ধারাবাহিক অভিযান কনটিকি অভিযান থর হেয়ারডাল অনুবাদ ইন্দ্রনাথ বর্ষা ২০১৯

কন-টিকি অভিযান-আগের পর্বগুলো

(১২)
থর হেয়ারডাল
(অনুবাদঃ ইন্দ্রনাথ)

আগের কথা
সমুদ্রে ভেসে পরার পর কয়েকদিন অশান্ত সমুদ্রের সঙ্গে যুঝে অভিযাত্রীরা ঢেউয়ের দুলুনির সঙ্গে একরকম অভ্যস্তই হয়ে উঠল; সমুদ্র যদিও শান্ত হয়ে এসেছিল। আরেকটা ভাবনা শুরু হল – বালসা কাঠ জল টেনে ভারী হয়ে উঠছে, ভেলা শেষমেষ সাগড় পাড়ি দিতে পারবে তো? পর্যবেক্ষণে দেখা গেল, দড়িগুলো কাঠের মধ্যে এমন বসে গেছে যে জল লেগে পচে যাবার ভয় নেই। এবারে মাছ ধরায় মন দিলেন অভিযাত্রীরা; টুনা, বনিটো, ডলফিন আর উড়ুক্কু মাছ। হ্যাঁ এই অঞ্চলে উড়ুক্কু মাছের প্রাচুর্য। এরই মধ্যে এক রাতে অন্ধকারের মধ্যে ভেলায় এসে পড়ল গভীর সমুদ্রের একটা ঘোলাটে কালো চোখ আর লম্বা নাকের সাপের মতো চেহারার একখানা মাছ। জ্যান্ত এ মাছ তো কেউ কখনো দেখেইনি, এমনকী এর কঙ্কালও খুব বিরল। এগুলির নাম জেমপিলাস। এক রাতে অভিযাত্রীদের এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল। অতিকায় এক প্রাণী জলের ভেতর ভেলার নীচে এসে দেখা দিল। তার গায়ে নীলাভ আলোর ছটা। ওরা বুঝতে পারলেন না কী ছিল সেটা। দিন দেড়েক বাদে দিনের আলোয় সেই দানবাকৃতি প্রাণীটার আবার দেখা মিলল। তার গায়ে লেগে থাকা একঝাঁক পাইলট মাছ। ওরা বুঝতে পারলেন ওটা একটা তিমি-হাঙর। মাছধরার হুকে ডলফিনের টোপ দিলেন অভিযাত্রীরা। শেষ অবধি ওটাকে শিকার করা গেল না। হারপুন শরীরে বিঁধলেও দড়ি ছিঁড়ে বিশালাকায় প্রাণীটা মিলিয়ে গেল জলের গভীরে, আর দেখা গেল না ওটাকে। ভেলা তখন পশ্চিমদিকে ভেসে চলেছে। এবারে দেখা দিল এক কচ্ছপ। ডলফিনদের আক্রমণে নাজেহাল। ল্যাসো তৈরি করে রাবারের ভেলায় চড়ে ওটাকে পাকড়াও করার আগেই কচ্ছপটাও ডুব দিল সমুদ্রের গভীরে। হারম্যান বেঙ্গটদের নানাবিধ মাংসের পদ আর টার্টল স্যুপ খাবার বাসনা অপূর্ণই রইল।

মাঝপথে

সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে গেল আমরা না একটা জাহাজের দেখা পেলাম, না ভেসে আসা কোনো টুকরো টাকরা, যাতে বোঝা যায় পৃথিবীতে অন্য কোনো লোকও আছে। গোটা সমুদ্রটাই এখন আমাদের; দিগন্তের দরজাগুলো খোলা, শান্তি আর স্বাধীনতা যেন খোদ স্বর্গ থেকে ঝরে পড়ছে।
বাতাসের টাটকা নোনা গন্ধ, চারপাশের অবিমিশ্র নীল জল আমাদের দেহ ও মন দুইই ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে দিয়েছিল। ভেলায় থাকাকালীন আমাদের কাছে সভ্য মানুষদের সমস্যাগুলো অসার এবং অলীক মনে হত, মানুষের মনের বিকার যেন। আবহাওয়াটাই প্রধান ছিল, বিশেষত খারাপ আবহাওয়া। আর সেটাও যেন এই ছোট্ট ভেলাটাকে গুরুত্ব দিত না। অথবা আরেকটা প্রাকৃতিক উপাদানের মতোই গ্রহণ করে নিয়েছিল, সমুদ্রের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যহত না করে যেটা পাখি বা মাছের মতোই সমুদ্র ও তার স্রোতের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। ভয়াল শত্রু হয়ে আছড়ে পড়ার বদলে আবহাওয়া বন্ধুর মতো ধীরস্থির ভাবে আমাদের এগিয়ে দিচ্ছিল। বাতাস আর ঢেউ যখন আমাদের ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল পাশাপাশি সামুদ্রিক স্রোতও নীচ থেকে আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছিল গন্তব্যের দিকে। কোনো নৌকো সমুদ্রে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের যাত্রাপথে এলে দেখত সাদা ফেনার মুকুট পরা লম্বা পেল্লায় ঢেউয়ের মাথায় ওপর নীচে শান্তভাবে দুলতে দুলতে চলেছি, আর বাণিজ্যবায়ু আমাদের কমলারঙের পালটা ফুলিয়ে রেখেছে পলিনেশীয়ার দিকে মুখ করে।
নৌকোর ওপরের লোকেরা নিশ্চয় দেখতে পেত ভেলার পেছনের দিকে বাদামি দাড়ির একটা লোক, গায়ে কোনো পোষাক নেই, হয় দড়িবাঁধা লম্বা একটা দাঁড় নিয়ে কসরৎ করছে নয়ত শান্ত আবহাওয়ায় একটা বাক্সের ওপর বসে, পা-টা দাঁড়ে আলগা ফেলে রেখে, কড়া রোদ্রে ঝিমোচ্ছে। ওই লোকটা যদি বেঙ্গট না হয়, তাহলে তাকে নিশ্চিত দেখা যেত কেবিনের মধ্যে ওর নিয়ে আসা তিয়াত্তরটা সমাজবিদ্যার বইয়ের একখানা নিয়ে উপুড় হয়ে রয়েছে। বেঙ্গটকে ভাঁড়ারের দায়িত্বও দেয়া হয়েছিল, প্রতিদিনের র্যারশন ঠিক করার দায়িত্বও ছিল ওর। হারম্যানকে দিনের যেকোনো সময় যেকোনো জায়গাতেই দেখা যেতে পারত – আবহাওয়ার যন্ত্রপাতি নিয়ে মাস্তুলের ওপর, সাঁতারু চশমা পরে ভেলার তলায় কোনো একটা পাটাতন পরীক্ষা করতে, অথবা পেছনে রাবারের ডিঙিতে বেলুন আর নানারকম মাপজোকের যন্ত্রপাতি নিয়ে। ও ছিল আমাদের টেকনিক্যাল চিফ, আবহাওয়া এবং জলভাগ সম্বন্ধে যাবতীয় পর্যবেক্ষনের দায়িত্ব ছিল ওর।
ন্যুট আর টরস্টাইন সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকত ওদের নানারকম ব্যাটারি, ঝালাইযন্ত্র আর বিদ্যুত-বর্তনী নিয়ে। যুদ্ধের সময়ে ওদের শেখা সমস্ত বিদ্যা, জলের ঝাপটা আর স্যাঁতসেতে আবহাওয়াতে জলতল থেকে একফুট উঁচুতে রাখা রেডিওটা সচল রাখার জন্য কাজে লেগেছিল।
প্রতি রাত্রে ওরা পালা করে আমাদের খবরাখবর আর আবহাওয়ার বিবরণ বেতার সংকেতে পাঠাত যাতে কোনো শখের বেতারগ্রাহক দৈবাৎ সেটা পেলে ওয়াশিংটনের মেটিরিওলজিক্যাল ইন্সটিটিউট অথবা অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে পারে। এরিক সাধারণত বসে বসে পাল মেরামত করত, দড়ির অংশ জুড়ত, অথবা কাঠ খোদাই করত অথবা দাড়িওলা লোক কিংবা অচেনা মাছের ছবি আঁকত। আর প্রতিদিন দুপুর বেলায় একটা বাক্সের ওপর সেক্সট্যান্ট যন্ত্রটা বসিয়ে সূর্যের গতি দেখে মাপত আগের দিনের তুলনায় কতটা এগোলাম আমরা। আমার অনেক কাজ ছিল – লগবুক, রিপোর্ট তৈরি, প্ল্যাংকটন সংগ্রহ, মাছধরা আর ছবি তোলা। প্রত্যেকের নিজের নিজের কাজের এলাকা আর দায়িত্ব ভাগ করা ছিল, কেউ কারো বিষয়ে নাক গলাত না। কঠিন কাজগুলো, যেমন হালে নজর রাখা, রান্নাবান্না, এগুলো সমানভাগে ভাগ করা ছিল সবার মধ্যে। প্রত্যেককে দিনে দু’ঘন্টা আর রাতে দু’ঘন্টা হালে বসতে হত। রাধুনির দায়িত্বটাও প্রত্যেকের মধ্যে পালা করে দেওয়া ছিল। ভেলায় কিছু নিয়মকানুনও ছিল। কয়েকটা জিনিষ নির্দিষ্ট করা ছিল, রাতের পাহারার সময় কোমরে দড়ি অবশ্যই বাঁধা থাকবে, জীবনরক্ষাকারী দড়ি সবসময় সঠিক জায়গায় রাখা থাকবে, খাওয়াদাওয়া কেবিনের দেয়ালের বাইরেই সারতে হবে আর বড়ো কাজটার জন্য পেছনের দিকে সবচেয়ে দূরে গিয়ে সারতে হবে। জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে হলে আমরা ইন্ডিয়ানদের মতো ‘পোউওউ’ (আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের প্রথাগত সামাজিক মন্ত্রণাসভাঃ অনুবাদক) ডেকে নিতাম আর নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতাম।
