদাবার ভরে নিল, চিৎকার করে আমাদেরও তাই করতে বলল। তার সেই চিৎকার কি ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ে গেল? নাকি সেই নারকীয় জায়গাটা ছেড়ে নিচে নামতে আমরা এতটাই উদগ্রীব ছিলাম যে তার নির্দেশ কানেই তুলিনি?

ল্যাচেনাল আর টেরে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে।

“নিচে নামছি আমরা,” চিৎকার করে বলল ওরা।

আমার আর ওর কোমরের মধ্যে রেবুফত একটা দড়ি বেঁধে নিল, বেরিয়ে পড়লাম আমরাও। আমাদের চারজনের জন্য কেবল দুটো আইস অ্যাক্স ছিল, স্বাভাবিকভাবেই টেরে আর রেবুফত সে দুটো হাতে নিল। পাঁচ নম্বর শিবির ছেড়ে নেমে যাওয়ার সময় এত দামি দামি সাজসরঞ্জাম আর তাঁবু এখানে এভাবে ফেলে যেতে হচ্ছে বলে খুব লজ্জা করছিল। উপায় নেই!

টেরে আর ল্যাচেনাল ততক্ষণে অনেকটা নেমে গেছে। ঝোড়ো হাওয়ায় বয়ে আসা তুষারকণার ঝাপটা চোখেমুখে এসে লাগছে, পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না কিছুই। ঝড়ের দাপটে এক গজ দূর থেকেও একে অন্যের কথা কিছু শোনা যাচ্ছে না। প্রচণ্ড ঠান্ডা, তাই ফেদার জ্যাকেট গায়ে চাপিয়েই বেরিয়ে পড়েছি আমরা। তবে তুষারঢালটার যা অবস্থা, গ্লিসেড করে – অর্থাৎ কোমর ও পিঠ বরফের ওপর রেখে আধশোয়া অবস্থায় পিছলে নামার পক্ষে একেবারে আদর্শ। সঙ্গের দড়িটা খুবই কাজে আসছিল।

এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে টেরে আর ল্যাচেনাল নেমে চলেছিল। ল্যাচেনাল আগে আগে, তাড়াতাড়ি নিচে নামার জন্য আজও সে মরিয়া, পেছন পেছন টেরে দড়ি ধরে সতর্কভাবে ল্যাচেনালের ওপর নজর রাখছিল। যে পথে আমরা উঠে এসেছি তার কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেল না, সব নতুন তুষারে ঢেকে গেছে। তবে রাস্তাটা সবার মনেই গেঁথে আছে – তুষারঢাল ধরে প্রথমে চারশো গজ নিচে নেমে যেতে হবে সোজা, তারপর বাঁদিকে দেড়শো-দুশো গজ আড়াআড়ি গেলেই চার নম্বর শিবির। তুষারপাত একটু হালকা হল, ঝড়ের দাপটও কমল কিছু। আবহাওয়া কি তবে পরিষ্কার হতে চলেছে? বিশ্বাস করতে ভরসা হয় না।

নামতে নামতে একটা খাড়া বরফের দেওয়ালের সামনে এসে পৌঁছলাম।

“এবারে বাঁদিকে,” বললাম আমি, “পরিষ্কার মনে আছে আমার।”

আমাদের মধ্যেই কেউ একজন বলল, “না, ডানদিকে।”

কিছু বুঝতে না পেরে আরও নেমে চললাম আমরা। হাওয়া একদম বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু তুষারপাত ফের বাড়ল। আকাশ থেকে বড়ো বড়ো পাখির পালকের মতো ভাসতে ভাসতে তুষার নেমে আসতে লাগল। কুয়াশা ঘন হয়ে এল। নিজেদের মধ্যে যাতে ছাড়াছাড়ি না হয়ে যায় সে জন্য চারজন একসঙ্গে এক লাইনে চলা শুরু করলাম। আমি রইলাম তৃতীয় স্থানে। সবার প্রথমে থাকা ল্যাচেনালকে প্রায় দেখতেই পাচ্ছিলাম না। এই আবহাওয়ায় রাস্তা চিনে চলা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। পর্বতারোহী হিসেবে আমরা চারজনই বেশ অভিজ্ঞ। সেই অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে এরকম দুর্যোগে এমনকি চেনা জায়গাতেও রাস্তা ভুল হতে পারে। দূরত্ব ঠিকঠাক আন্দাজ করা যায় না। এমনকি সামনের রাস্তা ওপরে উঠছে না নিচে নামছে তাও অনেকসময় বোঝা যায় না। অনেক জায়গাতেই গর্ত আছে ভেবে পায়ে কালো বোল্ডারের ঠোক্কর খেলাম। গাঢ় সাদা কুয়াশা, অবিশ্রান্ত ঝরে পড়া সাদা তুষারকণা, চতুর্দিকের পাহাড়ঢালে সাদা তুষারের আচ্ছাদন – সব মিলে একটা সাদা গোলকধাঁধায় আমাদের দৃষ্টি বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে মরতে লাগল। চারদিকের উঁচু উঁচু বরফখন্ডের আবছা অবয়বগুলো যেন সাদা আলখাল্লা পরা ভূতের মতো হাত ধরাধরি করে আমাদের ঘিরে নেচে চলেছে!

তবে আমরা যে একেবারে হারিয়ে গেছি তা নয়। নিশ্চয়ই আরও নিচে নামতে হবে আমাদের, একটা অদ্ভুত দেখতে বরফের চাঁই আছে যেখান থেকে বাঁদিকে আড়াআড়ি যেতে হবে। চাঁইটার কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে। ফেদার জ্যাকেটগুলোর ওপর তুষার পড়ে আমাদেরও একেকজন সাদা ভূতের মতো দেখাচ্ছে, সাদা অন্ধকারের মধ্য দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে চলেছে। মাঝে মাঝেই তুষারে কোমর অবধি ডুবে যাচ্ছিলাম। এরকম ক্লান্ত বিধ্বস্ত অবস্থায় ওর চেয়ে খারাপ আর কিছু হয় না।

আমরা কি বেশি নিচে নেমে এলাম? নাকি আরও নামতে হবে? কেউই কিছু বলতে পারল না। বাঁদিক ধরে কোনাকুনি নামলে বরং ভালো হত। এখানকার ঢালে তুষারের অবস্থা মোটেই ভালো নয়, খুব বিপজ্জনক। স্বীকার করতে বাধ্য হলাম যে আমরা ঠিক রাস্তায় আসিনি। তাই নিজেদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে ফের কিছুটা ওপরে উঠে আমাদের ঠিক মাথার ওপর যে বিশাল বরফের চাঁইটা ছিল তার পেছনে উঠে এলাম। এবারে নিশ্চয়ই আমরা চার নম্বর শিবিরের সমান উচ্চতায় আছি।

