ধারাবাহিক অভিযান কনটিকি অভিযান থর হেয়ারডাল অনুবাদ ইন্দ্রনাথ শরৎ ২০১৬

khelakontiki (5) (Medium)

কন-টিকি অভিযান

থর হেয়ারডাল

(অনুবাদঃ ইন্দ্রনাথ)

কন-টিকি অভিযান শুধুমাত্র অ্যাডভেঞ্চার নয়, সেটা ছিল একটা বিশ্বাসের পরীক্ষা, বৈজ্ঞানিকের সত্যানুসন্ধান। ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর কাল্লাও বন্দর থেকে প্রাচীন পদ্ধতিতে বানানো কাঠ (বালসা লগ) ও বাঁশের তৈরী ভেলায় চড়ে থর হেয়ারডাল ও তার পাঁচজন সাথী রওনা হনপ্রশান্ত মহাসাগরে সামুদ্রিক স্রোতের গতি ও হাওয়ায় ভর করে ১০১ দিন যাত্রার পর তারা পৌঁছতে সক্ষম হন তাদের লক্ষ্যে, পলিনেশিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। পূর্ণ হয় অভিযান, প্রমানিত হয় একটি বৈজ্ঞানিক সত্য।

একটি সিদ্ধান্ত

কখোনো কখোনো এমন বেকায়দায় যে পড়তে হয়! হয়তো জীবনের স্বাভাবিক গতিতেই ঘটল আর সেটা যখন বেশ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েছে, আপনি তাজ্জব হয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করবেন, “একী? আমি এখানে কেন?”

ধরুন আপনি একটা কাঠের ভেলায় মাঝ সমুদ্রে একটা তোতাপাখি আর পাঁচটা সঙ্গী নিয়ে ভেসে চলেছেন, আর একদিন ভালোমতো ঘুম টুম দিয়ে সক্কালে উঠে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আপনার মনে ওই প্রশ্নটাই এল।   

এরকমই এক সকালে আমি শিশিরভেজা লগবুকটাতে লিখেছিলুমঃ-

মে ১৭নরওয়ের স্বাধীনতা দিবস। গভীর সমুদ্র। চমৎকার বাতাস। আজকে আমার রান্নার পালা, আর সকালেই ডেক সাতটা উড়ুক্কু মাছ পেয়েছি, আর পেয়েছি আমাদের কেবিনের ছাতে একটা স্কুইড আর টরস্টাইনের স্লিপিংব্যাগের মধ্যে একটা অচেনা মাছ ……

এইখানে এসে পেন্সিল থেমে গেছে। আর অবশ্যম্ভাবী চিন্তাটা ঘিরে ধরেছে। সত্যি, আশ্চর্য এই ১৭ মে, আর আমাদের হাল হকিকত। কী করে শুরু হল এইসব?

বাঁদিকে তাকালে বিশাল সমুদ্র, অনবরত ঢেউ উঠছে, অসীম, দিগন্ত পর্যন্ত। ডানদিকে তাকিয়ে দেখছি, আবছায়া কেবিনের মধ্যে দাড়িওলা একটা লোক হেলান দিয়ে বসে বাঁশের বেড়ায় সাবধানে পা তুলে দিয়ে একমনে গ্যেটে পড়ছে। এই কেবিনটাই এখন আমাদের কজনের ঘরবাড়ি।

“বেঙ্গট!” আমি ডাকলাম। তোতাটা লগবুকের ওপর বসার চেষ্টা করছিল, ওটাকে সরিয়ে দিয়ে বললাম,

“বলতে পার, এখানে কী করছি? কেনই বা …”  

সোনালি দাড়ির তলায় গ্যেটে অদৃশ্য হলেন।

 “শয়তানটাকে জানি। অবিশ্যি তুমিই সবচেয়ে ভালো চেনো। উদ্ভট পরিকল্পনটা তোমারই। কিন্তু khelakontiki (3) (Medium)আমার মতে ফন্দিটা খাসা।” বলে, বাঁশের বেড়ায় আরো খানিকটা পা ওপরে তুলে, অবিচলিতভাবে গ্যেটেতে ডুবে গেল ও। কেবিনের বাইরে, বাঁশের তৈরি ডেকে বসে তিন বন্ধু কড়া রোদ্দুরের মধ্যেই কাজ করছিল। তাদের খালি গা, বাদামি চামড়া, ঘন দাড়ি, পিঠে ঘাম শুকিয়ে লবনের সাদা দাগ। তাদের দেখে মনে হয় প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ভেলা ভাসিয়ে পশ্চিমে যাওয়া ছাড়া তারা আর কোনো কাজ কোনোকালে করেইনি। এরিক হামাগুড়ি দিয়ে কেবিন থেকে বেড়িয়ে এল। হাতে একতাড়া কাগজ আর সেক্সট্যান্ট যন্ত্রটা।

