ধারাবাহিক অভিযান এভারেস্ট এরিক শিপটন অনুবাদ বাসব চট্টোপাধ্যায় শরৎ ২০১৬

এভারেস্ট  এরিক শিপটন সব পর্ব একত্রে


দক্ষিণাভিমুখী পদক্ষেপ

         যুদ্ধ সমাপ্ত হবার প্রথম কিছু বছর এভারেস্ট অভিযানের উদ্যোগে আসতে থাকল নানা রকম সমস্যা। তিব্বত সরকারের পাঠানো আবেদন ব্যর্থ হল। অগত্যা পরিত্যাগ করতে হল পুরনো জনপ্রিয় পথ। ১৯৫০ সালে চিনা কমিউনিস্ট আর্মির তিব্বত দখলের পরিণতি হিসেবে দীর্ঘদিনের জন্য পশ্চিমযাত্রীদের সে দেশে অনায়াস যাতায়াত বন্ধ হল।

  পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমি উল্লেখ করেছি যে অনেক আগে অর্থাৎ ১৯৩৫-এ শৃঙ্গ আরোহণের বিকল্প পথের সন্ধান আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু সে পথ আমরা এড়িয়ে গেছি বিশেষ কারণে। অধিক উচ্চতায় একের পর এক বিন্যস্ত পাথুরে এবং বরফের বিশাল স্ল্যাবের উপস্থিতি উত্তর গাত্র দিয়ে সংগঠিত বহু অভিযানই ব্যর্থ করেছে।

khelaeverest05 (Medium)   কুংসুং হিমবাহের উপর দিয়ে পূর্ব দিকে প্রবাহিত একটি রিজ আমাদের দৃষ্টি গোচর হল। আমরা দেখলাম এভারেস্ট এবং লোৎসের অন্তর্বর্তী ফাঁকা জায়গা দিয়ে পথটি সোজা শৃঙ্গের দিকে চলে গেছে। সেই পথ অর্থাৎ সাউথ কল, যা পিরামিডাকৃতি উচ্চতম শৃঙ্গের দিকের পৌঁছনোর পক্ষে সম্ভাবনাময়। এ পথ অনেকটাই ছড়ানো। ধীরে ধীরে উচ্চতা বৃদ্ধি হয়ে শৃঙ্গের

                                            কুংসুং হিমবাহ

দিকে এগিয়ে গেছে। অর্থাৎ অভিযানে খাড়াই পথ এড়িয়ে আরোহণের সম্ভাবনা থাকায় অভিযাত্রীদের কাছে গ্রহণীয়। কিন্তু কোন পথ ধরে অভিযাত্রীরা ঐ সহজতম আরোহণের পথ সাউথ কল পৌঁছবেন? দুর্গমতার কারণে পূর্ব দিক দিয়ে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব, পশ্চিম দিকের পথ অজানা।

          ১৯২১ সালে এভারেস্টের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের বিস্তৃত ভৌগোলিক সীমারেখা আবিষ্কৃত হয়। একে অপরের সাথে বিশাল রিজ সংলগ্ন প্রধান তিনটি শৃঙ্গ এভারেস্ট, লোৎসে, নাপৎসে। পর্বতারোহী ম্যালোরি ঐ তিন শৃঙ্গ সংযুক্ত বেসিনটির নাম দিয়েছিলেন West CWM. সাউথ কল অভিমুখী যে কোনো পথ লুকিয়ে আছে এই উপত্যকায়। এভারেস্টের সম্পুর্ণ দক্ষিণ দিক বরাবর যা বিস্তৃত। কিন্তু কোন অভিযাত্রী অবগত ছিলেন না প্রকৃত CWM-এর অবস্থান। ১৯৩৫ সালের অভিযানে উত্তর দিক দিয়ে আমরা CWM-এর পৌঁছবার পথ অন্বেষণের চেষ্টা করেছিলাম। ব্যর্থ হয়ে বুঝলাম নেপালের পথ দিয়েই লক্ষ্যে পোঁছনো সম্ভব। কিন্তু সে’সময় নেপাল এবং তিব্বতের পথ ছিল ইউরোপীয়ানদের কাছে নিষিদ্ধ।

          যুদ্ধ সমাপ্ত। নেপালে সরকারের নীতির শিথিলতায় বিদেশী ভ্রমণার্থীদের  প্রবেশে আর বাধা রইল না। ১৯৫১ সালে জুন মাসে ব্রিটিশ অভিযাত্রীদের কাছে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দিয়ে এভারেস্ট অভিযানের অনুমতি এল। হাতে এল অভিযানের নেতৃত্বের আমন্ত্রণ।

khelaeverest06 (Medium)

পরে উড়ে গেলাম ভারতে। ইংল্যান্ড ছাড়ার কয়েকদিন আগে আমার হাতে নিউজিল্যান্ড আলপাইন ক্লাবের প্রেসিডেন্টের চিঠি এল। চিঠিতে অনুরোধ করেছেন দুজন নিউজিল্যান্ডের পর্বতারোহী হিমালয়ের কয়েকটি শৃঙ্গে অভিযানের অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে আমাদের অভিযানে যোগ দিতে চান। ১৯৩৫-এর সামরিক কারণে এই বিশেষ অঞ্চল পরিদর্শন এবং গবেষণার জন্য ছিলেন এমনই নিউজিল্যান্ডীয় অভিযাত্রী। আমি এই দেশের পর্বতারোহীদের সম্পূর্ণ উচ্চ ধারণা পোষণ করতাম। স্বাভাবিকভাবেই এই প্রস্তাব আমার কাছে গ্রহণযোগ্য হল। কিন্তু নেপাল পৌঁছনোর পূর্বে আমি সেই পর্বতারোহীর নামও জানতাম না। নিউজিল্যান্ডের দুজন প্রখ্যাত পর্বতারোহীর নাম তখন আমার মস্তিষ্কে। একজন H.E.Rediferd এবং অন্যজন Edmund Hillary। অবশেষে কৌতূহলের