রেবুফত তুষার সরিয়ে রাস্তা করে আগে আগে চলছিল। আমি কোনও কথা না বলে অতি কষ্টে তার পেছন পেছন শরীরটাকে টেনেহিঁচড়ে এগিয়ে নিয়ে চলেছিলাম। এত সহজে হার মানলে তো চলবে না! এর শেষ দেখতে হবে। তবে রেবুফত যদি হঠাৎ পড়ে যেত তাহলে দড়ি ধরে ওকে আটকানোর শক্তি আমার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না।

চোয়াল শক্ত করে এক বরফের চাঁই থেকে আরেক বরফের চাঁই ঘুরে মরছিলাম আমরা। প্রতিবারই মনে হচ্ছিল, এই তো, সেই বরফের চাঁইটা দেখা গেছে এতক্ষণে, ওটার কাছে গেলেই রাস্তা চেনা যাবে, আর প্রতিবারই কাছে গিয়ে হতাশ হতে হচ্ছিল। এক মুহূর্তের জন্যও কুয়াশার চাদরটা একটু সরত যদি! তুষারপাতটাও যদি বন্ধ হত একটু! অবিরাম তুষারপাতের ফলে বরফের ঢালে নরম তুষারের আচ্ছাদন ক্রমশ গভীর হয়েই চলেছে। অনেকটা করে ডুবে যাচ্ছি তুষারের মধ্যে। আমাদের মধ্যে কেবল টেরে আর রেবুফতেরই তুষার সরিয়ে রাস্তা বানিয়ে চলার ক্ষমতা ছিল। ওরা পালা করে আগে আগে চলল। একজন ক্লান্ত হয়ে পড়লেই কোনও কথা না বলে অন্যজন তার জায়গা নিচ্ছিল।

দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাচ্ছিল রেবুফত। এই হার-না-মানা মনোভাবের জন্যই সে বিখ্যাত। সহজে সে হাল ছাড়বে না! এত ধীরে ধীরে সে এগোচ্ছিল যে একজন শিক্ষানবিশ পর্বতারোহীও দেখে হাসবে! কিন্তু সে থামবে না কিছুতেই। এই দৃঢ়সংকল্পের কাছে হার মেনে একটু একটু করে পর্বত তাকে রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছিল।

টেরে আবার সম্পূর্ণ অন্যরকম। নিজের পালা এলেই সে পাগলের মতো সামনে এগিয়ে গিয়ে আইস অ্যাক্সের দমাদ্দম এলোপাথাড়ি ঘায়ে মুহূর্তে অনেকটা রাস্তা তৈরি করে ফেলছিল, তারপর দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছিল। অসীম শক্তি ওর গায়ে! মানসিক জোরও কম নয়। ভাব দেখে মনে হচ্ছিল, যে কোনও মূল্যে এক্ষুনি এই বরফের খাঁচা ভেঙে বেরোতে পারলে বাঁচে সে! ল্যাচেনাল ক্রমাগত টেরেকে বিরক্ত করে চলেছিল। ওর মাথাটা গেছে! ওর বক্তব্য, আর এগিয়ে কোনও লাভ নেই, এখানেই বরফের মধ্যে একটা গর্ত খুঁড়ে সবাই মিলে ভেতরে ঢুকে আবহাওয়া ভালো হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকি। টেরেকে সমানে পাগল-ছাগল ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করে চলেছে সে। টেরে ছাড়া আর কারও কম্ম নয় ওকে সামলানো। কোমরে বাঁধা দড়িটা ধরে টানতে টানতে টেরে এগিয়ে যাচ্ছে, ল্যাচেনাল বাধ্য হচ্ছে পেছন পেছন যেতে, তবে সমানে গজগজ করে চলেছে।

মানতে বাধ্য হলাম সত্যিই আমরা পথ হারিয়েছি, এবং বেশ ভালোমতোই গুলিয়ে ফেলেছি। আবহাওয়া পরিষ্কার হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ আগেও সবার মাথায় নানারকম বুদ্ধি খেলছিল – এদিকে দেখলে হয়, ওদিকে গেলে কেমন হয় ইত্যাদি। এখন সবাই চুপ। এদিকে না ওদিকে? কিছুক্ষণ এধার ওধার আন্দাজে ঘোরাঘুরি করা গেল যদি অলৌকিক কোনও উপায়ে রাস্তার খোঁজ মেলে, ধীরে ধীরে সে আশাও কমে এল। দলের চারজনের মধ্যে যে দু’জন সুস্থ সদস্য, রাস্তা খুঁজে বার করার বেপরোয়া চেষ্টায় কান্ডজ্ঞান হারিয়ে তারাও শিশুসুলভ সব ভুল করতে শুরু করল। টেরে এক পায়ে ক্র্যাম্পন ঢিলে হয়ে যাওয়া অবস্থায় কিছু তুষারধ্বসপ্রবণ এবং অত্যন্ত খাড়াই ঢাল ধরে আড়াআড়ি কিছুটা করে এগিয়ে দেখল। রেবুফতও ব্যালেন্সের খেল দেখিয়ে প্রচণ্ড খাড়াই কিছু তুষারঢাল বেয়ে উঠে-নেমে দেখল।

চার নম্বর শিবির যে বাঁদিকে সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এ ব্যাপারে দেখা গেল সবাই একমত। কাস্তে হিমবাহের একেবারে প্রান্তে ছিল সেটা, কিন্তু খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। একটা বিশাল বরফের চাঁইয়ের খাড়া দেওয়াল আর একটা বরফাবৃত গিরিশিরা হাওয়া থেকে ক্যাম্পটা সুন্দর আড়াল করে রেখেছিল। এখন সেই খাড়াই বরফের দেওয়াল আর গিরিশিরাটাই আমাদের শত্রু হয়ে দাঁড়াল, কারণ ক্যাম্পটাকে ওগুলোই দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রেখেছে। এরকম কুয়াশার মধ্যে ক্যাম্পের এক্কেবারে কাছে বা ওপরে না পৌঁছোলে সেটা খুঁজে পাওয়ার কোনও জো নেই।

আমরা যদি চিৎকার করি তাহলে হয়তো ক্যাম্পের কারও কানে পৌঁছোতে পারে। ল্যাচেনাল চিৎকার করে উঠল। কিন্তু চারদিকের তুষার শব্দ শুষে নিচ্ছে। ওর আওয়াজ বোধহয় কয়েক গজ দূরেও পৌঁছোল না। এবারে চারজন একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলাম আমরা, “এক… দুই… তিন… বাঁচাও!” মনে হল আওয়াজটা অনেকদূর গেছে। তাই আবার, “এক… দুই… তিন… বাঁচাও!” কোনও দিক থেকে কোনও উত্তর নেই!