কনটিকির একটা সাধারণ দিন শুরু হত এইভাবে, রাতপাহারার লোকটা সকালের রান্নার দায়িত্বের লোকটাকে ডেকে তুলত আর সে ঘুম ঘুম চোখে হামাগুড়ি দিয়ে বাইরের ভেজা ডেকে এসে সকালবেলা উড়ুক্কু মাছ সংগ্রহে লেগে যেত। পলিনেশীয় বা পেরুভিয়ানদের মতো কাঁচা মাছ খাবার চেয়ে ওগুলো আমরা প্রাইমাস স্টোভে ভেজে নিতাম; স্টোভটা কেবিনের দরজার বাইরে শক্ত করে বাঁধা একটা বাক্সের মধ্যে বসানো থাকত। ওই বাক্সটাই আমাদের রান্নাঘর। এদিকটায় একটু আড়াল ছিল, কেননা দক্ষিণ-পূর্ব বানিজ্য-বায়ু উল্টোপাশ থেকে বইত। সমুদ্র আর হাওয়া বেশি ওলটপালট হলে কাঠের বাক্সে আগুন লেগে যাবার সম্ভাবনা থাকত, আর একবার তো রান্না করতে করতে রাধুনি ঘুমিয়ে পড়েছিল বলে গোটা বাক্সটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠে কেবিনের দেয়ালে আগুন ধরে গেছিল। কেবিনের ভেতর ধোঁয়া ঢুকে যাবার আগেই অবশ্য আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়েছিল, কনটিকিতে তো আর জল আনার জন্য খুব বেশি দূরে যেত হত না।
মাছভাজার গন্ধ অবশ্য ভেতরের নাক ডাকিয়েদের ঘুম ভাঙাতে পারত না, ফলে রাঁধুনিকে হয় কাঁটা চামচ দিয়ে খোঁচাতে হত নতুবা “ব্রেক ফাস্ট রেডি” বলে এমন বেসুরো গলায় গান ধরতে হত যে বেশিক্ষন কেউই সেটা সহ্য করতে পারত না। আশপাশে হাঙরের ডানা-টানা না দেখা গেলে দিব্যি প্রশান্ত মহাসাগরের জলে ডুব দিয়ে চান সেরে ভেলার ধারে বসে ব্রেকফাস্ট করা হত।
ভেলায় খাবারদাবার মোটেও খারাপ ছিল না। রান্নাবান্না মোটামুটি দুধরণের নিরীক্ষামূলক মেনুর মধ্যেই রাখা হত, একটা কোয়ার্টারমাস্টারের, বিংশ শতাব্দীর আরেকটা কনটিকির, পঞ্চম শতাব্দীর। প্রথমটার জন্য নির্দিষ্ট ছিল টরস্টাইন আর বেঙ্গট। ওদের খাবার দাবার কাঠের লগ আর বাঁশের ডেকের মধ্যে রাখা ছোটো ছোটো রেশন প্যাকেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মাছ আর সি-ফুড নিয়ে ওরা কখোনোই অত জোর পেত না। কয়েকসপ্তাহ বাদে বাদে আমরা বাঁশের ডেকের দড়িদড়া খুলে নীচ থেকে নতুন রসদ বার করেই কেবিনের সামনের দিকে বেঁধে রাখতাম। কার্ডবোর্ডের বাইরের পিচের আস্তরন যে বেশ প্রতিরোধী প্রমান হয়ে গেছিল, কেননা আমাদের রসদের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সমুদ্রের জল কার্ডবোর্ড বাক্সের পাশাপাশি রাখা সিল করা টিনের মধ্যে ঢুকে তার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল।
মূল কনটিকির সমুদ্রপাড়ি দেবার সময়ে পিচের আস্তরন বা সিল-করা টিন এসব ছিল না, সেরকম কোনো গুরুতর খাদ্য-সমস্যাও ছিল না। সেকালেও রসদ বলতে মানুষ ডাঙা থেকে যা বয়ে আনত আর সমুদ্রযাত্রায় যা কিছু পেত তাইই। আমরা অনুমান করতে পারি, লেক টিটিকাকায় পরাজিত হয়ে যখন কনটিকি পেরুর সৈকত থেকে ভেসে পড়েছিল, মনে মনে তার লক্ষ্য ছিল দুটোর একটা। সূর্য উপাসক মানুষদের আধ্যাত্মিক প্রতিনিধি হিসেবে উনি আশা করেছিলেন সমুদ্রযাত্রায় সূর্যের যাত্রাপথ অনুসরণ করলে হয়তো নতুন এবং অপেক্ষাকৃত কোনো নিরুপদ্রব জায়গার সন্ধান পাওয়া যাবে। অথবা তার কাছে আরেকটা বিকল্প ছিল দক্ষিণ আমেরিকার তটভূমি বরাবর ভেলা নিয়ে আরো এগিয়ে হানাদারদের আয়ত্বের বাইরে আরেকটা নতুন রাজ্যের সন্ধান। বিপদসঙ্কুল পাথুরে তট আর তীরবর্তী মারকুটে উপজাতীয়দের এড়িয়ে, আমাদের মতোই, ওরাও খুব সহজেই দক্ষিণ-পূর্ব বাণিজ্যবায়ু আর হামবোল্ট স্রোতের খপ্পরে পড়ে গিয়েছিল। আর ঠিক একই রকমভাবে আবহাওয়ার কেরামতিতে গোল চক্কর কাটতে কাটতে সূর্যাস্তের দিকে ভেসে গিয়েছিল।
যাইই ওই সূর্য-উপাসকদের পরিকল্পনা থাক না কেন, স্বভূমি থেকে পালানোর সময় তারা সমুদ্রযাত্রার রসদ নিয়ে নিয়েছিল। আদি খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে শুকনো মাংস, মাছ আর মিষ্টি আলু ছিল প্রধান। আদি ভেলার লোকেরা যখন পেরুর মরু-তট থেকে সমুদ্রে ভেসে পড়ল, তারা যথেষ্ট খাবার জলের সংগ্রহও সঙ্গে নিয়েছিল। মাটির ঘড়ার বদলে ওরা বিশাল লাউয়ের ফাঁপা খোল ব্যবহার করেছিল যেটা ধাক্কাধাক্কি অনেকটাই সামলাতে পারত, অবশ্য ভেলায় ব্যবহারের জন্য আরো ভাল জিনিষ ছিল পুরু ও বিশাল বাঁশের খোল। বাঁশের গাঁটগুলোর মধ্যে ছোটো ছোটো ফুটো করে পুরোটায় জল ভরে একেবারে শুরুর ছোটো ফুটোটা পিচ বা গালা দিয়ে বন্ধ করে দিত। এরকম তিরিশ চল্লিশটা বাঁশের খোল ভেলার বাঁশের পাটাতনের নীচে বেঁধে রাখা হত। সমুদ্রের ভেতর আর ছায়ায় সেই জল ঠান্ডা থাকত, ৭৯ ডিগ্রির নিরক্ষীয় সামুদ্রিক স্রোত ওর ওপর দিয়ে বয়ে চলত। আমাদের গোটা সমুদ্রযাত্রায় যতটা জল ব্যবহার প্রয়োজন এরকম ভাণ্ডারে তার দ্বিগুণ জল ধরে রাখা যেত। এরপরেও এমন আরো বাঁশের খোল নেওয়া যেত স্রেফ ভেলার নীচে দড়ি বেঁধে জলের মধ্যে ফেলে, যাতে ওজনও বাড়ত না অতিরিক্ত জায়গাও লাগত না।
আমরা দেখলাম দুমাস বাদে পানীয়জল কেমন বাজে আর বিস্বাদ হয়ে গেল, কিন্তু তদ্দিনে কম বৃষ্টির প্রাথমিক সামুদ্রিক এলাকা পার হয়ে বেশি বৃষ্টির এলাকায় ঢুকে পড়েছি, ফলে মুষলধার বৃষ্টি পানীয়জলের সংগ্রহটা সামলে দিল। প্রত্যেকের জন্য রোজ এক লিটারের ওপর জল বরাদ্দ থাকত আর সেটা কোনো না কোনো ভাবে সবসময়েই শেষ করা হত।
আমদের পূর্ববর্তীরা যদি ডাঙা থেকে পর্যাপ্ত রসদ নিয়ে নাও বেরোত তাহলেও ঠিক সামলে নিত। যতক্ষণ সামুদ্রিক স্রোতে ভেসে চলেছিল, সে-অঞ্চলে মাছের কোনো অভাব ছিল না। আমাদের গোটা সমুদ্রযাত্রায় এমন একটা দিনও যায়নি যেদিন আমাদের চারপাশে মাছ সাঁতরে বেড়ায়নি আর সহজে তাদের ধরা যায়নি। ক্কচিৎ এমন দিন গেছে যেদিন উড়ুক্কুমাছ, যতটুকুই হোক, নিজে নিজেই এসে ডেকে আছড়ে পড়েনি। এমনও হয়েছে বিরাট একটা বনিটো, বেশ সুস্বাদু, জলের তোড়ে সাঁতরাতে সাঁতরাতে ভেলার পেছনের দিকে উঠে পড়েছে আর লগের ফাঁক দিয়ে ছাকনির মতো জল বেরিয়ে যেতে ডেকের ওপর আছড়াতে লেগেছে। সুতরাং না খেয়ে মরা অসম্ভব।
পুরোনো আদিবাসীরা ওই ব্যাপারটা জানত, যেটা যুদ্ধে জাহাজডুবির সময়ে অনেক মানুষ জানতে পেরেছিল, যে কাঁচা মাছ চিবিয়েই তেষ্টা মেটানো যায়। কাপড়ে জড়িয়ে মাছ নিংড়িয়ে রস বের করে নিতে পারা যায় অথবা বড়োসড়ো মাছ হলে খুব সহজ ব্যাপার, পাশের দিকে একটু ফুটো করে দিলেই সেটা মাছের গ্রন্থিনিসৃত রসে ভর্তি হয়ে যাবে। অন্য পানীয় থাকলে অবশ্য এটা খেতে তত ভালো নয়, কিন্তু এতে নোনাভাব এতটাই কম যে তেষ্টা মিটে যাবে।