                  হিলারি

অবসান হল। অভিযানের সাথী হিসাবে ভবিষ্যতের প্রথম এভারেস্ট শৃঙ্গ আরোহী তখন আমাদের সামনে।খুব কম সময়ে অভিযানের ন্যূনতম সাজসরঞ্জাম গুছিয়ে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে আমরা ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। W.H.Murry, M Ward, T.D.Burdillon এবং আমি অভিযানের যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী। ঠিক হল প্রথম দুজন জাহাজে যাবেন অভিযানের খাদ্য সামগ্রীর দায়িত্ব নিয়ে। আমি এবং Bundillon তাঁদের যাত্রার পনেরো দিন

khelaeverest03 (Medium)উত্তর ভারত থেকে পদব্রজে পূর্ব নেপালের নামচেবাজার পোঁছলাম। এভারেস্টের দক্ষিণ পূর্ব পাদদেশে কুম্বু জেলার অন্তগর্ত ঐ অঞ্চলেই শেরপাদের বাসস্থান। সম্পূর্ণ পথই রেইন ফরেস্ট পরিবৃত। প্রায় অনতিক্রম্য এ পথ তিব্বতের দিক দিয়ে পুরনো পথের তুলনায় কঠিনতর। গভীর অরণ্যে সম্পূর্ণ স্যাঁতস্যাঁতে পথের আধিক্যে পথ হারানোর সমূহ সম্ভাবনা।

                                 সঙ্গী শেরপারা         

২২ সেপ্টেম্বর নামচেবাজার পোঁছলাম। ততদিনে সে বছরের মত বর্ষার মরসুম শেষ। বিশাল আইস ফলের পাদদেশ দিয়ে চারদিনের চেষ্টায় পথ নির্মিত হল। পশ্চিম CWM. ২০০০ ফুট উঁচু এই সংকীর্ণ প্রবেশ পথ চোদ্দো বছর আগেও আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। সাউথ কল অভিমুখী পথ অতিক্রমে প্রথম অন্তরায় ঐ বিস্তৃত আইস ফল। ঐ আইসফল অঞ্চলেই শায়িত পশ্চিম CWM পৌঁছনোর পথ। অটল ধৈর্যেই ঐ ভয়ংকর পথ অতিক্রম সম্ভব। পশ্চিম CWM সংকীর্ণ পথে উপরের ঝুলন্ত হিমবাহ গলে যে কোনো মুহুর্তে তুষার ধ্বস নেমে আসতে পারে।

 ৩০ সেপ্টেম্বর যখন দলের সদস্যরা আইসফলের নীচের অংশের প্রকৃতি অন্বেষণে ব্যস্ত, তখন হিলারি এবং আমি উপত্যকার বিপরীতের ২০০০০ ফুট উচ্চতার শৃঙ্গ আরোহণের সময় উপলব্ধি করলাম তুষার ধ্বসের সম্ভাবনার ভয়াবহতা। শৃঙ্গের উপর থেকে ডানদিকে তাকানো মাত্র আমি উত্তেজিত। পশ্চিম CWM শীর্ষস্থল তখন আমার দৃষ্টিগোচরে। South Call-এর দিকে প্রসারিত। চিন্তা করলাম ডান দিকে CWM উপরোক্ত অংশে আরোহণ সম্ভব না হলে পার্শ্ববর্তী শৃঙ্গগুলি দৃশ্যমান হবে না। অপ্রত্যাশিতভাবে সমস্যার সমাধানও তখন আমাদের সামনে। লোৎসে আরোহণের পথ ২৫০০০ ফুট থেকে সরলরেখা বরাবর প্রসারিত। এবং আড়াআড়িভাবে যেন সাউথ কলের উদ্দেশ্যে প্রবাহিত।

khelaeverest04 (Medium)

অভিযাত্রীদলঃ দাঁড়িয়ে বাঁদিক থেকে শিপটন, মারে,বার্দিলোঁ, রেডিফার্ড । বসে বাঁদিক থেকে ওয়ার্ড ও হিলারি

অকস্মাৎ এই পথ আবিষ্কার করে আমাদের উত্তেজনার পারদ উর্ধগামী। বহু বছর ধরে নিজেদের উদ্দেশ্যে করা অসংখ্য প্রশ্নের সমাধান হল এক লহমায়। কিন্তু আইসফলের মধ্যবর্তী অঞ্চলে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করলাম অগ্রসরমান ঐ বিস্তৃত পথের দুধারের  প্রতি মুহুর্তে বিপুল তুষারধ্বসের ভয়াবহতা। সুতরাং অভিযানের বিপুল সাজসরঞ্জাম বহন করে অভিযাত্রীদের এই পথ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অর্থ দুর্ঘটনাকে আমন্ত্রণ জানানো। ফলত অভিষ্ট শৃঙ্গের চূড়ায় পৌঁছতে বিপুল সামগ্রী CWM-এ সরবরাহ প্রয়োজন।