ধারাবাহিক অভিযান অন্নপূর্ণা অভিযান মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক বর্ষা ২০১৭

আগের পর্বগুলো


সেদিন সন্ধেবেলা বেসক্যাম্পে তুমুল আড্ডা আর খানাপিনা চলল। দু’দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর আরাম মেলায় শরীর ছেড়ে দিয়েছে সকলেরই। শৃঙ্গজয়ের সম্ভাবনা জোরদার হওয়ায় মনটাও দিব্যি ফুরফুরে। মুরগির মাংস রান্না হল, পানীয়ের বোতল খোলা হল। টেরে পরে আপশোশ করেছিল, তার জন্য অপেক্ষা না করায় খুব ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। তার কথা যে মনে পড়েনি আমাদের তা নয়, কিন্তু ওই প্রচণ্ড খাটুনির পর বেসক্যাম্পের আরাম আর অঢেল খাবারদাবার দেখে লোভ সামলাতে পারিনি।

যে খানাপিনার কথা বলছি সেটা হয়েছিল ২৪ মে সন্ধেবেলা। তার মাত্র একদিন আগে ২৩ মে ভোরে আমার লেখা চিঠি নিয়ে সরকি তুকুচার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। তুকুচা যেতেই তো তিন-চার দিন লাগার কথা, ফিরতে আরও দিন তিন-চার! দু’দিনের মধ্যে কোন জাদুমন্ত্রে আইজ্যাক আর অডট শেরপা-কুলি-মালপত্র সবসমেত এখানে এসে হাজির হল? জানা গেল, আইজ্যাক নিজেই দলবল নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে আসছিল, মিরিস্তি খোলার গিরিখাতে সরকির সঙ্গে তার দেখা হয়। এই দু’দিনের ভেতর ১৬,৭০০ ফিট উচ্চতার এক নম্বর ক্যাম্প থেকে আমরা প্রায় ২১,৭০০ ফিটের তিন নম্বর ক্যাম্প অবধি পৌঁছে গেছি শুনে আইজ্যাক আর অডটও খুব রোমাঞ্চিত হল।

পরদিন ঘুম ভাঙল বেশ বেলা করে। দু’দিনের অত্যাচারের পর শরীর প্রায় অসাড় হয়ে আছে। বাইরে ঝকঝকে আবহাওয়া। আরামদায়ক রোদ পেয়ে ধীরে ধীরে হাত-পায়ের সাড় ফিরল। ঠিক করলাম আজ স্নান করতে হবে। স্নান তো করলামই, দাড়িও কামিয়ে ফেললাম। সাফসুতরো হবার পর বেশ ঝরঝরে লাগল। পায়ে নরম ক্যাম্পিং বুট গলিয়ে অলসভাবে এ তাঁবু সে তাঁবু ঢুঁ মারতে শুরু করলাম। ধীরে ধীরে শৃঙ্গজয়ের পরিকল্পনাটা পরিষ্কারভাবে মনে দানা বেঁধে উঠতে শুরু করল। কঠিন লড়াই সামনে। সবার মনেই এক চিন্তা। হাতে দূরবীন নিয়ে বাইরে ছড়িয়েছিটিয়ে বসে আছে সব, আলোচনা চলছে শৃঙ্গজয়ের রাস্তার সম্ভাব্য সব বিপদআপদ নিয়ে। আমি মনস্থির করেই ফেলেছিলাম, শুধু তুকুচা থেকে সরবরাহের ব্যাপারটা নিয়ে সংশয় ছিল। এ ব্যাপারে নোয়েল যে বেশ আস্থাভাজন তার প্রমাণ মিলল ফের। বোঝা গেল, আমার নির্দেশ পৌঁছোনোর বহু আগেই সে শেরপা-কুলি-রসদ এবং সাজসরঞ্জাম যোগাড় করে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। খুব খানিক হিসেবনিকেশ করে শেষে আশ্বস্ত হলাম। নাঃ, এদিকটা নিয়ে তেমন চিন্তা নেই! ওপরের ক্যাম্পে রসদ সরবরাহের কাজটা এরা মসৃণভাবেই সামলাতে পারবে। মূল অভিযাত্রীরা এখন পাখির চোখের মতো কেবল শৃঙ্গজয়ের ওপর মনঃসংযোগ করতে পারে। তাই ঠিক করলাম, বিকেলবেলা আমি আর রেবুফত ধীরেসুস্থে এক নম্বর ক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা দেব। সঙ্গে যতটা পারি মালপত্র বয়ে নিয়ে উঠব। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম শৃঙ্গজয় না করে আর বেসক্যাম্পে নামব না এবারে। লুসিয়ান ডেভিসকে এই অভিযান থেকে লেখা আমার শেষ চিঠি লিখতে বসলাম আমি।

অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প

প্রিয় ডেভিস,                                                                                         ২৫ মে, ১৯৫০