যখন প্রতিদিন স্নান করতাম বা ভেজা গায়ে কেবিনের ছায়ায় শুয়ে থাকতাম জল পানের প্রয়োজনটা অনেকটাই কমে যেত। যদি কোনো হাঙর ভেলার চারপাশে রাজকীয় ভঙ্গীমায় ঘুর ঘুর করত তাহলে ভেলার পাশে পাশে ডুব দিয়ে চান করা হত না, তখন কেবল ভেলার পেছনে লগের ওপর টানটান হয়ে হাত পায়ের সাহায্যে শক্ত করে দড়ি ধরে শুয়ে থাকতে হত আর এক-দু’সেকেন্ড পরপর স্ফটিক-স্বচ্ছ জল আমাদের ওপর ছিটকে এসে পড়ে স্নান করিয়ে দিত।
গরমে তেষ্টায় যখন ছাতি ফাটছে সবাই এটাই ভাবে যে শরীর জল চাইছে আর তখনই জলের বরাদ্দে অনৈতিক হানাদারি শুরু হত, যদিও তেমন কিছুই লাভ হত না। ক্রান্তীয় অঞ্চলে সত্যি সত্যি গরমের দিনে কুসুম কুসুম গরম জল গলায় ঢাললে মুখের ভেতর তার স্বাদ বুঝতে বুঝতেই তেষ্টাটা আবার যে কে সেই। শরীর তখন আসলে জল চায় না, অদ্ভুত শোনালেও, চায় নুন। আমদের বিশেষ রসদের মধ্যে ছিল সল্ট-ট্যাবলেট, প্রতিদিন একটা করে নেবার জন্য, বিশেষভাবে গরমের দিনগুলোতে, কেননা ঘামের সাথে নুন বেরিয়ে যেত। আমাদের অভিজ্ঞতায় এরকম দিনগুলো দেখেছি, যখন হাওয়া নেই আর ভেলার ওপরে সূর্য নির্দয়ভাবে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। জল খেয়ে খেয়ে পেট ভরে গেল ওদিকে গলা শুকিয়ে কাঠ, সে আরো জল চাইছে। এরকম দিনে কুড়ি থেকে চল্লিশ শতাংশ তিতকুটে নোনা সমুদ্রের জল আমাদের মিষ্টি জলের সাথে মিশিয়ে দেখেছি, আশ্চর্য, ওই নোনাজলই আমাদের তেষ্টা মিটিয়ে দিত। পরে সমুদ্রের নোনা জল বহুবার খেয়েছি, কখনো অসুস্থ হইনি, বরং আমাদের জলের ভান্ডার বেড়ে উঠেছে।
এক সকালে প্রাতরাশে বসেছি, আচমকা একটা ঢেউয়ের ঝাপটা আমাদের খাবারের মন্ডের ওপর পড়ে খানিকটা অযাচিতভাবেই শিখিয়ে দিল যে যবের স্বাদ, নোনতা জলের খারাপ স্বাদটা অনেকটাই কাটিয়ে দেয়।
প্রাচীন পলিনেশীয়রা কতকগুলো অদ্ভুত প্রথা টিকিয়ে রেখেছিল। ওরা বলে ওদের পূর্বপুরুষরা যখন সমুদ্রপাড়ি দিয়ে এসেছিল, সঙ্গে নিয়ে এসেছিল একধরণের গাছের পাতা যা চিবোলে তেষ্টা নিবারণ হত। এ গাছের আরেকটা গুণ ছিল, যে, খুব দরকারে সমুদ্রের জল খেলেও অসুস্থ হত না কেউ। দক্ষিণ-সমুদ্রের দ্বীপপুঞ্জে এরকম গাছ জন্মাত না; ফলে সেগুলো অবশ্যই পূর্বপুরুষদের স্বভূমি থেকেই এসেছিল। পলিনেশীয় ঐতিহাসিকেরা একথা এতবার উল্লেখ করেছেন যে আধুনিক বিজ্ঞানীরা বিষয়টা অনুসন্ধান করে দেখেছেন যে এরকম প্রভাব একমাত্র কোকো গাছেরই হতে পারে, যেটা কেবলমাত্র পেরুতেই জন্মায়। এবং প্রাগৈতিহাসিক পেরুতে ইনকা আর তাদের অগ্রদূতেরা, এই কোকো গাছ নিয়মিত ব্যবহার করত, যাতে কোকেন থাকে। ইনকা-পূর্ব সমাধিগুলিতে তার অস্তিত্ব আবিষ্কার করা গেছে। পাহাড়িপথের ঝক্কি আর ক্লান্তিকর সমুদ্রযাত্রায় বোঝা করে এই পাতা তারা সঙ্গে নিয়েছিল, যা চিবিয়ে দিনের পর দিন তেষ্টা আর ক্লান্তি মিটত।
কনটিকিতে আমরা কোকো পাতা চিবোইনি, তবে সামনের ডেকে কঞ্চি দিয়ে বানানো বড়ো বড়ো ঝুড়িতে অন্যান্য অনেক গাছপালা ছিল যা দক্ষিণ-সাগরের দ্বীপগুলিতে গভীর ছাপ ফেলেছিল। ঝুড়িগুলো কেবিনের নীচু দেয়ালের সাথে শক্ত করে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। আর দিনে দিনে ক্রমশ আলু আর নারকেল গাছের হলদে শেকড় অথবা সবুজ পাতা ঝুড়ির ভেতর থেকে একটু একটু করে বেড়ে উঠছিল। যেন কাঠের ভেলার ওপরে একটা ছোটোখাটো ক্রান্তীয় বাগান।
প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলোতে যখন ইউরোপীয়রা প্রথম এল, ওরা ইস্টার দ্বীপে, হাওয়াই আর নিউজিল্যান্ডে প্রচুর মিস্টি আলুর চাষ দেখেছিল। একই গাছের চাষ অন্যান্য দ্বীপেও দেখা গেছিল কিন্তু কেবলমাত্র পলিনেশীয় এলাকাতেই। আরো পশ্চিমের দিকে কিন্তু এটা অজানাই থেকে গেছিল। এই প্রান্তিক দ্বীপগুলোয় মিষ্টি আলুর চাষই ছিল অন্যতম প্রধান, অন্যথায় এরা মূলত মাছ ধরেই বেঁচে ছিল। পলিনেশীয় উপকথাতেও এই গাছের উপস্থিতি আছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী পূর্বপুরুষদের স্বভূমিতে মিষ্টি আলুই ছিল প্রধান খাদ্য আর সেখান থেকে চলে আসার সময় ‘টিকি’ই এই গাছ নিয়ে এসেছিলেন, সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ‘পানি’। নিউজিল্যান্ডের উপকথায় আছে যে মিষ্টি আলু জলযানে করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এসেছিল আর সেগুলি মোটেও ক্যানো ছিল না, ছিল “দড়ি দিয়ে বাঁধা কাঠের তৈরি” জলযান।
এখনো অবধি যেটুকু জানা গেছে, সারা পৃথিবীতে আমেরিকাই একমাত্র জায়গা যেখানে ইউরোপীয়ানদের আগেই আলুচাষ হত। টিকি যে মিষ্টি আলু সঙ্গে করে এনেছিলেন, “ইপোমোইয়া বাটাটা”, সেটা হুবহু পেরুতে প্রাচীনকাল থেকে চাষ করা আলুই বটে। পলিনেশীয় আর প্রাচীন পেরুর বাসিন্দাদের সমুদ্রযাত্রার প্রধান রসদ ছিল শুকোনো মিষ্টি আলু। দক্ষিণ সমুদ্রের দ্বীপগুলিতে আলু জন্মাতে পারে কেবলমাত্র মানুষের লালন পালন ও যত্নে। যেহেতু এ গাছ সমুদ্রের নোনা জল সহ্য করতে পারে না, সুতরাং এটা ভাবা বাতুলতা যে এগুলো পেরু থেকে ৪০০০ মাইল সমুদ্রের স্রোতে ভেসে ভেসে এসে এখানকার সমস্ত দ্বীপগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পলিনেশীয়ানদের উৎস সম্পর্কে একটা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এড়িয়ে যাওয়া হয়, দেখা গেছে ভাষাতত্ববিদেরা বলেছেন এই বিস্তীর্ণ ছড়িয়ে থাকা দ্বীপগুলিতে মিষ্টি আলুকে ডাকা হয় “কুমারা” নামে যা পেরুতে প্রাচীন ইন্ডিয়ানদের মধ্যেও চালু ছিল। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নামটাও গাছের সাথে চলে এসেছিল।
পলিনেশীয়দের চাষ করা আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ গাছ ‘কনটিকি’তে আমাদের সঙ্গে ছিল, সেটা লাউ, ল্যাগেনারিয়া ভালগারিস। ফলের পাশাপাশি ওর খোলটাও খুব কাজের, পলিনেশীয়রা ওটার খোল আগুনে পুড়িয়ে, জল রাখার কাজে ব্যবহার করত। বাগানেই ফলে এমন আদর্শ গাছটিও একলা একলা সমুদ্রে ভেসে বংশ বিস্তার করতে অক্ষম অথচ পেরুর আদি বাসিন্দা এবং প্রাচীন পলিনেশীয়দের মধ্যেও একই রকমভাবে এর প্রচলন ছিল। পেরুর তটে, প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রে এরকম জল রাখার জন্য ব্যবহৃত লাউয়ের খোল পাওয়া গেছে এবং প্রশান্তমহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে মানুষ আসার বহু শতাব্দী আগে থেকেই ওখানকার মাছ ধরিয়েদের মধ্যেও এর ব্যবহার চালু ছিল। পলিনেশীয়রা লাউকে ডাকত ‘কিমি’ নামে আর সে-নামটা, পেরু সভ্যতার শেকড় যেখানে সবচেয়ে বেশী গভীরে, সেই মধ্য আমেরিকাতেও পাওয়া গেছে।
