ধারাবাহিক অভিযান অন্নপূর্ণা মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক বসন্ত ২০১৯

‌  এই লেখার আগের পর্বগুলো                     তাপস মৌলিকের সব লেখা

গত দু’দিন ধরে দু’নম্বর শিবিরে বসে আইজ্যাক দূরবিন চোখে আমাদের গতিবিধির ওপর যথাসাধ্য নজর রাখার চেষ্টা করছিল, আর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সমস্ত লিখে রাখছিল তার ডায়রিতে। এখানে তার ডায়রির কিছু অংশ তুলে দিলাম। 

৩ জুন, শনিবার, দু’নম্বর ক্যাম্প (যেদিন আমি আর ল্যাচেনাল শৃঙ্গজয় করলাম)
অডট আর নোয়েলের আজ তিন নম্বর ক্যাম্পে যাওয়ার কথা। সেখানকার তাঁবুগুলো খুলে টেরে আর রেবুফত চার নম্বর শিবিরে নিয়ে গেছে, অডটরা নতুন তাঁবু বসাবে। অক্সিজেন ব্যবহারের নিরিখে অডটের কাছে আজকের যাত্রাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ এক পরীক্ষা। ন’টা নাগাদ রওনা দিল ওরা। দশটার সময় দেখি নোয়েল ফেরত চলে এসেছে। কোনও সমস্যা? অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়ে সম্ভবত যথেষ্ট অক্সিজেন সরবরাহ হচ্ছে না। ওদিকে অডট তিন শেরপাকে সঙ্গে নিয়ে খুব ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে।
থিয়োডোলাইটের টেলিস্কোপে চোখ রেখে ঠায় বসে আছি আমি। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ফাঁক দিয়ে কাস্তে হিমবাহের উপরাংশটা দেখা যাচ্ছে। চারটে কালো বিন্দু দেখতে পাচ্ছি সেখানে। সামনে টেরে আর রেবুফত, ওদের নিচে কোজি আর শ্যাজ। মরিসদের কোনও চিহ্ন নেই। ওরা হয়তো শৃঙ্গের নিচে শেষ ঢালটায় পৌঁছে গেছে, যা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না। শৃঙ্গের কাছে প্রচণ্ড হাওয়া, বরফ-গুঁড়ো ওড়া দেখে বোঝা যাচ্ছে। মরিসদের শৃঙ্গ থেকে খুব দূরে থাকার কথা নয়। হয়তো এতক্ষণে…
৪ জুন, রবিবার
জঘন্য আবহাওয়া। গতকাল সারারাত তুষারপাত হয়েছে, সঙ্গে জোরালো উত্তুরে হাওয়া। অন্নপূর্ণা ঘন কুয়াশায় ঢাকা। ক্লান্ত লাগছে, চিন্তাও হচ্ছে। ওপরে ওরা কেমন আছে কে জানে!
তুষারপাত হয়েই চলেছে একটানা। দুপুরের মধ্যে মাটিতে আট ইঞ্চি পুরু তুষার জমে গেল। কুয়াশা ভেদ করে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না চারদিকে। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় তুষারধ্বস নামার আওয়াজ কানে আসছে।
বিকেল চারটে নাগাদ কয়েকজনের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। তুষারমানবের মতো চারটে সাদা ভূত উদয় হল – অডট আর তার সঙ্গী তিন শেরপা। ওদের জন্য গরম জল করে দিলাম।
গতকাল ওদের পৌঁছতে সন্ধে সাতটা বেজে গেছিল। আজ সকালে আবহাওয়া খারাপ দেখে অডটের বেরোনোর ইচ্ছে ছিল না, তাঁবুতেই ছিল সে। দুপুর একটা নাগাদ আবহাওয়া আরও খারাপ হয়ে এল। আজীবা তখন অডটের তাঁবুতে এসে বলে, “সাহেব, বর্ষা এখানে পৌঁছে গেছে বোধ হচ্ছে। এ বিলকুল বর্ষার দুর্যোগ। এভাবে বসে থাকলে আর বেঁচে ফিরতে হবে না আমাদের।”

৫ জুন, সোমবার
আজ কি দিনটা ভালো যাবে? কী জানি! গতকাল ওই সাংঘাতিক দুর্যোগের পর আশা করা উচিত নয়। রাত্তিরে একসময় আমার মনে হচ্ছিল, তিরিশে মার্চ ফ্রান্স থেকে যে আটজন রওনা হয়েছিলাম আমরা, তার মধ্যে আমি আর অডটই কেবল বেঁচে আছি এখনও।
ভোর ছ’টায় একবার কারও একটা চিৎকার শুনলাম বলে মনে হল। বাইরে বেরোলাম। নিচের উপত্যকায় জমে থাকা ঘন কালো মেঘের মধ্য থেকে সূর্য উঠছে। কোথাও কিছু দেখতে পেলাম না। তাঁবুর ভেতর ঢুকে ফের স্লিপিং ব্যাগে সেঁধিয়েছি, আবার চিৎকার কানে এল। পর পর দু’বার। দূরবিন চোখে অনেক ওপরে বরফের ছোটো একটা চাতালে দু’জনকে দেখতে পেলাম, মোটামুটি চার নম্বর শিবিরের উচ্চতায়, কিন্তু কিছুটা বাঁদিকে। চিৎকার করেই চলেছে ওরা, সঙ্গে দু’হাত ওপরে তুলে নাড়ছে। কারা হতে পারে? অডট বলল, সম্ভবত শ্যাজ আর কোজি। বোঝা যাচ্ছে ওদের হাঁটার ক্ষমতা নেই, বিশেষত একজনের। দুশ্চিন্তার ব্যাপার! নিশ্চয়ই পায়ে তুষারক্ষত হয়েছে। কী চায় ওরা? খুব ভালো আবহাওয়াতেও এখান থেকে ওদের কাছে পৌঁছোতে কম সে কম ছ’ঘন্টা লাগার কথা। কিন্তু গতকালের তুষারপাতের ফলে পুরো রাস্তাটাই নরম তুষারের পুরু চাদরে ঢাকা, আর আবহাওয়া যে কোনও সময় ফের খারাপ হতে পারে…
এখনও চিৎকার করে চলেছে ওরা! আপৎকালীন সাহায্য দরকার ওদের, বোঝা যাচ্ছে। বাকি আটজন গেল কোথায়? আরও ওপরে, শৃঙ্গের কাছে?
