ধারাবাহিক অভিযান অন্নপূর্ণা অভিযান মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক বসন্ত ২০১৭

আগের পর্বগুলো

khelaannapurnaimage-page1

    সেই বিপুল বিস্তীর্ণ শুভ্র তুষারক্ষেত্রের মধ্যে আমাদের বেচারা ছোট্ট দু’নম্বর ক্যাম্প অন্তহীন মহাসমুদ্রের মাঝে একফোঁটা ডিঙিনৌকোর মতো হারিয়ে গেল। চারপাশে দূর দূর থেকে অবিরাম তুষারধ্বসের আওয়াজ কানে আসছিল, কিন্তু ঠিক কোথায় যে ধ্বস নামছে কিছু বুঝতে পারছিলাম না। মোটামুটি নিরাপদ জায়গাতেই তাঁবু ফেলেছি এই ভেবেই মনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। কনকনে ঝোড়ো হাওয়া আর তুষারের ঝাপটার মধ্যে আইসঅ্যাক্স দিয়ে তাঁবু ফেলার মতো ছোটো একটু জায়গা সমতল করে নিয়ে টেন্ট খাটাতে ঘন্টাখানেক সময় লেগেছিল, তারপরই তড়িঘড়ি সবাই তাঁবুর ভেতর স্লিপিং ব্যাগের উষ্ণ আরামে আশ্রয় নিয়েছিলাম।

    আমি আর শ্যাজ যে তাঁবুটায় ছিলাম সেটা ছিল এই অভিযানের জন্য বিশেষভাবে তৈরি তাঁবুগুলির মধ্যে প্রথম পরীক্ষামূলক তাঁবু, এটাকে নমুনা করেই বাকি চৌদ্দটা তাঁবু তৈরি হয়েছিল। সুবিধে হচ্ছে এই তাঁবুটা অন্যগুলোর চেয়ে সামান্য বড়ো। শ্যাজ বলল তাঁবুর প্রবেশপথের উল্টোদিকে মাথা রেখে শুলে নাকি ঘুম ভালো হবে, কিন্তু ওরকম বিচ্ছিরি রাত আমি কখনও কাটাইনি। একটু পরপরই মনে হচ্ছিল যেন দম বন্ধ হয়ে মরে যাচ্ছি, আর ঘুমের তো দফারফা! জীবনে আর কোনওদিন তাঁবুর দরজার উল্টোদিকে মাথা রেখে শোব না। দরজার দিকে মাথা রাখলে চেনটা মাঝেমধ্যে অল্প ফাঁক করে ভেতরে একটু হাওয়াবাতাস খেলানো যায়। এমনিতে অবিশ্যি শ্যাজের মতো সঙ্গীর জুড়ি নেই। দিব্যি আরাম করে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর শুয়ে শুয়ে দেখলাম শ্যাজ রান্না চড়াল, যত্ন করে মেসটিনে ডিনার সার্ভ করল, আমি স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে আধশোয়া অবস্থাতেই খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম, একটু উঠতে অবধি হল না।

    এদিকে আমরা যখন দু’নম্বর ক্যাম্পে যতটা পারি আরামে থাকার চেষ্টা করছি, নিচে এক নম্বর ক্যাম্পে টেরের অবস্থা তখন সঙ্গিন। ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে সে অর্ধেক রাত জেগেই বসে রইল, তারপর যখন দেখল তুষার পড়ে পড়ে তার মাথা অবধি প্রায় ঢেকে ফেলেছে, বরফের ইগলুর ভেতর মমি হয়ে থাকা একটা মানুষের মতোই লাগছে নিজেকে, তখন যা হয় হবে ভেবে সরকির স্লিপিং ব্যাগটার মধ্যে মাথা-টাথা ঢুকিয়ে চেন বন্ধ করে দিল। দম বন্ধ হলে হবে ’খন, আগে তো ঘুমোনো যাক! ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে ঘুম নেমে আসতে দেরি হল না, ওইভাবেই সে বাকি রাত কাটিয়ে দিল।

    পরদিন ১৯,৩৫০ ফিট উচ্চতায় দু’নম্বর ক্যাম্পে বেলা ন’টার সময় যখন ঘুম ভাঙল আমাদের তখন সূর্যের আলোয় চারপাশ যথেষ্ট গরম হয়ে উঠেছে। তাঁবুর ক্যানভাসের কাপড় ভেদ করে আসা সোনালি আলোয় ভেতরটা মায়াবী লাগছে। কিন্তু পায়ে জুতো গলাতে গিয়ে সবার একেবারে নাজেহাল অবস্থা – দেখি বরফে, ঠান্ডায় জুতোগুলো এক-একটা শক্ত থান ইটের মতো হয়ে গেছে। এরপর থেকে আমি সবসময় আমার জুতোজোড়া নিজের স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে নিচের দিকে রাখতাম।

তাঁবুর দরজা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে দেখি – আকাশ ঘন নীল, অসাধারণ দৃশ্য চারদিকে, যেদিকেই তাকাই একের পর এক তুষারশৃঙ্গ আর সুউচ্চ সব গিরিশিরা, শৃঙ্গগুলির বেশিরভাগই ২৩,০০০ ফিটের চেয়েও উঁচু। আমাদের খুব কাছেই মাথার ওপরে অন্নপূর্ণার সেই ভাঙাচোরা গিরিশিরাটা, উত্তর-পশ্চিম উপগিরিশিরা ধরে আমরা আগে যে পথে ওঠার বৃথা চেষ্টা করেছিলাম। এখান থেকে ওই গিরিশিরা বরাবর আগাগোড়া পথটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, সে পথের দশ ভাগের এক ভাগ মাত্র আমরা এগোতে পেরেছিলাম। তাছাড়া, অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলাম, ভাঙাচোরা গিরিশিরাটা চূড়ো অবধি গিয়েছে বটে, কিন্তু তার মাঝপথে এক বিশাল দুর্লঙ্ঘ্য ফাঁক, ও পথে শৃঙ্গজয়ের সমস্ত সম্ভাবনায় জল ঢালার পক্ষে যা যথেষ্ট। উপগিরিশিরার পথ থেকে আমায় আর টেরেকে যে ফিরে আসতে হয়েছিল, সে ব্যাপারে আর কোনও আপশোশ রইল না তাই।