মাঝে মাঝে জুতোজোড়া খুলে ফেলে টেরে তার পায়ের পাতা মালিশ করছিল। আমাদের হাত-পায়ের অবস্থা ওকে তুষারক্ষতের বিপদ সম্পর্কে আরও সচেতন করে তুলেছে। ল্যাচেনালের মতো ওকেও তাড়া করে ফিরছিল পা বাদ যাবার আশঙ্কা। আমার অবশ্য অনেক দেরি হয়ে গেছে! গত রাতে রেবুফতের মালিশের ফলে হাত-পায়ে একটু সাড় ফিরেছিল, আজ আবার সব অবশ হয়ে আসছে।

গত রাত্রের পর থেকে কিচ্ছু খাইনি আমরা। কাল সারাদিনও মুখে দিইনি প্রায় কিছুই। আর দু’দিন যাবত সমানে হেঁটেই চলেছি। মৃত্যুর মুখোমুখি পড়লে মানুষের শক্তির ভাণ্ডার যেন অফুরন্ত বলে মনে হয়। যখন মনে হয় সব ক্ষমতা শেষ, আর পারব না, তখনও কিছু না কিছু শক্তি ঠিকই সঞ্চিত থাকে। তবে সেটা টেনে বার করতে সাংঘাতিক মনের জোর দরকার হয়।

সময় গড়িয়ে চলল। আমাদের অবশ্য কোনও বোধ ছিল না তার। রাত নেমে আসছে। আতঙ্কের সঙ্গে দেখলাম অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিক, যদিও এ নিয়ে একটা কথাও উচ্চারণ করল না কেউ। আমার আর রেবুফতের একবার মনে হল রাস্তাটা যেন খুঁজে পেয়েছি, যেন চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু কিছুটা এগিয়ে প্রচণ্ড খাড়াই এক বরফঢালের মাথায় পৌঁছে থামতে হল। কুয়াশার মধ্যে মনে হচ্ছিল ঢালটা যেন খাড়া পাতালে নেমে গেছে। পরদিন বোঝা গেছিল যে সেই মুহূর্তে আমি আর রেবুফত চার নম্বর শিবিরের ঠিক ওপরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম! যেখানে পৌঁছোতে পারলে আমরা হাতে স্বর্গ পেতাম, সেই চার নম্বর ক্যাম্পকে বরফের ওই খাড়া দেওয়ালটাই আড়াল করে রেখেছিল।

“তাড়াতাড়ি একটা ফাটল খুঁজে বার করতে হবে, যে করে হোক।”

“ঠিক, সারা রাত তো এভাবে বাইরে বসে থাকা যাবে না!”

“একটা গর্ত! স্রেফ একটা গর্ত! সবাই ওর ভেতর ঢুকে বসে থাকব!”

“হ্যাঁ, আর সবাই মিলে মরব গর্তের ভেতর, একসঙ্গে!!”

ঝুপ করে রাত নেমে গেল। এক্ষুনি কোনও একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক মিনিটও নষ্ট করার সময় নেই। এই খোলা তুষারঢালের ওপর সারা রাত যদি বসে থাকি তাহলে সকাল হওয়া অবধি বাঁচব না কেউ। বরফের মধ্যে গর্ত খুঁড়ে তার ভেতরেই কাটাতে হবে মনে হচ্ছে – পর্বতারোহণের পরিভাষায় যাকে বলে ‘বিভোয়া’ (Bivouac) করা। ব্যাপারটা কেমন হবে ভেবেই সবার রক্ত জল হয়ে যাচ্ছিল। ২৩,০০০ ফিটের ওপরে এই তুষারপাতের মধ্যে ‘বিভোয়া’ করা!!

আইস অ্যাক্সের সাহায্যে টেরে একটা গর্ত খুঁড়তে শুরু করল। ল্যাচেনাল তুষারে বুজে থাকা একটা ফাটলের ওপর কয়েক গজ এগিয়ে গেল, তারপর হঠাৎ তীক্ষ্ণ একটা চিৎকার করে আমাদের চোখের সামনে থেকে বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেল। আমরা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। টেরে আর ল্যাচেনালের মধ্যে বাঁধা দড়িটা ল্যাচেনালের সঙ্গে সর সর করে অনেকটা ফাটলের মধ্যে ঢুকে গেল। ওই দড়ি টেনে ল্যাচেনালকে ফাটল থেকে উদ্ধার করার মতো শক্তি কি টেরে আর রেবুফতের মধ্যে অবশিষ্ট আছে এখনও? ফাটলটা পুরোটাই তুষারে ঢেকে আছে, কেবল একজায়গায় ছোট্ট একটা ফুটো হয়েছে যার মধ্য দিয়ে ল্যাচেনাল পড়েছে।

“ল্যাচেনাল! শুনতে পাচ্ছ?” টেরে চিৎকার করে উঠল।

নিচ থেকে বহু বরফ আর তুষারের স্তর পেরিয়ে একটা জড়ানো কন্ঠস্বর আমাদের কানে এসে পৌঁছল। কিন্তু সেটা কী বলতে চাইছে কিছু বোঝা গেল না।

“ল্যাচেনাল,” টেরে দড়িটা ধরে প্রবল একটা ঝাঁকুনি দিল।

“আমি এখানে,” এবারে পরিষ্কার শুনতে পেলাম।

“হাড়গোড় কিছু ভেঙেছে?”