শৃঙ্গজয়ের লক্ষে চূড়ান্ত অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে তোমায় এই আমার শেষ চিঠি। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছে। তুকুচা থেকে তিন-চার দিনের রাস্তা আমাদের এই বেস ক্যাম্প। ব্যাপারটা মোটেই সুবিধের নয়, কারণ মাঝারি মাপের এক অনুসন্ধানী দল থেকে আমাদের পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি অভিযানে রূপান্তরিত করতে অনেক সময় নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। গতকাল আমরা প্রায় ২১,৭০০ ফিট উচ্চতা অবধি উঠেছিলাম। পুরো রাস্তাটাই কঠিন বরফ আর তুষারের ওপর দিয়ে, তবে এ রুটে বিপদের ঝুঁকি তুলনায় কম। আমাদের ক্যাম্পগুলির অবস্থান মোটামুটি এরকম –

অন্নপূর্ণার উত্তর হিমবাহের ডান তীরে বেস ক্যাম্প (১৪,৫০০ ফিট)।

উত্তর হিমবাহের হিমপ্রপাতের ওপরে এক নম্বর ক্যাম্প (১৬,৭৫০ ফিট), সেই ডান তীরেই, এক বিশাল তুষারক্ষেত্রের একেবারে কিনারায়।

অন্নপূর্ণা শৃঙ্গ থেকে সরাসরি নেমে আসা একটা হিমবাহের ওপর এক ছোট্ট চাতালে ১৯,৩৫০ ফিট উচ্চতায় দু’নম্বর ক্যাম্প।

আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আমাদের পরিকল্পনা আছে ২১,৭০০ ফিট উচ্চতায় তিন নম্বর ক্যাম্প স্থাপন করব, তারপর কাস্তের মতো দেখতে একটা হিমবাহের ওপর ২৪,৬০০ ফিট উচ্চতায় চার নম্বর ক্যাম্প। চিঠির সঙ্গে আইজ্যাকের আঁকা স্কেচম্যাপটা দেখলে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হবে (এই পর্বের শেষে দেখ)। একটা পাঁচ নম্বর ক্যাম্পও হয়তো বসাতে হতে পারে, ওপরদিকে রুট কীরকম পাই তার ওপর নির্ভর করছে।

আবহাওয়া সকালে দারুণ থাকে, বিকেলের দিকে খারাপ হয়ে আসে, প্রতিদিনই এরকম চলছে। রোজ বিকেলেই তুষারপাত হচ্ছে; বিরক্তিকর ব্যাপার, বিপজ্জনকও বটে, পরদিন চলতে গিয়ে নরম তুষারে ভুসভুস করে পা ডুবে যায়। দলের সবাই সুস্থ। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি এক নম্বর ক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছি। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই শৃঙ্গজয়ের জন্য চূড়ান্ত অভিযান চালাব আমরা। সকলেই বেশ আশাবাদী। ওপরের দিকে রাস্তা বেশ কঠিন, ওই অতি-উচ্চতায় এগিয়ে চলাও খুবই পরিশ্রমসাধ্য, তবে একবার চুড়োয় উঠতে পারলে এই প্রচন্ড পরিশ্রম আর কষ্টের কথা কারও মনে থাকবে না। আর বিশদে লিখতে পারছি না, প্রচুর কাজ পড়ে রয়েছে বুঝতেই পারছ। পরিস্থিতি আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে আইজ্যাক তোমায় জানাবে।

শুভেচ্ছা,

ইতি মরিস

আমি যখন এই চিঠি লিখছি তখন কোজির নির্দেশে শেরপা আর কুলিরা মিলে বেস ক্যাম্প গোছগাছ করে সুন্দর সাজিয়ে ফেলল। দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর ঘন মেঘ করে এল, বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ তুষারপাত শুরু হয়ে গেল। টেরের কথা ভেবে চিন্তা হচ্ছিল বেশ। সে তো আজ ভোরে দু’জন শেরপা নিয়ে তিন নম্বর ক্যাম্পের দিকে রওনা দিয়েছে, সঙ্গে প্রচুর মালপত্রও আছে… দুটো হাই অল্টিচিউড ইউনিট, কুড়ি পাউন্ড খাবারদাবার। তিন নম্বর ক্যাম্পেই ওদের রাত কাটানোর কথা আজ। বিকেল পাঁচটা নাগাদ যখন রওনা হলাম আমরা তখন বেশ ভারী তুষারপাত চলছে। ওর মধ্যেই তাড়াতাড়ি হেঁটে অন্ধকার হওয়ার আগে এক নম্বর ক্যাম্পে পৌঁছে গেলাম। তাড়াতাড়ি তাঁবু খাটিয়ে তিনজন ভেতরে সেঁধিয়ে গেলাম। রেবুফতের মুখের চামড়া রোদে একেবারে পুড়ে গেছে, ঠোঁটদুটো ফেটে গিয়ে ফুলে উঠেছে; বেচারার খেতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল।