আমাদের সঙ্গে যে মরসুমী ফল ছিল, পচে যাবার আগেই প্রথম কয়েক সপ্তাহে সেগুলো খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, এছাড়াও মিষ্টি আলুর পাশাপাশি তৃতীয় আরেকটা গাছ আমাদের সঙ্গে ছিল প্রশান্তমহাসাগরীয় ইতিহাসে যার ভূমিকা সর্বাধিক। আমাদের সঙ্গে দুশোটা নারকেল ছিল, ওগুলো আমাদের দাঁতের ব্যায়ামের সহায়ক ছিল আর চমৎকার পানীয়ও যোগাত। কিছু নারকেল-এ কল গজিয়ে গেল, আর সমুদ্রে ভেসে পড়ার মাত্র দশ সপ্তাহের মধ্যেই একফুট মতো হাফ ডজন চারাগাছ জন্মালো, ডালপালা মেলে তাতে মোটা মোটা সবুজ পাতাও গজিয়ে গেল। কলম্বাসের সময়ের আগে থেকেই পানামা আর দক্ষিণ আমেরিকা দুজায়গাতেই নারকেল গাছ জন্মাত। ঐতিহাসিক ওভিয়েদো লিখছেন স্পেনীয়রা পেরুর উপকূলে যখন পৌঁছয় তখন সেখানে প্রচুর নারকেল গাছ ছিল। প্রশান্তমহাসাগরের সমস্ত দ্বীপেই সেসময় এ গাছটা বহু আগে থেকেই ছিল।
উদ্ভিদবিদদের কাছে এখনো তেমন প্রমান নেই যে ঠিক কোন দিক দিয়ে প্রশান্তমহাসাগরের বুকে এই গাছটা ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু এখন অন্তত একটা জিনিস আবিষ্কার করা গেছে। অত শক্ত খোলা সত্বেও সমুদ্রে ভেসে ভেসে নারকেলও মানুষের সাহায্য ছাড়া বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। আমাদের ডেকে রাখা ঝুড়ির নারকেলগুলো পলিনেশীয়া যাওয়া অবধি একইসঙ্গে খাবার মতো আর অঙ্কুরিত হবার যোগ্যও ছিল। কিন্তু বিশেষ রসদ হিসেবে অর্ধেকটা আমরা ডেকের তলায় রেখেছিলাম, সমুদ্রের জল বইত ওর মধ্যে দিয়ে। সাগরের জলে সেগুলোর প্রত্যেকটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। হাওয়ার ধাক্কায় বালসা-ভেলা যত তাড়াতাড়ি ঢেউয়ের ওপর দিয়ে এগোত, নারকেলগুলো তত তাড়াতাড়ি ভাসতে পারত না। নারকেলের খোলার ওপরের চোখগুলো দিয়ে জল ঢুকে শাঁস নষ্ট করে দিয়েছিল। আমাদের আবর্জনা সংগ্রাহকও সমস্ত পথে সতর্ক ছিল যাতে কোনো খাবারের টুকরো টাকরা ভেসে ভেসে যেন পৃথিবীর এদিক থেকে ওদিকে না চলে যেতে পারে।
ডাঙা থেকে হাজার হাজার মাইল সমুদ্রের গভীরে দেখেছি পেট্রেল বা অন্যান্য সামুদ্রিক পাখি যেগুলো ঢেউয়ের ওপরেই ঘুমোতে পারে। মাঝে মাঝে শান্ত দিনে সমুদ্রের নীল জলে কোনো সাদা পাখির পাশে পাশে ভেসে চলেছি। খুব কাছাকাছি এলে লক্ষ্য করে দেখেছি দুতিনটে যাত্রীও পাখির ওপরে ভর দিয়ে দিব্যি ভেসে চলেছে। কনটিকি কাছাকাছি হলে সেই যাত্রীরা লক্ষ্য করে যে আরেকটা জলযান তাদের চেয়ে দ্রুতবেগে চলেছে আর সেতা বেশ খানিকটা বড়োও বটে, অমনি তারা পাখিটাকে একলা ফেলে, পাশাপাশি জলের ওপরে প্রায় দৌড়ে এসে টুক করে ভেলায় উঠে পড়েছে। অচিরেই কনটিকি এইসব গোপনে উঠে পড়া যাত্রীদের ভিড়ে ভিড়াক্কার। এগুলো ছিল ছোটো ছোটো সামুদ্রিক কাঁকড়া। খুব বেশি একনখের পরিমান আকার, কখনো আরেকটু বড়ো, ধরতে পারলেই ভেলাইয় আমাদের মতো গোলিয়াথদের সুস্বাদু খাদ্য!
ছোটো ছোটো কাঁকড়াগুলো সমুদ্রের ওপরে প্রায় পুলিশের নজরদারির কাজ করে, খাওয়ার মতো কিছু দেখলেই হল আর থামাথামির ব্যাপার নেই। কোনোদিন যদি কাঠের ফাঁকে আটকে থাকা কোনো উড়ুক্কু মাছ আমাদের রাঁধুনির চোখ এড়িয়ে গেল, তো পরদিন আটটা থেকে দশটা কাঁকড়া ওই মাছের ওপর জুড়ে বসে দাঁড়া দিয়ে খেতে শুরু করবে। বেশিরভাগ সময়েই আমাদের দেখতে পেলেই ভয়ের চোটে হুড়মুড় করে পালিয়ে গিয়ে লুকোত। কিন্তু একটামাত্র কাঁকড়া পেছনের দিকে স্টিয়ারিং হুইলের গর্তে বাসা বেঁধেছিল, খানিকটা পোষও মেনে গেছিল, আমরা নাম দিয়েছিলাম জোহান্স।
সবার প্রিয় পোষ্য তোতাটার মতো, কাঁকড়া জোহান্সও আমাদের দলের একজন হয়ে উঠেছিল। ঝকঝকে রোদে কেবিনের দিকে পিঠ করে হালে বসে আছে আমাদের কেউ আর সেসময় জোহান্স তার সঙ্গী হয়নি, তাহলে সে বেচারি নীল সমুদ্রে বড্ডো একাকি বোধ করত। অন্য কাঁকড়ারা যখন হুড়োহুড়ি করে প্রায় আরশোলার মতো কেটে পড়ে জোহান্স তখন ওর দরজার মুখে গেঁড়ে বসে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে কখন পাহারাদার বদলাবে। যেইই আসুক সাথে করে একটা বিস্কুটের টুকরো বা এক টুকরো মাছ ওর জন্য নিয়ে আসত আর নীচু হয়ে স্রেফ ওর গর্তের সামনে ধরতে হত তাহলেই ও গর্তের বাইরে বেরিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিত। দাঁড়া দিয়ে আমাদের আঙুল থেকে খাবারটা নিয়েই দৌড়ে গর্তের ভেতরে চলে যেত আর ভেতরে বসে খাবারটা মুখে পুরে বাচ্চাদের মতো শব্দ করে করে খেত।
যে নারকোলগুলো গেঁজে গিয়ে ফেটে গেছে বা স্রোতেভাসা প্ল্যাঙ্কটনে ঢেকে গেছে ছোটো ছোটো কাঁকড়ার দল মাছির মতো সেই ভিজে নারকেলগুলো ঘিরে থাকত। ক্রমশ যখন আমরা এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণীগুলো পরিমানমতো ধরতে শিখলাম, দেখলাম ভেলায় আমাদের মতো রাক্ষসদের কাছে ওগুলোও সমান ভালো খাবার।
এটা নিশ্চিত যে এই প্রায় না দেখতে পাওয়া, সমুদ্রের স্রোতে ভেসে চলা অসংখ্য অতিক্ষুদ্র প্ল্যাঙ্কটন অবশ্যই খুবই পুষ্টিকর খাদ্য। যেসব মাছ আর সামুদ্রিক পাখিরা এই প্ল্যাঙ্কটন খায় না, তারা যতো বড়োই হোক না কেন, অন্যান্য মাছ আর সামুদ্রিক প্রাণীদের খেয়েই বাঁচে। সমুদ্রের ওপরের দিকে ভাসমান এমন অসংখ্য দৃশ্য অদৃশ্য ছোটো ছোটো জীবকূলকে সাধারণভাবে প্ল্যাঙ্কটন নামে ডাকা হয়। এদের কিছু উদ্ভিদ, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, আর বাকী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী ও এককোষী মাছ, জুপ্ল্যাঙ্কটন, বলে। জুপ্ল্যাঙ্কটন, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন খেয়ে বাঁচে, ফাইটোপ্ল্যাংকটন বেঁচে থাকে অতিক্ষুদ্র জীবের মৃতদেহ থেকে নিঃসৃত অ্যামোনিয়া, নাইট্রেট আর নাইট্রাইট-এর ওপর। এইরকম পারস্পরিক নির্ভরতায় বেঁচে থেকেই তারা সমুদ্রের সমস্ত জীবকূলের খাদ্যের যোগান দেয়। আকারে বড়ো না হলেও সংখ্যায় এদের যোগান যথেষ্ট।
