ধারাবাহিক অভিযান কনটিকি অভিযান থর হেয়ারডাল অনুবাদ ইন্দ্রনাথ বসন্ত ২০২০

কন-টিকি অভিযান-আগের পর্বগুলো

থর হেয়ারডাল। (অনুবাদঃ ইন্দ্রনাথ)

আগের কথা

অভিযাত্রীরা মাঝে মাঝেই ভেলা ছেড়ে ছোটো রবারের ডিঙি নিয়ে ভেসে পড়ত। এমনি ভেসে পড়ার সময় একবার প্রায় দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল, কনটিকি থেকে অনেকটা দূরে চলে গিয়েছিল ভেলাটা। শেষমেষ কোনোরকমে ভেলায় ফিরে আসতে পেরেছিল তারা। এরপর থেকে নিয়ম হল দড়ি বাঁধা অবস্থাতেই কেবলমাত্র ভেলা ভাসানো যাবে। নড়বড়ে পাতায় ছাওয়া ছোট্ট কুটিরটা যেন একখণ্ড ওয়েসিস। অভিযাত্রীদের বড়ো আপনার, নিজস্ব গৃহ, আপাত নিশ্চিন্তির একখণ্ড আশ্রয়। যদিও চারপাশেই অসীম সমুদ্র। দিগন্তবিস্তৃত তার জলরাশি। ভেলাটা তার মাঝে যেন এক কল্পদৃশ্য। ক্রান্তীয় অঞ্চলের এই সমুদ্রে ভাসার সময় অভিযাত্রীদের মনে হত স্থানকালরহিত ইতিহাসের মধ্যে যেন বিলীন হয়ে রয়েছে তারা। বাঁশের ডেকের ওপরে বসে অন্ধকারে দুলতে থাকা প্যারাফিন আলোর চারপাশে বসে পুরোনো দিনের ইনকা অভিযাত্রীদের গল্প করত তারা। তাদের সাগরপাড়ি দেবার কথা, দক্ষিণ সমুদ্রের দ্বীপে এসে বসতিস্থাপন আর আশ্চর্য মূর্তিগুলির রহস্য উন্মোচনের কথা। দক্ষিণে ইস্টার দ্বীপে পাথর কুঁদে তৈরি বিরাট মাথাওয়ালা যে মূর্তিরা তাদের দাড়িওলা চিবুক আর সাদা চামড়ার বৈশিষ্ট্য নিয়ে অজ্ঞাত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধ্যানরত অবস্থায় রয়েছে। গাছপালাহীন দ্বীপের ঢালু জমিতে এখানে ওখানে ছড়ানো বিরাট মূর্তিগুলো কবে থেকে আকাশের দিকে উঁচিয়ে আছে। ইস্টার দ্বীপের বিভিন্ন জায়গাতে অনেক অসমাপ্ত বিরাট বিরাট মূর্তি, এখনো রয়ে গেছে। তা থেকেই আন্দাজ করা যায় বিভিন্ন স্তরে এই মূর্তি তৈরি ও মূর্তি স্থাপনে কীভাবে কাজ হত। ভেলার ওপর আরেকটা আকর্ষণীয় ব্যাপার ছিল খালি হাতে হাঙর ধরার খেলা। ডলফিন মাছের টোপ দিয়ে খানিকটা প্রলুব্ধ করে ওর লেজটা চেপে ধরে ভেলায় তুলে লেজের মধ্যে ফাঁস আটকে হাঙর ধরা।

সাগরপাড়ি

ডেকের ওপর একটা হাঙর তুলে ফেললেই তোতাটা খুব চমৎকৃত হত। বাঁশের কেবিন থেকে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে দেয়াল বেয়ে তিরবেগে উঠে পামগাছের পাতা-ছাওয়া ছাদের ওপরে একটা ভালো, নিরাপদ জায়গা বেছে নিয়ে উত্তেজনায় হয় বসে বসে মাথা ঝাঁকাত নয়তো ছাদের এদিক ওদিক ঘনঘন পায়চারি করতে করতে চিল চিৎকার করত। খুব দ্রুতই ও একজন দুরন্ত নাবিক হয়ে উঠেছিল আর সারাক্ষণই ফুটত, মজা করত, হাসাহাসি করত। আমরা জানতাম ভেলাতে মোট সাতজন আছি, আমাদের ছ’জন আর তোতাটা। কাঁকড়া জোহান, অবশ্য এর মধ্যে ধরা নেই, সে-অর্থে ও ছিল আমাদের ঠান্ডা রক্তবিশিষ্ট সঙ্গী, ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। রাতের বেলা বাঁশের কেবিনের ছাদের তলায় তোতাটা গুটি গুটি এসে খাঁচার ভেতর ঢুকে পড়ত, কিন্তু দিনের বেলা ডেকের ওপর বীরদর্পে ঘুরে বেড়াত নয়তো গাইরোপের ওপর বসে থাকত আর দারুণ দারুণ দড়াবাজিকরের খেলা দেখাত।

আমাদের যাত্রা শুরুর সময়ে মাস্তুলের দড়িতে টার্নবাকল লাগানো ছিল, কিন্তু সেটা দড়ি কেটে বসে যাচ্ছিল বলে ওগুলো বদলে আমরা দড়িতে সাধারণ গিঁট দিয়ে দিয়েছিলাম। মাস্তুলের দড়িতে টান পড়ে সূর্যের তাপে আর বাতাসে সেগুলো ঢিলে হয়ে এলে, আমরা সবাই মিলে হাতে হাত লাগিয়ে লোহার মতো ভারী লম্বা ম্যানগ্রোভ কাঠের মাস্তুল ধরে রাখতাম যাতে ধাক্কার চোটে দড়ির ওপর পরে সেগুলোকে ছিঁড়ে না দেয়। মাস্তুল টানাটানির সময় চূড়ান্ত সংকটজনক অবস্থায় তোতাটা ওর চেরা গলায় চেঁচিয়ে উঠতঃ “ হেঁইয়ো জোয়ান, টানো টানো, হো হো, হো, হা , হা, হা!” আর যদি আমরা তা শুনে হেসে ফেলেছি, আমোদগেঁড়েটা নিজের মর্জিমতো হাসতেই থাকত আর মাস্তুলের ওপর খালি পাক খেত।