সকাল আটটা : ওপরে পাঠানোর জন্য অডট একটা উদ্ধারকারী দল তৈরি করছে। ওর কাছে কোনও আইস পিটন নেই, সাজসরঞ্জামও নেই তেমন কিছু। নোয়েল সাহায্য আনতে আজীবাকে নিয়ে এক নম্বর শিবিরে নেমে যাচ্ছে, সেখান থেকে কিছু সাজসরঞ্জাম এবং দাওয়াথোন্ডুপকে সঙ্গে নিয়ে আসবে। আমাদের দু’নম্বর শিবিরে শেরপারা খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তিনজন শেরপা একই পরিবারের – পানসি, আয়লা এবং আংদাওয়া।
সকাল সাড়ে-আটটা : এখনও সমানে চিৎকার চলেছে। তুষারের ওপর বড়ো বড়ো করে দুটো অক্ষর লেখা আছে দেখতে পাচ্ছি – VU. মানে কী? ভেরি আর্জেন্ট? কয়েক মিনিট পরে একজন দেখি হঠাৎ খুব তাড়াতাড়ি নিচে নামতে শুরু করল, যে বরফের দেয়ালটা ক্যাম্প ইভা-কে আড়াল করে আছে সেদিকে। ক্যাম্প ইভা থেকে ৩০০ গজ দূরে থেমে পড়ল লোকটা, সেখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল কিছুক্ষণ, হাত নাড়ল, তারপর ফের ফিরে গেল আগের জায়গায়।
এবার দেখলাম ক্যাম্প ইভা থেকে বেরিয়ে একজন ওদের দিকে এগোচ্ছে। ওপরে দু’জন নয়, চার জনকে দেখা যাচ্ছে। নিচের জন ওপরের দলের সঙ্গে মিলিত হবার পর সবাই ধীরে ধীরে ক্যাম্প ইভার দিকে নামতে শুরু করল। তাহলে পাঁচজনের হিসেব পাওয়া গেল। বাকিরা কোথায়?
ক্যাম্প ইভার নিচে কাস্তে হিমবাহের ফানেলের মতো দেখতে জায়গাটায় চার নম্বর শিবির। ওরা যদি চার নম্বরে নেমে আসতে পারে তাহলে সেখান থেকে তিন কি দুই নম্বর ক্যাম্পে নামতে বেশি সময় লাগার কথা নয়।
সকাল সাড়ে-ন’টা : নোয়েল এক নম্বর শিবিরে পৌঁছে গেছে।
সকাল দশটা : অবশেষে কাস্তে হিমবাহের ফানেলের মতো জায়গাটায় তিনজনকে দেখতে পাচ্ছি। তিন নম্বর শিবিরের দিকে নামছে ওরা। মনে হচ্ছে একজন সাহেব আর দু’জন শেরপা। ভাগ্য ভালো আবহাওয়া এখনও চমৎকার। পশ্চিম দিক থেকে হাওয়া বইছে। অন্নপূর্ণা একেবারে পরিষ্কার ঝকঝক করছে। হে ভগবান, এরকম যেন আরও কিছুক্ষণ থাকে!
বেলা এগারোটা : আরও দু’জন নামছে। কোমরে দড়ি বাঁধা নেই, তার মানে এরা সাহেব। প্রথম দলের নামার রাস্তা ধরে বেশ তাড়াতাড়িই নামছে এরা। এরকমভাবে নামতে পারলে সন্ধের আগে এখানে পৌঁছে যাবে। অবশেষে খবরাখবর সব পাওয়া যাবে!
বেলা সোয়া এগারোটা : ভোরবেলা ক্যাম্প ইভার ওপরে বরফের চাতালে যেখানে প্রথম দু’জনকে দেখেছিলাম, সেখানে এখন একজনকে দেখা যাচ্ছে। আরও ওপরে উঠে চলেছে সে। ও কি পাঁচ নম্বর ক্যাম্পে যাচ্ছে! সেখানেও কেউ আছে নাকি? যাই হোক, নিচে নামতে থাকা পাঁচজন ছাড়া আরও দু’জন অন্তত আছে ওপরে, নাহলে লোকটা ওপরে উঠবে কেন? অর্থাৎ দশ জনের মধ্যে মোট সাত জনের হিসেব মিলল। তিনজনের একটা দল তাহলে নিশ্চয়ই এখনও ওপরে কোথাও আছে!