“৯৮ ডিগ্রি ৪৬ মিনিট পশ্চিম আর ৮ ডিগ্রি ২ মিনিট দক্ষিণ – এই আমাদের অবস্থান। কালকের চেয়ে আজকে অনেক ভালো এসেছি বন্ধুরা!”

ও আমার পেন্সিলটা নিয়ে কেবিনের দেয়ালে ঝোলানো চার্টে একটা ছোট্টো গোল আঁকল। উনিশটা ছোট্টো গোল দাগের পর আজকের গোলটা। শুরু হয়েছে পেরুর কাল্লাও বন্দর থেকে। হারম্যান, নুট আর টরস্টাইন, ওরাও এসে ভিড় করল, দেখবে বলে; ছোট্টো গোল দাগটা আমাদের আরো ৪০ মাইল এগিয়ে দিল দক্ষিণ সাগরের দ্বীপমালার দিকে।

“দেখছ নাকি! বন্ধুরা!” হারম্যান বেশ গর্ব গর্ব করে বলল, “তার মানে হল আমরা ইতিমধ্যে পেরুর সৈকত ছেড়ে ৮৫০ মাইল পাড়ি দিয়ে ফেলেছি।”   

khelakontiki (1) (Medium)

“হ্যাঁ। আর মাত্রই ৩৫০০ মাইল পাড়ি দিতে হবে সবচেয়ে কাছাকাছি দ্বীপটিতে পৌঁছনোর জন্য।” নুট যোগ করে।

“সত্যি বলতে কি,” টরস্টাইন ফুট কাটে, “ আমরা সমুদ্রের তলদেশ থেকে স্রেফ ১৫০০০ ফুট উপরে আর চাঁদের থেকে কয়েক ফ্যাদম নীচে আছি, এই যা।”

মোদ্দা কথাটা এই যে আমরা সক্কলেই জানলাম আমরা ঠিক কোথায় আছি আর আমি এবারে ভাবতে শুরু করতে পারি, “কেন?” তোতাটার এতে কিছু যায় আসে না, ওটার তো খালি কাঠের ওপরে বসে থাকতে পারলেই হল। আর সমুদ্র, একই রকম, গোলাকার, আকাশঘেরা, অন্তহীন নীল শুধু নীল।

যদ্দুর মনে পড়ে গত শীতে নিউ ইয়র্কের এক মিউজিয়ামে ঘটেছিল ব্যাপারটা। অথবা আরো পেছনে, দশ বছর আগে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে মার্কোয়েসাস দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে ছোট্ট একটা দ্বীপে। হতে পারে এবারে আমরা সেখানেই গিয়ে ভিড়ব হয়তো। যদি না উত্তরপূর্ব বাতাস আমাদের আরেকটু ঠেলে দক্ষিণে তাহিতি বা টুয়ামোটু দ্বীপপুঞ্জের দিকে পাঠিয়ে দেয়! আমি মনে মনে বেশ দেখতে পাচ্ছি ছোট্টো দ্বীপটাকে। মেটে-লাল পাহাড়, সবুজ ঘাসের ঢাল নেমে গেছে সমুদ্রের দিকে, তীর বরাবর পাম গাছের সারি। দ্বীপটার নাম ফাটু-হিভা।

khelakontiki (2) (Medium)

এই মুহূর্তে আমরা যেখানে ভাসছি সেখান থেকে দ্বীপটার মধ্যে কোনোই ভূখন্ড নেই। সে কত হাজার মাইল সমুদ্রের পর! আমি সরু ওইয়া উপত্যকাটাও দেখতে পাচ্ছি। সমুদ্রের দিকে ক্রমশ চওড়া হয়ে এসেছে। স্পষ্ট মনে আছে সমুদ্রের পাড়ে সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা এই অনন্ত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতাম আমরা। আমার সাথে তখন আমার স্ত্রী ছিলেন। এখনকার মতো দাড়িওয়ালা বোম্বেটেরা না। আমরা নানান জীবজন্তুর নমুনা সংগ্রহ করতাম আর সংগ্রহ করতাম লুপ্ত সভ্যতার ছবি বা প্রত্ন জিনিস।

