ধারাবাহিক অভিযান এভারেস্ট এরিক শিপটন অনুবাদ বাসব চট্টোপাধ্যায় শীত ২০১৬

এভারেস্ট  এরিক শিপটন সব পর্ব একত্রে

obhijaaneverest02

অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিচার বিবেচনা করে উত্তর দিকের ২০,০০০ ফুট বরফের দেওয়াল আরোহন শুরু করলাম। আরোহণের শুরুতে পথ যতটা ভয়াবহ  মনে হয়েছিল, ততটা বিপজ্জ্বনক ছিল না। প্রত্যক্ষ করলাম আইস ফলের মধ্যবর্তী অংশে তুষারধ্বসমুক্ত একটি সুন্দর পথ।

অবশেষে অসংখ্য রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাকে সাথী করে ওই বরফের খাড়াই দেওয়াল আরোহণ সম্ভব হল। আমাদের অবস্থা তখন শোচনীয়। সাউথ কলে পৌঁছনোর জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং সাজসরঞ্জামের অভাব। সিদ্ধান্ত নিলাম পশ্চিম CWM-এর উপরে শিবির স্থানান্তরিত করা হবে না। অপেক্ষা করতে থাকলাম

জাঁকিয়ে শীত না পড়া পর্যন্ত। সেই মূল্যবান সময় ব্যয় করলাম অজানা দেশের দক্ষিণ দিকের রেঞ্জ বরাবর নতুন পথ অন্বেষণে।

১৯৫১ সাল। বছরের শেষ প্রান্তে আমরা দক্ষিণ দিক দিয়ে এভারেস্ট অভিযানের বিকল্প পথ আবিষ্কার করলাম। সুযোগ এল কম বিপজ্জ্বনক পথ ধরে দ্রুত শৃঙ্গ আরোহণের। কিন্তু চূড়ায় পৌঁছনোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ের সম্মুখীন হলেন আরোহীরা, যে বিষয়গুলির কথা পূর্বে অভিযাত্রীরা কল্পনাও করেননি।

প্রথমত এটি একটি নতুন পথ। নিঃসন্দেহে উত্তর দিকের নীচের অংশ অপেক্ষা কঠিনতর দক্ষিণের এই নিম্নাংশ। শৃঙ্গের শেষ ২০০০ ফুট আরোহণে অভিযাত্রীদের সম্মুখে মৃত্যুদূতের মত উপস্থিত হয় অক্সিজেনের অভাব। বিধ্বস্ত অবসন্ন শরীরে শেষ সীমায় পৌঁছে আরোহী অবশেষে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, সমতল অংশে বিশ্রামের অবকাশ পেয়ে যান। উত্তর গাত্রের উর্ধাংশ ঘেরা পাথুরে বিন্যস্ত স্থান অপেক্ষা কম আশঙ্কাজনক।

দ্বিতীয়ত বিগত বারো বছরে অভিযানের সাজসরঞ্জামের ব্যপক উন্নতি ঘটেছে। যুদ্ধের আগে ব্যবহৃত পর্বতারোহণের সরঞ্জাম অপেক্ষা অধুনা ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি অনেক উন্নতমানের। বিশেষত উচ্চ হিমালয়ে প্রয়োজনীয় পর্বতারোহণের সাজসরঞ্জাম প্রধাণত জুতো, পোশাক এবং তাঁবু হবে হালকা এবং শীত ও বায়ু প্রতিরোধক। এ সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হালকা ধাতু আবিষ্কার যা অক্সিজেন বহনে সাহায্য করে। ফলত অতিরিক্ত ওজন বহন না করেই অভিযাত্রীরা প্রয়োজনীয় সাজসরঞ্জাম অনায়াসেই সাথে নিয়ে পৌঁছে যেতে পারেন অভিষ্ট লক্ষ্যে। ১৯৫১ সালে আমরা ইংল্যান্ডে ফেরবার পূর্বেই নেপাল সরকারের কাছ থেকে সুইস পর্বতারোহীরা আগামী বছরের অভিযানের অনুমতি পেলেন। প্রস্তাব দেওয়া হল ব্রিটিশ অভিযাত্রীরাও এই অভিযানে অংশগ্রহণ করবেন। অ্যাংলো-সুইস অভিযানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হল। সুইস অভিযাত্রীরা সব দিক থেকে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও দুটি অভিযাত্রী দলের একইসাথে একই পথে আরোহণ অবাস্তব বিবেচিত হল। সুতরাং সুন্দর আবহাওয়ার সাহায্য নিয়ে একদলের আরেকটি দলকে অনুসরণ করাই শ্রেয়। সিদ্ধান্ত হল ১৯৫২ সালের বসন্তে সুইস অভিযাত্রী দল অভিযান শুরু করবে এবং ব্রিটিশরা পরবর্তী বছরে শৃঙ্গ আরোহণের পদক্ষেপ নেবে।