অনেক সময় বহু মানুষ সমুদ্রে না খেতে পেয়ে মারা গেছে কারণ জালে বা বঁড়শিতে ধরার মতো যথেষ্ট বড়ো মাছ তারা ধরে উঠতে পারেনি। বেশিরভাগ সময়েই দেখা গেছে ওরা হয়তো সেসময় তরল মাছের সুরুয়ার ওপর দিয়েই ভেসে চলেছে। বঁড়শি বা জালের বদলে একটা কোনো ছাঁকনি-পাত্র থাকলেই ওই সুরুয়ার মধ্যে থেকে পুষ্টিকর খাবার প্ল্যাঙ্কটন ছেঁকে নিতে পারা যেত। ভবিষ্যতে কখনো হয়তো মানুষ সমুদ্রে প্ল্যাঙ্কটন চাষের কথা ভাববে, যেমনভাবে ডাঙায় শস্যদানা চাষ করে। একদানা শস্যের কোনো দাম নেই, কিন্তু একত্রে অনেকটা শস্য খাদ্যের যোগান হয়ে ওঠে।
সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ডক্টর এ ডি বাজকভ আমাদের প্ল্যাঙ্কটনের কথা বলেছিলেন আর একটা মাছধরার জাল পাঠিয়ে দিয়েছিলেন যা দিয়ে ওরকম ছোটো প্রাণী ধরা যাবে। “জাল”টা সিল্কের, এক বর্গ ইঞ্চি বুনটে তিনহাজার ছিদ্র। একটা লোহার বেড়িতে গোলমুখ-ফানেলের মতো করে আটকানো আঠারো ইঞ্চি ব্যাসের “জাল”টা ভেলার পেছনে আটকানো ছিল। অন্যান্য মাছধরার মতোই সময় আর জায়গা অনুযায়ী ধরা পড়ার পরিমান ওঠানামা করত। ক্রমশ পশ্চিমে সমুদ্র যত উষ্ণ হচ্ছিল ধরা-পড়া প্রাণীর সংখ্যা কমে আসছিল। সবচেয়ে ভালো পাওয়া যেত রাতের বেলায় কেননা বেশিরভাগ প্রাণীই দিনেরবেলা সূর্যের তাপে জলের অনেক গভীরে চলে যেত।
যখন ভেলায় সেভাবে আর কোনোকিছুই করার নেই, আমাদের সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা ছিল প্ল্যাঙ্কটন-জালে নাক ঠেকিয়ে শুয়ে থাকা। গন্ধ শোঁকার জন্য নয়, কেননা গন্ধটা খুবই খারাপ। দৃশ্যটা বেশ মুখরোচক তাও নয়, কেননা সেটা বীভৎস জগাখিচুড়ির মতো দেখাত। আগ্রহটা ছিল জাল থেকে ছোটো ছোট প্রাণীগুলো বার করে বোর্ডে সাজিয়ে আলাদা আলাদা করে খালি চোখে দেখলে নানা ধরণের চমৎকার সব আকার আর অগুন্তি রঙের সমাহার দেখা যেত।
বেশিরভাগই ছিল চিংড়ির মতো খোলযুক্ত প্রাণী(কোপেপডস) অথবা মাছের ডিম বা এককোষী মাছ; এছাড়াও মীন, শামুক, অদ্ভুতরকম অতিক্ষুদ্র রঙবেরঙের কাঁকড়া, জেলিফিশ আর অসংখ্য প্রকারের সামুদ্রিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীব, যেন ওয়াল্ট ডিজনির ফ্যানটাসিয়া থেকে নিয়ে আসা। কোনোটা সেলোফেন কাগজ থেকে কাটা ফিনফিনে ঝালর লাগানো উড়ন্ত অবয়বের মতো, কোনোটা লালঠোঁটওয়ালা ছোট্ট পাখির মতো, গায়ে পালকের বদলে শক্ত খোলা। প্ল্যাঙ্কটনের রাজ্যে প্রকৃতির বেহিসাবী উদ্ভাবনের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই; এক অধিবাস্তববাদী শিল্পিও এখানে নিজেকে ছোটো মনে করবে।
বিষুবরেখার দক্ষিণে, যেখানে হামবোল্ট স্রোত পশ্চিমদিকে বাঁক নিচ্ছে, সে অঞ্চলে আমরা কয়েক ঘণ্টা অন্তর অন্তর জাল থেকে বেশ কয়েক পাউন্ড করে প্ল্যাঙ্কটনের মন্ড বার করেছি। যেখানে যেমন প্ল্যাঙ্কটন স্তরের মধ্যে দিয়ে যেতাম সেখানে প্ল্যাঙ্কটনগুলো একসাথে নানান রঙের একটা কেকের তালের মতো উঠে আসত – খয়েরি, লাল, ধূসর, সবুজ। রাত্রিবেলা যখন ওগুলো অনুপ্রভায় জ্বলজ্বল করত, মনে হত এক ব্যাগ ঝকমকে মণিমানিক। কিন্তু যেই ধরতাম অমনি সেই রত্ন লক্ষ লক্ষ ছোটো ছোটো চিকচিকে চিংড়িজাতীয় প্রাণী আর স্বপ্রভ-মাছের চারায় পরিনত হত আর অন্ধকারে প্রবালের মতো জ্বলজ্বল করে উঠত। বালতিতে ঢেলে ফেললে নরম বস্তুটা একটা জ্বলজ্বলে প্রাণীদের আশ্চর্য মন্ডের মতো এসে পড়ত। রাতের বেলা অল্প সময়েই যে পরিমান ধরা পড়ত, ততটা দিনের অন্যসময়ে বহুক্ষণের ফসল। আর যত বিশ্রিই গন্ধ হোক, কেউ সাহস করে তা থেকে এক চামচ তুলে মুখে দিলে ঠিক ততটাই ভালো লাগত খেতে। আর তাতে যদি একেবারে ছোটো চিংড়ির মতো প্রাণী বেশি থাকত, তাহলে স্বাদ হত একেবারে চিংড়ির পেস্ট বা লবস্টার অথবা কাঁকড়ার মতো। যদি গভীর সমুদ্রের মাছের ডিম তাতে বেশি থাকত তাহলে ক্যাভিয়ের-এর মতো লাগত, হঠাৎ হঠাৎ গুগলির মতোও।
খাওয়ার অযোগ্য জুপ্ল্যাঙ্কটন হয় খুব ছোটো যাতে জলে ধুয়ে জালের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেত অথবা এতটাই বড়ো যে হাতে তুলে সেটা ফেলে দেওয়া যায়। খাবারের মধ্যে বাধাটা হত একরকম থলথলে অমেরুদন্ডী প্রাণী, কাচের বেলুনের মতো আর আধ-ইঞ্চি মতো তারামাছ। ওগুলো তেতো খেতে, ফেলে দিতে হত। এছাড়া সবই খাওয়া যেত, কাঁচা অথবা জলে সেদ্ধ করে স্যুপ বা মন্ড হিসেবে। একেকজনের একেকরকম স্বাদ। ভেলায় দুজনের মতামত হল, প্ল্যাঙ্কটন দারুণ খেতে, দেখতে পেলেই হল, ব্যস সেটুকুই যথেষ্ট। পুষ্টির দিক থেকে দেখলে ওগুলো বড়ো কাঁকড়া বা ঝিনুকের সমান, মশলা-টশলা দিয়ে ভালোভাবে রাঁধলে সি-ফুড যারা ভালবাসে তাদের কাছে এক্কেবারে প্রথম সারির খাবার।
এই ছোটো প্রাণীগুলো থেকে যে যথেষ্ট ক্যালরিও মেলে তার প্রমাণ, নীল তিমি, পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো প্রাণীটা কেবল প্ল্যাঙ্কটন খেয়েই বাঁচে। আমাদের জাল দিয়ে প্ল্যাঙ্কটন ধরার কায়দাটা বেশ আদিম ছিল, আর প্রায়ই ক্ষুধার্ত মাছেরা ওটা চিবিয়ে যেত। বিশেষত যখন দেখতাম পাশে পাশেই একটা তিমি জলের ফোয়ারা তুলে প্ল্যাঙ্কটন ছেঁকে নিচ্ছে স্রেফ ওর মুখের মধ্যে থাকা সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম লোমের মধ্যে দিয়ে। আর একদিন আমরা গোটা জালটাই হারিয়ে ফেললাম সমুদ্রে।
“তোমরা প্ল্যাঙ্কটন-খেকোরা ওর মতো করছ না কেন?” টরস্টাইন আর বেঙ্গট বেশ তাচ্ছিল্যভাবে একটা ফোয়ারা-ছোটানো তিমিকে দেখিয়ে বলল, “মুখ ভর্তি করো আর জলটা স্রেফ দাড়ির ফাঁক দিয়ে বার করে দাও।”
আমি নৌকোয় বেশ দূর থেকে তিমি দেখেছি, যাদুঘরেও স্টাফ করা দেখেছি, কিন্তু অন্যান্য উষ্ণরক্তবিশিষ্ট প্রাণী যেমন ঘোড়া বা হাতির মতো এই দৈত্যাকার প্রাণীটার প্রতি তেমন আকর্ষণ বোধ করিনি। তিমিকে প্রাণীগতভাবে একটা স্তন্যপায়ী হিসেবে মেনেই নিচ্ছি, কিন্তু মোটের উপর সবদিক থেকেই এটা একটা বড়ো মাছ বই নয়। বিশাল তিমিগুলো যখন আমাদের ভেলার খুব কাছাকাছি ছুটে আসত আমাদের মনে বিচিত্র ভাবের উদয় হত।
একদিন, রোজকার মতো, আমরা ভেলার একেবারে কিনারে বসে প্রাতরাশ করছি, এতটাই কিনারে যে একটু পেছনে হেললেই বাটি ধুয়ে নেওয়া যাচ্ছিল। আচমকা একটা ঝাঁকুনি লাগল, কিছু একটা আমাদের ঠিক পেছনেই সাঁতরে-আসা-ঘোড়ার মতো সজোরে নিঃশ্বাস ছাড়ল। দেখি একটা বিশাল তিমি ভেসে উঠেছে, সোজা আমাদের দিকে তাকিয়ে, আর এত কাছে যে আমরা ওর নাকের ফুটো দিয়ে ভেতরটা অবধি দেখতে পেলাম, পালিশ করা জুতোর মতো চকচক করছে। সমুদ্রে এভাবে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নেওয়ার ব্যাপারটা এত বিরল, কেননা সক্কলেই জলের মধ্যে ফুসফুস ছাড়াই সাঁতরে পাক খেয়ে খেয়ে যাচ্ছে আর ফুলকো কাঁপিয়ে কাজ সারছে। ঠিক এসময়ই আমাদের দূরবর্তী আত্মীয় এই উষ্ণ প্রাণীটার সঙ্গে একাত্মবোধ করলাম, ও-ও আমাদের মতো ডাঙা ছেড়ে কতদূর ভেসে এসেছে! ঠান্ডা ব্যাঙের মতো তিমি-হাঙরের চেয়ে এটাকে আমার দিব্যি লাগল। তিমি-হাঙর তো জল থেকে নাকই তোলার প্রয়োজন বোধ করে না, সেখানে এটা অনেকটা চিড়িয়াখানার হৃষ্টপুষ্ট আমুদে জলহস্তীকে মনে পড়ায়, যে কিনা আদতেই নিশ্বাস নেয়। দেখতে দেখতেই সমুদ্রে ডুব দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল তিমিটা।