বেলা বারোটা কুড়ি : নিচের দলটার পাঁচজনের মধ্যে চারজনকে তিন নম্বর শিবিরের ওপরে খুব খাড়াই একটা বরফঢাল পেরোতে দেখছি। একজন একটু পিছিয়ে পড়েছে। অনেক ওপরে, চার নম্বর শিবির থেকে বেরিয়ে একজন দেখছি খুব তাড়াতাড়ি নামছে এখন। হঠাৎ তিন নম্বর ক্যাম্পের ওপরে চারজন যেখানে ছিল সেখানে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের মতো একটা তুষারের মেঘকুন্ডলী উঠল। তুষারধ্বস! পড়ে গেছে ওরা, খাড়া বরফঢালের গা বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তুষারধ্বসটা ওদের ওপর দিয়ে চলে গেল। তিনজন দেখি ঢালটার বিভিন্ন জায়গায় পড়ে আছে। একেবারে নিচে যে পড়ে আছে সে প্রায় দেড়শো ফিট গড়িয়ে পড়েছে (আসলে ওটা পাঁচশো ফিট ছিল)। সে এবারে ধীরে ধীরে ঢাল বেয়ে ওপরে উঠছে আবার। বাকি দু’জন একজায়গায় দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। এবার চতুর্থজনকেও দেখতে পাচ্ছি। যাক বাবা! বেঁচে গেছে সবাই!
আমাদের শেরপারা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে। তুষারধ্বসের পাল্লায় পড়ে নিশ্চয়ই আইস অ্যাক্স আর স্নো গগলস খুইয়েছে চারজন। আংদাওয়া এবং ফুথারকে তাই বাড়তি অ্যাক্স আর গগলস নিয়ে ওদের দিকে রওনা দিল। ওপরের চারজনও ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে আবার। বিপজ্জনক নালাটা বেয়ে নামা তুষারধ্বসের বরফ জমে যে বিশাল বরফ-স্তূপটা তৈরি হয়েছে, বেলা তিনটে নাগাদ তার মাথায় দু’দলের সাক্ষাৎ হল। অবশেষে সব কিছু জানা যাবে এবার…

দু’নম্বর শিবিরের তাঁবুগুলোর কাছাকাছি পৌঁছোতেই আইজ্যাক, নোয়েল আর অড্ট ছুটে এল আমাদের দিকে। ভালো খবরটা দিতে আমার আর তর সইছিল না!
চিৎকার করে বললাম, “অন্নপূর্ণা শৃঙ্গ জয় করেছি আমরা। তিন তারিখ আমি আর ল্যাচেনাল শৃঙ্গে উঠেছি।” তারপর একটু থেমে যোগ করি, “আমার হাত-পায়ে সাড় নেই কোনও, তুষারক্ষত!”
তাঁবু অবধি পৌঁছোতে আমায় সাহায্য করল তিনজনই। আইজ্যাক আর নোয়েল ধরে ধরে নিয়ে এল, অডট সঙ্গে সঙ্গে আমার ক্ষতস্থানগুলো পরীক্ষা করা শুরু করল।
ব্যস, আমার দায়িত্ব শেষ। অভিযান সফল। বাকিরাও কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে। জোর বাঁচা বেঁচে গেছি যা হোক! অন্নপূর্ণা শৃঙ্গ জয় করেছি, ভালোয় ভালোয় ফিরেও এসেছি। এখন নিচের শিবিরগুলোয় যারা আছে তাদের দায়িত্ব। সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব ডাক্তার অডটের, ওই এখন আমাদের একমাত্র আশা-ভরসা। আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না, নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেব এদের বিশ্বস্ত হাতে। এরপর যাই হোক না কেন, বিশ্বের প্রথম আট-হাজারি শৃঙ্গ জয়ের কৃতিত্ব আর কোনোদিনও কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না আমাদের থেকে। সারাজীবন এই অভিযানের সুখস্মৃতি রোমন্থন করব আমরা। দলের অন্যদের কাজ এখন আমাদের সবাইকে ঠিকঠাক এখান থেকে নামিয়ে ফ্রান্সের মাটি অবধি পৌঁছে দেওয়া।

আমাদের জন্য এরা নতুন আরামদায়ক তাঁবু প্রস্তুত করে রেখেছে। দেখে মন ভরে গেল। বন্ধুরা সবাই ঘিরে রয়েছে আমায়, হাতের গ্লাভস আর গায়ের উইন্ড চিটার খুলে শুইয়ে দিল তাঁবুতে। আহ, অবশেষে শান্তি! বাইরে আবহাওয়া যথেষ্ট খারাপ হয়ে এসেছে, তাও বাকিদের পৌঁছোতে খুব দেরি হল না। সবার আগে পৌঁছল রেবুফত। ওর পায়ের পাতা দুটোয় তুষারক্ষত হয়েছে, হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছে তাই। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাকে, সারা মুখ যন্ত্রণাক্লিষ্ট, ঠোঁট আর চোয়ালের দু’পাশ দিয়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। এরা তার জামাকাপড় পালটে দিয়ে আলাদা একটা নতুন তাঁবুতে শুইয়ে দিল।
ল্যাচেনাল তখনও অনেক পেছনে। পায়ে তুষারক্ষত, চোখে তুষার-অন্ধতা, শরীর ক্লান্ত, বিধ্বস্ত – এই সাংঘাতিক বিপজ্জনক রাস্তায় কী করে সে নামছে কে জানে! কোজি নামতে নামতে তাকে ধরে ফেলেছিল। সে নিজেও খুব ক্লান্ত, তা সত্ত্বেও ল্যাচেনালকে সাহায্য করেছে প্রচুর।
সবার শেষে রওনা দিয়েছিল টেরে। শ্যাজ এখনও দুর্দান্ত ফর্মে আছে, টেরেকে পেছন থেকে দড়ি ধরে আগলে রেখেছিল সে। রেবুফতের পর ওরাই বাকি সবার আগে পৌঁছল। আইজ্যাক নালার নিচে বরফ-স্তূপটার কাছে টেরেকে নিয়ে আসতে গেল। টেরেও তুষার-অন্ধতার শিকার, আংথারকের কাঁধে ভর দিয়ে কোনোমতে ধীরে ধীরে নেমে আসছিল। একমুখ দাড়ি, যন্ত্রণা, শ্রান্তি, ক্লান্তিতে বিকৃত হয়ে আছে সেই মুখমন্ডল। দেখলে মায়া হয় টেরেকে। দলের সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য, শেরপারা যার নাম দিয়েছে ভীম, তার কিনা এই করুণ দশা! কারও সাহায্য ছাড়া এক পাও হাঁটতে পারছে না! ক্যাম্পে পৌঁছনোর পর টেরের অবস্থা দেখে অডট আর নোয়েলের চোখে প্রায় জল চলে এল। টেরে অবশ্য বলল, “আমি এমনিতে ঠিক আছি। শুধু এই হতচ্ছাড়া চোখ দুটো! চোখে ঠিকঠাক দেখতে পেলে নিজে নিজেই নামতে পারতাম আমি!”