দূর পশ্চিমে একটি স্বচ্ছ স্ফটিকখন্ডের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে ধৌলাগিরি শৃঙ্গ, অপেক্ষাকৃত কাছে গর্বিত ভঙ্গীতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে দুর্গম নীলগিরি। তার ডাইনে, আমাদের লিলিপুট ক্যাম্পের ওপর মাথা উঁচু করে অন্নপূর্ণা হিমালের সেই দৈত্যাকার তুষারপ্রাচীর, খাড়া নেমে গেছে মিরিস্তি খোলা নদীর গিরিখাতে। তারও ডানদিকে এক বিশাল হিমবাহের পরে সেই সুদৃশ্য কালো ত্রিকোণাকৃতি শৈলচূড়াটি যাকে আমরা পূর্ব তিলিচো পাস থেকে দেখেছিলাম। ঘুরে দাঁড়ালাম। চোখের সামনে এক বিশাল তুষারাবৃত পর্বতগাত্র সূর্যালোকে ঝকমক করছে, এখানে সেখানে তার বড়ো বড়ো বরফের চাঁই ঝুলে আছে, ফাটলে ফাটলে আকীর্ণ তার গা। সেই পর্বতগাত্র বরাবর তাকালে অনেক ওপরে, এত ওপরে যে দেখতে হলে পেছনদিকে ঘাড় হেলাতে হয়, চারপাশের এই সবকিছুর – এ বিশ্বসংসারের সর্বময়ী কর্ত্রীর মতন বিরাজ করছেন দেবী অন্নপূর্ণা।

চিন্তিত মুখে সেই তুষারাবৃত পর্বতগাত্রের দিকে বহুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম আমি। এ পথেই আমাদের উঠতে হবে! তার সামনে আমাদের সাজসরঞ্জাম আর ক্ষমতাকে নেহাতই তুচ্ছ বলে মনে হচ্ছিল। কীভাবে এগোনো যায় ভাবছিলাম। কত কী যে মাথায় রাখতে হবে আমায়! দলের সকলের স্বাস্থ্য, যন্ত্রপাতি-সাজসরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা, বিঘ্ন-বিপদ এবং আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকা, আর সবার ওপরে সময়। সময় নেই হাতে একদম! ভাবতে বসলে মাথায় জট পাকিয়ে যায়। কিন্তু আমি মনস্থির করে ফেলেছি, যাই হোক না কেন এগিয়ে যাব। আবহাওয়া যেরকমই হোক না কেন, একের পর এক ক্যাম্প স্থাপন করে এগোতে থাকব, একটানা তুষারঝড় শুরু না হলেই হল। নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখলে ব্যাপারটা একটা গাণিতিক সূত্রের মতো – প্রতিদিন যত বেশি সম্ভব রসদ এবং সাজসরঞ্জাম যতটা সম্ভব ওপরে তুলে নিয়ে গিয়ে ডাঁই করা, সেইসঙ্গে খেয়াল রাখা শৃঙ্গজয়ের লক্ষ্যে চূড়ান্ত অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় যথেষ্ট শক্তি যেন সদস্যদের শরীরে সঞ্চিত থাকে। অভিযানের এই পর্যায়ে এত উচ্চতায় সবারই শক্তিক্ষয় হতে বাধ্য; খেয়াল রাখতে হবে শরীর যেন খুব ভেঙে না পড়ে, দরকারের সময় শরীর ও মনের সঞ্চিত শক্তি ও প্রতিজ্ঞার শেষ বিন্দুটুকু অবধি যেন আমরা নিংড়ে বার করে আনতে পারি। এখান থেকে নেমে যে আমাদের ফিরে যেতে হবে সে কথাও ভুলে গেলে চলবে না।

সকালে দেখলাম গতকালের প্রচণ্ড পরিশ্রমের কথা শরীর বেমালুম ভুলে গেছে, দিব্যি ঝরঝরে লাগছে। এই সুন্দর ঝকঝকে আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে আরও ওপরে উঠে তিন নম্বর ক্যাম্প স্থাপন করার জন্য সবাই প্রস্তুত। বুটের ওপর গেইটার চাপিয়ে সবাই হালকা ক্র্যাম্পন বেঁধে নিলাম। এখান থেকে প্রায় সবসময়ই আমাদের ক্র্যাম্পন ব্যবহার করতে হয়েছে। একটা তাঁবু আমাদের সঙ্গে নিলাম, একটা তাঁবু যেরকম আছে রইল, তার ভেতর কিছু খাবারদাবারও রাখা থাকল। একেকজনের বোঝার ওজন দাঁড়াল প্রায় ২২ পাউন্ড। ক্যাম্প ছাড়ার আগে সেই সুবিশাল পর্বতগাত্রটি আরেকবার ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে নিলাম। অগুন্তি খাড়া খাড়া বরফের দেওয়ালের মধ্য দিয়ে কী করে এগোব তা আগেভাগেই একটু ছকে নেওয়ার চেষ্টা করলাম, কেননা একবার ওই গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়লে সামনে পঞ্চাশ গজের বেশি দৃষ্টি চলবে না।

কাল রাতে তাঁবুতে যে যার পার্টনার ছিলাম সেভাবেই দুটো টিমে ভাগ হয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে নিলাম, ল্যাচেনাল আর রেবুফত এক দড়িতে, দ্বিতীয় দড়িতে শ্যাজ আর আমি। প্রায় দশটা বাজে, আর দেরি করা ঠিক নয়। দু’নম্বর ক্যাম্পে রেখে যাওয়া তাঁবুটা ভালো করে বন্ধ-টন্ধ করে আমরা রওনা দিলাম। কিছু দূরে দেখা যাচ্ছে শৃঙ্গের একদম কাছাকাছি এক ঢাল থেকে নেমে আসা একটা তুষারধ্বসপ্রবণ বিপজ্জনক নালা, ধ্বস নেমে নেমে তার পায়ের কাছে বিশাল এক তুষারের ঢিবি হয়ে আছে। ওই ঢিবি অবধি রাস্তায় ফাটল খুব একটা নেই, তাই সরাসরি সেদিকে এগোতে শুরু করলাম। তুষারে পা ফেলতেই ঠান্ডায় পা প্রায় জমে যাওয়ার যোগাড়, অথচ বাতাস এত গরম যে কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্যাকেট-ফ্যাকেট সব খুলে ফেলতে হল। ক্রমশ কঠিন বরফ আর তুষারে ঢাকা সেই উঁচু উঁচু দেওয়ালগুলোর চক্রব্যূহে ঢুকে পড়লাম। বাঁদিকে একটা গিরিশিরা দেখে ভারী আশ্চর্য হয়ে গেলাম; পুরো গিরিশিরাটা বিশুদ্ধ কঠিন বরফ দিয়ে গড়া, একেবারে স্বচ্ছ নীল; সকালের সূর্যের তেরচা আলোয় প্রায় কাচের মতো লাগছে। আর ডানদিকে দুধের মতো সাদা অন্নপূর্ণার সেই এবড়োখেবড়ো উত্তর-পশ্চিম গিরিশিরা যেন আমাদের সঙ্গে মজা করছে, “দেখি তো আমার মতো উঁচুতে উঠতে পারো কিনা!!” এ এক অদ্ভুত জগত! এখানে সবকিছুই যেন উল্লম্ব, আকাশ তাক করে খাড়া উঠে গেছে! মাঝে মাঝে ভারসাম্যের বোধটাই কেমন ওলটপালট হয়ে যায়। দূর থেকে দেখে এ দুনিয়ার তাজ্জব ব্যাপারস্যাপার বিন্দুমাত্র আঁচ করা সম্ভব নয়।