প্রথমদিকে তোতাটা আমাদের রেডিও অপারেটরদের জ্বালিয়ে মারত। ওরা হয়তো মগ্ন হয়ে আছে রেডিও আর জাদু ইয়ারফোন নিয়ে আর হয়তো ওকালাহামার কোনো হ্যাম রেডিও অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগও করে ফেলেছে। হঠাৎ দেখা গেল ইয়ারফোন এক্কেবারে নিঃশব্দ, ওরা তার টানাটানি করে, নব-টব ঘুরিয়ে হাজার চেষ্টাতেও  একছিটে শব্দও শুনতে পেল না। তোতাটা ততক্ষণে এরিয়ালের তারটা কাটতে খুব ব্যস্ত। এটা শুরুর দিনগুলোতে ঘটত যখন এরিয়ালের তার একটা বেলুনে বেঁধে ওপরে পাঠানো হত। কিন্তু একদিন তোতাটা সত্যিই খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। খাঁচার মধ্যে বসে কেমন ঝিমিয়ে রইল, দুদিন কোনো খাবারে মুখ দিল না। তখনই ওর পটির মধ্যে এরিয়ালের তারের সোনালি রঙের টুকরো পাওয়া গেল। রেডিও অপারেটররা গালাগালি দেবার জন্য অনুতপ্ত হল আর তোতাটাও তার বদমাইশির জন্য। সেদিন থেকে ন্যুট এবং টরস্টাইন হয়ে উঠল ওর কাছের বন্ধু আর সেদিন থেকেই রেডিও-কর্নার ব্যতীত অন্য কোথাও ও ঘুমোত না। যখন ওটাকে ভেলায় আনা হয় তখন তোতার মাতৃভাষা ছিল স্প্যানিশ; বেঙ্গট বলেছিল ওটা টরস্টাইনকে নকল করে একেবারে খাস  নরওয়েজিয়ান বলার বহু আগে থেকেই নরওয়েজিয়ান টানে স্প্যানিশ বলাটা রপ্ত করে নিয়েছিল।

তোতাটার রসবোধ এবং ওর চমৎকার পালকের রঙ আমরা মাস দুয়েক বেশ উপভোগ করেছি। আর তারপর একদিন যখন ও মাস্তুলের ডগা থেকে থেকে দড়ি বেয়ে নামছে, ভেলার পেছনদিক থেকে একটা মস্ত ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল ভেলায়। যখন বুঝলাম তোতাটা ভেসে গেছে ঢেউয়ে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওকে আর দেখতে পেলাম না। কনটিকিকে থামানো বা ফেরানো সম্ভব ছিল না। আর যদি কিছু পড়েও যায় জলে, আগেকার অগুন্তি অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে আমাদের কাছে কোনো সুযোগ ছিল না ফিরে সেটাকে উদ্ধার করার।

তোতাটার অভাবে প্রথম সন্ধ্যায় আমরা খুবই মুষড়ে পড়েছিলাম; আমরা জানতাম আমাদেরও ঠিক একই হাল হবে যদি আমরা কোনো রাতে একলা পাহারা দেবার সময় ওইভাবে জলে পড়ে যাই। আমরা নিরাপত্তার বিধিনিষেধ আরো শক্তপোক্ত করলাম, রাত পাহারার সময় নতুন দড়ি ব্যবহার শুরু করলাম এবং একে অন্যেকে সতর্ক করতে থাকলাম এই বলে যে আমরা নিরাপদে আছি কেন না প্রথম দুমাস ভালোয় ভালোয় কেটেছে। একটা অসতর্ক পদক্ষেপ, একটা বেআক্কেলে নড়াচড়া, সবুজ তোতাটা যেখানে গেছে সেখানেই পাঠিয়ে দেবে আমাদের, এমনকি দিনের আলোতেও।

বহুসময় কাটলফিশের ডিমের খোলা ঢেউয়ের মাথায় ভাসতে দেখেছি উটপাখির ডিমের মতো অথবা নীল ঢেউয়ের ওপর সাদা খুলির মতো। কখনো-সখনো দেখেছি ওর তলায় একটা স্কুইড কিলবিল করছে। এও দেখেছি যে ধবধবে সাদা বল প্রায় আমাদের সঙ্গে একই তলে ভাসছে, স্রেফ ডিঙিতে ভেসে গিয়ে নিয়ে এলেই হল, বেশ সহজ। এরকম ভাবছি, সেসময়েই প্ল্যাঙ্কটনের নেটটা ছিঁড়ে গেল আর কাপড়ের নেটটা ভেসে গিয়ে ভেলার পেছনে ছেড়ে আসা সাদা ফেনার ওপর ভাসতে থাকল। ডিঙি নামিয়ে বেয়ে বেয়ে গিয়ে ভাসমান বস্তুগুলো তুলে আনার সময় প্রতিবারই আমরা একটা দড়ি বেঁধে নিতাম। অথচ বিস্ময়ের সাথে দেখতাম হাওয়া আর ঢেউয়ের ধাক্কায় ডিঙিটা দূরে চলে যেত আর কনটিকির সাথে বাঁধা দড়িটায় জলের মধ্যে এমন টান পড়ত যে কিছুতেই ডিঙি বেয়ে সদ্য ছেড়ে আসা বিন্দুতেও পৌঁছোতে পারতাম না। যেটা তুলে আনতে চাইছি হয়তো সেটার কয়েক গজের মধ্যে পৌঁছলাম, কিন্তু ততক্ষণে গোটা দড়িটা বেরিয়ে এসেছে আর কনটিকি আমাদের পশ্চিমে টেনে নিয়ে চলেছে। ভেলার ওপরে ক্রমশ আমাদের মনে গেঁথে গেল “একবার জলে পড়ে গেলেই ব্যস খেলা শেষ”। বাকি পথটা শেষ করতে চাইলে কনটিকিতেই লেপ্টে থাকতে হবে আমাদের যতক্ষণ না কনটিকির ডগাটা উল্টোদিকের ডাঙায় ভিড়ছে।

তোতাটা চলে যাওয়ায় রেডিও রাখার কোনাটা শূন্য হয়ে ছিল, কিন্তু, পরদিন প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ক্রান্তীয় সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ওর অভাবটা সামলে উঠছিলাম। পরপর কয়েকদিন অনেকগুলো হাঙর ধরা হল এবং আমরা ওদের পেটের মধ্যে নানান আশ্চর্য বস্তু আর টুনা মাছের মাথার ডেলার মধ্যে ক্রমাগত তোতার কালো বাঁকানো ঠোঁট অথবা ওইরকম কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম। আরো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল কালো ঠোঁটগুলো আসলে হজম হয়ে যাওয়া কাটলফিশের অংশ।

