ধারাবাহিক অভিযান এভারেস্ট এরিক শিপটন অনুবাদ বাসব চট্টোপাধ্যায় শীত ২০১৭

জয়ঢাকের  অভিযান লাইব্রেরি   আগের পর্বগুলো

পৃথিবীর শীর্ষস্থানে

ওইদিনই বুর্ডিলন এবং ইভান্স সাউথ সামিটে ফিরে এলেন। হান্ট এবং শেরপা দা নামগিয়াল ২৭৩০০ ফুট উচ্চতায় বিপুল পরিমাণে আরোহণ সামগ্রী জড়ো করলেন। শুরু হল নতুন উদ্যমে দ্বিতীয় অভিযাত্রী দলের আরোহণের প্রয়াস।

লো, গ্রেগরি এবং শেরপাদের সাথে হিলারি এবং তেনজিংও সাউথ কলে পৌঁছলেন। শুধু এভারেস্ট অভিযানের ইতিহাসই নয় যেকোনো দূর্গমতম শৃঙ্গ আরোহণের মুহুর্তে শেরপাদের অবদান আমাদের মত অভিযাত্রীদের কাছে যেহেতু অনস্বীকার্য, সেহেতু এভারেস্ট শৃঙ্গ আরোহণের প্রচেষ্টার দ্বিতীয় উদ্যোগের অন্তিম লগ্নে শেরপা তেনজিংকে হিলারির সহযোগী হিসেবে নির্বাচন অন্যতম মুখ্য কারণ। শেরপা তেনজিং ব্যতীত কোনো অভিযাত্রী এই সম্মান পাওয়ার অধিকারী নন। সেই ১৯৩৫ এর প্রথম এভারেস্ট অভিযানে সে আমার সাথীই শুধু নয় এ পর্যন্ত চারবার এভারেস্ট অভিযানে আমার সঙ্গে তেনজিং অংশগ্রহণ করে। এছাড়াও বছর জুড়ে হিমালয়ের বিভিন্ন শৃঙ্গাভিযানে তেনজিং ছাড়া আমার অভিযাত্রী দল সম্পূর্ণ হত না। একজন হিমালয় অন্তপ্রাণ অভিযাত্রী হিসেবে সে নিজেকে উৎসর্গ করেছিল। সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর তাবড় পর্বত অভিযাত্রী মহলে।

পূর্ববর্তী বছরে শৃঙ্গের ১০০০ ফুট নিচ থেকে খারাপ আবহাওয়ার জন্য ফিরে আসতে বাধ্য হয় তেনজিং। কোনো সহযোগী শেরপাই এই যোগ্যতার অধিকারী ছিল না। সবদিক থেকেই অভিযাত্রীরা দ্বিতীয় প্রয়াসের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু রাত থেকেই আবহাওয়ার অবনতি হতে থাকল। ২৭ তারিখ ভোর থেকে সাউথ কলে তীব্র হাওয়ার দাপট। তাপমাত্রা শূন্যের ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে। এই আবহাওয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব ধার ধরে শৃঙ্গারোহণও অসম্ভব।

২৮ তারিখ সকালে আবহাওয়ার তুলনামূলক উন্নতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল লো এবং গ্রেগরি দক্ষিণ-পূর্ব ধার ধরে অগ্রসর হবেন। স্থাপন করবেন নবম শিবির। তিনজন মালবাহক তাঁদের সাহায্য করবে। কিন্তু মালবাহকদের মধ্যে দুজন অসুস্থ হওয়ায় আরোহণ সামগ্রী নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলেন অভিযাত্রীরা। এঁদের মধ্যে লো, গ্রেগরি এবং শেরপা আং নিমা ৪০ পাউন্ডের বেশি মাল বহন করলেন।

ঘন্টাখানেক পরে হিলারি এবং তেনজিং প্রত্যেকে ৫০ পাউন্ড মাল পিঠে শীর্ষ শিবিরের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললেন। তাঁদের সুবিধা হল পূর্ব অভিযাত্রীদের নির্মিত পথ ধরে এগিয়ে চলতে। দিনের মধ্যবর্তী সময় হিলারি এবং তেনজিং পূর্ববর্তী তিন অভিযাত্রীকে ধরে ফেললেন। দ্রুত পাঁচ অভিযাত্রী পৌঁছে গেলেন হান্টের রেখে যাওয়া বিপুল আরোহণ সামগ্রীর নিকট। সিদ্ধান্ত নিলেন অধিকতর উচ্চতায় তাঁরা অন্তিম শিবির স্থাপন করবেন। অতিরিক্ত আরোহণ সামগ্রীর ভারে প্রত্যেক অভিযাত্রীর পিঠে তখন ৬৩ পাউন্ডের ওজন।