একঘন্টা চলার পর আমরা সবে নালার পাদদেশে সেই তুষারের স্তূপটার কাছে পৌঁছতে পারলাম। হাজার হাজার টন বরফ সেখানে ধ্বসের সঙ্গে নালা বেয়ে নেমে তালগোল পাকিয়ে আছে। খাড়া নালাটার যত কাছে এগোলাম চড়াই তত কঠিন হল। এই নালাটা বেয়ে অনবরত তুষারধ্বস নেমে চলে। মাঝে মাঝেই বরফের বড়ো বড়ো চাঁই ভেঙে পড়ার আওয়াজে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। এটা আমাদের পেরোতে হবে ভাবলেই তো প্রাণপাখি খাঁচাছাড়া হয়ে যাচ্ছে! খুঁজে খুঁজে বার করা গেল কোথায় নালাটা সবচেয়ে সরু, সেখান দিয়ে পেরোলে ধ্বসের আশঙ্কায় কাটানো সময়টা অন্তত কমবে। অন্নপূর্ণার এই পর্বতগাত্রের ওপরদিকের ঢাল থেকে যে তুষারধ্বসই নামুক না কেন তা এই নালা বেয়েই নামতে বাধ্য। তবে এই মুহূর্তে কিছু নামছে না! ল্যাচেনাল প্রথমে পেরিয়ে গেল। তারপর তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে একে একে অন্যদের পালা। একজন করে পেরোয়, বাকিরা উত্তেজনায় টানটান হয়ে দম বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। আমাদের পারাপারের রাস্তার ঠিক ওপরে একটা মস্ত কঠিন বরফের খন্ড তাকের মতো নালার একপাশ থেকে খানিকটা বেরিয়ে আছে, ছায়াতে থাকায় স্বচ্ছ সবুজ একটা মার্বেলখন্ডের মতো লাগছে সেটা। তাকটা ছাদের মতো কিছুটা হলেও আমাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে, তবে ওপর থেকে সত্যিই ধ্বস নেমে এলে ওতে কতটা আটকাবে বলা মুশকিল।

khelaannapurnaimage-page4

সব ঠিকঠাকই চলল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নালাটা পেরিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে উল্টোদিকে উঠে এলাম সবাই। বিশ্রাম নেবার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই, কারণ এদিকের ঢালটা এতই খাড়া যে নরম তুষার ধরে রাখতে পারেনি, পুরোই শক্ত বরফ। এগিয়ে চলা ছাড়া গতি নেই। ল্যাচেনাল আর রেবুফত আইসঅ্যাক্স দিয়ে চটপট ছোট্ট ছোট্ট ধাপ কেটে এগিয়ে গেল, এতই ছোটো ধাপ যে ক্র্যাম্পনের শুধু সামনের দুটো কাঁটাই ওতে রাখা যায়। বরফ প্রায় কাচের মতো; কঠিন, স্বচ্ছ। আইসঅ্যাক্সের ফলার আঘাতে তীক্ষ্ণ আওয়াজে ভেঙে গিয়ে ছোটো ছোটো টুকরোগুলো বিদ্যুৎগতিতে যেন নিচে মহাশূন্যের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। পর্বতগাত্র থেকে বেরিয়ে থাকা বিশাল বিশাল বরফখন্ডের নিচ দিয়ে দিয়ে আমরা ডানদিকে এগিয়ে চললাম। তারপর এক সঙ্কীর্ণ স্নো-ব্রিজ পেরিয়ে তুষারে ঢাকা একটা ছোট্ট চাতালে উপস্থিত হলাম। অবশেষে বিশ্রাম নেবার মতো একটা জায়গা পাওয়া গেল! ভাগ্য ভালো আজ আবহাওয়া এখনও অবধি চমৎকার। পেঁজা তুলোর মতো কয়েকখন্ড সাদা মেঘ ঘন নীল আকাশে আলগোছে ভেসে বেড়াচ্ছে।

আমাদের পায়ের তলায় এখন সেই সুবিস্তীর্ণ তুষারক্ষেত্র দু’নম্বর ক্যাম্পকে বুকে নিয়ে পড়ে আছে। ছোট্ট তাঁবুটা প্রথমে খুঁজেই পাচ্ছিলাম না, শেষে আমাদের উঠে আসার পদচিহ্ন অনুসরণ করে দেখতে পেলাম। ওপরে, আমাদের রাস্তার পরবর্তী পর্যায় খুব একটা সুবিধের নয়। একটা চড়াই তুষারঢাল বেয়ে দেড়শ ফিট মতো উঠলে পরে এক্কেবারে খাড়া এক বিশাল কঠিন বরফের দেওয়াল পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে, ডানদিক বাঁদিক কোনওদিক দিয়েই এগোনোর রাস্তা নেই। আরোহণের এই পর্যায়েই যদি এরকম সব বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়, আরও ওপরে না জানি কী হবে!

শ্যাজ আর আমি তেড়েফুঁড়ে তুষারঢাল ধরে এগিয়ে গেলাম। দেখি কোমর অবধি তুষারে ডুবে গেছি, আর নরম তুষারের নিচে কঠিন পেছল বরফে পা হড়কে ফের নিচে নেমে আসছি। দু’হাত দিয়ে একটা পা টেনে তুললাম আমি, তারপর আইসঅ্যাক্সটা যতটা সম্ভব ওপরে গেঁথে ওটা ধরে টেনে পেছনের পা-টা ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম – পিছলে গিয়ে ফের যেখানে ছিলাম সেখানেই! ওদিকে পরিশ্রমের চোটে বুক তখন হাপরের মতো ওঠানামা করছে। শেষমেশ নরম তুষার দু’পাশে সরিয়ে চলার মতো সরু একটা নালা কাটতে হল। ওই দেড়শ ফিট এগোতেই আমাদের এক ঘন্টা লেগে গেল। বিশাল বরফের দেওয়ালটার কাছে পৌঁছে ওই চড়া রোদ্দুরেও ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছিলাম আমরা। দেওয়ালটা খুঁটিয়ে দেখা গেল। একটা চওড়া তুষারে ঢাকা ফাটল, প্রায় একটা সরু গলির মতো, দেওয়ালটা বেয়ে উঠে গেছে। ফাটলটার মাথায় একটা বিশাল বরফখন্ড ওভারহ্যাং অবস্থায় অর্থাৎ সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। প্রথমে ফাটলটা ধরে ধাপ কেটে কেটে ওঠা চলতে পারে, তারপর ওভারহ্যাং টপকে দেওয়ালের ওপরে কীভাবে পৌঁছব সেটা দেখা যাবে। ল্যাচেনাল আর রেবুফতকে বললাম, এ পথে ওভারহ্যাং পেরিয়ে দেওয়ালটার মাথায় পৌঁছতে অন্তত দু’ঘন্টা সময় লাগবে; আমি আর শ্যাজ চেষ্টা করি, ততক্ষণ ওরা খুঁজে দেখুক ডানদিক বাঁদিক দিয়ে দেওয়ালটা এড়িয়ে ওপরে ওঠার কোনও সহজতর রাস্তা পাওয়া যায় কিনা।