ভেলায় ওঠার প্রথম দিন থেকেই আমাদের রেডিও অপারেটরদের কাজটা বেশ কঠিন ছিল। হামবোল্ট স্রোতের প্রথম দিন সমুদ্রের জল ব্যাটারির বাক্স উপচে পড়ছিল ফলে সংবেদনশীল রেডিও কর্নারের জায়গাটা ক্যানভাস কাপড় দিয়ে যথাসম্ভব ঢেকে রাখতে হচ্ছিল ওদের, ঢেউয়ের মধ্যে যতখানি ঢেকে রাখা সম্ভব আরকি! তারপর একটা সমস্যা উপস্থিত হল, ছোট্ট ভেলায় কীভাবে বড়ো একখানা এরিয়াল আটকানো যাবে তা নিয়ে। ওরা ঘুড়ির সাথে এরিয়ালটা বেঁধে দিয়ে ওপরে পাঠানোর চেষ্টা করল, কিন্তু দমকা হাওয়ায় ঢেউয়ের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ল সেটা আর ডুবে গেল। তারপর ওরা চেষ্টা করল এরিয়ালটা বেলুনে বেঁধে দিয়ে পাঠাতে, কিন্তু প্রখর সূর্যের তাপে সেটাও চুপসে গেল আর সমুদ্রে ডুবে গেল। আর তারপর তোতাটাকে নিয়ে সমস্যা তৈরি হল। এর ওপর পক্ষকাল হামবোল্ট স্রোতেই ভাসতে হল, আন্দিজের নিঃশব্দ এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে, যেখানে, শর্টওয়েভ মূক এবং প্রাণহীন, সাবানের বাক্সের হাওয়ার বুদবুদের মতো।

এরকমই একদিন রাতে হঠাৎ করে শর্ট ওয়েভ-এ আওয়াজ শোনা গেল, আর টরস্টাইনের পাঠানো সিগনাল দৈবাৎই লস অ্যাঞ্জেলেস-এর এক অ্যামেচার রেডিও অপারেটর শুনে ফেলল। সে তখন তার প্রেরক যন্ত্র নিয়ে খুটখুট করে সুইডেনের একজন অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিল। লোকটা জিজ্ঞেস করল আমাদের সেটটা কোন রকমের! আমাদের দিক থেকে সন্তোষজনক উত্তর পেয়ে ও টরস্টাইনকে নাম জিজ্ঞেস করল আর প্রশ্ন করল কোথায় থাকে? যখন ও শুনল যে টরস্টাইন প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে একটা ভেলায় বাঁশের একটা কেবিনে আছে, ওর রেডিওতে কথার বদলে নানারকম কোঁ কাঁ শব্দ হতে থাকল, টরস্টাইন আরো কিছু তথ্য দেবার পর লোকটা অবশেষে বলল ওর নাম হ্যাল আর ওর বউয়ের নাম অ্যানা। ওর বউ জন্মসূত্রে সুইডিশ, ফলে সে আমাদের বেঁচে থাকার কুশল সংবাদটা আমাদের পরিবারের লোকদের জানিয়ে দিতে পারে।

সে-সন্ধ্যায় আমাদের অদ্ভুত লাগছিল, বিলকুল একজন অপরিচিত লোক, একজন অস্থায়ী ছায়াছবির চালনাকারী, হ্যাল, লস অ্যাঞ্জেলিসের গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে বসেও সারা পৃথিবীতে একমাত্র লোক যে জানে আমরা বেঁচে আছি আর সেই মুহূর্তে ঠিক কোনখানে আছি। সে-রাত্তির থেকে, হ্যাল, হ্যারল্ড কেম্পেল আর ওর বন্ধু ফ্র্যাঙ্ক কুভেস পালা করে রোজ রাতে বসে ভেলা থেকে পাঠানো সংকেত শুনত। আর হারম্যান পেত আমেরিকার আবহাওয়া ব্যুরো থেকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে টেলিগ্রাম। তার কারণ ও প্রতিদিন এমন একটা অঞ্চলের দুখানা করে কোড রিপোর্ট পাঠাত যে অঞ্চলের প্রতিবেদন ওদের কাছে প্রায় ছিলই না আর কোনো পরিসংখ্যানও ছিল না। পরে টরস্টাইন এবং ন্যুট আরো অন্যান্য রেডিও অ্যামেচারদের সঙ্গে প্রায় প্রতি রাতেই যোগাযোগ স্থাপন করত আর এগুলো শুভেচ্ছাবার্তা হিসেবে নোটডেন এর এগিল বার্গ নামে এক হ্যাম রেডিওর মাধ্যমে নরওয়েতে পাঠাত।                        

মাঝ সমুদ্রে তখন মাত্রই কিছুদিন হয়েছে, রেডিও কর্নারে নোনতা জল বেশি হয়ে যাওয়াতে রেডিও কাজ করা বন্ধ করে দিল। অপারেটররা রাতদিন এক করে, স্ক্রু, শোল্ডারিং আয়রন  নিয়ে মাথা খারাপ করে ফেলল। আমাদের দূরের বেতার-বন্ধুরা হয়তো ভেবে নিয়েছিল, ভেলার দিন শেষ। এমনই এক রাতে এল ওয়ান টুবি সিগনাল হঠাৎ ইথারে আছড়ে পড়ল, আর তখুনি রেডিও কর্নারে বোলতার চাকের মতো বিজবিজ আওয়াজ শুরু হয়ে গেল কেননা কয়েকশো আমেরিকান অপারেটররা একযোগে আমাদের সিগন্যালের উত্তর দিতে শুরু করেছিল। ভেলায় রেডিও অপারেটরদের এলাকায় বসে থাকলে একজনের মনে হতেই পারে যে সে বোলতার চাকের মধ্যে বসে আছে। জায়গাটা সমুদ্রের জলে ভিজে স্যাঁতসেঁতে, কাঠ দিয়ে মোড়া সব এলাকাই অবশ্য তাই, আর যদিও বালসা কাঠের ওপরে অপারেটরদের বসার জন্য এক টুকরো রবার পাতা থাকত, তবু মর্স কী ছুঁলেই যে কেউ শরীরের পেছন দিকে বা আঙুলের ডগায় ইলেকট্রিক শক খেত। আর ওরা বাদে আমাদের মধ্যে বাইরের কেউ ওই গোছানো এলাকা থেকে একটা পেন্সিল বা ওই জাতীয় কিছু ঝেড়ে আনতে গেলেই তার চুল খাড়া হয়ে যেত বা পেন্সিলের শিসে লম্বা তড়িৎ স্ফুলিঙ্গ উঠত। কেবল টরস্টাইন, ন্যুট এবং তোতাটা ওখানে গায়ে আঁচড়টি না লাগিয়ে ঘুরে বেড়াত। তাই আমরা একটা কার্ডবোর্ডের শিট রেখে দিয়েছিলাম বাকিদের জন্য ওটা ‘বিপজ্জনক এলাকা’ বোঝাতে।