পরদিন ভোর সাড়ে ছ’টায় ঘড়ির অ্যালার্ম শুনে ঘুম ভাঙল। চায়ের জন্য স্লিপিং ব্যাগের ভেতর শুয়ে হাঁক পাড়লাম, কিন্তু কারও তেমন তাড়া দেখা গেল না। গজেন্দ্রগমনে বেরোনোর প্রস্তুতি শুরু হল। বাইরে বেরিয়ে দূরবীন চোখে লাগিয়ে দেখি আমাদের রুট বরাবর অনেক ওপরে তিনটে ছোট্ট ছোট্ট কালো বিন্দু দেখা যাচ্ছে, গত পরশু যে উচ্চতা অবধি আমরা উঠেছিলাম তার চেয়েও খানিক ওপরে, একটু বাঁদিকে। ওখানেই নিশ্চয় তিন নম্বর ক্যাম্প বসানো হয়েছে তবে। দশটা নাগাদ দু’নম্বর ক্যাম্পের দিকে রওনা দিলাম – রেবুফত আর শেরপা দাওয়াথোন্ডুপ এক দড়িতে; আমি, ল্যাচেনাল আর আং দাওয়া আরেক দড়িতে। এই দাওয়াথোন্ডুপ সম্পর্কে আইজ্যাক আমাদের বারবার সাবধান করে দিয়েছে, তুকুচা থেকে বেস ক্যাম্প আসার সময় এ নাকি প্রচুর মদ্যপান করেছিল।

          সূর্যের প্রখর আলোয় সেই বিশাল তুষারক্ষেত্র তখন তেতে উঠেছে, প্রচণ্ড গরম। ল্যাচেনালের চলতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। দরদর করে ঘামতে ঘামতে যেন একটা ঘোরের মধ্যে হেঁটে চলেছিল সে। কেউ কিছু জিগ্যেস করলে চোখ তুলে কেমন ভোঁতা দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল আর সামান্য অজুহাতেই বসে পড়ছিল। রেবুফতের প্রচণ্ড পেট ব্যথা শুরু হল, শেষে এমনই অবস্থা দাঁড়াল যে তার রুকস্যাকটা পালা করে অন্যদের বইতে হল। কষ্টেসৃষ্টে শম্বুক গতিতে এগিয়ে চলেছিলাম আমরা, সবাইকেই যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছিল। দু’নম্বর ক্যাম্পে পৌঁছোনোর আগের অন্তিম কয়েকশো গজ ল্যাচেনাল প্রায় টেনেহিঁচড়ে কোনওরকমে শেষ করল। ফুটিফাটা ঠোঁটের ওপর বেচারি দুটো স্টিকিং প্লাস্টার সেঁটে রেখেছে, রোদ থেকে বাঁচাবার জন্য। রোদে পুড়ে ঝামা হয়ে যাওয়া বেগুনী মুখের ওপর সে দুটো হলদেটে প্লাস্টারের টুকরো খুব বেখাপ্পা লাগছিল।

          দু’নম্বর ক্যাম্পে পৌঁছে দেখি টেরে, পানসি আর আয়লা সবে সেখানে নেমে এসেছে। টেরে প্রচণ্ড উত্তেজিত, “আরে, গতকাল তো আমরা ২২,০০০ ফিট অবধি পৌঁছে গেছিলাম, কিন্তু তোমাদের রেখে আসা তাঁবু বা জিনিসপত্র কিছু তো দেখতে পেলাম না। নিশ্চয়ই সব তুষারের নিচে চাপা পড়ে গেছে! যে অবধি উঠেছিলাম সেখানে সমতল জায়গা বলে কোনও ব্যাপারস্যাপার নেই। আইসঅ্যাক্স দিয়ে বরফ কেটে কেটে তাঁবু ফেলার মতো জায়গা একটা বানিয়েছিলাম তিনজন, সেটাকে সমতল ঠিক বলা যাবে না, আর ওই প্রচণ্ড খাড়াই বরফঢালের একেবারে মধ্যিখানে জায়গাটা। রাত্রে সেই ছোট্ট আস্তানাতেই কাটিয়েছি। বাপ রে বাপ, সে যে কী ভয়ঙ্কর রাত! চারপাশ দিয়ে হুড়মুড় হুড়মুড় করে অনবরত তুষারধ্বস নেমে চলেছে! দু’চোখের পাতা এক করে কার সাধ্যি!”

          বর্ণনা আরও বাস্তবানুগ করে তোলার জন্য টেরে মুখে নানারকম আওয়াজ করে বোঝাল ঠিক কীভাবে তাদের দু’পাশে মাত্র কয়েক গজ (টেরে অবশ্য বলেছিল কয়েক ইঞ্চি) দূর দিয়ে তুষারধ্বস নেমে চলেছিল। তারপর বলে চলল, “শেরপা দু’জন তো ভয়েই আধ্মরা! আমারও ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ হচ্ছিল না। এরকম রোমহর্ষক একটা রাত কাটানোর পর নেমে আসা ছাড়া কিছু করার ছিল না। তাই ফিরে এলাম। এখনই এক নম্বর ক্যাম্পে নেমে যাব আমি। সেখানে ভালো করে বিশ্রাম-টিশ্রাম নিয়ে ফের চাঙ্গা হতে হবে।”