একটা সন্ধ্যার কথা বেশ মনে আছে। তথাকথিত সভ্যজগৎ তখন প্রায় অবাস্তব সুদূরের ব্যাপার আমাদের কাছে। প্রায় এক বছর থাকা হয়ে গেছে দ্বীপে। এখানে একমাত্র সাদা চামড়া আমরাই। স্বেচ্ছায় ছেড়ে এসেছি সভ্যতার ভালো আর মন্দ দুটোই। সমুদ্রের তীরে নিজেরাই নিজেদের ছোট্টো ঘর বানিয়েছি, পাম গাছের ছায়ায় কাঠের পিলারের ওপর, সেখানেই থাকি। জংগলের ফলমূল আর সামুদ্রিক মাছ যা যা কিছু পাই তাই খেয়েই কাটে আমাদের।

সেই সন্ধ্যায়ও আর পাঁচটা দিনের মতো সৈকতেই বসে আছি; চাঁদের আলো, সামনে সমুদ্র। আমাদের চারপাশ ভালোলাগা আর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে ছিল আর তার প্রতিটা মুহূর্ত আমরা চেটেপুটে নিচ্ছিলাম। সারিবাঁধা জঙ্গলের গন্ধ, সমুদ্রের নোনা গন্ধ ভরে নিচ্ছি বুকে; পামগাছের পাতায় বাতাসের শিরশিরানি শুনছি। আর একটু পরপরই সমস্ত ছাপিয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের আছড়ে পড়া। ফেনার মুকুটপড়া ঢেউ ধেয়ে এসে ভেঙে পড়ছে ডাঙার পাথরগুলোর ওপরে। ঢেউয়ের ঝাপটায় খানিক শোরগোল উঠছে, জলে চিকচিক করে উঠছে পাথরগুলো। জল সরে যেতেই আবার সব চুপচাপ। আবার পরের ঢেউ এসে তীরে আছড়ে পড়া অবধি।    

“আশ্চর্য”, আমার স্ত্রী বলল, “দ্বীপের অন্যপাশে কিন্তু এমন বড়ো বড়ো ঢেউ ভাঙে না।

“না”, আমি উত্তরে বল্লাম, “তার কারণ এদিকটা বাতাসের গতির মুখোমুখি কিনা তাই এদিকেই ঢেউ বেশি।”

আমরা সমুদ্রের দিকে চেয়ে বসে রইলাম। মনে হল সমুদ্রও বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত যে সে ঢেউ বয়ে আনছে পুবদিক থেকে, পুব থেকে, হ্যা পুর্বদিক থেকেই। এটা চিরকালের পুবের বাতাস, বাণিজ্য-বায়ু (ট্রেড উইন্ড)। এই বাতাসই সমুদ্রের ওপরে বইতে থাকে, ঢেউ বানায়, ঢেউগুলি পুবের দিক থেকে ভেসে ভেসে এসে ভেঙে পড়ে দ্বীপের বুকে। ঢেউগুলি থমকে যায় পাহাড়ে, প্রবালের প্রাচীরে; পুবের বাতাস কিন্তু সৈকত পেরিয়ে জঙ্গলের, পাহাড়ের, দ্বীপের মাথার ওপর দিয়ে অনায়াসে বয়ে যায় আরো পশ্চিমে, এ দ্বীপ থেকে ওই দ্বীপ, সূর্যাস্তের দিকে।

সুতরাং সেই কবে থেকেই, সমুদ্র ফুঁসে উঠছে পুবের দিক থেকে, মেঘ ঘনিয়ে আসছে পুব আকাশেই, পুব দিগন্ত থেকেই তার আনাগোনা। প্রথম যে মানুষ এখানে এসেছিল তারা গোড়া থেকেই এটা জানত, এখন যারা থাকে তারাও এটা জানে। সামুদ্রিক পাখিরাও জানে, তারা ভোরবেলা খাবারের খোঁজে পুবদিকেই উড়ে যায় যাতে বেলা শেষে ডানা ভার হয়ে এলে ভরা পেটে পুবের বাতাসে ভর করে ফিরে আসা যায়।  গাছেরা, ফুলেরাও এই পুবের বাতাসের বয়ে আনা বর্ষার ওপরে নির্ভর করে বাড়ে। আর ওইখানে বসে বসে আমরাও জেনে ফেললাম, ওই দূর পূর্বদিগন্তের নীচে যেখানে মেঘ জড়ো হয়, তারও ওপাশে দক্ষিণ আমেরিকার তটভূমি। মাঝে অপার সমুদ্র, চার হাজার মাইলের বিস্তৃত মহাসাগর, আর কিচ্ছুটি না।