একদিন গভীর রাতে রেডিও কর্নারে বসে লন্ঠনের আলোয় ন্যুট খুটুরখাটুর করছিল, এমন সময়ে আচমকা পা দিয়ে আমাকে খুঁচিয়ে তুলল। বলল, অসলোর ঠিক বাইরে থাকে এমন একজনের সঙ্গে ও কথা বলছে, নাম বলেছে ক্রিশ্চিয়ান আমুন্ডসেন। এটা বলা যায় একটা অপেশাদার রেকর্ড কেন না আমাদের ভেলার ছোট্ট শর্ট ওয়েভ প্রেরকযন্ত্রটার ক্ষমতা প্রতি সেকেন্ডে ১৩৯৯০ কিলো সাইকেল, ছ’ওয়াটের বেশি পাঠাতে পারে না, মানে একটা ছোটো বৈদ্যুতিক টর্চের ক্ষমতার সমান। সেটা আগস্টের দুতারিখ আর আমরা পৃথিবীর ওপর প্রায় ষাট ডিগ্রি ভেসে চলে এসেছি অর্থাৎ অসলো এখন গোলকের ঠিক বিপরীতপ্রান্তে। পরেরদিন রাজা হাকোন ৭৫ বছরে পড়বেন, ফলে ভেলা থেকেই আমরা তার জন্য শুভেচ্ছাবার্তা পাঠালাম; পরের দিন ক্রিশ্চিয়ানের গলা আবার শোনা গেল এবং সে রাজার একটা প্রতিবার্তা আমাদের পাঠাল, আমাদের শুভেচ্ছা আর যাত্রার সাফল্য কামনা করে।

আরেকটা ঘটনা মনে আছে, ভেলার স্বাভাবিক জীবনের তুলনায় অন্যরকম। ভেলায় আমাদের দুটো ক্যামেরা ছিল আর এরিকের কাছে ছবি ডেভেলপ করার মতো জিনিসপত্র যাতে কোনো ছবি ঠিকঠাক না এলে যাত্রার মাঝেই আমরা দ্বিতীয়বার ছবি তুলে নিতে পারি। তিমি হাঙরটা দর্শন দেবার পর ও আর ধৈর্য রাখতে পারছিল না, তাই একদিন সন্ধেবেলা নির্দেশিকা অনুযায়ী কেমিক্যাল আর জল সঠিক মাত্রায় মিশিয়ে দুটো ফিল্ম ডেভেলপ করে ফেলল। নেগেটিভগুলো মনে হচ্ছিল দূর থেকে নেওয়া ফটোগ্রাফ, কতকগুলো আবছা ছিট ছিট আর বেশ কুঁচকেও গেল। সুতরাং ফিল্মটা নষ্ট হয়ে গেল। আমরা পরামর্শের জন্য পরিচিতদের টেলিগ্রাফ করলাম কিন্তু আমাদের বার্তাটা হলিউডের কাছাকাছি এক অপেশাদার রেডিও অপারেটর তুলে নিল। সে নিজের উদ্যোগেই একটা ল্যাবরেটরিতে ফোনটোন করে খুব দ্রুত জানালো যে আমাদের ডেভেলপারটা বেশি উষ্ণ হয়ে গিয়েছিল। আমরা যেন ৬০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার জল ব্যবহার না করি। নইলে নেগেটিভ কুঁচকে যাবে।

আমরা ওকে ওর পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ দিলাম এবং দেখলাম যে আমাদের চারপাশের তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ৮০ ডিগ্রি, এমনকি সমুদ্রের স্রোতেরও। এখন হারম্যান রেফ্রিজারেটর ইঞ্জিনিয়ার, ওকে মজা করে বললাম জলের তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রিতে নামাতে। ওকে বলা হল পাট করে রাখা রাবারের ডিঙির ছোটো এক বোতল কার্বনিক অ্যাসিড ব্যবহার করতে। স্লিপিং ব্যাগ আর উলের সোয়েটার মোড়া একটা কেটলিতে সেটা নিয়ে খানিক কারিকুরি করার পর হারম্যানের ঝুপসু দাড়িতে হঠাৎ করে দেখি বরফ আর হারম্যান কেটলিতে একটা বড়ো বরফের তাল নিয়ে তৈরি করে ফেলল।      

এরিক নতুন করে আবার ডেভেলপ করল আর দুর্দান্ত ফল।

বাতাসে ভেসে শর্টওয়েভে বয়ে যাওয়া ভূতুরে কথাগুলো হয়তো কনটিকির প্রাচীন দিনগুলোতে অজানা বিলাস বলেই গণ্য হত কিন্তু ভেলার নীচে সমুদ্রের স্রোত হুবহু সেই প্রাচীন দিনের মতই এবং সেই স্রোত আমাদের বালসা ভেলাটাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পশ্চিমে বয়ে নিয়ে চলেছে যেমনটা পনেরোশো বছর আগেও নিয়ে যেত।

দক্ষিণ সমুদ্রের দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি অঞ্চলে ঢোকার পর আবহাওয়াটা একটু বেশিরকমই বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠল, মাঝে মধ্যেই ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি; এদিকে বাণিজ্যবায়ু দিক পরিবর্তন করেছে। দক্ষিণপূর্ব থেকে স্থির নিশ্চিতভাবে বয়ে চলেছে যাতে আমরা নিরক্ষীয় স্রোতে ভেসে অনেকদূর এগিয়ে যাই। তারপর ঘুরে ভেসে চললাম আরো আরো পুবের দিকে। আমরা উত্তরে সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছই ১০ জুন, ৬°১৯’ দক্ষিণ অক্ষাংশে। তখন আমরা বিষুবরেখার এতটাই কাছাকাছি ছিলাম যে মনে হচ্ছিল আমরা বুঝি ভেসে ভেসে মার্কুইস দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে উত্তরে থাকা দ্বীপটাকেও পেরিয়ে, একবিন্দু ডাঙা খুঁজে না পেয়ে, নিঃসীম সমুদ্রে হারিয়ে যাব। কিন্তু তারপর বাণিজ্যবায়ু ঘুরে গেল, পুব থেকে উত্তরপূর্বে বইতে শুরু করল আর আমাদের ঠেলে নিয়ে চলল বাঁক নিয়ে দ্বীপমালার অক্ষাংশের দিকে।   

এমনটা প্রায়ই হত দিনের পর দিন শেষ অবধি বাতাস আর সামুদ্রিক স্রোত অপরিবর্তিতভাবে রয়ে গেছে এবং রাতের বেলাটা, কেবল ডেক-পাহারা বাদ দিয়ে, আমরা প্রায় ভুলেই গেছি স্টিয়ারিঙে কার থাকার কথা। কেননা বাতাস আর সামুদ্রিক স্রোত সুস্থিত থাকলে হালটা শক্ত করে বাঁধা থাকত এবং কনটিকির পাল আমাদের দেখভাল ছাড়াই বাতাসে ফুলেফেঁপে থাকত। সেসময় রাতপ্রহরী কেবিনের দরজায় চুপ করে বসে আকাশের তারা নজরে রাখত। আকাশের নক্ষত্রমণ্ডলে কোনো তারার অবস্থান বদলে গেলে সে উঠে গিয়ে দেখত কীসের জন্য এটা হল, বাতাসের নাকি হালের দিক বদল হয়েছে!