আমার স্নো গগলসটা ঘাম আর তুষারকুচি-গলা জলে ঝাপসা হয়ে গেছিল। রুমাল দিয়ে মুছব বলে ওটা খুলতেই চোখ একদম ধাঁধিয়ে গেল। অনন্ত এই তুষারের রাজ্যে প্রখর সূর্যালোকের প্রতিফলনে যে প্রচণ্ড ঔজ্জ্বল্যের সৃষ্টি হয় খালি চোখে তা সহ্য করা যায় না। বহুদূরে নিচে সবুজ উপত্যকায় চোখ রেখে ক্ষণিকের আরাম পাওয়া গেল। রোদচশমা ফের পরে নিয়ে কোমরের দড়িটা একবার দেখে নিলাম ঠিকঠাক বাঁধা আছে কিনা, কতগুলো আইস পিটন (শক্ত বরফে গাঁথার গজাল) আছে গুণে নিলাম, পিটন পোঁতার হাতুড়িটা কোমরে ঝুলছে কিনা দেখলাম, তারপর শ্যাজ বিলে করার জন্য তৈরি আছে দেখে বললাম, “এগোচ্ছি আমি, একটু একটু করে দড়ি ছাড়ো।”

শ্যাজ শক্ত করে ওর আইস অ্যাক্সটা বরফে পুঁতে আমাদের দু’জনের কোমরে বাঁধা দড়িটা তাতে বেড় দিয়ে নিয়েছে। একটু ঢিল দিয়ে বলল, “এগোও।”

এই উচ্চতায় যে কোনওরকম শারীরিক কসরত এক ভয়ানক শক্ত ব্যাপার। আইসঅ্যাক্স দিয়ে এক একটা ঘা মারি আর হ্যা হ্যা করে হাঁপাই, এভাবে কোনওরকমে ফাটলের নিচের অংশটা প্রথমে পরিষ্কার করলাম। খাড়া বরফের দেওয়ালের গা বেয়ে ফাটলটা তেরচাভাবে ওপরদিকে উঠে গেছে। ফাটলের ভেতর জমে থাকা তুষারও যথেষ্ট শক্ত আর জমাট ছিল। শেষমেশ তিন ফিট লম্বা আর ফুটখানেক গভীর একটা অংশ পরিষ্কার করে তার ভেতরে নিজেকে গুঁজে দিলাম, তারপর ফাটল ধরে ঘষটে ঘষটে এগোতে শুরু করলাম। প্রথম কয়েক গজ প্রায় অনুভূমিকভাবে এগোতে হল, তারপর ফাটলটা ওপরদিকে উঠতে শুরু করল, সেই সঙ্গে ক্রমশ সরু ও অগভীর হতে থাকল। যতটা ওপরে হাত যায় আইসঅ্যাক্স গেঁথে সেটা ধরে শরীরটা ইঞ্চি ইঞ্চি করে টেনে ওপরে তুলে ফাটলের একেবারে ওপরের প্রান্তে পৌঁছে গেলাম, আমার মাথা গিয়ে ঠেকল সেই ওভারহ্যাং হয়ে থাকা বরফখন্ডটায়। সেখানে ফাটলটার গভীরতা এতই কম যে পুরো শরীরটা ভেতরে সেঁধিয়ে রাখা মুশকিল, বাইরের দিকে গড়িয়ে পড়ার ভয় সবসময়। উপুড় হয়ে শুয়ে ডানহাতে দেওয়ালে গেঁথে রাখা আইসঅ্যাক্সটা ধরে কোনওরকমে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছিল। আমার বাঁহাত ফাটলের ভেতরদিকে, সেদিকে ধরার কিছু নেই। এবার মাথার ওপরের ওই বরফের চাঁইটা টপকাতে হবে। খুব সাবধানে, ব্যালেন্স বজায় রেখে, ডানহাতের আইসঅ্যাক্সটা দেওয়াল থেকে খুলে নিয়ে সেটা দিয়ে ছোটো ছোটো ঘা মেরে বরফখন্ডটার তাকের মতো বেরিয়ে থাকা অংশটুকু ভাঙতে শুরু করলাম। বাঁ হাতে কিছু ধরা নেই, তাই জোরে ঘা মারতে পারছিলাম না। ছোটো ছোটো বরফের টুকরো আলগা হয়ে নিচে শ্যাজের মাথায় ঝরে পড়তে লাগল, সে তখন হাতের দড়িটা ধরে উত্তেজনায় টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যাতে আমি পড়ে গেলে সামলাতে পারে। এভাবে কিছুটা ভাঙার পর তাকটার ঠিক নিচে আইসঅ্যাক্স দিয়ে মেরে বাঁ হাতে ধরার জন্য একটা খাঁজ বা হোল্ড কাটলাম, তারপর ডানহাতে আইসঅ্যাক্সটা ওপরে গেঁথে সেটা ধরে শরীরটা ধীরে ধীরে হেঁচড়ে তুলে বাঁ হাতে খাঁজটা ধরে ফেললাম। এবারে বাঁ হাতে অবলম্বন পেয়ে গেছি, তাই ডান হাতের আইসঅ্যাক্স দিয়ে তাকটার ঠিক কিনারায় বাঁ হাতে ধরার জন্য বেশ ভালো করে একটা খাঁজ বানালাম, তারপর অ্যাক্সে ভর দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে শরীরটা তুলে সেই খাঁজ ধরে ঝুলে পড়লাম। পেছন থেকে আমার শরীরের ওপর শ্যাজের একাগ্র উৎকণ্ঠিত দৃষ্টি যেন স্পর্শের মতো অনুভব করতে পারছিলাম। এবার বাঁ হাতে ঝুলে ঝুলে তাকটার ওপরদিকে দুটো ধাপ কাটলাম, যাতে ওভারহ্যাং টপকাবার পর সেখানে পা রেখে কিছুটা সময় অন্তত বিশ্রাম নিতে পারি। কিন্তু এখনই তাকটা টপকে ওপরে উঠে যাওয়া ঠিক নয়, কারণ দড়িতে কুলোবে কিনা আমি নিশ্চিত নই। ওপরে ঠিকঠাক নিরাপদভাবে দাঁড়িয়ে বিলে করার মতো জায়গা কত দূরে পাওয়া যাবে জানা নেই। ঝুঁকি নেওয়ার কোনও মানে হয় না, তাই ফের সেই ফাটলে আগের জায়গায় নেমে এসে উপুড় হয়ে শুয়ে রেল ইঞ্জিনের মতো খানিক হাঁপালাম, তারপর ডানহাতের আইসঅ্যাক্সটা খাড়া বরফের দেওয়ালে পেরেকের মতো অনেকটা গেঁথে ওতে দড়িটা গলিয়ে শ্যাজকে হাঁক দিলাম উঠে আসার জন্য। গিরগিটির মতো শ্যাজ ফাটল বেয়ে উঠে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর মাথা এসে ঠেকল আমার পায়ের নিচে। আমি ওপরে উঠে যাওয়ামাত্র ও আমার জায়গায় উঠে এসে আমার আইসঅ্যাক্সটার সাহায্যে আমায় বিলে করবে, আর ওর অ্যাক্সটা বাড়িয়ে দেবে আমাকে।