খাড়াই হলেও পথ তুলনামূলক কম বিপজ্জনক। প্রত্যেকেই অক্সিজেন ব্যবহার করছিলেন। কিন্তু অধিকতর উচ্চতায় পৌঁছেও শিবির স্থাপন উপযোগী স্থান পাওয়া গেল না। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ২.৩০ মি.। হঠাৎ তেনজিং এর মাথায় এল আগের বছরের অভিযানেই কিছুটা বামদিকে শিবির স্থাপনোপযোগী একটি স্থানের কথা। তাঁরা আড়াআড়ি অগ্রসর হতে থাকলেন। পৌঁছে গেলেন সংকীর্ণ কিন্তু শিবির স্থাপনের উপযোগী স্থানে। উচ্চতা ২৭৯০০ ফুট। চূড়া থেকে মাত্র ১১০০ ফুট নীচে। লো, গ্রেগরি এবং আং নিমা শীর্ষ শিবিরে আরোহণ সামগ্রী জমা করে ফিরে গেলেন সাউথ কল অভিমুখে। অন্তিম শিবিরের সেই উচ্চতম জনমানবহীন স্থানে নিঃসঙ্গ অবস্থায় রেখে এলেন হিলারি এবং তেনজিংকে। দুজনে অতিরিক্ত ভারী অক্সিজেনের সিলিন্ডার অ্যাঙ্কার হিসেবে ব্যবহার করে তাঁবুর অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। স্থাপিত হল সামিট ক্যাম্প।এখানে অক্সিজেনের প্রভূত অভাব। সঙ্গে থাকা অক্সিজেন সিলিন্ডারও প্রয়োজনের তুলনায় কম। দুশ্চিন্তায় পড়লেন দুই অভিযাত্রী।  হিলারি অক্সিজেনের ব্যবহারের যন্ত্রপাতি যতটা সম্ভব  নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহার করতে বাধ্য হলেন। কারণ ঐ হিসাব করা অক্সিজেন নিয়েই তাঁদের শীর্ষারোহণ করে একইদিনে সাউথ কলে ফিরে আসতে হবে।

অন্ধকার ঘনিয়ে এল। ত্রিসীমানায় তখন তীব্র ঠান্ডা হাওয়ার গর্জন। জ্যাম, জেলি, বিস্কুট, সার্ডিন এবং প্রস্তুত করা অ্যাপ্রিকট একত্র করে স্টোভের উত্তাপে গলানো এক অদ্ভুত উপাদান গলাধ্যকরণের পর স্লিপিং ব্যাগে প্রবেশ করলেন অভিযাত্রীরা। অধিক উচ্চতায় সামান্য নড়াচড়া করলেই অক্সিজেনের অভাব বোধ হয়। একমাত্র ঘুমন্ত অবস্থায়ই আরামদায়ক। কিন্তু ঘুম ভাঙলেই ক্লান্তি এবং শ্বাসক্রিয়ায় বিঘ্ন। অত্যধিক ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন অভিযাত্রীদের শরীর তীব্র ঠান্ডার দাপটে হয়ে পড়ে নিস্তেজ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁবুর দেওয়ালে শুরু হল বাতাসের বিরামহীন আঘাত। অ্যাংকার করা সত্ত্বেও সামান্য তাঁবুর স্থান পরিবর্তনে হিলারি তখন আতংকিত। তাপমাত্রা –২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাঝরাতে হাওয়ার দাপট কিছুটা কমল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁবুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিদ্রাহীন রাত কেটে গেল অভিযাত্রীদের। ভোর তখন ৬.৩০ মি. আবহাওয়া পরিষ্কার এবং শান্ত।

পরিষ্কার নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে অভিযাত্রীদের তখন একটিই ভাবনা –সাউথ সামিটে পৌঁছনো। তিনদিন আগেই যেখান থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন বুর্ডিলন এবং ইভান্স। ধীরে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চললেন অভিযাত্রীরা।