“না! চমৎকার জায়গা। আজ রাতের জন্য একদম ঠিকঠাক। চলে এসো সবাই।”

রাত্রের এই আস্তানাটা যেন ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতো স্বর্গ থেকে নেমে এল। ওটা না পেলে যে কী হত! চারজন রাত কাটাতে পারে সেরকম বড়ো একটা গর্ত খোঁড়ার মতো শক্তি তখন আমাদের কারও মধ্যেই অবশিষ্ট ছিল না। বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে টেরে ফাটলটার মধ্যে ঝাঁপ দিল, তার জোরালো গভীর গলায় ‘চলে এসো’ চিৎকার শুনে বোঝা গেল সেও ভালোভাবেই নিচে পৌঁছেছে। এরপর আমার পালা। গর্তটার মুখের কাছে গিয়ে শরীরটা ছেড়ে দিলাম আমি। প্রায় তিরিশ ফিট গভীর একটা প্রচণ্ড খাড়া আর প্যাঁচানো সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে পিছলে বিদ্যুৎগতিতে গর্তটার নিচে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। তারপর কোমরে বাঁধা দড়িতে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে রেবুফতকে বুঝিয়ে দিলাম সেও এবার চলে আসতে পারে।

খুবই ছোটো গর্তটা, আমাদের চারজনের জড়াজড়ি করে বসে থাকার মতো জায়গাটুকুই শুধু ছিল। ভেতরে প্রচণ্ড ঠান্ডা, শরীরে কাঁপুনি ধরে গেল। চারপাশে বরফের ভিজে স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল, মেঝেতে কার্পেটের মতো বিছিয়ে রয়েছে সদ্য পড়া নরম তুষার। মাথার ওপর থেকে শক্ত বরফের লম্বা লম্বা শলাকা ঝুলে আছে। কয়েকটা শলাকা ভেঙে সোজা হয়ে বসার মতো জায়গা করতে হল। শলাকার কিছু ভাঙা টুকরো মুখে পুরে চুষে চুষে তৃষ্ণা নিবারণের কাজও হল কিছুটা। বহুক্ষণ পর জল খেতে পেলাম!

তো, এই হল আমাদের সে রাতের আশ্রয়! যাই হোক না কেন, অন্তত হাওয়ার দাপট থেকে তো নিস্তার পাওয়া গেল! ভিজে স্যাঁতসেঁতে ভাবটা খুবই বিরক্তিকর হলেও গর্তের ভেতর তাপমাত্রা মোটামুটি সমানই থাকবে। নিকষ অন্ধকারের মধ্যে যতটা পারা যায় গুছিয়ে বসলাম চারজন। ‘বিভোয়া’-র নিয়ম অনুযায়ী জুতোজোড়া খুলে ফেললাম সবাই, নইলে নড়াচড়া করতে না পেরে অচিরেই পায়ের আঙুলগুলো তুষারক্ষতের গ্রাসে চলে যাবে। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন টেরে রুকস্যাকে ভরে যে স্লিপিং ব্যাগটা নিয়ে এসেছিল, সেটা খুলে তার ওপর অপেক্ষাকৃত আরামে বসল। যার কাছে যা গরম জামাকাপড় ছিল সব চাপিয়ে নিলাম গায়ে। মেঝের তুষারের ছোঁয়া বাঁচাতে আমি বসলাম সিনে ক্যামেরাটার ওপর। আইজ্যাক যদি দেখত! চারজন জড়াজড়ি করে বসা হল, যাতে নিজেদের শরীরের তাপ যতটা সম্ভব নিজেদের মধ্যেই থাকে, কিন্তু এক মুহূর্তও স্থির হয়ে বসতে পারছিলাম না কেউই।

কারও মুখে কোনও কথা নেই। কথা বলার চেয়ে ইঙ্গিতে বোঝাতে পারলে শক্তিক্ষয় অনেক কম হয়! সবাই যে যার নিজের ভাবনার গভীর অতলে তলিয়ে গেলাম। এর মধ্যেও টেরে ল্যাচেনালের পা মালিশ করে চলেছে। রেবুফতের মনে হল তার পা দুটোও জমে যাচ্ছে, তবে নিজের পা নিজে মালিশ করার মতো শক্তি তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল। আমি চুপচাপ চোখ বুজে বসে রইলাম। আমার হাত-পাও জমে যাচ্ছিল ফের, কিন্তু কী আর করা! চেতনা অবশ করে দেওয়া মারাত্মক ঠান্ডা ধীরে ধীরে আমাদের ওপর তার আধিপত্য বিস্তার করে চলল। আমি দুঃখকষ্ট, জ্বালাযন্ত্রণা, সময়, ঠান্ডা সবকিছু ভুলে মাথাটা পুরো খালি করে দেবার চেষ্টা চালাতে থাকলাম।

টেরে নিজের স্লিপিং ব্যাগটা ল্যাচেনালের সঙ্গে ভাগ করে নিল, ল্যাচেনালের হাত-পাগুলো স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে সমানে মালিশ করে চলল। ‘তুষারক্ষত যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে সে চেষ্টা তো করা যাক অন্তত!’ ভাবছিল সে।

অন্য তিনজনকে বিরক্ত না করে কারও পক্ষে একটু নড়াচড়া করাও সম্ভব হচ্ছিল না। বারে বারেই আমাদের বসার কায়দা বদলে যাচ্ছিল তাই। কীভাবে বসলে সবচেয়ে আরাম হয় সে খোঁজেই ব্যস্ত রইলাম চারজন! রেবুফত ক্রমাগত ওর পায়ের ব্যাপারে অভিযোগ জানিয়ে যাচ্ছিল, মালিশও চালিয়ে যাচ্ছিল সমানে। টেরের মতো সে হয়তো ভাবছিল, ‘শুধু কালকের কথা ভাবো, কাল কী হবে! তারপর যা হয় দেখা যাবে!’ কিন্তু ‘তারপর’ ব্যাপারটা যে একটা বড়ো জিজ্ঞাসা চিহ্ন হয়ে উঠেছে, সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিল সেও।