টেরের পরে পরেই শিবিরে পৌঁছল শ্যাজ ও কোজি। সবশেষে এল ল্যাচেনাল। দু’জন শেরপা দু’পাশ থেকে ধরে ওকে প্রায় চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে এল। সে এক দৃশ্য বটে! চোখ আর মাথায় ব্যান্ডেজ জড়ানো ল্যাচেনালের, ঘাড়টা পেছনদিকে একপাশে কাত হয়ে আছে, পা দুটো ঝুলছে শূন্যে, যেন হাওয়ার মধ্যে সাইকেলে প্যাডল করছে! আর এক ঘন্টা দেরি হলেও ওকে বাঁচানো যেত কিনা সন্দেহ। এরকম অবস্থাতেও শিবিরে পৌঁছেই সে আইজ্যাককে বলল, “শ্যাময়ের সম্ভ্রান্ত গাইডরা হিমালয় থেকে কীভাবে নেমে আসে দেখেছ?”
কোনও কথা না বলে আইজ্যাক তার দিকে একটা সুগার কিউব এগিয়ে দিল।

শৃঙ্গ জয় করে নেমে এসে সবাই আজ দু’নম্বর শিবিরে মিলিত হয়েছি আমরা। কিন্তু, উৎসবের মেজাজে নেই কেউ! এখন ডাক্তার সাহেব অডটের কেরামতি দেখানোর পালা। প্রাথমিকভাবে একবার সবাইকে তাড়াতাড়ি পরীক্ষা করে নিল সে। এখন সে পুরোদস্তুর একজন সার্জেন।
প্রথমেই অডট আমায় পরীক্ষা করল। আমার হাত-পায়ে কোনও সাড় নেই, কবজি আর গোড়ালির বেশ খানিকটা ওপর অবধি অসাড়। হাত দুটোর বীভৎস অবস্থা। চামড়া প্রায় নেই বললেই চলে, কোথাও কোথাও অল্প কিছু কালো হয়ে লেগে আছে মাংসের ওপর, লম্বা লম্বা ফালি আলগা হয়ে ঝুলছে। আঙুলগুলো ফোলা, বেঁকেচুরে আছে সব। পায়ের দশাও তথৈবচ। দুটো পায়ের তলাই বেগুনি আর ঘন খয়েরি রঙের হয়ে আছে, সাড় নেই একফোঁটা। বাঁ হাতটায় প্রচণ্ড ব্যথা। ভেবেছিলাম ওটা ভেঙেছে, ভাগ্যি ভালো সেটা হয়নি। ঘাড়ের চোটও গুরুতর কিছু নয়।
অডটের প্রাথমিক মতামতের জন্য গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম।
“কী মনে হচ্ছে?” জিজ্ঞেস করলাম ওকে।
“অবস্থা গুরুতর। হাত-পায়ের কিছু অংশ কেটে বাদ দিতে হবে তোমার, এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারছি না।”
“কিছু কি বাঁচানো যাবে?”