এরকম বহুবার তিমি এসেছে আমাদের কাছে। বেশিরভাগ সময়ে ওগুলো ছিল শুশুকের মতো দাঁতওয়ালা তিমি, ঝাঁক বেঁধে জলের ওপরে ভেলার কাছে এসে খেলা করেছে। কিন্তু মাঝে মাঝে সবচেয়ে বড়ো দাঁতালো তিমিও (স্পার্ম হোয়েল) আসত, বা অন্য দৈত্যাকার তিমি, একলা বা ঝাঁক বেঁধে। মাঝে মাঝে দিগন্তে চলে যাওয়া জাহাজের মতো আমাদের পাশ দিয়ে ভেসে গেছে হুস করে ফোয়ারা ছুটিয়ে কিন্তু কখনো কখনো সোজা আমাদের লক্ষ্য করে ধেয়েও এসেছে। প্রথম একবার একটা তিমি যখন ঘুরে আমাদের ভেলা তাক করে সোজা ধেয়ে এল, আমরা একটা মারাত্মক সংঘর্ষের জন্য তৈরি হয়ে ছিলাম। ক্রমশ ওটা আরো কাছাকাছি আসতে, যখনই জল থেকে মাথা তুলছিল, আমরা ওর ভারী আর দীর্ঘ নিশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। যেন একটা বিশাল মোটা চামড়ার কদাকার ডাঙার প্রাণী জল ঠেলে ধেয়ে আসছিল, মোটেই মাছের মতো নয়; বাদুড় যেমন পাখির মতো নয় তেমনি। সোজা ভেলার সামনের দিক লক্ষ্য করে আসছিল ওটা যেখানে আমরা সবাই দাঁড়িয়েছিলাম, এদিকে একজন মাস্তুলে বসে ওপর থেকে চেঁচিয়ে বলল ও আরো সাত আটটা তিমিকে আমাদের দিকে আসতে দেখছে।
প্রথম তিমিটার বিরাট চকচকে মাথার সামনেটা যখন আমাদের থেকে মাত্র দু’গজ দূরে, ওটা জলের নীচে ডুব দিল আর দেখলাম বিশাল নীল-কালো দেহটা নিঃশব্দে ভেলার নীচে আমাদের পায়ের তলায় চলে এল। খানিকক্ষণ ওখানে রইল, অস্পষ্ট এবং স্থির হয়ে আর আমরা শ্বাস বন্ধ করে দেখলাম তলায় সুবিশাল স্তন্যপায়ীটার বাঁকানো পিঠ আমাদের পুরো ভেলার চেয়েও অনেক বড়ো। তারপর খুব আস্তে ওটা গভীর নীল জলে ডুব দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। ইতিমধ্যে অন্য ঝাঁকটাও কাছাকাছি চলে এসেছিল কিন্তু ওরা আমাদের নজরই করল না। শক্তিশালী এবং লেজের ঝাপটায় তিমি-শিকারীদের নৌকো ডুবিয়ে দেয় বলে তিমিদের যে বদনাম আছে তা সম্ভবত ওদের প্রথমে আক্রমন করা হয় বলেই। অপ্রত্যাশিত জায়গায় তিমির ঝাঁকটা সারাটা সকাল আমাদের চারপাশে জল ছিটিয়ে ঘুরে বেড়াল, একবারের জন্যও ভেলায় বা দাঁড়ে এসে ধাক্কা দেয়নি। সূর্যের আলোয় ঢেউয়ের মধ্যে বেশ আনন্দেই খেলে বেড়াচ্ছিল ওরা। কিন্তু দুপুরবেলা এক লহমায় গোটা ঝাঁকটা চুপচাপ ভালোয় ভালোয় ডুব দিয়ে একসাথে অদৃশ্য হয়ে গেল যেন কোনো নির্দেশ পেয়েছে।
ভেলার নীচে শুধু তিমিই দেখিনি। বাঁশের চাটাই, যার ওপরে আমরা শুতাম, সেটা সরালে কাঠের লগের ফাঁক দিয়ে নীচেই নীল স্বচ্ছ জল দেখা যেত। খানিকক্ষণ শুয়ে থাকলেই একটু পরপরই সেখানে একটা বুকের পাখনা অথবা একটা লেজ নড়েচড়ে যাচ্ছে দেখা যেত আর অমনিই একটা গোটা মাছ। কাঠের ফাঁকটা কয়েক ইঞ্চি বড়ো হলে, শুয়ে শুয়েই সুতো বঁড়শি ফেলে ম্যাট্রেসের তলা দিয়েই মাছ ধরা যেত।
মাছের মধ্যে ডলফিন আর পাইলট মাছেরাই ভেলার সাথে লেপটে থাকত। কাল্লাও ছেড়ে সমুদ্রের স্রোতে প্রথমবার ডলফিন আমাদের সঙ্গ নেবার পর থেকে আমাদের গোটা যাত্রায় বড়ো ডলফিনের দল একটা দিনও আমাদের সঙ্গ ছাড়েনি। ভেলার কী যে ওদের আকর্ষণ করত জানিনা, কিন্তু মনে হয় এই অমোঘ আকর্ষণের কারণ মাথার ওপরে ভেলার ছায়ায় সাঁতার দেওয়ার সুযোগ অথবা সমুদ্রের শ্যাওলা আর গেঁড়ি-গুগলি খাবার সুযোগ। ভেলার কাঠের লগ আর দাঁড়ের চারদিক থেকে ওগুলো মালার মতো ঝুলে ছিল। গোড়াতে একটা পাতলা সবুজ আস্তরণ দিয়ে শুরু হয়েছিল কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই সামুদ্রিক শ্যাওলা এত অসম্ভব দ্রুত গজিয়ে উঠল যে ঢেউয়ের ওপরে দুলতে থাকা কনটিকিকে দাড়িওলা সমুদ্র-দেবতার মতো দেখাত। সবুজ সমুদ্র-শ্যাওলার মধ্যে ছোটো ছোটো মাছ আর আমাদের ভেলায় চুরি করে উঠে পড়া কীর্তিমান কাঁকড়ারা মহানন্দে বাসা করে ছিল।
একটা সময় পিঁপড়ে থিকথিক করত ভেলাতে। কয়েকটা গুঁড়ির ওপরে ছোটো কালো কালো পিঁপড়েরা বাসা বেঁধে ছিল। সমুদ্রে ভেসে পরার পর গুঁড়িগুলো ক্রমশ ভিজে জল শুষতে থাকায় পিঁপড়েরা বেরিয়ে এসে স্লিপিংব্যাগে আশ্রয় নিল। সর্বত্র পিঁপড়ে, কুটুস কুটুস করে কামড়ে আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে দিত, ভাবতাম ভেলাছাড়া করে ছাড়বে আমাদের। ক্রমশ সমুদ্রের ভেজা ভেজা ভাব বাড়লে ওরা বুঝতে পারল যে এটা ওদের উপযুক্ত জায়গা নয়। আমাদের অভিযান শেষ হতে হতে কয়েকটাই মাত্র টিকে ছিল। কাঁকড়া বাদে ভেলাতে আয়েস করে ছিল যারা তারা এক ইঞ্চি থেকে দেড় ইঞ্চি গেঁড়ি-গুগলি। শয়ে শয়ে জন্মে গেছিল ভেলায়, বিশেষত বাতাসের উলটো দিকটাতে; বড়ো গুগলিগুলো আমরা স্যুপে চড়াতে না চড়াতেই, ছোটো ছোটো লার্ভারা বড়ো হয়ে উঠছিল। গেঁড়িগুগলিগুলো বেশ তাজা আর সুস্বাদু; সমুদ্রের শ্যাওলা আর আগাছা আমরা স্যালাড হিসেবে খেতাম, কিন্তু তত ভালো না হলেও খাওয়ার যোগ্য। সত্যি সত্যি ডলফিনরা এই আগাছা খেত কিনা তা আমরা দেখিনি, কিন্তু ভেলার গুঁড়িগুলোর তলায় সর্বক্ষন ওরা চকচকে পেট উলটে সাঁতার দিত।
ডলফিন, ডোরাডো, অসাধারণ রঙিন ক্রান্তীয় মাছ, কিন্তু এটাকে অন্য প্রজাতির সাথে গুলিয়ে ফেলাটা ঠিক নয়, সেগুলোকেও ডলফিন নামে ডাকা হয় তবে তারা ছোটো দাঁতালো তিমি বিশেষ। ডলফিন সাধারণত তিন ফুট তিন ইঞ্চি থেকে চারফুট ছ-ইঞ্চি লম্বা আর ধারের দিকে যথেষ্ট চ্যাপটা হয়, মাথা আর ঘাড় খুবই উঁচু। ডলফিনের চমৎকার রঙ। জলের মধ্যে নীল-সবুজ দেখায় যেন একটা নীল বোতলে চিকচিকে সোনালি হলুদ পাখনা লাগানো। কিন্তু জল থেকে তুলে ফেললেই অদ্ভুত জিনিস দেখেছি। মাছটা মরে যেতেই ওর গায়ের রঙ বদলে গিয়ে কালো ছোপ ছোপ ধূসর রুপোলি হয়ে গেল আর শেষকালে রুপোর মতো সাদা রঙের হয়ে গেল। চার পাঁচ মিনিট এমনি রইল আর তারপরেই আবার পুরোনো রঙ ধীরে ধীরে ফিরে এল। এমনকী জলের মধ্যেও ডলফিন গিরগিটির মতো হামেশাই রঙ বদলায়, প্রায়শই আমরা তামারঙের নতুন প্রজাতির মাছ দেখে কাছে এলে মনোযোগ দিয়ে দেখেছি, ওহো, এ আমাদের পুরোনো বন্ধু ডলফিন যে!