আমরা ভেসে আসা মেঘের দিকে চেয়েছিলাম, জ্যোৎস্নাধোয়া সমুদ্রের ঢেউ দেখছিলাম, আর বসে বসে শুনছিলাম বৃদ্ধ মানুষটির কথা। আমাদের কাছেই  খালি গায়ে বালির ওপর বসেছিলেন, কাঠকুটো দিয়ে সামনের নিভুনিভু আগুনের দিকে তাকিয়ে।

“টিকি”, শান্ত স্বরে বললেন মানুষটি, “তিনি ছিলেন একাধারে দেবতা ও সর্দার। আমাদের পূর্বপুরুষদের তিনিই প্রথম এই দ্বীপে আনেন। তার আগে আমরা সাগরের ওপারে একটা বিশাল মহাদেশে থাকতাম।”

বলতে বলতে আগুনটাকে একটু উসকে দিলেন। বসে বসে ভাবছিলেন বৃদ্ধ। প্রাচীন সময়ে বাঁধা পড়ে থাকা এক মানুষ, চিরাচরিতভাবে পূর্বপুরুষ আর তাদের কাজকর্মের প্রতি অগাধ ভক্তি শ্রদ্ধা তার মনে। মনে বিশ্বাস আবার তিনি মিলিত হতে পারবেন পূর্বপুরুষদের সাথে। ফাটু হিভার পূর্ব উপকূলের সমস্ত লুপ্ত উপজাতীয় মানুষের মধ্যে বৃদ্ধ টেই টেটুয়া একমাত্র জীবিত মানুষ। ওঁর কতো বয়েস নিজেও সেটা জানতেন না। কিন্তু তার কুঁচকে যাওয়া চামড়া, চামড়ার বাদামি রঙ দেখে মনে হত প্রায় একশ বছর ধরে রোদে পুড়ে পুড়ে এমনটা হয়েছে। এই দ্বীপপুঞ্জে তখনও টিকে থাকা অল্প লোকেদের মতো উনিও বিশ্বাস করতেন বাপ দাদাদের মুখে মুখে শোনা পলিনেশিয়ার প্রধান দেবতা “টিকি”-র গল্পকথা। সূর্যের ছেলে টিকি।  

সেদিন যখন আমাদের কুঁড়েঘরে শুতে গেলাম বৃদ্ধ টেই টেটুয়ার “টিকি” র গল্প আর সমুদ্রের ওপারেkhelakontiki (4) (Medium) দ্বীপবাসীদের প্রাচীন ভূখন্ডের কথাটা আমার মাথায় কেবলই ঘুরপাক খেতে লাগল। আর থেকে থেকেই সমুদ্রের গর্জন। মনে হল অন্ধকার রাত্রির মধ্য থেকে একটা স্বর, কিছু একটা বলতে চাইছে, সেই কবে থেকে! আমি ঘুমোতে পারলাম না। মনে হল যেন সময়ের কোনো অস্তিত্বই নেই আর “টিকি”, এইমাত্র তার দলবল নিয়ে সমুদ্র পেরিয়ে নীচের বেলাভূমিতে এসে নামলেন। হঠাৎ একটা কথা মাথায় খেলে গেল আর আমি আমার স্ত্রীকে ডেকে বললাম, “একটা ব্যাপার খেয়াল করেছো? জঙ্গলে “টিকি”-র যে পাথরের মূর্তিগুলো আছে সেগুলোর সাথে দক্ষিণ আমেরিকার লুপ্ত সভ্যতার মূর্তিগুলোর কি আশ্চর্য রকম মিল!”

আমি নিশ্চিত সমুদ্রের দিক থেকে ঢেউগুলিও আমার কথার সমর্থনে বেশ জোরালো আওয়াজে ভেঙে পড়ল আর তারপর ক্রমে সেটা থিতিয়ে এলে আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম।    

ক্রমশ