শ্যাজ উঠে আসা অবধি কিছুক্ষণ বিশ্রাম পাওয়া গেছিল, এবার ফের আমার পালা। গেঁথে রাখা আইসঅ্যাক্সটার ওপর পা রেখে উঠে আমি বাঁ হাতে তাকের খাঁজটা ধরে ঝুলে পড়লাম। আমার হাতে অ্যাক্স নেই, তাই নিরাপত্তার জন্য ডান হাতে কোমর থেকে খুলে পিটন গাঁথার হাতুড়িটা নিয়ে নিয়েছিলাম, যদিও ওতে আইসঅ্যাক্সের কাজ হয় না। পরিকল্পনামাফিক শ্যাজ আমার ছেড়ে আসা জায়গায় উঠে এসে বিলে করার জন্য তৈরি হয়ে নিল, আর ওর অ্যাক্সটা বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। আমি পেছনদিকে না তাকিয়েই ডান হাতে অ্যাক্সটা নিয়ে নিলাম, তারপর ‘হেঁইয়ো মারি জোরসে’ বলে ঘুরিয়ে যথাসম্ভব জোরে কয়েক ফিট ওপরে অ্যাক্সের ফলাটা গেঁথে ফেললাম। পা দুটো তখন শূন্যে ঝুলছে আমার। তারপর দু’হাতের জোরে প্রাণপণ চেষ্টায় ইঞ্চি ইঞ্চি করে শরীরটা ওপরে টেনে তুলতে লাগলাম। কতক্ষণ লাগল জানি না, মনে হল এক যুগ পরে, ডান হাঁটুটা ওভারহ্যাং টপকে আগে থেকে কেটে রাখা দুটো ধাপের নিচেরটায় পৌঁছতে পারলাম। ওফফফ… কিছুটা স্বস্তি!! এরপর শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে এক ঝটকায় হাঁটুর জায়গায় ডানপায়ের বুটটা নিয়ে গেলাম… কিন্তু ক্র্যাম্পনের কাঁটাগুলো ঢুকল কি? না। কাঁটাগুলো বরফে গেঁথে না গেলে পায়ে ভর দিয়ে উঠব কী করে? পিছলে যাবে যে!! দুটো কাঁটা ঢুকলেও চলবে… মারো চাপ… একটা ঢুকেছে… আবার চেষ্টা করি… হ্যাঁ… এবারে দুটো ঢুকেছে… হেঁইয়ো মারি জোরসে… উঠে পড়লাম ওপরে!! এরপর আর এক হ্যাঁচকায় বাঁ পাটাও গেঁথে দিলাম আগে থেকে কেটে রাখা দ্বিতীয় ধাপটায়।

“উফফফ… উঠে পড়েছি!! যাচ্ছেতাই ব্যাপার… এ একটা রুট হল??”

শ্যাজ অধীর উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছিল, অবশেষে আমার গলা পেয়ে বলল, “বাহ, দারুণ মরিস, ওয়েল ডান।”

“তুমি নড়ো না এখনও, দড়িটা এক গজ ছাড়ো।”

জায়গাটা ঠিকঠাক ভারসাম্য রেখে দাঁড়াবার পক্ষে একেবারেই জুতসই নয়, তাই একমুহূর্তও না থেমে কঠিন বরফে ধাপ কেটে কেটে লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে চললাম। কয়েকগজ দূরে ঢালটা সহজ হয়ে এল, নরম তুষারে এসে পড়লাম। বেশ বড়ো একটা ধাপ কেটে দু’পায়ে ভালো করে দাঁড়িয়ে শ্যাজের উদ্দেশে চেঁচিয়ে বললাম, “আরেকটু অপেক্ষা করো। আরও দশ ফিট দড়ি ছাড়ো, একটা পিটন পুঁতে দড়িটা অ্যাংকর করে দি।”

হাওয়ার জোর ক্রমশ বাড়ছে। নিচ থেকে শ্যাজের উত্তর আবছা ভেসে এল, “ঠিক আছে।”

অমানুষিক পরিশ্রমে বুকটা এমন ধ্বক ধ্বক করছিল যে মনে হচ্ছিল এই বুঝি ফেটে যায়। ওই ঠান্ডাতেও কপাল আর ঘাড় বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছিল। আইসঅ্যাক্সে ভর দিয়ে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিট চোখ বন্ধ করে রইলাম, তারপর ফের ধাপ কেটে কেটে এগিয়ে চললাম। বরফ এখানে দানা দানা হয়ে জমাট বেঁধে আছে, কাচের মতো নিরেট নয়, তাই খুব বেশি পরিশ্রম করতে হল না। ওভারহ্যাং-এর বাধাটা তো পেরিয়ে এসেছি, সে তুলনায় এ পথ কিছুই নয়। আর এক গজ এগোলেই সোজা হয়ে দু’পায়ে দাঁড়াবার একটা দুর্দান্ত জায়গা পেয়ে যাব। অ্যাক্স দিয়ে কঠিন বরফের ছোট্ট সমতল জায়গাটা পিটন পোঁতার জন্য পরিষ্কার করে নিলাম। বরফের গুঁড়ো আর তুষারকুচি ওভারহ্যাং বরফের চাঁইটা বেয়ে নিচে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়তে লাগল। শ্যাজ এখনও সেই ফাটলে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, কী ভাবছে কে জানে! চেঁচিয়ে বললাম, “আর এক মিনিট।”