          “একদম ঠিক,” বললাম আমি, “এরকম অভিজ্ঞতার পর সেটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কোজি, শ্যাজ, অডট আর আইজ্যাক আজ বেস ক্যাম্প থেকে এক নম্বর ক্যাম্পে উঠে আসছে, তুমি সেখানে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করতে পারবে। আরেকটা সুবিধে হল, এক নম্বর ক্যাম্প থেকে ফের এখানে উঠে আসার সময় আরও কিছু মালপত্র বয়ে নিয়ে আসতে পারবে তোমরা। এই লোড ফেরি করার ব্যাপারটা সবসময় আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।”

          “আমরা যা কিছু বয়ে নিয়ে গেছিলাম সব ওই ২২,০০০ ফিটে ডাঁই করে এসেছি, তোমরা যে অবধি পৌঁছেছিলে সম্ভবত তার থেকে একটু বাঁদিকে কিছুটা ওপরে, একটা খাড়াই ঢালের মাঝখানে,” টেরে বলল; তারপর রুকস্যাক কাঁধে তুলে নিয়ে শেরপাদের হাঁক পেড়ে ডেকে তাদের দিকে কোমরে বেঁধে নেওয়ার জন্য দড়িটা ছুঁড়ে দিয়ে গভীর দরাজ গলায় আমাদের বিদায় জানিয়ে নেমে গেল।

          দু’নম্বর ক্যাম্প ফের চুপচাপ হয়ে গেল। রইলাম শুধু আমি, ল্যাচেনাল, রেবুফত আর দু’জন শেরপা। ল্যাচেনাল আর রেবুফতের শরীর ভালো নেই, তাই মানসিকভাবেও ওরা ঠিক চাঙ্গা অবস্থায় ছিল না। তার ওপর টেরে এইমাত্র বলে গেল তিন নম্বর ক্যাম্প অবধি রাস্তা প্রায় পুরোটাই গভীর নরম তুষারে ঢাকা। আগেরবারের যাত্রায় ল্যাচেনাল আর রেবুফত বুঝেছে ওরকম রাস্তায় পথ তৈরি করে চলা কতটা পরিশ্রমসাধ্য। আমার মনে হল, আরও ওপরে উঠে যদি এই দু’জনকে একদম সুস্থ এবং চাঙ্গা অবস্থায় পেতে হয় তাহলে আগামীকাল ওদের ওপর বেশি চাপাচাপি না করাই ভালো। ওরা যদি এখানে বিশ্রাম নিতে চায় তো নিক। দু’জন শেরপা রয়েছে, তিন নম্বর ক্যাম্প অবধি বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সাজসরঞ্জাম আর খাবারদাবারও রয়েছে আমাদের সঙ্গে। শেরপা দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে আমি একাই কেন ওপরে উঠি না কাল? উঠে তিন নম্বর ক্যাম্পটা ঠিকঠাক জায়গায় বসানোর কাজটা করি। চাই কি চার নম্বর ক্যাম্পও বসানোর চেষ্টা করতে পারি! আগামীকাল শ্যাজ আর কোজির এই দু’নম্বর ক্যাম্পে উঠে আসার কথা। আমি যদি তিন নম্বর ক্যাম্প কিম্বা তারও ওপরে একদিন বা দু’দিন কাটিয়ে ফের এখানে নেমে আসি, তার মধ্যে ল্যাচেনাল, রেবুফত, শ্যাজ আর কোজি এখান থেকে মালপত্র নিয়ে ওপরে উঠে যেতে পারবে। আমি ফিরে আসার মধ্যে টেরেও বিশ্রাম-টিশ্রাম নিয়ে চাঙ্গা হয়ে ফের এখানে উঠে আসবে, তখন আমরা দু’জন আবার একদফা ওপরের ক্যাম্পে লোড ফেরি করতে পারব। হাতে সময় খুবই কম। আজ মে মাসের ২৬ তারিখ হয়ে গেল। এখন এভাবে পালা করে একে একে আমাদের ওপরের ক্যাম্পে উঠে যাওয়া উচিত। এই পদ্ধতিতে সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে সবকটা ক্যাম্প বসিয়ে ফেলতেও পারব আমরা।

আজ বিকেলে দেখলাম আবহাওয়া ভালোই রইল, অন্যদিনের মতো দুপুর না ঘুরতেই দুর্যোগ ঘনিয়ে এল না। ল্যাচেনাল আর রেবুফত তাঁবুর ভেতর গভীর ঘুমে ডুবে রইল, আমি ধীরেসুস্থে সাজসরঞ্জাম গোছগাছ করে রুকস্যাক বাঁধাছাদা সেরে আগামীকাল ভোরের জন্য প্রস্তুত হয়ে রইলাম।