সারা সপ্তাহ জুড়ে আকাশের গোল চক্কর জুড়ে তারার দল ঘুরে যাচ্ছে আর সেই তারা দেখে দেখে ভেলার দিক ঠিক করে চালানোটা এতটাই সহজ যে অবিশ্বাস্য। সত্যিই রাতে তেমন একটা দেখার কিছু ছিল না। আমরা জানতাম রাতের পর রাতে আকাশের ঠিক কোথায় কোথায় কোন নক্ষত্রপুঞ্জ দেখা যাবে। এবং যখন আমরা নিরক্ষরেখার কাছাকাছি, উত্তর আকাশে দিগন্তে ঝকঝকে সপ্তর্ষিমণ্ডল উদয় হত। আমরা অধীর হয়ে থাকতাম ধ্রুবতারা দেখতে পাব কিনা। দক্ষিণ দিক থেকে কেউ নিরক্ষরেখা পার হয়ে এলেই ধ্রুবতারা দেখতে পাবে। কিন্তু উত্তর-পূর্ব বাণিজ্যবায়ু শুরু হতেই সপ্তর্ষিমন্ডল অস্ত গেল।

প্রাচীন পলিনেশিয়ান মানুষেরা দারুণ সমুদ্র-অভিযাত্রী ছিলেন। ওরা দিনে সূর্য দেখে আর রাতে তারা দেখে দিক ঠিক করতেন। গ্রহনক্ষত্রের ব্যাপারে তাঁদের জ্ঞান ছিল অবাক করে দেবার মতো। ওঁরা জানতেন পৃথিবী গোল এবং ওদের মধ্যে নিরক্ষরেখা, কর্কটক্রান্তি, মকরক্রান্তিরেখার মতো কঠিন ধারণার রেখাগুলোর আলাদা আলাদা নামও ছিল। হাওয়াইতে গোলাকার লাউয়ের খোলায় সামুদ্রিক চার্ট খোদাই করতেন তাঁরা এবং কোনো কোনো দ্বীপে ওঁরা গাছের ডাল দিয়ে বিশদে মানচিত্রও বানাতেন যাতে ঝিনুক আটকে দ্বীপ আর ছোটো ছোটো ডালের টুকরো দিয়ে নির্দিষ্ট সামুদ্রিক স্রোত বোঝাতেন। পলিনেশীয়রা পাঁচটা গ্রহ চিনতেন, যেগুলোকে ওঁরা বলতেন “ভ্রমণকারী তারা”, স্থির তারাদের চেয়ে আলাদা। স্থির তারাদের জন্য দুশোর ওপর নামকরণ ছিল তাঁদের। প্রাচীন পলিনেশীয়ায় একজন দক্ষ নাবিক জানতেন কখন কোন তারা আকাশের কোথায় উদয় হবে, রাতের বিভিন্ন সময়ে কোথায় থাকবে, এমনকি সারা বছরে বিভিন্ন সময়ে তার অবস্থানই বা কোথায় থাকবে। ওঁরা জানতেন কোন দ্বীপে পৌঁছলে কোন তারা অস্ত যাবে; শুধু তাইই নয় কখনো কখনো যে নক্ষত্রটি দিনের পর দিন বছরের পর বছর একটি দ্বীপে পৌঁছনোর পর অস্ত যাচ্ছে সেই দ্বীপটির নামকরণ সেই নক্ষত্রের নামেই হত।

তাঁদের কাছে তারাভরা আকাশটা ছিল পুব থেকে পশ্চিমে সরে সরে যাওয়া একটা জ্বলজ্বলে বিশাল কম্পাসের মতো, এছাড়াও মাথার ওপরের বিভিন্ন তারাদের অবস্থান থেকে ওঁরা জানতেন ঠিক কতটা উত্তর বা দক্ষিণে আছেন। আমেরিকার কাছাকাছি গোটা সমুদ্রে পলিনেশীয়রা অনুসন্ধান চালিয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের পর কিছু কিছু দ্বীপের মধ্যে পরপর প্রজন্ম ধরে যাতায়াতের রাস্তা প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিল। ঐতিহাসিক তথ্যও এমন সাক্ষ্য দেয় যে তাহিতির কোনো গোষ্ঠীপতি ২০০০ মাইল উত্তরে আর কয়েকডিগ্রি পশ্চিমে অবস্থিত হাওয়াই দ্বীপে আসার সময়ে হালের লোকটি সূর্য আর তারা দেখে প্রথমে উত্তরে বাইতেন যতক্ষণ না তারাগুলি মাথার ওপরে দেখা যায়, অর্থাৎ তারা হাওয়াই দ্বীপের দ্রাঘিমাংশে না পৌঁছন। তারপর ঠিক সমকোণে পশ্চিম দিক বরাবর বেঁকে চলতে থাকতেন যতক্ষণ না পাখি ও মেঘের দল জানান দিত যে দ্বীপমালার কাছে তাঁরা পৌঁছে গেছেন। নক্ষত্রজগৎ সম্বন্ধে পলিনেশীয়দের এমন বিস্তৃত জ্ঞান ঠিক কবে অর্জিত হল? কীভাবেই বা এত নিখুঁত সামগ্রিক গণণা করে ক্যালেন্ডার বানিয়েছিল তাঁরা? অবশ্যই পশ্চিম প্রদেশের মেলানেশিয়ান বা মালায়ানদের থেকে নয়। কিন্তু সেই প্রাচীন অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সভ্য জাতীয়রা, “সাদা চামড়ার দাড়িওলা লোক” যারা আমেরিকায় অ্যাজটেক, মায়া এবং ইনকাদের বিস্ময়কর সভ্যতা শিখিয়েছিল, তারাই এমন নিখুঁত অদ্ভুত ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিল এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানেও প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেছিল; সেসময় ইউরোপীয়রা তার ধারেকাছেও ছিল না। পেরুর মতো পলিনেশীয়াতেও ক্যালেন্ডার বছরটা এমন ভাবে সাজানো হত যাতে প্রথম দিনটা হত এমন একতা দিন, যেদিন কৃত্তিকা নক্ষত্রপুঞ্জ দিগন্তে প্রথম উদয় হবে। দুজায়গাতেই এই নক্ষত্রপুঞ্জকে কৃষিকাজের রক্ষাকর্তা বলে গণ্য হত।