আমার কোমরে মাছ ধরার বঁড়শির মতো দেখতে প্রায় এক হাত লম্বা এক বিশাল আইস পিটন ঝোলানো ছিল, তার অর্ধগোলাকৃতি হুকটার ভেতরে আবার খাঁজ খাঁজ কাটা। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাতুড়ির ঘা মেরে মেরে সেটা বরফে পুরো গেঁথে ফেললাম। বরফ এখানে খুব একটা শক্ত নয়, ভয় হল হুকটা খুলে বেরিয়ে আসবে না তো? অবশ্য হুকের গজালটার চারপাশের বরফ ফের জমে গিয়ে শক্ত করে ধরে রাখবে ওটা। এরপর আমার অতিরিক্ত দড়িটা বার করলাম। শুকনো পরিষ্কার সাদা দড়িটা থেকে ছুরি দিয়ে ছ’ফিটের একটা টুকরো কেটে হুকের সঙ্গে ফাঁসের মতো আটকে দিলাম, তারপর বাকি প্রায় ষাট ফিট লম্বা দড়িটা সেই ফাঁসে বেঁধে নিচে ঝুলিয়ে দিলাম। ওভারহ্যাং বরফখন্ডটার ওপর দিয়ে দড়ি নিচে ঝুলে পড়ল – আমাদের অভিযানের প্রথম ফিক্সড রোপ।

আগে একবার পরীক্ষা করে দেখা উচিত এটা। ঝুলে পড়লাম দড়িটা ধরে, কিছুটা নেমে দড়ি ধরে ফের উঠে এলাম আগের জায়গায়। নাঃ, ঠিকই আছে!

হাঁক দিলাম, “শ্যাজ, এবার উঠে আসতে পারো তুমি।”

“ঠিক আছে। রওনা হওয়ার সময় জানাচ্ছি।”

শ্যাজ রুকস্যাকটা ফাটলের ভেতর খুলে রেখেছিল, সেটা কাঁধে চাপিয়ে তৈরি হয়ে নিল। একটু পরেই তার গলায় পর্বতারোহীদের চেনা কমান্ড শোনা গেল, “আই অ্যাম কামিং।”

আমি শক্ত করে কোমরের দড়িটা ধরে বিলে করার জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ালাম।

শ্যাজ ফিক্সড রোপ ধরে ঝুলে পড়ল। কিছুক্ষণ বেশ ঘষটাঘষটির আওয়াজ পেলাম, তারপর ওভারহ্যাং বরফখণ্ডটার কিনারা থেকে একটা নোংরা টুপিপরা মাথা উঁকি দিল, তারপর রোদে পোড়া কালো একটা মুখ। একেকজনের মুখের যা ছিরি হয়েছে আমাদের! বাড়ির লোকে চিনতে পারলে হয়! ক্র্যাম্পন আর আইসঅ্যাক্স বরফে গেঁথে গেঁথে দড়ি ধরে শ্যাজ চলে এল আমার পাশে; ওভারহ্যাং পর্ব খতম হল ভালোয় ভালোয়।

হঠাৎই সূর্যটা ঢাকা পড়ে গেল মেঘে, ঠান্ডা হাওয়া ছাড়ল একটা। তাড়াতাড়ি উইন্ডচিটার গায়ে চাপিয়ে হুডে মাথা ঢেকে ফেললাম দু’জন। কিন্তু আমাদের বাকি দু’জনের কী হল? হাঁক পাড়লাম ওদের নাম ধরে।

“আমরা এখানেই আছি,” নিচ থেকে গলা পাওয়া গেল ল্যাচেনাল আর রেবুফতের। জানা গেল খাড়া বরফের দেওয়ালটার ডানদিক-বাঁদিকে খোঁজ করে লাভ হয়নি বিশেষ, ওদিকে কোনও রাস্তা নেই, আমাদেরটাই একমাত্র রুট। দুই মক্কেল তাই দিব্যি নিচে বসে দেখছে আমরা কী করি! পনেরো মিনিটের ভেতর ওরাও উঠে এল আমাদের কাছে।

khelaannapurnaimage-page8

ফের সামনে এগোনো শুরু করা গেল। শুভ্র তুষারসমুদ্রের মধ্য দিয়ে মন্থর কষ্টকর এক যাত্রা। আবহাওয়াও খারাপ হয়ে এল, শুরু হল তুষারপাত। পর্বতগাত্রের ঢালে আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপ এগোতে এতই পরিশ্রম করতে হচ্ছিল যে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লাম। পুরো রাস্তাই যদি এভাবে এগোতে হয় তবে কোনওদিনই হয়তো শৃঙ্গশীর্ষে পৌঁছতে পারব না আমরা। অন্যরাও আমার থেকে খুব বেশি আশাবাদী বলে মনে হল না। দিনের বেলা প্রতিদিন এই ভারী তুষারপাতটা শুধু যদি বন্ধ হত তাহলে রাত্রে তুষার জমে কঠিন হয়ে উঠত, এগোনোও সহজ হত অনেক। কিন্তু প্রতিদিনই দেখা যায় দুপুরের পর আবহাওয়া খারাপ হয়ে আসে, তুষারঝড় শুরু হয় নয়তো ভারী তুষারপাত, ফলে বারো থেকে আঠারো ইঞ্চি পুরু নতুন তুষারের আস্তরণ ঢেকে ফেলে চারদিক। পরদিন একই রুটে চলতে হলেও ফের নতুন করে ধাপ কেটে কেটে রাস্তা তৈরি করে এগোও! বিরক্তির একশেষ! এ অবধি যেটুকু এগিয়েছি আশা করি সে রাস্তা তুষারপাতে পুরো মুছে যাবে না, খুঁজে পাওয়া যাবে ফের। এই রুটই আমাদের অন্তিম আশাভরসা, এও কি শেষে মরীচিকার মতো ধোঁকা দেবে আমাদের?

আকাশ থেকে ভাসতে ভাসতে নেমে আসা হালকা তুষারকুচির ভেতর দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম সামনে একটা ধূসর ছায়ার মতো শ্যাজের দেহটা, নরম তুষারে রাস্তা তৈরি করতে করতে এগিয়ে চলেছে। আমায় কিছুটা রেহাই দিয়ে এখন সামনে এগিয়ে গেছে ও। শনশন হাওয়া বয়েই চলেছে, সামনে পঞ্চাশ ফিটের বেশি দেখার জো নেই। ঢালটা এখানে প্রচণ্ড খাড়াই, তাঁবু খাটাবার মতো কোথাও কোনও জায়গার চিহ্ন নেই। অবশ্য তিন নম্বর ক্যাম্প আরও কিছুটা ওপরে স্থাপন করলেই ভালো হয় আমাদের। অল্টিচিউড মেপে দেখা গেল ২১,৬৫০ ফিট। পরে অবশ্য জানা গেছিল আমরা মোটে ২১,০০০ ফিট উচ্চতায় ছিলাম, কিন্তু মনে হচ্ছিল প্রায় স্বর্গের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি।