পরদিন খুব ভোরে দাওয়াথোন্ডুপ আর আংদাওয়াকে ঘুম থেকে ঠেলে তুললাম। ভোরবেলায় তুষার অপেক্ষাকৃত শক্ত জমাটবাঁধা থাকে, চলতে সুবিধে। বেলা বেড়ে গেলেই রোদের তাপে গলে নরম হয়ে যাবে, ভসভস করে পা ঢুকে যাবে। তাই যত সকালে বেরোনো যায় তত ভালো, জমাট তুষারের সুযোগ নিয়ে তাড়াতাড়ি অনেকটা রাস্তা এগিয়ে যাওয়া যাবে। তৈরি হয়ে যখন বেরোলাম তখনও দু’নম্বর ক্যাম্পে রোদ এসে পৌঁছোয়নি। গতকাল টেরেরা যে পথে নেমেছে সেই রাস্তা ধরে বিশাল তুষারের ঢিবিটার কাছে পৌঁছে গেলাম, সামনেই সেই বিপজ্জনক নালা যেটা বেয়ে অনবরত তুষারধ্বস নেমে এই ঢিবি তৈরি হয়েছে। আমার কাছে ক্যামেরা ছিল। ভাবলাম জায়গাটার কিছু ছবি তুলি। দাওয়াথোন্ডুপকে বললাম, তুমি আগে নালাটা পেরোও। নালা পেরিয়ে আইসঅ্যাক্স দিয়ে ধাপ কেটে কেটে ও ঠিকঠাক এগোতে পারে কিনা সেটা দেখাও আমার আরেক উদ্দেশ্য ছিল। ভালোই এগোচ্ছিল দাওয়া, কিন্তু যেখানে ওপর থেকে ফিক্সড রোপ ঝোলানো আছে সেই খাড়া বরফের দেওয়ালটার কাছে পৌঁছে তার জারিজুরি খতম হয়ে গেল। আমাকেই আগে উঠতে হল। মনে পড়ল, টেরে গতকাল একইরকম গল্প বলেছিল। ও যখন পানসি আর আয়লার সঙ্গে এই রুটে ওপরে যায়, পানসি সবার আগে আগে উঠছিল। এই খাড়া দেওয়ালটার সামনে এসে পানসির মুখ শুকিয়ে গেছিল, হাতের আইসঅ্যাক্সটা তুষারে গভীরভাবে গেঁথে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সে। ভাবটা যেন, এই আমি থামলাম, আর এগোচ্ছি না বাবা! টেরে বলেছিল, ‘কী হল পানসি? এগোও! তোমার পালা এবার।’ একমুখ হেসে পানসি বলেছিল, ‘মাপ করবেন ভীমসাহেব! এ শুধু আপনাদের, মানে সাহেবদের জন্য।’ বিশাল লম্বাচওড়া শক্তসমর্থ টেরেকে শেরপারা সব ভীমসাহেব নামে ডাকত।

টেরে পানসিকে আর জোরজবরদস্তি করেনি। আমার দলের দাওয়াথোন্ডুপেরও একই দশা। কিন্তু আমার এবারে ইচ্ছে ছিল সিনে ক্যামেরার সাহায্যে এই ওভারহ্যাং আরোহণটার একটা ভিডিও তুলে রাখার। তাই আংদাওয়াকে বললাম সবার আগে উঠতে। আমাকে পেরিয়ে সামনে যাওয়ার সময় দেখি ও ভয়ে কাঁপছে। কিন্তু বড়োসাহেবের আদেশ বলে কথা, তাই মুখে কিছু না বলে কতকটা বাধ্য হয়েই সে তৈরি হল। খাড়া দেওয়ালটার ফাটলের ভেতর উপুড় হয়ে শুয়ে একহাতে শক্ত করে দড়ি ধরে আংদাওয়াকে বিলে করতে করতে অন্যহাতে ক্যামেরা উঁচিয়ে আমি ভিডিও তুলতে শুরু করলাম। প্রাণপণ চেষ্টা করেও কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যর্থ হয়ে নেমে এল আংদাওয়া। দড়ির নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও আরেকবার তাকে চেষ্টা করতে বলার সাহস হল না। তাই ওকে সরিয়ে এগিয়ে গেলাম আমি। ফিক্সড রোপের সাহায্য নিয়ে ওঠা এখন যথেষ্ট সহজ দেখলাম, কয়েক সেকেন্ডের ভেতরেই ওভারহ্যাংটার মাথায় পঁচিশ ফিট ওপরে পৌঁছে গেলাম। তারপর দড়ি ধরে বিলে করে করে দাওয়াথোন্ডুপকে তুলে আনলাম। উঠতে খুবই কষ্ট হল দাওয়ার। কঠিন বরফের সটান খাড়া দেওয়াল বেয়েও যে ওঠা যায় সে ধারণাই ওর ছিল না, অভিজ্ঞতা তো দূরের কথা! বুঝতে পারলাম, পর্বতারোহী হিসেবে ওদের চোখে আমাদের, অর্থাৎ সাহেবদের সম্মান দ্রুত বেড়ে চলেছে! স্টিম ইঞ্জিনের মতো হাঁপাতে হাঁপাতে দাওয়া ওপরে এসে হাজির হল, কষ্টে পরিশ্রমে ওর মুখটা বেঁকেচুরে গেছে। কী করে দড়ির সাহায্যে বিলে করে আংদাওয়াকে তুলে আনতে হবে সেটা ওকে বুঝিয়ে দিলাম, তারপর আমি ভিডিও তোলার জন্য প্রস্তুত হলাম। এবারে ঠিকঠাকই চলল সব, ভালোই উঠল ভিডিওটা।

কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর একটু গোছগাছ করে নিয়ে ফের রওনা দিলাম আমরা। কিন্তু সেই খাড়া দেওয়াল বেয়ে ওঠার কসরত করতে করতে অনেক সময় বয়ে গেছে। সূর্য এখন ঠিক মাথার ওপর। এতই প্রখর তার তেজ যে পর্বতঢালে জমে থাকা তুষার গলে দইয়ের মতো মাখোমাখো হয়ে আছে, ঠেলে ঠেলে পথ চলা প্রাণান্তকর পরিশ্রমের ব্যাপার। টেরেদের গতকালের চলার পথের চিহ্নও প্রায় মুছে এসেছে। ওদের রাস্তা অবশ্য এখান থেকে বেঁকে গেছে বাঁদিকে। গতবারের যাত্রায় ২১,৭০০ ফিট উচ্চতায় আমরা যে তাঁবু আর মালপত্র ডাঁই করে গেছিলাম সেগুলো আমায় উদ্ধার করতে হবে, তাই সোজা ওপরের দিকে এগিয়ে চললাম আমরা। একটু পরেই একফালি চাঁদের মতো দেখতে সেই বিশাল বরফের চাঁইটা চিনতে পারলাম। এর গোড়াতেই মালপত্র রেখে নেমে গেছিলাম আমরা। কিছুক্ষণ আইসঅ্যাক্স দিয়ে তুষারের জমি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হদিস পাওয়া গেল সে সবের। তুষার সরানো হল। নিচ থেকে বেরোল তাঁবু, সাজসরঞ্জাম আর প্যাক করা খাবারদাবার যা আমি, ল্যাচেনাল আর রেবুফত তিন দিন আগে রেখে গেছিলাম। ঠিকঠাকই আছে সব। তিনজন ভাগাভাগি করে জিনিসগুলো পিঠে তুলে নিয়ে এবার ফের বাঁদিকে এগিয়ে টেরেদের গতকালের রুটটা ধরার চেষ্টা করলাম। আমরা যেখানে ছিলাম সেখান থেকে রাস্তাটা মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে, কিন্তু ওইটুকু পেরোতেই প্রায় এক ঘন্টা লেগে গেল। প্রায় কোমর অবধি তুষারে ডুবে যাচ্ছে, আইসঅ্যাক্স দিয়ে তুষার সরিয়ে সরিয়ে নালার মতো পথ তৈরি করে তবেই এগোনো যাচ্ছিল। অবশেষে যখন সে রাস্তায় পৌঁছোলাম, সামনে দেখি এক প্রচণ্ড খাড়াই জমাট বরফের দেওয়াল, সূর্যের আলোয় আয়নার মতো ঝকঝক করছে। ওঠার জন্য দেওয়ালটার গায়ে টেরে যেসব ধাপ কেটেছিল সেসব প্রায় পুরোই গলে গেছে। ফের নতুন করে ধাপ কাটতে হল আমায়। শেরপাদের সুবিধের জন্য ওপরে পৌঁছে একটা বড়ো আইস পিটন গেঁথে তার থেকে লম্বা একটা নাইলনের দড়ি নিচে ঝুলিয়ে দিলাম। তারপর আরও কয়েক পা ওপরে উঠে ভালোভাবে দাঁড়ালাম যাতে দড়ি ধরে ওদের ঠিকঠাক বিলে করতে পারি। ফিক্সড রোপ ধরে উঠতে ওরা বেশ মজা পেয়ে গেছে। চিৎকার আর হাসিমস্করা করতে করতে, হা হা করে হাসতে হাসতে একে একে দু’জন ওপরে উঠে এল।