সাউথ সামিট পৌঁছলেন সকাল ৯টায়। চোখের সামনে মাথা তুলে তখন এক আনক্লাইম্বড রিজ, যা অনুসরণ করেই এগিয়ে যেতে হবে এভারেস্ট শৃঙ্গে। দুজনের আসনোপযোগী জায়গা তৈরি করলেন শৃঙ্গ মুকুটের ঠিক নীচে। অক্সিজেনের মুখোশ খুলে ফেললেন দুজনেই সময়ের আন্দাজ করবার চেষ্টা করতে থাকলেন। কত অক্সিজেন ব্যয় হয়েছে? কতটাই বা সঞ্চয় প্রয়োজন? গণনার মাধ্যমে বুঝলেন সাড়ে ৪ ঘণ্টার বেশি সময় হাতে আর নেই।

সামনের রিজ ধরে কার্নিশে পৌঁছনো বিপজ্জনক। যেকোনো মুহুর্তে বিপুল নরম তুষারাচ্ছন্ন পথ আরোহীর সামান্য ওজনেই ভেঙে পড়তে পারে।  চূড়ার বামদিকের অংশ অর্থাৎ West CWM উপরের অংশ যেহেতু কঠিন বরফাচ্ছাদিত, সে পথেই একমাত্র শৃঙ্গারোহণ সম্ভব। হিলারি সিদ্ধান্ত নিলেন এই কঠিন বরফ কেটে কেটে নিরাপদে চূড়ায় পৌঁছনো সেই মুহুর্তে একমাত্র পথ।

হিলারির দিনলিপি থেকে উদ্ধৃতি—‘রিজের শক্ত বরফে পথ তৈরির প্রথম সিঁড়ি কেটেছিল আমার আইস অ্যাক্স। স্ফটিকের ন্যায় সেই বরফে প্রথম আঘাতই আমাকে প্রত্যাশার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে দিল।’

সামান্য তফাৎ রেখে হিলারি এবং তেনজিং এগিয়ে চললেন। সহঅভিযাত্রী তেনজিং এর দড়ির সাহায্যে তৈরি সুরক্ষা বলয়কে পাথেয় করে বরফের দেওয়ালের ধাপ কেটে প্রথম আরোহণ করতে থাকলেন হিলারি। রিজের বামদিকে সঠিক পাথুরে পথ ধরে এগিয়ে যেতে থাকলেন । ৮০০০ ফুট নীচে চোখে পড়ল বিন্দুর মত West CWM এর চতুর্থ শিবির। আবহাওয়া সুন্দর হওয়া সত্ত্বেও তুষারাচ্ছাদিত রিজের উপরে অনবরত তীব্র হাওয়ার দাপট। ঘন্টাখানেক এগোনোর পর অকস্মাৎ এক কঠিনতম বাধার মুখোমুখি অভিযাত্রীরা। সম্মুখে ৪০ ফুটের পাথুরে দেওয়াল। সরাসরি আরোহণ অসম্ভব হওয়ায় হিলারি দুটি পাথুরে দেওয়ালের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ স্থানের(চিমনি) তুষারাচ্ছাদিত পথ আবিষ্কার করে আরোহণ শুরু করলেন। বরফের ধাপ কেটে কেটে চলতে থাকল আরোহণ। তবুও শৃঙ্গের চূড়া নজরে এল না। ঘন্টাদুয়েক এক নাগাড়ে বরফ কেটে আরোহণ করলেন হিলারি। এবার তাঁরা ধীরে ধীরে এগোতে থাকলেন। চূড়া থেকে তাদের বর্তমান দূরত্ব তখন অনেক কম।

অপ্রত্যাশিত ভাবে তাঁরা একটা সমান্তরাল স্থানে পৌঁছালেন। যেখান থেকে সরাসরি নর্থ কল দেখা যায়, যে পথে আছে প্রথম এভারেস্ট অভিযাত্রীদের ৩০ বছর পূর্বের সংগ্রামের চিহ্ন। দূরে দেখা যাচ্ছে রংবুক হিমবাহ। তিব্বতের খয়েরি রেখা। পৃথিবীর প্রথম দুটি মানুষ অকস্মাৎ উপলব্ধি করলেন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সবচেয়ে উচ্চতম স্থান এভারেস্টের চূড়ায় তাঁরা। করমর্দনের পর হিলারি শার্টের মধ্যে থেকে সযত্নে রক্ষিত ক্যামেরা বার করলেন। তুষার কুঠার হাতে তেনজিং এর ছবি তুললেন। যার গায়ে বাঁধা ইউনাইটেড নেশন, ব্রিটিশ, নেপালি এবং ভারতের জাতীয় পতাকা।