প্রশান্ত মহাসাগরের লাগোয়া পেরুর সৈকতের মরুভূমির বালিতে আজও প্রাচীন মানমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এগুলো সেই রহস্যময় সভ্য লোকেদেরই তৈরি ছিল, যারা বিশাল মূর্তি খোদাই করে রেখেছিল, পিরামিড বানিয়েছিল, মিষ্টি আলু আর লাউ চাষ করেছিল, আর বছর শুরু করত যেদিন কৃত্তিকা দিগন্তে প্রথম উদয় হত। প্রশান্ত মহাসাগরে ভেলা ভাসানোর সময়ই কনটিকি তারাদের চলাচল জানত।

জুলাইয়ের দুতারিখ রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করার সময় আমাদের রাতপ্রহরীর শান্তিতে বসে থাকার জো ছিল না। কয়েকদিন হালকা উত্তরপুর্ব থেকে বাতাস বইবার পর সেদিন বাতাস বেশ জোরালো আর সমুদ্রের চেহারাও বেশ খারাপ। শেষরাতে চমৎকার চাঁদ উঠল আর ভেলা বাইবার জন্য বেশ টাটকা বাতাস দিল। ভেলার একপাশে সামনের দিকে জলে কাঠের টুকরো ফেলে আমরা আমাদের গতিবেগ মাপলাম এবং দেখলাম যে গতির নয়া রেকর্ড করে ফেলেছি। ভেলার চালু ভাষাতে, আমাদের গড় গতিবেগ যখন, বারো থেকে আঠারো “কুচি”, সেখানে গতিবেগ এখন নেমে প্রায় “ছয় কুচি” আর ভেলার পেছনদিকে সুষমভাবে জ্বলজ্বলে ঢেউ পাক খেয়ে খেয়ে উঠছে।

বাঁশের কেবিনটার মধ্যে চারটে লোক নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে, টরস্টাইন বসে বসে মর্স কী টিপে চলেছে আর আমি হালে বসে নজর রাখছি। মাঝ রাত্তিরের একটু আগে একটা অস্বাভাবিক ঢেউ এসে ভেলার পেছনদিকে ভেঙে পড়ল আমার সামনেটা পুরো ঢেকে দিয়ে। জলের পাহাড়ের পেছন থেকে আমি এখানে ওখানে কেবল সাদা ঢেউয়ের চুড়ো দেখতে পাচ্ছিলাম আরো দুটো বিরাট বিরাট ঢেউয়ের মাথায়, ঠিক এটারই মতো আর এটার এক্কেবারে পেছন পেছন। আমরা যদি জায়গাটা না পেরিয়ে আসতাম আমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস হত যে যা দেখছি তাতে ঢেউগুলো একটা বিপজ্জনক ডুবো পাহাড়ের ওপর দিয়ে ভেঙে পড়ছে। বিশাল জলের দেয়ালের মতো প্রথম ঢেউটা আছড়ে পড়ার আগেই আমি সতর্ক করার জন্য চেঁচিয়ে উঠলাম যাতে ভেলাটা শক্ত পোক্ত করে ধরে যেটা আসছে তার জন্য তৈরি থাকা যায়।

প্রথম ঢেউটা যখন এল, ভেলাটা ওর পেছনের অংশটা আড়াআড়ি তুলে নিল সদ্য ভেঙে যাওয়া ঢেউয়ের মাথায় যাতে ওটা গুড়গুড় করে সর্বক্ষণই ঢেউয়ের চূড়ায় রইল। ভেলার দুপাশের পাক খাওয়া জলের ফেনার মধ্যে আমরা ভেসে চললাম, ভেলার নীচে ফুঁসে ওঠা সমুদ্র। ঢেউ সরে যাবার সময় শেষমুহূর্তে ভেলার মাথাটা উঁচু হয়ে উঠল  আর ভেলার পেছনটা আগে গড়িয়ে নেমে গেল ঢেউয়ের নিচু চওড়া অংশটিতে। পরমুহূর্তেই পরের জলের দেয়াল আমাদের সামনে খাড়া হয়ে উঁচু হয়ে উঠল আর আবার আমরা তড়িঘড়ি শূন্যে উঠে গেলাম এবং ভেলার পেছনটাতে জল আছড়ে পড়তে পড়তেই ঢেউ পার করে এলাম।  ফলে যেটা হল ভেলাটা আড়াআড়ি ঢেউ ভাঙছিল আর ওটাকে খুব দ্রুত ঘুরিয়ে ধরে রাখা কার্যত একরকম অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পরের ঢেউটা এল ছড়িয়ে থাকা ফেনার মধ্য থেকে চকমকে জলের দেয়ালের মতো আর আমাদের কাছে আসামাত্রই সেটা আছড়ে পড়ল। নীচে নামার সময় আমার কিছুই করার ছিল না, খালি শক্ত হাতে, যত জোরে পারি, কেবিনের ছাতের একটা বাঁশের খুঁটি আঁকড়ে ধরে রইলাম। নিঃশ্বাস বন্ধ করে রইলাম আর অনুভব করলাম যে আমরা আকাশে উঠে গেছি আর চারপাশের সমস্তকিছু ফেনার ঘূর্ণিতে বয়ে যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড পরই কনটিকি আবার জলের ওপর শান্তভাবে একটা নিরীহ ঢেউয়ে ভেসে চলেছে, দুপাশে ঢেউ সরে সরে যাচ্ছে। সমুদ্র আবার স্বাভাবিক। আমাদের সামনে বিরাট সমুদ্রের ঢেউ তিনটে ছুটে যাচ্ছে আর পেছনে এক কাঁদি নারকেল জলের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে।