অনেক ওপরে উঠে এসেছি। খাড়া খাড়া বরফের দেওয়ালের গলিঘুঁজি আর ভয়ানক চড়াই সব তুষারঢালে আকীর্ণ জায়গাটা এখন আমাদের পায়ের তলায়। মাথা তুলে দেখলাম ওপরে একটা অল্প চড়াই মসৃণ তুষারঢাল যার মাঝখান দিয়ে টেরের দলের পদচিহ্ন চলে গেছে। বাঁদিকে ভয়ঙ্কর খাড়াই অন্নপূর্ণার বিখ্যাত কেন্দ্রীয় বাহিকা বা নালা সোজা মনে হচ্ছে পাতালে নেমে গেছে, যেন ওপরের ঢাল বেয়ে যা কিছু নেমে আসবে সমস্ত গিলে খাওয়ার জন্য প্রকাণ্ড এক হাঁ করে আছে। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ আবহাওয়ায় নীলচে আলোয় ধোয়া চারদিক কেমন অপার্থিব লাগছে। কেন্দ্রীয় বাহিকার ওপারের স্বচ্ছ কঠিন বরফে তৈরি গিরিশিরাগুলি থেকে সূর্যালোক প্রতিসরিত হয়ে রামধনু তৈরি করেছে। গাঢ় নীল আকাশ, মেঘের কণামাত্র নেই, তরতাজা শুকনো হাওয়ায় আর্দ্রতাও খুব কম। শরীর-মনেও যেন অফুরন্ত শক্তি পাচ্ছি আমি আজ, ঠিকঠাক ভারসাম্যটা যেন এতদিনে খুঁজে পেয়েছি, আরোহণের সময় তেমন কষ্টই হচ্ছে না কোনও। গভীর এক প্রশান্তিতে ভরে আছে মন।

তবে এখনও অনেক রাস্তা বাকি। চারদিকের অত্যুঙ্গ সব শৃঙ্গরাজির যা আকার-আকৃতি, সে তুলনায় নিজেদের মাঝে মাঝে পিঁপড়েদের মতো মনে হয়। উঠেই চলেছে, উঠেই চলেছে, কিন্তু দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তুষারঢালটা ক্রমশ চড়াই হয়ে এল। রোদের তাপে নরম হয়ে যাওয়া তুষারের পক্ষে শরীরের ভার ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। পা ফেললে মন্ড হয়ে ঢাল বেয়ে কিছুটা নেমে যাচ্ছে, তারপর থিতু হচ্ছে। শেরপা দু’জনের দিকে খুব সতর্ক দৃষ্টি রেখে এগোতে হচ্ছিল। দু’পা যেতে না যেতেই দম নেবার জন্য থামতে হচ্ছে। প্রচণ্ড পরিশ্রমে পেছনের শেরপাদেরও যে একইরকম দমছুট অবস্থা সেটা বুঝতে পারছিলাম। মাঝে মাঝে মাথা তুলে ওপরে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম আর কত রাস্তা বাকি। হঠাৎই সেই চতুর্দিকব্যাপী শুভ্র তুষারের মধ্যে একফালি উজ্জ্বল হলুদ রঙ চোখে পড়ল। এ টেরের তাঁবু না হয়েই যায় না! গভীর তুষার ঠেলে ঠেলে মনে হল যেন অনন্তকাল পরে অবশেষে সেখানে উপস্থিত হলাম। এই জায়গাই এখনও অবধি এ রুটে আমাদের স্পর্শ করা সর্বোচ্চ বিন্দু। টেরের রেখে যাওয়া সাজসরঞ্জাম আর রসদপত্র সব তুষারের নিচে চাপা পড়ে গেছিল। তবে সে সমস্ত উদ্ধার করতে বেগ পেতে হল না, একটা বড়ো নাইলনের ব্যাগের ভেতর সব ঢুকিয়ে খুব যত্ন করে বাঁধা ছিল। এতটা ওপরে পৌঁছে গেছি বলে মনে খুব আনন্দ হচ্ছিল আমার, কিন্তু চারপাশ ভালো করে দেখে একটু ঘাবড়ে গেলাম। এই ঢালের ওপরেই স্থায়ীভাবে তিন নম্বর ক্যাম্প বসানোর কোনও প্রশ্নই ওঠে না। ডানদিকে গভীর খাদ অতলে নেমে গেছে; বাঁদিকে দৈত্যাকৃতি কিছু বরফের চাঁই ঢাল বেয়ে সাজানো – তারও ওপাশে অন্নপূর্ণার কেন্দ্রীয় বাহিকা; আর আমাদের ওপরে পঞ্চাশ গজ পর থেকে প্রচণ্ড ভাঙাচোরা এক অঞ্চল শুরু হয়েছে। বাঁদিকের বিরাট বিরাট বরফখন্ডের জঙ্গলটার দিকে ভালো করে লক্ষ করে দেখলাম দুটো চাঁইয়ের মধ্যবর্তী ফাটলগুলি সব নতুন তুষারপাতের ফলে বুজে গেছে। মাথায় একটা বুদ্ধি এল। ওখানে কোনও একটা ফাটলের মধ্যেই ক্যাম্প বসালে কেমন হয়? চারপাশ থেকে বেশ সুরক্ষিত থাকা যাবে! আর প্রকাণ্ড সব বরফের চাঁইগুলো ওপর থেকে নেমে আসা কোনও তুষারধ্বস থেকেও আমাদের আড়াল করে রাখবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ঠিক হল, এগিয়ে দেখা যাক সবাই মিলে।