“কিছুটা বাঁচাতে পারব বলেই আমার বিশ্বাস। যথাসাধ্য চেষ্টা করব আমি।”
ব্যাপারটা মোটেই উৎসাহব্যঞ্জক নয়, ধরেই নিলাম দুটো হাত দুটো পা-ই কেটে বাদ যাবে।
আমার রক্তচাপ পরীক্ষা করে চিন্তিত হয়ে পড়ল অডট। ডান হাতে কোনও রক্তচাপ পাওয়া গেল না, বাঁ হাতেও তাই। পায়ে পরীক্ষা করে দেখা গেল প্রেসার মাপার যন্ত্রের কাঁটা অল্প অল্প নড়ছে। তুষার-অন্ধতা থেকে বাঁচানোর জন্য আমার চোখ দুটো ব্যান্ডেজ দিয়ে বেঁধে অডট বলল, “এবার যাই, ল্যাচেনালকে দেখে আসি। ফিরে এসে তোমায় ক’টা ইঞ্জেকশন দেব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওগুলো ব্যবহার করেছিলাম আমি, তুষারক্ষতের চিকিৎসায় একমাত্র ওতেই কিছুটা কাজ হয়। আসি এখন।”
ল্যাচেনালের অবস্থা কিছুটা কম গুরুতর। ওর হাতে কিছু হয়নি, পায়ের পাতা আর গোড়ালি দুটো রক্ত জমে কালো হয়ে আছে। সম্ভবত ওর পায়ের পাতা দুটো কেবল বাদ যাবে, কিন্তু তাতে পাহাড়ে চড়তে কিংবা শ্যাময়ের পেশাদার গাইড হিসেবে জীবিকানির্বাহ করতে ওর অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। রেবুফতের অবস্থা তেমন গুরুতর কিছু নয়। ওর পায়ের পাতা দুটো গোলাপি হয়ে আছে, দুটো জায়গায় কেবল খয়েরি ছোপ পড়েছে। আইজ্যাক ঘন্টা দুয়েক ম্যাসাজ করায় যথেষ্ট উন্নতি হল পা দুটোর। তুষার-অন্ধতার জন্য অবশ্য চোখে ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে রেবুফতের, তবে সে তো মাত্র দু-তিন দিনের ব্যাপার! টেরের কিচ্ছু হয়নি, তুষার-অন্ধতা ছাড়া। কোজি প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই হল মোটামুটি দলের সবার অবস্থা।
ধীরে ধীরে রাত নামল। অডট তার প্রস্তুতি শেষ করল, আইজ্যাক ও শ্যাজকে সে নার্স হিসেবে নিয়োগ করল। দু’নম্বর শিবিরটাকে অস্থায়ী একটা হাসপাতালই বানিয়ে ফেলল সে। ওই দুর্যোগের মধ্যে, প্রচণ্ড ঠান্ডায়, চারদিক থেকে ক্রমাগত ভেসে আসা তুষারধ্বসের আওয়াজের মধ্যে গভীর রাত অবধি ওরা বন্ধুদের জীবন বাঁচানোর জন্য প্রাণপণ লড়াই করে গেল। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলির অন্যতম একটির কোলে বিশ হাজার ফিট উচ্চতায় বসানো এই ছোট্ট শিবিরে টর্চ হাতে ওরা এ তাঁবু থেকে সে তাঁবুতে টানা দৌড়োদৌড়ি করে চলল, আহত বিধ্বস্ত বন্ধুদের শুশ্রূষা করল, আপৎকালীন চিকিৎসা করল।
অডট আমায় ইঞ্জেকশন দেবার জন্য এল। বলল, “তোমার কুঁচকি আর কনুইয়ের ভাঁজে নোভোকেইন ইঞ্জেকশন দেব। ব্যথা লাগবে, একবারের চেষ্টায় হয়তো ধমনী খুঁজে পাব না আমি। নড়বে না একদম, বিশেষ করে যখন ঠিক জায়গায় সিরিঞ্জটা ফোটাতে পারব।” ইঞ্জেকশনে আমার বরাবরের ভয়। কী আর করা যাবে, দিতে যখন হবেই! এটাই নাকি একমাত্র রাস্তা! চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা, দেখতে পাচ্ছি না কিছুই। তাঁবুর ভেতরের আলো-আঁধারিতে হাতড়ে হাতড়ে ইঞ্জেকশন দেবার জায়গাগুলোয় ধমনী খুঁজতে লাগল অডট। আইজ্যাক পাশে সিরিঞ্জ প্রস্তুত করছে। অডটকে বললাম, “দেবে তো দাও, তবে সিরিঞ্জ ফোটানোর আগে বোলো।” হাত-পায়ের যা অসাড় অবস্থা, তাতে খুব বেশি ব্যথা লাগবে বলে মনে হয় না।
হঠাৎ কুঁচকিতে একটা প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব করলাম। পা দুটো থরথর করে কাঁপতে শুরু করল আমার, কিছুতেই বশে আনতে পারলাম না। ধমনী খুঁজে পায়নি অডট, ফের ছুঁচ ফোটাতে হবে। আবার একটা তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা, এবারে সারা শরীরে কাঁপুনি ধরে গেল আমার।
“উফফ, আস্তে,” না বলে থাকতে পারলাম না।
“নিডলে রক্ত জমে যাচ্ছে! তোমার রক্ত ঘন কালো, থকথকে পুডিং-এর মতো হয়ে গেছে!” বিস্ময়ের সঙ্গে বলল অডট। “এইবারে ধমনীটা খুঁজে পেয়েছি, নড়বে না একদম,” আবার ছুঁচ ফোটাল সে, পাশে দাঁড়ানো আইজ্যাককে চিৎকার করে বলল, “জলদি সিরিঞ্জটা দাও।”
আমি অনুভব করলাম ছুঁচের মধ্য দিয়ে তরল ওষুধটা ধমনীর রক্তে মিশে যাচ্ছে। এতে যে এত যন্ত্রণা হতে পারে আমার ধারণাই ছিল না! প্রাণপণে দাঁত চেপে শরীরের কাঁপুনি রোধ করার চেষ্টা করতে থাকলাম।
“একটু গরম অনুভব করছ?” সিরিঞ্জ বদল করতে করতে জিজ্ঞেস করল অডট। চোয়াল শক্ত করে শুয়ে আছি। নতুন সিরিঞ্জটাও পুরো খালি করে দিয়ে ফের প্রশ্ন করে অডট, “কী, ধমনীর ভেতরে একটু গরম গরম লাগছে?” তেমন কিছুই মনে হচ্ছিল না আমার। আরও কয়েকটা সিরিঞ্জ খালি করে অডট ফের জিজ্ঞেস করে, “এবার?”
“মনে হচ্ছে সামান্য গরম লাগছে। কী জানি! বুঝতে পারছি না ঠিক।”
“ঠিক আছে, এবার অন্য পায়ে,” ছুঁচটা খুলে নিল অডট। নতুন ছুঁচ আর সিরিঞ্জ প্রস্তুত করার ফাঁকে কিছুটা দম ফেলার সময় পাওয়া গেল।
“বাপ রে বাপ! কী সাংঘাতিক যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার!”