শেষ ঢেউটা কেবিনটার ওপর খুব জোর আঘাত করেছিল যাতে টরস্টাইন রেডিও কর্নারে উলটে পড়েছিল আর বাকিরা এত জোর শব্দের চোটে ভয়ে জেগে গিয়েছিল। দেয়াল আর মেঝের লগগুলির ফাঁক দিয়ে তোড়ে জল বেরিয়ে যাচ্ছিল। সামনের ডেকের বাঁদিকে বাঁশের বাতা ছিঁড়ে উড়ে গর্ত হয়ে গিয়েছিল আর ডাইভিং বাস্কেটটা সামনের দিকে দুমড়ে গিয়েছিল। বাকি সবকিছুই আগের মতো ঠিকঠাক। ওই বড়ো বড়ো তিনটে ঢেউ যে কোত্থেকে এল আমরা নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারিনি, এক যদি না সমুদ্রের তলার কোনো আলোড়নের জন্য হয়ে থাকে, যেটা এ-অঞ্চলে খুব একটা অস্বাভাবিক নয় মোটেই।

দুদিন পর প্রথম ঝড়টার মুখোমুখি হলাম। বাণিজ্যবায়ু প্রায় মরে আসছিল, পেঁজা তুলোর মতো বাণিজ্য-বায়ুর মেঘ মাথার ওপর দিয়ে খুব উঁচুতে নীলের মাঝ দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল, আর এমন সময়ে হঠাৎ করেই দক্ষিণ দিগন্তে হু হু করে ঘন কালো মেঘ করে এল। ঠিক তার পরেই অপ্রত্যাশিত দিক থেকে এমন প্রবল হাওয়া উঠল যে হাল ধরে রাখা একান্ত অসম্ভব হয়ে পড়ল। দ্রুত হাওয়ার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া হল যাতে পাল ফুলে ওঠে আর যথাযথ থাকে, অমনি অন্য দিক থেকে বাতাস এসে এমন ঝাপটা দিল যে পাল-টাল চুপসে ঘুরে গিয়ে যাত্রী আর মালপত্রের প্রায় দফারফা। কিন্তু তারপরই যেদিকে ঘন মেঘটা করেছিল সেদিক থেকেই সোজা বাতাস বইতে আরম্ভ করে দিল আর কালো মেঘ এসে আমাদের সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলল। এবারে নয়া উদ্যমে বাতাস বইতে শুরু করে অচিরেই সেটা সত্যি একটা প্রলয় ঝড়ের আকার ধারন করল।

অবিশ্বাস্য কম সময়ে চারপাশের সমুদ্র ফুঁসে উঠল পনেরো ফুট উঁচু অবধি, এক একটা ঢেউয়ের মাথা হিসহিস করে সমুদ্রের বুক থকে কুড়ি পঁচিশ ফুট উঁচুতে উঠে গেল, প্রায় আমাদের মাস্তুলের সমান আর আমরা ঢেউয়ের একেবারে তলায়। সব্বাইকে নিচু হয়ে ডেকের ওপরে হামাগুড়ি দিয়ে কিছু না কিছু আঁকড়ে থাকতে হল, বাতাস এসে বাঁশের দেয়াল ঝাঁকিয়ে ফাঁকফোকর দিয়ে শোঁ শোঁ আওয়াজে গর্জন করে বইতে লাগল।

রেডিও কর্নারটা বাঁচাবার জন্য আমরা পেছনের দিক-এর দেয়াল আর কেবিনের বাঁদিকের দেয়াল ক্যানভাসের কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলাম। আলগা মালপত্রগুলো দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা ছিল, পালটা নামিয়ে গুটিয়ে বাঁশের গায়ে বেঁধে রাখা ছিল। আকাশ সম্পূর্ণ মেঘে ঢেকে গেলে সমুদ্রও আরো কালো আর ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল আর চতুর্দিকে কেবল ভেঙে পড়া ঢেউয়ের মাথায় ফেনার সাদা চূড়া। পেছনের বিস্তৃত সমুদ্রে সাদা ফেনার রেখা টানা টানা বহুদূর অবধি ছড়িয়ে ছিল এবং চতুর্দিকে যেখানে ঢেউ ভাঙছে, ভেঙে নীচে পড়ছে, সেখানেই নীল কালো সমুদ্রের বুকে সবজেটে ক্ষতের মতো অনেকক্ষণ বুড়বুড়ি কাটছে। ঢেউ ভাঙতেই হাওয়ার ধাক্কায় ঢেউয়ের চূড়া থেকে লবনজল ছিটকে এসে ছড়িয়ে পড়ছে। শেষমেষ ক্রান্তীয় অঞ্চলের বৃষ্টি যখন আমাদের ওপরে আর সমুদ্রের বুকে অবিশ্রাম চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছিল, জলবিন্দুগুলি দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু আমাদের চুল দাড়ি থেকে গড়িয়ে আসা জলের স্বাদ কম নোনতা লাগছিল আর আমরা ডেকের ওপর প্রায় হাফ-ন্যাংটো এবং ঠান্ডায় প্রায় জমে গিয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে দেখলাম ঝড় সামলে নেবার জন্য আমাদের জিনিসপত্রগুলো ঠিকঠাকই আছে।

দিগন্তে যখন ঝড় ঊঠল  আর আমাদের ওপর এসে পড়ল, তখন প্রথমটা আমাদের চোখেমুখে উৎকন্ঠা আর উদ্বেগ ছেয়ে ছিল। সত্যি সত্যিই যখন তুমুল ঝড় এসে আমাদের গ্রাস করে নিল, অথচ কনটিকি ব্যাপারটাকে খুব সহজে নিয়ে পরের পর ঢেউয়ে দিব্যি ভেসে থাকল, তখন ঝড়টা আমাদের কাছে বেশ উত্তেজক একটা খেলার মতো হয়ে দাঁড়াল। চমৎকার দক্ষতায় কনটিকি চারপাশের ফুঁসে ওঠা সমুদ্রে আরামসে ভেসে চলেছে আর সবসময়েই একটা কর্কের মতো ঢেউয়ের মাথায় ভাসছে দেখে আমরা যারপরনাই উল্লসিত। কেননা ফুঁসে ওঠা সমুদ্রের জলের বেশিটা সবসময়েই আমাদের কয়েক ইঞ্চি নীচে। এরকম আবহাওয়ায় সমুদ্র আর পাহাড়ে অনেক মিল। ব্যাপারটা অনেকটা পাহাড়ের অনেক উঁচুতে, খোলা এবং ধূসর প্রান্তরে জনমানবহীন জায়গায় প্রবল ঝড়ে পড়ার মতই। যদিও আমরা তখন ক্রান্তীয় সামুদ্রিক অঞ্চলের একেবারে কেন্দ্রে ছিলাম আর আমাদের ভেলা সফেন সমুদ্রের ঢেউয়ে ওপর-নীচে দুলতে দুলতে ভেসে চলেছে, তবু আমাদের মনে হচ্ছিল যেন পাথর আর বরফের মাঝখান দিয়ে দ্রুত নীচের দিকে নেমে চলেছি।