অনবরত তুষারপাত হয়ে চলল। নরম তুষার সরিয়ে সরিয়ে রাস্তা তৈরি করে এগোনো ভয়ঙ্কর পরিশ্রমের একটা কাজ। যাই হোক, এক পা এক পা করে শম্বুকগতিতে এগিয়ে চললাম আমরা। শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও শৃঙ্গের দিকে যে একটু একটু করে এগিয়ে চলেছি সে কথা ভেবে খুব তৃপ্তি হচ্ছিল। পাহাড়ের ঢালে একফালি চাঁদের মতো দেখতে একটা বড়সড় বরফের চাঁই পাওয়া গেল। ঠিক হল, অনেক হয়েছে, আর নয়! এখানেই তিন নম্বর ক্যাম্পের জিনিসপত্র মজুত করে নেমে যাওয়া যাক এবারে। তাঁবু, সাজসরঞ্জাম আর খাবারদাবার সেই বরফের চাঁইটার গোড়ায় পিটন পুঁতে বেঁধে রাখা হল। কিছুটা ওপরে চাঁইটার গায়ে শক্ত বরফ কেটে একটা খোঁদল বানিয়ে একটা লাল রঙের ফ্লাস্ক ভালো করে গুঁজে দেওয়া হল সেখানে। ফ্লাস্কটা নিচে অনেকদূর থেকে দেখা যাবে, পরে অন্যদের জায়গাটা খুঁজে পেতে সুবিধে হবে।

নামাটা যে ওঠার তুলনায় কত সোজা সেটা ফের মালুম হল। এবার ল্যাচেনাল আর রেবুফত সামনে চলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা নিচে কুয়াশায় মিলিয়ে গেল। তুষারপাত আরও প্রবল হল। আমি শ্যাজের আগে আগে নামছিলাম, একটা ছোটো খাড়া বরফের ধাপ সামনে পেয়ে সোজা নিচে লাফিয়ে পড়লাম। আমার আর শ্যাজের মধ্যে সংযোগরক্ষাকারী কোমরে বাঁধা দড়িটার দৈর্ঘ্য হিসেবে রাখতে তাড়াহুড়োয় বেমালুম ভুলে গেলাম। শ্যাজের কোমরে লাগল এক জোর ঝটকা। সে মোটেই তৈরি ছিল না। হ্যাঁচকা টানে ভারসাম্য হারিয়ে বরফের ঢাল বেয়ে দুরন্ত বেগে পিছলে নামতে লাগল শ্যাজ, চিৎকার করতে করতে পাশ দিয়ে আমায় পেরিয়ে আরও নিচে গড়িয়ে চলল। ভাগ্যি ভালো, ঢালের ওপর পড়ে থাকা নরম তুষারের পুরু আচ্ছাদনে বাধা পেয়ে ধীরে ধীরে তার গতিবেগ কমে এল, শেষে একজায়গায় পুরোপুরি থেমে গেল সে। এই নরম তুষারকেই কিনা এতক্ষণ গাল দিচ্ছিলাম আমরা! অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে বিস্ময়বিস্ফারিত চোখে মাতালের মতো টলমল পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এল শ্যাজ, ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল হয়ে গেছে সে, তবে চোট লাগেনি কোথাও। এরপর শ্যাজ আগে আগে চলল, আমি পেছন পেছন দড়িটা ছোটো করে নিয়ে টান করে ধরে আমাদের উঠে আসার পথ অনুসরণ করে সেই তুষারপাত আর ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে নেমে চললাম। সেই বিপজ্জনক নালাটা পেরোবার মুখে ল্যাচেনাল আর রেবুফত আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। শ্যাজের টালমাটাল পদক্ষেপ দেখে ওরা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল, কাছে কাছে রইল তার, কড়া নজর রেখে সাবধানে নালাটা পার করিয়ে দিল। দ্বিতীয়বার কোনও দুর্ঘটনা ছাড়াই আমরা নালাটা পেরিয়ে এলাম। এরপর আমাদের দলের নানা সদস্যকে বহুবার নালাটা পারাপার করতে হয়েছে, কিন্তু অসীম ভাগ্যই বলতে হবে, একবারও কেউ তুষারধ্বসের কবলে পড়িনি।

মেঘলা গুমোটের জন্যই হোক কিম্বা কিছুটা নিচে নেমে এসেছি বলে, ঠান্ডা অনেক কম লাগছিল। এত তুষারপাত হয়েছে এর মধ্যে যে মাঝে মাঝে প্রায় কোমর অবধি নরম তুষারে ডুবে যাচ্ছি। মেঘ আর কুয়াশায় দু’নম্বর ক্যাম্পের কোনও চিহ্নই দেখা যাচ্ছে না। আন্দাজে আন্দাজেই এগোতে হচ্ছিল তাই। মাঝে মাঝে অবিশ্যি যে রাস্তায় উঠেছি সেটা খুঁজে পাচ্ছিলাম, তুষারপাতে পায়ের ছাপ মুছে এসেছে প্রায়। হাওয়ার জোর বাড়ল আরও, মুখ আর গগলসের ওপর তুষারকুচির তীব্র ঝাপটা আছড়ে পড়তে লাগল। মাথার হুডটা ভালো করে বেঁধে নিয়ে কুঁজো হয়ে কোনওমতে নেমে চললাম। কিছুটা উৎরাই গ্লিসেড করে হড়কে নেমে কয়েকটা পায়ের ছাপ আর একটা ফাটল দেখে মনে হল দু’নম্বর ক্যাম্প খুব কাছাকাছিই হওয়া উচিত। চারদিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখি ডাইনে কয়েক পা দূরেই তুষারে ঢাকা আমাদের তাঁবুটা দাঁড়িয়ে আছে! পুরো তাঁবুটাই তুষারে চাপা পড়ে গেছে প্রায়; একফালি লাল রঙের কাপড় শুধু দেখা যাচ্ছিল, তাই খুঁজে পেলাম। কী করা যায় এখন? এই একটা তাঁবুতে তো আমাদের চারজনের জায়গা হবে না! তার চেয়ে সবাই মিলে নেমে গেলে নিচ থেকে আরও মালপত্র ওপরে বয়ে নিয়ে আসা যাবে। সুতরাং, এগিয়ে চলো ফের।

বেলা পড়ে এসেছে। এক নম্বর ক্যাম্পের দিকে নামতে নামতে দৃশ্যমানতা আরও কমে এল। গাঢ় কুয়াশায় দিক ভুল করে ফেলার প্রবল সম্ভাবনা, তাই চারজন পরপর কোমরে দড়ি বাঁধা অবস্থায় এক লাইনে চলে মোটামুটি সোজা নামার চেষ্টা করছিলাম। ক্যাম্প ওয়ানের কাছাকাছি প্রচুর ফাটলে ভর্তি একটা জায়গা আছে জানতাম। মাকড়শার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ক্রিভাসগুলির মধ্য দিয়ে নামার একটাই মাত্র রাস্তা আছে, সেটা ছোটো ছোটো নুড়িপাথর দিয়ে কতগুলি স্তূপ বা কেয়ার্ন বানিয়ে চিহ্নিত করা ছিল। কেয়ার্নগুলোর একটাও এখন খুঁজে পাচ্ছি না। রেবুফত বলল আমাদের বাঁদিক ধরে নামা উচিত। ল্যাচেনাল বলল, না, ডানদিকে গেলে তবেই সে রাস্তা মিলবে। আমার মতে আমরা ঠিকই এগোচ্ছিলাম, এভাবে সোজা এগিয়ে গেলেই হবে। এই আবহাওয়ায়, আধো অন্ধকার আর ঘন কুয়াশায় একেকজন যে একেকদিকে এগিয়ে দেখব সে ঝুঁকিও নেওয়া ঠিক না। তাই ঠিক হল, প্রথমে রেবুফতের কথামতোই এগোনো যাক। দেখা গেল, বাঁ দিক দিয়ে নেমেই সে রাস্তা পাওয়া গেল যেটা একেবারে সোজা এক নম্বর ক্যাম্পে নেমে গেছে।