টেরে উদারভাবে ওর স্লিপিং ব্যাগের কিছুটা অংশ হাত-পা ঢাকার জন্য আমায় বাড়িয়ে দিল। আমার অবস্থা যে কতটা গুরুতর সেটা ও বুঝেছে। ও জানে, কেন আমি আর কোনও কথা বলছি না, কেন চুপ মেরে গেছি। নিজের ব্যাপারে সমস্ত আশা যে আমি ছেড়ে দিয়েছি, সেটা ও অনুভব করেছে। প্রায় দু’ঘন্টা ধরে ও আমার হাত-পা মালিশ করে দিল। ওর নিজের পাও নিশ্চয়ই জমে যাচ্ছিল, কিন্তু সেদিকে কোনও নজরই দিল না সে। ওর এই নিঃস্বার্থ মনোভাব দেখে আমার বুকে ধীরে ধীরে আবার সাহস ফিরে এল। ও আমার জন্য এত কিছু করছে, এরপর বাঁচার জন্য চেষ্টা না করাটা অন্যায় হবে! কিন্তু ততক্ষণে আমার হৃৎপিণ্ডটাও যেন একতাল বরফ হয়ে গেছে! ব্যথাবেদনার কোনও অনুভূতিই আর আমার নেই। জাগতিক কোনও ব্যাপারস্যাপার আর স্পর্শ করছিল না আমায়। মাথাটা যথেষ্ট পরিষ্কারই ছিল, কিন্তু মনে হচ্ছিল যেন চাঁদের আলোয় মেঘের ভেলায় চড়ে নিশ্চিন্তে আকাশে ভেসে চলেছি। চারদিকে কী গভীর প্রশান্তি! কিছুটা প্রাণশক্তি তখনও আমার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল, সময় যত গড়িয়ে চলল ততই তা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসতে লাগল। টেরের মালিশে আর কোনও কাজ হচ্ছিল না। মনে হল, এই শেষ! মন্দ কী? হিমালয়ের বুকে চিরতুষারের নিচে এরকম কবর ক’জনের ভাগ্যে জোটে? কোনও দুঃখ নেই আমার, নেই কোনও আপশোশ। একজন পর্বতারোহীর কাছে এই মৃত্যুই তো সবচেয়ে কাঙ্খিত! আমার স্বর্গেই আমি থেকে যাব চিরকাল। আহ, কী অপার শান্তি! মৃত্যু আমায় কোনও কষ্ট দেয়নি, দুঃখ দেয়নি – এই ভেবে মনটা পুলকিত হয়ে উঠল।

কয়েক ঘন্টা পর, একজন কারও অস্ফুট গলায় শুনলাম, “সকাল হয়েছে।” অন্য সবার মধ্যে একটা নড়াচড়া অনুভব করলাম। আমার একটু অবাক লাগল! এত নিচে এই গর্তের মধ্যে দিনের আলো পৌঁছোতে পারে সেটা আমি কল্পনা করিনি!

“এত ভোরে বেরোনো ঠিক হবে না, আরও অপেক্ষা করা যাক,” বলল রেবুফত।

আবছা একটা নরম আলো গর্তটার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, তাতে কেবল অন্যদের অবয়বটা অস্পষ্টভাবে দেখতে পেলাম। এই সময়ই শুনলাম সেই অদ্ভুত আওয়াজটা। অনেক দূর থেকে একটা টানা হিস হিস শব্দ ক্রমশ কাছে এগিয়ে এল, যত কাছে এল তত তার তীব্রতা বাড়ল। তারপর হঠাৎ ওপর থেকে হুড়মুড় করে আমাদের ওপর তুষার ঝরে পড়তে শুরু করল। সেরেছে! এ যে তুষারধ্বস নেমেছে! আর ধ্বসটা আমাদের গর্তের খোলা মুখের ওপর দিয়েই নামছে! মুহূর্তে চোখ-মুখ, সারা গা নরম তুষারে ঢেকে গেল। গর্তটার সমস্ত খাঁজ-খোঁজ তুষারে ভরে উঠতে লাগল। ফাঁকফোকর দিয়ে আমাদের জামাকাপড়ের ভেতরেও ঢুকে গেল তুষার। দু’হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে, দু’হাত দিয়ে মাথা ঢেকে বসে পড়লাম। তুষার পড়ছে তো পড়েই চলেছে। শেষে বরফের নিচে এভাবে জীবন্ত সমাধি হবে আমাদের? কিছুক্ষণ সব চুপ। কোনও শব্দ নেই। মাথা তুললাম। নাহ, গর্তটা পুরো ভরেনি তুষারে! একেবারে ডুবিনি আমরা, তবে গলা অবধি গর্তের নিচটা পুরো নরম তুষারে ভর্তি হয়ে গেছে। উঠে দাঁড়িয়ে গা ঝাড়া দিলাম। সোজা হয়ে দাঁড়ানোরও জায়গা নেই, ছাদে মাথা ঠুকে যাবে। ওদিকে কোমর অবধি তুষারে ডুবে আছি। পায়ে শুধু মোজা পরা। প্রথম কাজটা হল তুষারের মধ্য থেকে যার যার জুতোজোড়া উদ্ধার করা।

রেবুফত আর টেরে খুঁজতে শুরু করল, আর সবিস্ময়ে আবিষ্কার করল যে তারা কিছু দেখতে পাচ্ছে না! গতকাল তুষারঝড়ের মধ্যে আমাদের নিয়ে নামার সময় বেশ কিছুক্ষণ ওরা চোখের গগলস খুলে রেখেছিল, আজ তার খেসারত দিতে হচ্ছে। দু’জনই তুষার-অন্ধতা বা স্নো ব্লাইন্ডনেসের শিকার হয়েছে। হাতড়ে হাতড়ে ল্যাচেনালই প্রথম একজোড়া জুতো খুঁজে বার করল। পায়ে গলানোর চেষ্টা করে বুঝল ও দুটো ওর নয়, রেবুফতের। জুতো পরে রেবুফত সুড়ঙ্গটা বেয়ে ওপরে উঠে গেল।

“রেবুফত, বাইরে আবহাওয়া কেমন?” গর্ত থেকে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল টেরে।

“কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না! খুব হাওয়া দিচ্ছে।”

আমরা তখনও যার যার জুতো খুঁজে চলেছি। টেরে নিজের দুটো খুঁজে পেল এবার। কিন্তু কোনটা যে কোন পায়ের কিছুতেই বুঝতে পারে না, কিছুই সে দেখছে না চোখে। ল্যাচেনালের সাহায্যে কোনওমতে জুতোজোড়া পায়ে গলাল। ল্যাচেনাল প্রচণ্ড অস্থির হয়ে উঠেছে, পাগলের মতো করছে আবার। আমার অবস্থা ঠিক উলটো, নিঝুম নিশ্চল হয়ে পড়ে আছি। ওদিকে হাঁচরপাঁচর করে ঘষটাতে ঘষটাতে সুড়ঙ্গ বেয়ে বাইরের পৃথিবীতে পৌঁছে গেল টেরে। বাইরে বেরোতেই প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া তার চোখেমুখে ঝাপটা মারল।

‘আবহাওয়া আজও খারাপ!’ নিজের মনেই বলল টেরে, ‘আর কোনও আশা নেই। সব শেষ! এই কুয়াশায় কোনোদিনই আমরা রাস্তা খুঁজে পাব না আর!”