ডলফিনের কপালটা উঁচু আর চওড়া হওয়াতে পাশ থেকে চ্যাপটা বুলডগের মতো লাগে। ওরা শিকারের সময় জল ছেড়ে অনেকটা টরপেডোর মতো লাফ দেয় উড়ুক্কুমাছের ঝাঁকে। মেজাজ শরিফ থাকলে কাত হয়ে খুব দ্রুত জল কেটে এগিয়ে গিয়ে বাতাসে লাফিয়ে উঠে পাক খেয়ে থপ করে এসে জলে পড়ে। জলের মধ্যে সশব্দে এসে পড়ায় জল ছিটকে ওঠে চারদিকে। জলে এসে পড়তে না পড়তেই আবার লাফ দেয়, আবার, আবার, ঢেউয়ের ওপরে উঠে যায়। কিন্তু মেজাজ খারাপ থাকলে, ধরা যাক, আমরা একটাকে ধরে ভেলার ওপর তুলেছি, ব্যস কামড়ে দিল। টরস্টাইনকে বেশ কয়েকদিন খোঁড়াতে হল পায়ের বুড়ো আঙুলে কাপড় জড়িয়ে; ও একটা ডলফিনের মুখে আঙুলটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল আর সে বেচারা ফট করে মুখ বন্ধ করে একটু বেশিই জোরে চিবিয়ে দিয়েছিল। বাড়ি ফিরে আসার পর আমরা শুনেছিলাম, ডলফিনরা স্নান করতে নামা মানুষদের আক্রমণ করে খেয়েও ফেলে। এটা আমাদের কাছে খুব একটা প্রশংসার কিছু ছিল না কেননা আমরা প্রতিদিনই ওদের পাশাপাশিই স্নান করতে নেমেছি, তেমন কিছু করেইনি। ওরা যদিও দুর্দান্ত শিকারী, কারণ পেটের মধ্যে স্কুইড আর উড়ুক্কুমাছ দুইই পেয়েছি।
ডলফিনদের প্রিয় খাদ্য উড়ুক্কুমাছ। জলের ওপরে কিছু ঝাপটা মারলেই হল, উড়ুক্কু মাছ ভেবে অন্ধের মতো ছুটে চলে যাবে। বহুদিনই সকালের ঘুম ঘুম চোখে কেবিনের বাইরে এসে আধবোজা চোখে সমুদ্রের জলে যেই টুথব্রাশ ডুবিয়েছি, ঘুম টুম সব ছুটিয়ে একটা তিরিশ পাউন্ডের মাছ ভেলার তলা থেকে বিদ্যুতগতিতে এসে টুথব্রাশে ঠোক্কর মেরে হতাশ হয়েছে। আবার যখন ভেলার কিনার ঘেঁষে প্রাতরাশ সারছি, একটা ডলফিন লাফ দিয়ে বাতাসে পাক খেয়ে পড়ল আর জল ছিটকে আমাদের পিঠ ভিজিয়ে, খাবারের ওপর এসে পড়ল।
একদিন রাতে খেতে বসেছি, টরস্টাইন সবচেয়ে বড়ো মাছের গল্পটা এবারে সত্যি করে দিল। ও হঠাৎ হাতের কাঁটাচামচটা নামিয়ে রেখে সমুদ্রে হাতটা ডুবিয়ে দিল, আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই, জলের মধ্যে হুড়দাড় করে একটা বড়ো ডলফিন লাফ দিয়ে পড়ল আমাদের মধ্যে। টরস্টাইনের হাতে একটা মাছধরার সুতোর শেষপ্রান্ত, অন্যদিকে ঝুলছে সম্পূর্ণ আশ্চর্য একটা ডলফিন, যেটা কদিন আগেই এরিকের সুতো ছিঁড়ে পালিয়েছিল।
এমন একটা দিনও কাটেনি, অন্তত ছ’সাতটা ডলফিন ভেলার আশেপাশে কিংবা তলায় ঘোরাফেরা করেনি। কোনো এক দিন হয়তো খুব কম, দুটো কি তিনটে, কিন্তু পরদিনই দেখা গেল তিরিশ চল্লিশটা এসে গেল। সাধারণভাবে, রাতে টাটকা মাছ খেতে হলে যার রান্না করার পালা তাকে মিনিট বিশেক আগে বলে দিলেই হত। ও একটা ছোটো বাঁশে সুতো বেঁধে হুকে আধখানা উড়ুক্কু-মাছ আটকে দিত। সঙ্গে সঙ্গেই একটা ডলফিন দেখা দিত, জলের ওপর দিয়ে খলবল করে সোজা বঁড়শি তাক করে আসছে, পেছন পেছন আরো দুটো কি তিনটে। খেলানোর জন্য চমৎকার মাছটা আর ধরতে পারলে টাটকা মাছটা খেতেও বেশ সুস্বাদু, অনেকটা কড আর স্যামন মাছ মেশানো। ওটা দুদিন পর্যন্ত রাখা হত, তার বেশি দরকারও ছিল না, সমুদ্রে প্রচুর মাছ ছিল।
পাইলট মাছের সঙ্গে আমাদের অন্যরকম চেনাজানা ছিল। হাঙরেরা ওদের নিয়ে আসত আর আমাদের কাছে ছেড়ে যেত হাঙরটা মারা যাবার পর দেখভালের জন্য। প্রথম হাঙরটা সমুদ্রে পড়ার কয়েকদিনের মধ্যেই দেখা গিয়েছিল। শিগগিরি প্রায় প্রতিদিনই হাঙর দেখা যেতে লাগল। কখনো কখনো সাঁতরে ভেলার কাছাকাছি এসে চারপাশে এক দুচক্কর লাগিয়ে শিকারের খোঁজে চলে যেত। বেশিরভাগ সময়েই ভেলার পেছনদিকে দাঁড়ের ওপাশে পাহারা দিত, সামনেটা সতর্কভাবে এড়িয়ে, চুপচাপ টুঁ শব্দ না করে, মাঝে মাঝে লেজটা নাড়িয়ে ভেলার মন্থর গতির সাথে পাল্লা দিত কেবল। নীলচে ধূসর হাঙরদের শরীরটা রোদ্দুরে জলের ঠিক তলাতে বাদামি রঙের দেখাত। হাঙরেরা সমুদ্রের ঢেউয়ে উঠত নামত আর ওপরের পাখনাটা ভীতিজনকভাবে জেগে থাকত। খুব বড়ো ঢেউ দিলে তার ধাক্কায় হাঙরটা হয়তো আমাদের চেয়ে ওপরে উঠে গেল, তখনই আমরা পাশ থেকে ওটাকে দেখতে পেতাম যেন একটা কাচের বাক্সে রয়েছে আর আমাদের দিকে গম্ভীরভাবে সাঁতরে আসছে, মুখের সামনে অতিব্যস্ত অনুচর পাইলট মাছের দল। কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হত হাঙর আর তার ডোরাকাটা অনুচরেরা সোজা সাঁতরে ভেলার ওপরে এসে পড়বে, ঠিক তখনই ভেলাটা উঁচু হয়ে অবলীলায় ঢেউয়ের মাথায় উঠে উলটো দিকে নেমে পড়ত।
শুরুতে হাঙরদের জন্য একটা দারুণ সম্ভ্রম ছিল আমাদের, বিশেষত ওদের কুখ্যাতি আর ভীতিজনক উপস্থিতির জন্য। সরু দেহটায় অপরিমিত শক্তি, ইস্পাত-কঠিন পেশির সমাহার, চওড়া মাথাটায় কুঁতকুঁতে সবজেটে চোখ আর বেধড়ক খিদে, বিরাট চোয়ালটা ফুটবল অবধি গিলে নিতে পারে। হালের লোকটা যখন চেঁচিয়ে বলত “পাশের দিকে হাঙর” বা “সামনের দিকে হাঙর” আমরা সবাই বেড়িয়ে এসে হারপুন বা কোঁচ নিয়ে ভেলার কিনারে এসে দাঁড়াতাম। হাঙর সাধারণত পিঠের পাখনাটাকে উঁচিয়ে ভেলার কাঠের কাছাকাছি এসে আমাদের চারপাশে চক্কর দিত। দেখা গেল কোঁচটা হাঙরের শক্ত পিঠে ছুঁড়ে দিতে সেটা স্প্যাগেটির মতো বেঁকে গেল অথবা হাত-হারপুনটার মাথা মট করে ভেঙে গেল, সেমুহূর্তে আমাদের কাছে হাঙরটার কদর আরো বেড়ে যেত। অনেকটা পরিশ্রমে হয়তো হাঙরটার চামড়া বা কোমলাস্থি ভেদ করা যেত, হাঙরটা হারপুন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চলে না যাওয়া অবধি চারপাশের জল তোলপাড় হয়ে চলত আর শেষে একটুখানি তেল জলের ওপরে ভেসে ছড়িয়ে পড়ত।