শেরপা দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে সেরকম একটি তুষারে বুজে থাকা ফাটলের কিনারায় উপস্থিত হলাম। শক্ত হাতে দড়ি ধরে রেখে ওরা আমায় বিলে করতে শুরু করল, খুব ধীরে ধীরে আমি ফাটলের ওপর জমে থাকা তুষারে পা দিলাম। প্রথম কয়েক পদক্ষেপ খুবই সন্তর্পণে এগোলাম। আইসঅ্যাক্সের লম্বা ডান্ডাটা সম্পূর্ণ তুষারে গেঁথে ফেলে বুঝলাম বরফ যথেষ্ট জমাট বেঁধেছে। আত্মবিশ্বাস একটু বাড়ল। এবারে এগিয়ে গিয়ে অ্যাক্সের সাহায্যে ওপরের আলগা তুষার সরিয়ে ছোটো এক সমতল চাতালের মতো তৈরি করলাম। তারপর সেখান থেকে চারদিকপানে বেশ কয়েক পা এগিয়ে দেখে নিলাম। ফের কেন্দ্রে ফিরে এসে চাতালটার ওপর দাঁড়িয়ে এবার লাফাতে আরম্ভ করলাম, উদ্দামনৃত্য নাচতে শুরু করলাম। দেখলাম আমার ভার সইতে ফাটলে জমে থাকা তুষারের কোনও অসুবিধেই হল না। ওপরের আলগা নরম তুষারের আস্তরণ সরিয়ে জায়গাটা একটু সমতল করে নিলে আদর্শ এক ক্যাম্প করার জায়গা হবে এখানে, অনায়াসে দুটো তাঁবু মুখোমুখি ফেলা যাবে। এক মিনিটও নষ্ট না করে শেরপা দু’জন সেখানে তাঁবু খাটিয়ে ফেলল, গরম চা তৈরি করে ফেলল। আজকের দিনের জন্য এইই যথেষ্ট! লক্ষ্য ছিল তিন নম্বর ক্যাম্পটা সরিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ কোনও জায়গায় স্থায়ীভাবে বসানোর, সে কাজে আমরা সফল। নিচ থেকে ক্যাম্পটা অবশ্য দেখা যাবে না, বিশাল বিশাল বরফের চাঁইয়ে আড়াল হয়ে গেছে। দূরবীন চোখে লাগিয়ে নিচের ক্যাম্পের ওরা নিশ্চয়ই ভাবছে এখন, লোক তিনটে বেমালুম ভ্যানিশ হয়ে গেল নাকি?

শেরপারা ক্যাম্প গোছগাছ করে রান্নাবান্নার তোড়জোড় শুরু করল, আমি ততক্ষণে ফাটলটা বরাবর এগিয়ে অন্যপ্রান্তে অন্নপূর্ণার রাক্ষুসে কেন্দ্রীয় বাহিকাটার আরও খানিক কাছে গিয়ে ভালো করে দেখে এলাম; কারণ আগামীকাল আমাদের ঐ পথেই এগোতে হবে। মনে মনে আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম আগামীকালই চার নম্বর ক্যাম্প স্থাপন করার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করব। চারপাশের প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করার পক্ষে তখনও যথেষ্ট দিনের আলো ছিল। যেদিকে তাকাই সেদিকেই সুউচ্চ সব তুষারশৃঙ্গের মেলা। একদিকে অন্নপূর্ণার সেই ভাঙাচোরা অদ্ভুতদর্শন গিরিশিরা, উত্তর-পশ্চিম উপগিরিশিরা ধরে আমরা যে পথে ওঠার চেষ্টা চালিয়েছিলাম; দূরে সম্রাটের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে ধৌলাগিরি; আর উত্তরদিকে অনেক নিচে যতদূর চোখ যায় বিছিয়ে রয়েছে তিব্বতের বিস্তীর্ণ শুষ্ক মরুভূমি অঞ্চল, এখান থেকে মাত্র বারো-তেরো মাইল দূর হবে!

হিমশীতল একটা জোরালো হাওয়া উঠল, তবে আকাশে কোথাও কোনও সন্দেহজনক মেঘের চিহ্ন নেই। নিশ্চিত থাকা যায় আগামীকাল আবহাওয়া ভালোই থাকবে। আশায় বুক বেঁধে প্রফুল্লচিত্তে তাঁবুতে ঢোকা গেল। আজ আমার একলার জন্য দুর্ধর্ষ একটা তাঁবু, দু-দুটো এয়ার ম্যাট্রেস, দু-দু’খানা স্লিপিং ব্যাগ! খাওয়াদাওয়া সেরে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর পা ঢুকিয়ে হাওয়াবালিশে হেলান দিয়ে রাজাবাদশার মতো বসলাম, শেরপারা চা দিয়ে গেল। চা-পানের পর ডাক্তারসাহেব অডটের কড়া নির্দেশ অনুযায়ী অ্যাসপিরিন আর ঘুমের বড়ি খেয়ে নিলাম। অতঃপর কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

ব্যবহৃত ছবিঃ অন্নপূর্ণা অভিযান                                                        (এরপর আগামী সংখ্যায়)

জয়ঢাকের খেলা লাইব্রেরিতে এমন অনেক অভিযানের সংগ্রহ

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s