হালে যার দায়িত্ব থাকত এরকম আবহাওয়ায় তাকে সর্বক্ষণ কড়া নজর রাখতে হত। ঢেউয়ের ওপরে চড়ে যখন ভেলার সামনের অর্ধেকটা খুব উঁচু একখানা ঢেউ পেরোচ্ছে, পেছনের গুঁড়িগুলো জল ছেড়ে উঠে পড়েছে, আর পরের মুহূর্তেই নীচের দিকে ঝাঁপ দিচ্ছে, আবার পরের ঢেউটাতে চড়বে বলে। কখনো ঢেউগুলো এত কাছাকাছি চলে আসছিল যে পরের ঢেউটা প্রায় এসে পড়েছে অথচ প্রথম ঢেউটার ওপরে আমাদের ভেলার মুখটা তখনও শূন্যে। তারপরেই হালের ওপর ভয়ঙ্কর ফুলে ওঠা বিশাল জলের ঝাপটা এসে পড়ল অথচ ঠিক তার পরমুহূর্তে পেছনদিকটা ওপরে উঠে গেল আর জলের ঝাপটাটা দুপাশ দিয়ে সহজেই কেটে গেল।

আমরা হিসেব করে দেখেছিলাম, স্বাভাবিক শান্ত সমুদ্রে বড়ো বড়ো দুটো ঢেউয়ের মধ্যে মোটামুটি সাত সেকেন্ডের তফাৎ থাকে আর এইমতো ভেলার পেছনদিকে চব্বিশ ঘণ্টায় সবমিলিয়ে দুশো টন জল আছড়ে পড়ত। কিন্তু সেটা আমরা অত লক্ষ-টক্ষ করিনি কেননা জলটা নিরুপদ্রবে হালে বসা লোকটার পায়ের আশপাশ দিয়ে কাঠের গুঁড়ির ফাঁকফোকর দিয়ে নিরুপদ্রবে বয়ে চলে যেত। কিন্তু প্রবল ঝড়ের সময় চব্বিশ ঘণ্টায় ভেলার পেছনদিকে দশ হাজার টনের চেয়েও বেশি জল আছড়ে পড়ত। ফলে প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে যতটা জল বয়ে যেত তার ওজন মোটামুটি কয়েক গ্যালন থেকে ছয় ঘনফুট অবধি হত, কখনোবা আরো বেশি। কখনো এমন বজ্রগর্জনে ঢেউ এসে পড়ত ভেলায় যে হালের লোকটা এক কোমর জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে করত যেন সে একটা খরস্রোতা নদীর উজান ঠেলে চলেছে। সেসময়ও কয়েকমুহূর্তের জন্য ভেলা থরথর করে কেঁপে উঠল তার পরেই ভেলাটাকে ডুবিয়ে দেয়া ওই বিপুল জলের ভার ঝরনার মতো সরে গিয়ে হুস করে অদৃশ্য হয়ে গেল।

হারম্যান সারাক্ষণ বাইরেই ছিল, ওর অ্যানিমোমিটারটা নিয়ে ওই ঝড়ের তাণ্ডবটা মাপছিল। ঝড়টা প্রায় চব্বিশঘণ্টা থাকার পর আস্তে আস্তে জোরালো বাতাসের রূপ নিল আর তার সাথে বৃষ্টি, সমুদ্র অবশ্য চারপাশে একইরকম ফুঁসছিল আর অনুকূল বাতাসে আমরা পশ্চিমের দিকে দুড়দাড় করে এগোতে থাকলাম। দুটো উঁচু উঁচু ঢেউয়ের মাঝে বাতাসের সঠিক মাপজোখের জন্য, হারম্যানকে দুলতে থাকা মাস্তুলের ওপরে যতটা সম্ভব চড়ে কেবল সেটাকে কোনোমতে আঁকড়ে ধরে থাকতে হচ্ছিল।   

আবহাওয়া খানিকটা শান্ত হয়ে এলে আমাদের চারপাশে বড়ো মাছগুলো যেন একেবারে খেপে উঠল। ভেলার চারপাশে সমুদ্রের জলে ভর্তি হাঙর, টুনি, ডলফিন আর বেশকিছু চকচকে বনিটো, সব মিলে ভেলার নীচে গাদাগাদি করে অথবা খুব কাছেই ঢেউয়ের মধ্যে সাঁতরাচ্ছে। অবিশ্রাম জীবন-মরন সংগ্রাম যেন; জলের ওপরে মাছেদের বাঁকানো পিঠ উঠেই রকেটের মতো ছুটে যাচ্ছে, জোড়ায় জোড়ায় একটার পেছনে আরেকটা, ভেলার চারপাশের জল ক্ষণে ক্ষণেই গাঢ় রক্তে লাল হয়ে উঠছে। লড়াইটা মূলত টুনা আর ডলফিনদের মধ্যে, ডলফিনরা ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে আসছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত আর অনেক বেশি সতর্ক। আক্রমণকারীরা প্রধানত টুনি; মাঝে মাঝেই দেড় দুশো পাউন্ডের এক একটা মাছ মুখে ডলফিনের রক্তমাখা মাথা নিয়ে লাফ দিয়ে বাতাসে ছিটকে উঠছে। একলা একটা ডলফিন যদিও বা টুনার ঝাঁক পেছনে নিয়ে ছুটে পালায় ডলফিনের আসল ঝাঁকটা কিন্তু হাল ছেড়ে দিচ্ছে না, যদিও তাদের মধ্যে অনেকেই ঘাড়ে গভীর ক্ষত নিয়ে সাঁতরাচ্ছে। মধ্যে মধ্যে হাঙরগুলোকে মনে হচ্ছে, রাগে অন্ধ হয়ে গেছে, দেখলাম বড়ো টুনিগুলোর সাথে মারপিট করে সেগুলোকে ধরছে; টুনিগুলো এবারে ওদের চেয়েও বড়ো শত্রুর পাল্লায় পড়েছে।

একখানাও শান্তিপ্রিয় পাইলট ফিশ নজরে এল না। হয় সেগুলো খেপচুরিয়াস টুনির পেটে গেছে অথবা ভেলার নীচে গুঁড়ির ফাঁকেফোকরে ঢুকে আছে নয়তো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহুদূরে পালিয়েছে। আমরা অবশ্য জলে মুখ ডুবিয়ে সেটা দেখার সাহসটা করিনি।

ক্রমশ

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s