“হুঁ, জানি। কিছু করার নেই, দিতেই হবে ইঞ্জেকশন।”
অন্য পায়েও একই পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি চলল। যন্ত্রণায় আমার স্নায়ুগুলো যেন টুকরো টুকরো হয়ে ছিঁড়ে যেতে চাইছে। শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে সেই অসম্ভব যন্ত্রণা সয়ে যতটা পারি স্থির হয়ে শুয়ে রইলাম। চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা থাকায় দেখতে পাচ্ছি না কিছুই। বন্ধুদের মুখগুলো যদি দেখতে পেতাম, মনে হয় একটু সুবিধে হত। সে সুযোগ নেই। আমার চোখে শুধু অন্ধকার – গভীর অন্ধকার। নিজের মধ্যে ছাড়া সান্ত্বনা খোঁজার জায়গা নেই কোথাও!
রাত গভীর হল। তখনকার মতো রেহাই পেলাম আমি। অডট আর আইজ্যাক ল্যাচেনালের তাঁবুর দিকে চলল। মনে মনে প্রার্থনা করলাম, ঈশ্বর, ল্যাচেনালকে এই অসম্ভব যন্ত্রণা সহ্য করার শক্তি দাও। কিন্তু, মনে হল, ল্যাচেনালের ওখানে অডটদের খুব বেশি সময় লাগল না!
টেরে ল্যাচেনালের তাঁবুতে শুল। কোজি আর আইজ্যাক রইল রেবুফতের সঙ্গে। অডট এসে আমার পাশে শুয়ে পড়ল। যাক বাবা, রাতে যদি সেরকম কিছু হয় তো অডট আছে!

পরদিন দু’নম্বর শিবির সম্পূর্ণ গুটিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করা হল। তিনজন গুরুতর আহত সদস্যকে স্লেজে চাপিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে, দু’জন অন্যের সাহায্যে হাঁটতে পারবে, বাকি চার জন সুস্থ। মাইল কে মাইল হিমবাহ পেরোতে হবে, খাড়া পাথুরে দেয়াল বেয়ে হবে নামতে, পেরোতে হবে আলগা পাথরে ভরা মোরেন অঞ্চল, তারপর একটা নদী, আর তেরো হাজার ফিট উচ্চতার এক গিরিপথ – আর এ সমস্ত করতে হবে কিনা ভরা বর্ষার মধ্যে!
আজ জুন মাসের ছ’তারিখ। আইজ্যাক খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছে। নন্দাদেবী অভিযানে এসে টিলম্যানের দলের যে ভোগান্তি হয়েছিল, আমাদেরও সেই দশা না হয়! বর্ষার জলে ফুলে ওঠা নদীর জন্য টিলম্যানরা তিন সপ্তাহ আটকে পড়েছিল। অপেক্ষাকৃত সহজ কালী গন্ডকি উপত্যকায় পৌঁছনোর সময় কি পাব আমরা? যে করে হোক, এক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের পাহাড় ছেড়ে নেমে যেতে হবে। কোজি শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠবে, টেরের তুষার-অন্ধতাও ঠিক হয়ে যাবে, রেবুফতও ঠিকঠাক হাঁটতে পারবে অচিরেই, কিন্তু এই প্রচণ্ড প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে একেবারে সেই কালী গন্ডকি উপত্যকা অবধি দলের দু’জন গুরুতর আহত সদস্যকে শেরপাদের পিঠে করে বয়ে নামাতে হবে।
“অবিশ্বাস্য ব্যাপার! আবহাওয়া আজও একদম পরিষ্কার!” ভোরবেলা বলল আইজ্যাক।
নিচের এক নম্বর শিবির থেকে অডট কিছু আপৎকালীন ওষুধপত্র চেয়ে পাঠিয়েছিল। সকালে সে সব এসে পৌঁছনোর পর ফের আমার চিকিৎসা শুরু করল সে। গতকালের চিকিৎসায় অডট সন্তুষ্ট। ইঞ্জেকশনে কাজ হয়েছে, পায়ের চেটো অবধি সাড় ফিরে এসেছে আমার। হাত দুটোয় নতুন করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল অডট। মনে হচ্ছিল, হাতের আঙুলগুলোতেও যেন সামান্য সাড় পাচ্ছি! ঠিক ব্যথা নয়, অন্যরকম একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।
“হাত-পা দুটোর কিছু কি বাঁচবে?” ফের জিজ্ঞেস করলাম অডটকে।
“বলতে পারছি না ঠিক, এখনও ব্যাপারটা থিতু হয়নি পুরোপুরি। কিছুটা তো বাঁচবেই! মনে হয় হাত দুটো তুমি ব্যবহার করতে পারবে,” বলল অডট। তারপর অল্পক্ষণ চুপ থেকে যোগ করল, “অবশ্য প্রতিটা আঙুলেরই একটা-দুটো গাঁট বাদ যাবে, কিন্তু বুড়ো আঙুলটা যদি যথেষ্ট বাঁচানো যায় তাহলে কোনোকিছু ধরতে তোমার অসুবিধে হবে না।”
খবরটা দুঃখজনক, কিন্তু তবুও, গতকালই আমি ভয় পাচ্ছিলাম দুটো হাত-পাই না কেটে বাদ দিতে হয়! অবশ্য আমার কাছে আঙুলগুলো হারানোর অর্থ, অনেক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা ইচ্ছের এখানেই পরিসমাপ্তি। অনেক ব্যাপারেই হয়তো আপস করতে হবে, উপায় নেই! হয়তো জীবনটাই পালটে যাবে! নতুন এক ধরনের বেঁচে থাকার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে নিজেকে। কিন্তু ভবিষ্যতে কী হবে সেটা ভাবার ইচ্ছে বা শক্তি কোনোটাই তখন ছিল না আমার। লুকোছাপা না করে পরিস্থিতিটা খোলাখুলি বুঝিয়ে বলার জন্য মনে মনে অডটকে ধন্যবাদ দিলাম আমি। এই হল প্রকৃত বন্ধু!