গর্তের নিচে আমি আর ল্যাচেনাল তখনও জুতো খুঁজে চলেছি। ল্যাচেনাল আইস অ্যাক্স দিয়ে পাগলের মতো মেঝের নরম তুষারের মধ্যে খুঁচিয়ে চলেছে। তুলনায় আমি শান্তভাবে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে খুঁজছিলাম। ক্র্যাম্পনগুলো এবং আরেকটা আইস অ্যাক্স উদ্ধার করা গেল, কিন্তু আর কোনও জুতো পেলাম না!

বেশ! তাহলে এই গর্তই আমাদের চারজনের সমাধি হতে চলেছে! আজও যদি এখানে কাটাতে হয় তাহলে আর কেউই বাঁচব না। ভেতরে জায়গা খুবই কম। নরম তুষারের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আমি আর ল্যাচেনাল হাতড়ে চলেছিলাম। মাঝেমাঝেই দু’জনে ধাক্কা লাগছিল। শেষে ল্যাচেনাল ঠিক করল জুতো ছাড়াই ওপরে উঠে যাবে। টেরের নাম ধরে চিৎকার করতে করতে দড়িতে বার বার ঝাঁকুনি দিতে লাগল। ওপর থেকে দড়ি টেনে যতটা সম্ভব সাহায্য করল টেরে, সুড়ঙ্গের দেওয়ালে হাত-পায়ের ভর দিয়ে হাঁচরপাঁচর করতে করতে কোনওমতে উঠতে শুরু করল ল্যাচেনাল। কষ্টেসৃষ্টে একটু ওঠার পর বেশ তাড়াতাড়িই উঠতে লাগল সে, তারপর আমার দৃষ্টির বাইরে বেরিয়ে গেল।

গর্তের বাইরে বেরিয়েই ল্যাচেনাল দেখল আকাশ পরিষ্কার, একেবারে ঝকঝকে নীল! তুষার-অন্ধ হয়ে যাওয়া রেবুফত আর টেরের চোখে চারদিকে কুয়াশা বলে মনে হয়েছিল! আনন্দে চিৎকার করতে করতে পাগলের মতো দৌড়োদৌড়ি শুরু করল ল্যাচেনাল, “আকাশ পরিষ্কার! আবহাওয়া ভালো হয়ে গেছে! ঝড় থেমে গেছে! আকাশ পরিষ্কার!”

আমি আবার খোঁজাখুঁজিতে মন দিলাম। জুতোগুলো খুঁজে বার করতেই হবে, নইলে ল্যাচেনাল আর আমার পায়ের বারোটা বেজে যাবে! খালি হাত-পায়ে উপুড় হয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে মেঝের নরম তুষার পুরো লন্ডভন্ড করে ফেললাম। মনে হচ্ছে এই বুঝি শক্ত কিছুতে হাত ঠেকবে, কিন্তু না! কোথায় যে গেল জুতোগুলো! নিজেকে একটা বোধবুদ্ধিহীন চারপেয়ে জন্তুর মতো মনে হচ্ছিল, বেঁচে থাকার লড়াই ছাড়া আর কোনও কাজ নেই যার।

অবশেষে একটা জুতো পাওয়া গেল! আরেকটা তো এর সঙ্গেই ফিতে দিয়ে বাঁধা ছিল! হ্যাঁ, পেয়েছি ওটাও! তুষারের নিচে আরেকবার চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে অন্য জোড়াও উদ্ধার হল। কিন্তু  অনেক খুঁজেও সিনে ক্যামেরাটা কিছুতেই পেলাম না আর! অগত্যা সেটার মায়া ত্যাগ করতেই হল। জুতোজোড়া পায়ে গলানোর কোনও প্রশ্নই নেই। হাতদুটো কাঠের মতো অসাড় আর শক্ত হয়ে গেছে। আঙুলে কিছুই ধরতে পারছি না। পায়ের পাতা দুটো অসম্ভব ফুলে আছে। এই পায়ে জুতো কিছুতেই গলবে না। দু’জোড়া জুতো কোনওরকমে দড়িতে ঝুলিয়ে ওপরদিকে মুখ করে চিৎকার করলাম, “ল্যাচেনাল… জুতো!”

কোনও উত্তর নেই। তবে ওরা শুনেছে মনে হল। দড়িতে একটা ঝাঁকুনি, তারপর সর সর করে জুতোগুলো ওপরে উঠে গেল। একটু পরেই দড়িটা নেমে এল ফের। এবার আমার পালা! ভালো করে কোমরে পেঁচিয়ে নিলাম দড়িটা। শক্ত করে যে দড়ি ধরব, হাতে সে সাড় নেই। তাই বেশ কয়েকটা গিঁট মেরে নিলাম। ওরা তিনজন মিলে আশা করি টেনে তুলতে পারবে আমায়। চিৎকার করার শক্তি আর অবশিষ্ট ছিল না। দড়ি ধরে জোর এক ঝাঁকুনি দিলাম তাই, টেরে বুঝল।

প্রথমে গর্তের দেওয়ালের গায়ে শক্ত বরফে লাথি মেরে একটা ফোকর বানাতে হল। ওতে পা রেখে শরীরটা তোলার পর সুড়ঙ্গের দু’পাশের দেওয়ালে হাত-পায়ের সাহায্যে জ্যাম করে চিমনি ক্লাইম্বিং পদ্ধতিতে ওঠা যাবে মনে হল। কয়েক গজ ওভাবে উঠে দেওয়ালের বরফে হাত-পা ঢুকিয়ে নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করলাম। হাত দুটো কবজি অবধি একদম নিরেট হয়ে গেছে, পায়ের পাতা দুটোও গোড়ালি অবধি একেবারে শক্ত কাঠের মতো, এদিক ওদিক ঘোরানো যাচ্ছে না আর। কাজেই খুবই অসুবিধে হচ্ছিল উঠতে।