কুয়াশা ক্রমে গাঢ় থেকে আরও গাঢ় হচ্ছে। দু’পাশে দুটো ফাটলের মাঝখান দিয়ে নামছিলাম আমরা, হঠাৎ দেখি সামনে ফাটলদুটো জোড়া লেগে এক হয়ে গেছে! আর এগোনোর রাস্তা নেই। ফের পিছু হটতে হল। আগের জায়গায় ফিরে গেলাম আবার, তারপর ফাটলে ভরা অংশটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে নামার জন্য ডানদিকে এগোতে শুরু করলাম। দিনের শেষে পরিশ্রান্ত অবস্থায় এই উটকো ঝামেলা, এই ঘুরপথ, একেবারে নাকাল করে ছাড়ল আমাদের। কিছুটা নেমে মনে হল এক নম্বর ক্যাম্প আর খুব দূরে হওয়ার কথা নয়, তাই গলা চড়িয়ে হ্যালো হ্যালো করে ডাক ছাড়লাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দূর থেকে মৃদু কিন্তু স্পষ্ট আওয়াজ শোনা গেল, “এদিকে, এদিকে!” টেরের গলা।

ল্যাচেনাল বলে উঠল, “কী, বলেছিলাম না ডানদিক দিয়ে নামতে হবে আমাদের?”

কিছুক্ষণের মধ্যেই কুয়াশা ফুঁড়ে টেরে উদয় হল। বলল, এক নম্বর ক্যাম্পে সে ছাড়া পানসি, আয়লা আর আজীবা আছে, আমাদের সবার জায়গা সেখানে হবে না। অতি অল্প কিছু সাজসরঞ্জামই ক্যাম্প ওয়ানে আনা গেছে আপাতত, খাবারদাবার যা মজুত করা হয়েছে তাও ওপরের ক্যাম্পগুলিতে পাঠাবার জন্য। তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম, দিনের শেষ আলোটুকুর সুযোগ নিয়ে আমি, ল্যাচেনাল আর রেবুফত নিচে বেস ক্যাম্পে নেমে যাব। নামার পথে পড়ে যাবার মানসিক ধাক্কাটা শ্যাজ এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ও এখানে বিশ্রাম নিক।

টেরে গত রাত্রে তার খোলা আকাশের নিচে কাটানোর অভিজ্ঞতা সাতকাহন করে বলতে শুরু করল। ল্যাচেনাল অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে গজগজ করতে লাগল, “খালি হিরোগিরি! যত্ত সব!”

আমরাও আমাদের গল্প বললাম। একফালি চাঁদের মতো যে বরফখন্ডটার নিচে তিন নম্বর ক্যাম্পের জিনিসপত্র ডাঁই করে এসেছি তার রাস্তা মোটামুটি বুঝিয়ে দেওয়া গেল।

“কাল ভোরবেলাই পানসি আর আয়লাকে নিয়ে ওপরে উঠে যাব আমি,” বলল টেরে, “এদিকে আজীবা বেস ক্যাম্প আর ক্যাম্প ওয়ানের মধ্যে রুটিনমাফিক তার ফেরি সার্ভিস চালিয়ে যাবে।”

আজীবা খুব শক্তপোক্ত ছেলে, আর এই ফেরি সার্ভিসে ও একেবারে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছিল। প্রতিদিন দু’বার করে বেস ক্যাম্প থেকে এক নম্বর ক্যাম্পে মালপত্র বয়ে আনত সে। শয়ে শয়ে পাউণ্ড মাল এভাবে ও একাই তুলে এনেছে ক্যাম্প ওয়ানে। একঘেয়ে কাজটা মোটেই তেমন চটকদার নয়, কিন্তু অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এরকম নিঃস্বার্থ কিছু কাজের জন্যই অভিযানে সাফল্য আসে।

সুতরাং টেরে, শ্যাজ, পানসি আর আয়লা এক নম্বর ক্যাম্পে রইল। আমি, ল্যাচেনাল আর রেবুফত আজীবার সঙ্গে নিচে নামতে শুরু করলাম। আলগা ছোটো ছোটো নুড়িপাথরের ঢাল অর্থাৎ স্ক্রি জোন বেয়ে সড়সড় করে স্লিপ খেয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার ফিটেরও বেশি নেমে গেলাম আমরা। তারপর, উত্তর হিমবাহের হিমপ্রপাতের তলায় পৌঁছে নিচের বিস্তীর্ণ মোরেন অঞ্চলে আমাদের বেস ক্যাম্পের খোঁজে চেয়ে দেখি, ওমা! কোথায় সেই ছোট্ট একখানা তাঁবু! এ যে তাঁবুর মেলা বসে গেছে!! কিছুক্ষণ আগেই আইজ্যাক আর অডট প্রচুর কুলি আর বাকি শেরপাদের নিয়ে তুকুচা থেকে এসে পৌঁছেছে সেখানে। যাক, আজ আর কারও স্লিপিং ব্যাগের অভাব হবে না! খাওয়াদাওয়ার তো অঢেল ব্যবস্থা! এমনকি এর মধ্যেই সবুজরঙা বিশাল এক মেস টেন্টও খাটিয়ে ফেলা হয়েছে, কুলিরা সব গিয়ে জড়ো হয়েছে তার নিচে, কারণ বাইরে তখনও হালকা তুষারপাত হয়ে চলেছে।

অবশেষে তাহলে তুকুচা বেস ক্যাম্পের সঙ্গে আমাদের অগ্রবর্তী দলের যোগাযোগ স্থাপিত হল! এবার আমাদের রোখে কার সাধ্যি?

khelaannapurnaimage-page11

বেস ক্যাম্পে আড্ডা; বাঁদিক থেকে ল্যাচেনাল, অডট, রেবুফত, হারজগ, শ্যাজ

(এরপর আগামী সংখ্যায়)

জয়ঢাকের খেলা লাইব্রেরিতে এমন অনেক অভিযানের সংগ্রহ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s