আজও ফের ইঞ্জেকশন দিতে হবে। আজ আর নোভোকেইন নয়, এক নম্বর শিবির থেকে অ্যাসিটাইলকোলিন নিয়ে আসা হয়েছে। অডট বলল, এতে আরও বেশি ব্যথা লাগবে। বলতে লজ্জা করছে, ভেবে ভয়েই যেন আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। টেরে আমার তাঁবুতে এসে দাঁড়াল পাশে। সেও কিছু দেখতে পাচ্ছে না, চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা, ধরে ধরে এখানে সেখানে নিয়ে যেতে হচ্ছে। অডট আর আইজ্যাক যখন সব প্রস্তুত করছে, আমি টেরেকে ছুঁয়ে বললাম, “এই ইঞ্জেকশনে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়। ছুঁচ ফোটানোর আগে অডট আমায় বলবে, তখন আমায় একচুলও নড়লে চলবে না। তুমি যত জোরে পারবে আমায় জড়িয়ে ধরে রেখো তখন।”
টেরে পাশে থাকায় মনে একটু জোর এল। গত রাত্রের মতো অডট প্রথমে একটা কুঁচকিতে ছুঁচ ফোটাল। সে যন্ত্রণার কথা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মনে হল যেন জ্বলে যাচ্ছে পা’টা, ফুটন্ত তেল ভরা কড়াইয়ে ফেলে যেন ভাজা হচ্ছে সেটাকে। টেরে শক্ত করে জড়িয়ে রয়েছে আমায়, তার কোলে মুখ লুকিয়ে প্রাণপণ চিৎকার করলাম আমি, হাপুস নয়নে কাঁদলাম। ওদিকে অডট আর বাকিরা খুব খুশি! এই যে জ্বালা হচ্ছে, ওষুধ যে কাজ করছে এ নাকি তার প্রমাণ! শুনে তবু একটু সান্ত্বনা পেলাম। চারবার সিরিঞ্জ খালি করার পর অবশেষে প্রয়োজনীয় একশো সি.সি. ওষুধ ভেতরে ঢুকল।
“এবারে দুই হাত,” বলল অডট।
অনন্তকাল ধরে যেন চলল ব্যাপারটা! পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দিল আমায়। তবে ডান হাতে যে আগের চেয়ে অনেক বেশি সাড় পাচ্ছি সেটা সত্যি।
ধমনী খুঁজে পাওয়ার আশায় অডট বার বার ছুঁচ ফুটিয়ে চলল আমার ডান হাতে। কখনও ছুঁচটা প্রয়োজনের চেয়ে ছোটো হয়, কখনও লম্বা। ফের ছুঁচ ফোটাও তাই। পাগলা কুকুরের মতো ফের আমি চিৎকার শুরু করলাম। “আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরো আমায়,” বললাম টেরেকে। হাতটা যাতে না নড়ে তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু অডট মোটেই সন্তুষ্ট নয় ওতে।
“নড়বে না একদম! ঠিকঠাক হতেই হবে এটা, যতক্ষণ দরকার ততক্ষণ চালিয়ে যাব আমি।”
“চেষ্টা তো করছি যতটা পারি! তোমার কাজ করে যাও তুমি। চিন্তা নেই, সহ্য করব।”
আবার বাড়িয়ে দিলাম ডান হাত। ধমনী যখন খুঁজে পেল অডট তখন ছুঁচের মধ্যে রক্ত জমে গেল! রক্ত এখনও খুব ঘন হয়ে আছে। একই জায়গায় যাতে বার বার ছুঁচ ফোটাতে না হয় সে জন্য কনুইয়ের ভাঁজ থেকে ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে উঠতে কাঁধ অবধি পৌঁছে গেল অডট। দু’বার ছুঁচটা ফুটল স্নায়ুতে। সে এক অসহ্য যন্ত্রণা!