এই অভিযানের ব্যবস্থাপনার অন্যতম অংশ হিসেবে এভারেস্ট অঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সম্পর্কে অবগত হয়ে শারীরিক দক্ষতার পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৫৩-এর অভিযাত্রী দল নির্বাচন করতে হবে।


এই অন্বেষণের দায়িত্ব পড়ল আমার কাঁধে। সিদ্ধান্ত নিলাম এভারেস্টের পশ্চিমাংশে ২৬৭৫০ ফুট উচ্চতার চো ওয়ু শৃঙ্গ আরোহণের। গত বছরে দক্ষিণ দিক থেকে অভিযানের সম্ভাব্য পথের সন্ধান পেয়েছিলাম। ১৯৫০-এর অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন হিলারি, রিডিফোর্ড এবং বুর্ডিলন। অভিযান পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল Campbell Secord-এর। তা সত্ত্বেও খাড়াই obhijaaneverest03বরফের দেওয়াল, আরোহীদের অগ্রগতিতে ভয় উদ্রেককারী বাধার সৃষ্টি হল। কিছু নতুন দেশেরও সন্ধান পেলাম, যার মধ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে ১১ টি শৃঙ্গ আরোহণের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অভিযাত্রী Dr. Pugh obhijaaneverest01(পরবর্তীকালে১৯৫৩-এর কর্নেল হান্টের অভিযাত্রী দলে অংশগ্রহণ করেন) উচ্চ হিমালয়ে অক্সিজেন সরবরাহের যন্ত্রপাতি নিয়ে প্রভূত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। সমাধানের পথ দেখান উচ্চতর আবহাওয়ার তারতম্যের সাথে কীভাবে একজন অভিযাত্রী নিজেকে সুস্থ রাখবেন।

১৯৫২ সালের এপ্রিল মাসে সুইস অভিযাত্রী দল নেপাল পৌঁছলো। দলের নেতৃত্বে ছিলেন Dr. Edward Wyss-Dunant এবং আরোহী দলের নেতৃত্বের ভার পড়েছিল Rene Dittert –এর উপর। এছাড়াও দলে ছিলেন প্রখ্যাত সুইস পর্বতারোহী Andre Rich এবং Raymond Lambert। পর্বতারোহী মহলে Lambert-এর বিশেষ পরিচিত কারণ – তুষার ক্ষতে পায়ের অধিকাংশ হারানোর পরও তাঁর দুঃসাহসিক আরোহণ দক্ষতা।obhijaaneverest04

সবচাইতে বাঁয়ে ল্যাম্বার্ট ও সবচাইতে ডাইনে তরুণ তেনজিং

ছজন আরোহী এবং দুজন বিজ্ঞানীকে সাথী করে এই প্রথম অব্রিটিশ এভারেস্ট অভিযান। পূর্ব অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকল। গত বর্ষায় যেভাবে আমরা তুষার ধ্বসের সম্মুখীন হয়েছিলাম। সারাদিনের কঠিন পথ অতিক্রমের পর দলটি নিরাপদ স্থানে পৌঁছল। আইস ফলের উপরেই শিবির স্থাপিত হল। পরের দিনও গিরিশিরা অতিক্রম করতে চলল অমানুষিক পরিশ্রম। আইস ফলের উপরের অংশে পৌঁছে হিমবাহের দুধারে সংযুক্ত বিশাল তুষার ফাটলের সম্মুখে তখন অভিযাত্রীরা। দলের একজন তুষার ফাটলের ৬৫ ফুট নীচে দড়ির মাধ্যমে নেমে বরফের চিমনির সাহায্যে ফাটল অতিক্রম করলেন। অন্যপ্রান্তে পৌঁছে দড়ির সেতুনির্মাণ করে অপর অভিযাত্রী দলকে একে একে নিরাপদে অনায়াসে তুষার ফাটলের অপর প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হল।২৫শে এপ্রিল কুম্বু হিমবাহে মূল শিবির স্থাপিত হল। এবং ওইদিনই আইস ফলের পাদদেশে হল ক্যাম্প-১। শিবিরে মালপত্র সরবরাহ সম্পূর্ণ হলে ২৬শে এপ্রিল একটি দল অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করল। অর্থাৎ বিশাল আইস ফল ভেঙে ভেঙে পথ তৈরি।

obhijaaneverest05

সেই সুইস  অভিযাত্রীদল

ক্রমশ

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s