বরফের মধ্যে তেনজিং একটা গর্ত খুঁড়ে উৎসর্গ করে রেখে এলেন অনেকগুলি স্মারক। হিলারি হান্টের দেওয়া একটি ক্রুসিফিক্স পুঁতে দিলেন গর্তে।

এই সামান্য আড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে অনুভব করা যাবে না সেই মুহুর্তের দুই অভিযাত্রীর এভারেস্টে প্রথম আরোহণের উত্তেজনাকর অনুভূতি।

৩০ বছর আগে এভারেস্ট অভিযানে যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল তার অন্তিম মুহুর্তের অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতা হৃদয় দিয়ে ভাগ করে নিলেন পৃথিবীর সকল পর্বতারোহী এবং হিমালয়প্রেমী। ঈশ্বরের বর পেয়ে হিলারি এবং তেনজিং শীর্ষারোহণের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার ঝুলি বহন করে ফিরে এলেন সমতলে। প্রতি মুহুর্তে উপলব্ধি করলেন পৃথিবীর প্রতিটি কোণে তাঁদের সুখ্যাতি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মানবজাতির ইতিহাসে অকল্পনীয় সম্মান তখন তাঁদের মুকুটে। নিন্দুকরা বলতে লাগলেন,— “হায় পৃথিবীর শীর্ষবিন্দু আরোহণের সাথে সাথে কোন অভিযাত্রীদেরই উচ্চতম অগম্য স্থান বলে আর কিছু রইল না।”

এই উক্তির সাথে কোন সৎ অভিযাত্রী একমত ছিলেন না। কারণ তাঁরা জানতেন মধ্য এশিয়ায় ২৫০০০ ফিটের অধিক উচ্চতার অসংখ্য শৃঙ্গ বিদ্যমান। বহু দেশের অভিযাত্রীরাই শতবর্ষ জুড়ে আরোহণের চেষ্টা করেছেন। ডজনেরও অর্ধেক চূড়ায় পা রাখতে পেরেছেন । শুধু তাই নয় এভারেস্ট আরোহণের চেয়েও কঠিন ও দূর্গমতম সেসব শৃঙ্গে আরোহণ করতে অধিকতর দক্ষতা প্রয়োজন।

সেসব শৃঙ্গের উচ্চতা ১৮০০০ ফুট থেকে ২৫০০০ ফুটের মধ্যে। অধিকাংশ শৃঙ্গই নামহীন। সঠিক উচ্চতা নিরূপণও সম্ভব হয়নি। মানচিত্রেও অধিকাংশের কোন চিহ্ন নেই। অনেক কম উচ্চতার শৃঙ্গ আছে যা আধুনিকতম পর্বতারোহণের সাজসরঞ্জাম ব্যতীত আরোহণ প্রায় অসম্ভব। আমি বিশ্বাস করি এভারেস্ট শৃঙ্গ আরোহণ পৃথিবীতে পর্বতারোহণকে জনপ্রিয় করে তুলল। যেমন প্রথম ম ব্লাঁ আরোহণ অ্যালপাইন ক্লাইম্বিং এর ‘সোনালী দিন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, তেমনই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এভারেস্ট আরোহণকে হিমালয়ে পর্বত অভিযানের ‘সোনালী দিন’ হিসেবে চিহ্নিত  করবেন। পর্বত অভিযাত্রীদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার আর কোন অভাব রইল না। আমাদের পর্বতপ্রেমী উত্তরাধিকাররা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিজেদের সমর্পণ করলেন হিমালয়ে পর্বতাভিযানের এই বিপুল প্রাচুর্যে।  

লেখার শেষে কিছু দষ্প্রাপ্য ছবি সাজিয়ে দেয়া হল। প্রথম সফলেভারেস্ট অভিযানেরসমস্ত অভিযাত্রী, এভারেস্টের রুট ম্যাপ– সব।

।।সমাপ্ত।।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s