যে করেই হোক, ধীরে ধীরে ওপরে উঠে চলেছিলাম আমি। টেরে প্রাণপণে দড়ি ধরে টানছিল। আলো ক্রমশ বাড়ছে, বুঝতে পারছিলাম গর্তের মুখটা কাছে এগিয়ে আসছে। পাটিগণিতের তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্কের বাঁদরটার মতো মাঝে মাঝেই পিছলে ফের নিচে চলে যাচ্ছিলাম, কিন্তু হাত-পায়ের সাহায্যে কোনওমতে আবার সুড়ঙ্গের চারপাশের দেওয়ালের মাঝে শরীরটা গোঁজের মতো ফাঁসিয়ে পতন রোধ করছিলাম। হৃৎপিণ্ডটা পরিশ্রমে ফেটে চৌচির হয়ে যাবে মনে হচ্ছিল। বিশ্রাম নিতে বাধ্য হচ্ছিলাম মাঝে মাঝে। কিছুক্ষণ ঝিম মেরে থাকার পর নতুন শক্তির একটা ঢেউ আসছিল শরীরে। এরকমই একটা ঢেউয়ে ভর করে শরীরের শেষ শক্তিবিন্দুগুলি একত্র করে হাঁচরপাঁচর করতে করতে অবশেষে গর্তের মুখটায় পৌঁছে গেলাম। ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা টেরের পা দুটো জাপটে ধরে কায়ক্লেশে শরীরটা টেনে তোলার চেষ্টা করলাম। আমার টানে টেরে গর্তের মধ্যে পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। কোনওমতে সামলে নিয়ে নিচু হয়ে আমার কাঁধটা ধরে ফেলল। সামর্থ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছিলাম আমি। নিচু হওয়া টেরের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললাম, “আমি আর বাঁচব না, টেরে!”

গর্ত থেকে টেনে বার করে ধরে ধরে টেরে আমায় একটু দূরে নিয়ে এল। কয়েক গজ দূরে ল্যাচেনাল আর রেবুফত তুষারের ওপর বসে ছিল। যে মুহূর্তে আমায় ছেড়ে দিল টেরে, একটা নরম কাদার তালের মতো ঝুপ করে মাটিতে পড়ে গেলাম। তারপর চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে ল্যাচেনালদের কাছে পৌঁছে গেলাম।

আবহাওয়া ঝকঝকে পরিষ্কার। গত দু’দিনে প্রচুর তুষারপাত হয়েছে। নতুন তুষারে ঢাকা চারদিকের পর্বতশৃঙ্গগুলি দিনের আলোয় ঝলমল করছে। এত সুন্দর ওদের কখনও দেখিনি আমি। সন্দেহ নেই, পৃথিবীতে আমাদের শেষ দিনটা অসাধারণ সুন্দর হতে চলেছে!

রেবুফত আর টেরে সম্পূর্ণ তুষার-অন্ধ হয়ে গেছে। আমায় যখন ধরে ধরে নিয়ে আসছিল টেরে তখনই টের পেয়েছি, পদে পদে ঠোক্কর খাচ্ছিল সে। সমানে নির্দেশ দিতে হচ্ছিল আমায়। রেবুফতও নির্দেশ ছাড়া এক পা চলতে পারছে না। এরকম বিপজ্জনক জায়গায় চোখে দেখতে না পাওয়াটা খুবই ভয়ানক ব্যাপার। ল্যাচেনালের জমে যাওয়া পা দুটো সম্ভবত ওর স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলেছে। পাগলের মতো বকে যাচ্ছে ও, “আমি বলছি… এক্ষুনি নেমে যাওয়া উচিত আমাদের… ওইদিকে… নিচে…”

“তোমার পায়ে জুতো নেই!”

“তাতে কী হয়েছে? পা তো আছে!”

“পাগলের মতো কথা বোলো না। চার নম্বর ক্যাম্প ওদিকে নয়, বাঁদিকে!”

দাঁড়িয়ে উঠল ল্যাচেনাল, হিমবাহ ধরে সোজা নিচে নেমে যেতে চায় সে। টেরে তাকে টেনে ধরে ফের বসিয়ে দিল, তারপর তার জুতোজোড়া পায়ে গলাতে সাহায্য করল।

ওদের পেছনে প্রায় অচৈতন্যের মতো পড়ে ছিলাম আমি, নিজের চিন্তায় বিভোর। জানি আমার শেষ ঘনিয়ে আসছে! কিন্তু এরকম একটা মৃত্যু সমস্ত পর্বতারোহীর স্বপ্ন, প্রিয় পাহাড়ের বুকে চিরঘুমে ঘুমিয়ে পড়া। যেন আমার জন্যই আজ হিমালয় এত সুন্দর সাজে সেজেছে, আমি কৃতজ্ঞ। চারদিক শান্ত, নিশ্চুপ। মনে হচ্ছিল পবিত্র কোনও গির্জার মধ্যে শুয়ে আছি। কোনও ব্যথাবেদনার বোধ আমার ছিল না, ছিল না কোনও চিন্তাও। নির্ভার পালকের মতো অপার শান্তির এক জগতে ভেসে চলেছিলাম আমি। বেশ কিছুক্ষণ কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে উদ্বিগ্ন টেরে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এল আমার কাছে। ওকে বললাম, “আমি শেষ টেরে, আর কোনও আশা নেই। তোমাদের এখনও বাঁচার সুযোগ আছে, নিচে নেমে যাও, এ সুযোগ পায়ে ঠেলো না, বাঁদিক ধরে নেমে যাও, চার নম্বর ক্যাম্প ওদিকেই, আমার কথা চিন্তা কোরো না…”

কথাগুলো বলতে পেরে মনের ভার অনেক হালকা হয়ে গেল। কিন্তু টেরে শুনলে তো!

“নিচে নামতে আমরা সাহায্য করব তোমায়। আমরা যদি বাঁচি, তুমিও বাঁচবে।”

এই সময় ল্যাচেনাল হঠাৎ উঁচু গলায় চিৎকার করে উঠল, “বাঁচাও! বাঁচাও!”

এই বুদ্ধিটা ওর মাথায় কী করে এসেছিল কে জানে! জেনেবুঝে ও চিৎকার করছিল বলে মনে হয় না! অবশ্য আমাদের চার জনের মধ্যে ওই একমাত্র বহু নিচে দু’নম্বর শিবির দেখতে পাচ্ছিল। ও কি ভাবছিল অত নিচ থেকে ওর চিৎকার কেউ শুনতে পাবে? কী জানি! এরকম মরিয়া চিৎকারে মনে পড়ে গেল মঁ ব্লা পর্বতপুঞ্জের এক ঘটনার কথা। সেখানে এরকম চিৎকার শুনেই একবার কয়েকজন পর্বতারোহীকে বাঁচিয়েছিলাম আমি। এবার আমাদের পালা!