“একটু সহ্য করো, মরিস,” ফিসফিস করে বলল টেরে, “এক্ষুনি হয়ে যাবে। জানি যন্ত্রণা হচ্ছে খুব, আমি তো আছি পাশে।”
হ্যাঁ, জানি টেরে আমার পাশে আছে। ও পাশে না থাকলে এ দুর্বিষহ যন্ত্রণা আমি সহ্য করতে পারতাম না। অসম্ভব শক্তিশালী এই মানুষটাকে দেখলে মনে হয় কতই না জানি কাঠখোট্টা, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে এত নরম! ওর কোলে মাথা গুঁজে দিলাম আমি, টেরে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল আমায়।
“নাও, কী করবে জলদি করো,” বললাম অডটকে।
“দুত্তোর, এ ছুঁচটা খুবই সরু আর ছোটো,” অডটও ধৈর্য হারাতে শুরু করেছে। ছুঁচ আর সিরিঞ্জ নিয়ে ওর এই পিটপিটেমিতে বিরক্ত লাগছিল খুব। সন্দেহ হচ্ছিল, ভালো নার্সিং হোমেও একবারের চেষ্টায় কাজটা পারত কিনা সে! বেশ কয়েক ঘন্টা এবং ভগবান জানে কতবার চেষ্টার পর ইঞ্জেকশনটা ঠিকঠাক দেওয়া গেল। সিরিঞ্জ থেকে ওষুধটা ধীরে ধীরে রক্তে মিশে যাচ্ছিল। অসহ্য যন্ত্রণা সত্ত্বেও নড়াচড়া না করে স্থির শুয়ে রইলাম। দ্বিতীয় সিরিঞ্জটা খালি হওয়ার পর অনুভব করলাম রক্তে একটা গরম ভাব ছড়িয়ে পড়ছে। অডট উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল, কিন্তু রক্তের সে গরম ভাবটা ধীরে ধীরে অসহ্য এক জ্বালা ধরিয়ে দিল। চিৎকার করতে করতে টেরেকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর, অবশেষে বুঝতে পারলাম ছুঁচটা খুলে নিয়ে জায়গাটায় স্পিরিট আর তুলো লাগিয়ে দেওয়া হল।
“ডান হাত শেষ, এবারে বাঁ হাত,” বলল অডট।
বাঁ হাতে কিছুতেই আর ধমনী খুঁজে পায় না সে! বললাম, ছোটোবেলায় বাঁ হাতে গুরুতর চোট পেয়েছিলাম একবার। ধাঁধাঁটা এবার অডটের কাছে পরিষ্কার হল। ওইজন্যই বাঁ হাতে রক্তচাপ বা পালস, কিছুই পাচ্ছিল না সে। ধমনীর অবস্থানটা এ হাতে স্বাভাবিক নয়, কনুইয়ের ভাঁজে ইঞ্জেকশন দেওয়া যাবে না তাই, দিতে হবে কাঁধে, যা আরও কঠিন। পাঁচ-ছ’বার চেষ্টার পর অডট চিৎকার করে উঠল, “পেয়েছি!” অনড় হয়ে শুয়ে রইলাম আমি, সিরিঞ্জের পর সিরিঞ্জ ওষুধ রক্তে মিশে চলল।
“এবার তোমার ঘাড়ে একটা নোভোকেইন ইঞ্জেকশন দিতে হবে,” বলল অডট, “এটা একটা বিশেষ ধরনের ইঞ্জেকশন, ছুঁচটা খুব লম্বা, এক বিশেষ কোণে ঢুকিয়ে ঘাড়ের পেছনে স্নায়ুকেন্দ্র অবধি পৌঁছোতে হবে। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য দরকার এটা, যাতে ভবিষ্যতে ধমনী খুঁজে পেতে সুবিধে হয়।”
আর পারছিলাম না আমি। যথেষ্ট হয়েছে! ঘন্টার পর ঘণ্টা এই অত্যাচার সহ্য করে চলেছি। কিন্তু, অডটের দেখি কোনও হেলদোল নেই। ছুঁচ, সিরিঞ্জ ইত্যাদি প্রস্তুত করে সে আমার ঘাড়ে হাত বুলিয়ে জায়গাটা খুঁজতে লাগল। বাধ্য হয়ে বললাম, “ছুঁচ ফোটানোর আগে বোলো একবার।”
“এই যে, ফোটাচ্ছি এবারে,” ঘোষণা করে অডট।
তাড়াতাড়ি টেরেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম ফের। মনে মনে ঠিক করলাম, একটুও নড়ব না এবারে। ঢুকছে ছুঁচটা! নিশ্চয়ই অনেক লম্বা। বুঝতে পারলাম, ঘাড়ের ভেতরে খুব সংবেদনশীল এক জায়গায় পৌঁছে থামল ছুঁচের ডগাটা। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলাম। এর মধ্যে অডট আবার ঠিক জায়গায় পৌঁছনোর জন্য ছুঁচটা নাড়াচাড়া করছে। “ঢুকেছে! এক বারের চেষ্টায়!” উত্তেজিত হয়ে বলল সে।
“সময় লাগবে?” কোনোমতে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“প্রায় হয়ে এসেছে। ব্যস, আর মাত্র কুড়ি সি.সি.।”
বুঝতে পারলাম, ছুঁচটা ধীরে ধীরে বার করে নেওয়া হচ্ছে। ইঞ্জেকশনের পালা শেষ! অবশেষে শান্তি! অডট খুব খুশি। প্রায় সারাদিন সময় লাগলেও, শেষ পর্যন্ত যা যা চায় সবই ঠিকঠাক করতে পেরেছে সে। জীবনে কোনোদিন এমন ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা সহ্য করিনি, কিন্তু আমার হাত-পায়ের কিছুটাও যদি বাঁচে তবে সেটা অডটের এই নাছোড়বান্দা মনোভাবের জন্য। ল্যাচেনালের তাঁবুর দিকে যাওয়ার জন্য অডট আর আইজ্যাক এবার যন্ত্রপাতি গোছাতে শুরু করল। আপাতত আমার অবস্থায় অডট সন্তুষ্ট, তবে শেষ পর্যন্ত হাত-পায়ে তুষারক্ষতের প্রভাব কতটা থাকে তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
দু’নম্বর শিবির একটা হাসপাতালে পরিণত হয়েছে প্রায়। দলের সবার সমস্ত চিন্তাভাবনা আর কাজকর্ম আপাতত আহত সদস্যদের শুশ্রূষাকে ঘিরে আবর্তিত হয়ে চলেছে। ডাক্তার সাহিব অডটের কথাই এখানে শেষ কথা। সে-ই এখন অভিযানের অবিসংবাদী নেতা।

(এরপর আগামী সংখ্যায়)

 জয়ঢাকের খেলা লাইব্রেরিতে এমন অনেক অভিযানের সংগ্রহ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s