আমাদের শেষ হারপুনটা বাঁচাতে আমরা অনেকগুলো মাছধরার বঁড়শি একসাথে একটা ডলফিনের মধ্যে ঢুকিয়ে টোপটা জলে ফেলে দিতাম। ওটার সঙ্গে বাড়তি সুরক্ষার জন্য ইস্পাতের তারের সাথে একটুকরো মোটা দড়ি বাঁধা থাকত। আস্তে আস্তে নিশ্চিত লক্ষ্যে হাঙরটা আসত, নাকটা জলের ওপর ভাসিয়েই বাঁকানো চোয়ালটা হাঁ করে একঝটকায় গোটা ডলফিনটাকে গিলে ফেলত। ব্যস অমনি আটকে যেত। তারপর জলের ওপর ফেনা তুলে উথাল পাথাল চলত, শক্ত হাতে দড়ি ধরা থাকত আমাদের, প্রবল বাধা সত্বেও ওই বিরাট বস্তুটাকে খেলিয়ে খেলিয়ে পেছনদিকের কাঠের নীচু অংশে নিয়ে আসা হত। ওখানটায় ব্যাটা চুপ করে অপেক্ষায় থাকত, ভাবখানা এরপর কী হয় দখি। চোয়ালের করাতের মতো দাঁতের সারি দেখিয়ে ভয় দেখাত আমাদের। ঢেউয়ের ধাক্কায় হাঙরটা শ্যাওলায় পিচ্ছিল হয়ে থাকা ডেকের ওপর উঠে আসলেই আমরা ওর লেজে একটা দড়ি বেঁধে দিয়ে নিরাপদ দূরে সরে আসতাম যতক্ষণ না ওর যুদ্ধং দেহি মনোভাবটা স্তিমিত হয়ে আসে।
এরকমভাবে ধরা প্রথম হাঙরটার নরম হাড়ে আমাদের হারপুনের মাথাটা বিঁধে থাকতে দেখেছি, মনে হয়েছিল একারনেই হাঙরটা হয়তো অত লড়াই দিতে পারেনি। কিন্তু পরে একের পর এক হাঙর একইভাবে ধরার পর বুঝেছি ব্যাপারটা সবসময়েই এমনই সহজ। হাঙরটা ঝটকা দিক বা দড়িতে টান মারুক, সেটা যতই কঠিন আর ভীতিজনক হোক না কেন, ও ওর পুরো শক্তি কখনোই ব্যবহার করতে পারে না, আর সহজেই পাকড়ে ফেলা যায়, যদি না দড়ি টানাটানির সময় আমরা সামান্য এক ইঞ্চি দড়িও আলগা দিই, সর্বক্ষণ টানটান করে ধরে রাখি, হাঙরটাকে ছেড়ে না দিই। ভেলার ওপরে তুলে ফেলা হাঙরগুলোর দৈর্ঘ্য সাধারণত চারথেকে ছ’ফুট মতো হত, নীল আর বাদামি দুরকমেরই হাঙর ধরা হত। বাদামি হাঙরগুলোর পেশির ওপরে চামড়ার আস্তরন এতটাই পুরু যে ছুরি বসানো কঠিন, সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও কখনো কখনো আমরা ব্যর্থ হতাম। পেট বা পিঠের দু’দিকই সমান শক্ত। মাথার দু’পাশে পাঁচটা করে কানকোই ছিল একমাত্র অরক্ষিত জায়গা।
হাঙর ধরার পর জল থেকে ওঠানোর পর দেখেছি কালো পিচ্ছিল রেমোরা মাছ ওর দেহে সেঁটে আছে। মাথার সামনের দিকে চ্যাপটা অংশে গোল চোষক যন্ত্রের সাহায্যে এমনভাবে ওগুলো আটকে থাকত যে লেজ ধরে টেনে কিছুতেই ছাড়ানো যেত না। ওরা নিজে থেকেই ঝপ করে আলগা হয়ে এক সেকেন্ডের মধ্যে দেহের আরেক জায়গায় গিয়ে আটকে যেত। হাঙরের গায়ে ঝুলে থাকতে থাকতে, ক্লান্ত হয়ে, যখন দেখত ওটার আর সমুদ্রে ফিরে যাবার কোনো লক্ষণ নেই, ওরা লাফিয়ে পড়ে কাঠের ফাঁক গলে সমুদ্রে সাঁতার দিয়ে পালাত, আরেকটা হাঙরের খোঁজে। রেমোরা আরেকটা হাঙর না পাওয়া অবধি অন্য কোনো মাছের গায়ে সেঁটে থাকে। ওগুলো সাধারণত এক আঙুল সমান থেকে এক ফুট পর্যন্ত হয়। আমরা আদিবাসীদের পুরোনো একটা কসরত প্রয়োগ করে দেখেছি, ভাগ্য ভালো থাকলে কখনো জ্যান্ত রেমোরা ধরে ওরা এটা করত। ওরা মাছটার লেজে দড়ি বেঁধে জলে ছেড়ে দিত। মাছটা এরপর প্রথম যে মাছটা পেত তার গায়ে শক্ত হয়ে আটকে যেত, আর তারপর ভাগ্যবান মাছধরিয়েটির কাছে দুটো মাছই লেজে বাঁধা দড়ির সাহায্যে তুলে ফেলার ঝামেলাই থাকত না। আমাদের কপাল ভালো ছিল না। আমরা যতবার রেমোরার লেজে দড়ি বেঁধে ছেড়েছি, ওটা ছিটকে গিয়ে ভেলার কোনো না কোনো লগে শক্ত হয়ে এঁটে থেকেছে, ভেবেছে যে বেশ বড়ো একটা হাঙরের গায়ে আটকেছে বুঝি। যতই টানি ওটা ওখানেই আটকে থাকে। ক্রমশ আমাদের ভেলার লগের গায়ে ছোটো ছোটো এরকম অনেকগুলো রেমোরা গেঁড়ি গুগলির পাশাপাশি ঝুলতে ঝুলতে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে চলল।
রেমোরা মাছ অবশ্য বড্ড বোকা আর বিশ্রি দেখতে, মোটেও পোষ্য হিসেবে ভালো নয় বরং পাইলট মাছ সেদিক থেকে অনেক ভালো। পাইলট মাছ ছোটো চুরুটের আকারের, গায়ে জেব্রার মতো ডোরাকাটা, হাঙরের সামনে সামনে ঝাঁক বেঁধে চলে। এদের এরকম নাম হবার কারন মনে করা হয় এরা প্রায়ান্ধ হাঙরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে। আদতে এরা হাঙরের সঙ্গে সঙ্গেই চলে, এই অবধি, আর কখনো স্বাধীনভাবে কিছু করছে মানে নির্ঘাৎ দৃষ্টিসীমানার মধ্যে খাবারের সন্ধান পেয়েছে। পাইলট মাছ তার প্রভু বা মনিবের সাথে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত থাকে। কিন্তু রেমোরার মতো গায়ে সেঁটে থাকতে পারে না বলে, মনিব জল থেকে ছিটকে বাতাসে ওঠার পর আর জলে না ফিরে এলে সম্পূর্ণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে খুঁজে দেখে আবার ফিরে ফিরে আসে ভেলার ঠিক পেছনটাতে ঠিক যেখান থেকে ওদের মনিব আকাশে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। ক্রমশ হাঙরটা আর জলে না ফিরে এলে ওদেরও নতুন মনিবের খোঁজে বেরোতে হয়। কাছাকাছি কনটিকি ছাড়া আর অবশ্য কাউকেই পাওয়া যেত না।
ক্রমশ

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s