অন্য তিনজনও এবার গলা মেলালাম ল্যাচেনালের সঙ্গে, “এক.. দুই.. তিন.. বাঁচাও! এক.. দুই.. তিন.. বাঁচাও!” কোনওদিক থেকেই কোনও উত্তর পাওয়া গেল না। আমাদের সম্মিলিত চিৎকার দশ ফুট দূরেও পৌঁছোচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল না। আমার গলা তো প্রায় ফিসফিস করার মতোই শোনাচ্ছিল! টেরে আমায় জুতোজোড়া পরে নিতে বলল। কিন্তু হাতে কোনও সাড় নেই আমার। টেরে বা রেবুফত, কেউই চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। তেমন কোনও সাহায্য করতে পারল না ওরা। তাই ল্যাচেনালকে বললাম, “এদিকে এসো তো! আমার জুতোটা পরতে একটু সাহায্য করো।”

“ছাড়ো তো! জুতো পরে আর হবেটা কী ঘোড়ার ডিম? এক্ষুনি নিচে নামতে হবে আমাদের!”

এই বলে সে ফের দাঁড়িয়ে উঠে সোজা নিচের দিকে নামতে শুরু করল। বিন্দুমাত্র রাগ করিনি আমি। বুঝতে পারছিলাম, অতি-উচ্চতাজনিত পাগলামির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে ওর মধ্যে।

টেরে ওর ছুরিটা বার করে কাঁপা কাঁপা হাতে আমার জুতোর ওপরের চামড়াটা সামনে পেছনে চিরে দিল। এবারে সে দুটো পায়ে গলানো গেল। তাও ব্যাপারটা সহজ হল না, বেশ কয়েকবার চেষ্টা করতে হল। ভাবছিলাম এসব করে আর লাভ কী! এখানেই তো বসে থাকতে হবে! টেরে কিন্তু ছাড়ার পাত্র নয়। টেনেটুনে ঠিক পায়ে পরিয়ে দিল জুতোজোড়া। পা দুটো এমনিতেই ভয়ানক ফুলে ছিল, জুতো পরে প্রায় দৈত্যাকৃতি হয়ে গেল। অর্ধেক হুক বাদ দিয়ে কোনওমতে ফিতেও বেঁধে দিল টেরে। যাক, এখন আমি তৈরি! কিন্তু গোড়ালির নিচ থেকে তো সাড়ই নেই পায়ে, হাঁটবটা কী করে?

“ওদিকে নয়, ল্যাচেনাল, বাঁদিকে… বাঁদিকে!”

“পাগল হলে নাকি, মরিস?” বলল ল্যাচেনাল, “সোজা ডানদিকে নামতে হবে আমাদের।”

বাঁদিক না ডানদিক? টেরের কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার নয়। আমার মতো ও হাল ছেড়ে দেয়নি এখনও, শেষ অবধি লড়তে চায়। কিন্তু এই মুহূর্তে করণীয় কী?

কোনদিকে নামা উচিত সেই নিয়ে ওদের তিনজনের আলোচনা চলল। আমি বরফের ওপর চুপচাপ পড়ে রইলাম। ধীরে ধীরে আবার একটা ঘোরের মধ্যে হারিয়ে গেলাম। দুত্তোর, অত চিন্তা করে লাভ কী আর? যা হবার হবে! স্বপ্ন দেখলাম… সবুজ ঘাসে ছাওয়া পাহাড়ি ঢাল, শান্ত ছায়াঘন পথ, পাইনের বন, রজনের গন্ধ… আমার শ্যাময় উপত্যকা… আমার দেশ… আমি তো আমার নিজের পাহাড়ের কোলেই ফিরে চলেছি! কীসের কষ্ট আর, কীসের দুঃখ? আমার শরীর ধীরে ধীরে ফের ঠান্ডায় জমে যেতে শুরু করল।

“আহ… আহ!”

কেউ ডাকছে কী? না কারও গোঙানির আওয়াজ? চোখ খুললাম। তারপর শেষবারের মতো শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে বলে উঠলাম, “ওরা আসছে!”

আমার কথা শুনে ওরা তিনজন নিচের দিকে তাকিয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “শ্যাজ! শ্যাজ আসছে!!”

কোমর অবধি নরম তুষার ঠেলে ধীরে ধীরে নিচের ঢাল বেয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে মার্সেল শ্যাজ। মনে হচ্ছে শুভ্র তুষারঢালের ওপর ভাসতে ভাসতে একটা নৌকো এগিয়ে আসছে যেন। মাত্র দুশো গজ দূরে। মনে হল যেন স্বয়ং ঈশ্বর উদ্ধার করতে আসছেন আমাদের! আর ভাবনা নেই! এই দৃশ্যের অভিঘাত আমার দুর্বল শরীরে এমনই হল যে কিছুক্ষণের জন্য আমার চেতনা লোপ পেল। শরীর-মন সব ছেড়ে দিল। যেন আমার আর কিছুই করার নেই, যা করার ঈশ্বর করবেন এবার!

কয়েক মুহূর্ত পর চেতনা ফিরল, সঙ্গে ফিরে এল বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছেটাও। যাক, সব তাহলে শেষ হয়ে যায়নি এখনও! শ্যাজ কাছে এগিয়ে আসছে। এক মুহূর্তের জন্যও আমার চোখ ওর ওপর থেকে সরল না। আর কুড়ি গজ… আর দশ গজ… শ্যাজ সোজা আমার দিকেই এগিয়ে এল। কেন? কোনও কথা না বলে আমার ওপর ঝুঁকে পড়ে সে জড়িয়ে ধরল আমায়… আমার বরফশীতল চোখমুখে ওর গরম নিঃশ্বাস… জীবন… জীবনের নিঃশ্বাস!

একচুলও নড়ার ক্ষমতা ছিল না আমার। শরীরটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। জীবনের আলিঙ্গনে আমার হৃদয় তখন প্লাবিত, কিন্তু চোখে জল নেই একফোঁটা।

শ্যাজের চোখ ছলোছলো। আমার চোখে চোখ রেখে গাঢ় গলায় বলল সে, “অন্নপূর্ণা শৃঙ্গজয়ী পৃথিবীর প্রথম মানুষকে অভিবাদন। শাবাশ, মরিস!”

 (এরপর আগামী সংখ্যায়)

     জয়ঢাকের খেলা লাইব্রেরিতে এমন অনেক অভিযানের সংগ্রহ

 

Advertisements

One Response to ধারাবাহিক অভিযান অন্নপূর্ণা মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক শরৎ ২০১৮

  1. sudeep says:

    ভাবা যায়,গল্পই মনে হয়…পাহাড়ে ওঠার সময় যে কতরকম অভিজ্ঞতা হয় যে ওঠেনি সে চিন্তাও করতে পারবে না..প্রতিবারের মত অসাধারণ..এই বইটার জন্যে আমি কবে থেকে বসে আছি..

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s